Home Blog Page 7

গাজীর পট, দুর্জন আলীর স্মৃতি ও ফজল মিয়ার দল

বাংলাদেশের নিজস্ব সংস্কৃতির অকৃত্রিম অনুষঙ্গ ‘গাজীর পট’-এর গায়েন দুর্জন আলী, মৃত্যুবরণ করেন ২০১৭ সালের ৩০ জানুয়ারি। এ-বছর তাঁর মৃত্যুর ৮ বছর পূর্ণ হলো। মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত এই মহান শিল্পী তাঁর কাজে পূর্ণ সক্রিয় ছিলেন। ছোটোখাটো দোহারা গড়নের এই মানুষটি খুবই বড়ো মনের ছিলেন। পেশা ছিলো বাড়ি বাড়ি ঘুরে ছাতা মেরামত করা। থাকতেন নরসিংদীর হাজীপুরে, এক জীর্ণ কুটিরে। সাথে থাকতেন তাঁর ছোটো ভাই আরেক কিংবদন্তী গায়েন কোনাই মিয়ার পুত্র ফজল মিয়া ও তাঁর পরিবার। জীর্ণাবস্থায়, দরিদ্রাবস্থায় দিনাতিপাত করেও এই শিল্পী মানুষটি তাঁর মনের ভিতরে অফুরান প্রেম ও মানবিকতার রসের ধারা বহমান রেখে চলতেন। ২০১৫ সালে, যখন তাঁর সাথে প্রথম সাক্ষাত ঘটে, তখনই পেয়েছিলাম এই শিল্পীমনের পরিচয়।

লোকশিল্প গবেষক তোফায়েল আহমদ কলকাতার আশুতোষ মিউজিয়ামে ‘গাজীর পট’ দেখতে যান। আশুতোষ মিউজিয়াম কর্তৃপক্ষ দাবি করে, দুই বাংলার এই একটি গাজীর পটই অবশিষ্ট আছে। গবেষক তোফায়েল আহমদ এই তথ্য মেনে নিতে পারেননি। দেশে ফিরে খুঁজতে থাকলেন পটচিত্রী আর পট পরিবেশনা সম্প্রদায়। সারাদেশের পটচিত্রের ইতিবৃত্ত খুঁজতে গিয়ে লোকসংস্কৃতি গবেষক তোফায়েল আহমদ এবং তাঁর দলের সঙ্গী সমাজকর্মী হামিদা হোসেন, শিল্পী কালিদাস কর্মকার নরসিংদীর হাজীপুর গ্রামের বেদেপাড়ায় খুঁজে পান পটকুশীলব দুর্জন আলী এবং কোনাই মিয়াকে। এসব ঘটনা সেই সত্তর দশকের। তাঁদের সূত্র থেকেই ১৯৮০ সালে খুঁজে পাওয়া যায় মুন্সিগঞ্জের কমলাঘাটের কাঠপট্টির কালিন্দীপাড়ায় পটচিত্রী সুধীর আচার্য এবং তাঁর ছেলে শম্ভু আচার্যকে। দুর্জন আলীর কাছে যে-পটচিত্রটি দেখতে পেয়েছিলাম, তা শম্ভু আচার্যের আঁকা। বর্তমানে এই চিত্রটি গায়েন ফজল মিয়া ও তাঁর দল ব্যবহার করেন।

বাংলাদেশে হাতেগোনা যে-ক’জন গাজীর পটশিল্পী ছিলেন, দুর্জন আলী ছিলেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম। অনেকে মনে করেন, তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে গাজীর পটের শেষ সূর্যটি অস্তমিত হয়েছে।

দুর্জন আলীর জন্ম ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দে। তাঁর ভাই কোনাই মিয়াও ছিলেন পটকুশীলব। দুর্জন আলী এবং কোনাই মিয়ার বাবা আনোয়ার আলী। কয়েক পুরুষ যাবত তাঁরা নরসিংদীর হাড়িধোয়া-মেঘনা নদীর তীরে হাজীপুর গ্রামের বেদেপাড়ায় বসবাসরত। তাঁদের পূর্বপুরুষের আবাসস্থল ছিলো বৃহত্তর কুমিল্লার রামচন্দ্রপুরের দুলালপুর গ্রাম। দুর্জন আলী ও কোনাই মিয়ার ওস্তাদ কুমিল্লার জাফরগঞ্জের আবদুল হামিদ। কোনাই মিয়া অনেক আগেই প্রয়াত হয়েছেন। তাঁদের পূর্বপুরুষ ছিলেন বেদে সম্প্রদায়ের। দুর্জন আলী কখনো ছাতা সেলাইয়ের কাজ করতেন, কখনো সবজি বিক্রি করতেন, কখনো করতেন মুটে-মজুরের কাজ। দুর্জন আলী ছিলেন নিঃসন্তান।

দুর্জন আলীর সৌভাগ্য হয়েছিলো, ১৯৯৯ সালে ব্রিটেনে ‘বাংলাদেশ উৎসব’-এ বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক দলের সদস্য হয়ে গাজীর পটের গায়েন হিসেবে যোগদান করার।

ফজল মিয়া ও তাঁর দল
দুর্জন আলীর মৃত্যুর সাথে সাথে এ-অঞ্চল থেকে একটা যুগের অবসান হয়ে গিয়েছিলো, এরকম ধারণা ছিলো আমাদের। কিন্তু সম্প্রতি দুর্জন আলীর ভাতিজা ফজল মিয়ার ‘গাজীর পট’ নিয়ে নতুন দল গড়ার কথা জেনে নতুন আশার সঞ্চার হলো। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে নরসিংদী পৌর পার্কে নরসিংদী জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে আয়োজিত ‘গাজীর পট আসর’ দেখে পরদিন চলে গেলাম তাঁর বাড়ি হাজীপুরে। নয় বছর পর সেই একই ঘর, একই পরিবেশ দেখে স্মৃতিকাতর হলাম। ফজল মিয়াকে অভিনন্দন জানালাম মহান শিল্পী দুর্জন আলীর এই কীর্তি ধরে রাখার জন্যে।

গাজীর পটের গায়েন ফজল মিয়া

ফজল মিয়ার ছেলে দুটো এখন বড়ো হয়েছে। তবে ততোটা বড়ো নয়। কিশোর বলা যায়। তাদের নিয়েই সে গঠন করেছে তাঁর গাজীর গীতের দল। তাঁর দলের সদস্যরা হলেন : বড়ো ছেলে মো. আবদুল্লাহ, ছোটো ছেলে মো. হাবিবুল্লাহ ও করতাল বাদক মো. আঙ্গুর মিয়া।

ফজল মিয়ার কাছে আমাদের জিজ্ঞাসা ছিলো, কেন এখনো ধরে রেখেছেন এই শিল্পটি…? তিনি বলেন, “ভালো লাগে, মনে আনন্দ পাই, সেজন্যই এই গান করি।” এই বাক্য শুনে সহসা মনে পড়ে গিয়েছিলো নয় বছর আগের দুর্জন আলীর কাছে শোনা একই অমোঘ বাক্য, “সুখ আসে মনে, জ্ঞান পাওয়া যায়, এই জন্যই গাই।” একজন প্রকৃত শিল্পীর যথাযথ উপলব্ধি!

ফজল মিয়া আরো জানান, “বাপ-দাদারা এই গান কইরা গেছেন। তাঁদের স্মৃতিকে ধইরা রাখতে হইবো। এটা আমাদের সম্পদ। আমি যতোদিন বাঁইচা থাকমু, এই গান করমু। আমার মৃত্যুর পর আমার পোলারা করবো, যদি তারা চায়।”

ফজল মিয়া আলাপে আরো জানান, তিনি তাঁর পুরোনো পেশা ছাতা মেরামতের পাশাপাশি এখন গাজীর গীতকে পেশা হিসেবে নিয়েছেন। এখন নানা স্থান থেকে তাঁর ডাক আসে গান গাওয়ার জন্যে। গত এক-দেড় বছরের মধ্যে তিনি সোনারগাঁ, ময়মনসিংহ, ঢাকা ইত্যাদি জায়গায় গান করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলায়, শিশু একাডেমি মিলনায়তনে সম্প্রতি গাজীর গীত পরিবেশনের খবর তিনি জানান।

মহান শিল্পী দুর্জন আলীর স্মৃতি জাগরূক রাখতে ফজল মিয়া ও তাঁর দল বাংলাদেশের এই লোকপরম্পরার গীতধারাটিকে আর নরসিংদীর এই স্থানীয় সম্পদকে সবসময়ই ঊর্ধ্বে তুলে ধরবেন, পাশাপাশি আরো অনেকের মাঝে ছড়িয়ে দেবেন, এই প্রত্যাশা রেখেই নরসিংদীর হাজীপুরের পশ্চিমপাড়া তালতলার মাঠের পাশে তাঁর কুটির থেকে আমরা বেরিয়ে আসি।

জয়তু দুর্জন আলী
জয়তু ফজল মিয়া
জয়তু গাজীর পট।

এন্ট্রান্স ও মেট্রিকুলেশন পরীক্ষায় রায়পুরা রাজকিশোর রাধামোহন উচ্চ বিদ্যালয়

নরসিংদী অঞ্চলকে সুপ্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে নরসিংদী নগরের রূপকার তৎকালীন সাটিরপাড়ার জমিদারি তালুকদার ললিতমোহন রায় তাঁর বাবার নামে ১৯০১ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ‘সাটিরপাড়া কালী কুমার ইনস্টিটিউট’ ইংরেজি বিদ্যালয়। ফলে এই অঞ্চলে শিক্ষার যে-দ্বার উন্মোচন হয়েছিলো, তার ঠিক দুই বছর পর রায়পুরায় প্রতিষ্ঠা পায় আরেকটি ইংরেজি বিদ্যালয়, যার নাম ‘রাজকিশোর রাধামোহন ইনস্টিটিউট’ (বর্তমান নাম রায়পুরা রাজকিশোর রাধামোহন উচ্চ বিদ্যালয়)। ১৯০৩ সালে প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়টি শুরু থেকেই আলোড়ন তুলেছিলো এন্ট্রান্স পরীক্ষার সাফল্যে। সমসময়ে গড়ে ওঠা সাটিরপাড়া কালী কুমার ইনস্টিটিউট এবং রাজকিশোর রাধামোহন ইনস্টিটিউট— বিদ্যালয় দুটি নরসিংদী অঞ্চলে শিক্ষার যে-নতুন দিগন্তের সূচনা করেছিলো এবং এখনো যে-আলো ছড়িয়ে যাচ্ছে, তা নরসিংদীর ইতিহাস-ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

নরসিংদীর বরেণ্য লেখক ও গবেষকেরা নরসিংদীর ইতিহাস-ঐতিহ্য নিয়ে বহু তথ্য ও গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা গ্রন্থ কিংবা নিবন্ধ লিখেছেন। তবে দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য এবং আমি অত্যন্ত অবাক হয়েছি এই কারণে যে, সুরেন্দ্রমোহন পঞ্চতীর্থের লেখা ‘মহেশ্বরদীর ইতিহাস’সহ ইতিহাসের অন্যান্য গ্রন্থ ও গবেষণায় সাটিরপাড়া কালী কুমার ইনস্টিটিউটের সাথে আরো স্বনামধন্য শতবর্ষী বিদ্যালয়ের নাম-ইতিহাস থাকলেও রাজকিশোর রাধামোহন ইনস্টিটিউট সম্পর্কে তেমন উল্লেখযোগ্য কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। হয়তো সঠিক তথ্যের অভাব কিংবা নানা সীমাবদ্ধতার কারণে সেটি হয়ে ওঠেনি। কিন্তু রায়পুরার তাত্তাকান্দা গ্রামের ঐতিহ্যবাহী চৌধুরী বাড়ির জমিদার শ্রী রাজকিশোর পাল চৌধুরী এবং হাসিমপুর গ্রামের চৌধুরী বাড়ির জমিদার শ্রী রাধামোহন পাল চৌধুরী দুজনের নামের প্রথম অংশ নিয়ে ‘রাজকিশোর রাধামোহন ইনস্টিটিউট’ নামে এ-মাধ্যমিক বিদ্যালয়টি রায়পুরার কুড়েরপাড় নামক স্থানে প্রতিষ্ঠা করেন। সংক্ষেপে একে ‘আর কে আর এম’ বলা হয়ে থাকে। বিদ্যালয়টির প্রথম প্রধান শিক্ষক ছিলেন শ্রী নলিনী ঘোষ। তাঁর বাড়ি ছিলো কলকাতায়। তিনি ছিলেন একজন শিক্ষাবিদ।

উল্লেখ্য যে, রায়পুরারই আরেক শতবর্ষী শিক্ষালয় আদিয়াবাদ ইসলামিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাকালীন সিনিয়র শিক্ষক আমার নানা মরহুম মৌলভী আমির উদ্দিন আহমেদ নরসিংদী অঞ্চলের সর্বপ্রথম মুসলমান ছাত্র হিসেবে এন্ট্রান্স পাশের গৌরব অর্জন করেছিলেন কলকাতা মাদরাসা থেকে। একটি ডায়েরিতে তাঁর কিছু ছাত্রের মেট্রিকুলেশন পরীক্ষার রেজাল্ট ও সন-তারিখ লেখা ছিলো। সেখান থেকেই এসব ক্ষেত্রে আমার আগ্রহ তৈরি হয়। তৎসময়কার বিভিন্ন বিদ্যালয়ের ছাত্রদের তথ্য, বিদ্যালয়ের ইতিহাস জানার চেষ্টা থেকে আমি বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করতে থাকি। তারই ধারাবাহিকতায় রাজকিশোর রাধামোহন ইনস্টিটিউটের এন্ট্রান্স ও মেট্রিকুলেশন পরীক্ষার ফলাফল বের করি, যা ছিলো খুবই দুঃসাধ্য ও কঠিন একটি কাজ। আর এই কাজে আমি দিক-নির্দেশনা পেয়েছি যুক্তরাষ্ট্রের অস্টিন পি স্টেট ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ওয়াহিদুজ্জামান মানিকের নিকট থেকে, যিনি এসব বিষয়ে বিশদ গবেষণা করছেন।

রাজকিশোর রাধামোহন ইনস্টিটিউটের এন্ট্রান্স ও মেট্রিকুলেশন পরীক্ষার ফল বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, তখনকার সময় বিদ্যালয়টি কতোটা স্বনামধন্য ছিলো। এমনকি সাটিরপাড়া কালী কুমার ইনস্টিটিউটের সাথে যেন এক ধরনের অঘোষিত প্রতিযোগিতা ছিলো। এ-পর্যায়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ১৯০৭-১৯০৯ সালের এন্ট্রান্স পরীক্ষা এবং ১৯১০-১৯১৩ ও ১৯১৫-১৯২০ সালের মেট্রিকুলেশন পরীক্ষায় রাজকিশোর রাধামোহন ইনস্টিটিউটের সাফল্যের স্বরূপ তুলে ধরবো।

এন্ট্রান্স পরীক্ষা, ১৯০৭
দ্বিতীয় বিভাগে পাশ করেন ১ জন : রজনী কান্ত দত্ত (১৯ বছর ১ মাস) এবং তৃতীয় বিভাগে পাশ করেন ১ জন : অভয়চরণ ভট্টাচার্য (১৯ বছর ৫ মাস)।

এন্ট্রান্স পরীক্ষা, ১৯০৮
দ্বিতীয় বিভাগে পাশ করেন ৩ জন : কৃষ্ণকমল ভট্টাচার্য (১৯ বছর ৭ মাস), অম্বিকাচরণ (১৬ বছর ৬) ও উপেন্দ্র নারায়ণ কারকুন (১৮ বছর ১ মাস)। তৃতীয় বিভাগে পাশ করেন ১ জন : দীনেশ চন্দ্র ভট্টাচার্য (১৭ বছর ৯ মাস)।

এন্ট্রান্স পরীক্ষা, ১৯০৯
প্রথম বিভাগে পাশ করেন ২ জন : ক্ষিতিশ চন্দ্র ভট্টাচার্য (১৬ বছর ৮ মাস) ও যোগেন্দ্র চন্দ্র নাথ (১৭ বছর ১০ মাস)। দ্বিতীয় বিভাগে পাশ করেন ২ জন : পূর্ণচন্দ্র দত্ত (১৯ বছর ২ মাস) ও নবদ্বীপ চন্দ্র সাহা (১৬ বছর ১০ মাস)।

মেট্রিকুলেশন পরীক্ষা, ১৯১০
প্রথম বিভাগে পাশ করেন ১ জন : নরেন্দ্রচন্দ্র দাস (১৭ বছর ১১ মাস)। দ্বিতীয় বিভাগে পাশ করেন ১ জন : আলা উদ্দিন ভূঁইয়া (১৮ বছর ৪ মাস)। তৃতীয় বিভাগে পাশ করেন ১ জন : নাছির উদ্দিন (১৯ বছর ২ মাস)।

মেট্রিকুলেশন পরীক্ষা, ১৯১১
প্রথম বিভাগে পাশ করেন ২ জন : রাজমোহন দাস (১৬ বছর ৮ মাস) ও গঙ্গাচরণ সাহা (১৮ বছর ২ মাস)। দ্বিতীয় বিভাগে পাশ করেন ১ জন : তমিজাদ্দিন (২০ বছর ২ মাস)। তৃতীয় বিভাগে পাশ করেন ১ জন : অখিল চন্দ্র পাল (১৮ বছর ১০ মাস)।

মেট্রিকুলেশন পরীক্ষা, ১৯১২
প্রথম বিভাগে পাশ করেন ১ জন : চন্দ্র কিশোর দে (২০ বছর ৮ মাস)। দ্বিতীয় বিভাগে পাশ করেন ২ জন : নূরাহাদ ভূঁইয়া (১৮ বছর ২ মাস) ও মথুচন্দ্র পাল (২০ বছর)। তৃতীয় বিভাগে পাশ করেন ১ জন : আব্দুল গাফফার (২১ বছর ১০ মাস)।

মেট্রিকুলেশন পরীক্ষা, ১৯১৩
প্রথম বিভাগে পাশ করেন ৬ জন : আব্দুল হাকিম (১৬ বছর ১১ মাস), আব্দুল মজিদ (১৮ বছর), মনমোহন ভট্টাচার্য (১৯ বছর ৯ মাস), নকুল চন্দ্র দাস (১৮ বছর ৮ মাস), ভুপেন্দ্র চন্দ্র কুমার রায় (১৬ বছর ৮ মাস) ও অক্ষয় কুমার রায় (১৬ বছর ৮ মাস)। দ্বিতীয় বিভাগে পাশ করেন ৬ জন : আব্দুল গাফফার (২১ বছর ২ মাস), আব্দুল গণি (১৭ বছর ৩ মাস), মদন মোহন ভট্টাচার্য (২১), জনাব আলী (১৯ বছর ২ মাস), অধর চন্দ্র পাল (১৮ বছর ১১ মাস) ও পূর্ণ চন্দ্র পাল (১৮ বছর ৪ মাস)।

মেট্রিকুলেশন পরীক্ষা, ১৯১৫
প্রথম বিভাগে পাশ করেন ১ জন : তায়েব উদ্দিন (১৬ বছর ২ মাস)। দ্বিতীয় বিভাগে পাশ করেন ১ জন : শামসুল হক (১৭ বছর ২ মাস)।

মেট্রিকুলেশন পরীক্ষা, ১৯১৬
প্রথম বিভাগে পাশ করেন ২ জন : রাজেন্দ্র চন্দ্র চক্রবর্তী (১৭ বছর ৪ মাস) ও হরেন্দ্র লাল পাল (১৭ বছর ৫ মাস)। তৃতীয় বিভাগে পাশ করেন ১ জন : গঙ্গা চন্দ্র বিশ্বাস (২১ বছর ৫ মাস)।

মেট্রিকুলেশন পরীক্ষা, ১৯১৭
প্রথম বিভাগে পাশ করেন ২ জন : আহম্মেদ আলী (১৭ বছর ৪ মাস) ও সুরেশ চন্দ্র দাস (১৭ বছর ৫ মাস)। দ্বিতীয় বিভাগে পাশ করেন ৩ জন : আব্দুর রহমান মিয়া (২৩ বছর ৭ মাস), সুরেন্দ্র চন্দ্র চক্রবর্তী (১৮ বছর ৯ মাস) ও উপেন্দ্র কিশোর দত্ত (২২ বছর ১১ মাস)। তৃতীয় বিভাগে পাশ করেন ৩ জন : সচীন্দ্র লাল কর্মকার (১৭ বছর ১১ মাস), মোহাম্মদ জনাব আলী (১৬ বছর ৫ মাস) ও যতীন্দ্র কুমার রায় (১৯ বছর ১ মাস)।

মেট্রিকুলেশন পরীক্ষা, ১৯১৮
প্রথম বিভাগে পাশ করেন ১ জন : মো. ইমদাদুল হক (১৮ বছর ১ মাস)। দ্বিতীয় বিভাগে পাশ করেন ২ জন : বশির উদ্দিন আহম্মেদ (১৯ বছর ৫ মাস) ও ইন্দ্র মোহন দাস (১৮ বছর ৪ মাস)। তৃতীয় বিভাগে পাশ করেন ১ জন : মনমোহন সাহা (১৮ বছর ২ মাস)।

মেট্রিকুলেশন পরীক্ষা, ১৯১৯
প্রথম বিভাগে পাশ করেন ৪ জন : ললিত কুমার দত্ত (২১ বছর ১ মাস), পরেশ চন্দ্র নাগ (১৭ বছর ২ মাস), সোনা মিয়া (১৬ বছর ১১ মাস) ও রজনীকান্ত তালুকদার (১৭ বছর ১০ মাস)। দ্বিতীয় বিভাগে পাশ করেন ১১ জন : আব্দুল গফুর ভূঁইয়া (২০ বছর ১ মাস), আব্দুর রহমান (১৭ বছর ৩ মাস), আব্দুস সোবহান (১৭ বছর ১১ মাস), হিরেন্দ্র কুমার দাস (২০ বছর ৩ মাস), অশ্বিনী কুমার গোস্বামী (২০ বছর ৪ মাস), জলধর কর্মকার (১৭ বছর), মুহাম্মদ সাহেব আলী (২০ বছর ৫ মাস), সুরেশ চন্দ্র পাল (১৭ বছর ৭ মাস), সুরেন্দ্র কুমার রায় (১৮ বছর ২ মাস), সফিউদ্দিন ভূঁইয়া (২০ বছর ১ মাস) ও ক্ষেত্র মোহন সাহা (২১ বছর ৭ মাস)।

মেট্রিকুলেশন পরীক্ষা, ১৯২০
প্রথম বিভাগে পাশ করেন ২ জন : হরেন্দ্র চন্দ্র ঘোষ (১৭ বছর ১০ মাস) ও ভরত চন্দ্র নাথ (১৮ বছর ১ মাস)। দ্বিতীয় বিভাগে পাশ করেন ৭ জন : আব্দুল আজিজ (১৮ বছর ১১ মাস), আব্দুল ওয়াহেদ (১৮ বছর ১০ মাস), ললিত মোহন দাস (২১ বছর ৫ মাস), অমর চন্দ্র পাল (২০ বছর ৪ মাস), অশ্বিনী কুমার রায় (১৯ বছর ১ মাস), নগেন্দ্র কুমার রায় (১৮ বছর ৪ মাস) ও অনন্ত কুমার শ্যাম (২২ বছর ৩ মাস)। তৃতীয় বিভাগে পাশ করেন ২ জন : মুহাম্মদ নওয়াব আলী (১৭ বছর ২ মাস) ও মনিরউদ্দিন (১৮ বছর ৯ মাস)।

উল্লেখ্য যে, ১৯১০ সালে এই বিদ্যালয় থেকে প্রথম ২ জন মুসলমান ছাত্র মেট্রিকুলেশন পাশ করে। বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার পর এলাকায় ব্যাপক সাড়া পড়ে এবং অতি অল্প সময়ে আশানুরূপ ফলাফলে দ্রুত শিক্ষার্থী বৃদ্ধি পেতে থাকে। রায়পুরা ছাড়াও দেশের দূর-দূরান্ত থেকে ছাত্রছাত্রী এসে বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার কারণে এক পর্যায়ে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ছাত্রদের জন্যে আবাসিক বোর্ডিংয়ের ব্যবস্থা করেন এবং ১৯৬২ সালে স্থান সংকুলান না হওয়ায় কুড়েরপাড় থেকে তাত্তাকান্দায় মেঘনা নদীর শাখা কাঁকন নদীর তীরে পাগলনাথ মন্দিরের পাশে ৩ একর ৮১ শতাংশ জায়গায় গড়ে তোলেন বিদ্যালয়ের বর্তমান ক্যাম্পাস। ১২০ বছরের পুরোনো রায়পুরা রাজকিশোর রাধামোহন উচ্চ বিদ্যালয়টি সাফল্যের ধারাবাহিকতা বজায় রাখবে, এটাই কাম্য।


তথ্যসূত্র
১. কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্ষিক ক্যালেন্ডার (১৯০৮-১৯২৩) ও
২. কাঁকন, বিদ্যালয়ের এলামনাই এসোসিয়েশন কর্তৃক প্রকাশিত ম্যাগাজিন।


খন্দকার পারভেজ আহম্মদ (পিনু)
আহ্বায়ক, আমরা হাজীপুর ইউনিয়নবাসী

ভাটকবি মফিজ উদ্দিন

প্রিয় পাঠক, প্রত্নগবেষক ও লোকসাহিত্যিক মুহাম্মদ হাবিবুল্লা পাঠানের ভাটকবিদের নিয়ে দীর্ঘ গবেষণার ফল তাঁর গ্রন্থ ‘বাংলাদেশের ভাটকবি ও কবিতা’। এ-গ্রন্থ থেকে নরসিংদীর ভাটকবি মফিজ উদ্দিনকে নিয়ে এই লেখাটি প্রকাশ করা হলো। এই গ্রন্থের বিপুল পাঠ ও পরিচিতির স্বার্থে ও নরসিংদীর ঐতিহ্যপূর্ণ এক আখ্যানের সাথে পাঠকদের পরিচয় করিয়ে দেয়ার জন্যে আমাদের এ-উদ্যোগ।

‘কাব্য-কল্পলোকের সখি’র নাগাল পাবার একান্ত স্বপ্ন ও সাধনায় যিনি সমগ্র জীবন আত্মনিমগ্ন থেকেছেন, তিনি খ্যাতিমান ভাটকবি মফিজ উদ্দিন। তিনি সাবেক ঢাকা জেলার (বর্তমান নরসিংদী) শিবপুর থানার অন্তর্গত নোয়াদিয়া গ্রামে ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন এবং ২০০৩ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর পিতার নাম ইদ্রিছ আলী।

এই খ্যাতিমান কবি শতাধিক ক্ষুদ্র কবিতা পুস্তিকার রচয়িতা। তৎকালীন পাকিস্তানের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ প্রতিবাদরূপে তিনি রচনা করেন ‘দর্জ্জালের সিংহাসন, অবশেষে পলায়ন’ (১৯৫৬)। পুস্তিকাটি তৎকালে বাজেয়াপ্ত হয় এবং এটি রচনা ও প্রকাশের জন্যে দেশদ্রোহিতার অপরাধে তাঁকে সপ্তাহকাল কারাভোগ করতে হয়। গ্রামের সাধারণ মানুষের জন্যে লেখা সুন্দর ও সহজবোধ্য কবিতায় তাঁর প্রতিবাদী রাজনৈতিক চেতনা প্রশংসনীয়।
: মুহাম্মদ হাবিবুল্লা পাঠান, নরসিংদীর কবি সাহিত্যিক, ১৯৮৬, পৃষ্ঠা ৪৯

পল্লীর শ্যামশোভায় বর্ধিত বালক মফিজ উদ্দিনের শৈশবেই সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ ঘটে অজস্র গ্রামীণ কবিতার মাধ্যমে। সেকালে গ্রামীণ জীবনের আকর্ষণীয় বিষয়ভিত্তিক দীর্ঘ কবিতা হাটে-বাজারে সুর করে আবৃত্তি হতো, স্বল্পমূল্যে দু-চার পয়সার কবিতার প্রচলন ছিলো। গ্রামের সাধারণ অর্ধশিক্ষিত যুবক-বৃদ্ধরা বাজার থেকে ফেরার পথে ঐসব কবিতা সাগ্রহে দু-চার পয়সা দিয়ে কিনে নিতো। মাঠে-ঘাটে রাখাল যুবকেরা এসব কবিতা সুর করে আবৃত্তি করতো। সে-যুগে মফিজ উদ্দিনের সাড়া জাগানো কবিতা বাজারে-বন্দরে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলো।

কবির জীবন বৈচিত্র্যময়। মেট্রিক পাশ করে ১৯৪২ সালে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে ড্রাইভার হিসেবে ট্রেনিং নিয়ে এক বছর এলাহাবাদে কাটান। পরে মর্দান থেকে সামরিক প্রশিক্ষণে নায়েক পদে উন্নীত হয়ে কবি সামরিক বাহিনির দায়িত্ব পালন উপলক্ষে বোলান, বসরা, বাগদাদ, কারবালা, কৃষ্ণা, ব্যবিলন, মুগল, মিশর, পোর্টসৈয়দ, ইতালি, ভেনিস প্রভৃতি বহু স্থানে গমন করেন। ১৯৪৮ সালে চাকুরি থেকে অবসর গ্রহণ করে দেশে ফিরে আসেন। অতঃপর তিনি আইয়ুবপুর ইউনিয়ন কাউন্সিলের সেক্রেটারির দায়িত্ব পালন করেন একাধারে ছাব্বিশ বছর। তিনি ১৯৯৫ সাল থেকে বাংলাদেশ সরকারের বরাদ্দকৃত কবি-সাহিত্যিকের সম্মানি বাবদ মাসিক পাঁচশত টাকা ভাতা লাভ করেছেন।
: শেখ ম. আ. খালিদ ও ডা. অছিউদ্দিন আহমেদ, নোয়াদিয়ার কবি মফিজ উদ্দিন, জাগরণ, নরসিংদী, ১৯৯৭

কবি তাঁর প্রকাশিত পুস্তিকাগুলোতে ‘মফিজ উদ্দিন মিঞা (প্রাক্তন সৈনিক)’ নামটি ব্যবহার করেছেন। তিনি কিছুকাল নরসিংদীর নিকটস্থ ভাগদি, অতঃপর চাঁদপাশা গ্রামে বসবাস করেন।

যুদ্ধফেরত সৈনিকের মানস চেতনায় রাজনীতি বিশেষ প্রভাব বিস্তার করেছিলো। সে-প্রেক্ষিতেই তিনি রাজনীতিকে উপজীব্য করে অনেক কবিতা লিখেছেন, যেমন : কাশ্মীরের কবিতা ও হিন্দুস্থানের উল্টাবাজি, ইসলামি শাসনতন্ত্র রিপাবলিক রাষ্ট্রের কবিতা, একুশ দফার কবিতা, তাসখন্দের ৯ দফা, জিয়ার ১৯ দফার কবিতা, জাতির জনক শেখ মুজিবুরের জ্যেষ্ঠ কন্যা শেখ হাসিনার আগমনের কবিতা। রাজনৈতিক বিষয় ছাড়াও নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগ, নানা ঘটনা-দুর্ঘটনার বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার, প্রেমপ্রীতি ও ধর্মীয় বিষয় নিয়েও তিনি বহু কবিতা পুস্তিকা প্রণয়ন করেছেন।

কবি মফিজ উদ্দিন প্রাকৃত জনগোষ্ঠীর কবি। তিনি কবিতার ‘গ্রামার বা ব্যাকরণ’ জানেন না। সে-কারণে তিনি সাধারণ মানুষের বোধগম্য ভাষাতেই কবিতা রচনার প্রয়াস পান। কবিমন কল্পনাবিলাসী হলেও তিনি বাস্তব জগতেরই বাসিন্দা। মানুষের আনন্দ-বেদনার সমঅংশীদার তিনি। তাঁর হৃদয়ের অনিবার্য আকুলতা থেকেই কবিতার জন্ম হয়। সমাজের দুর্দশা নিরসনে কবিগণ ব্যাকুলচিত্ত থাকেন, অথচ সেই সমাজের মানুষদের কাছ থেকে তাঁরা যথাযোগ্য প্রতিদান পান না। দারিদ্র্যক্লিষ্ট জীবনের এ-বিষাদঘন আত্মজৈবনিক চিত্র গ্রাম্য কবি মফিজ উদ্দিনের কবিতায় বিধৃত হয়েছে :

মনের কল্পনায় ছন্দ যোগায়, তাই তো কলম ধরি,
জল্পনা সখির পিছে করি দৌড়াদৌড়ি।
জানি না লেখাপড়া মন-মরা শক্তি-বল নাই, কবিতা লিখিতে তবু কলম চালাই।
কবিতা লিখি তাই গ্রামার নাই, নাই সেই ব্যাকরণ,
গ্রাম্য ভাষায় কাহিনীর সব দিয়ে যাই বর্ণন।
লিখলে শুদ্ধ ভাষায় দেখা যায় গ্রামে থাকে যারা,
কঠিন ভাষায় লিখলে আবার পড়তে চায় না তারা।
তাই আদি অন্তে ভেবে চিন্তে গ্রাম্য ভাষা দিয়া, জীবিকানির্বাহ করি কবিতা বেচিয়া।
তবে আমার মত লিখকগণ পল্লীগ্রামে থাকে, দারিদ্র্যতার জ্বালায় মরি সমাজ কি তা দেখে?
: শিক্ষা সভ্যতা গেল মারা, পৃষ্ঠা ২

প্রতিভাবান কবি মফিজ উদ্দিন মার্কসবাদের দীক্ষা গ্রহণ করেছিলেন। মওলানা ভাসানীর রাজনৈতিক ভাবাদর্শ তাঁকে গভীরভাবে আলোড়িত করেছিলো। তাঁর শ্রেণিচেতনা ছিলো অত্যন্ত প্রখর। এজন্যে চাষাভূষার অধিকার আদায়ে সর্বদা সোচ্চার ছিলেন। নিজেকে চাষা বলে পরিচয় দিতে তাঁর কোনো দ্বিধা ছিলো না। তাই তিনি লিখেছেন, “তোদের লাগি কাইন্দা মরে মফিজ উদ্দিন চাষী, কবে ফুটবে মুখে হাসি। খাটবি কত ভূতের বেগার বুদ্ধিহারার দল, এখন বুঝে শুনে চল, জমি তোদের লাঙল তোদের তোদের জন্মস্থান।”

কবি মফিজ উদ্দিনের সমাজ ও রাজনৈতিক চেতনা ছিলো অত্যন্ত ক্ষুরধার। গণমানুষের প্রতি তাঁর ছিলো অগাধ ভালোবাসা। এজন্যেই তিনি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দুঃখ-দুর্দশার সঙ্গে একাত্ম হয়েছেন এবং অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ কণ্ঠে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। তাঁর কবিতায় সমকালীন রাজনীতি ও সমাজ প্রেক্ষিত এক সৌন্দর্যে উপস্থাপিত হয়েছে।

মফিজ উদ্দিন বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় ভাটকবি। তাঁর প্রকাশিত পুস্তিকাগুলোর একটি অসম্পূর্ণ তালিকা এখানে প্রদত্ত হলো :

— পানি বা গজব। প্রণেতা ও প্রকাশক। মুদ্রক : কোহিনূর প্রেস, নরসিংদী। প্র. সং ১০ ভাদ্র ১৩৬১/১৯৫৪, ৮ পৃষ্ঠা, মূল্য : দুই আনা। ১৩৬১ বঙ্গাব্দের ভয়াবহ বন্যার ধ্বংসলীলার বর্ণনা।
— ২১ দফার কবিতা ও চাষীর দুঃখ দুর্দশা। প্রকাশক : খন্দকার আফিরদ্দিন মিঞা, গ্রাম : ভাগদি, নরসিংদী। ১৯৫৪, ৮ পৃষ্ঠা।
— জব্বার মাস্টারের খুনের কবিতা (১ম খণ্ড), ১৩৬১/১৯৫৩, ৮ পৃষ্ঠা, মূল্য : দুই আনা। জব্বার মাস্টারের খুনের কবিতা (২য় খণ্ড), ১৩৬১, ১৯৫৪, ৮ পৃষ্ঠা, মূল্য : দুই আনা।
— অভাব না গজব, দেশের বর্তমান পরিস্থিতির জুলুমের প্রতিফল কবিতা। প্রকাশক : খন্দকার আফিরদ্দিন মিঞা, গ্রাম : ভাগদি, নরসিংদী। ১৯৫৪, ৮ পৃষ্ঠা, মূল্য : দুই আনা।
— জামাল জরিনার প্রেমকাহিনী ও পুত্রের হাতে পিতার খুন। প্রণেতা, গ্রাম : ভাগদি, পো. : নরসিংদী, জিলা : ঢাকা। প্রকাশক : সিরাজ মিঞা, আশ্রবপুর, চক্রধা, ঢাকা। ১১ মাঘ ১৩৬১/১৯৫৪, ৮ পৃষ্ঠা, মূল্য : দুই আনা।
— নবী কাহিনী (বই নং ১), আখেরী নবীর জন্ম কাহিনী ও আমিনা বিবির খোয়াব। প্রকাশক : সিরাজুল ইসলাম সরকার। ২২ বৈশাখ ১৩৬২, ৮ মে ১৯৫৫, ৮ পৃষ্ঠা, মূল্য : দুই আনা।
— নবী কাহিনী (বই নং ২), শিশু নবী ও দাই হালিমার কাহিনী।
— কাশ্মীরের কবিতা ও হিন্দুস্থানের উল্টাবাজি। প্রকাশক : খন্দকার আফিরদ্দিন মিঞা, ভাগদি, নরসিংদী। চৈত্র ১৩৬২, এপ্রিল ১৯৫৫, ৮ পৃষ্ঠা, মূল্য : এক আনা।
— রঙমালার কবিতা। ১৯৫৬, ৮ পৃষ্ঠা।
— দর্জ্জালের সিংহাসন, অবশেষে পলায়ন। প্রকাশক : ফজর আলী খাঁ, গ্রাম : হিজলিয়া, নরসিংদী, ঢাকা। ২৫ আশ্বিন ১৩৬৩, ১৯৫৬, ৮ পৃষ্ঠা, মূল্য : দুই আনা।
— ইসলামি শাসনতন্ত্র রিপাবলিক রাষ্ট্রের কবিতা।
— ইসলাম ধর্মের ঠিকাদারের কাহিনী ও ফাঁসির মরার নসিহত।
— চরসিন্দুর হাইস্কুলের হেডমাস্টার মুক্তার খানের খুনের কবিতা (১ম খণ্ড)। ১৯৬৭, ৮ পৃষ্ঠা।
— চরসিন্দুর হাইস্কুলের হেড মাস্টার মুক্তার খানের খুনের পূর্ণ বিবরণ (২য় খণ্ড)। প্রকাশক : সিরাজ মিঞা, আশ্রবপুর, ঢাকা। মুদ্রক : কোহিনূর প্রেস, নরসিংদী। ৮ পৃষ্ঠা, মূল্য : বার পয়সা। কবিতাটি বাস্তব ঘটনা নিয়ে রচিত। রশীদ নামক জনৈক ছাত্র মেট্রিক টেস্ট পরীক্ষায় ফেল করে। সে ফাইনাল পরীক্ষায় অংশগ্রহণের জন্যে প্রবেশপত্র পেতে হেড মাস্টারকে বারম্বার চাপ প্রয়োগ করে। তিনি এই দুর্বল ছাত্রকে পাত্তা দেননি। এতে রশীদ ক্ষিপ্ত হয়ে ১৯৬৭ সালের ৬ এপ্রিল নরসিংদী কলেজ চত্বরে হেডমাস্টার মুক্তার খানকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করে। পরে ঘাতক রশীদ গণপিটুনিতে নিহত হয়।
— টেডি নারী যাহানারার প্রেমকাহিনী (১৯৬৭ ?)।
— সতাই মার গোপন প্রেমকাহিনী ও কারে কেবা মারতে পারে ঠাডা পড়ে নিজে মরে। প্রণেতা : মফিজ উদ্দিন (প্রাক্তন সৈনিক), নোয়াদিয়া, ঢাকা। প্রকাশক : সিরাজ মিয়া, আশ্রবপুর, শিবপুর, ঢাকা। ১৯৬৯, ৮ পৃষ্ঠা, মূল্য : বার পয়সা।
— চাঁদের কবিতা। প্রণেতা ও প্রকাশক : নোয়াদিয়া, ঢাকা। মুদ্রক : খান প্রিন্টিং প্রেস, বাবুবাজার, ঢাকা। ১৯৬৯, ৮ পৃষ্ঠা, মূল্য : বার পয়সা। এ্যাপেলো-১১ নভোযানে তিন নভোচারীর চন্দ্রে অবতরণের বিবরণ।
— চাঁদে যাহা দেখিলাম, ২য় খণ্ড।
— ১১ দফা ও আসাদ ভাইয়ের কবিতা।
— কবিতা— শিবপুরের অগ্নিকাণ্ডের নিদারুণ কাহিনী ও আগুনে পোড়ায় তিনজনের মৃত্যু। প্রকাশক : সিরাজ মিয়া, আশ্রবপুর, শিবপুর, ঢাকা। ১৯৬৯, ৮ পৃষ্ঠা, মূল্য : পঁচিশ পয়সা। শিবপুরের অগ্নিকাণ্ডে তিনজনের মৃত্যুর ঘটনার বর্ণনা।
— হাসু মিয়া ও হিরণবালার বিয়ার কবিতা। প্রণেতা : চাঁদপাশা, নোয়াদিয়া, ঢাকা। প্রকাশক : আবদুল আজিজ, খলিলাবাদ। ১৯৭০, ৮ পৃষ্ঠা, মূল্য : দুই আনা।
— যাদুগরণী চন্দ্রবানের যাদুর কারখানা। ১৯৭০, ৮ পৃষ্ঠা।
— দুই বিয়ার তিলিসমত ও দুঃখের কাহিনী। প্রণেতা : চাঁদপাশা, নোয়াদিয়া, জিলা : ঢাকা। প্রকাশক : সিরাজ উদ্দিন ও অন্যান্য, আশ্রবপুর, ঢাকা। মুদ্রক : সিদ্দিক প্রেস, ভৈরব। ১৯৭০, ৮ পৃষ্ঠা।
— ডাকু রুস্তম ও রেজিয়ার প্রেমকাহিনী (১ম খণ্ড, সিরিজ কবিতা)। বিজ্ঞাপিত পুস্তিকাটি প্রকাশিত হয়েছিলো কি না জানা যায়নি।
— ইলেকশনের কাহিনী। ১৯৭০, ৮ পৃষ্ঠা।
— গোল ছাহেরার বিয়া ও মায়ের হাতে পুত্র খুন, ভাই ভাগ্নির ফাঁসি। প্রকাশক : সিরাজ উদ্দিন ও অন্যান্য, আশ্রবপুর, ঢাকা, মুদ্রক : সিদ্দিক প্রেস, ভৈরব। ১৯৭০, ৮ পৃষ্ঠা।
— বুড়া মিয়া জোয়ান বিবির আজব কারখানা কবিতা।
— (কোর্টের সামনে ঢাকার ঘটনা) শিক্ষা সভ্যতা গেল মারা, উকিলে উকিলকে মারে ছোরা। প্রণেতা : নোয়াদিয়া, ঢাকা। প্রকাশক : রুস্তম আলী, বৌয়াকুড়, নরসিংদী। মুদ্রক : রহমান প্রেস, নরসিংদী। ১৯৭৯, ৮ পৃষ্ঠা, প্রতি কপি ষাট পয়সা।
— মকদ্দমার রায়ে, ২য় খণ্ড।
— ভুট্টুর ফাঁসির কবিতা। প্রকাশক : মির রুস্তম আলী, বৌয়াকুড়, নরসিংদী। মুদ্রক : রহমান প্রেস, নরসিংদী। ১৯৭৯, ১৫ পৃষ্ঠা, মূল্য : এক টাকা পঁচিশ পয়সা।
— জাতির জনক শেখ মুজিবুরের জ্যেষ্ঠ কন্যা শেখ হাসিনার আগমনের কবিতা। প্রকাশক : মির রুস্তম আলী, ব্রাহ্মন্দী, দাসপাড়া, নরসিংদী। ১৯৮১, ৮ পৃষ্ঠা, মূল্য : এক টাকা।


মুহাম্মদ হাবিবুল্লা পাঠান
প্রত্নগবেষক ও লোকসাহিত্যিক

ভাটকবি দারোগ আলী

প্রিয় পাঠক, প্রত্নগবেষক ও লোকসাহিত্যিক মুহাম্মদ হাবিবুল্লা পাঠানের ভাটকবিদের নিয়ে দীর্ঘ গবেষণার ফল তাঁর গ্রন্থ ‘বাংলাদেশের ভাটকবি ও কবিতা’। এ-গ্রন্থ থেকে নরসিংদীর ভাটকবি দারোগ আলীকে নিয়ে এই লেখাটি প্রকাশ করা হলো। এই গ্রন্থের বিপুল পাঠ ও পরিচিতির স্বার্থে ও নরসিংদীর ঐতিহ্যপূর্ণ এক আখ্যানের সাথে পাঠকদের পরিচয় করিয়ে দেয়ার জন্যে আমাদের এ-উদ্যোগ।

“যে ফুল না ফুটিতে ঝরেছে ধরণীতে, যে নদী মরুপথে/ হারালো ধারা,/ জানি হে জানি তাও/ হয় নি হারা”— প্রত্যন্ত গ্রামে নীরবে-নিভৃতে কাব্যসাধনায় আত্মমগ্ন লোককবি দারোগ আলীও হারিয়ে যাবার নয়, তিনি তাঁর অবদানের মধ্যেই বেঁচে থাকবেন।

তিনি নরসিংদী জেলার রায়পুরা উপজেলার অন্তর্গত সাহাপুর গ্রামে ১৩৩৪ বঙ্গাব্দে জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৪২৪ বঙ্গাব্দে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর পিতা মুনসি রমজান আলী। পেশায় ছিলেন দলিল লিখক। দারোগ আলী ছিলেন এ-অঞ্চলের খ্যাতিমান পুঁথি রচয়িতা ও পাঠক এবং জারিগান গায়ক। তিনি তাঁর ওস্তাদ আবদুল বারিক সরকারের আন্তরিক সাহচর্যে পুঁথিপাঠ, রচনা ও জারিগান পরিবেশনায় অত্যন্ত দক্ষ হয়ে ওঠেন। তিনি চাঁদ সওদাগর, অরুণ শান্তি, স্বপন কুমার ও চম্পাকলি প্রভৃতি লোকনাট্য রচনা করেন, কিন্তু সেগুলো প্রকাশিত হয়নি। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে তিনি দোভাষী পুঁথির আদলে ১৯৭২ সালে ‘বঙ্গ-বিষাদ পুঁথি’ রচনা করেন। পুঁথির নামকরণ ও বিষয়বস্তু সম্পর্কে কবি লিখেছেন : “বাঙ্গালীদের চিরকাল দুঃখেতে কাটিল/ তাই সে পুস্তকের নাম বঙ্গ বিষাদ হইল।/ জিন্নার আমল হতে বাংলায় যা কিছু ঘটনা/ এ পুস্তকে কিছু কিছু করিনু বর্ণনা।”

১৩৮০ বঙ্গাব্দে (১৯৭৩) প্রকাশিত পুঁথিটির ভূমিকা লিখেছেন রায়পুরা থানার মুক্তিবাহিনির কমান্ডার মো. গয়েছ আলী। ছিয়ানব্বই পৃষ্ঠার পুঁথিটি পঁচিশটি উপশিরোনামে বিন্যস্ত ও ৩,৩৪২ পঙক্তিতে সমাপ্ত। এতে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম ও পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের প্রতি নানা বিভেদ-বৈষম্য, শেখ মুজিবুরের পরিচয় ও ভাষা আন্দোলন, যুক্তফ্রন্ট গঠন, আয়ুব খানের বাদশাহী ও ফলাফল, শেখ মুজিবের খেদ, শেখ মুজিবুর ও তাঁর সঙ্গীগণের বিরুদ্ধে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের ও তার ফলাফল, শেখ মুজিবকে উদ্ধারকল্পে বাঙ্গালীর প্রথম সংগ্রাম, শেখ মুজিব ও সঙ্গীগণ মুক্তি পায় এবং আয়ুব-মোনেমের অপসারণ, ভোটে ফেল করিয়া পাকিস্তানের চালাকি ও বাটপারি, ১৯৭১ সনে ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর বজ্রকণ্ঠ ঘোষণা ও পশ্চিমাদের গোপন ষড়যন্ত্র, ঢাকা ও অন্যান্য স্থানে পাঞ্জাবিদের নিষ্ঠুরতা এবং বঙ্গবন্ধুর বন্দী হওয়ার বয়ান, হানাদারগণ বঙ্গবন্ধুর স্ত্রী-পুত্রকে বন্দী করে নির্যাতন ও বাঙ্গালীদের উপর জুলুম অত্যাচার করে এবং মুক্তিযোদ্ধাগণ ট্রেনিং নিতে ভারতে যান, তার বিবরণ, বাঙ্গালীর মরণপণ মুক্তিযুদ্ধ, হাটুভাঙ্গার যুদ্ধ, বেলাব’র লড়াই, দুলালের কাহিনি, বিশ্বাসঘাতকতা, আজব ঘটনা, মুক্তির লড়াই কী চমৎকার, বঙ্গবন্ধু লায়লপুর কারাগারে বাংলার জন্য খেদ করে, তার বয়ান, ভারত-পাকিস্তানের যুদ্ধ, হরিষে বিষাদ, মুক্তিযুদ্ধে চূড়ান্ত বিজয় অর্জন ও পাকসেনাদের আত্মসমর্পণ, রাজাকারের বিচার, বঙ্গবন্ধুর মুক্তি লাভ ও স্বদেশ প্রত্যাবর্তন প্রভৃতি বিষয় অতি সরল ও শ্রুতিমধুর ভাষায় বিবৃত হয়েছে।

দেশের রাজনৈতিক ঘটনাবলির ক্রমাগ্রসর ধারা বর্ণনায় কবি যথেষ্ট ইতিহাস সচেতনতার স্বাক্ষর রেখেছেন। নামমাত্র লেখাপড়া জানা এক কবির পক্ষে ইতিহাসের সত্যাশ্রয়ী ঘটনার বিশ্লেষণী নৈপুণ্যে সত্যি বিস্মিত হতে হয়। মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে ইতোমধ্যে সহস্র গ্রন্থ রচিত হলেও প্রাকৃত জনগোষ্ঠীর উপযোগী সহজবোধ্য ভাষায় লেখা ‘বঙ্গ-বিষাদ পুঁথি’টি বাংলাদেশের কোনো লোককবির একক ও বিরল ব্যতিক্রমী প্রয়াস। কবি তাঁর সংবেদনশীল হৃদয়ের গভীর অনুভূতি দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের শাণিত চেতনাকে ‘কালের কপোল তলে শুভ্র সমুজ্জ্বল’ করে রেখেছেন। পরিতাপের বিষয় এই যে, অদ্যাবধি সুশীল সমাজের কাছে পুঁথিটি প্রকাশের সংবাদ অজ্ঞাত, অনালোচিত ও অপাঙক্তেয় থেকে গিয়েছে। অথচ অতি সরল লোকজ ভাষায় বাংলার আবহমান ঐতিহ্যের সনাতনী ধারায় বাণীবদ্ধ এই কাব্যগ্রন্থটি এক অসামান্য সাহিত্য-কীর্তিরূপে গণ্য হতে পারতো।

প্রচলিত ধারা অনুসারে পুঁথির প্রারম্ভে প্রভুস্তুতি যুক্ত হয়। কিন্তু এ-পুঁথিটিতে দেশবন্দনাসূচক পদাবলি বিশেষ প্রাধান্য পেয়েছে। কবি বাংলাদেশের মহিমাকীর্তনে এতো উচ্ছ্বসিত যে, তিনি লিখেছেন :

জেন্দেগী ভরিয়া কইলে তবু না হয় শেষ—
এই যে আমার সোনার বাংলা সোনার বাংলাদেশ
দেখিতে নয়ন জুড়ায় দেখতে লাগে বেশ।
ছয় ঋতু বিরাজ করে এই বাংলাদেশে শরীর জুড়ায় তার বসন্ত বাতাসে।
বসন্তে কোকিলায় ডাকে কুহু কুহু তানে
এহেন কোকিলার রব নাই কোনখানে। নদনদী যত ইতি কি বলব সে কথা
আনন্দে চালায়ে তরী যাই যথাতথা। খাদ্য লওয়াজেমায় ভরা সোনার বাংলা খানি
এক মুখে কী বলতে পারি তাহার বাখানি।
জেন্দেগী ভরিয়া কইলে তবু না হয় শেষ
এহেন সোনার পুরী আমার বাংলাদেশ।

কবি পুঁথির প্রারম্ভে সংক্ষিপ্ত হামদ, নাত ও উৎসর্গ পৃষ্ঠার পরেই ‘শেখ মজিবরের পরিচয় ও ভাষা আন্দোলন’ শীর্ষক অধ্যায়টি যুক্ত করেছেন। ভাষা আন্দোলনে শেখ মুজিবুর রহমান সংগ্রামী নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। ভাষা আন্দোলনের সূচনা থেকে ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার সাংবিধানিক মর্যাদা প্রদান পর্যন্ত তিনি এক নিরাপোষ সংগ্রামী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন। এজন্যে তাঁকে জেল-জুলুম সহ্য করতে হয়েছে।

“বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করা এবং মুক্তির দাবিতে জেলবন্দি আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমান এবং মহিউদ্দিন আহমদ ১৬ ফেব্রুয়ারী (১৯৫২) কারাগারে অনশন ধর্মঘট শুরু করেন। ১৮ ফেব্রুয়ারি শেখ মুজিব ফরিদপুর জেলে স্থানান্তরিত হন। ১৮ ফেব্রুয়ারি বিকেলে তারা অনশন ভঙ্গ করেন। ২৭ ফেব্রুয়ারি শেখ মুজিব ও ১ মার্চ মহিউদ্দিন কারাগার থেকে মুক্তি পান।”
                   : মাহবুবুল আলম, বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস, ২০০১, পৃষ্ঠা ১৭

‘শেখ মজিবরের পরিচয় ও ভাষা আন্দোলন’ বিষয়ক পুঁথিটি পাঠকেরা পড়তে পারেন মুহাম্মদ হাবিবুল্লা পাঠানের ‘বাংলাদেশের ভাটকবি ও কবিতা’ গ্রন্থের ২য় খণ্ডের ২০৭ নং পৃষ্ঠা থেকে।


মুহাম্মদ হাবিবুল্লা পাঠান
প্রত্ন-গবেষক ও লোকসাহিত্যিক

নরসিংদী টু মদনগঞ্জ : একটি ঝরে পড়া রেলপথের আত্মকাহিনি

ছোটোবেলা চরাঞ্চলের গ্রামের বাড়ি থেকে নানার বাড়ি চর্ণগরদী যাওয়া-আসার বিষয়টি বেশ রোমাঞ্চকর ছিলো। নৌকায় মেঘনা নদী পেরিয়ে নরসিংদী শহর হয়ে রেলস্টেশন দিয়ে চিনিশপুর রাজারদীর পরই পুরোনো ব্রহ্মপুত্র নদের কোলে চর্ণগরদীর সৈয়দ বাড়িতে যখন যেতাম, তখন মনে মনে একটা উৎসব ভাব জাগতো। সৈয়দ বাড়ির পাশেই ছিলো খান বাড়ি। সেখানে জন্মেছিলেন সাবেক মন্ত্রী মোমেন খান, বিজ্ঞানী বাতেন খান ও  সাবেক মন্ত্রী ও সংসদ সদস্য আব্দুল মঈন খান।

ছোটোবেলায় নানার বাড়ির স্মৃতির সঙ্গে সঙ্গে রেলস্টেশনের গায়ে লেখা ‘নরসিংদী জং’ শব্দটি হৃদয়ে গেঁথে গিয়েছিলো। এই সংক্ষিপ্ত ‘জং’য়ের পূর্ণাঙ্গ শব্দ যে ‘জংশন’, তা অনেক পরে জেনেছিলাম। ইঞ্জিন ঘোরানো, বগি ধোয়ামোছা, গাড়িতে পানি নেয়া ও গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ করা হয় জংশনে। নরসিংদী  থেকে নারায়ণগঞ্জের বন্দর থানাধীন মদনগঞ্জ পর্যন্ত রেললাইন স্থাপন করে শিল্পাঞ্চল ও ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র নরসিংদী ও প্রাচ্যের ড্যান্ডি নারায়ণগঞ্জকে যুক্ত করা হয়েছিলো। ফলে নরসিংদী পরিণত হয় জংশনে। কিন্তু অলাভজনক হওয়ায় প্রতিষ্ঠার ৭ বছরের মাথায় রেলপথটি বন্ধ করে দেয়া হয়। ১৪ বছর পর রেলপথের পাত তুলে নেয়া হলে ৪৬.৬৯ কিলোমিটারের রেলপথটি পরিত্যক্ত হয়ে যায়।

নরসিংদীতে প্রথম রেলপথ নির্মাণ শুরু হয়েছিলো ১৯১০ সালে, যা শেষ হয় ১৯১৪ সালে। আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ে কোম্পানি টঙ্গী-নরসিংদী-ভৈরব-আখাউড়া রেললাইনটি নির্মাণ করে। ঢাকা থেকে রেলপথ টঙ্গী পর্যন্ত নির্মিত হয়েছিলো ১৮৮৫ সালে। অবশ্য তখন রেলপথটি নারায়ণগঞ্জ থেকে শুরু করে ঢাকার ফুলবাড়িয়া হয়ে টঙ্গী থেকে ময়মনসিংহ পর্যন্ত ১৪৪ কিলোমিটার সম্প্রসারণ করা হয়েছিলো। টঙ্গী থেকে রেলপথটি ভৈরব পর্যন্ত সম্প্রসারণ কাজ শুরু হয় ২৫ বছর পর।

রেলপথ সম্প্রসারণের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নরসিংদীতে বস্ত্র ও তাঁতশিল্প, কৃষিপণ্য, ফলমূল চাষে ব্যাপক বিপ্লব ঘটে। বিশেষ করে নরসিংদীর হাসনাবাদ, বাবুরহাট, মাধবদী এবং গোপালদী ও আড়াইহাজার এলাকা হয়ে ওঠে বস্ত্রশিল্পের প্রাণকেন্দ্র। মূলত বস্ত্রশিল্পের উন্নতির কথা মাথায় রেখেই নরসিংদী টু মদনগঞ্জ রেলপথটি নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়, যা ১৯৭০ সালের জানুয়ারি মাসে চালু হয়।

স্বল্প দূরত্বের এই রেলপথে মোট ১০ টি স্টেশন ছিলো। স্টেশনগুলো হলো : নরসিংদী জংশন, মাধবদী, মোল্লারচর, আড়াইহাজার, প্রভাকর্দী, নয়াপুর, কুড়িপাড়া, নবীগঞ্জ, বন্দর ও মদনগঞ্জ। এর মধ্যে পাকিস্তান আমলে মদনগঞ্জে পাট, ধান, চালের জমজমাট আড়ত ছিলো। অপরদিকে নরসিংদীতে তৈরি কাপড় ছিলো খ্যাতির শীর্ষে। এসব পণ্য সারাদেশে সরবরাহ করার লক্ষ্যেই ১৯৬৭ সালে সর্বপ্রথম নরসিংদী-মদনগঞ্জ রেলপথ নির্মাণের কথা ওঠে। পরবর্তীতে জরিপ ও যাচাই-বাছাই সম্পন্ন করে রেলপথটি নির্মাণের জন্যে রেলপ্রকৌশলীরা মতামত দেন। এর প্রেক্ষিতে রেলপথ ও রেলস্টেশন নির্মাণ কাজ শেষ করে ১৯৭০ সালের জানুয়ারিতে রেলগাড়ি চলাচল শুরু করা হয়। কিন্তু ১৯৭৬ সালের দিকে এই পথে রেল চলাচল লোকসানে পরিণত হয়।

খায়রুল বশির নামে একজন রেল কর্মকর্তা নরসিংদী-মদনগঞ্জ রেলসড়কের লোকসান নিয়ে অনুসন্ধান চালান। তিনি বিভিন্ন ব্যক্তি ও রেলপোর্টারের (কুলি) সঙ্গে কথা বলে জেনেছেন, নরসিংদী-মদনগঞ্জ রেলপথটি মূলত অব্যবস্থাপনা আর দুর্নীতির কারণে ডুবেছে। এই রেলপথটি এমন পর্যায়ে এসে ঠেকেছিলো যে, বন্ধ করে দেয়া ছাড়া বিকল্প কোনো পথ ছিলো না। কোনো স্টেশনেই টিকেট চেক করা হতো না। পোর্টারদের নিয়ন্ত্রণে সবকিছু চলে গিয়েছিলো। তারাই স্টেশন নিয়ন্ত্রণ করতো এবং টিকেট চেক করতো। যাত্রীদের কাছ থেকে টিকেট সংগ্রহ করে তা পুনরায় কাউন্টারে বিক্রি করা হতো। তাদের এই মহাদুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ছিলো বুকিং সহকারী, টিআইসি, একাউন্টস টিআইসি, এসিও এবং ডিপিও অফিসের আরএসিআই। বলা যায়, এই রেলপথের সব দুর্নীতির ভাগ রেলের উচ্চ পর্যায়ে যেতো। দুর্নীতিটা এমন পর্যায়ে চলে গিয়েছিলো, রেলের চালকেরা পর্যন্ত এতে জড়িয়ে পড়েছিলো। ৫-১০ টাকা ঘুষের বিনিময়ে যাত্রীদের যত্রতত্র নামিয়ে দেয়া, এমনকি যাত্রীদের বাড়ির কাছে ট্রেন ব্রেক করার মতো ঘটনাও ঘটতো। দুর্নীতি চরম পর্যায়ে পৌঁছে গেলে সরকার রেলপথটি বন্ধ করে দেয়ার চিন্তা-ভাবনা করে। সোনারগাঁওয়ের তৎকালীন সংসদ সদস্য ও মন্ত্রী ব্যারিস্টার রাবেয়া ভূঁইয়া এই রেলপথের দুর্দশা দেখে ব্যথিত হন। তিনি রেলপথ তুলে দিয়ে সেখানে স্থলপথ নির্মাণের পরিকল্পনা করেন। তখন থেকেই যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ে ফাইল চালাচালি শুরু হয়।

নরসিংদী টু মদনগঞ্জ সেকশনের করুণ অবস্থা ১০ টি স্টেশনের উপর প্রভাব ফেলে। ১৯৭০ সালে রেলপথটি শুরুর সময় প্রতিটি স্টেশনে মাস্টার নিয়োজিত ছিলো। ১৯৭৭ সালে রেলপথটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার আগে প্রত্যেক স্টেশন থেকে মাস্টার উইথড্র হতে থাকে। তখন বুকিং সহকারী স্টেশনের সব দায়িত্ব পালন করতেন। শুধুমাত্র মদনগঞ্জ স্টেশনে একজন স্টেশন মাস্টার ও একজন পয়েন্টম্যান নিয়োজিত ছিলো। তারা মদনগঞ্জে ইঞ্জিন ঘুরিয়ে অনট্রেন করতেন।

১৯৭৭ সালে রেলপথটি বন্ধ হয়ে গেলে পুরো অঞ্চলটি প্রায় জনমানবশূন্য হয়ে পড়ে। এটি চোর-ডাকাতের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়। রেলপথের লোহালক্কর, কাঠ, পাথর চুরি হতে থাকে। তখন থেকে লম্বা সময় ধরে এই ভয়ঙ্কর অবস্থা বিরাজমান ছিলো। জানা যায়, ১৯৮০ সালের দিকে মদনগঞ্জে চালের ব্যবসার পাশাপাশি পাটের ব্যবসায়ও ধস নামে। সঙ্গত কারণে সরকার রেলপথটি সংস্কার ও পুনরায় চালু করার চিন্তা-ভাবনা বাদ দিয়ে সেখানে বাস-ট্রাক চলাচলের উপযোগী সড়কপথ নির্মাণের পরিকল্পনা করে।

পরবর্তীতে আশির দশকের শেষের দিকে রেললাইনের উপর সড়কটি নির্মিত হয়। বর্তমানে সড়কটি নরসিংদী টু নারায়ণগঞ্জ চলাচলের বিকল্প সড়ক হিসেবে বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে।


আপেল মাহমুদ
সাংবাদিক, গবেষক ও দুষ্প্রাপ্য গ্রন্থ সংগ্রাহক

কবি মহসিন খোন্দকারের ‘ব্যথার বঙ্গানুবাদ’ কবিতাগ্রন্থের পাঠ-আলোচনা অনুষ্ঠান

কথা বলছেন কবি ও ঔপন্যাসিক মনোয়ারা স্মৃতি | ছবি : রাজিব ভূঁইয়া

দিনটা শনিবার, ১০ মে ২০২৫। ‘বাংলাদেশ প্রগতি লেখক সংঘ, নরসিংদী’ কর্তৃক আয়োজিত হয় ‘মহসিন খোন্দকারের কবিতাগ্রন্থ ব্যথার বঙ্গানুবাদ-এর পাঠ-পরাপাঠ’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। নবধারা প্রি-স্কুল প্রাঙ্গণে বিকেল ৩ টা ৩০ মিনিটে আরম্ভ হয় অনুষ্ঠানটি। উপস্থিত ছিলেন নরসিংদীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসা কবি-লেখক-সংস্কৃতিকর্মী এবং সাহিত্যপ্রেমীরা। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন প্রগতি লেখক সংঘের সহ-সাধারণ সম্পাদক হাসান মাহমুদ সনেট। কবি মহসিন খোন্দকার রচিত ‘ব্যথার বঙ্গানুবাদ’ কাব্যের যুক্তিনিষ্ঠ পক্ষ-বিপক্ষের বাক-বিতণ্ডায় অনুষ্ঠানটি মুখরিত ছিলো। গ্রন্থটির কাব্যভাবনা, বিষয়, ভাষা, ছন্দসহ কবিতার মৌলিক ব্যাকরণিক বিষয়-আশয় চমৎকার বাকচাতুর্য দ্বারা তুলে ধরেন আলোচকগণ। আলোচকদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন নরসিংদীর বিশিষ্ট শিক্ষক, লেখক ও গবেষক প্রফেসর কালাম মাহমুদ, কবি ও সম্পাদক মমিন আফ্রাদ, কবি ও সম্পাদক শাহীন সোহান, কবি হাসনাইন হীরা, এক্টিভিস্ট ও রাজনীতি বিশ্লেষক নাজমুল আলম সোহাগ এবং কবি ও ঔপন্যাসিক মনোয়ারা স্মৃতি। কাব্যগ্রন্থকে কেন্দ্র করে প্রত্যেকের ধারাবাহিক আলোচনায় অনুষ্ঠানটি প্রাণোচ্ছ্বল হয়ে ওঠে।

লেখক ও গবেষক প্রফেসর কালাম মাহমুদ বলেন, “যা অনুভব, তা-ই কবিতা। কবি মহসিন খোন্দকার আঞ্চলিক ভাষার কবি। তার কবিতার জগত চমৎকার, শব্দবিন্যাস, বয়ানভঙ্গি অসাধারণ। সংকেত, উপমা, নতুন শব্দ প্রয়োগ ও সৌন্দর্য সৃষ্টিতে কাব্যখানি সার্থক হয়েছে।”

আলোচনা করছেন লেখক ও গবেষক প্রফেসর কালাম মাহমুদ | ছবি : রাজিব ভূঁইয়া

গ্রন্থের কবিতাগুলোর মৌলিক বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন সম্পাদক ও কবি শাহীন সোহান। তিনি বলেন, “এটি বিষয়, শব্দ, বাক্য, ভাষাভঙ্গি, রূপক, চিত্রকল্পে ঠাসা প্রেমের কাব্যগ্রন্থ। তবে কবিতার এতো সরল বাক্য আমার কাছে সুখকর মনে হয়নি।”

আলোচনার পর আলোচনায় চলে কাব্যের রসবোধ ও প্রকৃত নির্যাস। কবি মমিন আফ্রাদ বলেন, “প্রচুর ব্যক্তিগত প্রতীক ব্যবহার করেছেন কবি। যেমন : ভি-কাট রাত, চোখ ভর্তি জোনাকি, তিন ফর্মার আকাশ, ভাববিস্কুট, ফুলফুর্তির ফনেটিকস, মাখন মুহূর্ত, সাইকো সাফিক্স ও বয়সের তিরতিরানি তো আছেই।”

আরেকজন আলোচক কবি ও ঔপন্যাসিক মনোয়ারা স্মৃতি বলেন, “প্রতিটি কবিতা গূঢ় রসায়নে তাৎপর্যপূর্ণ। কাব্যের স্বকীয়তা হলো শব্দচয়নে। ‘ব্যথার বঙ্গানুবাদ’ একটি সমৃদ্ধ-সার্থক কবিতাগ্রন্থ।”

কবি হাসনাইন হীরা গ্রন্থটির শিল্পমান বিচার করতে গিয়ে সৈয়দ শামসুল হকের ‘পরাণের গহীন ভেতর’ ও আল মাহমুদের ‘সোনালী কাবিন’ কাব্যের সাথে তুলনা করে আলোচনা করেন। তিনি আরো বলেন, “আমার কাছে কাব্যের সবগুলো কবিতা একটি কবিতা মনে হয়েছে।”

কথা বলছেন কবি হাসনাইন হীরা | ছবি : রাজিব ভূঁইয়া

শিক্ষক, এক্টিভিস্ট ও সংস্কৃতিকর্মী নাজমুল আলম সোহাগ বলেন, “কবিতা কিছু শব্দ, কিছু চিত্রকল্পের গভীর উপলব্ধিবোধ। মহসিন খোন্দকারের নতুনত্ব, উচ্ছ্বাস-প্রবণতা, ছেলেমানুষি আমার মুগ্ধতার জায়গা। তিনি নিরন্তর লিখে যাবেন, এই আশা রাখি।”

এছাড়া চিত্রশিল্পী সাদেক মুকুল, সাবেক শিক্ষা অফিসার ও কলামিস্ট নূরুদ্দীন দরজী, লেখক নূরুল ইসলাম নূরচান, লেখক নূরজাহান বেগমসহ আরো অনেকে তাদের মূল্যবান বক্তব্য রাখেন। আলোচনা অনুষ্ঠানটি আরো প্রাণবন্ত হয় কবিতা আবৃত্তির মাধ্যমে। আলোচকদের আলোচনার ফাঁকে ‘ব্যথার বঙ্গানুবাদ’ গ্রন্থ থেকে ‘ভাববিস্কুট’, ‘আমাকে সরানো এতো সহজ না’ এবং ‘রঙিন রাতের ঠোঁট’ কবিতা আবৃত্তি করেন আবৃত্তিকার রওনক জাহান মুন ও কারিমা পুষ্পিতা।

অনুষ্ঠানটি সমাপ্ত হয় ‘প্রগতি লেখক সংঘ, নরসিংদী’ এবং এই অনুষ্ঠানের সভাপতি সুমন ইউসুফের বুদ্ধিদীপ্ত ও চিন্তাশীল আলোচনায়।

হরিচরণ আচার্য্য : স্থানীয় ইতিহাসে উপেক্ষিত সর্বশ্রেষ্ঠ কবিয়াল

0

দুই বাংলা, আসাম, ত্রিপুরা, বর্ধমান, শিলিগুড়ি, দার্জিলিং, উড়িষ্যা ও পাটনাসহ আরো অনেক স্থানে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ কবিয়াল এবং বৈষ্ণব সাধক হিসেবে যুগ যুগ ধরে পূজণীয় হয়ে আসছেন শ্রী হরিচরণ আচার্য্য কবিগুণাকর (১৮৬১-১৯৪১)। বিশেষ করে, ‘কবিগানের অমর স্রষ্টা’ অভিধাপ্রাপ্ত এ-ব্যক্তিত্ব স্বদেশি আন্দোলন, রাজনৈতিক টানাপোড়েন, সামাজিক অবক্ষয় ও সাংস্কৃতিক ভাঙাগড়ায় যে-খাঁটি বাঙালিত্বের প্রমাণ রেখে গেছেন, তা কোনোদিনই আমাদের কাছ থেকে হারিয়ে যাবে না। ১২৬৮ বঙ্গাব্দের কার্তিক সংক্রান্তির দিনে তৎকালীন ঢাকা জেলার মহেশ্বরদী পরগণাধীন নরসিংদী গ্রামে (নরসিংদী বর্তমানে একটি জেলা শহর) জন্মগ্রহণকারী হরিচরণ আচার্য্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কীর্তি হলো নিজ পৈতৃক ভিটায় আরাধ্য দেব-দেবী ‘শ্রী শ্রী গৌর বিষ্ণুপ্রিয়া আশ্রম’ প্রতিষ্ঠা। শেষ জীবনে কবিগান ছেড়ে দিয়ে মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত এ-আশ্রমের মাধ্যমেই তিনি জাগতিক সব সুখ-শান্তি আর আত্মতৃপ্তি খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করেছেন।

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের (১৮৬১-১৯৪১) সম-সাময়িক ব্যক্তি হিসেবে তিনি কবিদলে দোহারনট্ট (ঢোলকবাদক), তবলচি, বাঁশিঅলা, খোল-মন্দিরা ও বেহালাবাদক সহযোগে সারা বাংলাসহ ভারতবর্ষের অনেক জায়গায় আসর মাতিয়ে রেখেছিলেন। আখ্যা পেয়েছিলেন ‘কবিয়াল সম্রাট’। নদীমাতৃক বাংলার জমিদার, তালুকদার, রাজকর্মচারী ও ধনাঢ্য ব্যবসায়ীদের পৃষ্ঠপোষকতায় বেড়ে ওঠা কবিগানের ত্রাণকর্তা হিসেবে হরিচরণ আচার্য্য ‘বায়না’ পেয়েই নিজস্ব ‘পানসি’ নৌকাযোগে সর্বত্র ছুটে বেড়িয়েছেন। সেখানে প্রতিপক্ষ কবিয়ালকে টপ্পা, ছড়া কাটাকাটি, বাকচাতুর্যে পরাস্ত করে, ডাক-মালসী, মিলন আগমনী সঙ্গীতে শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করে তিনি জয়ের মালা গলায় পরতেন। কৃষক-শ্রমিক, সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ থেকে শুরু করে জমিদার, তালুকদারেরা তাঁর গানে মুগ্ধ হয়ে মেডেল, সোনা-রূপার মোহর, এমনকি নগদ অর্থও পুরস্কৃত করতেন।

নরসিংদী বাজারে বসবাসকারী ‘আচার্য্য ব্রাহ্মণ’ বিষ্ণুমোহন আচার্য্য বংশগতভাবে মূর্তিশিল্প ও ফলিত জ্যোতিষী বিদ্যাকে পেশা হিসেবে বেছে না নিয়ে শাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিত হিসেবে খ্যাতি পেয়েছিলেন। স্ত্রী বিষ্ণুশশীপ্রিয়া দেবী একজন দায়িত্বশীল গৃহিণী এবং পূজা অর্চনায় শ্রদ্ধাশীল নারীর ভূমিকায় ছিলেন অনন্যা। তাঁরাই হলেন হরিচরণ আচার্য্যরে পিতা-মাতা। তাঁর জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা ছিলেন গুরুচরণ আচার্য্য। তিনি দক্ষ মূর্তিশিল্পী ও ফলিত জ্যোতিষচর্চার মাধ্যমে কুলগত বৃত্তিতে খ্যাতিমান হয়েছিলেন।

হরিচরণ আচার্য্য সাটিরপাড়ার রঘুনাথ ব্রহ্মচারীর টোলে চতুষ্টয় বৃত্তি পর্যন্ত পড়াশোনা করার পর তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ছেদ পড়ে। তখন পারিবারিক কুলবৃত্তি এবং কবিরাজী চিকিৎসাবিদ্যা শেখানোর চেষ্টা করা হয়। এর কোনোটাতেই তাঁর স্থিতি হয়নি। বরং নরসিংদী ও তার আশেপাশের গ্রামাঞ্চলে অনুষ্ঠিত পালা ও রামায়ণ গানের আসরে সময় কাটাতে থাকেন বালক হরিচরণ। উক্ত গানের আসরে তিনি এতোটাই অনুরক্ত হয়ে ওঠেছিলেন যে, ১৪ বছর বয়সে নিজেই রামায়ণ গান গাইতে শুরু করেন। ১২৮৩ বঙ্গাব্দের পর সাটিরপাড়ার স্বরূপ কবিরাজের রামায়ণ গানের দলে ভিড়ে যান। অল্পদিনের মধ্যে উক্ত গানে তিনি অদ্বিতীয় হয়ে ওঠেন। বঙ্গদেশে তার যশ-খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে।

সেই সময় বাংলার সর্বত্র কবিগানের দ্যুতি ছড়িয়ে পড়েছিলো। মাধবদীর দক্ষিণের গ্রাম আলগী নিবাসী রামকানাই আচার্য্য, রায়পুরার ডৌকাদীর হরিশচন্দ্র চক্রবর্তী, পারুলিয়ার জয়হরি সরকার, বৈকুণ্ঠনাথ চক্রবর্তী ওরফে পাগল দ্বিজদাস প্রমুখ তখন কবিগানের আসর মাত করে যাচ্ছিলেন। রামায়ণ গান গাওয়ার পাশাপাশি হরিচরণ আচার্য্য এসব খ্যাতনামা কবির সংস্পর্শে আসেন।

এরই মধ্যে একদিন পারুলিয়া গ্রামে কবিগানের আসরে জয়হরি সরকার ও শিবচন্দ্র দাসের প্রতিদ্বন্দ্বিতা হওয়ার কথা থাকলেও এক পর্যায়ে শিবচন্দ্র আসর ছেড়ে গা ঢাকা দেন। আসর ধরে রাখার জন্যে তৎস্থলে যুবক হরিচরণ আচার্য্যকে নামিয়ে দেয়া হয়। কিন্তু উপস্থিত দর্শক-শ্রোতা ও বোদ্ধা মহলকে তাক লাগিয়ে দিয়ে স্বনামধন্য জয়হরি সরকারকে পরাজিত করে দেন। এ-ঘটনা মুহূর্তের মধ্যে চারদিকে চাউর হয়ে যায়। কবিয়াল হিসেবে শুরু হয় হরিচরণের নবযাত্রা। এরপর তাঁকে আর কবিগানের ক্ষেত্রে কখনো পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। সেই সময় ইংরেজি শিক্ষার প্রসার, আধুনিক নাটক, থিয়েটারসহ আরো কিছু বিনোদন সামগ্রী আমদানি হওয়ার ফলে কবিগান একমাত্র অশিক্ষিত সাধারণ সম্প্রদায়ের মনোরঞ্জন করে টিকে ছিলো। ফলে এতে অশ্লীলতা ও স্থূলতা ব্যাপকভাবে ঢুকে পড়ে। শিক্ষিত ভদ্রলোকেরা কবিগান শোনা প্রায় ছেড়েই দিয়েছিলেন। এমনি ক্রান্তিকালে একক ত্রাণকর্তা হয়ে আসেন হরিচরণ আচার্য্য। নিখুঁত লহর রচনা, গানে সাহিত্যরস সংযোজন এবং ছড়া-টপ্পা সংযুক্ত করে তিনি কবির আসরে নতুন প্রাণ ফিরিয়ে আনেন। চিতানে গান শুরু করে দিয়েই সব গায়ক বসে পড়ে, সর্বোত্তম গায়ক একটি বেহালা ও ঢোলের তালে বেশ মাজাঘষা সুরে গানটি গেয়ে যায়। এভাবে চারদিকে চারজন দাঁড়িয়ে একে একে গানটি আদায় করে। এ-প্রথার স্রষ্টা হলেন হরিচরণ আচার্য্য।

কবিগানের আধুনিকায়ন নিয়ে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়েছে। প্রাচীনকালে কবিয়ালরা নিজেদের মধ্যে পরামর্শ করে পর্যায়ক্রমে গান গাইতেন। রাম বসুই সর্বপ্রথম মৌখিক ছড়া কাটা এবং বাকযুদ্ধের অবতাড়নার সূচনা করেন। আর কবিগানের সর্বোজ্জ্বল সূর্য হিসেবে গানের কথায়, সুরে এবং বাদ্যযন্ত্রে আমূল পরিবর্তন এনে হরিচরণ আচার্য্য অমরত্ব লাভ করেছেন। সবচেয়ে প্রাচীন কবিয়াল গুঁজলা গুই অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে পেশাদার কবিগানের সূচনা করার পর রঘুনাথ দাস, লালুনন্দলাল, রামজী দাস, হরু ঠাকুর, কেষ্টা মুচি, নিতাই বৈরাগী, রাম বসু, ভোলা ময়রা, ঠাকুর দাস, নবাই ঠাকুর, এন্টনি ফিরিঙ্গি, রামকুমার সরকার, রামুমালী, নিমচাঁদ ঠাকুর, রামকানাই প্রমুখ কবিগান গেয়ে দেশ ভাসিয়ে ছিলেন। হরিচরণ আচার্য্য তাঁর স্বীয় মেধা আর যোগ্যতাবলে এতে পূর্ণতা আনেন।

হরিচরণ আচার্য্য অধিকাংশ সময় পানসি নৌকাতে কাটাতেন। পানসির এক বিশেষ কামরায় গদির উপর তাকিয়ায় ঠেস দিয়ে পদ্মাসনে বসে হাতে মালা নিয়ে জপ করতেন, বিশ্বামিত্র মুনির মতো। দেখতে তিনি ছিলেন উজ্জ্বল গৌরবর্ণ, আজানুলম্বিত বাহু, মুখে লম্বা দাড়ি, মস্তকে টাক ও পেছনে সামান্য কিছু কেশ ঝুটি বাঁধা। চোখ দুটি যেন কোন ভাবাবেশে ঢুলুঢুলু। গান গেয়ে যেটুকু সময় পেতেন, তার পুরোটাই ব্যয় করতেন নিজ ভিটায় গড়ে তোলা শ্রী শ্রী গৌর বিষ্ণুপ্রিয়া আশ্রমের কাজে। ফলে সারা বাংলার অজস্র কবিয়ালদের কাছে হরিচরণের মতো তাঁর প্রতিষ্ঠিত আশ্রমটিও বেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেছিলো। ‘মা-দাদা সম্প্রদায়’-এর প্রতিষ্ঠাতা শ্রী বসন্ত সাধুর শিষ্যত্ব গ্রহণ করার পর বৈষ্ণব মন্ত্রে দীক্ষিত হয়েই আশ্রম গড়ে তোলার ব্রত গ্রহণ করেছিলেন তিনি। বাংলার অধিকাংশ কবিয়ালের সাথে হরিচরণ আচার্য্যের বাকযুদ্ধ হয়েছে। প্রতিটি যুদ্ধে জয়ী হয়েছিলেন তিনি।

সুদীর্ঘ কবিয়াল জীবনে হরিচরণ বেশ কিছু ছাত্র-শিষ্য সৃষ্টি করে কবিগানকে আরো সমৃদ্ধ করার পথ প্রশস্ত করেছিলেন। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো নরসিংদী বাজারের প্রহ্লাদ সরকার, ঝালকাঠির নকুলেশ্বর সরকার, রূপগঞ্জের তারিণী সরকার, বেনুপুরের অম্বিকা পাটনী, জিনারদীর হরেন্দ্র চক্রবর্তী, সাধারচরের সর্বানন্দ আচার্য্য, ভৈরবের দ্বারিকা সরকার, কুমিল্লার অর্জুন দেবনাথ, চাপাতলীর কালী কুমার দে, নোয়াখালীর রমেশ আচার্য্য ও খুলনার রাজেন্দ্রনাথ সরকার প্রমুখ। তাঁর কবির দলে ধরতা দোহার হিসেবে কাজ করেছেন মনোমোহন আচার্য্য। তিনি ছিলেন হরিচরণের জ্ঞাতি ভাই। ‘আচার্য্য কর্তা’র দলে দোহার ও বাদ্যযন্ত্র সংগতকার হিসেবে আরো ছিলেন মদন, গোবিন্দ আর আদরমণি নামে এক সুকণ্ঠী বালিকা। তাঁরা ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত কবিগানের আসর মাত করে রেখেছিলেন।

১৩৪৮ বঙ্গাব্দের ১৩ জ্যৈষ্ঠ হরিচরণের প্রস্থান ঘটলে বাংলা থেকে একজন দ্বিগ্বিজয়ী কবিয়ালের যে-শূন্যতা সৃষ্টি হয়, তাতে লোকসঙ্গীতের এ-ধারা ভঙ্গুর পথে প্রবাহিত হতে থাকে। তাঁর যোগ্য উত্তরসূরী জন্ম না নেয়ায় কবিগান প্রায় হারিয়ে গেছে। বই-পুস্তকের পাতা ছাড়া এ-গানের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় না। কবিগানের নিজস্ব যুগ প্রবর্তনকারী হরিচরণ আচার্য্যের ভাগ্যে কোনো রাষ্ট্রীয় সম্মান কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মানসূচক ডিগ্রি না জুটলেও সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ, কৃষক, শ্রমিকদের কাছে ‘কবিয়াল সম্রাট’, ‘আচার্য্য কর্তা’ তথা প্রাণের মানুষ অভিধায় সিক্ত হয়েছিলেন। একই সাথে কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী থানাধীন মসূয়া গ্রামের একদল সংস্কৃত পণ্ডিত তাঁকে কবিগুণাকর উপাধি দিয়েছিলেন ১৩৬৫ বঙ্গাব্দের ১৯ অগ্রহায়ণ। নরসিংদী শ্রী শ্রী গৌর বিষ্ণুপ্রিয়া আশ্রম প্রাঙ্গণে যখন উপাধিপত্রটি কবিয়ালের হাতে তুলে দেয়া হয়, তখন সেখানে এক উৎসব বয়ে গিয়েছিলো।

শ্রী চৈতন্যের বৈষ্ণব ধর্মানুসারী, আজন্ম নিরামিষভোগী ও নির্লোভ চরিত্রের অধিকারী হরিচরণ আচার্য্য সংসার জীবনে ছিলেন নিঃসঙ্গ। অম্বিকাচরণ আচার্য্য নামের একমাত্র পুত্র অকালে মৃত্যুবরণ করলে তাঁর বংশ নির্বংশ হয়ে যায়। তবে তাঁর জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা গুরুচরণ আচার্য্যের বংশধরদের একটি শাখা ত্রিপুরার আগরতলায় বিদ্যমান রয়েছে। হরিচরণ গবেষণাগার নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে জগদীশচন্দ্র আচার্য্য গণেশ নিজ বংশীয় হরিচরণ চর্চা এখনো অব্যাহত রেখেছেন। তবে বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতির অমূল্য সম্পদ হলো তাঁর সৃষ্টি গান, লহর, ছড়া, পাঁচালী, টপ্পা, কবিয়াল জীবনের স্মৃতিকথা, অলৌকিক ঘটনাবলির বর্ণনা, ধর্মীয় বিবরণ প্রভৃতি। সুখের কথা, হরিচরণ আচার্য্যই একমাত্র কবিয়াল, যাঁর এসব গুরুত্বপূর্ণ উপাদান পুস্তিকা হিসেবে প্রকাশিত হয়েছিলো। এগুলো কবিগান ও কবিয়ালদের নিয়ে যেকোনো গবেষণায় আকরগ্রন্থ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

এ-যাবতকালে হরিচরণ আচার্য্যের লেখা ১০ টি গ্রন্থের নাম পাওয়া যায়। গ্রন্থগুলো হলো : কবির ঝংকার (১ম খণ্ড), কবির ঝংকার (২য় খণ্ড), পরিশিষ্ট (কবির ঝংকারের ৩য় খণ্ড), অমিয় লহরী, বঙ্গের কবির লড়াই, বসন্ত লীলামৃত, নবদ্বীপ সুধা, নদীয়া মঙ্গল, শ্রী দাদার অমিয় বাণী ও শ্রী শ্রী গৌর বিষ্ণুপ্রিয়া গীতি চয়নিকা। তাছাড়া তাঁর অসংখ্য সাহিত্য উপাদান এখনো অগ্রন্থিত অবস্থায় এখানে-সেখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। আমাদের দুর্ভাগ্য হলো, এসব দুষ্প্রাপ্য রচনাসম্ভার হারিয়ে যেতে বসেছে। কোনো কোনো গ্রন্থের দ্বিতীয় সংস্করণ হলেও তা এখন আর বাজারে পাওয়া যায় না। তবে সুখের বিষয়, এসব দুষ্প্রাপ্য রচনাবলির মধ্যে বঙ্গের কবির লড়াই, অমিয় লহরী ও কবির ঝংকার (১ম খণ্ড)-র অংশবিশেষ এক মলাটে প্রকাশিত হওয়ার মাধ্যমে নতুন করে হরিচরণ আচার্য্যের মূল্যায়ন করা হয়েছে। এর মধ্যে অমিয় লহরী ও কবির ঝংকারের দ্বিতীয় সংস্করণ ছাপা হয়েছে।

এই লেখায় কালজয়ী কবিয়াল হরিচরণ আচার্য্য সম্পর্কে যৎসামান্য ধারণা দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। এতে আমার নিজস্ব কোনো কৃতিত্ব নেই। বিস্মৃতপ্রায় এ-কবিয়ালের নামধাম, যশ-খ্যাতি এবং সাফল্যগাঁথা— সবকিছু জনসমক্ষে প্রস্ফুটিত করার জন্যে স্মরণীয় হয়ে আছেন কয়েকজন হরিচরণ প্রেমী। নিঃস্বার্থ এই মানুষগুলোর মধ্যে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার, ড. দীনেশচন্দ্র সিং, ময়মনসিংহ নাসিরাবাদ কলেজের সাবেক অধ্যাপক যতীন সরকার, ‘নরসিংদীর ইতিহাস’ গ্রন্থের লেখক শফিকুল আসগর, অধ্যাপক (অব.) প্রণব চক্রবর্তী, প্রফেসর গোলাম মোস্তাফা মিয়া, সাটিরপাড়া কালী কুমার ইনস্টিটিউশনের প্রয়াত প্রবীণ শিক্ষক সত্যেন্দ্রনাথ মোদক এবং একনিষ্ঠ হরিচরণ ভক্ত হরিপদ সাহার অবদান অনস্বীকার্য। তাঁদের সাথে নরসিংদীরই মানুষ বর্তমানে আগরতলা প্রবাসী জগদীশচন্দ্র আচার্য্য গণেশের এবং ডা. সুভাষ ভৌমিকের নাম বিশেষভাবে উল্লেখ করতে চাই। দেশত্যাগী ভাবুক এ-মানুষটি হরিচরণ চর্চাকে তাঁর জীবনের একটি অংশ করে নিয়েছেন। জানা যায়, শ্যামাচরণ সাহা (শ্যাম সাধু) হরিচরণের একনিষ্ট ভক্ত ছিলেন। তাঁকেও গৌর বিষ্ণুপ্রিয়া আশ্রমে গুরুর সমাধির সন্নিকটে সমাধিস্থ করা হয়। শ্যাম সাধুর পুত্র মনোরঞ্জন সাহা (কণা সাধু) মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত আশ্রমের সাথে যুক্ত ছিলেন এবং কণা সাধুর পুত্র ডা. দিলীপ কুমার সাহা এখনো আশ্রমের কর্মধারার সাথে নিজেকে সম্পৃক্ত রেখেছেন। তিনি গৌর বিষ্ণুপ্রিয়া আশ্রমধাম কমিটির বর্তমান সেক্রেটারি। সভাপতি হিসেবে আছেন অধ্যক্ষ অহিভূষণ চক্রবর্তী। হরিচরণ আচার্য্য সম্পর্কে ডা. দিলীপ কুমার সাহা বলেন, “হরিচরণ আচার্য্য হচ্ছেন আমাদের এই উপমহাদেশের সর্বশ্রেষ্ঠ কবিয়াল। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও হরিচরণ আচার্য্যের জন্ম-মৃত্যু একই সালে। আমি মনে করি, বাংলার আকাশে একই সময়ে দুই নক্ষত্রের বিচরণ ঘটেছিলো— পশ্চিম দিগন্তে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ এবং পূর্ব দিগন্তে আমাদের হরিচরণ আচার্য্য।”

ব্রিটিশ বিরোধী বিপ্লবীদের সংগঠক ও সহায়ক শিক্ষানুরাগী ললিতমোহন রায়, মহাত্মা গান্ধীর অনুসারী সুন্দর আলী গান্ধী, অভয় মোদক, দীননাথ মোদক প্রমুখের সাথে হরিচরণ আচার্য্যের সম্পর্ক ছিলো সুনিবিড়। শুধু কবিয়াল হিসেবেই নয়, তিনি একজন স্বাধীনতা সংগ্রামী ও দেশসেবক হিসেবেও ইতিহাসে স্থান করে আছেন। কিন্তু স্থানীয়ভাবে ঠিক ততোটাই উপেক্ষিত তিনি। অথচ তাঁকে নিয়ে কলকাতা ও আগরতলা বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডিসহ নানা গবেষণা হয়েছে, হচ্ছে।

কবিগানের পুনরুদ্ধারকারী, কর্কশ ও অশ্লীল কবিগানকে শ্রুতিমধুর করে অমরত্ব দান করায় অমর হয়ে থাকবেন হরিচরণ আচার্য্য। অথচ নিজভূমে তিনি চরমভাবে উপেক্ষিত। সুদূর আগরতলায় হরিচরণ গবেষণাগার প্রতিষ্ঠিত হলেও জন্মস্থান নরসিংদীতে তিনি হারিয়ে যেতে বসেছেন। তাঁর জন্ম-মৃত্যু তিথিতে তাঁকে স্মরণ পর্যন্ত করা হয় না। অথচ নরসিংদীর অমূল্য সম্পদ তিনি। কতোটা অকৃতজ্ঞ হলে স্থানীয় মানুষজন ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো এমনটা করতে পারে। তাঁকে সম্মান জানানোর এবং পরবর্তী প্রজন্মের জন্যে সঠিক ইতিহাস রেখে যাবার দায়বোধ কবে জাগবে, সেটাও অনিশ্চিত।


আপেল মাহমুদ
সাংবাদিক, গবেষক ও দুষ্প্রাপ্য গ্রন্থ সংগ্রাহক

বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক মোহাম্মদ আজমের সাথে নির্দিষ্ট আলাপ

0

মোহাম্মদ আজম। লেখক ও গবেষক। বর্তমানে তিনি বাংলা একাডেমির মহাপরিচালকের দায়িত্ব পালন করছেন। আজ (১৬ এপ্রিল ২০২৫, বুধবার) নরসিংদী সরকারি মহিলা কলেজের বাংলা বিভাগ কর্তৃক আয়োজিত ‘আধুনিক বাংলা কাব্যের ধারাক্রমে জসীমউদ্দীনের বিশিষ্টতা’ শীর্ষক এক সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। সেখানেই ‘গঙ্গাঋদ্ধি’র পক্ষ থেকে তাঁর এই ছোট্টো সাক্ষাতকারটি গ্রহণ করা হয়। সাক্ষাতকার গ্রহণ করেছেন সম্পাদক সুমন ইউসুফ।


 

বাংলাদেশে এখন প্রচুর লেখক-কবি বা বুদ্ধিজীবীদের ফ্যাসিবাদের বয়ান রচনাকারী বা বিগত সরকারের সমর্থক নাম দিয়ে বাংলা একাডেমি, পাঠ্যপুস্তক বা আরো নানা পরিসর থেকে বাদ দেয়ার যে-সংস্কৃতি চালু আছে, এটা কি ইনক্লুসিভ জাতি বা রাষ্ট্র নির্মাণের সহায়ক হচ্ছে?

মোহাম্মদ আজম :  না। যদি ব্যাপারটা এরকমই হয় যে, শুধু একজনকে ট্যাগ দিয়ে বাদ দেয়া হচ্ছে, তাহলে সেটা ডেফিনেটলি ইনক্লুসিভ রাষ্ট্র গঠনের অন্তরায়। কিন্তু একটা কথা আমাদের খেয়াল রাখতে হবে, বিগত সরকারের অপরাধপ্রবণতার সঙ্গে, অন্যায়ের সঙ্গে, বাড়তি ও অন্যায় সুবিধা নেয়ার সঙ্গে যদি কেউ যুক্ত থাকে, তারও একটা ফয়সালা আগে হওয়া উচিত। সেটা হওয়ার পরে এসবের সাথে যারা যুক্ত ছিলো না, তাদেরকে এক্সক্লুড করা কোনো কাজের কথা নয়।

এগুলো যাচাই-বাছাইয়ের জন্যে আপনারা কি নির্মোহ-নিরপেক্ষ কোনো পদ্ধতি চালু করেছেন?

মোহাম্মদ আজম : আপনি যদি বাংলা একাডেমির কথা বলেন, তাহলে আমি বলবো, আমরা একেবারে শতভাগ নির্মোহ থাকতে পারছি, সেই দাবি আমি করবো না। কিন্তু আমরা ডেফিনেটলি কাজ করি। বাংলা একাডেমি এমন বিষয় নিয়ে কাজ করে, যেটার সাথে বিশেষজ্ঞতার সম্পর্ক আছে। ফলে আমরা কোনো একটা পক্ষযুক্ত যে-কাউকে এনে দাঁড় করিয়ে দিতে পারি না। আমাদের বিশেষজ্ঞতার একটা লেভেল মেনটেইন করতে হয়। এবং সেক্ষেত্রে আমরা এমন অনেককেই আমাদের লেখালেখি বা অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানিয়েছি, যাদেরকে আর যা-ই হোক, আওয়ামী বিরোধী বলা যাবে না।

আমি উদাহরণস্বরূপ বলি সাইমন জাকারিয়ার বিষয়টা। আপনারা ফেসবুকসহ সোশ্যাল মিডিয়ার মব ট্রায়াল থেকে উদ্বুদ্ধ হয়ে যেসব সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, সেগুলো কি যথাযথ হচ্ছে?

মোহাম্মদ আজম : কোনো কোনো ক্ষেত্রে যেটা ঘটেছে, সেই ব্যাপারটা হলো, বাংলা একাডেমি তো কোনো আইনী প্রতিষ্ঠান না। বাংলা একাডেমি পুলিশ নিয়োগ করে ব্যারিকেড দিয়ে কোনো সেমিনার করতে পারে না। ফলে যখন বিপুল পরিমাণ লোক কোনো একটা ব্যাপারে আপত্তি জানিয়েছে, তখন আমাদের সাময়িকভাবে সেই সিদ্ধান্তটা পরিবর্তন করতে হয়েছে। তার মানে এই নয় যে, তিনি অন্য কোনো কাজ করছেন না। তার মানে এই নয় যে, তিনি আর কখনোই কাজ করবেন না। তার মানে এই নয় যে, তাদের দাবির সাথে আমরা একমত পোষণ করেছি।

অনুষ্ঠান থেকে বাদ দেয়ার পরে তো তাদের দাবির সাথে একাত্মতা পোষণ করাই হলো…

মোহাম্মদ আজম : না, একাত্মতা পোষণ হলো না। আমরা যেটা করলাম, সেটা হলো, একটা অনুষ্ঠান আমাদের নির্দিষ্ট সময়ে করতে হবে, এটা একটা ফিজিক্যাল প্রেজেন্স। সেখানে একটা মারামারি বা ফ্যাসাদের যে-ঝুঁকি, সেই ঝুঁকিটা আমরা কাটালাম মাত্র। এর মানে এই নয় যে, আমরা তাদের সাথে ঐকমত্য পোষণ করেছি।

এটা আপনি স্পষ্ট করে বলছেন?

মোহাম্মদ আজম : এক্সাক্টলি দ্যাট।

বাংলাদেশে সমাদৃত তিনজন লেখককে বাংলা একাডেমি পুরস্কারের জন্যে নাম ঘোষণা করেও বাদ দিয়েছেন…

মোহাম্মদ আজম : না। সেলিম মোরশেদের যে-ব্যাপারটা, সেটার সাথে বাকি দুজনের ব্যাপারটা এক নয়। সেলিম মোরশেদ তাঁর ফেসবুক স্ট্যাটাসে পরিষ্কারভাবে লম্বা বয়ান দিয়েছেন। এবং সেখানে নির্বাচক, বাংলা একাডেমি কর্তৃপক্ষ এবং সমস্ত কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। কিন্তু বাকি দুজনের ওই সময়ের গণহত্যা বা অন্যায় কর্মকাণ্ডে, যেটা কোনো নৈতিক অন্যায় নয়, ফৌজদারী অন্যায়, সেই ব্যাপারে তাদের অবস্থান কখনো কখনো অস্পষ্ট এবং কখনো কখনো সরাসরি ঐকমত্যমূলক। তো সেই সময় আমরা যে-পর্যালোচনা করেছি, সেখানে এসব প্রমাণিত হওয়ায় আমাদের এই সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে।

এই বিষয়ে আমার শেষ প্রশ্ন, বাংলা একোডেমি পুরস্কার নিয়ে প্রতিবারই কোনো-না-কোনো বিতর্ক হয়। এগুলো এড়ানো কি সম্ভব নয়? আপনি যেহেতু এখন দায়িত্বে আছেন, আপনার কী মনে হয়?

মোহাম্মদ আজম : কথা হলো যে, এই জিনিস একেবারে আমি বা বাংলা একাডেমি— এই পার্টিকুলার আসপেক্ট থেকে আলাপ করলে আমরা ব্যাপারটাকে ব্যাখ্যা করতে পারবো না। আমাদের খেয়াল রাখতে হবে, আমাদের রাষ্ট্রের সমস্যা হলো স্ট্রাকচার তৈরি না হওয়ার সমস্যা, প্রতিষ্ঠান তৈরি না হওয়ার সমস্যা। প্রতিষ্ঠান তার দীর্ঘ ইতিহাসের মধ্যে সেই মর্যাদা অর্জন করে, যে-মর্যাদা দশজনের স্বীকৃতি পায়। আমাদের এখানে এই বিতর্ক শুধু বাংলা একাডেমি পুরস্কার নিয়েই হয় না। প্রথমত, একটা পুরস্কার অন্তত আপনি দেখাতে পারবেন না, যে-পুরস্কার নিয়ে বিতর্ক হয় নাই। তার মানে, বাংলাদেশে প্রাতিষ্ঠানিক যে-অপূর্ণতা, এবং তার সাথে স্বীকৃতির যে-সম্পর্ক, জনসম্মতির যে-সম্পর্ক, এটার যে-অভাব, এই পুরো ব্যাপারটি নিয়ে আলাপ না করলে আমরা এর কোনো সুরাহা করতে পারবো না। আমি বলবো যে, আমাদের পুরো সংস্কৃতির মধ্যে এই ব্যাপারটা নিয়ে ঘোরতর সংকট আছে। আমাদের কাজ হবে, প্রতিষ্ঠানকে জোরালো করে, কাঠামোকে জোরালো করে এই সংস্কৃতিকে অতিক্রম করে যাওয়া।

আচ্ছা, সরকারের বা সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের এজেন্ডা বাস্তবায়নই কি বাংলা একাডেমির প্রকৃত কাজ? সম্পূর্ণ স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে জাতির মনন এবং সৃজন বিকাশে বাংলা একাডেমি কি কাজ করতে পারবে বলে মনে করেন আপনি?

মোহাম্মদ আজম : প্রথম কথা হলো যে, স্বায়ত্তশাসন শব্দটি আপনি যে-ভঙ্গিতে উচ্চারণ করেছেন, আপনি আগে, বামপাশে, ‘সম্পূর্ণ’ শব্দটি যোগ করেছেন, তার মানে হলো, এই বিষয়ে আপনারই দ্বিধা আছে। এখন স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান মানেই রাষ্ট্রের আওতা বহির্ভূত প্রতিষ্ঠান নয়। রাষ্ট্র কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে স্বায়ত্তশাসিত হিসেবে কাজ করতে দেয় সিম্পলি এই কারণে যে, রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন রাজনৈতিক দল বা রাজনৈতিক মতাদর্শ সাপেক্ষে যেন প্রভাবিত না হয়। যাতে করে সেই প্রতিষ্ঠান দীর্ঘমেয়াদী কাজ করতে পারে। যেমন ইউনিভার্সিটি। ইউনিভার্সিটি দীর্ঘমেয়াদে কাজ করে। আবার বাংলা একাডেমি, আমরা ধরে নিই যে, এটি একটি গবেষণামূলক প্রতিষ্ঠান, গবেষণামূলক রচনাবলি প্রকাশ করবে এবং নতুন নতুন গবেষণার উদ্যোগ নেবে। এই প্রতিষ্ঠান যদি রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন একটি দল দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়, তাহলে গবেষণা বলে যে-ব্যাপারটা, সেটাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এজন্যে এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান করা হয়েছে। কিন্তু কথাটা বুঝতে হবে যে, স্বায়ত্তশাসিত কথাটা কোথাও অ্যাবস্যুলিউট না। আপনি যদি পার্টিকুলার উদাহরণ দিতে পারেন যে, বাংলা একাডেমি গত সাত মাসে রাষ্ট্রের ধ্বজাধারী হয়ে কী কী কাজ করেছে, তাহলে ব্যাপারটা সম্পর্কে আমার বলতে আরো সুবিধা হবে। একটা কথা খেয়াল রাখতে হবে যে, বাংলা একাডেমি সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয় বাজেটে পরিচালিত এবং সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন স্বায়ত্তশাসিত একটি প্রতিষ্ঠান। এই পুরো অংশটা বাদ দিয়ে আপনি যদি শুধু ‘স্বায়ত্তশাসিত’ শব্দটি ব্যবহার করেন, তাহলে কিন্তু ব্যাখ্যাটা হচ্ছে না। যদি এর আর্থিকভাবে সম্পূর্ণ স্বনির্ভরতা থাকতো, তাহলে সে যেই স্বায়ত্তশাসন ভোগ করতে পারতো, আর্থিকভাবে সরকারের উপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল এবং সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অঙ্গীভূত একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে সেই মাপের স্বায়ত্তশাসন ভোগ করাটা সম্ভব নয়।

বাংলা একাডেমির পুরোনো ধারাবাহিকতার জায়গা থেকে একটি প্রশ্ন করতে চাই। সেটি হলো, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় আপনার উপর কোনো ধরনের চাপ প্রয়োগ করছে কি না?

মোহাম্মদ আজম : ব্যক্তি এখানে কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়, গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো কাঠামো এবং ইনস্টিটিউশন। আমি গত সাত মাসে প্রধানত যে-চেষ্টাটা করেছি, সেটা হলো, আমি একটা বই পুনর্প্রকাশ হবে কি না, পুনর্মুদ্রণ হবে কি না, এই বিষয়েও নিজে কোনো সিদ্ধান্ত জানাইনি। আমি কাগজে বরাবরই লিখে দিয়েছি আমার সংশ্লিষ্ট বিভাগকে যে, এই বইয়ের পুনর্মুদ্রণের সম্ভাবনা যাচাই করে আমাকে জানান। তার মানে, আমি এটাকে ইনস্টিটিউট আকারে ডেভেলপ করার জন্যে কাজ করছি। এটার কোনো সুফল ভবিষ্যতে হয়তো দেখা গেলেও যেতে পারে।

বাংলা একাডেমি সাহিত্যকে বাংলার প্রান্তে ছড়িয়ে দেয়ার জন্যে কী কাজ করছে? এ-ব্যাপারে আপনার পরিকল্পনা কী?

মোহাম্মদ আজম : বাংলার প্রান্তীয় অঞ্চলে সাহিত্যকে ছড়িয়ে দেয়ায় বাংলা একাডেমির কাজ আসলে খুবই অপ্রতুল। এবং এটা বাংলা একাডেমির বর্তমান যে-স্ট্রাকচার, সেই স্ট্রাকচারে আসলে সম্ভব নয়। আমি ব্যক্তিগতভাবে আসলে যেটা মনে করি, রাষ্ট্রীয় যেকোনো সাংগঠনিক, কাঠামোগত আয়োজন উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত সম্পূর্ণরূপে বিস্তার করা বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বর্তমান কাঠামো অনুযায়ীই সম্ভব। এবং এটাই করা উচিত। সেক্ষেত্রে প্রত্যেক উপজেলাতেই একটি কালচারাল হাব তৈরি করা জরুরি, যেখানে পাবলিক লাইব্রেরি, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, শিল্পকলা একাডেমি এবং বাংলা একাডেমির এটলিস্ট প্রতিনিধিত্ব থাকবে। তার মাধ্যমে উপজেলা পর্যায়ে সমস্ত কর্মকাণ্ড সাধিত হবে। একমাত্র এ-ধরনের একটি কাঠামো যদি বাংলাদেশ রাষ্ট্র তৈরি করে, এটা কোনো আদর্শবাদী বা কাল্পনিক সিদ্ধান্ত নয়, সরকার চাইলে এই সিদ্ধান্ত আজকেই নিতে পারে, তাহলেই একমাত্র এই কাজটা হতে পারে। বাংলা একাডেমির বর্তমান যে-কাঠামো, সেই কাঠামোতে বাংলাদেশের প্রান্ত পর্যন্ত সাহিত্যকে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব নয়।

আমার শেষ প্রশ্নটি হলো, বর্তমান সরকার আসার পরেও যেসব নিয়োগ হয়েছে, বাংলা একাডেমি, শিল্পকলা একাডেমি, বাসস এগুলো তো আসলে উপর থেকে চাপিয়ে দেয়া হলো। তাহলে কি পুরোনো ধারাবাহিকতাই বহাল থাকলো না?

মোহাম্মদ আজম : এসব নিয়োগের ক্ষেত্রে পৃথিবীর কোথাও অন্য কোনো পদ্ধতি আছে কি না, আমি জানি না। তবে কেউ কেউ প্রস্তাব করেছে যে, ভিসি নিয়োগের ক্ষেত্রে যেমন সার্চ কমিটি করা হয়, এরকম একটা সার্চ কমিটি করা যেতে পারে। সমস্ত পৃথিবীর অভিজ্ঞতা থেকে মনে হয়, এটা বেটার পদ্ধতি হতে পারে, এটা অসম্ভব নয়।

রায়পুরায় দুই কিশোরীকে ধর্ষণের দায়ে অভিযুক্তদের বিচারের দাবিতে প্রতিবাদী মানববন্ধন

রায়পুরার চর আড়ালিয়ায় দুই কিশোরী ধর্ষণকাণ্ডের চারদিন কেটে গেলেও এখনো পর্যন্ত কোনো আসামিকে গ্রেফতার করা হয়নি। এই ঘটনার তীব্র ক্ষোভ জানিয়ে আজ সকাল ১০ টা ৩০ মিনিটে নরসিংদী প্রেসক্লাবের সামনে ‘সচেতন নাগরিক সমাজ, নরসিংদী জেলা’র ব্যানারে ধর্ষকদের দ্রুত গ্রেফতার ও বিচারের দাবিতে প্রতিবাদী মানববন্ধন আয়োজিত হয়। এই মানববন্ধনে নরসিংদী জেলার বিভিন্ন সংগঠন, ছাত্র-শিক্ষক ও সাধারণ জনতা অংশগ্রহণ করেন। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ (রায়পুরা ও বেলাব শাখা), পূর্ব বাঘাইকান্দী এসইএসডিপি মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রী ও শিক্ষকমণ্ডলী, নারী অঙ্গন, নরসিংদী প্রগতি লেখক সংঘ, নরসিংদী পরিবেশ আন্দোলন, চিন্তাস্বর ইত্যাদি সংগঠন ভিন্ন ভিন্ন ব্যানারে এতে অংশগ্রহণ করে।

রায়পুরা সরকারি কলেজের বাংলা বিভাগের প্রধান আরেফা ফেরদৌস বলেন, “আমাদের মায়েরা, শিশুরা, বোনেরা কোথাও নিরাপদ নয়। তাদের নিরাপত্তা রাষ্ট্রকে দিতে হবে। ধর্ষকদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। অভিযুক্তদের দ্রুত গ্রেফতার করতে হবে।”

পূর্ব বাঘাইকান্দী এসইএসডিপি মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবু মূসা ধর্ষকদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানিয়ে বলেন, মামলা হওয়ার ৪৮ ঘণ্টা পার হয়ে গেলেও এখনো কেন আসামিরা গ্রেফতার হয়নি? প্রশাসনের নীরব ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন রাখেন এবং সকল শিক্ষার্থী যেন নিরাপদে স্কুলে যাতায়াত করতে পারে, সেই দাবি জানান।

‘নারী অঙ্গন’-এর সম্পাদক নাদিরা ইয়াসমিন বলেন, “ধর্ষণ একটি মানবতাবিরোধী অপরাধ। এই অপরাধীদের বিচার সামাজিকভাবে সম্ভব কি? এখনো কেন ধর্ষকদের গ্রেফতার করা হয়নি?” ধর্ষণ বন্ধে রাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন রাখেন। সর্বশেষ তিনি অভিযুক্তদের দ্রুত গ্রেফতার ও বিচারের দাবি জানান।

শিক্ষক নেতা রঞ্জিত কুমার সাহা বলেন, “গত ৭ এপ্রিল সন্ধ্যায় এই গণধর্ষণের শিকার হয় দুই স্কুল ছাত্রী। পরবর্তীতে ৯ এপ্রিল মামলা করা হলেও ধর্ষণকারীদের গ্রেফতার করা হয়নি।” তিনি আরো বলেন, “যদি ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেফতার না করা হয়, তাহলে আমরা আরো কঠিন কর্মসূচি নিয়ে রাস্তায় নামবো। আমরা ডিসি অফিস ও এসপি অফিস বরাবর পদযাত্রা করবো।”

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের কেন্দ্রীয় সভাপতি রাবেয়া খাতুন শান্তি এই কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকারী সকলকে ধন্যবাদ জানান এবং বলেন, “ধর্ষণ একটি মানবতাবিরোধী অপরাধ। এই অপরাধের সর্বোচ্চ শাস্তি এবং সারাদেশে নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।”

এছাড়া আরো বক্তব্য রাখেন বীর মুক্তিযোদ্ধা শহিদুল্লাহ খন্দকার, নরসিংদী সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী রিমন, নরসিংদী সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী নুসরাত, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের নেত্রী জয়শ্রী সাহা, রায়পুরা সরকারি কলেজের শিক্ষক আমজাদ হোসেন, কবি ও নাট্যজন শাহ্ আলম, শিক্ষক ও লেখক তপন আচার্য্যসহ প্রত্যেকেই এই ধর্ষণকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানান এবং ধর্ষকদের দ্রুত গ্রেফতার ও বিচারের দাবি জানান।

উল্লেখ্য যে, নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার চর আড়ালিয়ায় গত সোমবার (৭ এপ্রিল ২০২৫) দুই কিশোরী ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। সেদিন বিকেলে ভুক্তভোগী কিশোরীরা দুই তরুণের সঙ্গে নৌকায় বেড়াতে যায়। সন্ধ্যায় দুই তরুণ নৌকা তীরে ভিড়িয়ে আনে ও কৌশলে দুই কিশোরীকে একটি বিদ্যালয়ের পিছনে নির্জন স্থানে নিয়ে যায়। তাদের আরো ছয় বন্ধুকে সেখানে ডেকে আনে। এরপর ভুক্তভোগী দুই কিশোরীকে ভয় দেখিয়ে দলবদ্ধভাবে ধর্ষণ করে সেখানেই ফেলে রেখে চলে যায়। পরবর্তীতে ভুক্তভোগী কিশোরী দুজন নিজ নিজ বাড়িতে ফিরলে তাদের এই অবস্থা দেখে পরিবারের লোকজন ঘটনা জানতে চাইলে তারা এই নৃশংস ঘটনার বর্ণনা দেয়। ভুক্তভোগী দুই কিশোরী পূর্ব বাঘাইকান্দী এসইএসডিপি মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী। অভিযুক্ত ধর্ষণকারীরা একই এলাকার প্রভাবশালী পরিবারের। ভুক্তভোগী পরিবার প্রথমে ভয়ে তাদের বিরুদ্ধে মামলা দিতে সম্মতি দেয়নি, তারা ওই এলাকার ইউপি চেয়ারম্যানের নিকট বিচারের দাবি জানান। তারপর দুদিন কেটে গেলেও বিচারের কোনো ব্যবস্থা হয় না, এ-অবস্থায় ভুক্তভোগী পরিবার গত বুধবার (৯ এপ্রিল ২০২৫) স্থানীয় থানায় ৮ জনের নাম উল্লেখসহ আরো ২/৩ জন অজ্ঞাতনামা আসামি করে দুটি মামলা দায়ের করে।

দৈনিক প্রথম আলোর তথ্যসূত্রে জানা যায়, দুটি মামলায় এজাহারভুক্ত আসামিরা হলেন ইমরান মিয়া (১৯), রাজ্জাক মিয়া (২৫), আবদুর রহমান (২৭), ইস্রাফিল মিয়া (২৩), সাইফুল মিয়া (২৮), রমজান মিয়া (২২), কাইয়ুম মিয়া (২১) ও মুন্না মিয়া (২৩)।

বঙ্গদেশের বাণিজ্যে বসতি

আমরা জানি, কল্পকথা এবং মিথের শক্তি কেমনভাবে সামষ্টিক নির্জ্ঞান (Collective Unconscious) তৈরি করে; বঙ্গসন্তানদের অক্ষমতার গল্প, হীনমন্যতা, অলস প্রকৃতি এবং চরিত্র হননকারী বানোয়াট মিথের পরিমাণ এতো বেশি যে, এখানে আসল কথাটি শুনলেই বানোয়াট মনে হয়। আর বানোয়াট গল্পকে তো আমরা সত্য মনে করে বসেই আছি। এমনই একটি চরম বানোয়াট প্রকল্প হলো বাঙালিকে আপাদমস্তক কৃষিজীবী হিসেবে চিহ্নিত করা। এই সামষ্টিক নির্জ্ঞান বা যৌথ অবচেতনের নির্মিত আর্কিটাইপ আমাদের সামগ্রিক সত্তাকে সূচিত করে। ইতিহাস ও সমাজবিজ্ঞানে কথিত আছে, আমাদের প্রায় সকল পূর্বসূরি ছিলেন কৃষক, দিনমজুর। ‘ভেন্নাপাতার ছানি দেয়া আসমানীদের ঘরে’ থাকতেন। অর্থাভাবে-অন্নাভাবে কখনো-সখনো উপোসও করতেন। দুর্ভিক্ষ প্রায় লেগেই থাকতো। পরতেন মলিন জামা-কাপড়। চরম অভাব ছিলো তাদের নিত্যসঙ্গী। আর আমরা তো আরেকটি প্রবাদ ঠোঁটস্থই রাখি যে, ‘অভাবে স্বভাব নষ্ট’। অতএব তার স্বভাব-চরিত্র ভালো হবার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই। অর্থাৎ বঙ্গবাসী মানুষজন অভাবী এবং চরিত্রহীন। আমাদের সিনেমা, সাহিত্য, শিল্পকলায়ও এই অভাব, গরীবানা, প্রতারণা, বঞ্চনা ও চরিত্রহীনতার কাহিনিই প্রধান প্রতিপাদ্য বিষয়। এভাবে বঙ্গসন্তানদের বোঝার জন্যে কৃষি ও কৃষিভিত্তিক জীবনকে বোঝার বুদ্ধিবৃত্তিক বাধ্যবাধকতা তৈরি করা হয়েছে। এটি প্রায় আপ্তবাক্যের মতো হয়ে ওঠেছে যে, এখানকার মানুষকে বুঝতে হলে কৃষি এবং কৃষককে বুঝতে হবে। আমাদের বিদ্বান-পণ্ডিতগণ প্রবল আত্মবিশ্বাসের সাথে এমন সম্পূর্ণ বিভ্রান্তিতে পড়ে আছেন। তারা এই দেশ, এই মাটি এবং এর মানুষজনের কিছুই পড়তে পারেননি। সাধারণ মানুষকে তারা সার্বক্ষণিকভাবে ভুল পথে পরিচালিত করছেন। বাঙলা অঞ্চলের মানুষ, তাদের ইতিহাস-দর্শন-সংস্কৃতি সম্পর্কে বিপুল অজ্ঞতা নিয়ে আমাদের বুদ্ধিজীবীরা জ্ঞান বিতরণ করছেন। আমাদের বুদ্ধিজীবীতার এই করুণ দশা এবং বিভ্রান্তিকর অবস্থা কীভাবে হয়েছে, সেসব লম্বা আলোচনা-পর্যালোচনার বিষয়, আপাতত আমাদের সেদিকে যাওয়ার সময় নেই।

একটি পুরো জাতিকে কৃষিজীবী বলে দেয়া; জাতির ইতিহাসকে কৃষকের ইতিহাস বলে দেয়ার ভেতরে রয়ে গেছে অনেক বড়ো মাপের ষড়যন্ত্র কিংবা ক্ষমার অযোগ্য নির্বুদ্ধিতা। কৃষি-অর্থনীতি বা কৃষকের সন্তান বলে গর্ব করার ভেতরে যে-বোকামিটুকু আছে, তাকে বিশ্বের অন্যান্য মানুষেরা পুঁজি করে আমাদের পদানত করতে পারে সহজেই।

পৃথিবীর সকল সভ্যতার সূচনাই কৃষিকে কেন্দ্র করে ঘটেছে। কিন্তু যারা শুধুই কৃষির উপর থেকে গেছে, তাদের বিশেষ কোনো পরিবর্তন হয়নি। যারা ক্রমান্বয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য-শিল্পের প্রসার ঘটিয়েছে, তারা অর্জন করেছে পর্যাপ্ত পরিমাণ সমৃদ্ধি। বঙ্গভূমি সভ্যতার প্রায় সূচনালগ্ন থেকেই ব্যবসা-বাণিজ্য-শিল্পের সাথে যুক্ত হয়েছে, কৃষি ছিলো তার সমর্থনে পার্শ্বচরের ভূমিকায়। কিন্তু কৃষিকে প্রধান চরিত্রে প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে ব্যবসা-বাণিজ্যকে ভুলিয়ে দেয়ার অর্থ হলো তাকে তার ইতিহাস থেকে বিচ্যুত করা। আমরা ইতিহাস বঞ্চিত দুর্ভাগা জাতি। ইতিহাস-ঐতিহ্য-শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হবার পরিণতি কী হয়, সেটি আজকের বাঙালি সমাজকে দেখলেই টের পাওয়া যায়। আর কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি বলার মাধ্যমে ব্যাপারটি এখানেই শেষ হয়ে যায় না। কেননা যিনি কৃষিজীবী, তার কিছু নির্দিষ্ট চরিত্র আছে, কৃষক বলার মাধ্যমে তার চরিত্রে সেইসব গুণাবলিও আরোপ করা হয়। কৃষক অপরিবর্তিত, অচল, রক্ষণশীল, স্থবির, যুগের পর যুগ ধরে একইভাবে একই পরিস্থিতিতে বসবাস করে। তার কোনো পরিবর্তন নেই। মহামতি কার্ল মার্কস যেই প্ররোচণায় এই অঞ্চলের মানুষ এবং তাদের ইতিহাসকে বলেছিলেন জড়িমাগ্রস্ত, উদ্ভিদপ্রতিম, ইতিহাসহীন, ধ্বংস করে দেয়ার উপযোগী। এর সাথে আমাদের শিল্প-সাহিত্য-দর্শনের একেবারে প্রাইমারি চরিত্রের গরীবানাও মুখ্য হয়ে ওঠেছে, আমাদের চিত্রশিল্প হয়ে যায় ফোক আর্ট, আমাদের চলচ্চিত্র হয় হাহাকার, আমাদের নাচ-গান-সাহিত্য হয় অতি সরল-তরল-স্থূল এবং বৈচিত্র্যহীন; কেননা কৃষক এর বেশি ভাবতে পারে না, এর বেশি নিতে পারে না, তার মাথার উপর দিয়ে যায়। রুচি-নন্দন-সৃজনের এখানে ভোক্তা কিংবা উৎপাদক কোনোটিই নেই, কেননা তারা কৃষক-কৃষিজীবী- কৃষকের সন্তান। কৃষকের কোনো আবিষ্কারের স্বপ্ন নেই, দু’বেলা দু’মুঠো অন্ন জোগাড়েই তার সময় শেষ হয়ে যায়, স্বপ্ন শেষ হয়ে যায়। কৃষক কোনো দূরদর্শী চিন্তায় সক্ষম নয়। অভিজ্ঞতাবাদী দার্শনিক ডেভিড হিউম যাদের উদ্দেশ্য করে বলেছেন, এরা জ্ঞান-বিজ্ঞান-আবিষ্কারের সক্ষমতা রহিত মানুষ। কৃষকের জমি, সার, বীজ, উৎপাদনের উপকরণ নিয়ন্ত্রণ করে ব্যবসায়ী। কৃষকের জীবন, চিন্তা, ভবিষ্যত ব্যবসায়ীর হাতে (কোনো জাতি কৃষক হলে তাকে নিয়ন্ত্রণ করে অন্য ব্যবসায়ী জাতি), কাজেই একটি পুরো জাতিকে কৃষিজীবী বলে দেয়া; জাতির ইতিহাসকে কৃষকের ইতিহাস বলে দেয়ার ভেতরে রয়ে গেছে অনেক বড়ো মাপের ষড়যন্ত্র কিংবা ক্ষমার অযোগ্য নির্বুদ্ধিতা। কৃষি-অর্থনীতি বা কৃষকের সন্তান বলে গর্ব করার ভেতরে যে-বোকামিটুকু আছে, তাকে বিশ্বের অন্যান্য মানুষেরা পুঁজি করে আমাদের পদানত করতে পারে সহজেই। তাই কৃষক বলে আবেগে গদগদ হবার যে-ক্ষতি, তার বিষয়ে সচেতন থেকে এই বিষয়ে কথা বলতে হবে। আমাদের কৃষি অবশ্যই আছে, কিন্তু এর অর্থ এমন কেন দাঁড়ালো যে, একমাত্র কৃষিই আছে? কেন ব্যবসার কথা বলা হচ্ছে না, এর গভীরে খতিয়ে দেখা দরকার। পৃথিবীকে এ-যাবতকালে যারা নেতৃত্ব দিয়েছে, তারা গভীরভাবে ব্যবসা-বাণিজ্য-শিল্পের সাথে জড়িত। এখনো বিশ্বের শক্তিশালী দেশগুলো মূলত ব্যবসায়ী। সারা বিশ্বের প্রায় সব অঞ্চল থেকে পঙ্গপালের মতো বাঙলায় ছুটে আসা মানুষজন বাঙলার ব্যবসায় ভাগ বসাতে এসেছে। পর্তুগিজ, ফরাসি, দিনেমার, ব্রিটিশ, গ্রিক, আরব বণিকেরা দূর-দূরান্ত থেকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এখানে ব্যবসা-বাণিজ্য করতে এসেছে, কাদের সাথে? স্থানীয় কৃষকদের সাথে (!)? ব্যবসা দখলকে কেন্দ্র করে এখানে হয়েছে প্রায় সকল যুদ্ধ, তাহলে সেই ব্যবসায়ী-বণিকদের ইতিহাস কোথায়? হঠাৎ তারা কোথায় উধাও হয়ে গেলো? এই ইতিহাস লোপাট হয়ে যাবার কারণ কী? কারা বাঙলার বাণিজ্যের ইতিহাস ভুলিয়ে দিতে চায়? কারা এই অঞ্চলকে ভুখা-নাঙ্গা-চরিত্রহীন অধঃপতিত দেখতে চায়? তাতে তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য কেমন রমরমা হয়ে ওঠে এবং লাভের ভাগ কীভাবে বেড়ে যায়, তার খোঁজ আমাদের রাখা দরকার।

নদীমাতৃক বাংলাদেশকে ভুলভাবে কেবল কৃষি অর্থনীতির একটি দেশ হিসেবে পরিচিত করানো হয়েছে। কৃষির বিকাশে নদীর অবদান যেমন অনস্বীকার্য, তেমনি শিল্প স্থাপনেও নদীর বিকল্প নেই। আধুনিক সময়ের উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা হয়তো এই সমস্যার অনেকটাই বিকল্প তৈরিতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু তিনভাগ জলের পৃথিবীতে শেষ বিচারে নদী, সমুদ্র বা জলপথই ভরসা। ইতিহাসের অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে বাঙলা অঞ্চলের অর্থনীতি কৃষিনির্ভর হয়ে পড়ায় সাধারণ বিবেচনায় আমরা ধরেই নিয়েছি, বাঙলা মূলত কৃষিজীবীদের দেশ এবং আমাদের সমাজতাত্ত্বিকদের বিশ্লেষণে তাই কৃষিমানসের বিশ্লেষণই লক্ষণীয় হয়ে ওঠেছে। কিন্তু আমাদের এটিও জানা থাকার কথা, ইংরেজরা এসে আমাদের মসলিন শিল্পীদের আঙুল কেটে নেয় এবং কাপড়ের কাঁচামাল উৎপাদন করে সেটি ইংল্যান্ডে পাঠাতে বাধ্য করে। স্থানীয় কলকারখানা বন্ধ করে দেয়া হয় অধ্যাদেশ জারি করার মাধ্যমে। কলকারখানা বন্ধ করে একটি শিল্পসমৃদ্ধ জাতিকে তাদের উৎপাদিত পণ্যের সাধারণ ক্রেতায় রূপান্তরিত করে। অর্থাৎ শিল্প ও বাণিজ্য বন্ধ করে দিয়ে কাঁচামাল উৎপাদনকারী কৃষকে পরিণত হতে বাধ্য করা হয়; ইতিহাসে এমন অপকর্মগুলোর শক্ত প্রমাণ রয়েছে। এসব বিষয়ের অনুপুঙ্খ বিবেচনায় না নিলে বাঙলার মানুষের বৈশিষ্ট্য নির্ণয়েও একটা বড়ো ফাঁক থেকে যাচ্ছে। কেননা কৃষক, শিল্পপতি আর বণিকের মানস কাঠামো এক নয়। বাঙলার অর্থনীতিতে কৃষির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকার পরেও কৃষিই প্রাচীন বাঙলার অর্থনীতির একমাত্র এবং প্রধান ভিত্তি নয়। বর্তমান পৃথিবীতে, বিশেষত বাংলাদেশে কৃষি অর্থনীতির শ্রমিক অর্থাৎ কৃষকের মর্যাদাও একেবারে তলানির দিকে। কেউ কৃষকসন্তান হলে তার সামাজিক মর্যাদা বণিকসন্তান, শিল্পপতিসন্তান বা চাকুরিজীবীর সন্তানের চেয়ে অনেক নিচেই থাকে। কেননা মনস্তাত্ত্বিকভাবে অবচেতন মানসেই আমরা তাকে অবহেলাযোগ্য বলে মনে করি। কৃষি অর্থনীতিই আমাদের মূল অর্থনৈতিক ভিত্তি চিহ্নিত করার ভেতরে কাজ করে একটা সুস্পষ্ট অবজ্ঞার সুর। তাই আমাদের দেখার দরকার আছে, প্রাচীন বাঙলার অর্থনৈতিক ভিত্তি আসলেই কি শুধু কৃষি ছিলো? আমরা যে সোনার বাঙলার কথা বলি, সেই সোনার বাঙলা কি শুধুই কৃষিনির্ভর ছিলো? অবশ্য সোনার বাঙলা নিয়েও অনেক ইতিহাস-দর্শন-সংস্কৃতি-সমাজমূর্খ বুদ্ধিজীবীর প্রবল তাচ্ছিল্য আছে। প্রাচীন ইতিহাসের সচেতন পাঠক মাত্রই জানেন, বাঙলার অর্থনীতিতে কৃষি এবং শিল্প— দুটোই ছিলো সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ, শুধু তা-ই নয়, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ছিলো শিল্প ও বাণিজ্যের প্রাধান্য। মধ্যযুগের সাহিত্যে নায়ক হলো চাঁদ সদাগর, সীমান্ত সদাগর, ধনপতি সদাগর— এরা। তারা বাণিজ্য করতে যান চীন জাপান সিংহলে। আমাদের সামষ্টিক নির্জ্ঞানে বাণিজ্যের স্মৃতি জাগরিত আছে। তাম্রলিপ্ত এবং চন্দ্রকেতুগড়ে গ্রেকো-রোমান শিল্পকলারও ছাপ পাওয়া যায়, কেননা তখন বাণিজ্য চালু ছিলো। ছিলো বৈশ্বিক আদান-প্রদান।

সেই অতীতের অনেক কিছুই আমরা বেমালুম ভুলে বসে আছি। সুপ্রাচীনকাল থেকেই বাঙলার সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বিস্তৃত ছিলো সমগ্র পৃথিবীর। মানুষের প্রাচীনতম সভ্যতা হিসেবে বিবেচনা করা হয় মেসোপটেমীয় সভ্যতাকে। পারস্য উপসাগর, আরব সাগর হয়ে সুমেরীয়, কেলডীয়, আক্কাদীয়, ব্যবিলনীয় এবং মিশরীয় সভ্যতার জনগোষ্ঠীর সাথে বাঙলার বণিকদের ছিলো পণ্য আদান-প্রদানের সম্পর্ক। ক্রিট দ্বীপপুঞ্জ, রোমান, গ্রিকদের সভ্যতার সাথে ছিলো বাণিজ্য সম্পর্ক। সেইসব সময়ের অনেক নথিপত্র, প্রত্নতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক দলিল-দস্তাবেজও রয়েছে বিস্তর। কিন্তু বিশ্ব পরিস্থিতি পাল্টে গেলে বাঙলার বণিকদেরও সুদিন ফুরিয়েছে। দুর্গম জলপথে জলদস্যুদের আক্রমণের হার বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে বাঙলার ব্যবসায়ী সমাজ পশ্চিমের দেশগুলোর সাথে বাণিজ্য বর্জন করে সিংহল, যবদ্বীপ, মালয় প্রভৃতি দেশের সঙ্গে বাণিজ্য করতে আরম্ভ করেছিলো। ষোড়শ শতাব্দী থেকে পর্তুগিজ ও মগ দস্যুদের আক্রমণ বাড়তে থাকে। বস্তুত ষোড়শ শতাব্দীর পর থেকে বাঙালি বণিকদের বৈদেশিক বাণিজ্য প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। জলদস্যুদের আক্রমণে অতিষ্ঠ হয়ে বাঙলার বণিকসমাজ ধীরে ধীরে সমুদ্রবাণিজ্যে আগ্রহ হারাতে থাকে। তবে শিল্প ও বাণিজ্যে আগ্রহী অপরাপর জাতিগোষ্ঠীর লোকেদের আগমন বাড়তে থাকে এই অঞ্চলে। অর্থাৎ ব্যবসা-বাণিজ্যের ধরন পাল্টালেও সেটি একেবারে বন্ধ হয়ে যায়নি। কৃষির গুণগান গাইতে গাইতে আমরা ভুলতে বসেছি শিল্প ও বাণিজ্যসমৃদ্ধির গৌরবময় ইতিহাস। আমাদের সামষ্টিক নির্জ্ঞানে এগুলো রয়ে গেছে, যখন বহির্বাণিজ্য নেই, তখনো চাঁদ সদাগরেরা চলে যায় সিংহলে।

আমাদের লোককাহিনিগুলো লক্ষ্য করলে দেখা যাবে সওদাগরদের প্রবল উপস্থিতি। চাঁদ সদাগরের প্রভাব ও প্রতিপত্তির কথা আমরা জানতে পারি, যখন সে স্বয়ং দেবীকেই প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করে, যদিও পরিণামে তার বশ্যতা স্বীকার করতে হয়েছে। কিন্তু সওদাগরের বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে থাকার ভিত্তি হলো নৌ-বাণিজ্যের অর্থনৈতিক শক্তি। পূর্ববঙ্গ গীতিকায় সাগর পাড়ি দেয়ার আছে বহু গল্প। প্রাচীন ব্রতকথাগুলোতে দেখা যাবে, বাবা-ভাই-স্বামীর বাণিজ্যযাত্রা নিয়ে বাড়িতে থাকা মেয়েরা স্বজনের মঙ্গলকামনা করছে, ব্রত পালন করছে, সুরে সুরে গাইছে মঙ্গলগীতি :
“ভেলা! ভেলা! সমুদ্রে থেকো
আমার বাপ-ভাইকে মনে রেখো!”
অথবা
“সাগর! সাগর! বন্দি।
তোমার সঙ্গে সন্ধি।
ভাই গেছেন বাণিজ্যে,
বাপ গেছেন বাণিজ্যে,
সোয়ামি গেছেন বাণিজ্যে।
ফিরে আসবেন আজ…”
কিংবা
“কাগা রে! বগা রে! কার কপাল খাও?
আমার বাপ-ভাই গেছেন বাণিজ্যে, কোথায় দেখলে নাও?”

মধ্যযুগের বাঙলা সাহিত্য, বাঙলার প্রাচীন বিভিন্ন লিপিমালা এবং সংস্কৃত সাহিত্যে বাঙালির নৌ-বাণিজ্যের প্রচুর প্রমাণ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। একটি সমৃদ্ধ জাতির অর্থনৈতিক ক্ষমতার ভিত্তি শুধু কৃষির উপর দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। কৃষির যেমন কিছু ভৌগোলিক ও প্রাকৃতিক সীমাবদ্ধতা আছে, যা কাটিয়ে ওঠা অত্যন্ত দুরূহ, ব্যবসায় তেমন নয়। তাই সমৃদ্ধ প্রাচীন বাঙালির যে-ইতিহাস আমরা পাই, তা শুধুই কৃষিনির্ভর ভাবার অবকাশ নেই। নীহাররঞ্জন রায় তাঁর ‘বাঙালীর ইতিহাস আদিপর্ব’তে উল্লেখ করেছেন, “মৌখরী-রাজ ঈশানবর্মের হড়হা লিপিতে (ষষ্ঠ শতকের দ্বিতীয় পাদ) গৌড়দেশবাসীদের (গৌড়ান্) “সমুদ্রশ্রয়ান্” বলা হইয়াছে; […] সামুদ্রিক বাণিজ্যই যাহার আশ্রয়। কালিদাস রঘুবংশে রঘুর দিগ্বিজয় প্রসঙ্গে বাঙালীকে “নৌসাধনোদ্যতান্” বলিয়া পরিচয় দিয়াছেন। পাল ও সেন বংশের লিপিমালায় নৌবাট, নৌবিতান প্রভৃতি শব্দ তো প্রায়শ উল্লিখিত হইয়াছে। এই উভয় রাজবংশের, এবং সমসাময়িক বাঙলাদেশের অন্যান্য রাজবংশেরও, সামরিক শক্তি নৌবলের উপর অনেকটা নির্ভর করিত; ইহার উল্লেখ তো অনেক শিলালিপিতেই আছে। বৈদ্যদেবের কমৌলি লিপিতে নৌযুদ্ধের বর্ণনাও আছে।”

আভ্যন্তরীণ এবং আন্তঃদেশীয় বাণিজ্যে প্রধান বাহনই ছিলো নৌযান। ব্যবসা-বাণিজ্য এবং সীমান্ত রক্ষা ও যুদ্ধের প্রয়োজনেও ব্যবহৃত হয়েছে বিভিন্ন আকার ও নকশার নৌকা। নৌকার সাথে, নদীর সাথে বাঙালির জীবন আষ্টেপৃষ্ঠে জড়ানো। সমুদ্রগামী সুবিশাল নৌকা বা জাহাজ তৈরিতে বাঙালির দক্ষতাও ছিলো বিশ্বের অপরাপর জাতির কাছে সুবিদিত। বাঙলার নানা স্থানে নৌকা ও জাহাজ নির্মাণের কেন্দ্র ছিলো, বিশেষ করে ঢাকা ও চট্টগ্রামে। কবিকঙ্কন মুকুন্দরাম তাঁর চণ্ডীমঙ্গলে বলেছেন যে, কখনো কখনো নৌকাগুলি ৩০০ গজ লম্বা ও ২০০ গজ চওড়া হতো। দ্বিজ বংশীদাস তাঁর মনসামঙ্গলে ১০০০ গজ লম্বা নৌকার কথাও বলেছেন। চীনা পরিব্রাজক মাহুন্দের লেখনী থেকে জানা যায়, তুরস্কের সুলতান আলেকজান্দ্রিয়ার জাহাজ নির্মাণ পদ্ধতিতে অসন্তুষ্ট হয়ে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম থেকে জাহাজ নির্মাণ করিয়ে নিয়েছিলেন। বাংলাদেশ নদ-নদীবহুল হওয়ায় স্বভাবতই বাঙলার মানুষের প্রধান বাহন হয়ে ওঠে নৌকা আর বাণিজ্যের জন্যে জাহাজ। অক্ষয়কুমার দত্ত প্রণীত ও শ্রীরজনীনাথ দত্ত সম্পাদিত ‘প্রাচীন হিন্দুদিগের সমুদ্রযাত্রা ও বাণিজ্য বিস্তার’ নামক গ্রন্থে ভারতীয় তথা এই অঞ্চলের মানুষের নৌ-বাণিজ্যের বেশ জোড়ালো স্বাক্ষ্য পাওয়া যায় : “ঋগ্বেদ যে অতি প্রাচীন গ্রন্থ, তাহা ব্যক্তিমাত্রেরই বিশ্বাস আছে। এই সুপ্রাচীন গ্রন্থে অর্ণবপোত, বাণিজ্য ও বণিকদিগের সমুদ্রযাত্রা-সম্বন্ধীয় প্রসঙ্গ দেখিতে পাওয়া যায়। উক্ত গ্রন্থের প্রথম-মণ্ডলস্থ পঞ্চবিংশতি সূক্তের রচয়িতা মহর্ষি শুনঃশেফ বরুণ দেবের কীর্ত্তন করিতে করিতে বলিয়াছেন যে, ‘সমুদ্র-মধ্যে যে স্থানে পোত-সমূহের যাতায়াতের জন্য পথ আছে, তাহা বরুণ দেব অবগত আছেন। …উক্ত গ্রন্থের প্রথম-মণ্ডলের ছাপান্ন সূক্তটি ঋষিবর শৈব্য দ্বারা রচিত। বণিকেরা যে সমুদ্রযাত্রা করিত, তাহা মহর্ষি প্রকাশ করিয়াছেন।’” মানব ইতিহাসের প্রাচীনতম গ্রন্থ ঋগ্বেদ থেকে শুরু করে লিখিত এবং প্রত্নতাত্ত্বিক প্রাচীন প্রামাণ্য দলিলসমূহ থেকে বেশ স্পষ্টভাবেই বোঝা যায়, এই অঞ্চলের মানুষের ব্যবসা-বাণিজ্যের রয়েছে সমৃদ্ধ অতীত।

বাঙলা ও বাঙালির সাম্প্রতিক দুর্দশার পেছনেও অনুঘটক হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে এই শিল্পসমৃদ্ধির বয়ান। বিদেশি পর্যটক এবং ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে বাঙলার ধন-রত্নের গল্প যখন বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে, তখনই বিভিন্ন দস্যুবৃত্তিতে অভ্যস্ত জাতিগোষ্ঠী এবং পৃথিবীর নানা প্রান্তে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা বিবেক-বিবেচনাহীন অর্থলোভী লুটেরার দল এই অঞ্চলে আসতে থাকে, তাদের নানা মুখোশ; কেউ ধর্মপ্রচারক, কেউ ব্যবসায়ী, কেউ পরিব্রাজক, কেউ-বা নিতান্তই ভবঘুরে; কিন্তু সবার সেই একই উদ্দেশ্যÑ কিছুটা উন্নত জীবন উপভোগের সুযোগ লাভ করা। ‘গঙ্গাঋদ্ধি’ রাজ্যের প্রভাব-প্রতিপত্তির গল্প এতোটাই ছড়িয়েছিলো যে, বিশ্বজয়ী আলেকজান্ডার এখানে রাজ্য বিজয়ের নামে অভিযান পরিচালনার সাহস সঞ্চয় করতে না পেরে ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন। এই শিল্পসমৃদ্ধি আবার অনেকের ঈর্ষার পাত্রও করে তুলেছিলো বাঙলা অঞ্চলকে। আগত আর্যরা যেমন দীর্ঘদিন বাঙলাকে করায়ত্ত করতে না পেরে বিভিন্নভাবে বাঙলার নামে দুর্নাম রটিয়েছে। অক্ষমতার লজ্জাকে ঢাকতে বাঙলাকে বলেছে অসুরদের অঞ্চল, যেখানে কেউ ভ্রমণ করলে প্রায়শ্চিত্ত করতে হতো। মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান তাঁর ‘গঙ্গাঋদ্ধি থেকে বাংলাদেশ’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন : “হিন্দু ধর্মশাস্ত্র-পুরাণ-উপাখ্যানে উপেক্ষিত গঙ্গাঋদ্ধি ভাস্বর হয়ে আছে কার্তিয়াস, দিওদোরাস, প্লুতার্ক প্রমুখ গ্রিক লেখকদের ইতিবৃত্তে, স্ট্রাবো ও টলেমি ভূগোলবৃত্তান্তে, আর ভার্জিলের মহাকাব্যে। ভার্জিল ভেবেছিলেন তাঁর জন্মভূমি মালটুয়ায় ফিরে গিয়ে এক মর্মর মন্দির স্থাপন করবেন এবং মন্দির চূড়ায় স্বর্ণ-গজ-দন্তে গেঁথে দেবেন গঙ্গাঋদ্ধির বীরত্ব গাথা।”

বাংলাদেশের প্রাচীন পরিচয় ‘গঙ্গাহৃদয়’ বা ‘গঙ্গাঋদ্ধি’ নামে। এর হৃদয় গঙ্গার মতোই সুবিশাল। অনন্তকাল ধরে বহমান। উদার চিত্তে সবার পাপ-তাপ ধুয়ে পবিত্র করে দিচ্ছে। অথচ এর সন্তানেরা অনবরত নিমগ্ন হয়ে যাচ্ছে বহিরাগত পঙ্কিল স্রোতের প্রচণ্ড গরলে। অবোধ শিশুর মতো ঝাঁপিয়ে পড়ছে খরখরে মরুভূমি ও কনকনে বরফের প্রাণহীন শুষ্কতায়। গঙ্গাহৃদয় জানে, এই শিশুরা একদিন বড়ো হবে, আবার অধোবদনে এসে দাঁড়াবে তার সামনে, কিন্তু তাদের অবাক করে দিয়ে গঙ্গাহৃদয় তাদের স্থান করে দেবে অনন্ত মিঠাপানির আদি ও অকৃত্রিম ভালোবাসায়। আমাদের ইতিহাস আছে, তবে ইতিহাসের গৌরবময় অধ্যায় আত্মস্থ করতে ব্যর্থ হলে আত্মপরিচয় তৈরি হয় না। প্রকৃত আত্মপরিচয়ের যথার্থ ছায়াতলে আজ অথবা আগামীকাল আমাদের ফিরে আসতেই হবে।

কিন্তু আমাদের দীর্ঘকালের পরাধীনতা, অন্যদের দেয়া খুদকুঁড়া, উচ্ছিষ্ট ভোগের লোভ, ভিক্ষার ফুটা পয়সার মতো বিবিধ তত্ত্ব ও তথ্যের অনুকরণ আমাদের মানসিক বিকৃতি তৈরি করেছে। এই অবস্থায় আমরা নিজেদের দেখতে পাই না, যতোটুকু দেখতে পাই, সেইটুকু পুরোপুরি বিভ্রান্ত করে ছাড়ে। আমাদের একটি সামষ্টিক অবিশ্বাস এবং সংশয় আছে যে, আমরা আসলেই কারা? সমস্যার শেকড়ে আমাদের প্রবেশের সক্ষমতা নেই, ফলে আমাদের বুদ্ধিজীবী-পণ্ডিত-বিদ্বানগণ ভুল পথে হাঁটছেন, ভুল রোগের ভুল চিকিৎসা দিয়ে ভুক্তভোগীর জীবনকে মর্মান্তিক করে তুলছেন। কবি নজরুল অনেকটা আক্ষেপের সাথেই বলে গেছেন, “পরাধীনতার মতো জীবন হননকারী তীব্র হলাহল আর নাই। অধীনতা মানুষের জীবনীশক্তিকে কাঁচাবাঁশে ঘুণ ধরার মতো ভুয়া করিয়া দেয়। ইহার আবার বিশেষ বিশেষত্ব আছে, ইহা আমাদিগকে একদমে হত্যা করিয়া ফেলে না, তিল তিল করিয়া আমাদের জীবনী-শক্তি, রক্ত-মাংস-মজ্জা, মনুষ্যত্ব, বিবেক সমস্ত কিছু জোঁকের মতো শোষণ করিতে থাকে। আখের কল আখকে নিঙড়াইয়া পিষিয়া যেমন শুধু তাহা শুষ্ক ছ্যাবা বাহির করিয়া দিতে থাকে, এ অধীনতা মানুষকে তেমনই করিয়া পিষিয়া তাহার সমস্ত মনুষ্যত্ব নিঙড়াইয়া লইয়া তাহাকে ওই আখের ছ্যাবা হইতেও ভুয়া করিয়া ফেলে। তখন তাহাকে হাজার চেষ্টা করিয়াও ভালোমন্দ বুঝাইতে পারা যায় না। আমাদেরও হইয়াছে তাহাই। আমাদিগকে কোনো স্বাধীনচিত্ত লোক এই কথা বুঝাইয়া বলিতে আসিলেই তাই আমরা সাফ বলিয়া দিই, ‘এ লোকটার মাথা গরম!’”

এখন থেকে আরো শত বছর আগেই কবি কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর ‘আমাদের শক্তি স্থায়ী হয় না কেন?’ প্রবন্ধে এ-কথা বলে গিয়েছেন। আশ্চর্য ব্যাপার, নজরুল এতো সাবলীলভাবে এমন নিরেট সত্য কথাগুলো বলেছেন তাঁর সমাজের মানুষকে। এবং নিশ্চিতভাবেই এ-কারণে তাঁকে নিগৃহীত হতে হয়েছে। ফলে তাকে শুনতে হয়েছে, ‘এ লোকটার মাথা গরম!’


দ্রাবিড় সৈকত
সহযোগী অধ্যাপক, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়