Home Blog

হাবিবুল্লা পাঠানের কাছে গেলাম, যন্ত্র-রাষ্ট্রের খবর জানতে

0

মুহাম্মদ হাবিবুল্লা পাঠান। ইতিহাসে নিবেদিত যার চোখ ও হৃদয়। থাকেন নিজের গ্রামেই, যে-গ্রামে তাঁর জন্ম, বেড়ে ওঠা আর দৃপ্তভরে পদচারণা ৮৭ বছর ধরে। ৮৮ বছরে পা দিলেন এ-বছর ফেব্রুয়ারির ৭ তারিখে। নিজের গ্রাম আর গ্রামের মাটি তাঁর আরাধ্য বিষয়। মাটির গভীরে সঞ্চিত রাখা আছে যে-মহাকালিক অতীত; যে-অতীতের কোনো হদিস জানা ছিলো না কারোরই, তা তিনি ধীরে ধীরে মাটির উপরে পাদপ্রদীপের আলোয় উন্মোচিত করেছেন থরে থরে। সবাই বিস্মিত হয়েছে।

এটা তাঁর গ্রাম, বটেশ্বর। এখানেই থাকেন তিনি, তাঁর পথপ্রদর্শক পিতার ভূমিতে, যে-পিতা তাঁকে হাতেখড়ি দিয়েছেন কেবল মাটির দিকে গভীর অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে তাকিয়ে থাকার এক অবিনাশী অভ্যাসের, যা এই ৮৭ বছর বয়সেও এক মুহূর্তের জন্যে বিস্মৃত হতে পারছেন না।

আমরা কয়েকজন বাইকে চেপে চলে গেলাম গাছপালার অফুরান স্নেহচ্ছায়াঘেরা গ্রাম বটেশ্বরে। তখন দ্বিপ্রহর। খুঁজে পেতে কষ্ট হয় না এই বাড়ি। ১৯৭৪ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘বটেশ্বর প্রত্ন সংগ্রহশালা ও গ্রন্থাগার’ নামের চৌচালা টিনশেড ঘরটি দু’ কক্ষ বিশিষ্ট। হাবিবুল্লা পাঠান গত সাত দশক ধরে যা কুড়িয়েছেন মাটির নিচ থেকে আর আশপাশের গ্রামের নানা মানুষজনের নিকট থেকে, তা এখানে সঞ্চিত করে আগলে আছেন। আমরা যখন পৌঁছুলাম, তখন তিনি এর একটি কক্ষের চৌকিতে ঘুমোচ্ছেন। আমরা অপেক্ষা করছিলাম তাঁর জেগে ওঠার। আমরা জানতাম, তিনি ইদানিং প্রায়ই নানা অসুখে ভুগছেন। শরীর ও মন কোনোটাই তাঁর স্বস্তি শান্তি আর নিরুদ্বিগ্ন নাই— এগুলো আমরা আগেই জানতাম।

যাবতীয় আলাপ-সালাপের পর ঘুরে-ফিরে সেই একই জায়গায় তিনি এবং আমরা মিলিত হই, আর তা হচ্ছে— তাঁর দেহাবসানের পর কী হবে সবকিছুর? তিনি এবং আমরা যে-শব্দ উচ্চারণ করে তৃপ্তি (!) ও বিষাদাক্রান্ত হই, তা হলো, ‘লোপাট’, ‘বেহাত’, ‘দখল’ ইত্যাদি!

ঘুম থেকে জেগেই সহজাত ভঙ্গিতে কথা বলা শুরু করলেন। তাঁর পিতার কথা, তাঁর কথা, নানা ধরনের প্রত্নসামগ্রী সংগ্রহের গল্প। আমাদের প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছেন। জানালেন তাঁর মনের ভেতর সবসময়ই চেপে রাখা সেই অমোঘ অভিমান ও ক্ষোভের অনল! তাঁর মারা যাবার পর কী হবে এইসব সাতদশকের তিল তিল করে গড়ে তোলা সঞ্চিত রত্নরাজির! তিনি কোনো আশার আলো দেখতে পান না। পরিবারেও এমন কেউ নেই এগুলো যত্ন আর ভালোবাসার শক্তিশালী রক্ষাব্যূহ হয়ে আগলে রাখার। আর সরকারের বা রাষ্ট্রের কাছে আবেদন করে করে আর কিছু লাভ নাই আর! আর কতো! এটা তো বেদনাদায়ক আরেক উপাখ্যান! যেমন ‘জাদুঘর’। গোটা সময় আমরা লক্ষ্য করেছি, এই বিষয়ে তিনি কথা বলতে ইচ্ছুক না। সরাসরি বলেননি, কিন্তু আমরা প্রসঙ্গ তুললেই তিনি কথা অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেন। আমরা বুঝতে পেরেছি, তিনি এ-বিষয়ে কতোটা হতাশ আর বিরক্ত!

উয়ারী-বটেশ্বর-টঙ্গীরটেকসহ গোটা অঞ্চলেই প্রত্নতাত্ত্বিক খননের মাধ্যমে যেসব সামগ্রী পাওয়া গেছে এবং হাবিবুল্লা পাঠানের কাছে যেসব সামগ্রী সঞ্চিত আছে, সব সংরক্ষিত থাকার জন্যে একটি ‘জাদুঘর’ নির্মাণের ব্যবস্থা গ্রহণ করে সরকার আর সরকারের প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর। নামও ঠিক করে ‘গঙ্গাঋদ্ধি জাদুঘর’। ২০১৯ সালে এই জাদুঘরের কাজ শুরু হয় এবং তা এক বছরের মধ্যেই সমাপ্ত হবার কথা। কিন্তু হায়, সাত বছর অতিবাহিত হলেও এটির কাজ সমাপ্ত হবার প্রসঙ্গ তো অনেক দূরের আলাপ, বরং যতোটুকু শেষ হয়েছে, তা-ও অযত্ন-অবহেলায় পতিত স্থাপনায় পরিণত হয়েছে।

মুহাম্মদ হাবিবুল্লা পাঠান কথা বলছিলেন আমাদের সাথে। তাঁর ঘরে। যেখানে দুটি বড়ো সাইজের শেলফে কাচবন্দী আছে তাঁর আহরিত রত্নভাণ্ডার। উয়ারী ও বটেশ্বর এবং গোটা প্রত্নঅঞ্চল থেকে ৭০ বছর ধরে সংগ্রহ করা আড়াই হাজার বছর আগেকার বহুবিচিত্র সামগ্রী, যেমন : বঙ্গভারতের দুর্লভ নিদর্শন বিষ্ণুপট্ট, ব্রোঞ্জ বা তামার তৈরি অনুপম শিল্পমণ্ডিত ধাবমান অশ্ব, বৌদ্ধ-শৈব নৈবেদ্যপাত্র, পাথরের বাটখারা, কচ্ছপ, হস্তী, হাঁস, পোকা, ফুল, অর্ধচন্দ্র প্রভৃতি মন্ত্রপুত কবচ, পোড়ামাটির তৈরি কিন্নর, বিভিন্ন জীবজন্তুর প্রতিকৃতি, স্বল্পমূল্যবান পাথর ও কাচের পুঁতি ইত্যাদি।  এসব সামগ্রীই যে এই শেলফে আছে এমন নয়। তবে আছে, গোপন শেলফে। চারদিকে সুশীল প্রত্নপ্রেমিকের ছদ্মবেশে তস্করের ছড়াছড়ি। বলছিলেন তিনি। পুঁতির মালা আর কয়েক ধরনের পুঁতি নিয়ে তাঁর ব্যক্তিগত গবেষণা এখনো চলমান।

কথা বলছিলাম ধীমান বয়স্ক এক প্রত্ম আর ইতিহাসের নিবেদিতপ্রাণ ঋষির সাথে। আমরা কয়েকজন। ফাঁকে ফাঁকে চলছে চা-নাস্তা পর্ব। তিনি এই বয়েসেও যে-মাত্রায় ধূমপান আঁকড়ে ধরে আছেন, তা দেখাও এক বিস্ময়!

তিনি বলছিলেন তাঁর জীবনের নানা অভিজ্ঞতার সারাৎসার। তাঁর ভাটকবিতা প্রকাশের গল্প, কয়েক খণ্ড লোককাহিনি সংগ্রহের বিচিত্র ও অভূতপূর্ব অভিজ্ঞতার কথা, গাজীপুরের মেয়েলি গীত সংগ্রহ করতে গিয়ে কীরকম হেনস্তার শিকার হয়েছেন, সেসব ঘটনা শুনতে শুনতে আমরা বুঝতে চেষ্টা করি তাঁর সমগ্র জীবনের অমোঘ ঝোঁক ও নেশার মতো লেগে থাকা  এক সংগ্রাহক আর সংকলকসত্তার ভেতরটা। তবে সম্পূর্ণ বুঝতে পারাটা এতোটা সহজ তো নয়— এটা জানি।

যাবতীয় আলাপ-সালাপের পর ঘুরে-ফিরে সেই একই জায়গায় তিনি এবং আমরা মিলিত হই, আর তা হচ্ছে— তাঁর দেহাবসানের পর কী হবে সবকিছুর? তিনি এবং আমরা যে-শব্দ উচ্চারণ করে তৃপ্তি (!) ও বিষাদাক্রান্ত হই, তা হলো, ‘লোপাট’, ‘বেহাত’, ‘দখল’ ইত্যাদি!

তাঁর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আমরা বাড়ির পাশেই ‘গঙ্গাঋদ্ধি জাদুঘর’ নামক শাপগ্রস্ত সেই স্থাপনার ভেতর যাই। দেখি জঙ্গলাকীর্ণ ধুলা আর বহুস্তর বিশিষ্ট মাটিতে মুছে যাওয়া স্থাপনার নকশাবোর্ড, ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের পিলার…। সমগ্র স্থাপনাটির নকশা, ডিজাইন ও পুরো জাদুঘরের পরিকল্পনায় আমরা মুগ্ধ হই। কিন্তু এটা এখন গোচারণভূমি আর গাঁজাখোরদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে, দেখলেই বোঝা যায়। রাষ্ট্রের বা জনগণের কোটি কোটি টাকার কী শ্রাদ্ধশান্তি!

২০১৯ সালে শুরু হওয়া ‘গঙ্গাঋদ্ধি জাদুঘর’-এর নির্মাণাধীন স্থাপনা

রাষ্ট্র সরকার সংস্কৃতিমন্ত্রণালয় প্রত্নতত্ত্বঅধিদপ্তর গবেষক লেখক মন্ত্রী জেলাপরিষদ ঠিকাদার ইঞ্জিনিয়ার শ্রমিক… আরো কিছু পার হয়ে, এবং এদের প্রত্যেকের অভ্যন্তরে আরো অনেক লাভালাভের গল্প-টানাপোড়েন কতো কতো সংঘাত-সংকট পেরিয়ে হাবিবুল্লা পাঠানের আগলে রাখা সঞ্চিত সম্পদ ওখানে কী করে পৌঁছুবে— রাষ্ট্রের জনগণের জন্যে প্রদর্শনের, গবেষণার, শিক্ষা লাভের, সর্বোপরি একটা জাতির সভ্য হবার শর্তগুলো পূরণ হওয়া পর্যন্ত কতো আর অপেক্ষা করতে হবে, তা এই জাতি আসলেই হয়তো জানে না। সিস্টেম মানুষের উপকারের জন্যে, শৃঙ্খলাপূর্ণ পদ্ধতিচর্চার সহায়ক হবার জন্যে। সিস্টেম মানুষের জীবনীশক্তি, ধৈর্যশক্তি নিঃশেষ করার জন্যে নিশ্চয়ই নয়!

এই রাষ্ট্রের সিস্টেম নিয়ে আলাপ করতে করতে আমরা উয়ারী গ্রামে যাবার মনস্থির করলাম। যে-গ্রামে উৎখনন হয়েছিলো কয়েক দফায়, এবং মূলত, এই উৎখননের ফলেই খুলে যায় এক প্যান্ডোরার বাক্সের; আবিষ্কৃত হয় আড়াই হাজার বছর আগেকার এক দুর্গনগরীর, যেটা ছিলো মূলত টলেমি বর্ণিত গঙ্গারিডাই জাতির এক মহাবাণিজ্য বন্দর।

আমরা চলছিলাম দুটো বাইকে চড়ে, পাঁচজন। সেখানে আমাদের জন্যে অপেক্ষা করছে কী যে অদ্ভুত বাংলাদেশ, তা তখনো আমাদের ধারণায় ছিলো না। ঘনবসতিপূর্ণ নয় এখনো, এরকম গ্রামাঞ্চল পার হচ্ছি আমরা প্রচুর গাছপালার ছোটো ছোটো উদ্যান পেরিয়ে, বুকে নির্মল বাতাস ভরে নিয়ে, অপরাহ্ণের শেষ আলোয়।

উয়ারী গ্রামের এই খননকৃত জায়গাটিতে পৌঁছুতে হলো আমাদের দু’ঘর গ্রামবাসীর উঠোনের উপর দিয়ে, অনেক দ্বিধার সাথে। একটা প্রত্নস্থানে প্রবেশের পথ কেন এরকম, ভাবতে ভাবতে আমরা ঢুকে গেলাম প্রাচীর ঘেরা একটি স্থানে। এই সেই স্থান, যেটাতে এই শতাব্দীর প্রথম দশকে কয়েক দফায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষক, গবেষক ও শিক্ষার্থীদের মিলিত প্রচেষ্টায় অনেক দফায় খননকার্য পরিচালনার মাধ্যমে যে-ইতিহাস উন্মোচিত হয়েছে, তাতে ‘বাঙলার ইতিহাস’ নূতন করে রচনা করতে হচ্ছে ইতিহাসবিদ ও গবেষকদের। এসব কথা আমাদের অনেক আগেই জানা ছিলো। মোটামুটি সবাই জানে এসব কথা। গত ১৫-২০ বছর ধরেই জানে। কিন্তু এ কী তার রূপ! প্রায় জঙ্গল হয়ে যাওয়া একটা কবরস্থানের মতো মনে হলো। কিন্তু কবরস্থানে বাচ্চাদের অ্যামিউজমেন্ট পার্ক! হ্যাঁ, এটা সত্যি যে, এখানে এই স্বল্পপরিসর জায়গাটিতে বাচ্চাদের খেলাধুলা করার জন্যে স্থাপন করা হয়েছে স্লিপার, দোলনা, খেলনা হাতি-ঘোড়া ইত্যাদি। যেই স্থানটি সংরক্ষিত থাকার কথা, তার উপর দিয়েই জুতোর থপথপ আওয়াজ তুলে এইসব খেলাধুলার সামগ্রীতে চড়ছে বালক-বালিকারা। পৃথিবীর কোনো প্রত্নস্থানে এরকম গরু-ছাগল এবং মানুষের অবাধ চলাফেরা ঘটিয়ে সবকিছু নষ্ট হয়ে যাওয়ার পরিস্থিতি করা হয় কি না, এসব জানতে জানতে ভাবি, এগুলো দেখভাল করার কি কেউ নেই? এমন সময় লাগোয়া বাড়ির ভেতর থেকে এলেন আনোয়ারা বেগম নামের মাঝবয়েসী এক মহিলা। বললেন, তিনি দেখভাল করার দায়িত্বে ছিলেন অনেক দিন। এখন নাই। করোনার পর থেকে তাকে টাকা-পয়সা দেয়া বন্ধ করে দেয়া হয়। সরকার পরিবর্তনের পর তাকে বলে দেয়া হয়েছে, এখানে আর দেখভালের দরকার নেই। আমরা জিজ্ঞেস করি, কারা তাকে নিয়োগ দিলো আর কারা তাকে ছাড়িয়ে দিলো? তিনি বললেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সুফি মোস্তাফিজুর রহমানের কথা।

আনোয়ারা বেগমের সাথে আরো অনেক কথাই হলো। তার কথায় প্রচুর খেদ। তার জমি নাকি কেড়ে নেয়া হয়েছে। কে জানে, আসলে তার কথা ঠিক কি না! সুফি মোস্তাফিজুরের উপর খুবই ক্ষোভ তার।

কর্তৃপক্ষের নিকট ‘পৃথিবীর প্রথম উন্মুক্ত জাদুঘর’ স্থাপনের তৃপ্তিমিশ্রিত ঢেঁকুর থাকলেও সেটা কতোটা উন্মুক্ত আর কতোটা উন্মুক্ত নয়, উন্মুক্ত জাদুঘর বললেই সেটা যে বাপ-মা বিহীন হয়ে যায় না— এই ব্যাপারে বোঝাপড়ার ধরন দর্শনার্থীরা তখনই বুঝে ফেলবেন, যখন দেখবেন ‘উন্মুক্ত জাদুঘর’ সংক্রান্ত বিলবোর্ডই  নষ্ট হয়ে গেছে!

যাই হোক, আমরা বুঝলাম, এই খননকৃত প্রত্নস্থানটিতে এসে আমাদের কিছুই লাভ হয়নি। অথবা হয়তো হয়েছে। ইতিহাসের একটা আকরভূমি, কোটি কোটি টাকা খরচ করে খননকৃত এক মহা আবিষ্কারকে রাষ্ট্র এভাবে হেলাফেলার বস্তু বানিয়ে ফেলে রেখেছে— কীভাবে জানা হতো, না এলে আজ!

চলে যাচ্ছিলাম। বাইকের কাছাকাছি আসতেই এক মহিলা পার্কিং চার্জ দাবি করে বসলো, বাইকপ্রতি বিশ টাকা। আমরা এই ধরনের অনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ জানাতেই প্রায় খেঁকিয়ে ওঠলো মহিলাটি। “উনি কি নৈতিক কাজ করছে?” এরকম প্রশ্নে আমরা দিশেহারা। কাকে উদ্দেশ্য করে বলছে, জিজ্ঞেস করতেই সেই একই নাম উচ্চারণ করলো, সুফি মোস্তাফিজুর রহমান।

বাইকে চড়তে চড়তেই হঠাৎ মনে পড়ে গেলো পাঁচদোনার গিরিশ প্রত্নমিউজিয়ামের কথা। মনীষী ভাই গিরিশচন্দ্র সেনের স্মৃতি রক্ষার্থে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে নির্মিত এই মিউজিয়ামটির নির্মাণেও ছিলেন সুফি মোস্তাফিজুর। এতোটা জঘন্য, জগাখিচুড়ি, গোঁজামিলপূর্ণ জাদুঘর সম্ভবত বাংলাদেশে আর একটিও নেই। তার আর আওয়ামী লীগ নেতা নূহ উল আলম লেনিনের একটা প্রতিষ্ঠান আছে ‘ঐতিহ্য অন্বেষণ’ নামে। গত সরকারের পিরিয়ডে এই প্রতিষ্ঠানটি সারা দেশে সরকারের কোটি কোটি টাকা শ্রাদ্ধ করে নন্দনহীন, গোঁজামিলপূর্ণ এবং শেষ পর্যন্ত সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা না করে ভাগাড়ে পরিণত করে ফেলে রাখার মতো এরকম আরো হয়তো ‘ইতিহাস-ঐতিহ্য’ নিয়ে খেলাধুলা করেছে! সৎ, সাহসী, মেধাবী ও অনুসন্ধানী সাংবাদিকগণই কেবল এর প্রকৃত হদিস বের করতে পারবে।

সোজা মসৃণ কালো পিচের রাস্তার দু’পাশে আম-কাঁঠালের সারি। বাইকের পিঠে বসে থাকা এই বন্দরের জাহাজ আর মানুষের কলধ্বনি সমেত আমাদের চুল উড়িয়ে নিচ্ছে ব্রহ্মপুত্র তীরের বাতাস। খ্রিস্টপূর্ব ৩৫০ অব্দের সেই আলেকজান্ডারীয় বৈকালিক আলো মুখে পড়তেই আমাদের মনে পড়ে যায় দ্বিপ্রহরে ফেলে আসা সেই সন্তের মুখ। মুখমণ্ডলে বয়সের যে-বলিরেখা ছড়িয়েছে ইদানিং, সেই ঋজু দৃপ্ত তবু ভারাক্রান্ত সেই নতমুখ একজন মুহাম্মদ হাবিবুল্লা পাঠানের। তিনি ঘুমিয়ে ছিলেন। তিনি অসুস্থ শারীরিকভাবে।

এক অজপাড়াগাঁ বটেশ্বরে এমন কেউ ছিলেন বিশেষ ধীসম্পন্ন মানুষ, যিনি সেই ১০০ বছর আগে ১৯২৬ সালে এই গ্রামে বসেই ‘সবুজ পল্লী’ নামে পত্রিকা করতেন। তিনি মোহাম্মদ হানীফ পাঠান। মাটির নিচ থেকে পাওয়া গুটিকা দেখে যার চোখ আবিষ্কার করেছিলো এক মহাকাল; আর তা ছড়িয়ে দিয়েছিলেন তার বালক পুত্রের স্কন্ধে। শহরের বড়ো বড়ো বিদ্বান-পণ্ডিত-গবেষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চার দশক তারা লেখালেখি করেছেন। আর তারপর বড়ো বড়ো মানুষেরা একসময় পরীক্ষা করে দেখলো মুহাম্মদ হাবিবুল্লা পাঠান নামের গ্রামের এই স্কুলশিক্ষকের চোখ ও হৃদয়ের অবিনাশী সত্যাসত্য। পত্রিকা হলো, বই হলো, খননকর্ম হলো, তথ্যচিত্র হলো, কতো কতো আলোকচিত্র হলো, সেমিনার হলো, পুরস্কার হলো, সরকার হলো, প্রত্নতত্ত্ব হলো, প্রচুর মানুষের প্রচুর প্রচুর পিনিক হলো এই বিশ-পঁচিশ বছরে। কিন্তু  গত ১০০ বছরে বাংলাদেশে আবিষ্কৃত কোনো প্রত্নতাত্ত্বিক অঞ্চলের ভাগ্যই এই উয়ারী-বটেশ্বরের মতো হলো না। এই স্থানটির যথাযথ যা প্রাপ্য ছিলো, তা হলো না। এখানে প্রাপ্ত আয়ুধসমূহের যেখানে যথাযথ সংরক্ষণের প্রতিশ্রুতি ছিলো, তা হলো না। আর একজন হাবিবুল্লা পাঠান সাত দশক ধরে যা সংগ্রহ করেছেন অনাগত মানুষ আর মানুষের মনন উৎকর্ষের জন্যে, তার কিছুই হলো না। সম্পূর্ণ অরক্ষিত, হারিয়ে ফেলার আশঙ্কা নিয়ে আড়াই হাজার বছর আগেকার এই সভ্যতা হয়তো প্রতীক্ষা করছে বাংলাদেশ রাষ্ট্র পরিচালিত নূতন কোনো নাটকের, আবার হয়তো নূতন করে খনন শুরু হবে, নূতনভাবে কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ হবে, নূতন কোনো প্রত্নতত্ত্ব, নূতন কোনো জেলাপরিষদ, নূতন কোনো ঠিকাদার….

তবু আমরা চাই, বাংলাদেশ রাষ্ট্রের এই সকল ধারাবাহিক নাটক দেখার জন্যে প্রত্নঋষি মুহাম্মদ হাবিবুল্লা পাঠান, আপনি শতায়ু হোন।

শরীফুন্নেছা ঝিনু ও তাঁর সশস্ত্র মহিলা দল

0

১০ জনের একটা মহিলা দল গঠিত হলো। এখন তাঁদের যুদ্ধের প্রশিক্ষণ দরকার। আর সেজন্যে প্রথমেই দরকার একটি আদর্শ স্থান। পাকিস্তানি আর্মি ও রাজাকার বাহিনীর চোখের অন্তরালে তাঁদের প্রশিক্ষিত করার দায়িত্ব নিজেদের কাঁধেই তুলে নেন দুই কমান্ডার— ন্যাভাল সিরাজ ও ইমাম উদ্দিন। স্থান নির্ধারিত হয় আলগী গ্রামের শরীফুন্নেছা ঝিনুর বাড়িতেই। এই বাড়িটি গাজী বাড়ি হিসেবে পরিচিত। শরীফুন্নেছা ঝিনুর চাচা বীর মুক্তিযোদ্ধা গাজী আলাউদ্দিন। তাঁর চাচা ও অন্যান্য ভাইয়েরা সবাই মুক্তিযুদ্ধে যুদ্ধরত। তাই পারিবারিক আবহ তাঁর রক্তের ভেতর দেশপ্রেমের বীজ আগেই রোপিত করেছিলো।

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ আপামর মানুষের সম্মিলিত অবদানে ভাস্বর হয়ে আছে ইতিহাসে। নারী-পুরুষের মিলিত অংশগ্রহণ ছিলো যুদ্ধের নয় মাস জুড়েই। নরসিংদী সদর, পাঁচদোনা, ঘোড়াশাল, কালীগঞ্জসহ ব্যাপক এলাকা ছিলো বীরপ্রতীক ন্যাভাল সিরাজের অধীনে। ন্যাভাল সিরাজ আর সাব ইউনিট কমান্ডার ইমাম উদ্দিনের প্রচেষ্টা আর উদ্যোগে নরসিংদী সদরের আলগী গ্রামে গড়ে ওঠে মহিলা ট্রেনিং সেন্টার।

মুক্তিযুদ্ধে এ-অঞ্চলের সাহসী নেতৃবৃন্দ বুঝতে পেরেছিলেন, সকল বয়সের নারীদেরও যুদ্ধে অংশগ্রহণ জরুরি। তাঁরা নারীদের খুঁজতে থাকেন। একসময় পেয়ে যান নরসিংদী কলেজে একাদশ শ্রেণিতে অধ্যয়নরত আলগী গ্রামের শরীফুন্নেছা ঝিনুকে। যুদ্ধের কোনোকিছুই না জানা ও না বোঝা গ্রামের এক লাজুক তরুণী এই ধরনের দায়িত্বের কথা শুনে ভড়কে যান। কিন্তু ন্যাভাল সিরাজের অসীম সাহস ও উৎসাহে ভেতরে সাহস সঞ্চয় করেন। শরীফুন্নেছা ঝিনুর উপর দায়িত্ব অর্পিত হয় আরো কয়েকজন মেয়েকে যুক্ত করার। অবশেষে খুঁজে বের করে যুক্ত করেন আলগী গ্রামেরই আরো ৯ জনকে। তারা হলেন— মমতাজ বেগম (পিতা : আবদুল মালেক), সখিনা বেগম (পিতা : আ. আহাদ), খোদেজা বেগম (পিতা : হাজী নোয়াব আলী), সুরাইয়া বেগম (পিতা : মজিদ ভূঁইয়া), মোহছেনা বেগম (পিতা : মজিদ ভূঁইয়া), রোকেয়া বেগম (পিতা : আবদুস সামাদ), দিলরুবা বেগম (পিতা : মজিদ ভূঁইয়া), আফজল বেগম ও নূরজাহান বেগম।

১০ জনের একটা মহিলা দল গঠিত হলো। এখন তাঁদের যুদ্ধের প্রশিক্ষণ দরকার। আর সেজন্যে প্রথমেই দরকার একটি আদর্শ স্থান। পাকিস্তানি আর্মি ও রাজাকার বাহিনীর চোখের অন্তরালে তাঁদের প্রশিক্ষিত করার দায়িত্ব নিজেদের কাঁধেই তুলে নেন দুই কমান্ডার— ন্যাভাল সিরাজ ও ইমাম উদ্দিন। স্থান নির্ধারিত হয় আলগী গ্রামের শরীফুন্নেছা ঝিনুর বাড়িতেই। এই বাড়িটি গাজী বাড়ি হিসেবে পরিচিত। শরীফুন্নেছা ঝিনুর চাচা বীর মুক্তিযোদ্ধা গাজী আলাউদ্দিন। তাঁর চাচা ও অন্যান্য ভাইয়েরা সবাই মুক্তিযুদ্ধে যুদ্ধরত। তাই পারিবারিক আবহ তাঁর রক্তের ভেতর দেশপ্রেমের বীজ আগেই রোপিত করেছিলো।

এই প্রতিবেদকের সাথে সম্প্রতি কথা হয় শরীফুন্নেছা ঝিনুর। ৭১ বছর বয়স হয়ে গেছে তাঁর। অনেক কথাই মনে করতে পারেন না। তবে তিনি বলেন, “ন্যাভাল সিরাজ আমাদের বাড়িতে এলেন। আমাকে দেখে তাঁর মনে হলো মহিলাদের ট্রেনিং সেন্টার খোলার কথা। আমাকে বললেন, আরো মেয়ে জোগাড় করতে হবে। আমার গ্রাম থেকে অনেককে জোগাড় করলাম। তারা আসতে চায় না। বাবা-মা তাদের আসতে দিতে চায় না। …আমাদের বাড়িতেই সেন্টার খোলা হলো। …আমরা থ্রি নট থ্রি, পিস্তল আর স্টেনগান চালানো শিখেছিলাম।”

কখনো সম্মুখযুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে হয়েছে কি না, এই প্রশ্নের উত্তরে তিনি জানান, “একবার শুধু পাঁচদোনা ব্রিজের কাছে গিয়েছিলাম সশস্ত্র অবস্থায়। শুনেছিলাম ওখানে বিরাট গণ্ডগোল হচ্ছে। আমরা সবাই প্রস্তুতি নিয়েই গিয়েছিলাম। কিন্তু যুদ্ধ করতে হয়নি। দু’-একজন আহত মুক্তিযোদ্ধাকে ওখানে সেবা করেছিলাম আমরা।”

বর্বর পাক বাহিনী অবশ্য এই মহিলা প্রশিক্ষণ কেন্দ্রটির খবর জেনে গিয়েছিলো। তাছাড়া এই বাড়ির আরো কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধার কথাও তাদের জানা হয়ে গিয়েছিলো। অবশেষে একদিন এই সেন্টারটি পাক বাহিনী পুড়িয়ে ফেলে সম্পূর্ণভাবে। অবশ্য কারো কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। শরীফুন্নেছা ঝিনু ও তাঁর দল এবং বাড়ির অন্যান্য বাসিন্দারা আগেই অন্যত্র অবস্থান নিয়েছিলো ন্যাভাল সিরাজের নির্দেশে।

মুক্তিযোদ্ধা শরীফুন্নেছা ঝিনু পরবর্তীতে নরসিংদী কলেজ থেকে বিএসসি পাশ করেছিলেন। তিনি বর্তমানে বিবাহ সূত্রে চট্টগ্রামে বসবাস করেন।

এমনি অনেক ঘটনা-দুর্ঘটনায় ভারাক্রান্ত আমাদের একাত্তর। অনেক মানুষের আত্মত্যাগ জড়িত। আমাদের নরসিংদী জেলার নারীরা কোনোভাবেই পিছিয়ে ছিলো না মুক্তিযুদ্ধের অবিনাশী নয় মাসে। শরীফুন্নেছা ঝিনু ও তাঁর দল ইতিহাসের শ্যামল ছায়ায় মিশে থাকবেন সমগ্রকাল।

মুক্তিযুদ্ধে রায়পুরা

তিন নদীর বাহুবন্ধ পললে গঠিত রায়পুরায় সুপ্রাচীনকাল থেকেই গড়ে ওঠেছিলো কৃষিশিল্প। পরে তাঁতশিল্পে সমৃদ্ধ হয় এই জনপদ। সামন্ত যুগে ও জমিদারি ব্যবস্থায় অনেক জমিদার, অমাত্য, ভূ-স্বামী, তালুকদার, সামন্তপ্রভু পালাক্রমে শাসন ও শোষণ করেছেন এই রায়পুরাকে। তাই মুক্তিযুদ্ধের পূর্বেই এই মাটির মানুষ লড়াই-সংগ্রাম করেছে জমিদারি প্রথার বিরুদ্ধে, নীল চাষের বিরুদ্ধে, ইজারা প্রথার বিরুদ্ধে ও জলমহাল ইজারার বিরুদ্ধে, সর্বোপরি শোষণ ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে। এই মাটি কালে কালে হয়েছে আন্দোলন ও লড়াই-সংগ্রামের অগ্নিগর্ভ, বঞ্চিত মানুষ হয়েছে অধিকার সচেতন, হয়েছে সাহসী ও সংগ্রামী।

লড়াই-সংগ্রামে, বিদ্রোহ-বিপ্লবে রায়পুরার মাটি ও মানুষ যখন ঋদ্ধ-সমৃদ্ধ, দগ্ধ-বিদগ্ধ, তীব্র তাঁতানো, ঠিক ঐ-সময়ই বেজে ওঠে স্বাধীনতা সংগ্রামের মহাঢঙ্কা। ভাষা আন্দোলনের বারুদপোড়া রক্তের তেজ, বাষট্টির হামুদুর রহমান শিক্ষা কমিশন বিরোধী আন্দোলন, ছেষট্টির ছয়দফা আন্দোলন বেয়ে জাতীয় আন্দোলন যখন ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের দিকে ধাবিত হচ্ছিলো, রায়পুরা তখন তেঁতে ওঠেছিলো সেই আন্দোলনের অগ্নিচ্ছটায়।

বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণেই মুক্তিযুদ্ধের স্পষ্ট দিক-নির্দেশনা পাওয়া যায়। প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো, তোমাদের যা কিছু আছে, তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে… মনে রাখবা, রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দেবো। এ-দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাআল্লাহ…— এসব কথায়ই মুক্তিযুদ্ধের দিক-নির্দেশনা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ৭ মার্চের পর থেকেই রায়পুরার সংগ্রামী জনতা, মুক্তিকামী মানুষ যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুত হতে থাকে। রায়পুরার স্থানীয় নেতৃবৃন্দ ছাত্র, যুবক, জনতা, কৃষক, কামার, কুমার সবাইকে উদ্বুদ্ধ করতে লাগলেন। প্রাথমিক পর্যায়ে আড়াই হাত লম্বা বাঁশের লাঠি হাতে চললো গোপন প্রশিক্ষণ।

রায়পুরায় সবচেয়ে ভয়াবহ যুদ্ধ হয়েছে রামনগরের পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে। ডিসেম্বরের ৬ তারিখ থেকে ৩/৪ দিনব্যাপী রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে উভয়পক্ষের অনেক যোদ্ধা নিহত হয়। ব্রহ্মপুত্রের পশ্চিমপাড় থেকে মিত্রবাহিনি ও মুক্তিবাহিনি যৌথ আক্রমণ চালায় পাকবাহিনির ঘাটিতে। অপর পাড়ে জগন্নাথপুর, নদীর তীরে পাকবাহিনির ঘাঁটি লক্ষ্য করে অবিরাম গোলাবর্ষণ করে মিত্রবাহিনি। পাশাপাশি শুরু করে বিমান হামলা। দুই ধরনের আক্রমণের মুখে পাকসেনাদের প্রতিরোধ ব্যূহ ভেঙে তছনছ হয়ে যায়।

আর কে আর এম উচ্চ বিদ্যালয় মাঠ, পিরিজকান্দি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠ, লক্ষ্মীপুর উচ্চ বিদ্যালয় মাঠ, রাজারবাগ উচ্চ বিদ্যালয় মাঠ, নারায়ণপুর সরাফত আলী উচ্চ বিদ্যালয় মাঠ, পলাশতলী বাজার সংলগ্ন মাঠ ও রহিমাবাদের একটি খোলা জায়গায় প্রশিক্ষণ চলতো প্রাথমিকভাবে। ইপিআর ও সেনাবাহিনির অবসরপ্রাপ্ত সদস্যরা এসব ক্যাম্পে প্রশিক্ষণ দিতেন ছাত্র-যুবকদের। পিরিজকান্দির তালেব হোসেন, কাঙ্গালিয়ার লাল মিয়া, জালালাবাদের সার্জেন্ট (অব.) আব্দুল কাদের, ইদ্রিস কমান্ডার— তাঁরাই প্রশিক্ষণ দিতেন ক্যাম্পে।

একাত্তরে রায়পুরা ছিলো ঢাকা-আগরতলা পথের নিরাপদ ট্রানজিট। একাত্তরে এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহেই অনেক বরেণ্য নেতৃবৃন্দ ঢাকা থেকে রায়পুরা হয়ে নিরাপদে ভারতে গমন করেছেন। তাদের মধ্যে অগ্নিকন্যা মতিয়া চৌধুরী, নারী নেত্রী আয়েশা খানম, বাম রাজনীতিবিদ কমরেড খোকা রায়, জিতেন ঘোষ, বারিণ দত্ত ও জ্ঞান চক্রবর্তী অন্যতম।
৯ এপ্রিল পাকবাহিনি রায়পুরায় প্রবেশ করে। সেদিন তারা ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথ ধরে ভৈরবের দিকে মুভ করে। রায়পুরায় ঢুকতে তারা তেমন কোনো প্রতিরোধের মুখে পড়েনি। পরের দিনই পাকবাহিনি রায়পুরায় ক্যাম্প স্থাপন করে রেললাইনের পাশে (যে-স্থানকে সবাই কলোনি বলে ডাকে)। রায়পুরায় পাকবাহিনি স্থানীয় রাজাকারদের সহযোগিতায় বিভিন্ন জায়গা ও মুক্তিযোদ্ধাদের ঘরবাড়ি রেকি করতে থাকে। পরবর্তীতে হানাদার বাহিনি রায়পুরায় গণহত্যা ও ঘর-বাড়িতে অগ্নিসংযোগ শুরু করলে অনেকেই ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ জায়গায়, বিশেষ করে নদীবেষ্টিত অপেক্ষাকৃত দুর্গম এলাকায় আশ্রয় নেয়, অনেকেই পালিয়ে ভারতে চলে যায়। পাকবাহিনি রাজাকারদের সহযোগিতায় হাশিমপুর মৌলভীবাজারে, মামুদপুর ডাকের বাড়িতে, বাহেরচর খোন্দকার বাড়িতে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট চালায়।

রায়পুরার অনেক ছাত্র-যুবক স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেয় মুক্তিযুদ্ধে। ছাত্র-যুবকরা অনেকেই পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত গমন করে মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং গ্রহণ করে। রায়পুরা এলাকা থেকে এতো বেশি ছাত্র-যুবক ভারতে গিয়েছিলো যে, আগরতলা প্রশিক্ষণ ক্যাম্পগুলো রায়পুরাকে জেলা মনে করতো। এলাকায় বাম রাজনীতির প্রভাব থাকায় অনেক ছাত্র-যুবক ভারতে ট্রেনিং গ্রহণ করে ন্যাপ-সিপিবি-ছাত্র ইউনিয়নের বিশেষ গেরিলা বাহিনি গঠন করে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে।

একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে রায়পুরায় যারা শীর্ষ সংগঠকের ভূমিকা পালন করেছেন, তাঁদের মধ্যে কৃষকনেতা ফজলুল হক খোন্দকার, সাবেক সাংসদ মরহুম আফতাব উদ্দিন ভূঁইয়া, বর্তমান সাংসদ ও সাবেক মন্ত্রী রাজিউদ্দিন আহমেদ রাজু, গয়েছ আলী মাস্টার, কমরেড শামসুল হক, কমরেড বাবর আলী মাস্টার, আফজাল হোসাইন, আব্দুল হাই (চর উজিলাব), খালেক মাস্টার (পাহাড় উজিলাব), সাইদুর রহমান সন্দু মিয়া, আব্দুল বাছেদ চৌধুরী (ভেলুয়ারচর), বজলুর রহমান (আলীনগর) ও সুভাষ সাহা (রহিমাবাদ) প্রমুখ অন্যতম।

একাত্তরে অস্ত্র হাতে রায়পুরার যে-সকল সাহসী বীরপুরুষ হানাদার বাহিনির বিরুদ্ধে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে বীর মুক্তিযোদ্ধা গয়েছ আলী মাস্টার (থানা কমান্ডার), জয়ধর আলী ভূঁইয়া (গ্রুপ কমান্ডার), শহীদ সুবেদার মেজর আবুল বাশার (বীরপ্রতীক), কমান্ডার নজরুল ইসলাম (যুদ্ধাহত), আফজাল হোসাইন, জালাল উদ্দিন ভূঁইয়া, হারুন-অর-রশীদ, সুবেদার আব্দুল ওয়াহিদ (গ্রুপ কমান্ডার), ইদ্রিস হাবিলদার (গ্রুপ কমান্ডার), নূরুজ্জামান জহির (গ্রুপ কমান্ডার), সুবেদার আজিম চৌধুরী (গ্রুপ কমান্ডার), মো. শহীদ উল্লাহ, সাদত আলী মোক্তার (জাহাঙ্গীরনগর), সাহাবুদ্দিন, কর্পোরাল শাহজাহান, কর্পোরাল মো. নূরুল হক, সিপাহি সোহরাব হোসেন, শহীদ আব্দুস সালাম কাওসার (গ্রুপ কমান্ডার), হাবিলদার মোবারক হোসেন, বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ সাহাবুদ্দিন নান্টু (বীরবিক্রম), শহীদ আমান খান, শহীদ বশিরুল ইসলাম, শহীদ জহিরুল হক দুদু, শহীদ এ কে এফ এম শামসুল হক ডেপুটি, জলিলুর চৌধুরী মন্টু (গ্রুপ কমান্ডার), গোপাল চন্দ্র সাহা (গ্রুপ কমান্ডার), আবু সাইদ সরকার (গ্রুপ কমান্ডার), মজনু মৃধা, নূরুল ইসলাম কাঞ্চন, কাজি হারুন-অর-রশিদ ও খন্দকার শাহ আলম অন্যতম। আরো অনেক সাহসী ছাত্র-যুবক যুদ্ধে অংশ নিয়েছেন, যাঁদের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে ইতিহাসের পাতায়। ক্ষুদ্র পরিসরে আমাদের সকল বীর মুক্তিযোদ্ধাদের নাম লেখা সম্ভব নয়।

রায়পুরায় স্থানীয় উদ্যোগেও মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে। ইপিআর ও বেঙ্গল রেজিমেন্টের সদস্যরা এবং ন্যাপ-সিপিবি-ছাত্র ইউনিয়নের মুক্তিযোদ্ধারা রায়পুরার বিভিন্ন স্থানে মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্প স্থাপন করেছিলেন। নারায়ণপুরে বাবর আলী মাস্টারের বাড়িতে, গোকূলনগরে মান্নান মাস্টারের বাড়িতে, জালালাবাদে বলরাম সাহার বাড়িতে, চর উজিলাব’র আব্দুল হাইয়ের বাড়িতে ও হাইরমারা গ্রামে মুক্তিযোদ্ধারা ক্যাম্প স্থাপন করেছিলেন।

একাত্তরে বৃহত্তর রায়পুরায় (২৮ ইউনিয়ন) অনেকগুলো রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ হয়েছে। এসবের মধ্যে বেলাব বড়িবাড়ির যুদ্ধ, হাটুভাঙ্গার যুদ্ধ, বাদুয়ারচর রেলওয়ে ব্রিজের যুদ্ধ, রামনগরের যুদ্ধ, বাঙালিনগরের যুদ্ধ, হাইরমারায় ক্যাম্প আক্রমণ, ব্রজভাঙ্গার যুদ্ধ, তেলিপাড়ার যুদ্ধ, রায়পুরা থানার অস্ত্র লুণ্ঠন, মেথিকান্দা কলোনির যুদ্ধ অন্যতম। এছাড়াও মুক্তিযোদ্ধা ও পাক হানাদার বাহিনির মধ্যে বিচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন স্থানে আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণ হয়েছে। মুক্তিসেনারা ঢাকা-চট্টগ্রাম রেল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করার জন্যে একাত্তরের মাঝামাঝি সময়ে আশারামপুরের কাছে ব্রজভাঙ্গার রেলব্রিজ উড়িয়ে দেয় ডিনামাইট দিয়ে। ফলে হানাদার বাহিনির রেলপথে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। এই ঘটনায় পাকবাহিনি ক্ষুব্ধ হয়ে ব্রিজের পাশের গ্রাম শ্যাওড়াতলীতে আগুন দেয়। ব্যাপক ধর-পাকড় চালায়।
একাত্তরের ৩১ মে রেলপথে কয়েকটি বগি বোঝাই পাকসেনার নরসিংদী থেকে ভৈরবের দিকে যাওয়ার খবর শুনে মুক্তিবাহিনি শ্রীনিধি রেলস্টেশনের অদূরে মাইন স্থাপন করে। কিন্তু সেই মাইন স্থাপনের ঘটনা কীভাবে যেন টের পেয়ে যায় পাকসেনারা। ট্রেন আউট সিগনালে থামিয়ে পাকসেনারা স্টেশন মাস্টারের কাছে এলে স্টেশন মাস্টার চিৎকার দিয়ে বলেন, মন্টু ভাই, আর্মি আইছে। পাকসেনারা স্টেশন মাস্টার মওলা আলী দেওয়ানকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায় আশুগঞ্জ (৩১ মে) এবং পরের দিন (১ জুন) তাকে নির্মমভাবে হত্যা করে।

স্থানীয় রাজাকারদের সহযোগিতায় পাকসেনারা প্রায় প্রতিদিনই গ্রামে ঢুকে নিরীহ মানুষ ধরে আনতো মেথিকান্দার ক্যাম্পে। পাকসেনাদের মেথিকান্দা ক্যাম্পের প্রধান ছিলেন মেজর মঞ্জুর। সারারাত তাদের উপর চলতো অমানুষিক নির্যাতন। ভোরের দিকে তাদের রেললাইনের পাশে বধ্যভূমিতে নিয়ে গিয়ে গণহারে হত্যা করা হতো। পাকসেনারা প্রায়ই বিভিন্ন গ্রাম থেকে ধরে আনতো যুবতী মেয়েদের। তাদের উপর চলতো পাশবিক নির্যাতন। মাঝে মাঝে তাদের আর্তনাদ অনেক দূর থেকে শোনা যেতো বলে জানান মেথিকান্দা সেনাক্যাম্পের তৎকালীন কেয়ারটেকার জাফর।

পাকসেনারা স্থানীয় রাজাকারদের নিয়ে প্রায়ই বিভিন্ন গ্রামে ঢুকে লুটে নিতো হাঁস-মুরগী-গরু-ছাগল। এসব লুটের ভাগ রাজাকাররাও পেতেন। রায়পুরায় পাকসেনাদের সহযোগিতা করেছিলো স্থানীয় রাজাকারেরা। একাত্তরে রায়পুরায় যারা শান্তি কমিটি গঠন এবং নেতৃত্ব দিয়েছিলো, তাদের মধ্যে আব্দুল মতলেব ভূঁইয়া, মাওলানা খলিল উল্লাহ, সাঈদ উদ্দিন চৌধুরী, ময়ধর আলী, আব্দুল জলিল, আবু সাঈদ পণ্ডিত অন্যতম। তারা মুক্তিযোদ্ধাদের গোপন খবর, উপস্থিতি, কার্যক্রম, মুক্তিযোদ্ধা গ্রেফতারে সহযোগিতা, ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগে সহযোগিতা, পথ-ঘাট চিনিয়ে দেয়া, এলাকার পরিস্থিতি সম্পর্কে আগাম খবর দেয়া, ক্যাম্পে যুবতী নারী সরবরাহ, খাবার সরবরাহসহ নানাভাবে সহযোগিতা করতো পাকবাহিনিকে। একাত্তরের মাঝামাঝি সময় থেকে আমাদের বীর সাহসী মুক্তিযোদ্ধারা পাকবাহিনির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। মুক্তিযোদ্ধারা ধীরে ধীরে সংগঠিত হয়ে পাল্টা গুপ্ত হামলা শুরু করে বিভিন্ন স্থানে। মুক্তিবাহিনির একটি সফল অ্যাম্বুশ যুদ্ধ হলো হাটুভাঙ্গার যুদ্ধ। একাত্তরের ডিসেম্বরে পাকসেনারা রেললাইন ধরে পিছু হটার সময় হাটুভাঙ্গায় মুক্তিবাহিনির অ্যাম্বুশে পড়ে মারা যায় ৩০/৩৫ জন পাকসেনা। ব্রজভাঙ্গা ব্রিজের উপরও পাকসেনাদের উপর আক্রমণ চালায় আমাদের সাহসী মুক্তিযোদ্ধারা। সে-যুদ্ধে রাজাকার ময়ধর আলীসহ নিহত হয়েছিলো ৫/৬ জন পাকসেনা। বাদুয়ারচর ব্রিজের কাছেও তুমুল যুদ্ধ হয়েছে পাকসেনাদের সাথে। সেখানে নিহত হয়েছিলো কয়েকজন পাকসেনা। তবে বেলাব বড়িবাড়ির যুদ্ধ ছিলো আরো ভয়াবহ। সেই যুদ্ধে মুক্তিবাহিনির গ্রুপ কমান্ডার সুবেদার মেজর আবুল বাশারসহ ৮/৯ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। সেটি ছিলো মুক্তিযোদ্ধাদের অনেকটা ব্যর্থ অপারেশন। তেলিপাড়া যুদ্ধে ১০/১২ জন পাকসেনা খতম করেন মুক্তিযোদ্ধারা। মে মাস থেকে পাকসেনারা ভৈরব থেকে অবিরাম শেল নিক্ষেপ করতে থাকে। এতে অনেক জনসাধারণ আহত-নিহত হয়েছে, ঘরবাড়ি-গবাদিপশু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একাত্তরে হিন্দুদের ঘরবাড়িতে হামলা ও অগ্নিসংযোগ ছিলো এক ভয়াবহ ঘটনা। জুলাই মাসের মাঝামাঝি কড়ইতলা গ্রামের দুই হিন্দু লোককে পাকবাহিনি ধরে নিয়ে মেরাতলীর রেলব্রিজে দাঁড় করিয়ে গুলি করে হত্যা করে।

রায়পুরায় সবচেয়ে ভয়াবহ যুদ্ধ হয়েছে রামনগরের পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে। ডিসেম্বরের ৬ তারিখ থেকে ৩/৪ দিনব্যাপী রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে উভয়পক্ষের অনেক যোদ্ধা নিহত হয়। ব্রহ্মপুত্রের পশ্চিমপাড় থেকে মিত্রবাহিনি ও মুক্তিবাহিনি যৌথ আক্রমণ চালায় পাকবাহিনির ঘাটিতে। অপর পাড়ে জগন্নাথপুর, নদীর তীরে পাকবাহিনির ঘাঁটি লক্ষ্য করে অবিরাম গোলাবর্ষণ করে মিত্রবাহিনি। পাশাপাশি শুরু করে বিমান হামলা। দুই ধরনের আক্রমণের মুখে পাকসেনাদের প্রতিরোধ ব্যূহ ভেঙে তছনছ হয়ে যায়। এই যুদ্ধে ৪০/৫০ জন পাকসেনা নিহত হয়। অন্যদিকে মিত্রবাহিনি ও মুক্তিসেনা নিহত হয় ১০/১২ জন। মিত্রবাহিনির নিহত হিন্দু সৈনিকদের রায়পুরার দৌলতকান্দি এনে দাহ করা হয়।

নভেম্বরের শেষদিকে মিত্রবাহিনি, মুক্তিযোদ্ধা ও সাধারণ মানুষের সম্মিলিত প্রতিরোধের মুখে পাকসেনাদের আক্রমণ ও অভিযান ক্রমশ থিতিয়ে আসে। সর্বশেষ ও চূড়ান্ত পর্যায়ের যুদ্ধে বাংলাদেশের পূর্ব রণাঙ্গণে মুক্তিবাহিনি ও মিত্রবাহিনির যৌথ ও তীব্র আক্রমণে টিকতে না পেরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনি ভৈরব ও তার আশেপাশের এলাকায় অবস্থান নিতে থাকে। ঊর্ধ্বতন কমান্ডারের নির্দেশ মোতাবেক, পাকবাহিনি যাতে ঢাকার দিকে পলায়ন করতে না পারে, সেজন্যে রায়পুরা থানার পূর্বাঞ্চলে ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনার তীরবর্তী এলাকায় ৬ ডিসেম্বর থেকে মুক্তিবাহিনি ব্যারিকেড ও প্রতিরোধ ঘাঁটি স্থাপন করে এবং তুমুল আক্রমণ চালায়। ৯ ডিসেম্বর চতুর্থ গার্ড রেজিমেন্ট হেলিকপ্টারে রায়পুরার পূর্ব-দক্ষিণ এলাকায় অবতরণ করতে থাকে। ১০ ডিসেম্বর ভারতীয় ১০ বিহার রেজিমেন্ট ও ১৮ রাজপুত রেজিমেন্ট রায়পুরায় পৌঁছায় এবং স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে যৌথ আক্রমণ চালায়। ফলে পাকসেনারা নরসিংদী হয়ে ঢাকার দিকে পলায়ন করে এবং রায়পুরা হানাদার মুক্ত হয়। তারিখটি ছিলো ১০ ডিসেম্বর।
প্রকৃতপক্ষে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ছিলো একটি জনযুদ্ধ। এ-যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন আবালবৃদ্ধবণিতা। অনেক গরীব মানুষ নিজেরা অভুক্ত থেকে খাবার তুলে দিয়েছিলেন অভুক্ত মুক্তিযোদ্ধাদের মুখে। অনেক মা-বোন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দিয়েছেন, নিরাপদে রেখেছেন, গোপনে খাবার সরবরাহ করেছেন। এক টুকরো পোড়া আলু, সেদ্ধ শালুক, চটা পিঠার কণা দিয়ে আপ্যায়ন করেছেন অভুক্ত মুক্তিযোদ্ধাদের। আড়ালে পড়ে থাকা গণমানুষের এমন ত্যাগ-তিতিক্ষাকে ক্ষুদ্র করে দেখার কোনো অবকাশ নেই। তাই আমাদের মুক্তিযুদ্ধ হলো আমাদের জাতিসত্তার এক মৌলিক তাড়না, অস্তিত্বের অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ, নিজস্ব ঠিকানা খোঁজার এক রক্তাক্ত সংগ্রাম।


মহসিন খোন্দকার
সাধারণ সম্পাদক, প্রগতি লেখক সংঘ, নরসিংদী

বেদনা দত্ত : সামাজিক অবহেলার আড়ালে এক বীরাঙ্গনার কথা

0

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ চলছে। দেশব্যাপী চলছে পাকিস্তানি বাহিনীর ধ্বংসযজ্ঞ। আতঙ্ক আর উৎকণ্ঠায় মানুষজন পালিয়ে বেড়াচ্ছে। বাড়িঘর ছেড়ে ছুটছে অজানা গন্তব্যের দিকে। মুক্তিযোদ্ধারা প্রতিরোধ চালিয়ে যাচ্ছে সাধ্যমতো। শহর, বন্দর, স্টেশন, এমনকি গ্রাম থেকে গ্রামে সকল গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় পাকিস্তানি সেনারা স্থাপন করছে তাদের ক্যাম্প। এমনি একটি ক্যাম্প স্থাপিত হয় বর্তমান পলাশ উপজেলার জিনারদী ইউনিয়নের বড়িবাড়ি গ্রামে, বড়িবাড়ি রেলব্রিজের নিচে। মুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমণ থেকে রেলব্রিজটিকে রক্ষার জন্যেই হয়তো এই ক্যাম্পটি স্থাপন করা হয়েছিলো। জিনারদী ইউনিয়নের বরাব-বড়িবাড়িসহ আশেপাশের পুরো এলাকায় মূলত সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বসবাস ছিলো। হানাদার বাহিনীর ক্যাম্প স্থাপনের খবর পেয়ে এলাকার মানুষ পরিবারসহ পালিয়ে যায়। জনশূন্য ভূতুড়ে এক জনপদে পরিণত হয় বড়িবাড়িসহ আশেপাশের গ্রামগুলো। কিন্তু পাক আর্মি ক্যাম্পেরই একদম কাছে একটি বাড়িতে রয়ে যান এক বিধবা নারী; তার এক ছেলেকে নিয়ে। দুই মেয়েকে পাঠিয়ে দেন শিবপুরের এক আত্মীয়ের বাড়িতে। আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশি— সকলেই এলাকা ছেড়েছে। এদিকে বাড়িতে ধান থাকায় নিরুপায় হয়েই সেখানে রয়ে যান মা ও ছেলে। দূরের এক আত্মীয় নৌকাযোগে ধানগুলো নিতে এলেই তারাও সাথে চলে যাবেন, এই আশায় দিন কাটাচ্ছেন।

পাকিস্তানি আর্মির ক্যাম্প স্থাপনের কারণে এলাকায় গোপনে মুক্তিযোদ্ধাদের আনাগোনাও বেড়ে যায়। আশেপাশের বাড়িঘরে মানুষজন না থাকায় স্বভাবতই মুক্তিযোদ্ধারা কোনো প্রয়োজন হলে সেই বিধবা নারীর বাড়িতে এসে উঠতেন। তাছাড়া তার বাড়ির পেছনের জঙলায় লুকিয়ে ক্যাম্পের সেনাদের গতিবিধি নজরে রাখা সহজ ছিলো। ফলে মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে পরিবারটির একরকম সখ্য গড়ে ওঠে। মুক্তিযোদ্ধাদের রান্নাবান্না করে খাওয়াতেনও মাঝে-মধ্যে। পাশাপাশি পাকিস্তানি বাহিনীর বিভিন্ন তথ্য এনে দিতেন। বাড়ির ছোটো ছেলেটিও নানাভাবে সাহায্য-সহযোগিতা করতেন।

হঠাৎ একদিন পাক হানাদার বাহিনীকে এসব কথা জানিয়ে দেন সিরাজুল ইসলাম নামে স্থানীয় এক রাজাকার। এরপরই পাক হানাদার বাহিনী সেই নারীকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যায় তাদের ক্যাম্পে। তিনদিনব্যাপী তার উপর চালায় অমানুষিক নির্যাতন। সেই সাথে গণধর্ষণ। নির্যাতনের তীব্রতা এতোটাই মারাত্মক ছিলো যে, তিনি একদম অচেতন হয়ে পড়েন। পাক বাহিনী মৃত ভেবে তাকে রেল লাইনের পাশেই একটি ডোবায় ফেলে দিয়ে যায়। কতো সময় পর তার জ্ঞান ফেরে, তা তিনি বলতে পারেন না। জ্ঞান ফিরলেও ডোবা থেকে উঠে আসার মতো শারীরিক শক্তি ছিলো না তার। রাতের অন্ধকারে হাতড়ে তা-ও ডোবা পার হতে চেষ্টা করেন। কিন্তু কিছুতেই পাড়ে উঠে আসতে পারছিলেন না। এদিকে মুক্তিযোদ্ধারা আগেই জেনে গিয়েছিলেন তার এই পরিণতির কথা। তারাও নানাভাবে তাকে উদ্ধারের জন্যে তৎপর ছিলেন। পরে মানিক সেন নামে এক মুক্তিযোদ্ধা তাকে সেই ডোবা থেকে উদ্ধার করেন। উদ্ধার করে নিয়ে যান স্থানীয় গ্রাম্য ডাক্তার ময়েশ চন্দ্রের কাছে। চিকিৎসা শেষে আশ্রয় নেন দুই-তিন কিলোমিটার দূরের গোপীরায়েরপাড়ায়, এক আত্মীয়ের বাড়িতে। সেখানে বেশ কিছুদিন থেকে কিছুটা সুস্থ হয়ে ওঠেন। পরবর্তীতে চলে যান শিবপুরের আজকিতলায়, আরেক আত্মীয়ের বাড়ি। যুদ্ধের বাকি সময় সেখানেই অবস্থান করেন।

রক্ত হিম করা ভয়ঙ্কর অমানবিক এই ঘটনার শিকার সেই নারীর নাম বেদনা দত্ত। শরীরের নানা স্থানে স্পষ্ট ক্ষতচিহ্ন নিয়ে তিনি এখনো বেঁচে আছেন। বাস করছেন সেই বড়িবাড়ি গ্রামের তার নিজ বাড়িতেই। বয়সের ভারে ন্যুব্জ নিপীড়িত এই নারীর জীবনের গল্প যেন আমাদের মনে করিয়ে দেয় স্বাধীনতা যুদ্ধে অজানা অনেক নারীর করুণ পরিণতি আর আত্মত্যাগের বিস্মৃত ইতিহাস।

বীরাঙ্গনা বেদনা দত্ত | ছবি : গঙ্গাঋদ্ধি

বেদনা দত্তের জন্ম ঢাকার কদমতুলি থানা এলাকায়, ১৯৪০ সালে। তাঁর বাবা যোগেন্দ্র দে। ছোটোবেলায়ই বাবা-মাকে হারান তিনি। ১৫ বছর বয়সে নরসিংদীর পলাশ উপজেলার জিনারদী ইউনিয়নের বড়িবাড়ি গ্রামের এই বাড়িতে নরেন্দ্র দত্তের সাথে বিয়ে হয় তাঁর। সংসার জীবনে তাঁদের এক ছেলে— গোপাল দত্ত এবং দুই মেয়ে— জ্যোসনা দত্ত ও মল্লিকা দত্তের জন্ম হয়। কিন্তু আকস্মিকভাবে নরেন্দ্র দত্ত অসুস্থতাজনিত কারণে মারা যান ১৯৬৯ সালে। তিন সন্তান নিয়ে বিধবা বেদনা দত্ত মহাবিপদে পড়েন। তবুও কষ্টে-সৃষ্টে চালিয়ে নিচ্ছিলেন সংসার।

এরই মধ্যে শুরু হয় আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ। শুরু হয় পাকিস্তানি বাহিনীর তাণ্ডব। শুরু হয় আমাদের প্রতিরোধ যুদ্ধ। সেই সাথে পলাশের বড়িবাড়ি গ্রামে বেদনা দত্তের সাথে ঘটে যায় নির্মম সেই ঘটনা।

একসময় আমরা স্বাধীন হই। কিন্তু বেদনা দত্তের ভাগ্য পরিবর্তিত হয় না। পাক হানাদার বাহিনীর নির্যাতনের শিকার হওয়ার কারণে সমাজের মানুষের কাছে তিনি অবহেলিত হতে থাকেন। মানুষের কটু কথা আর একঘরে করে রাখার তৎপরতায় বিষিয়ে ওঠে তাঁর জীবন। শুধু তা-ই নয়, যুদ্ধের সময় দুই বছর বয়সী শিশুকন্যা মল্লিকা দত্ত পাক হানাদার বাহিনীর নির্যাতনের ফলে জন্ম নিয়েছে, এমন গুজবে আজো তাঁর বিয়ে দিতে পারেননি। ছেলে গোপাল দত্তই উপার্জনক্ষম একমাত্র ব্যক্তি। তিনি কৃষিকাজ ও গবাদিপশু পালন করেই সংসার চালাচ্ছিলেন।

বীরাঙ্গনা বেদনা দত্তের ছেলে গোপাল দত্ত | ছবি : গঙ্গাঋদ্ধি

এভাবেই দুঃখ-দুর্দশা, ক্ষুধা আর দারিদ্র্যকে সাথে নিয়ে চলছিলো বেদনা দত্তের জীবন। ইতোমধ্যে কেটে গেছে স্বাধীনতার ৫০ বছর। মুক্তিযোদ্ধাসহ বীরাঙ্গনা নারীদের বহু তালিকা হয়েছে। তাঁদের সম্মাননা-ভাতা-বাড়িঘর দেয়া হয়েছে। সমাজের মূল স্রোতে তাঁদের ফিরিয়ে আনার নানা তৎপরতা গ্রহণ করা হয়েছে। কিন্তু ক্ষমতাসীন নানা সরকারসহ সমাজের কেউই বড়িবাড়ির বীরাঙ্গনা বেদনা দত্তের দুর্দশা লাঘবে এগিয়ে আসেনি।

তখন ২০২১ সাল। নরসিংদীর একজন সাংবাদিক শরীফ ইকবাল রাসেল (বাংলা টিভি) কোনোভাবে জানতে পারেন তাঁর সেই ঘটনা এবং করুণ জীবনযাপনের কথা। তিনি স্বপ্রণোদিত হয়ে বহু চড়াই-উতরাই পেরিয়ে খুঁজে বের করেন সুবিধাবঞ্চিত বেদনা দত্ত, তাঁর পরিবার ও বাড়িঘর। তিনি জানান, “প্রথম যেদিন বেদনা দত্তের বাড়ি আবিষ্কার করি, সেদিন বাড়ির উঠোনে উঠে দেখি, বেদনা দত্তের মেয়ে মল্লিকা দত্ত গ্রামের কোনো মাঠ থেকে কলমি তুলে এনেছেন। পাশেই চুলায় পানি গরম হচ্ছে। কলমি সিদ্ধ করে তাঁরা দুপুরে খাবে।” এই দুরাবস্থা, ভাঙা বেড়ার ঘর দেখে ও তাঁদের সাথে কথা বলে তিনি মর্মাহত হন এবং বেদনা দত্ত ও তাঁর পরিবারের হেন অবস্থা নিয়ে একের পর এক নিউজ করতে থাকেন। পাশাপাশি নিজেই প্রশাসনের লোকজনের সাথে যোগাযোগ করে নানা জায়গায় চেষ্টা-তদবির চালাতে থাকেন। অবশেষে তিনি ঊর্ধ্বতন প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সমর্থ হন।

সমাজের প্রভাবশালীদের কাছ থেকে প্রতিনিয়ত অবহেলিত বেদনা দত্তকে অবশেষে স্বাধীনতার ৫০ বছর পর ২০২১ সালের ডিসেম্বরে ‘বীরাঙ্গনা’ স্বীকৃতি দেয়া হয়। মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের সহযোগিদের হাতে নির্যাতিত হওয়ায় বীরাঙ্গনা বেদনা দত্তকে মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতি দিয়ে গেজেট জারি করে তৎকালীন সরকার। জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের (জামুকা) ৭৩তম সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বীরাঙ্গনা বেদনা দত্ত এই স্বীকৃতি পান। তখনো পর্যন্ত মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতি পাওয়া বীরাঙ্গনার সংখ্যা ২৭২ জন।

তখন থেকে সরকারি ভাতা এবং আরো পরে বাড়ি বরাদ্দ পান বেদনা দত্ত। কিন্তু ধীর গতির কাজ, ঠিকাদারদের অবহেলা আর নানা জটিলতায় বাড়ি নির্মাণ আটকে ছিলো দীর্ঘদিন। অবশেষে ২০২৩ সালে দুইটি শোবার ঘর, দুইটি টয়লেট, কিচেন, বসার ঘর ও বারান্দা সম্বলিত নবনির্মিত বাড়িতে থাকতে শুরু করেন তিনি। বাড়িতে সরকারিভাবে বিদ্যুৎ, পানি ও আনুষঙ্গিক সুযোগ-সুবিধাও প্রদান করা হয়।

যুদ্ধের সময় মুক্তিরা আমগো বাড়িত আইতো। দিনে নানান জাগায় যাইতো। রাইতে খাওয়ার সময় অইলে আইতো। আমি রাইন্ধা-বাইড়া দিতাম। ভাত দিতাম, মাঝে-মইধ্যে রুটি বানায়া দিতাম। যন্ত্রপাতি আগায়া দিতাম। রেললাইনে ক্যাম্প করছিলো পাঞ্জাইব্যারা। এক রাজাকার আমার কথা তাগো কাছে কইয়া দিছে। বাড়িত আমি আর আমার ছেলে থাকতাম। বাড়ির ভিত্রে আইয়া আমারে ধরছে আর আমার পোলায় সামনেই পানি আছিলো, লাফ দিয়া পানিত পইড়া গেছে। তো আমারে লইয়া গেছে ক্যাম্পে। নিয়া আটকাইয়া রাখছে, লাত্থি দিছে, মাইরধর করছে ইচ্ছামতো। আর অত্যাচার করছে তিন-চাইর দিন ধইরা। আরো অনেক লোকে মিল্যাও অত্যাচার করছে।

বেদনা দত্ত ও তাঁর পরিবারের বর্তমান অবস্থা জানতে এবং স্বচক্ষে অবলোকন করতে আমরা যাই তাঁর বাড়িতে। চরনগরদী বাজার হয়ে বরাব মন্দির পেরিয়ে ছোটো একটি কালভার্টের পরেই হাতের বামদিকে চলে গেছে ছোট্টো পাকা সড়ক। সড়কটি বেদনা দত্তের বাড়ি পেরিয়ে একদম রেললাইন পর্যন্ত গিয়ে শেষ হয়েছে। সড়কটির নামকরণ করা হয়েছে ‘বীরাঙ্গনা বেদনা দত্ত সড়ক’ নামে। জানতে পারি, তাঁর সম্মানেই বেহাল সড়কটি নতুন রূপ ধারণ করেছে। তবে এখনো সড়কের নামফলক বসানো হয়নি।

বাড়িতে ঢুকেই বেদনা দত্তকে দেখতে পাই। উঠোনে বসে আছেন মাথা নিচু করে। ৮৫ বছর বয়স্ক বীরাঙ্গনা এই নারী অনেকটাই অসুস্থ এখন। সোজা হয়ে চলতে পারেন না। তাঁর পুত্র গোপাল দত্তের স্ত্রী স্বর্ণা দত্ত ও মেয়ে রাখি দত্ত চেয়ার পেঁতে আমাদের বসতে দেন। আন্তরিকভাবে আমাদের গ্রহণ করায় শুরু থেকেই আমরা আলাপে ঢুকে পড়ি। বেদনা দত্তের বয়স্ক কণ্ঠ আমাদের ইতিহাসের গভীরে নিবদ্ধ রাখে অনেকক্ষণ। আমাদের জানান একাত্তর সালের ভাদ্র মাসে তাঁর সাথে ঘটে যাওয়া অমানবিক ঘটনার নির্যাস। তবে অসুস্থ থাকায় খুব বেশিক্ষণ বলতে পারলেন না। তিনি বলেন, “যুদ্ধের সময় মুক্তিরা আমগো বাড়িত আইতো। দিনে নানান জাগায় যাইতো। রাইতে খাওয়ার সময় অইলে আইতো। আমি রাইন্ধা-বাইড়া দিতাম। ভাত দিতাম, মাঝে-মইধ্যে রুটি বানায়া দিতাম। যন্ত্রপাতি আগায়া দিতাম। রেললাইনে ক্যাম্প করছিলো পাঞ্জাইব্যারা। এক রাজাকার আমার কথা তাগো কাছে কইয়া দিছে। বাড়িত আমি আর আমার ছেলে থাকতাম। বাড়ির ভিত্রে আইয়া আমারে ধরছে আর আমার পোলায় সামনেই পানি আছিলো, লাফ দিয়া পানিত পইড়া গেছে। তো আমারে লইয়া গেছে ক্যাম্পে। নিয়া আটকাইয়া রাখছে, লাত্থি দিছে, মাইরধর করছে ইচ্ছামতো। আর অত্যাচার করছে তিন-চাইর দিন ধইরা। আরো অনেক লোকে মিল্যাও অত্যাচার করছে। কোনো খাওয়া-দাওয়া আছিলো না। কতো আর সহ্য করমু? পরে আমি অজ্ঞান হইয়া পড়ছি। হ্যারা মনে করছে, আমি মনে হয় মইরা গেছি নাকি কী চিন্তা কইরা আমারে লাইনের পাড় ফালায়া দিছে। আমার যহন কিছু জ্ঞান আইছে, তহন ভোর রাইত। আমি পলাইতে গিয়া খালের এই পাড় আইছি কোনোমতে। পরে মুক্তিরা দেখছে। পরে আমারে তুলছে। তুইল্যা ডাক্তরের কাছে নিছে। পরে আমি শিবপুর গেছিগা। স্বাধীনের পরে আবার বাইত আইছি।”

যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে তাঁর প্রতি পাড়া-প্রতিবেশি ও আত্মীয়-স্বজনদের দৃষ্টিভঙ্গি ও আচরণ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি জানান, “এহনো মানুষ আমারে নিয়া নানান কথা কয়। আমার একটা মাইয়্যা আছে, বিয়া দিতারি নাই তো। মাইনষের আজগুবি কথায় আমার মাইয়্যাডার বিয়া অইছে না।”

বীরাঙ্গনা বেদনা দত্তের ছোটো মেয়ে মল্লিকা দত্ত | ছবি : গঙ্গাঋদ্ধি

সমাজের এমন নিগ্রহে রাগ-দুঃখ প্রকাশ করলেও শেষে তিনি জানান যে, তাঁর আত্মত্যাগ আর সন্তানদের দুর্গতির বিনিময়ে হলেও এই দেশের মানুষ যে মুক্ত হয়েছে, সেই কারণে তিনি গর্ববোধ করেন।

বেদনা দত্তের বিচলিত কণ্ঠ নেমে আসে ধীরে ধীরে। আমরা অপেক্ষা করি গোপাল দত্ত ও মল্লিকা দত্তের জন্যে। তাঁরা পারিবারিক কাজে জিনারদী বাজারে অবস্থান করছিলেন। ততোক্ষণে রেললাইনসহ আশেপাশের এলাকা ঘুরে দেখি। স্বচক্ষে দেখে আসি বড়িবাড়ি রেলব্রিজ ও পাকিস্তান আর্মির ক্যাম্প স্থাপনের জায়গাটি। ঘণ্টাখানেক পর দুই ভাই-বোন একসাথে এসে হাজির হন বাড়িতে। তাঁদের সাথে কথা বলে জানতে পারি একাত্তরসহ পরবর্তী আরো নানা ঘটনা। যুদ্ধের সময় গোপাল দত্তের বয়স ছিলো ১২, তাঁর বোন জ্যোসনা দত্তের ৮ এবং মল্লিকা দত্তের ২। অল্প বয়সে দেখা যুদ্ধ ও তাঁর পরিবারের দুর্দশার কথা আমাদের বর্ণনা করেন গোপাল দত্ত। সেই সাথে যুদ্ধ-পরবর্তী স্বাধীন দেশে সামাজিক নিগ্রহ ও অর্থনৈতিক দুরাবস্থার চিত্রও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “যুদ্ধের পরে যহন বাড়িতে আসি, আইসা দেখি যে, বাড়ির চারপাশে বড়ো বড়ো ঘাস। বেড়া বিভিন্ন দিক দিয়া ভাঙ্গা, কিন্তু বাড়িটা পাইছি। …আর এলাকার মানুষও ফেরত আইছে। সবাই ঘটনাটা জানছে। এলাকায় আমার মায়ের নামে অনেক বদনাম ছড়াইয়া যায়। কেউ কিছু হইলেই কইতো, তোর মারে পাকিস্তানিরা ধইরা নিছে, এই করছে সেই করছে। আমার খারাপ লাগতো অনেক। কিন্তু কিছু কইতে পারতাম না। তবে এহন কেউ আর আগের মতো করে না। ’২১ সালে সম্মানটা পাওয়ার পরে আর কেউ কিছু কয় না।”

স্বাধীনতার ৫০ বছর পার হলেও তাঁরা কেন এতোদিন সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত ছিলেন, এমন প্রশ্নের জবাবে জানান, “আমরা আসলে সরকারি ভাতা সম্পর্কে এতোটা জানতাম না। জানতাম, খালি মুক্তিযোদ্ধাগোরে ভাতা দেয়। আর কেউ কোনো-সময় আমগোরে কিছু কয়ও নাই। চার-পাঁচ বছর আগে নসন্দী থেকে এক সাংবাদিক আইয়া আমগোর খোঁজ-খবর নেয়। উনিই আমগোরে বীরাঙ্গনা উপাধির কথা জানায়, ভাতার কথা জানায়। পরে পলাশ উপজেলা পরিষদ আর ঢাকা দৌড়াদৌড়ি কইরা কাজটা করি। উপজেলা অফিসারও অনেকবার বাড়িত আইয়া দেইখ্যা ছবি-টবি তুইল্যা নিছে। তো এইভাবেই আসলে সব হইছে।”

গোপাল দত্ত তাঁর মায়ের আত্মত্যাগ নিয়ে গর্ব করেন এবং আমাদের অর্জিত স্বাধীনতাকে সবার উপরে স্থান দেয়ার কথা বলেন। সবশেষে তাঁদের বর্তমান অবস্থা সম্পর্ক তিনি বলেন, “সরকারি যেই ভাতা পাই, সেইটা আমার মা আর বোনের পিছেই খরচ করি। নতুন বাড়িতেও তারা দুইজনেই থাকে। আমরা এই আগের ঘরেই থাকি। এক মেয়ে, এক ছেলে, আমি আর আমার বউ— আমরা চারজন। ছেলে-মেয়ে দুইজনই পড়ালেখা করে। আমি আগে কৃষিকাজ করতাম। কিন্তু এহন শ্বাসকষ্টের কারণে তেমন কোনো কাজ করতে পারি না। আমার একটা গাভী আছে, এটার দুধ বিক্রির টাকা দিয়াই কষ্ট করে চলতেছি।”

বীরাঙ্গনা বেদনা দত্ত ও তাঁর সন্তানদের এই ত্যাগ ও দুর্দশার চিত্র আমাদের ইতিহাস ও মানসপট থেকে কখনোই হারিয়ে যাবার নয়। অন্ধকারে তাঁরাই আমাদের আলোকরেখা। আমাদের উচিত, ইতিহাসের ধুলোর আস্তরণ মুছে এরকম আত্মত্যাগী চরিত্রদের খুঁজে বের করা এবং তরুণ প্রজন্মের সামনে দেশ গড়ার পাথেয় হিসেবে সর্বদা হাজির রাখা। তাহলেই অর্ধশত বছর ধরে বেদনা দত্তদের ভুলে থাকার দায় হয়তো-বা ঘুচবে, কিছুটা হলেও।


তথ্যসূত্র
১. বেদনা দত্ত, গোপাল দত্ত ও মল্লিকা দত্তের সাক্ষাতকার;
২. সাংবাদিক শরীফ ইকবাল রাসেলের সাক্ষাতকার;
৩. ‘প্রতিদিনের সংবাদ’ ও বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক।

আনোয়ার হোসেনের শহীদী আত্মত্যাগ

আক্রান্ত হলো মুক্তিযোদ্ধাদের একটি ক্যাম্প। প্রায় ৩০-৩৫ জন মানুষকে মাঠের মধ্যে দাঁড় করানো হলো। তাক করা সশস্ত্র বর্বর পাকিস্তানি বাহিনীর বন্দুক। সবাইকে ব্রাশফায়ার করতে উদ্যত। ট্রিগারে হাত। মুহূর্তেই একটি কণ্ঠ কথা বলে ওঠে উচ্চস্বরে। “দাঁড়ান, এখানে সবাই মুক্তিযোদ্ধা নয়। কেবল আমরা পাঁচজন মুক্তিযোদ্ধা। বাকি সবাই সাধারণ জনগণ। এদেরকে ছেড়ে দেন। আমাদের মেরে ফেলেন।” তারপর সবাই চুপ।

সবাই চেয়ে দেখলো কণ্ঠটা কার। আনোয়ারের। সবাই তাঁকে চেনে। শেখেরচরের আনোয়ার হোসেন। অকুতোভয় এক সাহসের নাম। আত্মত্যাগী এক দেশপ্রেমিক। তা না হলে মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়েও মানুষের জীবন বাঁচানোর কর্তব্য ভুলে যেতেন না। এই সাহস আর ত্যাগের শিক্ষা সে গ্রহণ করেছিলো অনেক আগেই। আনোয়ার হোসেন ইন্টারমিডিয়েটে পড়তো নরসিংদী কলেজে। পড়াশোনার পাশাপাশি সামাজিক সংগঠনেও অগ্রণী ভূমিকা পালন করতো। শেখেরচরের ঐতিহ্যবাহী সংগঠন ‘ধূমকেতু সংঘ’ গড়ার পেছনে আনোয়ার হোসেনের চিন্তা, শ্রম, নিষ্ঠা জড়িত ছিলো। দেশমাতৃকার প্রতি মমত্ববোধ, দেশের শত্রুর বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার মনোবাসনা এই সময়েই তাঁর ভেতর প্রোথিত হয়েছিলো। আনোয়ার হোসেনের পিতা মো. মিজানুর রহমান এ-ব্যাপারে তাঁকে উৎসাহ-উদ্দীপনা যোগাতেন।

মো. আনোয়ার হোসেন

আলগী তারিণী ভূঁইয়া বাড়ির ক্যাম্প। অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়। ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেনি তখনো তেমনটা। সুচিন্তিতভাবে এই সময়টাই বেছে নিয়েছে বর্বর পাক হানাদার বাহিনী আর এদেশীয় রাজাকারেরা। যেহেতু রাতেও একবার আশেপাশে ঘোরাঘুরি করে ব্যর্থ চেষ্টা করেছিলো মুক্তিযোদ্ধাদের এই ক্যাম্পটি আক্রমণের।

ভোর। ১৮-১৯ জনের একট দলের ক্যাম্প। দু’-একজন পাহারায়। বাকি সবাই ঘুমে অচেতন। আলগীর আশেপাশের তিনটি গ্রাম ধরে তিন দিক দিয়ে ক্যাম্পটি ঘিরে ফেলে পাকিস্তানি সেনারা। এই ক্যাম্পের অবস্থান রাস্তার সাথে লাগোয়া ছিলো এবং নিরাপত্তার দিক দিয়ে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ছিলো বলে আগেই জানিয়েছিলেন নরসিংদী সদরের সাব কমান্ডার ইমাম উদ্দিন। তিনি সন্ধ্যায় পরিদর্শন করেছিলেন ক্যাম্পটি।

মূলত নরসিংদী সদরের মুক্তিযুদ্ধের সার্বিক দায়িত্বে ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের কমান্ডার নৌ-সৈনিক সিরাজ উদ্দিন আহমেদ, যিনি ন্যাভাল সিরাজ নামে পরিচিত। অকুতোভয় সাহসের মূর্ত প্রতীক ন্যাভাল সিরাজ মুক্তিযুদ্ধের পরে ‘বীর প্রতীক’ খেতাবে ভূষিত হয়েছিলেন। ন্যাভাল সিরাজ এই ক্যাম্প আক্রমণের রাতে বালাপুর ক্যাম্পে অবস্থান করছিলেন। সেখানেও পাক বাহিনী দ্বারা আক্রমণের শিকার হয়েছিলেন।

আলগী, কাঁঠালিয়া আর বালাপুর— মুক্তিযোদ্ধাদের তিনটি ক্যাম্পই আক্রান্ত হয়েছিলো সেই রাতে।

আলগীর তারিণী ভূঁইয়া বাড়ির এই ক্যাম্প আক্রান্ত হয় ১৫ অক্টোবর ভোরের দিকে। আলগী বাজারের দক্ষিণ দিক দিয়ে হানাদার বাহিনী উত্তর, পশ্চিম ও দক্ষিণ— এই তিন দিক দিয়ে ঢুকে ঘিরে ফেলে ক্যাম্পটি। ভাগদীর আওলাদ হোসেন উত্তর দিকে পাহারায় ছিলেন। হঠাৎ উত্তর দিকের ক্যাম্পের খুব কাছে টর্চের আলো ফেলতেই আওলাদ বুঝতে পারে, তারা আক্রান্ত হয়েছে। সাথে সাথেই সে রাইফেলের গুলি ছোঁড়ে। হানাদার বাহিনীও তিন দিক দিয়ে গুলি ছোঁড়ে। আওলাদ আহত হয়ে সংলগ্ন পুকুরে পড়ে যায়। পরের দিন পুকুরেই তাঁর লাশ পাওয়া যায়।

চতুর্দিক থেকে মুহূর্মুহু স্টেনগান আর রাইফেলের গুলির বিকট চিৎকারে ঘুমন্ত-জাগ্রত এই ক্যাম্পের সকল মুক্তিযোদ্ধা আর স্থানীয় এলাকাবাসীর ঘুম উবে গিয়ে দৌড়াদৌড়ির হুলস্থূল লেগে যায়। আনোয়ার হোসেন এ-সময় গুলিতে আহত হয়ে পাশের পুকুরে পড়ে যায়, আওলাদের মতোই। পরে তাঁকে পুকুর থেকে আহত অবস্থায় উপরে তোলা হয়। বেশিরভাগ মুক্তিযোদ্ধারাই পালাতে সক্ষম হয়। কেবল আনোয়ারসহ ৫ জন মুক্তিযোদ্ধা ধরা পড়ে।

সবাইকে মাঠের মধ্যে একত্রে দাঁড় করানো হয়। সাথে এলাকার আরো কিছু মানুষ। সবাইকে একসাথে ব্রাশফায়ার করে এখনি ঝাঁঝরা করে দেয়া হবে।

পরমুহূর্তেই সেই অমোঘ উচ্চারণ, যে-শব্দ আর বাক্যরাশির কারণে বেঁচে গেলো অনেকগুলো নিরীহ প্রাণ। আর পরিচয় পাওয়া গেলো শস্যদায়িনী শ্যামল বাংলামাতার এক সাহসী বীর আনোয়ার হোসেনের। “দাঁড়ান, এখানে সবাই মুক্তিযোদ্ধা নয়। কেবল আমরা পাঁচজন মুক্তিযোদ্ধা। বাকি সবাই সাধারণ জনগণ। মারতে হয় আমাদের মারুন। এদেরকে ছেড়ে দিন।” মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও শেষবেলায় আরো অনেক মানুষের প্রাণ বাঁচানোর চেষ্টায় আনোয়ার হোসেন অন্য সবার থেকে আলাদা হয়ে গেলেন। যদিও প্রত্যেক মুক্তিযোদ্ধারই প্রাণের দাম সমান এই বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্যে। মৃত্যু নিশ্চিত করে বর্বর পাক বাহিনী আনোয়ার হোসেনকে মাঠের এক কাঁঠালগাছে ঝুলিয়ে রেখেছিলো। বাকি পাঁচজনের লাশ মাঠে ছড়ানো ছিলো বৃক্ষচ্যুত পাতার মতো। ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই গ্রামবাসী ক্যাম্পের মাঠে ছয় মুক্তিযোদ্ধাকে এভাবে লাশ হয়ে যেতে দেখে বেদনায় মুষড়ে পড়েন আর মুক্তিযোদ্ধারা লাভ করেন সাহস ও শক্তি। আনোয়ার হোসেনের সহযোদ্ধা বাকি পাঁচ শহীদ মুক্তিযোদ্ধারা হলেন— নেহাব গ্রামের মোহাম্মদ আলী, চাকশালের তাইজউদ্দিন পাঠান, কল্যাণদির সিরাজুল ইসলাম, কামারটেকের আব্দুস সালাম, ভাগদীর আওলাদ হোসেন।

এই সেই তারিণী ভূঁইয়া বাড়ির ক্যাম্প, মাঠ আর কাঁঠাল গাছ। এই গাছে আনোয়ার হোসেনকে মেরে ঝুলিয়ে রেখেছিলো বর্বর পাকিস্তানি বাহিনী। মূল কাঁঠাল গাছটি ৫০ বছরেরও অধিক সময় টিকে ছিলো এখানে। পরে ভেঙে যায়, এবং একই স্থানে নতুন একটা কাঁঠাল গাছের চারা রোপণ করা হয় সেই বিভীষিকাময় ও গৌরবজনক ইতিহাসকে জাগরিত রাখতে। এই চারাটির নিচে মূল গাছের গোড়া এখনো অক্ষত রয়েছে। এই ঐতিহাসিক মাঠে ছয়জন শহীদের স্মরণে একটি স্মৃতিস্তম্ভও নির্মাণ করা হয় জেলা মুক্তিযুদ্ধ কাউন্সিলের সৌজন্যে, ২০১১ সালে। এই স্মৃতিস্তম্ভটির ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন আনোয়ার হোসেনের ভাই বিশিষ্ট শিল্পপতি মো. মোশাররফ হোসেন (সিআইপি) | ছবি : শহিদুল্লাহ পিয়াস

কান্দাপাড়া গ্রামের এক রাজাকার মুক্তিযোদ্ধাদের এই ক্যাম্পটির খোঁজ-খবর পাক বাহিনীকে জানিয়েছিলো, এমনকি পথ দেখিয়ে নিয়ে গিয়েছিলো— এরকম খবর পরদিন থেকেই মানুষের জানা হয়ে গিয়েছিলো। মুক্তিযুদ্ধের পর এই রাজাকারকে মুখে চুনকালি ও মাথা ন্যাড়া করে সারা এলাকা ঘোরানো হয়েছিলো শাস্তি হিসেবে। এই রাজাকারকে মুক্তিযোদ্ধারা মেরে ফেলতেই উদ্যত ছিলো। কিন্তু অনেক গ্রামবাসীর উপর্যুপরি অনুরোধ ও শহীদ আনোয়ার হোসেনের পিতা নিজে ক্ষমা করে দেয়ায় এই লঘু শাস্তি নির্ধারণ করা হয়েছিলো।

শহীদ আনোয়ারের সেই মৃত্যুপূর্ব কাতর আহ্বানে যাদের প্রাণ বেঁচে গিয়েছিলো, সেই সব কৃতজ্ঞ মানুষেরা প্রতি বছর ১৬ ডিসেম্বর শহীদ আনোয়ারের পিতার কাছে এসে দেখা করতো (যতোদিন তিনি বেঁচে ছিলেন), কৃতজ্ঞ চিত্তে শ্রদ্ধা জানাতো এমন বীরের গর্বিত পিতা-মাতাকে। সেই সাথে সর্বদাই স্মরণ করতো আনোয়ার হোসেনের এই আত্মত্যাগকে।

শহীদ আনোয়ার হোসেনকে শেখেরচর মাদরাসা ও ঈদগাহ গোরস্থানে সমাহিত করা হয়েছিলো। প্রতি বছর ১৫ অক্টোবর তাঁর সমাধি ফুলে ফুলে ছেয়ে যায়।

নরসিংদীর মুক্তিযুদ্ধে ন্যাপ-সিপিবি-ছাত্র ইউনিয়ন গেরিলা বাহিনির ভূমিকা

বাঙালি জাতির ইতিহাসে সবচে’ গর্ব এবং গৌরবের অধ্যায় ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা অর্জন। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে সমগ্র জাতি ঐক্যবদ্ধ হয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। ঐতিহাসিক মুজিবনগর সরকার কর্তৃক গঠিত সেনাবাহিনি, ভারতে এবং দেশের অভ্যন্তরে ট্রেনিংপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে জনগণ এই মহান যুদ্ধে নানাভাবে অংশগ্রহণ করে। ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ সামগ্রিক বিবেচনায় ছিলো একটি জনযুদ্ধ।

আওয়ামী লীগ ছাড়াও ন্যাপ (মোজাফফর), ন্যাপ (ভাসানী), কমিউনিস্ট পার্টি এবং বাম ছাত্র সংগঠনগুলো মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। পাকিস্তানের ২৩ বছরের সংগ্রামের ইতিহাসে বাম রাজনৈতিক দল এবং ছাত্র সংগঠনের ভূমিকা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিশেষ করে, ’৬৯-এর গণআন্দোলনে আওয়ামী লীগের ৬ দফার সাথে ছাত্রলীগ-ছাত্র ইউনিয়নের ১১ দফা দাবি আন্দোলনকে চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে যায়। বঙ্গবন্ধু কারাগার থেকে মুক্ত হন। দেশ স্বাধীনতার পথে এগিয়ে যায়।

স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসে সারা দেশের মতো নরসিংদী জেলাও বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করে। নরসিংদী জেলার মুক্তিযুদ্ধে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের সাথে বাম রাজনৈতিক দল এবং ছাত্র সংগঠনের অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক আলোচনার এই অংশে ন্যাপ (মোজাফফর), কমিউনিস্ট পার্টি (মনি সিং) এবং ছাত্র ইউনিয়ন (মতিয়া)-এর যৌথ গেরিলা বাহিনির অবদানের সংক্ষিপ্ত বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধে নরসিংদী কলেজের রয়েছে ঐতিহাসিক অবদান। ১৯৭০-এর কলেজ ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ছাত্র ইউনিয়নের মতিয়া গ্রুপের ভুলু-মুজিব পরিষদ বিজয়ী হয়। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতিপর্বে নরসিংদী কলেজের ছাত্র-শিক্ষকেরা নানাভাবে প্রস্তুতি নিতে থাকে। নরসিংদী কলেজের তৎকালীন অধ্যক্ষ ছিলেন আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার অন্যতম আসামী নৌ-বাহিনির সাবেক কমান্ডার আবদুর রউফ। তিনি ১৯৭১ সালে ভারতে যাওয়ার পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধে ছাত্র-শিক্ষকদের সংগঠিত করাসহ নানাভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। দেশ স্বাধীন হবার পর তিনি কলেজের দায়িত্বে ফিরে এলেও দেশ গড়ার সংগ্রামে অংশ নেয়ার জন্যে অধ্যক্ষের দায়িত্ব ছেড়ে তৎকালীন ন্যাপ (মোজাফফর) রাজনৈতিক দলে যোগদান করেন।

নরসিংদী সদর এবং নরসিংদী কলেজে ন্যাপ (মোজাফফর), ছাত্র ইউনিয়ন (মতিয়া)-এর মুক্তিযুদ্ধকালীন নেতৃত্বে এবং অংশগ্রহণে যাঁরা ভূমিকা রেখেছেন, তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন— হাবিবুল্লাহ বাহার, আবুল হাশিম মিয়া, আতাউর রহমান ভূঁইয়া এবং তৎকালীন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ ছাত্র শহীদুল্লাহ বাহার, নূরুল ইসলাম গেন্দু, আজিজ আহমেদ খান, বি এ রশিদ, আলী আহমেদ, রফিকুল ইসলাম, মজিবর রহমান, সামছুল হক ভূঞা, বদরুজ্জামান বদু ভূঞা, গাজী শাহাবুদ্দিন, যূথিকা চ্যাটার্জী, কার্তিক চ্যাটার্জী। যূথিকা চ্যাটার্জী ও কার্তিক চ্যাটার্জীর বাবা ছিলেন জিনারদীর বিজয় চ্যাটার্জী, যিনি ছিলেন প্রখ্যাত বাম রাজনীতিবিদ এবং যুক্তফ্রন্টের পার্লামেন্ট সদস্য। দেশের কৃষক-প্রজা এবং সাধারণ মানুষের মুক্তির জন্যে জেল-জুলুম-নির্যাতন ভোগ করেছেন। মুক্তিযুদ্ধকালীন দেশে এবং ভারতে অবস্থানকালীন তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে।

হাবিবুল্লাহ বাহারের নেতৃত্বে নরসিংদী সদরের মুক্তিযোদ্ধাদের একটি বড়ো অংশ ভারতে ট্রেনিং গ্রহণ করে দেশে ফিরে যুদ্ধে অংশ নেন। এই দলের অন্যান্য সদস্যরা দেশের অভ্যন্তরে ট্রেনিং গ্রহণ করেন। ট্রেনিংয়ের প্রধান অস্ত্র ছিলো থ্রি নট থ্রি রাইফেল, স্টেনগান, এলএমজি ও হ্যান্ড গ্রেনেড।

দীর্ঘ নয় মাসের যুদ্ধ শেষে ১৯৭১ সালের ১২ ডিসেম্বর নরসিংদী মুক্ত হয়। নরসিংদী মুক্ত হওয়ার গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে ভারতীয় মিত্রবাহিনির সাথে হাবিবুল্লাহ বাহারের নেতৃত্বে মুক্তিবাহিনি নরসিংদী শহরে প্রবেশ করে এবং এই বাহিনির হাতে অনেক রাজাকার (যারা পালাতে পারেনি) আত্মসমর্পণ করে এবং তাৎক্ষণিক সংঘর্ষে বেশ কয়েকজন রাজাকার মৃত্যুবরণ করে।

বিজয়ের প্রাক্কালে এই বাহিনির দুজন মুক্তিযোদ্ধা মতিউর রহমান এবং আবদুল হারিছ শহীদ হন।

মহান মুক্তিযুদ্ধে রায়পুরা-বেলাব অঞ্চলেও বাম রাজনীতিবিদ ও জনগণের বিরাট ভূমিকা রয়েছে। কৃষক আন্দোলনসহ সকল রাজনৈতিক আন্দোলনে রায়পুরা-বেলাব অঞ্চলের অংশগ্রহণ ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছে।

রায়পুরা অঞ্চলে কৃষকনেতা ফজলুল হক খোন্দকার একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের একজন শীর্ষ সংগঠক। ১৯৭১ সালে তাঁর নেতৃত্বে রায়পুরার বহু যুবক-তরুণ মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং গ্রহণ করার জন্যে ভারতে চলে যান এবং ট্রেনিং নিয়ে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। তিনি স্থানীয়ভাবে রায়পুরার ৫ টি স্থানে ছাত্র-যুবকদের মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করেন। তাঁর দলের অন্যতম মুক্তিযোদ্ধারা ছিলেন— আবদুল হালিম, আবদুল কুদ্দুস, পলাশতলীর হাশিম চেয়ারম্যান, রহিমাবাদের সুভাষ সাহা, প্রীতিরঞ্জন সাহা প্রমুখ। এই দলেরই দুজন সদস্য ঐতিহাসিক বেতিয়ারা যুদ্ধে শহীদ হন। তাঁরা হলেন— শহীদ জহিরুল হক দুদু এবং শহীদ বশিরুল ইসলাম।

মুক্তিযুদ্ধে বেলাব অঞ্চলে নেতৃত্ব দেন কৃষকনেতা আবদুল হাই, শামসুল হক (চেয়ারম্যান), বাবর আলী মাস্টার। এই দলের অন্যান্য মুক্তিযোদ্ধারা ছিলেন বারৈচার আবদুল আলী মৌলভী, খালেক মাস্টার, আজিম উদ্দিন মস্তু, আবদুল কাদির, জিলানী কাদির প্রমুখ। মুক্তিযুদ্ধের প্রধান ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত বেলাব অঞ্চলে যুদ্ধের প্রধান ট্রেনিংকেন্দ্র ছিলো আবদুল হাইয়ের বাড়ি। বাড়িটি ট্রেনিং-বাড়ি হিসেবেই পরিচিতি লাভ করে। এছাড়াও আরো কয়েক স্থানে ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়। যুদ্ধকালীন জাতীয় পর্যায়ের বাম রাজনীতিবিদদের একটি প্রধান বিচরণ ক্ষেত্র ছিলো এই বেলাব অঞ্চল।

নরসিংদী জেলার মনোহরদী অঞ্চলে মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সংগঠক ছিলেন আবদুর রশিদ তারা মাস্টার। তাঁর নেতৃত্বে একটি বিশাল বাহিনি মনোহরদী অঞ্চলে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে দেশকে শত্রুমুক্ত করতে বিশেষ অবদান রাখে। তাঁর দলের অন্যতম সংগঠক ও যোদ্ধারা ছিলেন— শামসুল ইসলাম (খিদিরপুর), আবুল হোসেন (বড়চাপা), আবু তাহের (বড়চাপা), কুদ্দুস মৃধা (একদুয়ারিয়া), এম এন রশিদ (চন্দনবাড়ী), নিত্য গোপাল রায় প্রমুখ।

মনোহরদী অঞ্চলের আরেকজন বাম রাজনীতিবিদ এবং মুক্তিযুদ্ধের শীর্ষ সংগঠক ছিলেন ফয়েজ মাস্টার। পেশায় ছিলেন শিক্ষক। ছাত্রজীবনেই তিনি ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন এবং একাধিকবার জেল খাটেন। মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক হিসেবে তাঁর অবদান অনন্য।

নরসিংদী জেলায় মুক্তিযুদ্ধে দলমত নির্বিশেষে সকলের অংশগ্রহণে বিজয় ত্বরান্বিত হয়। আমরা পাই একটি স্বাধীন ও মুক্ত স্বদেশ।


গোলাম মোস্তাফা মিয়া
সাবেক অধ্যক্ষ, নরসিংদী সরকারি কলেজ

নরসিংদীতে যেভাবে বিজয় অর্জিত হয় : সংক্ষিপ্ত পাঠ

১৯৭১ সালে দীর্ঘ ৯ মাস নরসিংদী জেলার বিভিন্ন স্থানে শতাধিক খণ্ডযুদ্ধ সংঘটিত হয়। ওই যুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনির নির্মমতার শিকার হয়ে শহীদ হন ১১৬ জন বীর সন্তান। এর মধ্যে নরসিংদী সদরের ২৭ জন, মনোহরদীর ১২ জন, পলাশের ১১ জন, শিবপুরের ১৩ জন, রায়পুরার ৩৭ জন ও বেলাব উপজেলার ১৬ জন।

রাজনৈতিকভাবে অগ্রসরমান ঢাকার অদূরের নরসিংদী জেলায় মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত হয়েছিলো এক অদম্য শক্তি নিয়ে, স্বপ্রণোদিতভাবে। যুদ্ধ অনভিজ্ঞ তরুণ ছাত্র, কৃষক, শ্রমিক, জনতা মুক্তির স্পৃহায় অটুট মনোবল নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধে। মনোবলই যে অধিকতর শক্তিশালী, পুরো যুদ্ধকালীন তার প্রমাণ রেখেছেন নরসিংদীর বীর মুক্তিযোদ্ধারা।

১৯৭১-এর পাকিস্তানি বাহিনির নির্মম হত্যাযজ্ঞের কথা মনে করে এখনো ভয়ে আতকে ওঠেন নরসিংদীবাসী। স্বজন হারানোদের কান্নায় এখনো ভারি হয়ে ওঠে আকাশ-বাতাস। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনির নির্মমতার সাক্ষী ২২ টি গণকবর রয়েছে নরসিংদী জেলাজুড়ে। স্বাধীনতার ৫০ বছরেও অযত্ন ও অবহেলায় পড়ে আছে এসব গণকবর। সংরক্ষণ না করায় অরক্ষিত এসব গণকবরের শেষ চিহ্নটুকু মুছে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।

মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নরসিংদীর এমন কোনো স্থান নেই, যেখানে ৭১-এ শত্রু সেনাদের নিষ্ঠুর ছোবল পড়েনি। ১৯৭১ সালে নরসিংদী জেলার বেশ কয়েকটি স্থানে নির্মম হত্যাযজ্ঞ চালায় পাকিস্তানি বাহিনির সদস্যরা। স্বাধীনতা যুদ্ধের শুরু থেকেই নরসিংদী জেলায় প্রতিরোধ গড়ে ওঠে। ৭১-এ বর্তমান জেলা সদরের বিভিন্ন এলাকা থেকে ২৭/২৮ জনকে ধরে নিয়ে পাকিস্তানি সেনাদের ক্যাম্প নরসিংদীর টেলিফোন এক্সচেঞ্জে আটক রাখা হতো। নির্যাতন শেষে তাদের নিয়ে যাওয়া হতো বর্তমান ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের পাঁচদোনা মোড় সংলগ্ন লোহারপুলের নিচে। সেখানে ৪/৫ জনকে বসিয়ে রেখে তাদের সামনে ২০/২২ জনকে গুলি করে হত্যা করে পাকিস্তানি বাহিনি। হত্যা শেষে লোহারপুলের নিচে সবাইকে একসঙ্গে মাটিচাপা দেয়। আজো স্থানীয় বাসিন্দাদের কানে সেদিনের আর্ত চিৎকারের শব্দ ভেসে আসে। বোমা বর্ষণ ও নরসিংদী দখলের পর পাকিস্তানি বাহিনির নির্মম নির্যাতনের কারণে বিক্ষুদ্ধ অসহায় জনতা আক্রোশে ফুঁসতে থাকে। নরসিংদীর নেতারা, ইপিআর, বেঙ্গল রেজিমেন্টের বিদ্রোহী সৈন্য এবং যুবক শ্রেণি দ্রুত নরসিংদী শহর ছেড়ে চলে যায়।

৭১ সালে দীর্ঘ ৯ মাস নরসিংদী জেলার বিভিন্ন স্থানে শতাধিক খণ্ডযুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে। ৭১-এর মার্চে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের একটি কোম্পানি হানাদার বাহিনিকে প্রতিরোধ করতে নরসিংদীতে ইপিআর, আনসার ও পুলিশ বাহিনির সঙ্গে মিলিত হয়। এতে হাজার হাজার ছাত্র-জনতা তাদের স্বাগত জানায়। নরসিংদী জেলার বিভিন্ন স্থানে প্রশিক্ষণ কেন্দ্র খুলে শত শত যুবকদের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। পরে শুরু হয় প্রতিবাদ-প্রতিরোধ ও চোরাগুপ্তা হামলা।

মুক্তিযুদ্ধে নরসিংদী জেলা ছিলো ২ নং সেক্টরের অধীনে। সেক্টর কমান্ডার ছিলেন তৎকালীন মেজর জেনারেল সফিউল্লাহ। নরসিংদীকে ৩ নং সেক্টরের অধীনে নেয়া হলে কামান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এএনএম নূরুজ্জামান (পরবর্তীতে যিনি ছিলেন রক্ষীবাহিনি প্রধান)।

নরসিংদী জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার আব্দুল মোতালিব পাঠান বলেন, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে নরসিংদীর মুক্তিযোদ্ধাদের গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা রয়েছে। সশস্ত্র যুদ্ধে জেলার বিভিন্ন স্থানে শত শত নারী-পুরুষকে নির্বিচারে হত্যা করে গণকবর দিয়েছিলো পাকিস্তানি বাহিনি। গণকবরগুলোর বেশিরভাগই চিহ্নিত করা হয়েছে। বর্তমান সরকার এসব সংরক্ষণ করার চেষ্টা করছে। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের ভয়াবহ রাতের পর ৪ এপ্রিল পাকিস্তানিদের বিমান হামলায় নরসিংদী শহর ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিলো। এ-হামলায় শহীদ হন আব্দুল হক, নারায়ণচন্দ্র সাহা, চাঁদ মোহন দাস, জগদীস দাস, নির্মল দাসসহ নাম না জানা আরো অনেকে। এছাড়া মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন নরসিংদীর পাঁচদোনা ব্রিজে বিভিন্ন যানবাহন থেকে নামিয়ে পাকসেনা ও তাদের দোসর রাজাকাররা নিরীহ মানুষদের হত্যা করে ব্রিজের নিকট গণকবর দিয়েছে। এ-স্থানটি বধ্যভূমি হিসেবে সরকার কর্তৃক চিহ্নিত করা হয়েছে এবং জেলার সবগুলো বধ্যভূমি সংরক্ষণ করার জন্যে উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। নরসিংদীতে অনেকগুলো মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স নির্মাণ করা হয়েছে। স্বাধীন মাতৃভূমি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে মুক্তিবাহিনিরা মার্চ মাস থেকেই সশস্ত্র যুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু করে পাক বাহিনির অন্তরাত্মা কাঁপিয়ে দেয়।

২৩ মে তৎকালীন মুসলীম লীগ নেতা মিয়া আবদুল মজিদ মুক্তিসেনাদের গুলিতে নিহত হন। এরপরই পাক বাহিনি নরসিংদী টেলিফোন ভবনে ঘাঁটি স্থাপন করে। স্থানীয় টাউট, দালাল ও রাজাকারদের যোগসাজশে হানাদার বাহিনিরা প্রতিদিন চালায় ধর্ষণ, নরহত্যা ও লুটতরাজ। অপরদিকে বাংলার মুক্তি পাগল ছেলেরা প্রতিরোধের প্রস্তুতি নেয় এবং আঘাত হানে শত্রু শিবিরে।

নরসিংদী সদর উপজেলায় নেহাব গ্রামের ন্যাভাল সিরাজের নেতৃত্বে হানাদার প্রতিরোধ দুর্গ গড়ে তোলা হয়। ওই স্থান থেকে সমগ্র জেলায় মুক্তিযোদ্ধারা নিরলসভাবে তৎপরতা অব্যাহত রাখে। নরসিংদীকে মুক্ত করতে পাক বাহিনির সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধারা যেসব স্থানে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিলেন এবং গণহত্যা ও গণকবর ও বধ্যভূমি রয়েছে, সেই স্থানগুলো হলো— নরসিংদী সদর উপজেলার বাঘবাড়ী, পালবাড়ী, আলগী, পাঁচদোনা, খাটেহারা ব্রিজে প্রথম ও দ্বিতীয় রেইড, শীলমান্দি গ্রামে রেলগাড়ি অ্যাম্বুশ, অপারেশন বড়ৈবাড়ী, বাদুয়ারচরে বাড়িঘর পোড়ানো ও নির্যাতন, চিনিশপুর তিতাস গ্যাস সাব-স্টেশন রেইড, ইউনাইটেড মেঘনা চাঁদপুর (ইউএমসি) পাটকলে পণ্যবাহী জাহাজ ধ্বংস, তিতাস গ্যাস লাইন অপারেশন, আনন্দীতে বৈদ্যুতিক টাওয়ার অপারেশন, ব্রাহ্মন্দী হাই স্কুলে আক্রমণ ইত্যাদি। শিবপুর উপজেলার পুটিয়া, ঘাসিরদিয়ার মাইন বিস্ফোরণ, অপারেশন ভরতের কান্দি, বানিয়াদির যুদ্ধ, চন্দনদিয়া, দত্তের গাঁও, দুলালপুর, মরজাল, যোশর বাজার, লেটারবর, কাটাঘাট বাজার। মনোহরদী উপজেলার হাতিরদিয়া বাজার, হেতিমদি, দশদোনা অ্যাম্বুশ, মনোহরদী ডাকবাংলো রেইড, হাতিরদিয়ার অ্যাম্বুশ, রামপুর অ্যাম্বুশ, পাতিরদিয়ায় গরুর গাড়ি বহরে আক্রমণ, ব্রহ্মপুত্র নদীতে লঞ্চ আক্রমণ, মনোহরদী থানা আক্রমণ, হানাদারদের চালাকচর বাজার ঘেরাও, গাইকাল অ্যাম্বুশ। রায়পুরা উপজেলার শ্রীরামপুর বাজার, রামনগর, মেথিকান্দা, হাটুভাঙ্গা, বাঙালিনগর, খানাবাড়ী, আমিরগঞ্জ ব্রিজ, গৌরীপুর গণহত্যা, কোহিনুর জুট মিল গণহত্যা, তেলিয়াপাড়ার যুদ্ধ, শ্রীরামপুর বাজার পোড়ানো, রামনগর ঘেরাও এবং গণহত্যা, রামনগরের দ্বিতীয় যুদ্ধ, মেথিকান্দা রেলস্টেশনে হানাদারদের আক্রমণ, রামনগর গ্যাস লাইন অপারেশন, রায়পুরা সদর কলোনির যুদ্ধ, দৌলতকান্দি প্রতিরক্ষা অভিযান, গৌরীপুর গণহত্যা, কোহিনুর জুট মিল হত্যাকাণ্ড ইত্যাদি। বেলাব উপজেলার নারায়ণপুর বাজার, পোড়াদিয়া বাজার অ্যাম্বুশ, বড়িবাড়ী ও নীলকুঠি নামক স্থানে গণহত্যা। পলাশ উপজেলার ঘোড়াশাল টেলিফোন এক্সচেঞ্জ রেইড, ফৌজি চটকলের নিষ্ফল অপারেশন, পাক বাহিনির নেহাব গ্রাম ঘেরাও, নেহাব গ্রামের প্রতিরোধ যুদ্ধ, শীতলক্ষ্যা নদীতে গানবোট আক্রমণ, ঘোড়াশাল ব্রিজ অপারেশন, ভোলাব গ্রামের প্রতিরোধ যুদ্ধ, শিল্পাঞ্চলের যুদ্ধ, পাকিস্তানি সেনাবাহিনি ও তাদের দোসরদের চরাপাড়ায় আগুন ও হত্যা, ডাঙ্গায় গণহত্যা, ডাঙ্গা এলাকায় জ্বালাও-পোড়াও, খিলপাড়ায় গণহত্যা, আটিয়া গ্রামে গণহত্যা ও আগুন, জিনারদীর যুদ্ধ, মূলপাড়ার যুদ্ধ, জিনারদী রেলস্টেশন রেইড ও পার্শ্ববর্তী ছনপাড়া ও বাগহাটার কালভার্ট উড়ানো, ঘোড়াশাল ব্রিজ ও রেলস্টেশন রেইড, ন্যাশনাল জুট মিল হত্যাকাণ্ড ইত্যাদি।

বেলাব যুদ্ধের সময় আড়িয়াল খাঁ নদীর পাড়ে বেলাব বড়িবাড়ী ও নীলকুঠির যুদ্ধে হানাদারদের হাতে শহীদ হন সুবেদার আবুল বাশার, মমতাজ উদ্দিন, আব্দুস সালাম ও আব্দুল বারী। এছাড়া পাক হানাদার বাহিনি বড়িবাড়ী বাজনাবর নিরীহ ৮/১০ জনকে ধরে এনে একসঙ্গে গুলি করে হত্যা করে এবং বাড়িঘরে আগুন ধরিয়ে দেয়। পাক বাহিনিরা রাজাকারদের সহযোগিতায় নরসিংদী জেলার ২২ টি স্থানে নৃশংস হত্যাকাণ্ড চালিয়েছিলো।

১৯৭১ সালের ১১ ডিসেম্বর বিকালে ভারতীয় সেনাবাহিনির কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রামচরণ সিংয়ের নেতৃত্বে একটি ব্রিগেড ১১ টি হেলিকপ্টার নিয়ে নরসিংদী শহরের পার্শ্ববর্তী বালুশাইর চকে অবতরণ করে। এরপর ভারতীয় বিমান বাহিনির মিগ-২১ যুদ্ধবিমান নিয়ে নরসিংদী শহরের পাক বাহিনির ক্যাম্প লক্ষ্য করে ব্যাপক বোমা বর্ষণ শুরু করে। অবস্থা বেগতিক দেখে পাকসেনারা দিশেহারা হয়ে পড়ে। তাছাড়া জিনারদী রেলস্টেশনের পূর্বপাশে পাটুয়া গ্রামে সংঘটিত হয় একটি যুদ্ধ। যুদ্ধটি ছিলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এ-যুদ্ধের মধ্যেই নিহিত ছিলো নরসিংদীকে মুক্তাঞ্চল ঘোষণা করার মুহূর্তটি। ইতোমধ্যেই নরসিংদীর আশপাশের থানাগুলো থেকে হানাদার বাহিনি তাদের তল্পিতল্পা গুটাতে বাধ্য হয়। মুক্তিযোদ্ধাদের প্রবল চাপের মুখে তাই নরসিংদীর হানাদাররাও যেকোনো মুহূর্তে ঢাকা চলে যাওয়ার জন্যে উদগ্রীব হয়ে পড়ে। সম্ভবত, এমনি একটি দল ১২ ডিসেম্বর সকালবেলা জিনারদী রেলস্টেশনের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে এ-খবর পৌঁছামাত্র ন্যাভাল সিরাজের নেতৃত্বে একটি দল পাটুয়া গ্রামে হানাদারদের গতি রোধ করে। শুরু হয় প্রচণ্ড যুদ্ধ। প্রায় ঘণ্টাখানেক যুদ্ধ চলার পর মনোবল ভাঙা ২১ জন হানাদার অস্ত্র-শস্ত্রসহ মুক্তিযোদ্ধাদের কছে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়। ফলে ১২ ডিসেম্বর নরসিংদীকে সম্পূর্ণ মুক্ত এলাকা বলে ঘোষণা করা হয় এবং বাংলাদেশের পতাকা নিয়ে বিজয় মিছিল বের করা হয়। ২১ জন হানাদারের মধ্যে ২ জন মারাত্মক আহত হওয়ায় তাদেরকে হত্যা করা হয়। বাকি ১৯ জনকে স্বাধীনতার পর ১৭ জানুয়ারি মেজর হায়দারের মাধ্যমে রমনা থানায় জমা দেয়া হয়। এমনিভাবে নরসিংদীতে সমাপ্তি ঘটে নয় মাসের শ্বাসরুদ্ধকর মুক্তিযুদ্ধের। মুক্তির আনন্দে জনগণ উদ্বেল হয়ে ওঠে এবং লাভ করে পরম শান্তি। মুক্তিযোদ্ধারা লাভ করে জনগণের অকুণ্ঠ ভালোবাসা।

নরসিংদীর ৬ উপজেলার বীর সন্তানেরাই মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিলেন। তাদের মধ্যে বীরশ্রেষ্ঠ ফ্লাইট লে. মতিউর রহমান, প্রাক্তন মন্ত্রী প্রয়াত আব্দুল মান্নান ভূঁইয়া, প্রয়াত সাংসদ আফতাব উদ্দিন ভূঁইয়া, সাবেক মন্ত্রী রাজিউদ্দিন আহম্মেদ রাজু, প্রয়াত সাংসদ মেজর (অব.) সামসুল হুদা বাচ্চু, সাবেক সাংসদ অধ্যাপক সাহাবুদ্দিন, সাবেক সাংসদ সরদার শাখাওয়াত হোসেন বকুল, সাবেক সাংসদ আব্দুল আলী মৃধা, ন্যাভাল সিরাজ উদ্দিন আহম্মেদ, ফজলুর রহমান ফটিক মাস্টার, আজিজুর রহমান ভুলু, মজনু মৃধা, আব্দুল রাজ্জাক ভূঁইয়া, কাজী হাতেম আলী, প্রয়াত হাজী গয়েছ আলী মাস্টার, প্রয়াত নূরুল ইসলাম কাঞ্চন, আলী আকবর, মো. আমানুল্লাহ, সিরাজুল হক, তাজুল ইসলাম খান, অধ্যাপক মো. ইউনুছ, আব্দুল মোতালিব পাঠান, মীর এমদাদ, মো. নূরুজ্জামান, আব্দুল লতিফ, হাবিবুল্লাহ বাহার, নিবারণ রায়, মনছুর আহম্মেদ, আলী আকবর সরকার, নূরুল ইসলাম গেন্দু, বাবর আলী মাস্টার, আবেদ আহমেদ, আব্দুল হাই, সমশের আলী ভূঁইয়া, মতিউর রহমান মাস্টার, আব্দুল মান্নান খান, তোফাজ্জল হোসেন মাস্টার, বিজয় চ্যাটার্জী, ইমাম উদ্দিন ও সাদেকুর রহমান অন্যতম।

মুক্তিযুদ্ধকালে বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে শহীদ হয়েছেন গিয়াস উদ্দিন আহমেদ, অধ্যাপক সরোজ কুমার অধিকারী, ড. সাদত আলী, মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ, মোহাম্মদ সামসুজ্জামান ও মোহাম্মদ ফজলুর রহমান।

মুক্তিযুদ্ধে অনন্য অবদানের জন্যে জাতীয় পর্যায়ে বিশেষ খেতাবে ভূষিত হয়েছেন নরসিংদীর ৯ জন। তারা হলেন ফ্লাইট লে. শহীদ মতিউর রহমান (বীরশ্রেষ্ঠ), লে. কর্নেল আব্দুর রউফ (বীরবিক্রম), সুবেদার খন্দকার মতিউর রহমান (বীরবিক্রম), বিগ্রেডিয়ার (অব.) এএনএম নূরুজ্জামান (বীরবিক্রম), সুবেদার ফজলুর রহমান (বীরবিক্রম), শহীদ মো. শাহাবুদ্দিন নান্টু (বীরবিক্রম), ন্যাভাল সিরাজ উদ্দিন আহম্মেদ (বীরপ্রতীক), লে. কর্নেল (অব.) মো. নজরুল ইসলাম হিরু (বীরপ্রতীক), হাবিলদার মো. মোবারক হোসেন (বীরপ্রতীক)।


ড. মো. মোয়াজ্জেম হোসেন
চেয়ারম্যান, নরসিংদী প্রেসিডেন্সি কলেজ

নরসিংদীতে মুক্তিযুদ্ধ ও ন্যাভাল সিরাজ

সড়কের পাশে হোন্ডা রেখে তিনি কাঠের পুলটি সবেমাত্র পার হয়েছেন, এমন সময় তাঁর উপর অতর্কিতে গুলিবর্ষণ শুরু হয়। তিনি খালের পানিতে ঝাঁপ দেন। হয়তো ভেবেছিলেন, পানির নিচে ডুব দিয়ে তিনি বহুদূর চলে যাবেন, যেমনটা তিনি করেছিলেন পাকিস্তানিদের ক্যাম্প আক্রমণ করার বেলায়। কিন্তু এবার তা হলো না। খালে অতোটা পানি ছিলো না। তাঁর উপর আবার গুলি হয়। সঙ্গী কৃষককর্মী লিয়াকত ঝাঁপ দিয়ে পড়ে নিজের শরীর দিয়ে তাঁকে বাঁচানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু পারেননি।

সে এক উত্তাল সময়। যিনি বা যারা সেই সময়ের মধ্য দিয়ে যাননি, তিনি বা তারা এর ছোঁয়া পাননি। এমন কারো পক্ষে তা পুরোপুরি অনুভব করাও সম্ভব নয়। সময়টা সত্যিই আমাদের জাতির জন্যে অপরিসীম গৌরবের। বীরের জাতি হিসেবে বিশ্বব্যাপী পরিচিত হওয়ার সময় ছিলো তখন। এমন সময় কোনো জাতির জীবনে বোধ হয় একবারই আসে।

সত্তর সালের নির্বাচনে জয়লাভ আর পশ্চিম পাকিস্তানিদের তা মেনে না নেয়া, মার্চে অসহযোগ আন্দোলন, ২৫ মার্চের গণহত্যা পেরিয়ে যুদ্ধের দামামা বেজে ওঠলো চারদিকে। শহর, বন্দর, গ্রাম, গঞ্জ— সর্বত্র। উদ্দাম সেই ঢেউ আজকের নরসিংদীর জনপদকেও তোলপাড় করলো। তখনকার নরসিংদী অবশ্য এখনকার মতো ছিলো না। নরসিংদী ছিলো একটি থানা; ঢাকা জেলার নারায়ণগঞ্জ মহকুমার। রায়পুরা, শিবপুর, মনোহরদীও একই মহকুমায়। অন্যদিকে, পলাশ ছিলো কালীগঞ্জ থানাধীন, ঢাকা সদরের উত্তর মহকুমায়। পলাশের ডাঙ্গা ইউনিয়ন ছিলো রূপগঞ্জ থানাধীন। নরসিংদীর ভূ-প্রকৃতি ও যোগাযোগ ব্যবস্থাও তখন ভিন্নরকম ছিলো। ঢাকার সঙ্গে যোগাযোগের একমাত্র পাকা সড়ক ডেমরা-ভূলতা-মাধবদী-পাঁচদোনা হয়ে নরসিংদী। ডেমরায় শীতলক্ষ্যা নদীতে ছিলো ফেরি পারাপারের ব্যবস্থা। বিকল্প ছিলো রেলপথ।

পাকিস্তানের নৌ-বাহিনিতে কর্মরত নরসিংদী থানার নেহাব গ্রামের সিরাজ উদ্দিন আহমেদ তখন ছুটিতে তাঁর গ্রামের বাড়িতে। মার্চ মাসের ঘটনাবলি তাঁকে ছুঁয়ে যায়। রক্তে আগুন ধরায়। পঁচিশে মার্চের পর তিনি বিদ্রোহ করেন। এলাকার ছাত্র-যুবকদের সঙ্গে নিয়ে তিনি গেরিলা বাহিনি গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু অস্ত্র পাবেন কোথায়? সেই সুযোগও এসে পড়লো সহসাই।

সিরাজ উদ্দিন আহমেদ (১৯৩৬-১৯৭২)

পাকিস্তান সেনাবাহিনিতে কর্মরত বেঙ্গল রেজিমেন্ট ও সীমান্তরক্ষী ইপিআরের বিদ্রোহী অফিসার ও সৈনিকেরা ডেমরায় প্রতিরোধ যুদ্ধে অবতীর্ণ হয় এপ্রিলের প্রথমদিকে। পরে তাঁরা পিছু হটে নরসিংদীতে আসেন। এই দলের নেতা ছিলেন ক্যাপ্টেন মতিউর রহমান। তাঁরা ঢাকা-নরসিংদী সড়কের বাগবাড়িতে অবস্থান নিয়ে প্রতিরোধ ব্যূহ গড়ে  তোলেন। সিরাজ উদ্দিন আহমেদ তাঁদের সাথে যোগ দেন। পরে পাকিস্তানি বাহিনি নরসিংদী অভিমুখে অগ্রসর হলে ৯ এপ্রিল এখানে প্রচণ্ড লড়াই বাঁধে। এই অঞ্চলে মুক্তিযুদ্ধের প্রথম লড়াই। শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানিদের ভারি অস্ত্রের গোলাবর্ষণের সামনে টিকতে না পেরে তাঁরা পিছু হটতে বাধ্য হয়। অবস্থান নেয় পাঁচদোনার পালবাড়িতে। ১০ এপ্রিল পাঁচদোনায় তাঁরা অগ্রসরমান পাকিস্তানি বাহিনিকে প্রতিরোধ করে। প্রতিরোধের মুখে পাকিস্তানি বাহিনি পিছু হটে বাবুরহাটে অবস্থান নেয়। ঢাকা থেকে বাড়তি সৈন্যবহর এসে তাদের সঙ্গে যোগ দেয়। অনেক রাত অবধি যুদ্ধ চলে। প্রতিরোধ যোদ্ধাদের গোলাবারুদ ফুরিয়ে এলে তাঁরা শেষ পর্যন্ত অবস্থান ত্যাগ করতে বাধ্য হন। ঐ-সময় তাঁদের সঙ্গে যেসব অস্ত্রশস্ত্র ছিলো, সিরাজ সাহেব সেগুলো চেয়ে নেন। এই অস্ত্র তাঁর গেরিলা বাহিনি গঠনে সহায়ক হয়। তিনি নেহাব গ্রামে যুবকদের ট্রেনিং দেন এবং শক্তিশালী ক্যাম্প গড়ে তোলেন। গেরিলাদের কমান্ডার হিসেবে ‘ন্যাভাল সিরাজ’ নামে তিনি লোকমুখে পরিচিতি পান।

এ-সময় নরসিংদী থানার নেহাব’র পাশাপাশি শিবপুরেও গেরিলা বাহিনি গড়ে ওঠে। ২৫ মার্চের পর শিবপুরে ছাত্র-জনতা থানার অস্ত্র দখলে নিয়ে ঐ-বাহিনি গড়ে তোলেন। এর সংগঠক ছিলেন আবদুল মান্নান ভূঁইয়া। ন্যাভাল সিরাজের সাথে শিবপুর কেন্দ্রের যোগাযোগ স্থাপিত হয় অল্প সময়েই। শিবপুরে গেরিলা বাহিনিতে যোগ দেয়া যুবকের সংখ্যা ছিলো অনেক। কিন্তু তাদের অস্ত্রশস্ত্র তেমন ছিলো না। এ-সময় ঢাকার পিলখানায় ইপিআরের অস্ত্রাগার লুট করে নিয়ে আসে একদল বিদ্রোহী ইপিআর। তারা সেই অস্ত্র ডেমরা থেকে একটি লঞ্চে করে নিয়ে আসেন ডাঙ্গায়। তাঁদের নেতা ছিলেন হাবিলদার হারুন। কিশোরগঞ্জের বাজিতপুরের মানুষ। ডাঙ্গায় ন্যাভাল সিরাজের সাথে তাঁদের যোগাযোগ হয়। তাঁদের সেই অস্ত্রের কিছু ডাঙ্গায় নামিয়ে নিজের ক্যাম্পে নেন তিনি। বাকি অস্ত্র ঐ-লঞ্চে করেই শীতলক্ষ্যা নদী দিয়ে তিনি নিয়ে যান প্রথমে চরসিন্দুর ও পরে হাতিরদিয়া নামক স্থানে। উদ্দেশ্য শিবপুরে নেয়া। হাতিরদিয়ায় তিনি এবং হাবিলদার হারুন সেসব আবদুল মান্নান ভূঁইয়ার গেরিলা বাহিনির জন্যে তাঁকে দেন। আর এর ফলে এপ্রিল মাস থেকেই বর্তমান নরসিংদী জেলায় মুক্তিযুদ্ধের দুইটি শক্তিশালী কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়। নেহাব ও শিবপুরে।

এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়— কবির কথার মতোই ছিলো সেই সময়টা। নরসিংদীর তরুণদের কাছেও। সাহসী তরুণেরা যুদ্ধে যাওয়ার জন্যে এই দুই কেন্দ্রে ভিড় করার পাশাপাশি সীমান্ত পেরিয়ে আগরতলা যাচ্ছেন ট্রেনিং নিতে। তিনি তখন ছাত্রদের একটি দল পাঠালেন আগরতলায়। উদ্দেশ্য ট্রেনিং নিয়ে তারা বিস্ফোরক, মাইন ও গ্রেনেড জাতীয় সমরাস্ত্র নিয়ে আসবেন। গেরিলা যুদ্ধের জন্যে এসব বেশ জরুরি, যা তাঁর কাছে নেই।

এ-সময় আমরাও আজকের পলাশ (তখনকার কালীগঞ্জ থানাধীন) থেকে অজানা পথ পাড়ি দিয়ে আগরতলা যাই। ১৮ এপ্রিল। কিছুদিন পর সেখানকার কলেজটিলা থেকে বাছাই হয়ে ট্রেনিং নিতে যাই মতিনগরে, মুক্তিযুদ্ধের ২ নম্বর সেক্টরের হেডকোয়ার্টারে। সেক্টর কমান্ডার খালেদ মোশাররফ। তাঁর গড়ে তোলা স্টুডেন্টস কোম্পানিতে আমাদের ট্রেনিং শুরু হয় মতিনগরের টিলার চূড়ায়। অল্প কিছুদিন পর এর স্থান পরিবর্তন হয় মেলাঘরে। এখানে একই কোম্পানির ঢাকা প্লাটুনে পরিচয় ঘটে নরসিংদী, রায়পুরা ও শিবপুর থানা থেকে যাওয়া আমাদেরই মতো ছাত্র-তরুণদের সাথে। তারা অনেকেই ঢাকা ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। বেশ ক’জন নরসিংদী কলেজের।

মেলাঘরে ট্রেনিং শেষে যখন অস্ত্রশস্ত্রসহ দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা হচ্ছে, তখন ন্যাভাল সিরাজ গেলেন ওখানে। গেলেন আমাদের অঞ্চলের মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে আসতে। সেদিন আমাদের লাইন ধরে দাঁড় করানো হয়। সামনে দাঁড়িয়ে সেক্টর কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ, মেজর এটিএম হায়দার ও আমার অপরিচিত ন্যাভাল সিরাজ। ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করছি, তিনি কে? পাশে দাঁড়ানো কেউ একজন বললেন, তিনি নরসিংদী থেকে এসেছেন। সাদা হাফশার্ট গায়ে পরা নরসিংদীর ঐ-ভদ্রলোকটিই যে ন্যাভাল সিরাজ, তা জানতে বেশি দেরি হলো না। সেক্টর কমান্ডার আমাদের বললেন, স্টুডেন্টস কোম্পানির ঢাকা প্লাটুনের ঢাকা শহরের যোদ্ধারা প্রথম দল হিসেবে কয়দিন আগে গিয়েছে। এবার ঐ-প্লাটুনের দ্বিতীয় দল হিসেবে তোমাদের যাওয়ার পালা। থানাভিত্তিক দল গঠিত হলো। নরসিংদী, শিবপুর, রূপগঞ্জ ও আড়াইহাজার— এই চার থানার জন্যে। পাশের কালীগঞ্জ ও রায়পুরা থানার দল গঠনের প্রয়োজনীয় সংখ্যক যোদ্ধা না থাকায় তাদের এই চার থানায় অন্তর্ভুক্ত করে দেয়া হলো। চার থানার চারজন থানা কমান্ডার হলেন যথাক্রমে মুহম্মদ ইমামউদ্দিন, আবদুল মান্নান খান, আবদুল জব্বার খান পিনু ও আবদুস সামাদ। আঞ্চলিক কমান্ডার নিয়োগ করা হলো ন্যাভাল সিরাজকে। অতঃপর আমরা ন্যাভাল সিরাজের নেতৃত্বে বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ, বিস্ফোরক ও অস্ত্র নিয়ে উল্লেখিত চার থানায় এলাম। আমরাই গোটা অঞ্চলে ভারত থেকে ট্রেনিং নিয়ে আসা প্রথম মুক্তিযোদ্ধা দল।

আমরা এসে নেহাব ও শিবপুরে স্থানীয়ভাবে ট্রেনিং নেয়া মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে মিলেমিশে পাকিস্তানি বাহিনির উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছি। একেক থানায় একেকভাবে। তবে আগাগোড়া আমাদের আঞ্চলিক কমান্ডার ছিলেন ন্যাভাল সিরাজ। বেশ পরে প্রত্যেক থানায় আরো কিছু মুক্তিযোদ্ধা গ্রুপ এসেছে ভারত থেকে ট্রেনিং নিয়ে। তবে তাঁরা ছিলেন ভিন্ন কমান্ডের অধীন।

নরসিংদীতে মুক্তিযুদ্ধ আর ন্যাভাল সিরাজ অনেকটা সমার্থক। সেই যুদ্ধ শুরুর সময় থেকে নরসিংদী মুক্ত হওয়া অবধি। প্রথম যুদ্ধ বাগবাড়িতে, ৯ এপ্রিল। এই যুদ্ধে তিনি ছিলেন ক্যাপ্টেন মতিউরের সাথে। পরের দিন ১০ এপ্রিল পাঁচদোনার যুদ্ধে তিনি ছিলেন অসীম সাহসী বীরের ভূমিকায়। এরপর পাঁচদোনায় আরো দুইবার যুদ্ধ হয়েছে দুর্ধর্ষ পাকিস্তানি বাহিনির সাথে। সম্মুখ যুদ্ধ। ১৬ আগস্ট ও ১০ অক্টোবর। উভয় যুদ্ধে তাঁর বীরত্বের জুড়ি মেলা ভার। তাঁর অকুতোভয় নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা লড়েছেন জীবন বাজি রেখে। হানাদার বাহিনির বুকে কাঁপন ধরিয়েছেন তিনি ও তাঁর যোদ্ধারা। এই যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধারা প্রাণ দিয়েছেন, শত্রুর প্রাণ নিয়েছেন, অস্ত্র কেড়ে নিয়ে সেই অস্ত্রে শত্রুর বিরুদ্ধে লড়েছেন।

তাঁর কমান্ডে শিবপুরের মুক্তিযোদ্ধারা পুটিয়া ব্রিজ উড়িয়েছেন। সেদিনই পুটিয়ার যুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনির ক্যাপ্টেন সেলিমসহ ৩১ জনকে হত্যা করা হয়। তিনি নিজে ১৩ ও ১৪ আগস্ট জিনারদী ও মূলপাড়ার যুদ্ধে শত্রুবাহিনিকে কুপোকাত করেছেন। ২০ আগস্ট চিনিশপুরের তিতাস গ্যাস লাইনের স্টেশন এক্সপ্লোসিভ দিয়ে উড়িয়ে দিয়ে অবাক করার মতো ঘটনা ঘটিয়েছেন। রাতের বেলা গ্যাস স্টেশনটি প্রচণ্ড শব্দে বিস্ফোরিত হয়ে ১৫-২০ মাইল পর্যন্ত বিস্তৃত জনপদকে যেভাবে আলোকিত করেছিলো, তা ছিলো যুদ্ধের এক অবাক করা অভিজ্ঞতা। নরসিংদী শহর ও ঘোড়াশালে অবস্থানকারী পাকিস্তানি বাহিনি ঐ-অবস্থায় ভয়ে ভীত হয়ে ক্যাম্প ছেড়ে দিগ্বিদিক ছুটেছিলো।

পাকিস্তানি বাহিনি তাঁকে হত্যা ও উচ্ছেদের চেষ্টা করেছে প্রথম থেকে শেষাবধি। দুর্ধর্ষ এই পদাতিক বাহিনি ভারি অস্ত্র নিয়ে অন্তত তিনবার তাঁর হেডকোয়ার্টার নেহাব গ্রাম আক্রমণ করেছে। কিন্তু আপামর জনসাধারণ আর অকুতোভয় মুক্তিযোদ্ধাদের জীবন-মরণ প্রতিরোধের মুখে প্রতিবারই তারা ব্যর্থ হয়েছে। তাঁর কৌশলের কাছে পরাভূত হয়েছে শত্রুরা। গেরিলা যুদ্ধের ক্ষেত্রে এ এক অনন্য দৃষ্টান্ত।

ন্যাভাল সিরাজের কমান্ডের চার থানার মুক্তিযোদ্ধারা যার যার এলাকায় অনেক সাহসী যুদ্ধে অংশ নিয়েছেন। তন্মধ্যে রূপগঞ্জের নাগরীর অভিযান উল্লেখ করার মতো। মাধবদী ও ঘোড়াশালের টেলিফোন এক্সচেঞ্জ উড়ানোর অপারেশনও এখানে উল্লেখ করা যায়। এছাড়া ন্যাভাল সিরাজ তাঁর কমান্ড এলাকার বাইরেও অনেক দুঃসাহসিক অভিযানে গিয়েছেন সেসব এলাকার জনগণের আগ্রহে। তেমন অভিযান তিনি চালিয়েছেন পূবাইল ও তালটিয়ায়। দুটি অভিযানেই পাকিস্তানি সৈন্যবাহিনিকে বহন করে নিয়ে যাওয়া ট্রেন আক্রমণ করেন এবং ট্রেন লাইনচ্যুত হয়ে পাকিস্তানি সৈন্যদের হতাহতের ঘটনা ঘটে। অপর আরেকটি অভিযানে কালীগঞ্জের মসলিন কটন মিলে শত্রুদের ক্যাম্প আক্রমণ করে তিনি তাদের হটিয়ে দেন। তারা মিল ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়। অবশেষে ১২ ডিসেম্বর তাঁর নেতৃত্বে নরসিংদী ও শিবপুর থানার মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মিলিত অভিযানে নরসিংদী শত্রুমুক্ত হয়। সেদিন পাকিস্তানি সেনাবাহিনির জীবিত ২১ জন বন্দী হয়েছিলো তাঁর দলের হাতে।

নরসিংদীর মুক্তিযুদ্ধে কিংবদন্তিতে পরিণত হয় ন্যাভাল সিরাজ। লোকজনের মুখে মুখে তখন তাঁর সাহসিকতা ও বীরত্বের জয়গান, গল্পকথা। যুদ্ধ শুরুর আগে অনেকটা অপরিচিত নৌ-বাহিনি কর্মকর্তা সিরাজ উদ্দিন আহমেদ যুদ্ধ শেষে এক কীর্তিমান জনপ্রিয় মানুষ। তাঁকে একনজর দেখার জন্যে লোকেরা ভিড় করেন সর্বত্র। তিনি যেখানে যান, সেখানেই মানুষের ঢল নামছে। এই দৃশ্য আমি দেখেছি। এবং এমন জনপ্রিয়তা ও খ্যাতিই তাঁর কাল হয়েছিলো পরবর্তীতে।

সে-সময় আমি অনুভব করেছি, মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসে সমাজ মানসে রূপান্তর ঘটেছে। রণাঙ্গনে জীবন বাজি রাখা, মৃত্যুমুখ থেকে ফিরে আসা মানুষগুলোর অনেকের চিন্তায় নতুন স্বপ্ন এসে উঁকি দিচ্ছে। সেই স্বপ্ন মুক্তিযুদ্ধের সময় বেড়ে ওঠা রাষ্ট্রভাবনার। রাষ্ট্র হবে সাম্য ও মৈত্রীর। রাষ্ট্র হবে শোষণহীন, যাতে থাকবে প্রত্যেক মানুষের মৌলিক প্রয়োজন মেটানোর নিশ্চয়তা। এমন স্বপ্ন তো সমাজতান্ত্রিক সমাজের।

পাশাপাশি দেখেছি, সামাজিক নতুন দ্বন্দ্ব মাথাচাড়া দিয়ে ওঠছে। মুক্তিযুদ্ধকালে যারা দেশের ভেতরে ছিলেন না, যুদ্ধে প্রত্যক্ষ কোনো ভূমিকা পালন করেননি, মুক্তিযোদ্ধাদের ত্যাগ দেখেননি, তারা ভাবছেন, মুক্তিযুদ্ধের বীরত্বে জনপ্রিয় হয়ে ওঠারা তাদের পথের কাঁটা। এছাড়া যারা প্রাণের ভয়ে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেনি, চুপটি মেরেছিলেন, কিন্তু মনে মনে ভিন্ন ভাবনা ছিলো, সেই মোড়লরাও নানা রকম কূটচালে নামলেন। উভয়েরই প্রতিপক্ষ যেন মুক্তিযুদ্ধের ‘হিরো’রা। তাদের এক অদ্ভুত মৈত্রী দেখা গেলো মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে। এই দ্বন্দ্বের নিরসন হলো না। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে হাজারো সমস্যার মাঝে এ নিয়ে ভাবার সময় কারো ছিলো না।

এমন এক প্রেক্ষাপটে ন্যাভাল সিরাজ নৌ-বাহিনির চাকরিতে আর যোগ দিতে গেলেন না। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন রাজনীতি করবেন। তবে চলমান জোয়ারে গা ভাসিয়ে নয়। তাঁর রাজনীতি হবে গণমানুষের পক্ষের, সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার। সেই স্বপ্ন নিয়ে তিনি মওলানা ভাসানীর দলে যোগ দিলেন। এতে কারো কারো ভ্রু কুচকালো। কিন্তু তিনি কি কোনোকিছুর পরোয়া করেন? না, মোটেও না। একটা পুরোনো হোন্ডার পিঠে চড়ে তিনি সংগঠনের কাজে, মুক্তিযোদ্ধা ও সাধারণের প্রয়োজনীয় সাহায্য-সহযোগিতা দিতে ঘুরে বেড়ান। আর যেখানে যান, সেখানেই মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হন। তিনি তাতে আরো উজ্জীবিত হন।

১৯৭২ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর, আড়াইহাজার থানার পুরিন্দায় সাংগঠনিক সফরে যান সেখানকার কিছু লোকের অনুরোধে। হাই স্কুল ভবনে আয়োজন। যেতে হয় পাশের খাল পেরিয়ে। সড়কের পাশে হোন্ডা রেখে তিনি কাঠের পুলটি সবেমাত্র পার হয়েছেন, এমন সময় তাঁর উপর অতর্কিতে গুলিবর্ষণ শুরু হয়। তিনি খালের পানিতে ঝাঁপ দেন। হয়তো ভেবেছিলেন, পানির নিচে ডুব দিয়ে তিনি বহুদূর চলে যাবেন, যেমনটা তিনি করেছিলেন পাকিস্তানিদের ক্যাম্প আক্রমণ করার বেলায়। কিন্তু এবার তা হলো না। খালে অতোটা পানি ছিলো না। তাঁর উপর আবার গুলি হয়। সঙ্গী কৃষককর্মী লিয়াকত ঝাঁপ দিয়ে পড়ে নিজের শরীর দিয়ে তাঁকে বাঁচানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু পারেননি। দুজনেই গুলিতে নিহত হন। দিবালোকে। চক্রান্তকারীদের নীল নকশায়। এমন ঘটনায় সেদিন পুরো জনপদ স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলো। এ যেন এক কমান্ডারের জীবনের ট্র্যাজেডি নয়, পুরো মুক্তিযুদ্ধের ট্র্যাজেডি। যেই বীর যোদ্ধাকে পাকিস্তানি বাহিনি সর্বশক্তি নিয়োজিত করেও কাবু করতে পারেনি, তাঁকেই জীবন দিতে হলো স্বাধীন দেশে ঈর্ষাকাতর সংকীর্ণমনা চক্রান্তকারীদের হাতে। তা-ও দেশ মুক্ত হওয়ার নয় মাসের মাথায়।

এই হত্যার প্রতিবাদে মানুষ ফুঁসে ওঠেছিলো। বিশাল প্রতিবাদ সভা হয়েছিলো ঘোড়াশাল হাই স্কুল আর পাঁচদোনা কে জি গুপ্ত হাই স্কুল মাঠে। দুইটি প্রতিবাদ সভায়ই আমি উপস্থিত ছিলাম। তাঁর ভক্ত সাধারণ মানুষ আর মুক্তিযোদ্ধারা বুক ভাসিয়ে কেঁদেছিলেন। পাঁচদোনার সভায় বয়োবৃদ্ধ মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানী এসেছিলেন। বক্তৃতা করে প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। কে জি গুপ্ত স্কুলের মাঠের এক কোণেই এখানকারই মানুষ এই সাহসী বীরকে অন্তিম শয়ানে শায়িত করা হয়েছে।

পাঁচদোনা বাজারের পাশে বীরপ্রতীক ন্যাভাল সিরাজের সমাধি, প্রতিবছর তাঁর হত্যা দিবসে এভাবেই ফুলে ফুলে ছেয়ে যায়

মুক্তিযুদ্ধে অসীম সাহসী বীরত্বের জন্যে ন্যাভাল সিরাজ বীরপ্রতীক খেতাবে ভূষিত হন স্বাধীনতার পরপরই। নরসিংদীতে জন্মগ্রহণকারী আরো কয়েকজন এ-কারণে খেতাব পেয়েছেন। তবে ন্যাভাল সিরাজই একমাত্র বীর, যিনি নরসিংদীর মাটিতে যুদ্ধ করার কৃতিত্বে-কীর্তিতে তারকা হয়েছিলেন। অন্যরা কেউ যুদ্ধে নরসিংদীতে ছিলেন না, ভূমিকা রেখেছেন অন্য কোথাও। সেদিক থেকে তিনি আছেন অনন্য এক উচ্চতায়, নরসিংদীর মাটির গভীরে শিকড় গেড়ে। তাই যতদিন এই অঞ্চলের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস চর্চা হবে, ততদিন তাঁর স্মৃতি আর অমর কীর্তি ভাস্বর হয়ে থাকবে।

বীরের এই শোণিত ধারার গৌরবগাথা আমরা যেন ভুলে না যাই।


সিরাজ উদ্দিন সাথী
ন্যাভাল সিরাজের সহযোদ্ধা
প্রধান উপদেষ্টার মুখ্য সচিব

দখল ও দূষণ কবলিত নরসিংদীর নদ-নদী

0

প্রফেসর আব্দুর রাজ্জাকের একটা ভবিষ্যতবাণী ছিলো এমন, “বাংলাদেশের প্রধান সমস্যা হবে পানির সমস্যা।” অন্যদিকে, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে উইলিয়াম উইল কক্স তার ঐতিহাসিক বক্তৃতা ‘লেকচারস অন দি রিভার সিস্টেম অব বেঙ্গল’-এ মূলত ব্রিটিশ ভারতে নদীগুলোর গুরুত্ব এবং তাদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব নিয়ে আলোচনা করেছিলেন। বক্তৃতাটিতে তিনি এই অঞ্চলের নদীর ভবিষ্যত সমস্যাবলির কথা আলোচনা করেছিলেন। আসলে সভ্যতার প্রাচীন চিহ্ন বয়ে চলার পথ পরিক্রমায় নদী এক বহুমাত্রিক বিচিত্র প্রাকৃতিক সম্পদ। নদী ব্যতিত প্রাণ অচল। বয়সের দিক থেকেও বিবেচনা করলে নদী হচ্ছে মহাপ্রাচীন এক সত্তা। পাহাড়-পর্বত, সমুদ্র, মরুভূমি কিংবা মাটির মতোই নদী বিরাট শক্তিশালী। নদী সৃষ্টি করতে পেরেছে এমন কোনো জাতি পৃথিবীতে দেখানো যাবে না। কিন্তু নদী ধ্বংসের উদাহরণ অহরহ। আধুনিক টেকনোলজি আবিষ্কারের পূর্ব পর্যন্ত মানুষের দৈনন্দিন কর্মকাণ্ড ছিলো নদী কেন্দ্রিক। নদীর অশেষ ব্যবহার মানুষের জীবনে কতোটুকু প্রভাব ফেলতো, সেটা বইপত্র ঘাটাঘাটি করলেই প্রমাণ মেলে। নদীর দর্শন মানবজাতির ইতিহাসের এক নিগূঢ় রহস্যে আবৃত। বিভিন্ন নদী-কেন্দ্রিক জাতির যে-ইতিহাস, তা মূলত মানবজাতির প্রাকৃতিক ইতিহাস। কিন্তু আধুনিক সভ্য জাতিকুল নদীকে শাসন করছে, দূষণ করছে এবং ধ্বংসলীলায় মেতে ওঠছে। ফলে ভবিষ্যত প্রজন্মকে ঠেলে দিচ্ছে অবিরাম ধ্বংসের দিকে। নদী এখন রাজনীতির শিকার। পুঁজিবাদের লক্ষ্যবস্তু দেশের নদীগুলোর চেহারা এখন রুগণপ্রায়। মানবজাতির অস্তিত্বের নির্মাতা এসব নদ-নদী এখন মানুষের কাছে পরিত্যাজ্য। দুর্গন্ধ আর দূষণে নদীগুলোর দেহ থাকলেও প্রাণহীন। যে-নদী মানুষকে তার সুস্বাদু মাছ দিয়ে আমিষের চাহিদা মেটাতো, জলপথে অল্প খরচে দূর-দূরান্তে পণ্য আনা-নেয়ায় সাহায্য করতো, যে-নদী পৃথিবীর প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা করতো, আজ মানুষই তার বুকে ছুরি চালাচ্ছে।

নরসিংদীতে নদীর সংখ্যা
দেশে ৫৭ টি আন্তর্জাতিক নদ-নদী রয়েছে। কোনো কোনো পরিসংখ্যানে শাখা-প্রশাখাসহ বাংলাদেশে নদ-নদীর সংখ্যা ৭০০ টিরও বেশি। সরকারি সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী দেশে ২৩০ টি নদ-নদী আছে। শিশু একাডেমির শিশু বিশ্বকোষে বলা হয়েছে, দেশে নদ-নদী ৭০০ টি। উইকিপিডিয়ার তথ্যমতে, নদ-নদীর সংখ্যা ৪০৫ টি। পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) অনুসারে নরসিংদীতে ১১ টি নদী রয়েছে। মেঘনা, ব্রহ্মপুত্র, শীতলক্ষ্যা এবং আড়িয়াল খাঁর মতো নদীগুলো নরসিংদীর উপর দিয়ে বয়ে গেছে। পৃথিবীর সবখানে নদীকে কেন্দ্র করেই সভ্যতা ও সংস্কৃতি ব্যাপকভাবে গড়ে ওঠেছে। নরসিংদীতেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। ভৌগোলিক গঠন, ভূতত্ত্ব, শিল্প-সাহিত্য, সংস্কৃতি ও ভাষা, ইতিহাস-ঐতিহ্য, পৌরাণিক উপাখ্যান, ধর্মীয় তীর্থস্থান, গল্প-কাহিনি, কবিতা, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক জীবনব্যবস্থা, কৃষি ও মৎস্য পালন, ব্যবসা-বাণিজ্য, যাতায়াত, জীববৈচিত্র্য, পরিবেশ ও জীবন-জীবিকার এক বিশাল অনুষঙ্গ গড়ে ওঠেছে নরসিংদীর এসব নদীকে কেন্দ্র করেই। নরসিংদীর উয়ারী-বটেশ্বর তার জ্বলন্ত উদাহরণ। একসময় গ্রিসের সাথে নদীপথে এই অঞ্চলের বাণিজ্যের তথ্য মেলে হেরোডেটাসের ইতিহাসের বইয়ে। অন্যদিকে, পৃথিবীর শীর্ষ দূষিত নদীগুলোর অবস্থান এখন নদীমাতৃক বাংলাদেশেই। আর এর মধ্যে নরসিংদী অন্যতম। বিবিসির সমীক্ষায় বলা হয়েছে, দেশের ৪৩৫ টি নদী এখন প্রকটভাবে হুমকির মুখে। ৫০-৮০ টি নদী বিপন্নতার শেষ প্রান্তে। যেখানে নরসিংদীর হাড়িধোয়া, ব্রহ্মপুত্র, শীতলক্ষ্যা এবং মেঘনার দূষণ প্রকট। আর এই দূষণ ক্রমাগত চলতে থাকলে ২০৫০ সাল নাগাদ শীতলক্ষ্যা আর মেঘনা ব্যতিত বাকি নদীগুলো শুকিয়ে যাবে। সেই সাথে ধ্বংস হবে বিরাট ইকোসিস্টেম এবং এর প্রভাব পড়বে জনসাধারণের উপর। দেশে নদী থেকে সৃষ্ট খালের সংখ্যাও বিশাল— ২৪ হাজার। নরসিংদীর খালগুলো হয় এখন ময়লার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে অথবা শুকিয়ে যাচ্ছে। উইকিপিডিয়ার তথ্যানুসারে নরসিংদীতে মোট ১১ টি নদ-নদী রয়েছে। এর মধ্যে মূলত চারটি নদীই প্রধান। এগুলো হচ্ছে মেঘনা, শীতলক্ষ্যা, ব্রহ্মপুত্র, আড়িয়াল খাঁ। অন্যদিকে, হাড়িধোয়া, পাহাড়িয়া, মরা ব্রহ্মপুত্র, নাগদা, সোনাখালী, কয়রা ও গঙ্গাজলী শাখা নদী। কয়রা ও গঙ্গাজলী এখন বিলুপ্তির পথে, ড্রেনের মতো অথবা কিছু কিছু জায়গায় দেখা মেলে এদের।

মোট দৈর্ঘ্য
জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের সাবেক প্রধান হাইড্রোলজিস্ট মো. আখতারুজ্জামান তালুকদার জানান, দেশে বর্তমানে ২০০ কিলোমিটারের বেশি দীর্ঘ নদী রয়েছে ১৪ টি, ১০০ থেকে ১৯৯ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের নদী রয়েছে ৪২ টি, ১০ থেকে ৯৯ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের নদী ৪৮০ টি এবং ১ থেকে ৯ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের নদীর সংখ্যা ৩৭৬ টি। ১ কিলোমিটারেরও কম দৈর্ঘ্যের নদী রয়েছে ৪১ টি। সবচেয়ে বেশি নদী রয়েছে সুনামগঞ্জ জেলায়— ৯৭টি। নদ-নদীর এই তালিকা তৈরির কাজ শুরু হয় ২০১৯ সালে। তালিকা তৈরিতে তথ্যের প্রধান উৎস ছিলো জেলা প্রশাসন। এছাড়া বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃক ছয় খণ্ডে প্রকাশিত নদ-নদীর তালিকা সার্ভে অব বাংলাদেশ কর্তৃক প্রকাশিত প্রশাসনিক ম্যাপ ও পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের ট্রাস্টি প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিসেসের (সিইজিআইএস) ম্যাপ মাধ্যমিক (সেকেন্ডারি) উৎস হিসেবে ব্যবহার করা হয় এই গবেষণায়।

উইকিপিডিয়ার তথ্য অনুসারে, বাংলাদেশে মোট নৌপথের দৈর্ঘ্য ২৪,০০০ কিলোমিটার হলেও নৌপরিবহনযোগ্য নৌপথের দৈর্ঘ্য মাত্র ৫,৯৬৮ কিলোমিটার, তা-ও শুষ্ক মৌসুমে আবার সেটি কমে গিয়ে দাঁড়ায় ৩,৮৬৫ কিলোমিটারে। নৌপথের সম্ভাব্য ন্যূনতম গভীরতার (Least Available Depth, LAD) উপর ভিত্তি করে বাংলাদেশের এই অভ্যন্তরীণ নৌ চলাচল গতিপথকে চারটি ভাগে ভাগ করা যায় : শ্রেণি ১, শ্রেণি ২, শ্রেণি ৩ এবং শ্রেণি ৪। এদের সম্ভাব্য ন্যূনতম গভীরতা যথাক্রমে ৩.৬৬ মিটার, ২.১৩ মিটার, ১.৫২ মিটার এবং ১.৫২ মিটারের কম। এই চার ধরনের নৌপথের মধ্যে শ্রেণি ৪-এর নৌপথগুলি মূলত মৌসুমী আর বাকি নৌপথগুলি সারা বছর ধরে চালু থাকে। উপরের তথ্যসূত্রের আলোকে বলা যায়, নরসিংদীতে ১৩ থেকে ১৬৫ কিলোমিটারের নয়টি নদ-নদী রয়েছে। যেগুলো বর্ষা মৌসুমে নৌ চলাচলে সক্ষম, তার মোট দৈর্ঘ্য ৫৩৮ কিলোমিটার। আর এর মধ্যে সারা বছর নৌকা চলাচলে সক্ষম ১০০ কিলোমিটারের দৈর্ঘ্যের নদীপথ। আবার এসব নৌপথের অধিকাংশই মেঘনা, শীতলক্ষ্যা আর আড়িয়াল খাঁ নদীতে।

শিল্প কারখানা বৃদ্ধির ফলে প্রচুর পরিমাণ রাসায়নিক বর্জ্য নদীতে ফেলা হচ্ছে। দূষিত হচ্ছে পানি। এই বিশাল পরিমাণ পানি সহজে পিউরিফাই করা সম্ভব নয়। কিন্তু নদীতে ফেলা ইন্ডাস্ট্রিয়াল বর্জ্য পদার্থের কারণে নদীর দূষণ রোধে বড়ো ভূমিকা রাখতে পারে ম্যানগ্রোভ।

কীভাবে দূষণ হচ্ছে
পৃথিবীর মাত্র ১ শতাংশ মিঠা বা স্বাদু পানি আমরা ব্যবহার করতে পারি। এই মিঠা পানির ৭০ শতাংশ ব্যবহার করা হয় কৃষিকাজে। কিন্তু নানা কারণে নদ-নদীগুলো শুকিয়ে যাচ্ছে এবং ধ্বংস হচ্ছে। ফলে পানির সংকট দিন দিন প্রকট হচ্ছে। এর মধ্যে দুটি কারণ উল্লেখযোগ্য। প্রথমত ভারতের বাঁধ, দ্বিতীয়ত দেশের শিল্প-কারখানা। ভারতের সাথে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক নদীর সংখ্যা ৫৭ টি। দেশের প্রায় সবগুলো নদীই ভারত থেকে সৃষ্ট। এগুলো দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশের উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে সমুদ্রে পতিত হয়েছে। কিন্তু নব্য যুগে এসে ভারত তার অভ্যন্তরীণ চাহিদার কথা বলে উজানে বাঁধ নির্মাণ করে নদীর স্রোত ঘুরিয়ে দিচ্ছে। এতে ক্ষতির শিকার হচ্ছে ভাটির ভূমি বাংলাদেশ। আন্তর্জাতিক আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে যা ইচ্ছে, তাই করে যাচ্ছে ভারত। এটা নিয়ে ভারতের অনেক পরিবেশ বিজ্ঞানীও সতর্ক করেছিলো, ভারত সরকার তা কানে নেয়নি। আগে বর্ষার মৌসুমে ফসলের জমিগুলো পানিতে টইটুম্বুর করতো। সেখানে নতুন পানির সাথে জমিনে পলি জমতো। ফলে মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি পেতো এবং ভালো ফসল ফলতো। কিন্তু এখন আর সেটা চোখে পড়ে না। অন্যদিকে আবর্জনা, রঙের পানি, কীটনাশক, অতিমাত্রায় নগরায়ন, শিল্প-অঞ্চল ইত্যাদির কারণে ও কর্তৃপক্ষের অবহেলায় দিন দিন বেড়েই চলেছে দূষণের মাত্রা। যত্রতত্র জলাশয় ভরাট করে কারখানা গড়ে তোলা হচ্ছে এবং সেই কারখানার দূষিত তরল বর্জ্য ফেলা হচ্ছে নদ-নদীতে। জলাশয় ভরাটের ফলে একদিকে পরিবেশ ধ্বংসের মাধ্যমে, জীববৈচিত্র্যের ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতি হচ্ছে, অন্যদিকে জলাশয়গুলো ভরাটের কারণে তাপ শোষণের মাত্রা কমে এসেছে, যার দরুণ আজকাল এতো গরম লাগছে।

পানির ফরেনসিক পরীক্ষা
নরসিংদীর চারটি নদীতে ১২৯ টি তরল বর্জ্য পদার্থের প্রতিষ্ঠান থেকে রাসায়নিক বর্জ্যমিশ্রিত পানি সরাসরি নদীগুলোকে দূষিত করছে। নদীগুলো হচ্ছে মেঘনা, শীতলক্ষ্যা, ব্রহ্মপুত্র এবং হাড়িধোয়া। এই নদীগুলোর PH (Potential Hydrogen) স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি। পানির BOD (Biological Oxygen Demand) এবং COD (Chemical Oxygen Demand) অত্যন্ত উদ্বেগজনক অবস্থায় আছে। উল্লেখ্য, BOD একটি জৈবিক প্রক্রিয়া। অন্যদিকে, COD একটি রাসায়নিক প্রক্রিয়া।

এবার বুড়িগঙ্গা নদীর ফরেনসিক রিপোর্টটি দেখে নেয়া যাক। “এই নদীর পানিতে অদ্রবণীয় ক্ষুদ্র কঠিন পদার্থ (টোটাল সাসপেন্ডেবল সলিডস, টিএসএস) পাওয়া গেছে ১০৮, ৫৭ ও ১৯৫। অথচ পানিতে এর আদর্শ মান ১০। বুড়িগঙ্গার শ্যামপুর এলাকার পানিতে অদ্রবণীয় ক্ষুদ্র কঠিন পদার্থ (টোটাল সাসপেন্ডেবল সলিডস, টিএসএস) পাওয়া গেছে ১০৮, ৫৭ ও ১৯৫। অথচ পানিতে এর আদর্শ মান ১০। গবেষকেরা বলছেন, এর মানে সম্পূর্ণরূপে মিশে না যাওয়া কঠিন পদার্থ নদীর পানিতে আস্তরণ তৈরি করছে, যা জলজ উদ্ভিদের বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। পানিতে অক্সিজেন চাহিদার পরীক্ষায় দেখা যায়, রাসায়নিক অক্সিজেনের চাহিদা (সিওডি) ১৯০, ২২৭ ও ২৭৬। অথচ আদর্শমান হচ্ছে ৪। আর জৈবিক অক্সিজেন চাহিদা (বিওডি) ৮৭, ৭২, ও ১০৬। অথচ আদর্শ মান হিসেবে বিওডি থাকার কথা ০.২।” (সূত্র : আহমেদ দীপ্ত, প্রথম আলো)

উপরের তথ্য বিশ্লেষণ করে বলা যায়, নরসিংদীর উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ব্রহ্মপুত্র নদটি বুড়িগঙ্গা নদীর চেয়েও ভয়াবহ। এটা নরসিংদীর নদীগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি দূষণের শিকার। মাধবদী, শেখেরচর এবং সদরের আশপাশের এলাকায় মূলত ডাইং মিল এবং তরল বর্জ্য নিঃসরণকারী প্রতিষ্ঠান থেকে প্রতিদিন টনের টন রাসায়নিক বর্জ্যের পানি নদে পড়ছে। ফলে আশপাশের এলাকায় দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে। ব্যাহত হচ্ছে জনজীবন। তাই সামগ্রিক বিষয়ের প্রেক্ষিতে অনুমান করা যায় যে, নরসিংদীর নদীগুলোর পানির কোয়ালিটি ইনডেক্স পরীক্ষা করলে এর দূষণ বুড়িগঙ্গার পানির সমপর্যায়ে হওয়ার সম্ভাবনাই প্রবল। সরকারিভাবে জেলার নদ-নদীগুলোর পানির কোয়ালিটি ইনডেক্স পরীক্ষা করা জরুরি। তাহলেই নদ-নদীগুলো কতোটুকু রুগ্ণ, তা বেরিয়ে আসবে।

বর্জ্যপ্রবাহের উৎসসমূহ
নরসিংদী পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, নরসিংদীতে তরল বর্জ্য নিঃসরণকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ১২৯ টি। এর মধ্যে ETP (Effluent Treatment Plant) আছে ১১৭ টিতে। ৩ টি প্রতিষ্ঠানের কোনো ইটিপি নেই। ১ টি বন্ধ আছে এবং ৪ টি প্রতিষ্ঠানে নির্মাণাধীন। আর বাকি ৪ টির তথ্য পাওয়া যায়নি। এসব কারখানার তরল বর্জ্য সরাসরি নরসিংদীর নদীগুলোতে ফেলা হচ্ছে। মারাত্মকভাবে দূষণের শিকার নদীগুলো হচ্ছে মেঘনা, শীতলক্ষ্যা, ব্রহ্মপুত্র এবং হাড়িধোয়া।

পত্রিকার স্থান সংকুলানের কথা বিবেচনা করে নিচে শুধু হাড়িধোয়া নদীতে বিষাক্ত বর্জ্য ফেলার ফ্যাক্টরিগুলোর একটি তালিকা তুলে ধরা হলো।

১. থার্মেক্স গ্রুপ (৭ টি);
২. আবেদ টেক্সটাইল এন্ড ডাইং (৩ টি);
৩. আব্দুছ সোবান ডাইং (১ টি);
৪. শিল্পী ডাইং (১ টি);
৫. হাজী ডাইং (১ টি);
৬. রাজ্জাক ডাইং (১ টি);
৭. চৌধুরী ডাইং (১ টি);
৮. গ্রিন বাংলা ডাইং (১ টি);
৯. ক্রিয়েটিভ প্রাইম ডাইং (১ টি) এবং
১০. শায়লা ডাইং (১ টি)।

উল্লেখ্য, পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী থার্মেক্স গ্রুপের ৭ টি ফ্যাক্টরির বিপরীতে একটি সেন্ট্রাল ইটিপি, আবেদ টেক্সটাইল এন্ড ডাইংয়ের ৩ টি ফ্যাক্টরির বিপরীতে একটি সেন্ট্রাল ইটিপি এবং বাকিদের একটি করে ইটিপি রয়েছে। কিন্তু বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে সরেজমিনে গিয়ে এবং খবর নিয়ে জানা গেছে, কারোর ইটিপিই সচল নয়। এলাকাবাসীর মতে, তারা রাতের আঁধারে অথবা কোনো গোপন ড্রেনের মাধ্যমে বিষাক্ত তরল বর্জ্য সরাসরি নদীতে ফেলছে। ফলে নদীর প্রাকৃতিক জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হচ্ছে। মাছ বিলুপ্তির পাশাপাশি জনজীবনেও ব্যাপকভাবে প্রভাব ফেলছে এই দূষণ প্রক্রিয়া। দূষিত পানির দুর্গন্ধে অতিষ্ঠ হয়ে অনেকে বিভিন্ন জায়গায় অভিযোগ দিয়েও কোনো বিচার পাচ্ছেন না। ফলে তারা অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছেন এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়েই বসবাস করতে বাধ্য হচ্ছেন।

নরসিংদীর প্রধান চারটি নদী দূষণ ও ক্ষয়-ক্ষতির পরিমাণ
নরসিংদীর পরিবেশ দূষণের অন্যতম কারণ জেলার অপরিকল্পিত কল-কারখানা। শত শত কল-কারখানা যত্রতত্র গড়ে ওঠেছে, যার ফলে নদীগুলোর এখন জীর্ণ-শীর্ণ দশা। নিচে জেলার গুরুত্বপূর্ণ চারটি নদীর দূষণ চিত্র নিয়ে আলোচনা করা হলো :

নরসিংদীর প্রাণকেন্দ্রের মধ্যদিয়ে বয়ে গেছে মৃতপ্রায় ব্রহ্মপুত্র এবং হাড়িধোয়া নদী দুটি। অন্যদিকে জেলার পূর্ব ও পশ্চিম দিক দিয়ে যথাক্রমে মেঘনা ও শীতলক্ষ্যা দীর্ঘপথ অতিক্রম করেছে। নরসিংদীর এসব নদীতে একসময় শত শত নৌকা চলাচল করতো, যদিও মেঘনা ও শীতলক্ষ্যায় সেটা এখনো আছে। কিন্তু ব্রহ্মপুত্র আর হাড়িধোয়া নদীতে তার দেখা মেলে না এখন আর। জেলেরা জীবিকা নির্বাহ করতো মাছ ধরে। নদীগুলো নানা প্রজাতির দেশীয় মাছে ভরপুর ছিলো একসময়। স্থানীয় আমিষের একটা বড়ো অংশ আসতো এই নদীগুলোর মাছ থেকে, যেটা বাৎসরিক জাতীয় আমিষের একটা ভালো অংশের যোগান দিতো। হাজার হাজার জেলে তাদের জীবিকা নির্বাহ করতো এই নদীগুলোর মাছ ধরে এবং বিক্রি করে। কিন্তু বিগত কয়েক বছর যাবত নদীগুলো (প্রধানত দুটি নদী) আক্রমণের শিকার হয়েছে। প্রথমত নরসিংদীর বিভিন্ন কারখানার রঙমিশ্রিত তরল বর্জ্য নদীতে ফেলা। আর দ্বিতীয়ত নদী দখল। মূলত হাড়িধোয়া এবং ব্রহ্মপুত্র নদী দুটি এখন প্রায় ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। জেলার ১২৯ টি তরল বর্জ্য নিঃসরণকারী ফ্যাক্টরি, ১২ টি অবৈধ ব্যাটারি ফ্যাক্টরি, প্রচুর মিষ্টির দোকানের রাসায়নিক বিষাক্ত বর্জ্য এবং শহরের ড্রেন দিয়ে আসা ময়লার পানি মূলত নদীগুলোকে দূষিত করছে। বিভিন্ন গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, প্রতিটি ডাইং ফ্যাক্টরি প্রতি টন ফেব্রিক ডাইংয়ের জন্যে ২০০ টন সফট ওয়াটার ব্যবহার করে। আর প্রতিটি কারখানা অন্তত দৈনিক কয়েক টন কাপড় ডাইং করে থাকে। এসব ডাইংয়ের ব্যবহৃত পানি সরাসরি নদীতে ফেলা হচ্ছে। সেই হিসেবে হাড়িধোয়ার পাড়ের ১৮ টি ফ্যাক্টরি থেকে দৈনিক কমপক্ষে ফ্যাক্টরিপ্রতি সর্বনিম্ন ৫ টন কাপড় ধরলে ফ্যাক্টরিপ্রতি ১,০০০ টন তরল বর্জ্য সরাসরি নদীতে ফেলা হচ্ছে। সেই হিসেবে ১৮ টি ফ্যাক্টরি থেকে ১৮,০০০ টন রঙমিশ্রিত পানি নদীতে ফেলা হচ্ছে। তাহলে মাসে দাঁড়ায় ৫,৪০,০০০ টন। এবং এই পানি প্রবাহিত হয়ে এর মোহনা মেঘনা নদীতে গিয়ে পড়ছে। এটা নিঃসন্দেহে খুবই ভয়ঙ্কর ব্যাপার।

এবার আসা যাক আর্থিক ক্ষতির হিসাবে। নদীটির ধ্বংসকারী আঠারোটি ফ্যাক্টরির প্রতিটির বয়স গড়ে ১৫ থেকে ২০ বছর। তাহলে প্রতিটি ফ্যাক্টরি এই ১৫ থেকে ২০ বছরে আনুমানিক কমপক্ষে ১০০ কোটি টাকার ক্ষতি করেছে শুধু হাড়িধোয়া অঞ্চলেই। হিসাবটি পরিবেশ, মানুষের জীবিকা, স্বাস্থ্য এবং কৃষিকে আনুষাঙ্গিক ধরে করা হয়েছে। আরেকটু পরিষ্কার করে বললে, বিশ বছর যাবত ফ্যাক্টরিগুলো যেভাবে নদী দূষণ করে আসছে, ফলে শত শত পরিবার যে-পরিমাণ হাঁস পালন করতো এবং এতে হাঁসের ডিম ও মাংস, শত শত জেলের মাছ ধরে জীবিকা, কৃষকের নদীর পানির বিকল্প হিসেবে বিদ্যুৎ ব্যবহার করে ভূগর্ভের পানি তুলে সেচ কাজে ব্যবহার ইত্যাদি নানা বিষয় অন্তর্ভুক্ত এবং হিসাবটি ২০ বছর ধরে করতে হবে। উক্ত বছরগুলোতে এই নদীটি জাতীয় মোট কী পরিমাণ আমিষ হারিয়েছে, তা হিসাব করলে বের হয়ে আসবে। তাছাড়াও অসংখ্য মানুষ না জেনে-না বুঝে এখানে গোসল করছে। ফলে তাদের চর্মরোগসহ নানাবিধ পানিবাহিত রোগ হচ্ছে। কতো লোক শ্বাসকষ্টজনিত কারণে মারা পড়েছে কিংবা ভুগছে। ফলে ডাক্তারের শরণাপন্ন হতে হচ্ছে, সেই সাথে ঔষধপত্র। পানি দূষণের কারণে বিভিন্ন ধরনের রোগবালাই নদীপাড়ের মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। এটা নিয়ে রাষ্ট্র কোনোদিন গবেষণা করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে বলে চোখে পড়েনি। হয়তো গবেষণা করলে বেরিয়ে আসতো, প্রতি বর্গমাইলে কী পরিমাণ মাছ থাকতো, সেই হিসেব এবং কী পরিমাণ অর্থ রাষ্ট্র হারিয়েছে আর এ-যাবত কতো লোক অসুস্থ হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন ইত্যাদি।

নদী পাড়ে হাঁস পালন অর্থনীতি
নদীপাড়ের হাজার হাজার পরিবারের নারীরা হাঁস পালনের মাধ্যমে তাদের হাতখরচের যোগান দিতেন। হাঁস বিক্রি কিংবা হাঁসের ডিম বিক্রি করে সারা বছরই তারা নিজেদের স্বাবলম্বী করার চেষ্টা করতেন। এটাকে ছোটো পরিসরে নদীপাড়ের অর্থনীতি বলা যেতে পারে। হাঁসের জন্যে অতিরিক্ত খাদ্যের প্রয়োজন পড়ে না। হাঁসগুলো নদী থেকে শামুক আর ছোটো মাছ খেয়ে পাকস্থলী পূর্ণ করে ঘরে ফেরে। যদি হাড়িধোয়া নদীকে ধরেই একটা আনুমানিক হিসাব করি, তাহলে এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণটা বের হয়ে আসবে। ৩৮ কিলোমিটার নদীটির পাড়ে হাজার হাজার পরিবারের বসবাস। তার মধ্য থেকে যদি ১,২০০ পরিবার অন্তত ৩ টি করে হাঁস পালন করে আর দৈনিক গড়ে ৩,০০০ ডিম দিলে বছরে (গড়ে ১৫ টাকা ধরে হিসেব করলে) এক কোটি চৌষট্টি লাখ পঁচিশ হাজার টাকা আসবে, যা ২০ বছরে বত্রিশ কোটি পচাশি লাখ টাকা। এখন যদি ব্রহ্মপুত্র নদের হিসাব করি, তাহলে এটি হাড়িধোয়ার তিনগুণ। তাহলে এই নদের পাড়ে হাঁসের ডিমের হিসাবটি দাঁড়ায় আটানব্বই কোটি পঞ্চান্নো লাখ টাকা। আর ১০৮ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের শীতলক্ষ্যাও প্রায় সাতানব্বই কোটি টাকার নদীপাড়ের ডিম অর্থনীতি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এ তো গেলো শুধু ডিমের হিসাব। যদি হাঁসের মাংসের হিসাব করা হয়, তাহলে প্রতিটি পরিবার বছরে গড়ে একটি করে হাঁস বিক্রি করলে এবং গড় মূল্য হাঁসপ্রতি অন্তত ৫০০ টাকা ধরে বছরে ছয় লাখ এবং বিশ বছরে এক কোটি বিশ লাখ টাকা হয়। সেই হিসেবে ব্রহ্মপুত্র তিন কোটি এবং শীতলক্ষ্যা আড়াই কোটির উপরে। তাহলে দেখা যাচ্ছে নদী দূষণের ফলে নদীপাড়ের এই অর্থনীতি ভেঙে পড়েছে। সেই সাথে পাড়ের জনবসতিও আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে।

নদী দখল ও ভুলভাবে খনন
ব্রহ্মপুত্র, আড়িয়াল খাঁ, নাগদা, কলাগাছিয়া, সোনাখালী, হাড়িধোয়া ও কয়রা নদ-নদীগুলো বেহাত হয়ে যাচ্ছে। নাগদা, কয়রা ও সোনাখালীর অস্তিত্ব এখন বিভিন্ন সরকারি নথিপত্রে, বাস্তবে এর দেখা মেলা কষ্টকর। ব্রহ্মপুত্র ও হাড়িধোয়া বিভিন্ন প্রভাবশালী মহল কর্তৃক দখল হয়ে যাচ্ছে। এছাড়াও যখন নদী খনন প্রকল্পের কাজ চলমান ছিলো, তখন এলাকার প্রভাবশালী মহল প্রভাব বিস্তার করে নিজেদের দখলকৃত ভূমির পরিমাণ ঠিক রেখেছে। সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, নদীর ভূমি দখল করে প্লট বানিয়ে বিক্রি করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে প্রভাবশালী মহল। ঘটনাটি ব্রহ্মপুত্র ও হাড়িধোয়া দুই নদীর বেলায়ই দেখা গেছে। এগুলো মানুষের চোখে পড়লেও ভয়ের কারণে কেউ কোনো প্রতিবাদ করার সাহস করে না কেবল আক্রমণের শিকার হবে, এমনটা ভেবে। অন্যদিকে খনন কাজে সবচেয়ে চোখে পড়ার মতো যে-ঘটনাগুলো ঘটেছে, সেটা হলো নদীগুলো খনন করার সময় পাড় থেকে স্লোপ করে একটি ফুটপাতের মতো রাস্তা তৈরি করা হয়। পরে সেখান থেকে আবার কিছুটা স্লোপ করে মাটি কেটে নদীর তলদেশ সমান করা হয়। এতে নদীর প্রস্থ কমে আসে। ব্যাপারটি আরো সহজভাবে বললে, হাড়িধোয়ার ৬২ মিটার প্রস্থের নদীটি উপরের বর্ণনা অনুযায়ী খনন করার ফলে দুইপাশের প্রস্থ মিলে অর্ধেক নদী গায়েব করে ফেলা হয়েছে। ব্রহ্মপুত্র নদের উপর অসংখ্য ব্রিজকে কালভার্ট বানিয়ে ফেলা হয়েছে। এগুলো নদীর প্রস্থকে অনেক কমিয়ে দিয়েছে। নরসিংদী জেলার পলাশ উপজেলার চরনগরদী বাজারের প্রবেশপথে ব্রহ্মপুত্রের ছোটো ব্রিজটিই তার চাক্ষুষ প্রমাণ। কালভার্টটি (কালভার্টের দৈর্ঘ্যকে ব্রিজ বলা যাচ্ছে না) আবার নদের তলদেশ থেকে কয়েক মিটার উপরে অবস্থিত। এটা কীসের জন্যে তৈরি করা হয়েছে, সেটা প্রকৌশল অধিদপ্তরের লোকজন আর ঠিকাদারগণ ভালো বলতে পারবেন। এটা পরিকল্পনা কমিশনের প্ল্যানে নদীর উপর ব্রিজের যে-ম্যাপ তৈরি করা হয়েছে, সেটা দেখলে বলা যাবে, তারা এই নদ থেকে কী পরিমাণ লুটপাট করেছে। এটা ঘটছে প্রশাসন, ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের নেতা এবং ঠিকাদারদের যোগসাজশে। যদি হাড়িধোয়া নদী ধরেই হিসাব করি, তাহলে বলা যায়, ৩৮ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য ও ৬২ মিটার প্রস্থের নদীটির আয়তন অর্ধেকে নেমে এসেছে। ফলে নদীর পানি কমে গিয়ে নানাবিধ সমস্যা দেখা দিচ্ছে। নদীতে পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি থাকলে সেটা সূর্যের কড়া তাপকে শোষণ করে। ফলে, আবহাওয়া শীতল থাকে। অন্যদিকে, নদী দখলের মধ্য দিয়ে কেটে ফেলা হচ্ছে হাজার হাজার বৃক্ষ। এটা জলবায়ু পরিবর্তনে ব্যাপক প্রভাব ফেলছে।

হাড়িধোয়া নদীর বীরপুর অংশে ঘুরে দেখা যায়, নদীর সীমানা পিলার থেকে কমপক্ষে ১০০ ফুট নদীর জায়গা ভরাট করে বাড়িঘর করেছে অনেকে। সেই সাথে দেয়াল টেনে প্লট করেও রাখা আছে বিভিন্ন স্থানে। ছবির ডানপাশে হলুদ রঙের সীমানা পিলারটি দেখা যাচ্ছে | ছবি : গঙ্গাঋদ্ধি

গার্মেন্টস ও কল-কারখানার বর্জ্য
শিল্প কারখানা ও গার্মেন্টস খাত থেকে বিশ্বের ২০ শতাংশ বর্জ্যপানি ও ১০ শতাংশ কার্বন-ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ হয়। বিশ্বব্যাপী যে-পরিমাণ পানি ব্যবহার হয়, তার প্রায় ২.৬% টেক্সটাইল মিলে ব্যবহার করা হয়। অনুমান করা হয় যে, টেক্সটাইল ইন্ড্রাস্ট্রিগুলোর ডাইং করার সময় প্রতি বছর ২.৪ ট্রিলিয়ন গ্যালন পানি লাগে। পোশাক শিল্প এবং ফ্যাশন ওয়াটার ফুটপ্রিন্ট অনুযায়ী এটি অনুমান করা হয় যে, বিশ্বব্যাপী ইন্ড্রাস্ট্রিয়াল পলিউশনের ২০% পলিউশন আসে টেক্সটাইলের ট্রিটমেন্ট এবং ডাইং ইন্ড্রাস্ট্রি থেকে। আনুমানিক ৮,০০০ প্রকারের সিনথেটিক কেমিক্যাল কাঁচামালকে টেক্সটাইল ম্যাটারিয়ালে পরিণত করতে ব্যবহৃত হয়।

প্রতি বছর, টেক্সটাইল মিলগুলো লক্ষ লক্ষ গ্যালন কেমিক্যাল কন্টামিনিটেড ইফ্লুয়েন্ট আমাদের নদীতে ডিসচার্জ করে। এটি অনুমান করা হয় যে, একটি টেক্সটাইল মিল প্রতি টন ফেব্রিকের ডাইংয়ের জন্যে ২০০ টন সফট ওয়াটার ব্যবহার করে। সুতরাং এটি কেবল পানি শোষণ করে না, কেমিক্যালগুলো পানিকে দূষিত করে, যা উন্নয়নশীল দেশের সর্বত্র পরিবেশগত ক্ষতি এবং রোগ— উভয়ই সৃষ্টি করে।

২০১৭ সালের এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে যে, কেবলমাত্র ২০১৫ সালে, ফ্যাশন শিল্প ৭৯ বিলিয়ন ঘনমিটার পানি কনজিউম করেছিলো, যা কি না ৩২ মিলিয়ন অলিম্পিক আকারের সুইমিংপুল পানি দ্বারা পরিপূর্ণ করার পক্ষে যথেষ্ট ছিলো। ২০৩০ সালের মধ্যে এই সংখ্যা ৫০% বৃদ্ধি পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

কনভেনশনাল টেক্সটাইল ডাইং এবং ফাইবার ফিনিশিং— উভয়ই ওয়াটার কনজিউমিং এবং পলিউটিং শিল্প। অনুমান করা হয় যে, (স্পিনিং, ডাইং, ফিনিশিংসহ) এক কেজি ফাইবার প্রসেস করতে (তুলা, পলিয়েস্টার এবং অন্যান্য ম্যাটারিয়ালস) ১০০ থেকে ১৫০ লিটার পানির প্রয়োজন।
ফ্যাশন শিল্প বর্তমানে সারা বছর ধরে যে-পরিমাণ পানি ব্যবহার করে, তা ১১০ মিলিয়ন মানুষের ৫ বছরের তৃষ্ণা নিবারণের জন্যে যথেষ্ট।

ডয়েচে ভেলের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এলেনমার্ক আর্থার ফাউন্ডেশন বলছে, প্রতি বছর ঢাকার চারপাশের নদীতে যে-পরিমাণ রঙ মিশছে, তা দিয়ে অলিম্পিকের ৩৭ মিলিয়ন সুইমিংপুল পূর্ণ করা সম্ভব। আর ঢাকার আশপাশের নদ-নদী বলতে নরসিংদীর ব্রহ্মপুত্র, হাড়িধোয়া, শীতলক্ষ্যা এবং মেঘনাকেও বোঝানো হয়েছে।

ইন্ডাস্ট্রিগুলো এসব ব্যবহৃত পানি নামমাত্র পরিশোধন করে সরাসরি নদীতে ফেলছে। এটা অত্যন্ত গর্হিত কাজ। মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক পদার্থ মিশ্রিত পানি নদীতে ফেলার ফলে জনজীবন বিপর্যস্ত হচ্ছে। নির্বংশ হচ্ছে মাছসহ অসংখ্য জলজ প্রাণির জীবন। পশু-পাখির তৃষ্ণা মেটাবার জন্যে যে-পানির প্রয়োজন, সেটা ধ্বংস করা হচ্ছে। পশু-পাখির শরীরে অবলীলায় প্রবেশ করছে বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক পদার্থ। ফলে পশু-পাখি বিলুপ্তির পথে এগিয়ে যাচ্ছে এবং প্রভাব পড়ছে বাস্তুসংস্থানের উপর। নদীর পানি ব্যবহার করে কৃষক যে-কৃষিকাজ করতেন, অতিমাত্রায় রঙের কারণে এখন আর সেই পানি ব্যবহার করতে পারছেন না। ফলে রাষ্ট্র বঞ্চিত হচ্ছে জিডিপি আর জাতীয় মোট আমিষ থেকে।

হোটেল ও বাসা-বাড়ির বর্জ্যের রস
দেশের প্রায় বেশিরভাগ শহর কিংবা বাজার নদীর পাড়ে গড়ে ওঠেছে। ছোটো-বড়ো অসংখ্য বাজারের বর্জ্য নদীর পাড়ে ফেলা হচ্ছে, যার পরিমাণ দৈনিক লক্ষ বা কোটি টন। এসব বর্জ্য থেকে প্রচুর জীবাণু মিশ্রিত রস নদীর পানির সাথে মিশে যাচ্ছে। এতে পানির দূষণ ঘটছে এবং সেই সাথে জীবাণু বিভিন্নভাবে মানবদেহে প্রবেশ করছে। বাজারের হোটেল-রেস্তোরাঁ থেকে ফেলে দেয়া খাদ্য পচে পানির সাথে মিশে নদীর দূষণ ঘটাচ্ছে। আবার অনেক বড়ো বড়ো ময়লার ভাগাড় আছে, যেগুলো নদীর পাড়ে অবস্থিত, সেগুলো থেকে গড়িয়ে পড়া বর্জ্যের রস গিয়ে পড়ছে নদীর পানিতে। এটা মারাত্মক ক্ষতিকর। কারণ, এসব বর্জ্যের রসে রয়েছে ক্ষতিকারক উপাদান। মূলত যারা যেভাবে পারছে, যত্রতত্র ময়লা ফেলছে। ফলে নদীর পাড়গুলোতে যাওয়াই দুষ্কর হয়ে পড়ছে দুর্গন্ধের কারণে। এসব বর্জ্যের রস ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। এগুলো থেকে সৃষ্টি হওয়া মশা-মাছি বাজারের পরিবেশ নষ্ট করছে। ক্ষতি করছে পরিবেশের। এখানে মূলত বাজারের ব্যবসায়ীরা দায়ী। তারা তাদের ব্যবহৃত বর্জ্য নির্দিষ্ট স্থানে না ফেলে নিজেদের সুবিধামতো নদীর পাড়গুলোতে ফেলছে। দায়ী করা যায় পৌর কর্তৃপক্ষকেও। তাদের তদারকির অভাবে শহর, নগর, বাজার এবং বন্দরের নদীর পাড়গুলো কদাচার হয়ে গেছে। যদি যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হতো, তাহলে নদীর পাড়গুলোর এই বেহাল দশা হতো না।

ভেলানগর ব্রিজের পাশে স্তূপীকৃত বর্জ্য গড়িয়ে পড়ছে হাড়িধোয়া নদীতে | ছবি : গঙ্গাঋদ্ধি

মাইক্রোপ্লাস্টিক
সম্প্রতি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের অভ্যন্তরীণ নদীগুলোতে প্রতি বর্গকিলোমিটার পানিতে ২৫ লাখেরও বেশি ভাসমান মাইক্রোপ্লাস্টিকের কণা (১-১০০০ ন্যানোমিটার) পাওয়া গেছে। এছাড়াও নদীর তলদেশের প্রতি কেজি পলিতে ৪৫০ টি পর্যন্ত এই ক্ষুদ্র কণা পাওয়া গেছে। এর অন্যতম কারণ প্রতিবেশি দেশ ভারতের দৈনিক ৭৩ হাজার টন প্লাস্টিক বর্জ্য বিভিন্ন নদীর অববাহিকার মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরে পতিত হওয়া। পরবর্তীতে এসব প্লাস্টিকের কণা জোয়ারের টানে দেশের অভ্যন্তরে (যমুনা ও ব্রহ্মপুত্র নদীতে) প্রবেশ করে। বাংলাদেশ, ভারত এবং ভূটানের যৌথ অংশগ্রহণে গবেষণাটি পরিচালিত হয়েছিলো।

এছাড়াও দেশের প্রতিটি শহর, বাজার, বন্দর কিংবা নগরের বাজারগুলো থেকে প্রচুর বর্জ্য নদীতে ফেলা হচ্ছে। নদীর পাড়ে পড়ে থাকা প্লাস্টিকের বর্জ্য এবং পলিব্যাগ রোদের তাপে বা প্রাকৃতিক ক্রিয়া-বিক্রিয়ার কারণে গলে গিয়ে পানি বৃদ্ধির সাথে সাথে নদীতে মিশে যাচ্ছে এবং বয়ে যাচ্ছে মাইলের পর মাইল। ফলে মানুষ যখন নদীতে গোসল করতে নামে, তখন অনায়াসেই তাদের শরীরে ঢুকে পড়ছে প্লাস্টিকের এসব ক্ষতিকর কণা। এসব প্লাস্টিকের কণা প্রবেশ করছে মাছের শরীরেও। আর মানুষ যখন এই মাছ বাজার থেকে কিনে আনে, সাথে কিনে আনে মাইক্রোপ্লাস্টিকও। এসব প্লাস্টিকের কারণে শরীরে নানাবিধ রোগবালাই হচ্ছে। মানুষ ও মাছ— উভয়ের প্রজননে প্রভাব ফেলছে এসব মাইক্রোপ্লাস্টিক।

নেচার মেডিসিনে প্রকাশিত এক স্টাডি বলছে, ১-১০০০ ন্যানোমিটার সাইজের প্লাস্টিক (যথাক্রমে ন্যানো ও মাইক্রোপ্লাস্টিক) ব্রেনে জমা হতে পারে, এবং সেটা লিভার ও কিডনির তুলনায় অনেক বেশি পরিমাণে (৭-৩০ গুণ)! গবেষকদল ২০১৬ সালের একটা নমুনার সাথে এই নমুনা মিলিয়ে দেখেছেন যে, মাইক্রোপ্লাস্টিকের ডিপোজিট বেড়েছে বহুগুণ। মাইক্রোপ্লাস্টিক ও ন্যানোপ্লাস্টিক শুধু সামুদ্রিক মাছ বা প্রাণির চর্বিতেই থাকে না, আমাদের ঘর-বাড়ির পরিবেশেও থাকে, বাইরের বাতাসের চেয়ে একটু বেশি পরিমাণেই। এগুলো আসে গৃহস্থালির কাজে ব্যবহৃত প্লাস্টিক সামগ্রী থেকে। আমরা শ্বাসের সাথে তা গ্রহণ করি এবং আল্টিমেটলি এগুলো গিয়ে জমা হয় লিভার, কিডনি, ফুসফুস, প্লাসেন্টা (যেখান থেকে ভ্রূণেও যেতে পারে) এবং অস্থিমজ্জায়। আগে ভাবা হতো, শুধু ন্যানোপ্লাস্টিকই ব্লাড-ব্রেইন ব্যারিয়ার পাস করতে পারে। ব্যারিয়ার কী? রক্তবাহিকা ও মস্তিষ্কের টিস্যুর মধ্যকার ব্যারিয়ার, যেটা কি না এখন মাইক্রোপ্লাস্টিকও ভেদ করে যেতে পারে! এসব মাইক্রোপ্লাস্টিকের বেশিরভাগই আসে পলিইথিলিন থেকে, যেটা বিশ্বে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত প্লাস্টিক।

এসবের উপস্থিতিকে কার্ডিওভাস্কুলার ডিজিজের জন্যে দায়ী করা হয়েছে। পাকস্থলির ক্যান্সার কোষকে প্লাস্টিকের সংস্পর্শে আসার পর আরো দ্রুত ছড়াতে দেখা গিয়েছে। ব্রেনে গিয়ে এরা কী তাণ্ডব চালাবে, সেটা না হয় সময়ই বলুক। কিন্তু চিকিৎসক ও গবেষকদের কপালে দুশ্চিন্তার যে-কয়েকটা বাড়তি ভাঁজ তৈরি হয়েছে ও হবে, তা বলাই বাহুল্য।

নরসিংদী সদর, মাধবদী এবং জেলার অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বাজারের পাড়ে এমন অসংখ্য টন পলিথিন ফেলা হচ্ছে। ফলে রোদের কড়া তাপে সেগুলো গলে পড়ছে নদীতে। আর এভাবেই দূষণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হচ্ছে।

কৃষি
মানুষের সংখ্যা বাড়ার সাথে সাথে খাদ্যের চাহিদাও বাড়ছে। আর খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধির জন্যে একই জমিতে বারবার ফসল ফলানো এবং পোকামাকড়হীন উৎপাদন বৃদ্ধির জন্যে বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার করা হচ্ছে। ফলে বৃষ্টি হলে এসব জমির সার এবং কীটনাশক বৃষ্টির পানিতে ভেসে নদীতে গিয়ে পড়ছে। এভাবে জেলার লক্ষ লক্ষ হেক্টর জমিতে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহারের ফলে নদীর পানি দূষিত হচ্ছে। অথচ প্রাকৃতিক উপায়ে কী করে পোকামাকড়হীন উৎপাদন বৃদ্ধি করা যায়, সেদিকে কোনো কর্ণপাতই করা হচ্ছে না বা কর্তৃপক্ষ করছে না। গবেষণায় পর্যাপ্ত বরাদ্দ দিলে কৃষিবিজ্ঞান এক্ষেত্রে দারুণ সাফল্য অর্জন করতে পারতো। কিন্তু কর্তৃপক্ষের সদিচ্ছা আর রাজনৈতিক ফ্যালাসির কারণে দেশের পরিবেশ ধ্বংস হচ্ছে এবং এটা হচ্ছে সকলের চোখের সামনেই। অথচ আজ থেকে শত বছর আগেও কয়েক কোটি মানুষ বাস করতো এদেশে। তখন কীটনাশকের এতো ব্যবহার হতো বলে এমন তথ্য পাওয়া যায় না। কিন্তু তারা না খেয়ে ছিলো বা ফসল কম হতো এমনটা কখনোই বলা যাবে না। বরং আমাদের দেশে একটা প্রবাদ প্রচলন আছে যে, আমরা মাছে-ভাতে বাঙালি। অর্থাৎ গোলা ভরা ধান আর পুকুর ভরা মাছ এবং গোয়াল ভরা গরু আমাদের ধন-সম্পদে পরিপূর্ণ করে রেখেছিলো। সারা বছর জমানো গরুর গোবর জমির উৎকৃষ্ট সার হিসেবে বিবেচিত। জমিতে গোবর ব্যবহার করলে যেমন প্রচুর ফসল পাওয়া যেতো, তেমনি আমাদের নদীগুলোও রাসায়নিক সার আর কীটনাশকের করাল থাবা থেকে রক্ষা পেতো। আর রাষ্ট্রের বেঁচে যেতো হাজার হাজার কোটি টাকা। অথচ এখন এগুলো পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করা হচ্ছে। সবুজের সমারোহ বাংলার পথে-ঘাটে চোখ মেললেই দেখা যেতো। বিশাল বড়ো বড়ো বন-জঙ্গল সার এবং কীটনাশকের ব্যবহার ছাড়াই হাজার হাজার বছর ধরে টিকে আছে।

ড্রেনের বর্জ্য
মানুষ বাড়ার সাথে সাথে শহরের চাপও বাড়ছে। মূলত উন্নত জীবনযাপন আর শহরের অধিক কর্মসংস্থান গ্রাম থেকে মানুষকে শহরের দিকে নিয়ে আসে। ফলে অতিরিক্ত মানুষের আবাসস্থলের চাহিদা মেটাতে এবং ভাড়া পাওয়ার আশায় অসংখ্য ইট-পাথরের দালান একের পর এক গড়ে ওঠতে থাকে। ফলে শহুরে জীবনে নানাবিধ সংকট সৃষ্টি হতে থাকে। বিভিন্ন সমস্যার সাথে সাথে শহরের ড্রেনেজ ব্যবস্থার উপরও চাপ পড়ে। কোটি কোটি মানুষ তাদের ব্যবহৃত পানি এবং বর্জ্য ড্রেনে ছেড়ে দেয়। আর এভাবেই শহরের শত শত কিংবা হাজার হাজার ড্রেন নদীতে তরল বর্জ্য নিয়ে আসে। কিন্তু কী পরিমাণ বর্জ্য একটি শহর কিংবা সারা দেশ থেকে ড্রেনের মধ্য দিয়ে নদীতে পড়ছে, সেটার হিসাব এখনো পর্যন্ত বাংলাদেশে হয়নি। আর এই অবস্থা থেকে উত্তরণের কোনো পদক্ষেপও নেয়া হয়নি এখনো পর্যন্ত। এটা নিয়ে আলোচনাই হয়নি কোথাও। এসব ড্রেনের বর্জ্য নদীগুলো দূষণেও কম ভূমিকা রাখছে না। শীতলক্ষ্যা নদীর আশপাশের এলাকায় গড়ে ওঠা প্রায় ৪০০ ফ্যাক্টরির তরল বর্জ্য বিভিন্ন ড্রেন আর নালার মাধ্যমে নদীতে পড়ছে। এর পরিমাণ প্রায় দৈনিক ২০ কোটি লিটার। হোটেল, রেস্তোরাঁ এবং বাজারের বিশাল পরিমাণ বর্জ্য সরাসরি নদীতে ফেলা হচ্ছে, যা নদীর দূষণকে আরো তরান্বিত করছে। ব্রহ্মপুত্র, শীতলক্ষ্যা ও হাড়িধোয়া নদীতে প্রতি লিটার পানিতে ডিও মেনাস ডিজলভ অক্সিজেন থাকার কথা ৪-৬ মিলিগ্রাম। কিন্তু দুঃখের বিষয়, বর্তমানে তা মাত্র ১-২ মিলিগ্রাম। এটা জলজ প্রাণির বেঁচে থাকার জন্যে একেবারেই নগণ্য। অনেক প্রতিষ্ঠান ইটিপি স্থাপন করলেও কার্যত এসব লোক দেখানো এবং রাতের বেলায় অপরিশোধিত পানি ড্রেনের মাধ্যমে সরাসরি নদীগর্ভে ফেলা হচ্ছে। আর এভাবেই দেশের অসংখ্য নদ-নদী মানুষের জীবনের ন্যায় অসুস্থতায় ভুগছে।

দূষণ রোধে ম্যানগ্রোভ
শিল্প কারখানা বৃদ্ধির ফলে প্রচুর পরিমাণ রাসায়নিক বর্জ্য নদীতে ফেলা হচ্ছে। দূষিত হচ্ছে পানি। এই বিশাল পরিমাণ পানি সহজে পিউরিফাই করা সম্ভব নয়। কিন্তু নদীতে ফেলা ইন্ডাস্ট্রিয়াল বর্জ্য পদার্থের কারণে নদীর দূষণ রোধে বড়ো ভূমিকা রাখতে পারে ম্যানগ্রোভ। প্রাকৃতিক উপায়ে এটা সম্ভব। দেশের নদীগুলোর পানি পরীক্ষা করলে দেখা যাবে যে, Biological Oxygen Demand and Chemical Oxygen Demand অত্যধিক বেশি। এক্ষেত্রে ম্যানগ্রোভ প্রাকৃতিক ফিল্টার হিসেবে কাজ করতে পারে। এক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ চাইলে একটা পাইলট প্রকল্পের সূচনা করতে পারে। অনেকেই বলে থাকবেন, ম্যানগ্রোভ তো লবণাক্ত পানি ছাড়া জন্মায় না। হ্যাঁ, কথা সত্যি, এটা লবণাক্ত পানি ছাড়া জন্মায় না। কিন্তু কিছু প্রজাতি নিয়ে কলাকাতায় একটি পাইলট প্রকল্প চালু করে তারা সফল হয়েছে। তারা প্রমাণ পেয়েছে যে, ম্যানগ্রোভ ব্যাপকভাবে পানির দূষিত পদার্থ শুষে নেয় এবং পানি পরিষ্কার করে। পরিবেশবাদীরা শিল্পায়নের বিরুদ্ধে নয়। কিন্তু সেটা হতে হবে সুষ্ঠু প্রক্রিয়ায়। জেলার ১২৯ টি তরল বর্জ্য নিঃসরণকারী প্রতিষ্ঠান যদি একসাথে বসে আলোচনা সাপেক্ষে একটা ফান্ডিং করে এবং সেটা দিয়ে নদীর পাড়ে ম্যানগ্রোভ লাগায়, তাহলে ন্যূনতম হলেও ক্ষতি থেকে বাঁচা যেতো।

জার্মানির পানি পরিষ্কার করার পদ্ধতি
সম্প্রতি জার্মানির এরলাঙ্গেন-নুরেমবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যাটারিয়াল সায়েন্টিস্ট মার্কুস হালিক পানি বিশুদ্ধকরণ প্রক্রিয়া নিয়ে গবেষণা করে সফলতার মুখ দেখেছেন। তার উদ্ভাবিত পদ্ধতিটি এতোটাই কার্যকর যে, এটার মধ্য দিয়ে যতো প্রকার দূষিত পানি আছে, তার বর্জ্যকে পানি থেকে আলাদা করে ফেলে। তিনি ম্যাগনেটিক আয়রন অক্সাইড ন্যানো পার্টিকেল ব্যবহার করে অনেক ধরনের দূষণ অপসারণ করতে সক্ষম হয়েছেন। তারা পার্টিকেলগুলোর পৃষ্ঠকে মলিকিউল দিয়ে আবৃত করে আর সেই কারণে পার্টিকেলগুলো বিভিন্ন ধরনের দূষণ শনাক্ত করতে পারে। পার্টিকেলগুলো ডিজেলের সাথে যুক্ত হয়ে জমাট বাঁধে, যা চুম্বক দিয়ে সহজেই টেনে বের করা যায়। এই ধরনের আরো কী কী পদ্ধতি আছে, রাষ্ট্রকে সেগুলো বিভিন্ন দেশের সাথে যোগাযোগ করে বের করতে হবে। এতে নদীগুলো কিছুটা হলেও বেঁচে যাবে।

নদীর লিভিং এনটিটি
বাংলাদেশের উচ্চ আদালত ২০১৯ সালে দেশের সব নদীকে ‘লিভিং এনটিটি বা জীবন্ত সত্তা’ হিসেবে ঘোষণা করেছেন। ফলে এখন থেকে দেশের নদীগুলো মানুষ বা অন্যান্য প্রাণির মতোই আইনী অধিকার পাবে। আদালতের রায় অনুযায়ী নদীগুলো ‘জুরিসটিক পারসন বা লিগ্যাল পারসন’। এর মধ্য দিয়ে নদীগুলোরও মানুষের মতো মৌলিক অধিকারের স্বীকৃতি রয়েছে। নদীগুলোকে বাঁচাতে হলে সম্মিলিতভাবে সচেতন নাগরিকদের এগিয়ে আসতে হবে। বিভিন্ন সংগঠন একসাথে হয়ে একটা কঠোর আন্দোলনের দিকে যেতে পারে। এখানে বিভিন্ন স্কুল, কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্যাম্পেইন করে তরুণদের সম্পৃক্ততা বাড়ানো যেতে পারে। নদীগুলো বাঁচানোর জন্যে সরকারকে বাধ্য করতে হবে এজন্যে যে, যারা নদী দূষণের সাথে জড়িত, তাদের সরকারি সুবিধা বাতিল করে আইনের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। আর বিভিন্ন কারখানার বিষাক্ত বর্জ্য নদীতে পড়ছে কি না, সেটা সর্বসাধারণের দেখার জন্যে পরিবেশ অধিদপ্তরের সিসি ক্যামেরাগুলো ওপেন করে দেয়ার জন্যে সরকারকে পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করা। কারণ সেখানেই একটা গণ্ডগোল আছে। দেশের পরিবেশ আন্দোলনের যেসব সংগঠন আছে, সেগুলো এক্টিভ করে তুলতে হবে। পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের ভূমিকাকে মিডিয়ার মাধ্যমে সামনে নিয়ে আসতে হবে। নয়তো নদীগুলোকে বাঁচানো সম্ভব হবে না। নদীর লিভিং এনটিটির সর্বোচ্চ ব্যবহার এখন অত্যাবশ্যকীয় হয়ে পড়েছে। দেশের নদ-নদী এবং জলাভূমি ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় কঠোর পরিবেশগত নীতি এবং আইন তৈরি করেছে। নিম্নলিখিত চারটি আইন এক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক :

বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫ (পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়, ১৯৯৫), বাংলাদেশ পানি আইন ২০১৩ (বাংলাদেশ, ২০১৩ক), জাতীয় নদী সংরক্ষণ কমিশন আইন ২০১৩ (বাংলাদেশ, ২০১৩খ) এবং বাংলাদেশ জীববৈচিত্র্য আইন ২০১৭ (বাংলাদেশ, ২০১৭)।

কিন্তু এগুলোর প্রয়োগ নেই বললেই চলে। আর আইনগুলোরও সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তন অনিবার্য হয়ে পড়েছে। আইনগুলোতে শাস্তির বিধান এমনভাবে রাখা হয়েছে যে, এগুলো দেশের পরিবেশের সর্বনাশকারী পুঁজিবাদীদের পরিবেশ দূষণে আরো উৎসাহিত করছে। আইনগুলোতে বিশ হাজার থেকে দুই লাখ টাকা জরিমানার বিধান এবং অনাদায়ে দুই মাস জেল থেকে দশ বছর পর্যন্ত করা হয়েছে। অর্থাৎ যতো বড়ো অপরাধই করুক না কেন, টাকার জোরে তিনি পার পেয়ে যাবেন, এটি এমনই এক অদ্ভূত ও হাস্যকর আইন। টাকার জোরে যাতে অপরাধী পার পেয়ে যেতে না পারে, পরিবেশ বাঁচাতে সেই আইন তৈরি এখন অনিবার্য। শাস্তির বিধানে কোটি টাকা পর্যন্ত জরিমানা রাখা উচিত। আর জেল হলে সেটা তাকে যেন ভোগ করতেই হয়, এমন আইন তৈরি করা ফরজ হয়ে গেছে। আর আইন তৈরির পর প্রয়োগ না হলে সেটা আরো ভয়ানক হবে। পানি আইন নীতিমালা এবং বিধিমালা— এসবের কোনোটাই বাংলাদেশে এখনো পর্যন্ত হয়নি, এটি অত্যন্ত দুঃখজনক। কয়েক বছর আগে হাড়িধোয়া নদী নিয়ে মামলা হয়েছিলো। কিন্তু এখনো সেই মামলার রায় আসেনি। নদী পুনরুদ্ধারে দেশের তিনটি পাইলট প্রকল্পের মধ্যে একটি হাড়িধোয়া। সেটিও জেলার প্রভাবশালী মহলের চাপের মুখে বন্ধ হয়ে গেছে। তাহলে এভাবে চলতে থাকলে দেশের যে বিপন্ন অবস্থা, এটা তো বাড়তেই থাকবে। আর এর ক্ষতির সম্মুখীন হবে সাধারণ ও প্রভাবশালী সকলের সন্তানেরা।

রাজনৈতিক বন্দোবস্ত চাই
দেশের বিদ্যমান রাজনৈতিক দলগুলো থেকে এখন পর্যন্ত নদীগুলো রক্ষায় কার্যকরী কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করতে দেখা যায়নি। সরকার আসে, সরকার যায়, কিন্তু নদী দূষণ চলতে থাকে আগের মতোই কিংবা তারচেয়ে বেশি। রাজনীতির সাথে জড়িত বহু নেতা রয়েছেন, যারা সরাসরি নদী দূষণের সাথে জড়িত। নদী নিয়ে সরকার যেভাবে কৃচ্ছসাধন করছে, এভাবে চলতে দিলে নদীগুলোর তলদেশ গরু-ছাগলের তৃণভূমিতে পরিণত হতে খুব বেশি সময় লাগবে বলে মনে হয় না। নির্বাচনের ইশতেহারে পরিবেশ রক্ষার ব্যাপারে কোনো দলই বিগত সময়ে আগ্রহ প্রকাশ করেনি। এটা অত্যন্ত দুঃখজনক। দেশের বিদ্যমান রাজনৈতিক দলগুলো যদি একসাথে বসে এটা নিয়ে আলাপ-আলোচনা করে, তাহলে একটা মীমাংসা হতে বাধ্য। এখানে রাজনৈতিক সদিচ্ছার চরম ঘাটতি দেখছি। তারা পরিবেশ নিয়ে মাথা ঘামিয়ে সময় নষ্ট করার পক্ষে নয়। ক্ষমতায় গেলে সবাই ভুলে যায়, কার কী দায়িত্ব বা কী প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসেছিলো। তাই এমন কিছু নিয়ে ভাবা উচিত, যেন তারা সেটা ভোলার অবকাশ না পান। এখানে বলে রাখা ভালো যে, কোনো দলই এটার বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস করে না এবং এটা যে প্রয়োজন, তার গুরুত্ব বিনাবাক্যে স্বীকার করে। কিন্তু জনগণের জন্যে কিছু করতে হলে সেটা তো দেখাতে হবে। তারা যেন পরিবেশ দূষণ রোধে রাষ্ট্রীয়ভাবে সকলকে সাথে নিয়ে কিছু একটা করে, সেই বন্দোবস্ত এখনই করতে হবে। আগামীতে করতে চাইলে সেই ‘আগামী’ কবে আসবে, তা আমরা জানি না। আমরা জানতেও চাই না।


বালাক রাসেল
সম্পাদক, ঢেঁকি

দেশপ্রেমে ব্রতী আবুল হাসিম মিয়ার জীবনচরিত

একাত্তরের জুলাই মাসের মাঝামাঝি সময়। মুক্তিযুদ্ধ সংগঠকদের সর্বদলীয় কমিটির আহ্বায়ক, প্রবীণ জননেতা এবং বাম রাজনীতিবিদ আবুল হাসিম মিয়াকে পাকিস্তানি সেনারা শিবপুর উপজেলার পুটিয়া ইউনিয়নের ভরতেরকান্দি গ্রামের শফিউদ্দিন মাস্টারের বাড়ি থেকে আটক করে। সেখান থেকে তাঁকে নরসিংদী টেলিফোন এক্সচেঞ্জে নিয়ে যায়। তাঁর উপর চালায় অমানবিক নির্যাতন। পা উপরে ও মাথা নিচে ঝুলিয়ে দাঁতের পাটিতে বেত মেরে ফেলে দেয়। এক সপ্তাহ এভাবে তাকে নির্যাতনের পর ছেড়ে দেয়া হয়।

নরসিংদী অঞ্চল বাম রাজনীতির তীর্থভূমি হিসেবে পরিচিত ছিলো। বহু বিপ্লবী রাষ্ট্র ও পুলিশের রোষানল থেকে বাঁচতে এখানে এসে আশ্রয় গ্রহণ করতেন। এটা ছিলো বামধারার রাজনীতিবিদ ও বিপ্লবীদের অভয়কেন্দ্র। গত শতকে নরসিংদী অঞ্চল দাঁপিয়ে বেড়ানো তেমনি একজন নিবেদিতপ্রাণ বামধারার রাজনীতিবিদ ছিলেন আবুল হাসিম মিয়া; সবার প্রিয় ‘হাসিম ভাই’। বনেদী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেও অতি সাদামাটা জীবনযাপন করেছেন সমগ্র জীবন। আর মানুষের কল্যাণে নিজেকে নিবেদিত রেখেছেন সর্বদা।

আবুল হাসিম মিয়া জন্মেছেন ১৯২০ সালে, দত্তপাড়ায়। রাজনৈতিক পরিবারে তাঁর জন্ম। নরসিংদীর অবিসংবাদিত রাজনৈতিক পুরুষ সুন্দর আলী গান্ধী তাঁর চাচা। সে-কারণে সর্বভারতীয় বহু নেতার সংস্পর্শে আসার সুযোগ পান তিনি।

আবুল হাসিম মিয়ার পিতা হাফিজ উদ্দিন ছিলেন একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী ও ধার্মিক ব্যক্তি। তাঁর চাচা সুন্দর আলী গান্ধী ছিলেন নরসিংদীর খ্যাতিমান ব্যক্তি। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে তাঁর ছিলো বলিষ্ঠ ভূমিকা। মহাত্মা গান্ধীর একনিষ্ঠ সৈনিক এবং অনুসারী ছিলেন বলে তিনি জনগণের কাছ থেকে ‘গান্ধী’ উপাধি পান। একদিকে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন, অন্যদিকে স্থানীয় সামন্ত প্রভু, জোতদার, মহাজন, সুদখোরদের বিরুদ্ধেও তিনি ছিলেন আপসহীন। অসাম্প্রদায়িক ভূমিকার কারণে তাঁকে হিন্দু-মুসলমানদের ঐক্যের দূতও বলা হতো। গৌরবদীপ্ত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব সুন্দর আলী গান্ধী ১৯৪৭ সালে ইন্তেকাল করেন। তাঁর মরদেহ মেঘনা নদীর তীরে তাঁর প্রতিষ্ঠিত স্কুল-মসজিদ-ঈদগাহের পাশে নিজ পারিবারিক কবরস্থানে সমাহিত করা হয়। হাসিম মিয়ার আরেক চাচা বেলায়েত হোসেন মাস্টার ছিলেন শিক্ষানুরাগী ও সমাজসেবক। পারিবারিক বাতাবরণে তিনি বড়ো হন দেশসেবার ব্রত নিয়ে। দুজনের ঐকান্তিক প্রচেষ্টার ফলশ্রুতিতে সেই অঞ্চলের অনগ্রসর সম্প্রদায় এবং জনগোষ্ঠীর ছেলেমেয়েদের শিক্ষা প্রদানের মানসে ১৯২৮ সালে নরসিংদী মাইনর স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন এবং পরবর্তীতে ১৯৩৮ সালে বিদ্যালয়টি নরসিংদী উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয়। বর্তমানে এটি ‘নরসিংদী পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়’ নামে পরিচিত।

নরসিংদী অঞ্চলের স্বনামধন্য ব্যবসায়ী হিসেবেও পরিচিত ছিলেন বেলায়েত হোসেন মাস্টার। বাংলা, ইংরেজি— উভয় ভাষাতেই তিনি ঋদ্ধ ছিলেন। দুষ্প্রাপ্য, দুর্লভ এবং বিশ্বখ্যাত বই-পুস্তক ও পত্র-পত্রিকা পাঠ করে লাভ করতেন পরম তৃপ্তি ও প্রশান্তি। নরসিংদী সরকারি কলেজ, নরসিংদী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় এবং মেঘনার তীরে স্থাপিত দাতব্য চিকিৎসালয়সহ বহু প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠার পেছনে তাঁর শ্রম ও ঘামের গন্ধ পাওয়া যায়। তাছাড়া স্থানীয় বাউলমেলার শীর্ষ আয়োজক হিসেবে আমৃত্যু দায়িত্ব পালন করেছেন। বেলায়েত হোসেন মাস্টারের অনেক গুণাবলি, বিশেষ করে, দুষ্প্রাপ্য গ্রন্থ সংগ্রহ, দুর্লভ পত্র-পত্রিকা পাঠ ও সংগ্রহ বংশগতভাবে তাঁর পুত্র শাহাদাত হোসেন মন্টুর ভেতরও জাগ্রত ছিলো। শাহাদাত হোসেন মন্টু এ-বছরের জুন মাসে পরপারের পথে পাড়ি দিয়েছেন।

আবুল হাসিম মিয়ার মেজো কাকা আবদুল হামিদের ছেলে আবদুল গফুর মিয়াও খুবই সাহসী ও বিচক্ষণ ব্যক্তি ছিলেন। তিনি নারায়ণগঞ্জ মহকুমার মুসলিম লীগের প্রথম সাধারণ সম্পাদক ও পরে সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।

হাসিম মিয়ার পিতামহ কেরামত আলী আরবি, ফারসি ও উর্দু ভাষায় সুপণ্ডিত ছিলেন। দ্বীনি চেতনায়ও ঋদ্ধ ছিলেন। তিনি দত্তপাড়ায় এসে বসতি গড়ে তুলেছিলেন। প্রপিতামহ আরবাব আলী খান সিপাহী বিপ্লবের (১৮৫৭) সংগঠক ও তহবিল সংগ্রাহক ছিলেন।

শিক্ষা-সংস্কৃতি, সমাজসেবা ও রাজনীতিতে বিশাল পরিবারটি নিঃসন্দেহে সারা দেশে বিখ্যাত ছিলো বলাই যায়। পাক-ভারত উপমহাদেশের বরেণ্য ব্যক্তিগণ এই বাড়িতে আতিথেয়তা গ্রহণ করেছেন। তাঁদের মধ্যে ভারতের প্রথম রাষ্ট্রপতি ড. রাজেন্দ্র প্রসাদ, ড. আচার্য কৃপানলি, ডা. বিধানচন্দ্র রায়, শরৎ বোস, রাসবিহারী বোস, শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, তাজউদ্দীন আহমদ, আতাউর রহমান খান, খাজা নাজিমুদ্দিন, মোহাম্মদ আলী (বগুড়া), প্রফেসর মোজাফ্ফর আহমদ, কমরেড মণি সিংহ প্রমুখ।

পারিবারিক জীবন
আবুল হাসিম মিয়ার পিতা হাফিজ উদ্দিনের ছিলো দুই স্ত্রী। প্রথম স্ত্রীর গর্ভের সন্তান আবদুল আজিজ (কালু মিয়া)। দ্বিতীয় স্ত্রীর গর্ভের তিন পুত্র সন্তান— আবুল হাসিম মিয়া, আবদুর রশিদ মিয়া ও আবদুল লতিফ মিয়া। দুই কন্যা সন্তান হলো মাজেদা বেগম ও ফিরোজা বেগম। আবুল হাসিম মিয়া ছাত্র জীবনেই রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। মেট্রিক পাশের পর রাজনৈতিক কারণে পড়াশোনা করা হয়নি। দেশপ্রেমের দীক্ষা নিয়ে সমাজের কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করেন। রাজনৈতিক কারণেই তাঁর বিয়ে করা হয়নি। ছোটো ভাই আবদুল লতিফের সংসারের সাথে তিনি সম্পৃক্ত থাকেন।  তাঁর মা-ও ছোটো ভাইয়ের সংসারে যুক্ত ছিলেন। আবদুল লতিফের নরসিংদী বাজারের পাটপট্টিতে একটি লন্ড্রি ছিলো। পরবর্তীতে অন্য ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ত হন তিনি। তাঁর জীবদ্দশায় তাঁর ছোটো ভাই মারা যায়। ছোটো ভাইয়ের তিন ছেলে ও তিন মেয়ে। এরাই ছিলো তাঁর সন্তান। এদের লেখাপড়ার দায়িত্ব পালন করেন তিনি। সার্বক্ষণিক রাজনীতি করার কারণে স্থায়ীভাবে কোনো ব্যবসা-বাণিজ্য করতেন না। কিছু ঘনিষ্ঠজনের মাধ্যমে ব্যবসায় ক্ষুদ্র পুঁজি বিনিয়োগ করেছিলেন। তা থেকে প্রাপ্ত লভ্যাংশ দিয়ে নিজের ও সংসারের খরচ মেটাতেন।

ভাতিজা ও ভাতিজিদের লেখাপড়ার জন্যে হারুন অর রশিদ ভূঁইয়াকে লজিং মাস্টার নিয়োগ করেছিলেন। হারুন সাহেবের বাড়ি ছিলো শিবপুরের বৈলাব গ্রামে। মাধবদীতে সুতার দোকানের কর্মচারী ছিলেন। তাঁর অনুপ্রেরণায় হারুন অর রশিদ নরসিংদী পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৬৮ সালে প্রাইভেটে এসএসসি পাশ করেন। নরসিংদী কলেজের অনেক ছাত্র গ্রাম থেকে এসে আর্থিক কারণে মেসে অথবা ভাড়া বাড়িতে থেকে পড়াশোনা করতে পারতো না। আবুল হাসিম মিয়া বহু ছাত্রের লজিংয়ের ব্যবস্থা করে দেন। অপর ভাই আবদুর রশিদ মিয়ার ছেলেমেয়েরাও প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পেছনে তাঁর উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা যথেষ্ট কাজে লেগেছে। ভাতিজি রাশিদা বেগম লাভলি সিদ্ধিরগঞ্জ রেবতি মোহন পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতেন। বর্তমানে তিনি অবসরপ্রাপ্ত। ভাতিজা মিয়া মো. মঞ্জুর নরসিংদী সরকারি কলেজ ছাত্র সংসদের (১৯৯৯-২০০০) ভিপি ছিলেন।

ভাষা আন্দোলনে অবদান
ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে নরসিংদী অঞ্চল যথেষ্ট সরব ছিলো। জনগণের সম্পৃক্ততা ছিলো গভীর। ফলে এই অঞ্চল ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম ক্ষেত্র হিসেবে গড়ে ওঠে। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টি হলে নরসিংদীতে প্রতিশ্রুতিশীল রাজনীতিবিদদের সংখ্যা ক্রমশ বৃদ্ধি পায়। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো মাওলানা মুহাম্মদ আবদুল আজিজ, বিজয়ভূষণ চ্যাটার্জি, সেকান্দর আলী, আবুল হাসিম মিয়া, আহমেদুল কবীর, মোসলেহ উদ্দীন ভূঞা, আফতাব উদ্দিন ভূঞা, ফজলুল হক খোন্দকার, আফসার উদ্দিন ভূঞা, আবদুল করিম মিয়া ও কফিল উদ্দিন ভূঞা প্রমুখ।

২৩ ফেব্রুয়ারি দত্তপাড়ার ঐতিহাসিক ঈদগাহ ময়দানে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী উপস্থিত হন। সেদিন সন্ধ্যার পূর্বেই পুরো শহর মিছিলে-শ্লোগানে উদ্ভাসিত হয়। শুরু হয় গণগ্রেফতার ও পুলিশী নির্যাতন। সেদিন আবুল হাসিম মিয়া, সুরেশ পোদ্দার, আবুল ফজল মিয়া ও গৌরানন্দ সাহা গ্রেফতার হন।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সম্পৃক্ততা
সাটিরপাড়া কালী কুমার ইনস্টিটিউশন (স্কুল এন্ড কলেজ)-এর পরিচালনা পরিষদের দুই মেয়াদে সদস্য ছিলেন আবুল হাসিম মিয়া। ১৯৭২-৭৫ ও ১৯৭৫-৭৮। তিনি নরসিংদী সরকারি কলেজের ও নরসিংদী পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের গভর্নিং বডির সদস্য ছিলেন। নরসিংদী উচ্চ বালিকা বিদ্যানিকেতনের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এবং নরসিংদী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় (বর্তমানে সরকারি) দেশভাগের পর দ্বিতীয় পর্যায়ে চালু করার প্রধান উদ্যোক্তা। এছাড়া তিনি ব্রাহ্মন্দী মাধ্যমিক বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের গভর্নিং বডির সদস্য ছিলেন।

কারাজীবন
১৯৫৮ সালে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট সামরিক আইন জারি করে। পাকিস্তানব্যাপী রাজনৈতিক নেতাদের কারারুদ্ধ করা হয়। সাটিরপাড়া কালী কুমার ইনস্টিটিউশন স্কুলের সহকারী প্রধান শিক্ষক রবীন্দ্র মল্লিক (ফণী মল্লিক)-এর সাথে ছিলো আবুল হাসিম মিয়ার সখ্য। তিনি ছিলেন বামপন্থামনস্ক। আবুল হাসিম মিয়া, সুরেশ পোদ্দার, কার্তিক সাহা, সাত্তার, সরোজেন্দ্র লাল সাহা, মুস্তাফা সরোয়ার ও আবুল ফজল প্রমুখকে গ্রেফতার করে কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়।

মুক্তিযুদ্ধে অবদান
একাত্তরের জুলাই মাসের মাঝামাঝি সময়। মুক্তিযুদ্ধ সংগঠকদের সর্বদলীয় কমিটির আহ্বায়ক, প্রবীণ জননেতা এবং বাম রাজনীতিবিদ আবুল হাসিম মিয়াকে পাকিস্তানি সেনারা শিবপুর উপজেলার পুটিয়া ইউনিয়নের ভরতেরকান্দি গ্রামের শফিউদ্দিন মাস্টারের বাড়ি থেকে আটক করে। সেখান থেকে তাঁকে নরসিংদী টেলিফোন এক্সচেঞ্জে নিয়ে যায়। তাঁর উপর চালায় অমানবিক নির্যাতন। পা উপরে ও মাথা নিচে ঝুলিয়ে দাঁতের পাটিতে বেত মেরে ফেলে দেয়। এক সপ্তাহ এভাবে তাকে নির্যাতনের পর ছেড়ে দেয়া হয়। পাকিস্তানি সেনারা তাঁকে শর্ত জুড়ে দেয়, তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ রাখতে পারবেন না। সেখান থেকে ছাড়া পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে নরসিংদী ছেড়ে যেতে হবে। তিনি পাকিস্তানি সেনাবাহিনির কাছে দমে যাননি। ঢাকার মিরপুরে আত্মগোপনে থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করতে থাকেন।

মস্কো ভ্রমণ
ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) প্রধান অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদের পরামর্শে ১৯৭৯ সালের জুলাই মাসে আবুল হাসিম মিয়াকে পার্টির তিন মাসের প্রশিক্ষণ ও সফরের জন্যে সোভিয়েত ইউনিয়নে প্রেরণ করা হয়। সেখানে তিনি সমাজতন্ত্র বাস্তবায়নের ফলে বিভিন্ন রাজ্যের জনগণ কেমন আছে, তা সচক্ষে দেখেন, তাদের সাথে কথা বলেন। মস্কোসহ সেই দেশের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান পরিদর্শন করেন।

জাতীয় স্থানীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ
আবুল হাসিম মিয়া ১৯৭০ সালে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে নরসিংদী-রূপগঞ্জ আসনে পিডিপি’র প্রার্থী হয়ে ‘ছাতা’ প্রতীকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি ন্যাপে যোগদান করেন। ১৯৭৩ সালে প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নরসিংদী সদর আসনে ন্যাপের প্রার্থী হিসেবে ‘কুঁড়েঘর’ প্রতীকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন। উপরের দুটি নির্বাচনে প্রচুর ভোট না পেলেও ভালো ও যোগ্য প্রার্থী হিসেবে সবাই তার প্রশংসা করেন।

নরসিংদী পৌরসভার চেয়ারম্যান পদে ১৯৭৭ সালে ‘ঘড়ি’ প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জয়লাভ করতে পারেননি। ১৯৯৩ সালে গণফোরাম গঠিত হলে তিনি উক্ত দলে যোগদান করেন এবং ১৯৯৬ সালে নির্বাচনে ‘উদীয়মান সূর্য’ প্রতীকে অংশগ্রহণ করে স্বল্প সংখ্যক ভোট পান।

শেষকথা
১৯৯৯ সালের ২৯ ডিসেম্বর ৭৯ বছর বয়সে আবুল হাসিম মিয়া চলে যান না ফেরার দেশে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসের ২৯ তারিখ তাঁর ২৫তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে নরসিংদী প্রেসক্লাব মিলনায়তনে ‘আবুল হাসিম মিয়া স্মৃতি সংসদ’ স্মরণসভার আয়োজন করে এবং গুণীজনদের সম্মাননা প্রদান ও শীতার্তদের মাঝে কম্বল বিতরণ করে।

যারা ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়াতেন, তাদের সংখ্যা অল্প এবং এখন তারা বিলীয়মান প্রজাতি। আবুল হাসিম মিয়ার মৃত্যুর ২৫ বছর পরও তাঁর কর্মের জন্যে বেঁচে আছেন মানুষের হৃদয়ে।


রঞ্জিত কুমার সাহা
উপদেষ্টা, বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি
সিনেট সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়