Home Blog Page 3

স্থানীয় সাংবাদিকতার পথিকৃৎ ঈশ্বর চন্দ্র সূত্রধর

0

স্বাধীনতার পরপর নরসিংদী ঢাকা জেলার একটি ছোটো থানা শহর। সাংবাদিকদের সংখ্যাও খুব বেশি নয়। হাতে গোনা কয়েকজন সাংবাদিককে নিয়ে ঈশ্বর চন্দ্র সূত্রধর গড়ে তোলেন নরসিংদী প্রেস ক্লাব। সবাই মিলে প্রধান সাংবাদিক হিসেবে তাঁকেই সভাপতি নির্বাচিত করেন।

একজন নির্লোভ ও মানবিক গুণাবলী সম্পন্ন মানুষ ছিলেন ঈশ্বর চন্দ্র সূত্রধর (১৯২৫-১৯৮৩)। এসব বিশেষণের প্রভাব পড়েছিলো তাঁর কর্মজীবনে— সাংবাদিকতায়। দিনের পর দিন অভুক্ত থেকেও মানুষের দুঃখ-দুর্দশা নিরসনে তিনি আপোষহীন কলমযোদ্ধা ছিলেন। পকেটে টাকা নেই, পেটে ভাত নেই— এমন দারিদ্র্য তাঁর পেশায় পিছুটান আনতে পারেনি। ঢাকার নিকটবর্তী নরসিংদী জনপদে ঘুরে ঘুরে মানুষের দুঃখ-কষ্ট আর সমস্যা খুঁজে বেরিয়েছেন আমৃত্যু। সেসব সংবাদপত্রে প্রকাশ করে সমাধানের পথ সুগম করে গেছেন।

নরসিংদীর এমন কোনো গ্রাম কিংবা দুর্গম এলাকা ছিলো না, যেখানকার মানুষ ঈশ্বর চন্দ্রের নাম জানতেন না। তবে তিনি ‘ঈশ্বর বাবু’ নামে বেশি পরিচিত ছিলেন। গায়ে হাফ-হাতা তিন পকেটঅলা শার্ট আর লুঙি, পায়ে চটি চাপিয়ে ভোরবেলা বাসা থেকে বের হতেন। পকেটে কলম আর নোটবুক ছিলো সর্বদা তাঁর সঙ্গী। মানুষের সব সমস্যা নিজের মাথায় নিয়ে ঘুরতেন। কীভাবে রিপোর্ট লিখলে মানুষ সেটা থেকে মুক্তি পাবে, সেই চিন্তা-ভাবনায় মগ্ন থাকতেন। কখনো নিজের সমস্যার কথা ভাবেননি। কখনো প্রচণ্ড ক্ষিধেয় কাহিল হয়ে পকেটের কোণ হাতড়ে খুচরো পয়সা পেলেও তা দিয়ে ভাত কিংবা রুটি খাওয়া সম্ভব ছিলো না। অগত্যা সামান্য মুড়ি কিনে ক্ষুধা নিবারণের ব্যর্থ চেষ্টা করেছেন। এভাবে জীবন ধারণ করতে গিয়ে সংসার-ধর্ম করার কথা তাঁর মনেই আসেনি। অকৃতদার জীবন বেছে নিয়েছিলেন নির্বিঘ্নে সাংবাদিকতা পেশা চালিয়ে যাবার জন্যে।

পাকিস্তান আমলে ঈশ্বর বাবু যখন সাংবাদিকতা শুরু করেন, তখন নরসিংদী ছিলো ঢাকা জেলাধীন নারায়ণগঞ্জ মহকুমার একটি মফস্বল থানা শহর। এর পার্শ্ববর্তী থানাগুলো, যেমন : শিবপুর, রায়পুরা, মনোহরদী, পলাশ ও বেলাব অবশ্য তেমন উন্নত ছিলো না। এসব এলাকার লোকজন কেনাকাটা কিংবা চিকিৎসা নিতে নরসিংদী থানা শহরে আসতেন। পরবর্তীতে নরসিংদী হয়ে ওঠে এসব থানার কেন্দ্রস্থল। এর ধারাবাহিকতায় থানা শহরটি প্রথমে মহকুমা, পরে জেলা শহরে পরিণত হয়। নৌকাঘাটা শিবপুর থানাধীন লালমাটির সভ্যতা ঘেরা একটি গ্রামের নাম। সেই গ্রামের সূত্রধর পরিবারে ১৯২৫ সালে জন্মগ্রহণ করেন ঈশ্বর বাবু। তাঁর বাবার নাম শ্যামাচরণ সূত্রধর। বাল্যকাল সে-গ্রামেই কাটে। বাবা কাঠের কাজ (আসবাবপত্র, গৃহনির্মাণ ও নৌকা বানানো) করে জীবিকা  নির্বাহ করতেন। কিন্তু ছেলেকে তিনি সূত্রধর বা মিস্ত্রি বানাতে চাননি। এভাবে এইচএসসি পাশ করার পর আর উচ্চশিক্ষা নেয়া সম্ভব হয়নি আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে। পরিবারের আর্থিক অবস্থার কথা চিন্তা করে গ্রামের স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করেন। কিন্তু তখন তাঁর মাথায় কাজ করছিলো অন্য এক চিন্তা। মওলানা ভাসানী, মাওলানা আকরম খাঁ, তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া, সন্তোষ গুপ্ত প্রমুখের বর্ণাঢ্য সাংবাদিকতা জীবনে আকৃষ্ট হন ঈশ্বর বাবু। বিশেষ করে, মানিক মিয়ার আপোষহীন ও সাহসী সাংবাদিকতা তাঁর মনে গেঁথে যায়। তাই তিনি মাস্টারি ছেড়ে দিয়ে সাংবাদিকতা পেশা গ্রহণে মনোনিবেশ করেন। কিন্তু গ্রামে থেকে এ-ধরনের সাংবাদিকতা করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। তাই জীবনের ঝুঁকি নিয়েই নরসিংদী চলে আসেন। এখানে নেই তাঁর আশ্রয়, নেই কোনো আত্মীয়-স্বজন। অনেকটা ভবঘুরে জীবন বেছে নেন। পেটে ভাত না থাকলেও চোখে-মুখে সাংবাদিক হওয়ার দীপ্ত আলোর রশ্নি ভাসতে থাকে। সফলও হন। তখন ‘দৈনিক ইত্তেফাক’ দেশের সবচে’ জনপ্রিয় পত্রিকা এবং সেটির ভূমিকা ছিলো দুঃসাহসিক। এর সঙ্গেই যুক্ত হলেন ঈশ্বর বাবু। নরসিংদীর সংবাদদাতা হিসেবে সাংবাদিকতা শুরু করেন। এভাবে ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত  ইত্তেফাকের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। কিন্তু ঠুনকো একটি ঘটনায় ইত্তেফাকের সঙ্গে তাঁর মনোমালিন্য দেখা দেয়। ছেড়ে দেন প্রিয় ইত্তেফাক। এরপর সংযোগ ঘটে সরকারি সংবাদ সংস্থা ‘বাসস’-এর সঙ্গে। ১৯৮৩ সালের ১৬ অক্টোবর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বাসসের সঙ্গে ছিলেন তিনি।

বর্ণাঢ্য সাংবাদিকতা জীবনে মহকুমা প্রশাসক, মন্ত্রী, সচিব কিংবা ডিসি-এসপিদের সান্নিধ্যে জীবন কাটালেও ব্যক্তিগত জীবন ছিলো অত্যন্ত সাদামাটা এবং দারিদ্র্যে নিমজ্জিত। এরপরও পকেটে দু-চারশো টাকা থাকলে রাজা হয়ে যেতেন। আশেপাশের মানুষজন কিংবা বন্ধু-বান্ধবদের যত্ন করে খাওয়াতেন। পকেট খালি থাকলেও চুপ করে বসে থাকতেন। না খেয়ে থাকলেও কিছু বলতেন না। তখন একমুঠো মুড়ি কিংবা চিড়া খেয়ে জীবনধারণ করতেন।

ঈশ্বর বাবুর ঘনিষ্ঠ শিষ্য নিবারণ রায় জানান, অত্যন্ত সাদাসিধে জীবনযাপন করতেন ঈশ্বর বাবু। কোনো চাহিদা ছিলো না। টাকা থাকলে খেতেন, না থাকলে উপোস থাকতেন। বসবাস করতেন নরসিংদী শহরের পশ্চিম কান্দাপাড়াস্থ বিধুভূষণ দাসের এক ছাপড়াঘরে। ভাড়া ২০-২৫ টাকা মাত্র। চিরকুমার এ-মানুষটির ঘর-সংসার ছিলো না সত্যি, কিন্তু তিনি পুরো নরসিংদীবাসীকে নিজের সংসার মনে করতেন। অসহায়-গরীব মানুষকে নিজের সন্তানতুল্য মনে করতেন। কখনো তিনি সম্পদের পেছনে ছোটেননি। নিজের এক টুকরো জমি বরাদ্দের জন্যে ডিসি-এসপিকে অনুরোধ করেননি।

বর্ষীয়ান সাংবাদিক নিবারণ বাবু আরো জানান, “১৯৭৪ সালে তিনি ইত্তেফাক ছেড়ে দিলেও তিনি আমাকে সে-পত্রিকার সাংবাদিক হিসাবে নিয়োগ দিতে অনেক চেষ্টা করেন। সেখানকার কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরকে অনুরোধ করেন, আমাকে নরসিংদী প্রতিনিধি করার জন্য। তাঁর কাছ থেকে হাতে-কলমে সাংবাদিকতা শিখি। এমন সৎ সাংবাদিক আমি জীবনে দেখিনি। অনেক সময় উপোস থেকে আমাদের বাসায় যেতেন। কখনো মুখ ফুটে কিছু বলতেন না। আমার মা অনেক সময় তাঁকে জোর করে খাওয়াতেন। তিনি সাংবাদিকতার জন্য  জীবন বিলিয়ে গেছেন। কিন্তু নিজে কোনো কিছু প্রত্যাশা করেননি। দুঃখজনক বিষয় হলো, নরসিংদীর মানুষ তথা সাংবাদিক সমাজ এ-মহান ব্যক্তিটিকে ভুলে গেছে।”

নরসিংদী প্রেস ক্লাব সূত্রে জানা গেছে, উক্ত প্রেস ক্লাবের জন্ম ১৯৭২ সালে। স্বাধীনতার পরপর নরসিংদী ঢাকা জেলার একটি ছোটো থানা শহর। সাংবাদিকদের সংখ্যাও খুব বেশি নয়। হাতে গোনা কয়েকজন সাংবাদিককে নিয়ে ঈশ্বর চন্দ্র সূত্রধর গড়ে তোলেন নরসিংদী প্রেস ক্লাব। সবাই মিলে প্রধান সাংবাদিক হিসেবে তাঁকেই সভাপতি নির্বাচিত করেন। সাধারণ সম্পাদক হন বাবু নিবারণ রায়। এভাবে পথচলা শুরু হয় নরসিংদী প্রেস ক্লাবের। এরপর উক্ত প্রেস ক্লাবের সঙ্গে যুক্ত হন জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক এবং দূতাবাস কর্মকর্তা স্বপন কুমার সাহা, ‘নরসিংদীর খবর’-এর সম্পাদক হাবিবুল্লাহ বাহারের মতো বরেণ্য সাংবাদিকরা। তাছাড়া উক্ত প্রেস ক্লাবের সঙ্গে জড়িত অনেকেই পরবর্তী জীবনে জাতীয় এবং আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাতি পেয়েছিলেন। বর্তমানে নরসিংদী প্রেস ক্লাব সাংবাদিকদেরকে বটবৃক্ষের মতো ছায়া দিয়ে যাচ্ছে। নিজস্ব বহুতল ভবনে বসে সাংবাদিকেরা পেশাগত দায়িত্বের পাশাপাশি আড্ডা ও পরামর্শ করছেন। অথচ এর গোড়াপত্তন করে গেছেন ঈশ্বর চন্দ্র সূত্রধর।

ঈশ্বর বাবুর শেষ জীবনটা ছিলো সবচে’ মর্মান্তিক। অর্থকষ্টে সঠিক চিকিৎসা পর্যন্ত করতে পারনেনি। আত্মীয়-পরিজনবিহীন অবস্থায় ডায়বেটিসে আক্রান্ত হয়েছিলেন। কঠোর নিয়ম-নীতি আর ব্যয়বহুল ঔষধের অভাবে মধ্যবয়সেই ঝরে পড়েছিলেন তিনি। শরীরে আঘাতজনিত কারণে তিনি গ্যাংগ্রিনে আক্রান্ত হয়েছিলেন। ডায়বেটিস থাকায় সেটা সহজে সেরে ওঠছিলো না। একপর্যায়ে সে-আঘাত ভয়াবহ রূপ ধারণ করে অর্থের অভাবে। শিষ্য নিবারণ বাবু স্বউদ্যোগে গুরুকে ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভর্তি করেন। কিন্তু অবস্থাটা এমন পর্যায়ে চলে গিয়েছিলো যে, সেখান থেকে তাঁর অবস্থা ভালোর দিকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি। ১৯৮৩ সালের ১৬ অক্টোবর ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে মৃত্যুবরণ করেন। তখন তাঁর জন্যে চোখের পানি ফেলার মতো একজন সহকর্মী কিংবা আত্মীয়ও ছিলো না। সে-সময় লাশ গ্রহণ এবং সৎকারের লোক খুঁজে পাচ্ছিলো না মেডিক্যাল কর্তৃপক্ষ। অবশেষে নিবারণ বাবু এবং তাঁর কর্মস্থল বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা’র প্রচেষ্টায় একটি ট্রাকে করে প্রবীণ সাংবাদিক ঈশ্বর বাবুর লাশ নরসিংদীতে আনা হয়। এবার বিপত্তি বাধলো হিন্দু ধর্ম অনুসারে তাঁর মুখাগ্নি নিয়ে। ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী, একজন নিকটাত্মীয় কিংবা সন্তানকে এ-দায়িত্ব পালন করতে হয়। কিন্তু সেখানে এমন কেউ ছিলেন না। এগিয়ে এসে শিষ্য নিবারণ রায় গুরু ঈশ্বর বাবুকে মেঘনা নদীতীরবর্তী শ্মশানে নিয়ে সৎকার করলেন। মুখাগ্নি করলেন নিজ হাতে। এভাবে একজন সাংবাদিকের ট্র্যাজেডিপূর্ণ ইতিহাসের জন্ম হলো নরসিংদীতে।

তিনি যখন মারা যান, তখন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ থেকে তাঁর লাশ গ্রহণের জন্যে কোনো আত্মীয়-স্বজন পাওয়া যায়নি। শিষ্যদের প্রচেষ্টায় তাঁর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছিলো। এরপর হঠাৎ করে এই অকৃতদার মানুষটির আত্মীয়-স্বজনের আবির্ভাব ঘটে। মূলত তারা ঈশ্বর বাবুর ব্যাংক-ব্যালেন্সের খোঁজ করতে এসেছিলেন।

এই ত্যাগী ও বড়ো সাংবাদিককে নিয়ে ছোটো একটি স্মৃতি রয়েছে আমার। আমি তখন জন্মস্থান দিলারপুরের ছঘরিয়া পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করি, তৃতীয় শ্রেণিতে। সে-সময় এক প্রচণ্ড ঝড়ে স্কুলগৃহটি উড়ে যায়। ফলে খোলামাঠে ক্লাশ করতে হতো আমাদের। এর মধ্যে একদিন হেডমাস্টার স্যার ছাত্র-ছাত্রীদেরকে বললেন, আগামীকাল সবাই ভালো কাপড়-চোপড় পরে আসবে। আমরা ধরে নিই, আগামীকাল হয়তো স্কুল পরিদর্শক আসবেন। কিন্তু পরদিন দেখা গেলো, একজন সাংবাদিক কাঁধে ক্যামেরা ঝুলিয়ে হাজির হলেন। খোলা মাঠে ক্লাশ নেয়ার দৃশ্য ধারণ করে সাংবাদিক সাহেব চলে গেলেন। পরদিন দেখলাম, ইত্তেফাক পত্রিকায় সেই ছবিসহ একটি সংবাদ ছাপা হয়েছে। সংবাদের শুরুতে ঈশ্বর চন্দ্র সূত্রধর নামটি রয়েছে। হেডস্যার পত্রিকা বগলদাবা করে স্কুলে হাজির। এর কিছুদিন পর জানতে পারলাম, সংবাদটি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দৃষ্টিগোচর হয়েছে। কয়েকদিনের মধ্যেই স্কুলগৃহের নির্মাণকাজ শুরু হয়ে যায়। কাঁচা ঘর পাকা ভবনে রূপ নেয়। ঘটনাটি আমার মনে বেশ দাগ কাটে। তাৎক্ষণিকভাবে সাংবাদিক ঈশ্বর বাবুকে আমার কাছে সংবাদের জাদুকর মনে হয়েছিলো। একটিমাত্র সংবাদে উড়ে যাওয়া স্কুলগৃহ পাকা দালানে পরিণত হয়েছে। তাঁর এই কীর্তিতে আমার মনে একটি প্রশ্ন উঠেছিলো, সাংবাদিকেরা আসলে কি মানুষ, না অন্য গ্রহের জীব? ঈশ্বর বাবুর এই জাদুকরী কাণ্ডের প্রভাব পরবর্তীতে আমার পেশাগত জীবনের উপর পড়ে। সাংবাদিক হওয়ার সুপ্ত বাসনা মনে অঙ্কুরিত হতে থাকে। ভিন্ন এক নায়কের আসন লাভ করেন ঈশ্বর বাবু।

এ-নায়কের আর্থিক অবস্থা জানতে পারি আরো অনেক পরে। আমি তখন একটি জাতীয় দৈনিকের স্টাফ রিপোর্টার হিসেবে কর্মরত। ছুটিতে বাড়িতে গিয়ে নরসিংদী প্রেস ক্লাবে আড্ডাচ্ছলে ঈশ্বর বাবু সম্পর্কে খোঁজ-খবর করি। ইত্তেফাকের সাংবাদিক নিবারণ বাবু ছাড়া অন্যান্য সাংবাদিকেরা তাঁর সম্পর্কে তেমন কোনো তথ্য জানেন না। তাঁর ঘনিষ্ঠ অনেক সাংবাদিক মৃত্যুবরণ করেছেন। অনেকে বয়োবৃদ্ধ অবস্থায় আছেন। তাই তাঁর সাংবাদিকতা জীবনের বিস্তারিত উপাত্ত জানা সম্ভব হয়নি। টুকরো টুকরো স্মৃতি হাতড়াতে গিয়ে ঈশ্বর বাবুর মর্মান্তিক এক কাহিনি জানা গেলো। তিনি যখন মারা যান, তখন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ থেকে তাঁর লাশ গ্রহণের জন্যে কোনো আত্মীয়-স্বজন পাওয়া যায়নি। শিষ্যদের প্রচেষ্টায় তাঁর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছিলো। এরপর হঠাৎ করে এই অকৃতদার মানুষটির আত্মীয়-স্বজনের আবির্ভাব ঘটে। মূলত তারা ঈশ্বর বাবুর ব্যাংক-ব্যালেন্সের খোঁজ করতে এসেছিলেন। নরসিংদীতে কোনো সহায়-সম্পত্তি কেনা আছে কি না, তা-ও জানতে চেষ্টা করেন। কিন্তু অনেক অনুসন্ধান করেও নগদ অর্থ কিংবা জমি-জমার কোনো হদিস করতে পারেননি। সোনালী ব্যাংকে একটি একাউন্টের সন্ধান পেলেও সেখানে কানাকড়িও সঞ্চিত ছিলো না। বাড়ি-ঘরের খোঁজ করে জানতে পারেন, তিনি বড়ো সাংবাদিক হয়েও ছোটো একটি ভাড়া করা খুঁপড়ি ঘরে থেকেছেন। ঈশ্বর বাবুর টাকা-পয়সা আর সম্পত্তির অনুসন্ধান করতে এসে তাঁর আত্মীয়-স্বজনদের বরং কিছু গাঁটের পয়সা খরচ হলো।

নরসিংদী প্রেস ক্লাব, বিভিন্ন সামাজিক সংস্থা ও জেলা প্রশাসকের দপ্তরে খোঁজ করে প্রয়াত সাংবাদিক ঈশ্বর বাবুর কোনো স্মৃতিচিহ্ন পাওয়া যায়নি। এমনকি তাঁর প্রতিষ্ঠিত নরসিংদী প্রেস ক্লাবেও কোনো স্মৃতি সংরক্ষিত নেই। প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসেবে প্রেস ক্লাবে ছবি টাঙানোর রেওয়াজ থাকলেও সেটা বাস্তবায়িত হয়নি। ক্লাবের একাধিক সদস্য জানান, ঈশ্বর বাবুর ছবি রাখতে কারো আপত্তি নেই। কিন্তু তাঁর ছবি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তবে তাঁর এবং প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক নিবারণ রায়— দুজনের ছবিই প্রেস ক্লাবে সংরক্ষণ করার পরিকল্পনা রয়েছে।

প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি মাখন দাস বলেন, “ঈশ্বর বাবু আমাদের অনুকরণীয় ছিলেন। তিনি নিঃস্বার্থভাবে লোভ-লালসার ঊর্ধ্বে থেকে সাংবাদিকতা করে গেছেন। মৃত্যুর সময় তাঁর নিজের এক টুকরো জমিও ছিলো না। ব্যাংকে এক পয়সাও খুঁজে পাওয়া যায়নি। তাই এই মহৎ সাংবাদিকের স্মৃতি রক্ষার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। সভায় আলোচনা হয়েছে। অচিরেই ক্লাবের পক্ষ থেকে একটি স্মরণিকা প্রকাশ করা হবে। সেখানে প্রয়াত সব সাংবাদিকদের ছবিসহ জীবনী অন্তর্ভুক্ত থাকবে।”

নরসিংদীর ইতিহাস এবং নরসিংদীর গুণীজন সম্পর্কিত বেশ কিছু বই-পুস্তক প্রকাশিত হয়েছে। সেখানেও ঈশ্বর বাবু বেশ অবহেলিত। কোনো কোনো গ্রন্থে তাঁর নাম পর্যন্ত উল্লেখ করা হয়নি। কোনো বইয়ের পাতায় বেশ দীনতার সঙ্গে তাঁর সম্পর্কে দু-চার লাইন ব্যয় করা হয়েছে। এর মধ্যে শফিকুল আসগরের ‘নরসিংদীর ইতিহাস’ গ্রন্থে সাড়ে পাঁচ লাইনের বিবরণ দেয়া হলেও এতে কিছু তথ্যবিভ্রাট রয়েছে। তিনি ১৯৮৩ সালে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে মৃত্যুবরণ করলেও সে-বইয়ে তাঁর মৃত্যুর সাল ১৯৮৫ সাল উল্লেখ করা হয়। মৃত্যুস্থান নরসিংদী শহর বলা হয়। তবে সরকার আবুল কালামের লেখা ‘নরসিংদীর গুণীজন’ বইয়ে ঈশ্বর চন্দ্র সূত্রধরের একটি স্কেচ দেয়া হয়েছে। জানতে পারি, কোনো-এক পত্রিকায় ছাপা হওয়া ঈশ্বর বাবুর অস্পষ্ট একটি ছবি থেকে স্কেচটি করানো হয়েছিলো। বইটিতে ঈশ্বর বাবুকে যথার্থ চারণ সাংবাদিক হিসেবে উল্লেখ করে বলা হয়েছে, “নরসিংদী যখন থানা, সাংবাদিক শব্দটিও বোধহয় সে সময় সাধারণ মানুষের কাছে পরিচিত ছিলো না, সে সময় তিনি সাদা হাফশার্ট আর লুঙ্গি পরে ঘুরে বেড়াতেন সংবাদের নেশায়। …চিরকুমার এ-চারণ সাংবাদিক দীর্ঘরোগ ভোগ করে চরম অবহেলা আর অবজ্ঞায় জীবনের শেষ সময় অতিবাহিত করেন।”

নরসিংদীর সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও প্রবীণ শিক্ষাবিদ অধ্যাপক গোলাম মোস্তাফা মিয়া ঈশ্বর চন্দ্র সূত্রধর সম্পর্কে বলেন, “একজন খাঁটি চারণ সাংবাদিক বলতে যা বোঝায়, সেটা ছিলেন ঈশ্বর বাবু। তিনি হয়তো মোনাজাত উদ্দিনের মতো এতো ব্যাপকতা এবং জনপ্রিয়তা অর্জন করতে পারেননি, কিন্তু নরসিংদী জেলার প্রতিটি অঞ্চলে তিনি বিচরণ করেছিলেন। সংবাদপত্রের পাতায় সমস্যা, দুর্নীতি, অনিয়ম ও দেশের কথা তুলে ধরেছিলেন। তাই এক অর্থে তাঁকে নরসিংদীর মোনজাত উদ্দিন বলা যায়।”

এই মানুষটি সারাজীবন নিঃস্বার্থভাবে সাংবাদিকতা করে গেছেন। সাংবাদিকতা যে একটি উপাসনাতুল্য কর্মকাণ্ড, সেটা ঈশ্বর চন্দ্র সূত্রধরের জীবন থেকে শিক্ষা নেওয়া যায়।


আপেল মাহমুদ
সাংবাদিক, গবেষক ও দুষ্প্রাপ্য গ্রন্থ সংগ্রাহক

শিবপুরের বিভিন্ন স্থান-নামের উৎস সন্ধান | পর্ব ৪

বাড়ৈআলগী
সেই আমলে এলাকায় জায়গা জমির জরিপ চলছিলো। কিন্তু সঠিক তথ্য না পাওয়ায় জমি রেকর্ডভুক্ত করতে সমস্যা হচ্ছিলো। এলাকার মুরুব্বিরা সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। অনেক মুরুব্বি অতীতের বর্ণনা দিতে পারতেন। তাদের মধ্যে ‘বাড়ৈ’ নামে একজন ব্যক্তি ছিলেন। আবার আলগা থেকে হয়েছে ‘আলগী’। মুরুব্বি বাড়ৈ সাহেবের নামের সাথে ‘আলগী’ যোগ হয়ে হয়েছে ‘বাড়ৈআলগী’। অর্থাৎ তাদের এলাকাটি অন্যান্য এলাকা থেকে দূরবর্তী স্থানে স্বতন্ত্র বা আলগা ছিলো বলেই গ্রামের নাম বাড়ৈআলগী। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার পর এখানে ‘বাড়ৈআলগী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়’টি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। একসময় স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মরহুম আবদুল মান্নান বিদ্যালয়ের উন্নয়নে সচেষ্ট ছিলেন।

তেলিয়া
এই এলাকায় ব্যাপক হারে হিন্দু লোকের বসবাস ছিলো। কারো একজন হিন্দু ভদ্রলোকের নাম ছিলো তৈলচন্দ্র ওরফে তেলাচন্দ্র। আর এই নাম হতেই হয়েছে তেলিয়া। এছাড়া একসময় এলাকাটিতে প্রচুর তৈলবীজ উৎপাদন হতো। ওই বীজ থেকে উৎপাদিত তেলে নিজেদের চাহিদা মিটিয়ে অন্যান্য এলাকায়ও সরবরাহ করা যেতো। সবচেয়ে উল্লেখ্য যে, এ-গ্রামে অনেক বড়ো একটি বটগাছ ছিলো। বটবৃক্ষটি দীর্ঘ বছর ধরে এলাকাসহ পথিকের দৃষ্টি আকর্ষণ করতো। ইতিহাসের সাক্ষী গাছটি এখন আর আগের মতো না থাকলেও এর ধ্বংসাবশেষ পথযাত্রীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ওই বটগাছের কারণে স্বর্গগত তৈলচন্দ্রের তেলিয়া গ্রাম শিবপুর ও নরসিংদীতে ব্যাপক পরিচিতি এনে দিয়েছে।

ঝাউয়াকান্দী
গ্রামের নাম সম্পর্কে সুস্পষ্ট তথ্য পাওয়া না গেলেও এলাকাবাসী মনে করে, একসময় এখানে অনেক অনেক ঝাউ গাছ জন্মাতো। ঝাউ গাছ একপ্রকার সূচাগ্র ও রমণীয় সুন্দর বৃক্ষ বিশেষ। গাছের শাখা-প্রশাখা দেখতে খুবই সুন্দর। সারিবদ্ধ ঝাউগাছ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে। আর এ-সমস্ত ঝাউগাছের কারণেই গ্রামের নাম ঝাউয়াকান্দী হয়েছে। এ গ্রামে প্রথম প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো ঝাউয়াকান্দী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি। ১৯২৩ সালে মোলভী সুবেদ আলী পণ্ডিত ও মরহুম খিদির বক্স এই বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। সুবেদ আলী সাহেব নিজেই জমি দিয়েছিলেন। দক্ষিণমুখী বিদ্যালয়ের বর্তমান অবকাঠামোগত অবস্থা আগের চেয়ে ভালো। প্রাক্তন ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে মনোহরদীর গোতাশিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জনাব ওসমান গণি মাস্টার, জনাব নাসির উদ্দীন মোল্লা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব। দুইটি গ্রামের নামে সমৃদ্ধ তেলিয়া ঝাউয়াকান্দী উচ্চ বিদ্যালয় ইতোমধ্যে এলাকার শিক্ষায় বিশেষ অবদান রেখে চলেছে।


লেখক : সাবেক উপজেলা শিক্ষা অফিসার

শিবপুরের বিভিন্ন স্থান-নামের উৎস সন্ধান | পর্ব ৩

ভরতেরকান্দী
যতোটুকু জানা যায়, বর্তমান ভরতেরকান্দী এলাকায় একসময় ভরত নামে একজন হিন্দু ছিলেন। তিনি পেশায় কুমোর ছিলেন। হাড়ি-পাতিল তৈরির কুমোর শুধু নয়, দেখতেও নাকি ছিলেন রাজকুমারের মতো। অতিশয় সুন্দর ভরত বাবু আচার-আচরণে এলাকার সকলের প্রিয়ভাজন ছিলেন। এলাকায় যথেষ্ঠ প্রভাব-প্রতিপত্তি ছিলো তার। গুণমুগ্ধতার কারণে একটি সময়ে এসে এলাকা তথা গ্রামের নাম রাখার প্রয়োজনে সবাই মিলে ভরত বাবুর নাম অনুসারে গ্রামের নাম রাখেন ভরতকান্দী। ওই ভরতকান্দী পরবর্তীতে হয়ে যায় ভরতেরকান্দী। ভরতেরকান্দীতে একটি বাজার আছে। নাম পেত্নির বাজার। আগের দিনে রাতের বেলায়, বিশেষ করে গভীর অন্ধকার রাতে এ-বাজারে অদ্ভুত সব কাণ্ড ঘটতো, যা ভূত-পেত্নিরা ঘটাতো মনে করে বাজারের নাম রাখা হয়েছিলো পেত্নির বাজার। গ্রামের ভরতেরকান্দী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ১৯৩৯ সালে। বিদ্যোৎসাহী ব্যক্তিত্ব মরহুম আবদুর রাজ্জাক মোল্লা সাহেবের দানকৃত জমির উপর। বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় বিশেষ ভূমিকা নিয়েছিলেন মরহুম হাফিজ উদ্দিন সরকার, মো. তমিজ উদ্দিন প্রধান, আবদুল ওয়াহাব মোল্লা, দানিছ মোল্লা এবং জমিদাতা আবদুর রাজ্জাক মোল্লা। বিদ্যালয়ের কীর্তিমান ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. একেএম রাশিদুল আলম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

কুমরাদী
এই গ্রাম নিয়ে আধ্যাত্মিক ও মজার ঘটনা রয়েছে। একসময় গ্রামটিতে একজন অসুস্থ মহিলা ছিলেন। তার নাম ছিলো ‘রাদী’। তার অসুস্থতা এমন মারাত্মক পর্যায়ে গিয়েছিলো যে, কোনোপ্রকার চিকিৎসায় আরোগ্য লাভ হচ্ছিলো না। অনেক কিছুর পর একজন আধ্যাত্মিক ব্যক্তির চিকিৎসায় মহিলা সুস্থ হয়ে ওঠেন। জানা যায়, রাদীকে চিকিৎসা দেয়ার পর বুজুর্গ ব্যক্তিটি উচ্চস্বরে বলেছিলেন, “কুমরাদী বা উঠো রাদী।” ‘কুমরা’ শব্দের একটি অর্থ গড়াগড়ি খাওয়া। অসুস্থ সেই মহিলা দীর্ঘদিন ধরে বিছানায় গড়াগড়ি করছিলেন। বুজুর্গ হুজুর বলেছিলেন, কুমরাদী বা গড়াগড়ি থেকে উঠো। হুজুরের সেদিনের সেই কথার পর আর তাকে গড়াগড়ি করতে হয়নি এবং সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠেন। সেই ‘কুমরাদী’ বলা থেকেই পরবর্তীতে গ্রামের নাম হয়ে যায় কুমরাদী। অন্য একটি সূত্র থেকে জানা যায়, কুম্ভরাণী নামে সে-এলাকায় একজন জমিদার ছিলেন এবং তার নাম থেকেই প্রথমে কুম্ভরাণী ও পরে কুমরাদী নামটি এসেছে। এলাকায় আরো জনশ্রুতি আছে যে, এখানে একসময় গভীর জঙ্গল ছিলো। ওই গহীন জঙ্গলে শাহ মনসুর আলী (র.) নামে একজন দরবেশ বসবাস করতেন। তখনকার সময়ে অতি দ্রুত দরবেশের নাম ও সুনাম চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়েছিলো। নামধাম শুনে বর্তমান কুমিল্লার স্থানীয় এক নিঃসন্তান রাজা তার রাণীসমেত সন্তান লাভের আশায় আমাদের নরসিংদীর কুমরাদীতে দরবেশের আস্তানায় হাজির হন। দরবেশের সাথে সাক্ষাত করে তার মাধ্যমে আল্লাহর নিকট সন্তান লাভের প্রার্থনা করেন। দরবেশ সন্তান লাভের জন্যে ঔষধ-পথ্যাদি দিয়েছিলেন বটে, কিন্তু সাথে কিছু শর্ত যুক্ত করে দেন। শর্তে বলা হয়েছিল যে, যদি তারা কন্যা সন্তান লাভ করে, তবে সেই কন্যাকে দরবেশের সাথে বিয়ে দিতে হবে। দিগ্বিদিক চিন্তা না করে রাজা-রাণী দরবেশের শর্তে রাজি হয়ে যান। দরবেশ আল্লাহর নিকট তাদের সন্তান লাভের প্রার্থনা করলে মহান রাব্বুল আলামিন তাতে সাড়া দেন। তাদের ঘরে আলো ঝলমলে ফুটফুটে এক কন্যা সন্তান জন্ম নেয়। সেই কন্যা শাহজাদীর নাম রাখা হয় রাদী। শাহজাদী ধীরে ধীরে বড়ো হতে থাকেন। একসময় রাজ্যের ভবিষ্যত শাহজাদী বিবাহযোগ্যা হন। অন্যদিকে মেয়ের বিয়ের শর্তের কথা রাজার মনে থাকলেও রাণী তা বেমালুম ভুলে যান। তাকে বিষয়টি অবগত করানো হলে তিনি আগের শর্ত মানতে রাজি হননি। তড়িঘড়ি করে অন্য কোনো রাজ্যের রাজপুত্রের সাথে রাণী শাহজাদীর সম্বন্ধ ঠিক করে ফেলেন। রাজ্যময় বিয়ের সানাই বেজে ওঠে। জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন চলে। সমস্ত প্রজাদের খাওয়ানোর ব্যবস্থা হয়। কিন্তু এর মাঝে হঠাৎ শাহজাদী মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়েন। অনেক কান্নাকাটি, বড়ো বড়ো বৈদ্য দিয়ে চিকিৎসা করানো হলেও শাহজাদী সুস্থ হননি। শর্ত ভঙ্গের কারণে রাজা খুবই বিচলিত হয়ে পড়েন। অনন্যোপায় হয়ে রাজা পূর্বের প্রতিশ্রুতি অনুসারে মেয়েকে নিয়ে কুমরাদীতে দরবেশের আস্তানায় চলে আসতে বাধ্য হন। কিন্তু দুঃখজনক যে, দরবেশ তখন আস্তানার বাইরে ছিলেন। কোনো উপায় করতে না পেরে রাজা মেয়েকে আস্তানায় রেখে চলে যান। তার অনেক পরে দরবেশ ফিরে এসে এহেন অবস্থা দেখে সহজেই ঘটনা বুঝে ফেলেন। তিনি মেয়েটিকে পা দিয়ে ধাক্কা দিয়ে বলে ওঠেন, “কুম, কুম”, যার অর্থ রাদী উঠো। সহসা শাহজাদী জ্ঞান ফিরে পান। এ-ঘটনা পুরো এলাকায় জানাজানি হয়ে যায়। এভাবে গ্রামের নাম হয় কুমরাদী। অনেকের মতে, কুমরাদীতে বর্তমানে যেই ভগ্নদশার দরগাহ রয়েছে, তা সেই আধ্যাত্মিক দরবেশেরই। এখনো প্রতিদিন অনেক মানুষ তা দেখতে আসেন। দরগাহ বা মাজার সংলগ্ন একটি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে পরবর্তীতে, সাথে এতিমখানা। কুমরাদী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯২১ সালে, ব্রিটিশ আমলে। মাওলানা আবদুল আজিজ এর প্রতিষ্ঠাতা। তাঁকে সহযোগিতা করেছিলেন পুটিয়া ইউনিয়নের এককালের প্রখ্যাত চেয়ারম্যান আবদুর জব্বার মাস্টার, যিনি আততায়ীর হাতে নিহত হন। বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় আরো সহযোগিতা করেছেন মরহুম আলাউদ্দিন শিকদার, মো. শামসু ভূঁইয়া ও মো. আবুল হাশেম। প্রায় ১০৪ বছর পূর্বে প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়টি বিভিন্ন উত্থান-পতনের মধ্যেও স্বমহিমায় মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। অনেক ছাত্র-ছাত্রী এ-বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে জীবনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন মাওলানা আবদুল আজিজ সাহেবের পুত্র ব্যারিস্টার আবু তাহের আবদুল্লাহ। এই গ্রামেই রয়েছে দেশ বিখ্যাত ও একসময়ের আন্তর্জাতিক মানের কুমরাদী দারুল উলুম মাদরাসা।

কুমরাদী গ্রাম ও শিবপুরে মাদরাসা শিক্ষার কথা
মাদরাসা শিক্ষা সর্বপ্রথম চালু হয়েছিলো মহানবী হযরত মোহাম্মদ (সা.)-এর মাদরাসা স্থাপনের মাধ্যমে। তিনি মদিনায় হিজরতের পর মসজিদে নববীর পাশে ‘সুফফা আবাসিক’ ও ‘দারুল কুববাহ’ নামে দুইটি মাদরাসা স্থাপন করেছিলেন বলে ইতিহাস রয়েছে। এছাড়াও তিনি মসজিদভিত্তিক মাদরাসা চালু করেছিলেন। খলিফাগণের মধ্যে হযরত ওমর (রা.) সিরিয়ায় এবং হযরত আলী (রা.) বুশরা ও কুফায় মাদরাসা শিক্ষা চালু করেছিলেন। উমাইয়া ও আব্বাসীয় আমলেও মাদরাসা শিক্ষা বিস্তৃত হয়েছিলো। কোথাও কোথাও মাদরাসাভিত্তিক বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষাও চালু হয়েছিলো।

বাংলাদেশে মাদরাসা শিক্ষা প্রথম আরম্ভ হয়েছিলো সুলতানি আমলে। ১২৭৮ সালে সোনারগাঁয়ে একটি মাদরাসা স্থাপিত হয়, যেটি বাংলাদেশের প্রাচীনতম মাদরাসাগুলোর মধ্যে অন্যতম। ১৭৮০ সালে কলকাতায় আলিয়া মাদরাসা স্থাপিত হয়। ১৮৯৯ সালে চট্টগ্রামে ‘দারুল উলুম মঈনুল ইসলাম মাদরাসা হওয়ার পর এদেশে কওমী মাদরাসার প্রচলন শুরু হয়। তারও আগে ঢাকায় হাজী মহসিন ট্রাস্টের উদ্যোগে একটি মাদরাসা প্রতিষ্ঠিত হয়। মাদরাসা প্রতিষ্ঠা ও চালুর এমন ধারাবাহিকতায় নরসিংদীর শিবপুরে ‘কুমরাদী দারুল উলুম মাদরাসা’ প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯২৭ খ্রিস্টাব্দে। এই মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা আবদুল আজিজ। এই মাদরাসা হতে বহু ছাত্রছাত্রী পড়াশোনা করে জগতখ্যাতি অর্জন করেছেন। আজিজ সাহেব মাদরাসার পাশাপাশি স্বতন্ত্র এতিমখানাও তৈরি করেছিলেন। বহু এতিম এখানে বিনামূল্যে থাকা-খাওয়ার সুযোগ পেয়ে লেখাপড়া করে তাদের জীবনের পথ খুঁজে নিতে পেরেছে। এখানে এতিম মেয়েদের পড়াশোনার পর তারা বয়োপ্রাপ্ত হলে এতিমখানার তত্ত্বাবধানে উপযুক্ত পাত্রের কাছে তাদের বিবাহের ব্যবস্থা করে দেয়া হতো। শুধু তা-ই নয়, নবদম্পতির ভবিষত উন্নয়নের জন্যে আর্থিক সহযোগিতারও ব্যবস্থা করে দেয়া হতো।


লেখক : সাবেক উপজেলা শিক্ষা অফিসার

শিবপুরের বিভিন্ন স্থান-নামের উৎস সন্ধান | পর্ব ২

পুটিয়া
শিবপুরের গ্রাম ও গ্রামীণ সভ্যতার আলোচনায় এবার চলে এসেছি পুটিয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রাম ও ইতিহাস-ঐতিহ্য বিষয়ে। এ-ইউনিয়নে বহু গ্রাম রয়েছে এবং পুটিয়া গ্রামের নামেই পুটিয়া ইউনিয়ন হয়েছে। পুটিয়া নামটি কোথা থেকে বা কীভাবে এলো জানতে ইউনিয়নের প্রাক্তন একজন চেয়ারম্যানের সাথে আলোচনা হয়। শ্রদ্ধেয় চেয়ারম্যান এবং এলাকার অন্যান্যদের থেকে জানা যায়, দোর্দণ্ড প্রতাপশালী ব্রিটিশ শাসনামল ছিলো তখন। বেনিয়া ব্রিটিশদের নানাবিধ অত্যাচার-নির্যাতনে এলাকার মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে ওঠেছিলো। এলাকায় যারা ইংরেজদের প্রতিনিধিত্ব করতো, তারা মানুষকে মানুষই মনে করতো না। অসহনীয় নির্যাতনের মধ্যে থেকে ইংরেজদের কথামতো চলতে হতো। তাদের বাধ্যগত না থাকলে সাধারণ মানুষের উপর স্টিম রোলার চলতো প্রতিনিয়ত। এমনিভাবে অত্যাচারিত হতে হতে আর মার খেতে খেতে এলাকার কয়েকজন বুদ্ধিমান ব্যক্তি ফন্দি করলেন, মরলে মরবো, সাধারণ মানুষের উপর যে-ইংরেজ কর্তা এমন অত্যাচার করছে, তাকে কৌশলে পেটাতে হবে। একদিন সাদরে সেই ইংরেজ কর্তাকে দাওয়াত দিয়ে এনে এমন পিটুনি দিলো যে, সেই নরাধম ইংরেজ এলাকা ছেড়ে পালাতে বাধ্য হলো এবং আর কোনোদিন এলাকায় ফিরে আসেনি। তারপর যে-ই আসতো, একই কৌশলে পিটুনি দেয়া হতো। পিটুনির ধরন দেখে ইংরেজদের অনেকে ভয় পেয়ে আর এই এলাকায় আসতো না। এলাকা হয়ে যায় ইংরেজ-শূন্য। মানুষজন ইংরেজ তাড়ানোর সেই পিটুনির কৌশল দেখে খুব আনন্দ পেয়েছিলো। লোকজন একসাথে বসে হাসাহাসি করতো। ধীরে ধীরে পিটুনি বা কঠিন মার দেয়ার জায়গাকে ‘পিটাইয়া’ বলতে আরম্ভ করলো। ‘পিটাইয়া’ বলতে বলতে কিছুটা পরিবর্তিত হয়ে এখনকার বিখ্যাত ‘পুটিয়া’, যে-পুটিয়া সারা বাংলাদেশের মানুষের নিকট এক নামে পরিচিত। নরসিংদী সদর সংলগ্ন এই ইউনিয়নের দক্ষিণ প্রান্তের মানুষজনের নিত্যদিনের চলাফেরা নরসিংদী শহরের সাথে। এ-ইউনিয়নের বুক চিরে চলে গেছে ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক। পুটিয়া বাংলাদেশের অনত্যম বৃহৎ গরুর হাট। প্রতি শনিবার হাটের বিশালতা দেখে স্তম্ভিত হতে হয়। দেশের দূর-দূরান্তের মানুষ এই হাটে আসেন পছন্দমতো গরু ক্রয় করতে।
পুটিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় : গ্রামটিতে সর্বাগ্রে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো ঐতিহ্যবাহী পুটিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। প্রতিষ্ঠার সাল ১৯২০। তারও আগে এই জায়গায় টোল ও মক্তব ছিলো। পৃথিবী ছিলো প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ডামাডোলে। তারপরও ১৯১৯ সালে শিক্ষা সংস্কারের আওতায় পৌর এলাকা ও গ্রামাঞ্চলের বিশেষ বিশেষ জায়গায় ইউনিয়ন কেন্দ্রিক প্রাথমিক শিক্ষাকে অবৈতনিক করার সামান্য চিন্তা থেকে বর্তমানের পুটিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো। এলাকার অনেক ছাত্র-ছাত্রী এখানে পড়াশোনা করে জীবনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। পরবর্তীতে পুটিয়া উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়ে মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষা অনেক এগিয়েছে। মাদরাসা শিক্ষায়ও পুটিয়া অনেক এগিয়ে।

সৈয়দনগর
নাম থেকেই বোঝা যায়, এলাকায় সৈয়দ বংশের লোকজনের বসবাস ছিলো। সেই ‘সৈয়দ’ উপাধি থেকেই গ্রামের নামকরণ হয়েছে। তারও আগে এই গ্রামকে ‘সৈকারচর’ বলে মানুষ চিনতো। সম্ভবত গ্রামে সৈয়দদের বসবাস শুরু হলে তাদের উপাধি থেকে ‘সৈয়দনগর’ নামটি এসেছে। গ্রামটি খুবই পরিচিত এবং ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের পাশে অবস্থিত হওয়ায় ব্যাপক পরিচিত। গ্রামের মানুষ শিক্ষা-সংস্কৃতিতে বেশ অগ্রসর। সৈয়দনগরে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, উচ্চ বিদ্যালয়সহ বেশ কয়েকটি মাদরাসা রয়েছে।
সৈয়দনগর দড়িপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় : ১৯৭৯ সালে প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়টি প্রথমদিকে নৈশ বিদ্যালয় ছিলো। বিদ্যালয়ের জন্যে জমি দিয়েছেন মরহুম সাফিজ উদ্দিন, ডা. আ. ওহাব, মো. সামসুদ্দিন ও মো. আ. মান্নান মোল্লা। উল্লেখিত ব্যক্তিবর্গ ছাড়াও প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে স্মরণীয় হয়ে আছেন মো. জামাল উদ্দিন, মো. ফজলুর রহমান, তমিজ উদ্দিন মাস্টার, মফিজ উদ্দিন ও রমিজ উদ্দিন। উল্লেখযোগ্য শিক্ষকগণের মধ্যে ছিলেন জনাব মো. জামাল উদ্দিন, জনাব মো. ফজলুর রহমান, জনাব আবু সাঈদ এবং জনাব আ. হান্নান মোল্লা। তাঁদের হাতে এলাকার বহু ছেলেমেয়ে লেখাপড়া করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

মুন্সেফেরচর
এলাকাটিতে একসময় খুবই খরস্রোতা নদী ছিলো। ইংরেজদের স্বার্থে এলাকার ভূমি জরিপ করা একান্তভাবে দরকার হয়ে পড়ে। কিন্তু নদীতে পানি ও কোথাও বিচ্ছিন্ন চর থাকায় জরিপ করা দুরূহ হয়ে পড়ে। তবু জরিপ করতে হবে বিধায় তদানীন্তন ব্রিটিশ সরকারের স্থানীয় প্রতিনিধি জরিপের জন্যে একজন উচ্চপদস্থ মুন্সেফ পাঠান। উক্ত মুন্সেফ এলাকায় দীর্ঘদিন অবস্থান করে কঠিন জরিপ করতে চেষ্টা করেন। আশেপাশের এলাকা ও গ্রামের মানুষজন মুন্সেফকে জমি সংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য দিতেন। মুন্সেফ সাহেবও জনগণের সাথে ভালো ব্যবহার করতেন, সম্মান দিতেন। এলাকাবাসীও তাকে সম্মান দিতে ভুল করেনি। সেই মুন্সেফ সাহেবের সম্মানার্থে তারা গ্রামের নাম রাখে মুন্সেফেরচর।
মুন্সেফেরচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় : ১৯৩৯ সালে ব্রিটিশ শাসনকালে মুন্সেফেরচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপিত হয়। শিক্ষায় অনুরাগী মরহুম আক্রাম আলী গাজী জমি দিয়েছেন। অনেক চড়াই-উতরাইয়ের মধ্যে এখন বিদ্যালয়টি একটি ভালো অবস্থানে আছে। পুরোনো কৃতিত্বপূর্ণ ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও নরসিংদী সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যাপক শ্রদ্ধেয় মরহুম মো. আবদুস ছালাম খন্দকার, দুই দুইবার পুটিয়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মো. সালাহ উদ্দিন গাজী, চট্রগ্রাম মেরিন একাডেমির ইঞ্জিনিয়ার মো. মাসুদ মিয়া। নিবেদিতপ্রাণ ও শ্রদ্ধেয় শিক্ষক ছিলেন জনাব আমিনুল ইসলাম, জনাব নাজমুল কবির আনোয়ার, জনাব জিন্নত আলী গাজী, জনাব মনির উদ্দিন গাজী এবং জনাব মো. কামাল গাজী।


লেখক : সাবেক উপজেলা শিক্ষা অফিসার

শিবপুরের বিভিন্ন স্থান-নামের উৎস সন্ধান | পর্ব ১

মানিকদী
শিবপুরের দুলালপুর ইউনিয়নের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত ‘মানিকদী’ বহুল পরিচিত ও শিক্ষায় অগ্রসরমান একটি গ্রাম। ব্রিটিশ আমলের আগে থেকেই এ-গ্রামের মানুষ শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে অনেক এগিয়ে ছিলো। শিক্ষার হার বেশি থাকায় চাকরি-বাকরিতেও তারা অগ্রগামী ছিলো। এ-গ্রামের নামকরণ প্রসঙ্গে জানা যায়, এলাকাটি ছিলো হিন্দুপ্রধান। তৎসময়ে হিন্দুদের মধ্যে কোনো-এক সদ্বংশীয় প্রভাব ও প্রতিপত্তিশালী স্বর্গীয় মানিক বাবুর নামানুসারে গ্রামের নাম রাখা হয়েছিলো ‘মানিকদী’। গ্রামের বিশেষ উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব ছিলেন মোমতাজ উদ্দিন আহমেদ। সুপ্রিম কোর্টের একসময়ের যশস্বী এডভোকেট মরহুম মোজাফ্ফর আহমেদ এবং তাঁর ছেলে স্বনামধন্য বিচারপতি মরহুম মাসুক আহমদ মানিকদীরই কৃতী সন্তান। গ্রামের বয়োজ্যেষ্ঠ অভিজ্ঞ ব্যক্তিত্ব অন্তিম চন্দ্র সেনের কাছ থেকে জানা যায়, মানিকদী গ্রামটি একসময় নদীতে ডুবে ছিলো। এখানে ক্রমাগত চর পড়ে। চরে উর্বর ফসল ফলতো। এমন ফসল ফলার কারণে অন্যান্য এলাকার মানুষদের এই এলাকা আকর্ষণ করতো ও টেনে নিয়ে আসতো। সেই উর্বর ফসলের কারণে মানুষজন বলতো ‘এখানে মানিক ফলে’। আর এভাবেই গ্রামটি পেয়ে যায় ‘মানিকদী’ নাম। এ-গ্রামের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মানিকদী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৩৯ সালেরও পূর্বে। প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন স্বর্গীয় সুরেন্দ্র চন্দ্র দাশ। সুরেন্দ্র বাবু এই বিদ্যালয়ের শিক্ষকও ছিলেন। প্রতিষ্ঠাতা প্রধান শিক্ষক ছিলেন আবদুল কুদ্দুস পণ্ডিত। জমিদাতা ছিলেন মরহুম সেকান্দর আলী। বিদ্যালয়ের উল্লেখযোগ্য ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে ছিলেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মোক্তার হোসেন, জেলা রেজিস্ট্রার মাহমুদুর রহমান রিপন, উপজেলা নির্বাহী অফিসার তাহমিনা বেগম, জেলা কৃষি অফিসার বাদল চন্দ্র ঘোষ এবং জীবন বীমা করপোরেশনের পরিচালক সুধাংশু চন্দ্র ঘোষ।

ভিটিচিনাদী
বিখ্যাত, সুপরিচিত এবং দৃষ্টিনন্দন চিনাদী বিলের পূর্বপাড়ে চিনাদী বিলের সৌন্দর্য, সম্পদ ও মৎস্য আহরণের সুবিধা পেয়ে এখানে ব্যাপক হারে মানুষের বসবাস আরম্ভ হয়েছিলো। বসবাসের জন্যে বিলের পাড়ে বাড়ি বানানোর প্রয়োজন হয়। বাড়ি বানানোর আগে ভিটি তৈরি করতে হতো। জোরেশোরে মানুষের মধ্যে ভিটি তৈরি শুরু হয়েছিলো। ভিটি তৈরির ধুমধাম থেকেই গ্রামের নাম হয়ে যায় ‘ভিটিচিনাদী’। গ্রামটি এখনো হিন্দু অধ্যুষিত এবং প্রায় ষাট ভাগ হিন্দুদের বসবাস রয়েছে। গ্রামের একমাত্র শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ভিটিচিনাদী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপিত হয় ১৯৬৯ সালে। স্থানীয় নিরীহ মৎস্যজীবী মানুষের ছেলেমেয়েদের শিক্ষার জন্যে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন দুলালপুর তথা শিবপুরের কিংবদন্তীতুল্য চেয়ারম্যান মরহুম মোমতাজ উদ্দিন আহমেদ। শিক্ষানুরাগী এই চেয়ারম্যান বিদ্যালয়ের জন্যে জমিরও ব্যবস্থা করেছিলেন। প্রতিষ্ঠাতা প্রধান শিক্ষক ছিলেন মরহুম রইস উদ্দিন ভূঁইয়া। প্রখ্যাত ভেটেরিনারি ডাক্তার বদর উদ্দীন এ-বিদ্যালয়ের কৃতী ছাত্র ছিলেন।

গড়বাড়ি
শিবপুরের বর্তমান গড়বাড়ি এলাকা একসময় সুপ্রসিদ্ধ ভাওয়াল রাজার এস্টেটের অন্তর্ভুক্ত ছিলো। এলাকায় দুটি মৌজা ছিলো, যার একটি ‘গুদ্দ মহেশ্বরদী’ এবং অপরটি ‘নগর মহেশ্বরদী’। এই দুটি নামের মৌজা এখনো চালু রয়েছে। কিন্তু একসময় গড়বাড়ি এলাকা নিয়ে কিছুটা বিভ্রান্তি তৈরি হয়। অর্থাৎ এলাকা মৌজাভুক্ত করতে সমস্যায় পড়তে হয়। কোন এলাকা কোন মৌজার অন্তর্ভুক্ত করা যায়, তা নিয়েই ছিলো বিভ্রান্তি। এই পরিস্থিতিতে এলাকার জন্যে একটি গড় হিসেব করার পরামর্শ পাওয়া যায়। পরামর্শ মোতাবেক গড় করা থেকেই গ্রামের নাম হয়েছে ‘গড়বাড়ি’। গড়বাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কয়েকজন অভিজ্ঞ ও শ্রদ্ধেয় শিক্ষকের সাথে আলোচনা করে একই অভিমত পাওয়া যায়। গড়টি করার পরামর্শ এসেছিলো ভাওয়াল রাজ প্রশাসনের পক্ষ থেকে। অর্থাৎ গড় করে সমীকরণের মাধ্যমে মৌজাভুক্ত করা হয়েছিলো এলাকাটিকে। এলাকায় সুপরিচিত নাজির বাড়ির শিক্ষক জনাব আবদুল বাছেদ নাজিরের নিকট থেকে জানা যায় গড়বাড়ির বিভিন্ন ঐতিহ্যের কথা। ভাওয়াল রাজের পৃষ্ঠপোষকতায় গড়বাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি স্থাপিত হয় ১৯৩৯ সালে। প্রথমদিকে বিদ্যালয় ভবন ছিলো স্থানীয় ঠাকুর বাড়িতে। প্রথম জমিও দিয়েছিলেন ঠাকুর বাড়ির কেউ একজন। বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, প্রতিষ্ঠার সময় বিদ্যালয়ের নাম ছিলো ‘গুদ্দ মহেশ্বরদী ফ্রি মডেল স্কুল’। পাশাপাশি ক্যাম্পাসে ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার পর গড়ে ওঠেছে এম এ রশিদ উচ্চ বিদ্যালয়। উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা ও জমিদাতা মোহাম্মদ আবদুর রশিদ স্বয়ং। এ-দুটি বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে কৃতিত্বপূর্ণ ফলাফল অর্জন করে যারা জীবনে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছেন, তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন বিপ্লব নাজির।

সাতপাইকা
সাতপাইকা অঞ্চলটি একসময় হিন্দু অধ্যুষিত ছিলো। হিন্দুদের একটি সুপরিচিত বাড়ি ছিলো ঠাকুর বাড়ি। মজার বিষয় হলো, এলাকায় কোনো জমিদার বা জমিদারি ছিলো না। কিন্তু এখানে পাইকদের বসবাস ছিলো। জানা যায়, অন্যান্য সব এলাকার জমিদারদের পাইকেরা বর্তমান সাতপাইকা এলাকায় বাড়িঘর নির্মাণ করে বসবাস করতো। ওই সমস্ত পাইকদের মধ্যে সাতজন ছিলেন অত্যন্ত প্রভাবশালী ও নামিদামি। আর সেই পাইকদের মধ্যে প্রভাবশালী সাতজন পাইকের কারণে গ্রামের নাম হয়ে যায় ‘সাতপাইক’, যার বর্তমান নাম ‘সাতপাইকা’। সেই গ্রামের এক সাহসী ব্যক্তির নাম ছিলো গোপাল গুপ্ত। গোপাল গুপ্ত ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের সক্রিয় যোদ্ধা ছিলেন। কিন্তু ব্রিটিশ স্পাইদের বিশেষ তৎপরতার কারণে দুভার্গ্যবশত গোপাল গুপ্ত এলাকা ছেড়ে ভারতে চলে গিয়েছিলেন। সাতপাইকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি মোটামুটি পুরাতন, প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো ১৯৩০ সালে। প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন জহর উদ্দীন প্রধান ও জাব্বার প্রধান। প্রথম প্রধান শিক্ষক ছিলেন স্বর্গীয় ঈশ্বর চন্দ্র দাশ। জমি দিয়েছিলেন জহর উদ্দীন প্রধান ও জাব্বার প্রধান। সাতপাইকা স্কুলের স্বনামধন্য ছাত্র ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা মিয়ার উদ্দীন। এই বীর মুক্তিযোদ্ধা মিয়ার উদ্দীন ’৭১-এর স্বাধীনতা যুদ্ধে শিবপুরের পুটিয়া রণাঙ্গনে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনির বিরুদ্ধে সম্মুখযুদ্ধ করে শাহাদাত বরণ করেন। মিয়ার উদ্দীনের ভাই এবং বাংলাদেশ গ্লাস ও সিরামিকসের প্রিন্সিপাল মুসলেউদ্দীনও সাতপাইকা স্কুলের ছাত্র ছিলেন। সচিব আবু বকর সিদ্দিক এ-স্কুলেরই ছাত্র। সাতপাইকা গ্রামের অভিজ্ঞ মুরুব্বি সাবেক ব্যাংক ম্যানেজার তাইজদ্দিন সাহেবের কাছ থেকে গ্রাম ও স্কুল সংক্রান্ত অনেক তথ্য পাওয়া গেছে।


লেখক : সাবেক উপজেলা শিক্ষা অফিসার

বাঙলাদেশ লেখক শিবিরের আয়োজনে সদ্যপ্রয়াত লেখক ও চিন্তক রিপন ইউসুফকে নিয়ে স্মরণসভা

সদ্যপ্রয়াত লেখক ও চিন্তক রিপন ইউসুফ স্মরণে ‘কবি-গল্পকার-চিন্তক রিপন ইউসুফ-এর স্মরণসভা’ শীর্ষক এক স্মরণসভার আয়োজন করেছে ‘বাঙলাদেশ লেখক শিবির, নরসিংদী’। ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫ (শুক্রবার) দুপুর ৩ টায় নবধারা প্রি-স্কুলে অনুষ্ঠানটি আরম্ভ হয়। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা ও সভাপতিত্ব করেন ‘বাঙলাদেশ লেখক শিবির, নরসিংদী’র সভাপতি জনাব নাজমুল আলম সোহাগ।

শুরুতেই সদ্যপ্রয়াত লেখক-বুদ্ধিজীবী বদরুদ্দীন উমর, লেখক-গবেষক যতীন সরকার, প্রখ্যাত লালনসঙ্গীতশিল্পী ফরিদা পারভীন এবং লেখক রিপন ইউসুফের প্রতি শ্রদ্ধাস্বরূপ এক মিনিট দাঁড়িয়ে নীরবতা পালন করা হয়।

নরসিংদী সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ গোলাম মোস্তাফা মিয়া, কবি ও সম্পাদক সুমন ইউসুফ, কবি ও ঔপন্যাসিক শাদমান শাহিদ, কবি হাসনাইন হীরা, কবি আল মনির, কবি ও প্রকাশক মোশাররফ মাতুব্বর, কবি এমরানুর রেজা, শিক্ষক ও সংস্কৃতিকর্মী মঈনুল ইসলাম মীরু, প্রয়াত রিপন ইউসুফের পরিবার, বন্ধু, আত্মীয়-স্বজনসহ আরো কবি-সাহিত্যিক, সাংবাদিক এবং জেলার বিভিন্ন প্রান্তের নিবেদিতপ্রাণ সংস্কৃতিকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন। আলোচনায় সকলেই রিপন ইউসুফের সাহিত্য, দর্শন, চলচ্চিত্র ভাবনা, সমাজ ও রাষ্ট্রচিন্তা নিয়ে আলোকপাত এবং লেখকের সাথে প্রত্যেকের ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণ করেন।

কবি হাসনাইন হীরা জানান, “রিপন ইউসুফ আমার বন্ধু, আমার ভাই, আমার সহযাত্রী। শিল্প-সাহিত্যের নানা অলি-গলির ভেতরে তার সাথে সম্পৃক্ত থেকেছি। নানা বিষয়ে তর্ক-বিতর্ক করেছি। বাংলা অঞ্চল নিয়ে গভীর চিন্তা করতেন রিপন ইউসুফ। ম্যাজিক রিয়ালিজম নিয়ে অনেক কৌতূহল এবং কাজ ছিলো তার।”

অধ্যাপক জহির মৃধা বলেন, “রিপন সর্বদা চিন্তাশীল মানুষ ছিলো। সিআইডিপি রোগে অনেকদিন আক্রান্ত ছিলো। তার মৃত্যু আমাদের খুব কাঁদায়, আমাদের খুব ভাবায়।”

কবি আল মনির বলেন, “তার যে বহুমুখী প্রতিভা, এটা সবার মধ্যে থাকে না। এ-ধরনের প্রতিভা আমাদের সমাজে কম।”

কবি এমরানুর রেজা জানান, “জন্মানোর সাথে সাথে আমাদের জন্য অনিবার্য হয়ে যায় মৃত্যু, আমাদের সবাইকে একদিন চলে যেতে হবে। আদর্শগত দিক থেকে রিপন ইউসুফ অত্যন্ত মার্জিত ও সুন্দর ছিলেন। তার আদর্শের জায়গা থেকে কলমকে কখনো বিক্রি করেন নাই। তিনি আত্মমগ্ন মানুষ। রিপন ইউসুফ কখনো হারাবেন না।”

শিক্ষক ও সংস্কৃতিকর্মী মঈনুল ইসলাম মীরুর বক্তব্য ছিলো, “রচনার সংখ্যা দিয়ে কবিকে বিচার করা যায় না। রিপন ইউসুফ চিন্তক মানুষ, স্বল্পভাষী মানুষ। …সে নিঃসন্দেহে ভালো লেখক।”

কবি ও সম্পাদক সুমন ইউসুফ  বক্তব্যে বলেন, “রিপন ইউসুফের সাথে এক দশক চলেছি। সে সংগঠনে বিশ্বাস করতো না। ব্যাপক সংগঠনবিমুখ ছিলো। আবার সমাজ ও রাষ্ট্রে সংগঠনের প্রয়োজনীয়তা কতোটুকু, সে-বিষয়ে তার সম্যক ধারণা ছিলো।”

প্রফেসর গোলাম মোস্তাফা মিয়া বলেন, “সত্যিকার অর্থে তার মৃত্যুটা অকালমৃত্যু। যখন চিন্তায়-দর্শনে পরিপক্বতা সৃষ্টি হয়েছে, ঠিক সেই মুহূর্তে আমরা তাকে হারিয়েছি। …তার সাথে গভীরভাবে জড়িয়ে ছিলাম চিন্তার জায়গা থেকে। আমাদের তার চিন্তার জায়গাটুকু আলাদাভাবে আলোচনা করা দরকার। রিপন বেঁচে থাকবে তার সৃষ্টি ও কর্মের মাধ্যমে।”

তাছাড়া শিক্ষক শাহজাহান, সংস্কৃতিকর্মী মাইনুল রহমান খান, কবি ও প্রকাশক মোশাররফ মাতুব্বর, কবি মমিন আফ্রাদ, কবি শাহ আলম, কবি নাজমুল শাহরিয়ার, কবি ইফতেখার, কবি আল সউদ, রিপন ইউসুফের বড়ো ভাই রাসেল ওয়ালিদসহ আরো অনেকে কথা বলেন। পাশাপাশি রিপন ইউসুফের রচিত কবিতা, গল্প ও অনুবাদের বিভিন্ন অংশ পাঠ করা হয়৷

প্রসঙ্গত, রিপন ইউসুফ ছিলেন নরসিংদীর টাউয়াদীতে বসবাসকারী একজন নিবেদিতপ্রাণ কবি, গল্পকার এবং চিন্তক। তার বেশকিছু কবিতা, গল্প, অনুবাদ, রিভিউ, রাষ্ট্র-সমাজ বিষয়ক ভাবনা, চলচ্চিত্র বিষয়ক গদ্য জাতীয়-স্থানীয় বহু পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। তিনি দীর্ঘদিন সিআইডিপি নামক দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত ছিলেন। গত ১৯ জুলাই ২০২৫ (শনিবার) বিকেলে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন তিনি।

অকালে হারানো অনুজপ্রতিম এক বন্ধুর কথা

“পৃথিবীতে জন্ম মানেই মৃত্যু। আমাদের জীবন এবং পার্থিব অস্তিত্বের প্রারম্ভ জন্ম দিয়ে এবং এর অনিবার্য সমাপ্তি মৃত্যুতে।”— এই মহাসত্য আমাদের মানতেই হবে, কিন্তু মৃত্যু যখন হয় অকালে, তখন তা মানতে কষ্ট হয়, নানা প্রশ্নে মন জর্জরিত হয়, হৃদয় ভারাক্রান্ত হয়।

মানুষের জীবনের আয়ুষ্কাল খুব বেশি নয়। শত বছরের উপরের সংখ্যা গণনার মধ্যে আসে না। আশি-নব্বই বছর বাঁচার সংখ্যাও কম। জীবন চলার নানা পথ পরিক্রমায় বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু সম্ভবত বর্তমানে সত্তরের মতো। রিপন ইউসুফ এই বেঁচে থাকার জীবন-সংগ্রামে সেই আয়ুও পেলো না। রিপন মায়ের গর্ভ থেকে পৃথিবীতে এসেছিলো ১৯৮৮ সালের ১৯ মার্চ (যদিও স্কুলের একজন শিক্ষক এসএসসি রেজিস্ট্রেশনে তার জন্মসাল ১৯৯১ উল্লেখ করে দেন)। আর পৃথিবী ছেড়ে, আমাদের ছেড়ে চির বিদায় নিয়েছে ২০২৫ সালের ১৯ জুলাই, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে, শেষ বিকেলে। ৩৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই ইহজগত থেকে অনন্তে যাত্রা। তার এই অকাল প্রয়াণের শোক আমরা বন্ধু-স্বজন, আত্মীয়-পরিজন— সবাই মেনে নিয়েছি ভারাক্রান্ত হৃদয়ে, আর স্মরণ করছি তার স্মৃতিকে।

রিপন ইউসুফের পৈতৃক বাড়ি নরসিংদীর মেঘনার চরাঞ্চল নজরপুর ইউনিয়নের নবীপুর গ্রামে। জন্ম নিয়েছেন নরসিংদী শহরের বৌয়াকুড়ে। শৈশব-যৌবন কেটেছে নরসিংদী শহরেই। লেখাপড়া শুরু শিশুবাগ বিদ্যাপীঠ থেকে, তারপর ব্রাহ্মন্দী কামিনী কিশোর মৌলিক উচ্চ বিদ্যালয়, নরসিংদী সরকারি কলেজ। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে প্রথমে শান্তা মারিয়াম বিশ্ববিদ্যালয়ে কিছুদিন পড়াশোনা করেছেন ফ্যাশন ডিজাইনের উপর। তারপর সাংবাদিকতা নিয়ে পড়াশোনা করেছেন স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে।

রিপন ইউসুফের বাবা জাহাঙ্গীর আলম ডাক বিভাগের পরিদর্শক পদে চাকরিরত অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। নরসিংদী সদরের চিনিশপুর ইউনিয়নস্থ টাওয়াদী গ্রামে বাড়ি করে পরিবার নিয়ে থাকতেন। রিপনের মা গৃহিণী, বাবার অনুপস্থিতিতে মা-ই ছেলেদের নিয়ে সংসারের দায়িত্ব পালন করে চলেছেন। রিপনরা দুই ভাই— রাসেল ওয়ালিদ বড়ো, রিপন ছোটো।

লেখালেখিতেও রিপন তার সৃষ্টিশীলতার স্বাক্ষর রেখেছিলেন। কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ, অনুবাদেও তার হাত ভালো ছিলো। এসব মাধ্যমে ছোটো ছোটো করে লেখাগুলোর মধ্যে তাকে আলাদা করে চেনা যেতো। রূপক-প্রতীকে সুনিপুণ অলঙ্কৃত শব্দ ব্যবহারে তার লেখাগুলো অন্যদের থেকে আলাদা এবং শিল্পমর্যাদায় উন্নীত হতে পেরেছে বলে আমি মনে করি।

রাসেল ও রিপন ভাই হলেও সম্পর্ক ছিলো বন্ধুত্বের, পরস্পরের বোঝাপড়া ছিলো অনেক সুন্দর। রাসেল বিয়ে করেছে, একটি কন্যা সন্তানও এসেছে এই পরিবারে। সবাইকে নিয়ে মায়ের নেতৃত্বে সংসার চলছিলো পরিকল্পিতভাবে। এর মধ্যে রিপনের দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হওয়া এবং অকালে চির বিদায়ে পরিবারটি নতুন জীবন-সংগ্রামের মুখোমুখি হয়েছে।

রিপনের সাথে আমার পরিচয় নরসিংদী সরকারি কলেজের অধ্যক্ষের দায়িত্ব থেকে ২০০৯ সালের শেষে অবসর নেয়ার পর। নাজমুল আলম সোহাগ (আমার স্নেহভাজন ছাত্র) নরসিংদীর খালপাড় চেয়ারম্যান মার্কেটে বই-পুস্তক লাইব্রেরি দেয়ার পর সেখানে দিনের নানা সময়ের আড্ডায় বসতাম। সেখানে রিপনও আসতো। আসতো জহির মৃধা, মাইনুল, মিরু, প্রণব, লিংকন, সনেট, শাদমান শাহিদ, সুমন ইউসুফ, শাহীন সোহান, মীর লোকমান, মমিন আফ্রাদ, অনির্বাণ মাহবুব, রাসেল ওয়ালিদসহ আরো অনেকে, যাদের অধিকাংশ আমার ছাত্র। জীবন চলার পথে শিশু, প্রবীণ, আমার সহকর্মীরা যেমন আমার বন্ধু, তেমনি আমার তরুণ ছাত্ররা, ছাত্রতুল্যরাও আমার সবচাইতে ঘনিষ্ঠ বন্ধু। এই বন্ধুদের আড্ডায় রিপন ইউসুফ আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলো। এই দৃষ্টি আকর্ষণের প্রথম এবং প্রধান বিষয় ছিলো বই। নতুন বইয়ের সন্ধান তার কাছে পাওয়া যেতো। আমি ছাত্রজীবন থেকেই বই পাগল ছিলাম। এ নিয়ে অনেক গল্প-কথা আছে। এখনো বই পড়া-বই সংগ্রহ করার অভ্যাস চলমান। রিপনের বই পড়া এবং বই সংগ্রহের নেশা ছিলো। প্রথমত বই পড়া, নতুন বইয়ের সন্ধান এবং সংগ্রহের আগ্রহের মিল থেকেই তার সাথে আমার ঘনিষ্ঠতা বেড়ে যায়। আমার লাইব্রেরিতে আড্ডায় বসা, রিপনের ব্যক্তিগত লাইব্রেরিতেও তার নিজস্ব কক্ষে আড্ডায় বসে আমাদের আলাপচারিতা বাড়তে থাকে। আলাপচারিতায় প্রাধান্য পায় সাহিত্য, দর্শন, ইতিহাস, ধর্মতত্ত্ব, চলচ্চিত্র। এসব বিষয়ে দুর্লভ এবং নতুন বই আমি রিপনের মাধ্যমে সংগ্রহ করার সুযোগ পাই। অনেক বই, যেগুলোর হার্ডকপি (সরাসরি প্রিন্ট কপি) পাওয়ার সুযোগ ছিলো না, সেগুলো অনলাইন থেকে বের করে নিজে পড়তো এবং আমাকেও পিডিএফ করে পড়ার ব্যবস্থা করে দিতো। এসব বিষয়ে জ্ঞানের জগতে তার সাথে আমার একটি ভিন্নমাত্রিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে।

বইকেন্দ্রিক আড্ডার পাশাপাশি চলচ্চিত্র নিয়ে কথা, চলচ্চিত্র দেখা সমতালে চলতে থাকে। প্রায় সকল জনরার ছবি দেখার অভ্যাস ছিলো তার। বইয়ের মতো চলচ্চিত্র নিয়েও অনেক আগ্রহ ছিলো রিপন ইউসুফের। সারা পৃথিবীর সকল ভাষার শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র দেখার বাসনা থেকে সে ল্যাপটপে ডাউনলোড করতো ছবিগুলো। আমি সেখান থেকে পেনড্রাইভে করে টেলিভিশনের বড়ো পর্দায় দেখতাম নিয়মিত। কখনো কখনো রিপনও আমার সাথে থাকতো। রিপন বাড়িতে দেখতো তার মোবাইল এবং ল্যাপটপে। অনেক ছবি ভাষার সমস্যার কারণে বুঝতে অসুবিধা হতো, সেগুলো নিয়ে তার সাথে কথা হতো। ছবি দেখতে দেখতে চলচ্চিত্রকে বোঝার অনেক পরিপক্বতা এসেছিলো রিপনের। তানভীর মোকাম্মেলের চলচ্চিত্র বিষয়ক অনেক কর্মশালায় অংশ নিয়ে চলচ্চিত্র বিষয়ে তার শিক্ষা চলচ্চিত্রকে ভালোভাবে বোঝার শক্তি তৈরি করেছিলো। তার সাথে এ-বিষয়ে যুক্ত হয়ে আমিও অসংখ্য পেনড্রাইভে পাগলের মতো প্রায় কয়েক শতক ভালো মানের দেশি-বিদেশি চলচ্চিত্র সংগ্রহ করে ফেলি। সাথে সাথে আমার পাঠাগারে চলচ্চিত্র বিষয়ক বইয়ের সংখ্যাও অনেক পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। নরসিংদী শিল্পকলা একাডেমির চলচ্চিত্র সংসদেও রিপনকে যুক্ত করে ফেলি। সেখানে চলচ্চিত্র উৎসবের ছবি ছাড়াও বিভিন্ন সময় পর্দায় অনেক ছবি দেখার সুযোগ তৈরি হয়। রিপনের মাধ্যমে আমার কয়েক শতক ছবির সংগ্রহের তালিকা থেকে বিশ্বসেরা কয়েকটি চলচ্চিত্রের নাম উল্লেখ না করে পারছি না। ‘মন্তাজ’-এর সফল পরীক্ষামূলক ছবি রাশিয়ার পরিচালক সের্গেই আইজেনস্টাইনের ‘দ্য ব্যাটেলশিপ পটেমকিন’, চার্লি চ্যাপলিনের ‘মডার্ন  টাইমস’, ইতালির পরিচালক ভিত্তরিও ডিসিকার ‘বাইসাইকেল থিভস’, ‘টু উইমেন’, ‘সানফ্লাওয়ার’, জাপানের পরিচালক আকিরা কুরোসাওয়ার ‘রশোমন’, ‘সেভেন সামুরাই’, ফ্রান্সের পরিচালক জ্যাঁ রেঁনেয়ার ‘দ্য রিভার’, আলফ্রেড হিচককের ‘দ্য বার্ডস’, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে নির্মিত ছবি ‘অল কোয়ায়েট অন দ্য ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট’, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে নির্মিত ছবি ‘দ্য ব্রিজ অন দ্য রিভার কাউয়াই’, ‘ব্যালাড অব অ্যা সোলজার’, ব্রাজিলের ছবি ‘সিটি অব গড’, ইরানের পরিচালক মাজিদ মাজেদি’র ‘চিলড্রেন অব হ্যাভেন’, দক্ষিণ কোরিয়ার পরিচালক কিম কি দুকের মহামতি গৌতম বুদ্ধের দর্শন নিয়ে অসাধারণ ছবি ‘স্প্রিং-সামার-ফল-উইন্টার অ্যান্ড স্প্রিং’।

এভাবে বাংলাদেশ, ভারত, আমেরিকা, রাশিয়া, জাপান, ইতালি, স্পেন, ইসরাইল, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য, ব্রাজিল, ইরান, কোরিয়াসহ সারা পৃথিবীর ছবি আমরা দেখেছি। ছবি পর্যালোচনা করেছি। সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক, মৃণাল সেন, বাংলাদেশের তারেক মাসুদের ছবি দেখা এবং আলোচনা প্রাধান্য পেতো। রিপন আজ নেই, সবই যেন স্মৃতির পাতায় জমা হয়ে গেলো। আর শূন্যতা আর একাকিত্বের মধ্যে পড়ে গেলাম আমি।

রিপনের লেখালেখির পাশাপাশি চলচ্চিত্র নির্মাণের আকাঙ্ক্ষাও ছিলো প্রবল। চলচ্চিত্র পরিচালকদের সাথে যুক্তও হয়েছিলেন। নিজেকে প্রস্তুত করতে শুরু করেছিলেন। পরীক্ষামূলকভাবে শর্টফিল্ম নির্মাণের কাজে হাত দিয়েছিলেন। ‘দৃশ্যকল্পদ্রুম’ প্রযোজনা সংস্থার মাধ্যমে তার নির্মিত শর্টফিল্ম ‘রাস্তার কোণার লোক’-এর মধ্যে আমরা তার সম্ভাবনার চিহ্ন পেয়েছিলাম।

লেখালেখিতেও রিপন তার সৃষ্টিশীলতার স্বাক্ষর রেখেছিলেন। কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ, অনুবাদেও তার হাত ভালো ছিলো। এসব মাধ্যমে ছোটো ছোটো করে লেখাগুলোর মধ্যে তাকে আলাদা করে চেনা যেতো। রূপক-প্রতীকে সুনিপুণ অলঙ্কৃত শব্দ ব্যবহারে তার লেখাগুলো অন্যদের থেকে আলাদা এবং শিল্পমর্যাদায় উন্নীত হতে পেরেছে বলে আমি মনে করি।

দীর্ঘ লেখার সুযোগ নেই, ‘গঙ্গাঋদ্ধি’তে প্রকাশিত তার শেষ কয়েকটি লেখা নিয়ে সংক্ষিপ্ত করে কিছু বলা যায়। ‘গঙ্গাঋদ্ধি’র ডিসেম্বর ২০২৪ সংখ্যায় তার প্রকাশিত কবিতা ‘রাষ্ট্র, তোমারে ধরতে চেষ্টা করতেছি, পারতেছি না’ কবিতাটি দেখতে পারি :

দিন দিন তুমি কেমন বিটকয়েন হইয়া যাইতেছো রাষ্ট্র! কেমন ক্রিপ্টোময়, নাগালের বাইরে। তোমারে ধরতে চেষ্টা করতেছি। পারতেছি না। এই মৃতপ্রায় হেমন্তের দিনগুলোতে তোমারে নিয়া ভাবতে বসলে প্রটোকল মাইনিং কইরা চলতে হয়। না জানি কোন ট্যাগের টেলিগ্রাম আসে! অথচ আমরা ভাবছি ভবিষ্যত হইবে ক্যাশলেস, বাইন্যান্সময়। আর মনোনয়ন পাবে, সমতার বন্দোবস্ত। কিন্তু তাকায়া দেখি পুরোনো চিন্তার নতুন নতুন এয়ারড্রপ। সত্যিই, দিন দিন তুমি কেবল বিটকয়েনই হইয়া উঠতেছো রাষ্ট্র, এক্কেরে নাগালের বাইরে। তোমারে বাঁধতে পারতেছি না এমন কোনো ব্লকচেইনে, যেখানে রাষ্ট্র হবে না কেবল ক্ষমতাবানদের, রাষ্ট্র হবে না কেবল শুয়োরের বাচ্চাদের!

ব্যাখ্যার প্রয়োজন নেই, রাষ্ট্রের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের কণ্ঠে প্রতিনিয়ত যা ধ্বনিত হচ্ছে, তারই ভিন্নমাত্রিক কবিতার শৈল্পিক আঙ্গিকে প্রকাশ। নরসিংদী জেলার কাগজ ‘গঙ্গাঋদ্ধি’র ত্রৈমাসিক সাহিত্য সাময়িকী ‘গগনশিরীষ’ ২০২৫-এর মে সংখ্যায় রিপনের প্রকাশিত গল্প ‘একটি লাশের তদন্ত’। গল্পটি আমার খুবই ভালো লেগেছে। রূপক-প্রতীকের খোলসে এই ছোটো পরিসরের গল্পটিতে তার সৃষ্টিশীল সাহিত্যরূপের স্বাদ পেয়েছি।

‘গগনশিরীষ’-এর দ্বিতীয় সংখ্যায় প্রবন্ধ আঙ্গিকে তার একটি গুরুত্বপূর্ণ লেখা ‘কেন ভূমিভিত্তিক জাতীয়তাবাদ; প্রসঙ্গ রাজনৈতিক বাঙলাদেশ’ ছাপা হয়েছে। প্রবন্ধটিতে বাঙালির ইতিহাস পর্ব বিশ্লেষণে ভূমিভিত্তিক জাতীয়তাবাদের গুরুত্ব ও যুক্তিগ্রাহ্যতা তুলে ধরেছেন সুন্দরভাবে এবং প্রবন্ধের শেষ অংশে ‘চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের’ বাস্তবতা উল্লেখ করে স্পষ্টত বলেছেন, “ভবিষ্যত পৃথিবীর ‘পুঁজি’ স্বাভাবিকভাবেই ‘প্রযুক্তি’। ‘প্রযুক্তি’ই নিয়ন্ত্রণ করবে ভবিষ্যত।” রাজনৈতিক বাংলাদেশে কল্যাণকর জীবনের জন্যে পরিবর্তিত ‘পুঁজি’তে আমাদের অবস্থান কী হবে, এই প্রশ্ন রেখে প্রবন্ধটি শেষ করেছেন। বিষয়টি আমাদের জন্যে খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

অনুবাদেও প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন রিপন। ‘গঙ্গাঋদ্ধি’র প্রথম বর্ষের প্রথম সংখ্যায় মার্কিন লেখক ও কার্টুনিস্ট জেমস থারবার (১৮৯৪-১৯৬১)-এর Fables for Our Time and Famous Poems Illustrated গ্রন্থের The Rabbits Who Caused All The Trouble গল্পটির বাংলা অনুবাদ ‘খরগোশের বাচ্চারা, যারা ছিলো সমস্ত ফ্যাসাদের মূলে’ প্রকাশিত হয়েছে। ছোটোগল্পটি খুবই অল্প কথার। কিন্তু গল্প শেষে অসাধারণ একটি ম্যাসেজ রয়েছে, “এই পৃথিবীতে পালিয়ে যাওয়াদের কোনো স্থান নেই। …দৌড়াও। যতোদূর দৌড়াতে পারো।”

পূর্বেই বলেছি, রিপনের লেখালেখি শিল্পের মানে উত্তীর্ণ। রিপন নেই, আমরা যারা আছি, আমাদের দায়িত্ব তার অল্প পরমায়ুর জীবনে যেসব সাহিত্যকর্ম রয়েছে, তা দ্রুত গ্রন্থাকারে প্রকাশ করে তার সৃষ্টিকে বাঁচিয়ে রাখা।

রিপন আড্ডাপ্রিয় মানুষ ছিলো। আড্ডা আমারও পছন্দ। আমাদের আড্ডা ছিলো ঘরে-বাইরে। আড্ডা হলো পছন্দমতো জায়গায় একত্রে বসে অবাধ ও স্বতঃস্ফূর্ত কথোপকথন, যা প্রাণকে বাঁচিয়ে রাখে, যেখান থেকে প্রাণ নতুন করে জন্ম লাভ করে। রিপন আড্ডা দিতো নজরপুরের চেঙ্গাতলী বাজারের চায়ের দোকানে, বদরপুর ব্রিজ সংলগ্ন চায়ের দোকানে, বটতলা বাজারের চায়ের দোকানে, গ্রন্থকল্পদ্রুম, বই-পুস্তক লাইব্রেরিসহ আরো অনেক স্থানে। টেলিফোনে জানতে চাইতাম, রিপন তুমি কোথায়? উত্তর আসতো চেঙ্গাতলী, বদরপুর, বটতলা বাজার। এই তিন জায়গাতেই আড্ডা বেশি চলতো, বিদায়বেলায় বই-পুস্তক ও ছাপাঘরে। আড্ডায় শুধু নানা বিষয়ে কথোপকথনই নয়, চলতো শিল্প-সাহিত্যের চর্চাও।

রিপন আজ নেই, মনে পড়ছে অনেক কথা, অনেক স্মৃতিময় সময়। পারিবারিক-ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে আমার সাথে পরামর্শ করতো। বাবার অনুপস্থিতিতে মা, বড়ো ভাইকে নিয়ে সংসার পরিচালনা বিষয়ে কথা হতো। কথা হতো একটি মানসম্মত বইয়ের দোকান গড়ার স্বপ্ন নিয়ে ‘গ্রন্থকল্পদ্রুম’ প্রতিষ্ঠা বিষয়ে, সিনেমা নির্মাণ প্রসঙ্গে, আমাকে নিয়ে ‘মৃদুস্বরের উজ্জ্বল আলো’ গ্রন্থ প্রকাশ বিষয়ে। গ্রন্থটি প্রকাশে সুমন ইউসুফ, শাহীন সোহান, শাহীনুর মিয়ার সাথে রিপন ইউসুফেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ও অংশগ্রহণ ছিলো। একদিন দীর্ঘসময় তার জীবনের কথা, একটি মেয়েকে ভালোবাসার কথা, জীবনের নানা পরিকল্পনার কথা শুনেছিলাম— সবই আজ স্মৃতি।

২০২৪ সালের অক্টোবর মাসে রিপন অসুস্থ হয়ে পড়লো। নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষায় ‘সিআইডিপি’ নামক দুরারোগ্য ব্যাধি শনাক্ত হলো। ডাক্তারই তাকে বলেছিলো, এই রোগ ভালো হওয়ার নয়, নানা উপসর্গ নিয়ে জীবনের সমাপ্তি ঘটবে। শুরুও হয়েছিলো সেসব অবস্থা : হাঁটতে না পারা, চোখের দৃষ্টি হারিয়ে ফেলা। সে চেষ্টা করেছিলো মানসিক শক্তি নিয়ে সব মোকাবেলা করার। মা-বড়ো ভাই রাসেল চিকিৎসার কোনো ত্রুটি করেনি। আমরাও ডাক্তারদের সাথে কথা বলেছি। ডাক্তারদের কথা, চিকিৎসা চলবে, কিন্তু রোগের চির মুক্তি ঘটবে না। অসুস্থতার সময়গুলোতে তার মনের অবস্থার কথা ভাবতে গিয়ে হৃদয় ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে।

একদিন সময় এলো। জীবনের অনেক স্বপ্নকে অপূর্ণ রেখে হলো তার চির বিদায়। নবীপুর কবরস্থানে নির্জনে ঘুমিয়ে আছে রিপন ইউসুফ। তার আত্মার শান্তি হোক।


গোলাম মোস্তাফা মিয়া
সাবেক অধ্যক্ষ, নরসিংদী সরকারি কলেজ

আমরা কেন রিপন ইউসুফ হয়ে ওঠি

আমরা দাঁড়িয়ে আছি মৃতদেহের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার অনুষ্ঠানের মুখোমুখি হয়ে। আমাদের পাশে আমাদের বন্ধুর মৃতদেহ অথবা আমাদের বন্ধুর মৃতদেহের পাশে আমরা। যেমন আমরা পাশাপাশি বসেছি অনেকদিন অথবা দিনের পর দিন। আমরা ভাবছি, আমাদের সময়গুলোকে যেভাবে আমরা ভাবতে শিখেছিলাম কিংবা শিখেছিলাম চিন্তাগুলোকে নেড়েচেড়ে দেখতে। আমরা বেড়ে ওঠতাম, অশ্বত্থ গাছের তলায় যেভাবে বেড়ে ওঠতো নকশা করা পাতাঅলা গাছ। আমরা বাতাসের সঙ্গে পরিচিত হতাম আমাদের নিজস্ব কায়দায়। কিন্তু জানাজার নেতৃত্বদানকারী ইমাম সাহেবের অপরিচিত ছিলাম সামাজিক সামষ্টিক কায়দার কারণে। তিনি চিনতে পারতেন না রিপন ইউসুফকে, বিগত দিনগুলোতে এমনকি তার প্রয়াণ দিবসেও। তিনি চিনতে পারেননি আমাদেরকেও, যারা এসেছি এলাকার বাইরে থেকে। তার মতো সবাই তাকে চিনতো এলাকাবাসী হিসেবে, যার বাবা তার মতো অকালপ্রয়াত হয়েছিলেন বেশ আগেই। কিন্তু আমরা চিনতাম আমাদের বন্ধুকে, যে অনুধাবন করেছিলো যে, ‘আগন্তুক’ সিনেমার মামার মতো আমাদের একসাথে বসে আড্ডা নামক বস্তুটির গতিপথটি ঠিক কোনদিকে হওয়া প্রয়োজন এবং আমরা ঠিক কোনদিকে আমাদের নিজেদেরকে নিয়ে যাবো। তখন আমাদের বাকিদের হয়তো এতো অল্প বয়সে ‘প্রয়োজন’ শব্দের ওজনের মানদণ্ড গজিয়ে ওঠেনি, তাই আমরা হয়তো এর ভার ঠাহর করে ওঠতে পারিনি। আমাদের বাকিদের কাছে এই ‘প্রয়োজন’ শব্দটি ছিলো এক-আধটু বই পড়া বা ভিনদেশি সিনেমা দেখে অন্যদের থেকে নিজেকে একটু আলাদা করার প্রক্রিয়া। সোজা কথায় যদি বলি, একটু লোকেদের দেখানো যে, দেখো, আমরা কেমন জাতে উঠছি! কথাটাকে ‘শোঅফ’ বলে দিলে সবার ধরতে হয়তো সুবিধা হয়। কিন্তু রিপন ইউসুফ হয়ে ওঠছিলো সবার চেয়ে আলাদা। নিজের বোধশক্তির উন্নতির জন্যে ছিলো রিপন ইউসুফের এই যাত্রা। এই যাত্রায় রিপন ইউসুফ যে-আলো জ্বেলেছিলো, বাকি বন্ধুদের মতো সেই আলো প্রবেশ করেছিলো আমার চোখেও। সেই আলোতে আমি বুঝতে চেয়েছি, আমরা কেন রিপন ইউসুফ হয়ে ওঠি।

তার সাহিত্যপাঠের উদ্দেশ্য ছিলো জীবনকে নিবিড়ভাবে জানা, আরো বিশেষভাবে বললে এই অঞ্চলের আদি মানুষের সরল জীবন ব্যবস্থা সম্পর্কে তার জানার আগ্রহ। এই বিষয়ে বিশেষ পাণ্ডিত্যও ছিলো তার। এই বিষয়ে তার জোরালো বক্তব্যও ছিলো। তার মতে, এখানকার আদি মানুষের সঠিক ইতিহাস না জানলে এখানকার মানুষকে কখনোই বোঝা যাবে না আর এখানকার মানুষকে না বুঝলে মানুষের জন্যে যেকোনো উন্নয়নই মানুষের কোনো কাজে আসবে না।

আমার বন্ধু রিপন ইউসুফ সদ্যপ্রয়াত। এই প্রেক্ষিতে সামগ্রিক স্মৃতিচারণ আমার এই লেখার উদ্দেশ্য নয়। বরং আলবেয়র কাম্যু’র মুরসাল্টের মতোন রিপন ইউসুফ কোনো চরিত্র হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছিলো কি না, যে প্রচলিত সত্যের বাইরে কোনো গভীর সত্যের প্রতি টান অনুভব করতো; যেটা নিশ্চিতভাবেই কোনো দায়বদ্ধতা না হয়ে শুধুই একটা টান অনুভব থেকেই হতো।

নিষ্ঠুর রসিকতার জন্যে সে ছিলো একদমই আলাদা। যেকোনো বিষয়ে তার রসিকতা অনেক সময় মানুষকে বিব্রত ও বিভ্রান্ত করেও দিতো। কিছু কিছু ক্ষেত্রে হয়তো সেটা নিষ্ঠুরতার মাত্রা ছাড়িয়ে ব্যক্তিকে বিষাদগ্রস্ত করে দিতো। এখানে একটা বিষয় ভাবার থাকে, এই নিখাদ রসিকতার পেছনে রিপন কতোটা দায়ী ছিলো অথবা যাকে নিয়ে এসব রসিকতা করা হতো, তারা নিজেরা কতোটা দায়ী ছিলো। তাদের ভাঁড়ামির বিপরীতে সান্ত্বনার প্রত্যাশায় রিপন ইউসুফের কাছে আসা এবং তার বিপরীতে প্রাঞ্জল রসিকতা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে আত্মপক্ষপাতদুষ্ট না হলে হয়তো তারা নিজেদের ভাঁড়ামি অতিক্রম করে নিজেদেরকে নির্মাণের সুযোগ দিলেও দিতে পারতো। রিপন ইউসুফের আয়নায় তাদের নিজেদেরকে দেখার ব্যর্থতা কি রিপন ইউসুফের আয়নার অস্বচ্ছতা নাকি তাদের নিজেদেরকে না দেখার প্রকাণ্ড অনিচ্ছা, তা বুদ্ধিমানদের কাছে প্রশ্ন রাখা যেতেই পারে। এক্ষেত্রে উল্লেখ করা প্রয়োজন, যেচে রসিকতা করার উদাহরণ রিপন ইউসুফের ক্ষেত্রে বিরল। ব্যক্তি রিপন ইউসুফের এই বিতর্কিত গুণটি তাকে অন্যদের থেকে সমাজে আলাদা ও প্রাসঙ্গিক করেছে নিশ্চিত রূপেই। রিপন ইউসুফ সকলের কাছে সর্বপ্রথম পরিচিত হয়ে ওঠেছিলো একজন চলচ্চিত্র বোদ্ধা হিসেবে। যদিও তার সাহিত্যচর্চা ও সাহিত্যের পাঠ চলছিলো সমানতালেই। সিনেমা নির্মাণ বিষয়ে পরিকল্পনা ছিলো তার বেশ আগে থেকেই। পাশাপাশি চলছিলো প্রস্তুতি। আমার মতো অনেকেরই ভিন্ন দেশের ভিন্ন রূপের সিনেমার পরিচয় হয়তো রিপনের কাছ থেকেই। প্রথম বয়সে সিনেমা নির্মাণ বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন আয়োজন থাকলেও হয়তো সেটা বাস্তব হয়ে ওঠতো না বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার কারণে। সেই সীমাবদ্ধতার ছিলো বিবিধ কারণ, যে-বিষয়ে আমি লিখতে অনিচ্ছুক।

সিনেমাটোগ্রাফি বিষয়ে চমৎকার ধারণা ছিলো তার। বেশ আত্মবিশ্বাসী ছিলো সে এই বিষয়ে। সিনেমা নির্মাণের টানে মফস্বল পেরিয়ে রাজধানীতে গেলেও সেখানকার পেশাদারদের কাজ এবং কাজের মান নিয়ে তার ছিলো হতাশা। যে-মানের কাজ রিপন দেখতে চাইতো বা কাজ হবে বলে মনে করতো, সেই মানের কাজ সেখানে সে পায়নি। নিরাশ হতে হয়েছিলো তাকে। ‘ঘুড়ি’ ও ‘যিশু আপনি কোথায়’ নামক দুইটি শর্টফিল্ম করার চেষ্টা করে। তারপর হাত দেয় শর্টফিল্ম ‘রাস্তার কোণার লোক’ বানানোর কাজে। চমৎকার গল্প আর চিত্রনাট্য থাকলেও যে-সমস্যা সামনে এসে দাঁড়ায়, তা হলো কারিগরি ও বাজেট দুর্বলতা। সিনেমাটির গল্প সূক্ষ্ম মেকআপ এবং ফিনিশিংয়ের দাবি রাখতো। সেখানে অপ্রতুল বাজেট এবং মেকআপ সুবিধার কারণে বেশকিছুটা খাপছাড়াও লেগেছিলো। বাজেট যদি আরো বেশি থাকতো, তবে হয়তো তা সত্যজিৎ রায়ের ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’ না হলেও ঋতুপর্ণর ‘হীরের আংটি’ হয়ে ওঠতে পারলেও পারতো। রিপন ইউসুফের নিজের কাজের প্রতি খুব বেশি আত্মতুষ্টি ছিলো না কখনোই। সিনেমা হচ্ছে এমন একটি শিল্প, যেখানে অনেক লোকের পরিশ্রম একত্রিত হয়ে সিনেমা আকারে রূপ নেয়। বিভিন্ন জায়গায় যোগাযোগের অনীহা ও আলসেমি রিপন ইউসুফের সিনেমা বিষয়ক প্রতিভা ও জ্ঞানকে বঞ্চিত করেছে নিশ্চিতভাবেই। তবে তার সিনেমা বিষয়ক অগাধ জ্ঞান স্রেফ তার সিনেমার প্রতি অনুরাগের ফসল বলেই আমার মনে হয়। সিনেমা পরবর্তী সময়ে সাহিত্য হয়ে ওঠেছিলো তার প্রধান বিচরণ ক্ষেত্র। সাহিত্যের বিভিন্ন জায়গায় ছিলো তার বিচরণ। উপন্যাস, ছোটোগল্প, কবিতা, ইতিহাস, প্রবন্ধÑ সবই ছিলো তার পাঠের বিষয়। তার ব্যক্তিগত বইয়ের সংগ্রহ দেখলে তা সহজেই বোঝা যায়। এমন না যে, শুধু বই সংগ্রহ করতো সে, বই সে পাঠও করতো। তার সংগ্রহে থাকা এমন বই খুব কমই আছে, যা সে পড়েনি। আমাদের পরিচিত একজন লোক ছিলেন, যার সংগ্রহে অনেক বই ছিলো। রিপন ইউসুফের তার বইয়ের উপর বেশ লোভ ছিলো এবং সেই লোকের মৃত্যুর পর তার বইয়ের সংগ্রহের উপর তার একটা বাসনা ছিলো। কারণ সেই লোকের সন্তানেরা বই তেমন পড়ে না, তারচেয়ে রিপন বইগুলো নিয়ে নিলে অনেকদিন ধরে এগুলো সে পাঠ করতে পারবে। যদিও-বা এগুলো ছিলো স্রেফ কথার কথা। আমার এই ঘটনার উল্লেখ করা শুধু এটা বোঝানোর জন্যে যে, পার্থিব জীবনে রিপন ইউসুফের আকর্ষণের বিষয় ও বস্তুটি তুলে ধরা। যদিও হায়, এখন রিপন ইউসুফের সংগ্রহের বই নিয়ে কী করা হবে, তা আমরা বন্ধুরা ভাবছি। এখনো আমরা এই তল্লাটে তার বইয়ের উপর লোভ করা কাউকে খুঁজে পেয়েছি কি? সাহিত্যের ছোটোগল্প ও কবিতার প্রতি তার অনুরাগ ছিলো বিশেষ। সাহিত্যের প্রায় সব জায়গায় তার নিবিড় পাঠ থাকলেও ছোটোগল্প ও কবিতা লেখার বিষয়ে সে ছিলো বিশেষ আগ্রহী। তার কবিতার মাঝখানে লাতিন সাহিত্যের গন্ধ পাওয়া যেতো। লেখাগুলো কেমন তার নিজের লেখারই অনুবাদ মনে হতো। এটাকে হয়তো সাহিত্যে নতুন কিছু করার প্রয়াস হিসেবে দেখা যেতে পারে। কবিতা লেখার পর কিছু কবিতা সে আমাকে পাঠ করতে দিতো। কিছু কিছু কবিতার চিত্রকল্প নির্মাণ ছিলো বেশ জোরালো ও সচেতন। কবিতার সচেতন নির্মাণে রিপন ইউসুফ ছিলো অতীব মনোযোগী। শব্দের ভারিক্কিহীন ব্যতিক্রমী প্রকাশ রিপন ইউসুফের কবিতা। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিলো কবিতার মাঝে রিপন ইউসুফের নিজস্বতার ছাপ অর্থাৎ কবিতা পড়তে দিলে নাম না দেখেই বলে দেয়া যেতো, এটা রিপন ইউসুফের কবিতা। ছোটোগল্পের ব্যাপারে তাকে বেশ নিরীক্ষাধর্মী লেগেছে। কবিতার মতো গল্পের ক্ষেত্রেও সে তার নিজস্বতার ছাপ রাখতে পেরেছে বলেই আমার মনে হয়। তার কিছু ছোটোগল্প আমার কাছে ভালো লেগেছে। তার একটা গল্প আমার বিশেষভাবে ভালো লেগেছিলো। গল্পটি ছিলো এক যুবক আর একটি বিড়ালকে কেন্দ্র করে। গল্পটিতে চরিত্রের পরিবর্তন বেশ চমকপ্রদ ছিলো। গল্পটি প্রথম পাঠেই আমি মুগ্ধ হয়ে যাই এবং তাকে এটা জাতীয় মাসিক সাহিত্য পত্রিকায় ছাপানোর পরামর্শ দিই। তখন সে আমাকে জানায়, সে আরো কিছু গল্পসহ বই প্রকাশ করতে চায়। তার লেখার সমালোচনার বিপরীতে তার প্রতিক্রিয়া কিছুটা তীব্র ছিলো। তার অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী হওয়াই হয়তো এর কারণ ছিলো। মাঝে মাঝে এমন হয়েছে, তাকে ইচ্ছে করে রাগান্বিত করার জন্যে আবোল-তাবোল কিছু সমালোচনা করে দিতাম… ওই যে, নিষ্ঠুর মজা…! আমরাও কি কম করেছি? যা-ই হোক, হয়তো গল্পগুলো বই আকারে প্রকাশিত হলে পাঠকের তা ভালো লাগতেও পারে।

তার কিছু রাজনৈতিক বিশ্লেষণধর্মী লেখাও আছে, যা এখানকার ইতিহাস-সংস্কৃতি ও জাতীয়তাবাদ বিষয়ে তার নিজস্ব বিশ্লেষণ। সেই বিশ্লেষণ ছিলো সুচিন্তিত ও প্রাসঙ্গিক। এই ধরনের লেখায় তার রাজনৈতিক সচেতনতা প্রকাশ পায়। তার রাজনৈতিক চিন্তায় সে এমন একটি ‘টানেল’ পদ্ধতিতে বিশ্বাস করতো, যেখানে আপনি যে-মতবাদেই বিশ্বাস করেন না কেন, আপনাকে নিয়ম মেনে সেই টানেলে ঢুকতে হবে এবং নিয়ম মেনে অন্যের অসুবিধা না করে আপনার নিজস্ব বিকাশ ঘটাতে হবে। চিত্রনাট্য লেখার একটা চিন্তাও সে করেছিলো। লিখেছিলোও একটা। তবে সব ছাপিয়ে একটা বিষয় বিশেষভাবে পরিলক্ষিত, তার সাহিত্যপাঠের উদ্দেশ্য ছিলো জীবনকে নিবিড়ভাবে জানা, আরো বিশেষভাবে বললে এই অঞ্চলের আদি মানুষের সরল জীবন ব্যবস্থা সম্পর্কে তার জানার আগ্রহ। এই বিষয়ে বিশেষ পাণ্ডিত্যও ছিলো তার। এই বিষয়ে তার জোরালো বক্তব্যও ছিলো। তার মতে, এখানকার আদি মানুষের সঠিক ইতিহাস না জানলে এখানকার মানুষকে কখনোই বোঝা যাবে না আর এখানকার মানুষকে না বুঝলে মানুষের জন্যে যেকোনো উন্নয়নই মানুষের কোনো কাজে আসবে না। এখানকার তান্ত্রিক জীবনের পদ্ধতির বিস্তারিত ছিলো তার গবেষণার বিষয়। তার মতে, তান্ত্রিক জীবন ব্যবস্থাই এখানকার আদি এবং প্রাসঙ্গিক জীবন ব্যবস্থা। এটি হারিয়ে যায়নি বরং তান্ত্রিক জীবন ব্যবস্থা বর্তমানে বিদ্যমান আছে বিচ্ছিন্নভাবে। এই জীবন ব্যবস্থাকে কেবল ফিরিয়ে আনতে পারা যাবে এর নিবিড় পাঠ ও প্রয়োগের মাধ্যমে। সে মনে করতো, এখানে প্রথম উপনিবেশ স্থাপন করেছিলো আর্যরা, যারা এখানে দ্বিতীয় ধাপে প্রবেশ করেছিলো এবং এখানকার বিদ্যমান তান্ত্রিক জীবনের উপর প্রভাব বিস্তার করেছিলো বিভিন্ন ঈশ্বর ব্যবস্থা চাপিয়ে দেয়ার মাধ্যমে। এবং এখানকার আদি বাসিন্দারা পাহাড়ে বা দুর্গম অঞ্চলে আশ্রয় নিয়েছিলো তাদের সাংস্কৃতিক অস্তিত্ব রক্ষার প্রয়োজনে। বিক্ষিপ্তভাবে হলেও তারা কিছুটা সেই ব্যবস্থা ধারণ করে। তাদের মাতৃতান্ত্রিক জীবন ব্যবস্থা এই তান্ত্রিক জীবনের একটি অন্যতম দিক, যেখানে একজন নারী পরিবারের প্রধান হিসেবে বিবেচিত হন এবং প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব বিস্তার করেন। তদের জীবন ব্যবস্থার কিছু চমকপ্রদ বিষয় সে আড্ডায় তুলে ধরতো। এছাড়া ইউরোপীয় খাপছাড়া শিক্ষা ব্যবস্থা কীভাবে আমাদের গুরুমুখী শিক্ষার প্রাণনাশ করলো এবং এই ধরনের শিক্ষা ব্যবস্থা আমাদের মাঝে কীভাবে কেরানি মানসিকতা উৎপাদন করছে আর এই উৎপাদিত মানসিকতা কীভাবে আমদানি করছে পশ্চিমের অযাচিত চাহিদার জঞ্জাল, তা আড্ডায় আলোচনা করতো। এসবই ছিলো তার বিস্তর পাঠের ফসল, যা উৎপাদিত হয়েছিলো কেবল পাঠের প্রতি ভালোবাসা থেকে। প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতি তার কখনোই আস্থা ছিলো না। দশম শ্রেণিতে টেস্ট পরীক্ষায় ফেল করেছিলো সে। অংক এবং হিসাববিজ্ঞানে। ফলে পরের বছর এসএসসি দিতে হয়। এইচএসসিতে সারাদিন কলেজের বাইরে বাইরে বদরপুর থেকে বুধিয়ামারা ঘুরে বেড়াতো বন্ধুদের সাথে আর বিভিন্ন বিষয়ে আলাপ আর আড্ডা চলতো। ফলাফল যা হবার, তা-ই হলো, অই কোনোরকম পাশ। ভর্তি হলো শান্তা মারিয়াম ইউনিভার্সিটিতে ফ্যশন ডিজাইনের ছাত্র হিসেবে। টিকলো না সেখানে। তারপর স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে জার্নালিজম এন্ড মিডিয়া স্টাডিজে। সেখান থেকেও চলে এলো, গ্রাজুয়েশন হলো না। আমি বললাম, গ্র্যাজুয়েশন করলি না, এখন ভদ্রঘরের মেয়ে দিবে তোকে কেউ? উত্তরে হাসতো আর বলতো, আরে খোক্কা, যখন লাগবে, ঠিকই বিয়ে করে নেবো। বিয়ে করার ইচ্ছে প্রকাশ করেছিলো একবার, একটা বায়োডাটা তৈরি করেছিলো। আমাকে দেখালো, আমি দেখলাম পেশার ঘরে লেখা : লেখক ও সম্পাদক। আমি পেট ফাটিয়ে হাসলাম আর বললাম, এই বায়োতে বিয়ে হবে না, সংশোধন করতে হবে। লিখতে হবে দলিল লেখক ও সাধারণ সম্পাদক, তাহলেই বিয়ে হতে পারে।

রিপন ইউসুফ ধীরে ধীরে হয়ে ওঠেছিলো এক জ্ঞানের প্রতিচ্ছবি। কেউ যদি ব্যক্তিবিদ্বেষ এবং তর্কের জন্যে তর্ক করতে না চায়, তাহলে তাকে এই কথাটা মানতে হবে। যদিও কথাটা সিদ্ধান্ত এবং স্পর্শকাতর বিষয়, তবু হ্যাঁ, আমাকে এখানে পৌঁছুতেই হয়। সে আমাদের মধ্যে বহু অপরিচিত ও অপ্রচলিত আলাপ ও চিন্তা জারি রেখেছে। তার এই অপ্রচলিত চিন্তা বর্তমানে ব্যাপক প্রচলিত ব্যবস্থার বিপক্ষে একটি শক্ত ধাক্কা নিঃসন্দেহে। আর এই প্রচলিত অসম্পূর্ণ জীবন ব্যবস্থা থেকে মুক্তির জন্যে আমরা যখন আমাদের মস্তিষ্ককে ব্যবহার করি, তখন আমরা প্রকারান্তরে রিপন ইউসুফই হয়ে ওঠি। রিপন ইউসুফ কেবল আমাদের বন্ধুরই নাম নয় বরং একটি চিন্তার নাম। সে মনে করতো, আমাদের এই অঞ্চলে ইন্টেলেকচুয়াল মানুষের বড়ো ঘাটতি। এখানকার বুদ্ধিজীবীদের চিন্তা সবলভাবে দাঁড়ায়নি। এখানকার সামাজিক বিভিন্ন ইস্যুতে বুদ্ধিজীবীদের চিন্তার নিষ্ক্রিয়তা তার কথার স্বপক্ষে শক্ত প্রমাণ। আমরাও যখন এই দুর্যোগ সমভাবে অনুভব করি, তখন হ্যাঁ, আমরাও রিপন ইউসুফ হয়ে ওঠি।


নাজমুল শাহরিয়ার কবি

হাওয়ায় মিলিয়ে গেলো মনীষাফুল

0

বাঙলা অঞ্চল রিপন ইউসুফের প্রধানত চূড়ান্ত আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু ছিলো। রাজনৈতিক ও ভূখণ্ডগত বাংলাদেশের স্বর্ণোজ্জ্বল অতীতকে হৃদয়ে ও মগজে ধারণ করে বর্তমানের বিধ্বস্ত দিশাহীন বাংলাদেশের উন্নয়নের সমাধান খোঁজার চেষ্টায় রত ছিলো নিয়ত।

সাহিত্যের বাজারে পূর্ণরূপে আত্মপ্রকাশ যে সাধনার বিষয়,  দীর্ঘ প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে একটা প্রকৃষ্ট মাহেন্দ্রক্ষণে এটা ঘটে— এই বোধবুদ্ধি রিপন ইউসুফের জানা ছিলো খুব যথাযথভাবেই। এমনিতেই দেশি-বিদেশি সাহিত্যপাঠের গহ্বরেই তার নিত্য পরিভ্রমণ ছিলো। মূলত সে লিখতো কবিতা, পরে গল্প, তারও পরে প্রবন্ধ। তবে গল্প নিয়ে বেশি সিরিয়াস ছিলো। জাতীয় বিভিন্ন পত্রিকায় গল্প ছাপা হবার পর আত্মবিশ্বাসও বেড়ে গিয়েছিলো। তার প্রথম গল্পগ্রন্থের পাণ্ডুলিপি প্রস্তুত ছিলো, এবং প্রকাশনীর দ্বারে করাঘাত করা হচ্ছিলো মাত্র।

কিন্তু রিপন ইউসুফ সাহিত্যের পরিমণ্ডলে নিছক ‘সাহিত্য’ করার জন্যেই বিচরণ করতে চায় নাই। এরকম অভীপ্সা তার ছিলো না। সে একটা ফিলোসফি ধারণ করতো। সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতি দায় অনুভব করতো।

বাঙলা অঞ্চল রিপন ইউসুফের প্রধানত চূড়ান্ত আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু ছিলো। রাজনৈতিক ও ভূখণ্ডগত বাংলাদেশের স্বর্ণোজ্জ্বল অতীতকে হৃদয়ে ও মগজে ধারণ করে বর্তমানের বিধ্বস্ত দিশাহীন বাংলাদেশের উন্নয়নের সমাধান খোঁজার চেষ্টায় রত ছিলো নিয়ত। এবং সমাধান সে জানতোও। মূলত এগুলোই রিপন ইউসুফের লেখালেখি, পড়াশোনা আর চিন্তার নিয়মিত অনুষঙ্গ ছিলো।

চারপাশে এই যে রাষ্ট্র আর রাজনীতি বুঝে ফেলা প্রচুর মানুষের দঙ্গল, নিজেদের মগজে যতোটুকু ধারণক্ষমতা, ততোটুকু দিয়েই সমাজ-রাষ্ট্র-দর্শন ইত্যাদি নিজেদের বাপ-দাদা প্রভাবিত মতামত দ্বারা আদিষ্ট হয়ে উচ্চবাচ্য করা মানুষের মব, ৫৪ বছরেও বুদ্ধিজীবী আর তাত্ত্বিকদের ব্যর্থতার ভাগাড় এই আমার রাষ্ট্র, কেন এখনো ভাগাড়ই রয়ে যাবে— এইসব প্রশ্ন উত্থাপন আর উত্তর খোঁজার চিন্তার প্র্যাক্টিস রিপন ইউসুফের মজ্জাগত বিষয় ছিলো। মানুষেরা আসলে ভালো সমাধান চায়, কিন্তু এর বিপরীতে একেকজন বিএনপি, আওয়ামী লীগ, বাম আর হেফাজতের ভেতর এসবের সমাধান খোঁজে, এরকম ভাবনায় রিপন ইউসুফ প্রথমে আমোদ অনুভব করতো, পরে গভীরভাবে ভাবতো। একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটছে রাষ্ট্রে, প্রতিহিংসা আর প্রতিশোধপরায়ণতায় নিয়মিত ব্যস্ত থাকছে মানুষেরা, একই কাজ কিন্তু সবাই করছে, দুই বা তিনদলে বিভক্ত হয়ে একে অপরকে একই ভাষায় গালাগাল করছে— স্বৈরাচার, ফ্যাসিবাদ এরকম বলে। এবং এসব তৎপরতাকে মানুষ ভাবছে রাজনীতি। এইসব তাৎপর্যহীন আচরণ আর এক্টিভিজম চলছে যুগের পর যুগ, শতাব্দীর পর শতাব্দী।

সাইত্রিশ বছরের একটা যুবক এক দশক নিবিষ্টভাবে পরিশ্রম ও সাধনা করে গেছে সাহিত্য, দর্শন, চলচ্চিত্র নির্মাণের মতো শিল্পকলার এমনসব উৎকর্ষের সাথে, যা নিজের সাথে সাথে সমাজ-রাষ্ট্র বা মানুষের অন্তর্জগতে আলোড়ন তুলতে পারার মতো গৌরব বয়ে আনতে পারতো।

রিপন ইউসুফ সমাজ আর রাষ্ট্রকে আর সামাজিক বা রাজনৈতিক দর্শনকে পরিশুদ্ধ করার পথঘাট খুঁজে পেয়েছিলো বাঙলার একদম প্রাকআর্য যুগে। সেখান থেকেই মণিমুক্তা সংগ্রহ করে প্রচার করাই ছিলো তার সাহিত্য আর বক্তব্য আর চিন্তার প্রধান অভিপ্রায়। প্রস্তুতিও শেষ হয়ে গিয়েছিলো। এখন কেবল প্রকাশের পালা।

২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারির ১০ তারিখ আমরা নির্ধারণ করেছিলাম ‘রিপন ইউসুফের একক বক্তৃতা’ আয়োজনের। বিষয় ছিলো ‘কেন জাতীয়তাবাদ; প্রসঙ্গ রাজনৈতিক বাংলাদেশ’। নরসিংদীতেই আয়োজন করার প্রস্তুতি সম্পন্ন ছিলো আমাদের। বর্তমান রাষ্ট্রের জন্যে এক আলোচিত বিষয় ছিলো এটা। উন্মুক্ত প্রশ্নোত্তর পর্বও ছিলো। জাতীয়তাবাদ নিয়া মানুষের যে আপ্ত কিছু ধারণা আর জ্ঞান, যে নিন্দা আর ভুল বোঝাবুঝির আস্তরণ, মূলত এগুলো নিরসনের চেষ্টা করা যুক্তি আর বাস্তবতার মাধ্যমে— এই আয়োজনের উদ্দেশ্য ছিলো এরকমই। কিন্তু হায়, জানুয়ারির শেষের দিকেই তার দুরারোগ্য ব্যাধি ধরা পড়ে এবং নিষ্ক্রিয় হয়ে যেতে থাকে। কেবল মনের জোরে পরবর্তী আট মাস টিকে ছিলো সে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এতোটা সক্রিয় ছিলো না রিপন ইউসুফ। সে যে-সোসাইটিতে বসবাস করতো, সেখানেও নয়। খুব অল্প মানুষের সাথেই কথা-গল্প-আড্ডা আর চিন্তা বিনিময় করতে পারতো।

রিপন ইউসুফ ৫ আগস্টের একদিন পর ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছিলো, অভ্যুত্থান বেহাত হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল! আমরা এক বছর অতিবাহিত করার পর তার ভবিষ্যতবাণীর মর্ম বুঝতে পারছি।

এটা আমাদের জন্যে বড়ো বেদনার মতো বাজে যে, সাইত্রিশ বছরের একটা যুবক এক দশক নিবিষ্টভাবে পরিশ্রম ও সাধনা করে গেছে সাহিত্য, দর্শন, চলচ্চিত্র নির্মাণের মতো শিল্পকলার এমনসব উৎকর্ষের সাথে, যা নিজের সাথে সাথে সমাজ-রাষ্ট্র বা মানুষের অন্তর্জগতে আলোড়ন তুলতে পারার মতো গৌরব বয়ে আনতে পারতো। অথচ সবকিছু একটা ব্যাগে ভরে আত্মপ্রকাশের রাস্তায় পা ফেলার সাথে সাথেই হাওয়ায় মিলিয়ে গেলো। আর দেখা গেলো না কোথাও। আমরা এটা জেনে ফেলেছি যে, সত্যিকার অর্থেই আর কখনো কোথাও তাকে দেখা যাবে না। কী হাস্যকর অদ্ভুত বিচারব্যবস্থা নিয়তির! মানুষজন্মের অ্যাবসার্ডিটি নিয়ে নূতন করে আর ভাবার কী আছে বুঝি না!

রিপন ইউসুফের অপ্রকাশিত সব লেখাপত্র শীঘ্রই প্রকাশিত হচ্ছে বলে জানি। তার চিন্তার প্রদীপ প্রজ্জ্বলিত থাকবে সদা তার সেসব লেখার মধ্যেই।


সুমন ইউসুফ
সভাপতি, বাংলাদেশ প্রগতি লেখক সংঘ, নরসিংদী

রিপন ইউসুফ কোথায় গেলো

0

রিপনের সাথে তর্কটা এখানো শেষ হয়নি, তার আগেই সে চলে গেলো; এভাবে চলে যাওয়ার অভ্যাস তার আগে ছিলো না। কে জানে কী হয়েছে, হুট করে এভাবে তর্কের মাঝপথে বিরতি দেয়াটা ভালো হয়নি; সবার তর্কের দম থাকে না, সবাই তর্ক বোঝেও না, তর্কের বিষয় রেখে অধিকাংশই ব্যক্তিগত বিষয়ে ঢুকে পড়ে, তারপর যা হবার তাই হয়; তর্ক ঢুকে পড়ে পরচর্চার কুৎসিত অন্ধ গলিতে। রিপন এমন অন্ধ গলির নোংরা ময়লা এড়িয়ে চলতে জানে। তাই রিপনের সাথে তর্কটা জরুরি।

কবিতা, কথাসাহিত্য, প্রবন্ধ, চিত্রকলা, দর্শন, রাজনীতি, অর্থনীতি, দেশ, রাষ্ট্র, সমাজ নিয়ে আমাদের অনেক কথা বাকি আছে। কবিতা লিখে কি আসলেই কিছু হয়? কিংবা সিনেমা কতোটুকু ভূমিকা রাখে আসলে সমাজে? আর রাখলেই বা কী, কতোজন সেটি দেখতে যায়? এর থেকে বোধ হয় রাজনীতি অনেক সরাসরি বিষয়। রাষ্ট্র নিয়ে, ভবিষ্যত নিয়ে আলাপের একটা পথরেখা পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু রাজনীতি কারা করে? কেন করে? কী তাদের রাজনীতি? দেশ, মানুষ, প্রকৃতি-প্রযুক্তির সাথে তাদের সংযোগ কেমন?

রেলস্টেশনের বটতলা কিংবা মেঘনার পাড়ে শ্মশানঘাট, থানারঘাট অথবা দূর নির্জন আড়িয়াল খাঁ নদীর ধারে কবি রিপন ইউসুফের সাথে অসংখ্য বিতর্ক এখনো বাকি।

এসব আলাপ আসলে অদরকারি। অর্থনৈতিক মুক্তি ছাড়া মানুষের কোনো পথ নাই। তো মানুষের মুক্তির জন্যে কতো টাকা লাগে? কী পরিমাণ সম্পদ হলে মানুষ ভাবতে পারে যে, তার অর্থনৈতিক মুক্তি ঘটেছে? এই মাত্রা কে নির্ধারণ করবে? মানদণ্ডের বাটখারা সেই লোকটাকেই-বা আমরা মানতে যাবো কেন? হিউম্যান সাইকোলজি এখানে কী বলে? ‘ডিজায়ার’ কি কোনো মাত্রায় পরিমাপ করা সম্ভব? দেল্যুজ তো বললো, মানুষের ‘ডিজায়ারিং মেশিন’-এর তো কোনো সমাপ্তি নাই। এটা কি যোগ দর্শনের ‘চিত্তবৃত্তি নিরোধ’? চিত্তবৃত্তি না থাকলে মানুষের থাকে কী? কিছু একটা তো থাকতে হবে।

কী আছে মানুষের? ঐ একটা মাথা, আর সেটা ভর্তি করা চিন্তা-দুশ্চিন্তা-কুচিন্তা। এই চিন্তার মালিক তো সে নিজে না, অন্য কেউ চিন্তা রেডি করে দেয়ার পর সে এক্সিকিউট করে বেড়াচ্ছে। চিন্তাও যদি নিজের না হয়, তাহলে কী আছে তার? শরীর? সেটি কি চিন্তার ফল? নাকি শরীরের ফল চিন্তা? শরীর না থাকলে কি তার চিন্তা থাকতো? চিন্তা না থাকলে কি তার শরীর থাকতো? ডিম আগে না মুরগি আগের দশা। ভাই, শেষ পর্যন্ত আমার সারভাইবাল কোশ্চেন, আমাকে তো নিজেকে বহন করে নিয়ে যেতে হবে।

কিন্তু এর তো একটা ভিত্তি আছে, কোথাও দাঁড়াতে হয়, আমরা কি কোথাও দাঁড়াতে পারছি? আমাদের কোনো একটি পাটাতনে দাঁড়াতে দেয়া হচ্ছে না। কারা দিচ্ছে না, কেন দিচ্ছে না, সেটি তারা পারে কীভাবে? ঐ দেখবেন, কিছু বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী বুদ্ধিজীবীর ভেক ধরে জাতিকে জ্ঞান দিচ্ছে, সে এই জ্ঞান কোথায় পাইলো, কিছু বিশ্ববিখ্যাত তাত্ত্বিকের নাম আওড়াতে দেখবেন, ঐ-সকল তাত্ত্বিকের কপি করে কিন্তু তার মতো আর দাঁড়াতে পারে না, কারণ তাদের দাঁড়াবার আলাদা শক্ত পাটাতন আছে, সেখানে আমার জায়গা হবে না, এটা মাথায় রাখতে হবে, সে তার জায়গা আমার জন্যে ছেড়ে দিবে না, কিন্তু আমি তো উদাম করে দাঁড়িয়ে আছি, সমস্যা এখানেই, আপনার মাটিতে আপনার পা নেই, ভেসে ভেসে বেশিদূর যাওয়া যাবে না, ধপাস করে পড়ে যাবেন, নাক-মুখ থেতলে যাবে।

অবশ্য এই থেতলানো মুখ পুঁজি করে আবার ভিক্ষা ভালো পাওয়া যায়, নিজেদের ভিক্ষুক হিসেবে রাখতে চাইলে, আর কোনোমতে ভিক্ষুদের সর্দারি বাগিয়ে নিতে পারলে এক জীবন ভালোই কেটে যেতে পারে। পশ্চিমের লোকজন বেশ দয়ালু হয়ে ওঠেছে, তারা সব শুষে নিলেও নিজেদের মলমূত্র সাফ করানোর জন্যে কামলা বাঁচিয়ে রাখে, আর বেঁচে থাকার মতো পরিমিত ভিক্ষা তারা দেয়, এই উদারতা তাদের আছে। পশ্চিমা তাত্ত্বিকের তৈরি করা তত্ত্ব ভিক্ষা করেও আমাদের একই দশা হচ্ছে, এসব পারলে বাদ দেন, নতুবা দূরে যান…

চা-সিগারেট কতোগুলো খাওয়া হয়, এই হিসেব কখনো করা হয়নি, রেলস্টেশনের বটতলা কিংবা মেঘনার পাড়ে শ্মশানঘাট, থানারঘাট অথবা দূর নির্জন আড়িয়াল খাঁ নদীর ধারে কবি রিপন ইউসুফের সাথে অসংখ্য বিতর্ক এখনো বাকি। বইমেলায় প্রকাশের অপেক্ষায় থাকা আমার পরবর্তী বইয়ের বিষয়টি নিয়েও জরুরি কথা আছে। বাঙালি, বঙ্গীয়, বৃহৎবঙ্গ, গ্লোবালাইজেশনের বিতর্কগুলো তো একটা পরিণতির দিকে নিতে হবে; রিপনের সিরিয়াস চরিত্রের ভেতর এই খামখেয়ালিটুকু আমি নিতে পারি না, সবারই ব্যক্তিগত কাজ আছে, ব্যক্তিগত জীবন আছে, তাই বলে তর্কের মাঝপথে যখন-তখন চলে যাওয়া যায় না।

যান, কাদের ব্যবসা ফুলে-ফেঁপে ওঠছে, সেটাও সুযোগমতো দেখেন; বাঙালি বলার সমস্যাটুকুকে কারা পুঁজি করে অন্য ব্যবসা করে, কারা বিদ্বেষ উসকে দেয়, কারা এই শব্দে আদিবাসীদের নিয়ে রাজনীতির বড়ো দান বাগিয়ে নেয়, আমরা কি সেসব দেখিনি? আসলে কেউ সমাধান চায় না, ক্ষত বাঁচিয়ে রেখে নিজেদের বুদ্ধিজীবীতাকে উপভোগ করতে চায়। বস্তুত সমাধান কীভাবে আসতে পারে, তার কোনো ধারণাই তাদের নাই, থাকলে কই? এতো যে বড়ো বড়ো কথা, বড়ো বড়ো চিন্তা, অজস্র পরামর্শ, তাহলে আমাদের দিন দিন আরো অধঃপতন হচ্ছে কেন? সন্দেহ করেন, যারা কথা বলছে, তাদের প্রত্যেককে সন্দেহ করেন; হয় তারা জানে না, নির্বোধ অথবা অসৎ, এর বাইরে অন্য কিছু হলে আমরা তার কিছু না কিছু ফলাফল দেখতে পেতাম।

ফলাফল থাকবে কীভাবে? এখানে কি কেউ থাকে? এই মাটিতে কারো কোনো স্বপ্ন নেই, সব ধ্বংস হয়ে গেছে কবি সাহেব, কবিতা লেখেন, সিনেমা বানান, তত্ত্ব আওড়ান, একটা বেশ নান্দনিক জীবন উপভোগ করেন, আপনার তো দায়িত্ব নাই, অন্য কেউ আপনার জন্যে লালগালিচা পেতে দিবে, আপনি বিভিন্ন পোজে ছবি তুলবেন। চলেন, এর চেয়ে ভালো হয় সোহান-রাসেল-সুমনসহ একটা ছবি তুলি, ফেসবুকে দেওয়া যাবে, ‘আজকে দারুণ আলাপ হলো’, এই তো, প্রচার সর্বস্বতা, এর বাইরে কী? একটা সমাজ পাল্টাতে কয় জনম অপেক্ষা করতে হয়!


দ্রাবিড় সৈকত
কবি, চিত্রকর
সহযোগী অধ্যাপক, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়