Home Blog Page 10

আবদুল মান্নান ভূঁইয়া : কৃষক আন্দোলন বেয়ে মুক্তিযুদ্ধের সেনাপতি

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিক্রির কথাগুলো ইদানিং অনেকের মুখে মুখে ফিরছে। সেটার সোল এজেন্ট হয়ে ওঠেছিলো আওয়ামী লীগ। এজেন্ট হওয়ার কারণ, তারা মনে করে, তারাই দেশ স্বাধীন করেছে এবং এর সকল সুফল তারাই ভোগ করবে। তবে এ-কথা ঠিক, একাত্তরে দেশ স্বাধীন হয়েছিলো আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে। যাদের অধীনে স্বাধীনতাকামী বিভিন্ন দল, মত ও গোষ্ঠীর লোকজন অংশগ্রহণ করেছিলেন। এমন অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন, যাদের দলীয়, সাংস্কৃতিক কিংবা গোষ্ঠীগত পরিচয় ছিলো না। আমার আত্মীয় নইমুদ্দিন ভূঁইয়া একজন কৃষক ছিলেন। তিনি স্বাধীনতার জন্যে লাঙল ফেলে রেখে হাতে অস্ত্র তুলে নিয়েছিলেন। এমন দল-গোষ্ঠীহীন লাখ লাখ নইমুদ্দিনকে আওয়ামী লীগ অস্বীকার করে এককভাবে নিজের কৃতিত্ব ফলাতে চেয়েছে।

তেমনি আওয়ামী ঘরানার বাইরে দেশের বড়ো একটা জনগোষ্ঠী নিঃস্বার্থভাবে স্বাধীনতার জন্যে জীবন বাজি রেখে যুদ্ধে গিয়েছিলেন। যাদের রাজনৈতিক পরিচয় আওয়ামী লীগের চেয়ে কোনো অংশে কম ছিলো না। দেশের  বামপন্থী  রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এমন অনেক দল জীবন বাজি রেখে মুক্তিযুদ্ধ করেছিলো। এদের সবচেয়ে বড়ো একটা ঘাঁটি ছিলো তৎকালীন ঢাকা জেলার পূর্বাঞ্চল হিসেবে খ্যাত নরসিংদী অঞ্চলে। যার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন ন্যাপ (ভাসানী)-র খ্যাতিমান নেতা আবদুল মান্নান ভূঁইয়া (১৯৪৩-২০১০)। তাঁর অধীনে শত শত বামপন্থী নেতা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। এই বামপন্থী মুক্তিবাহিনিটি স্থানীয়ভাবে ‘মান্নান ভূঁইয়া বাহিনি’ নামে পরিচিতি লাভ করেছিলো। কিন্তু প্রগতিশীল রাজনীতিবিদ হিসেবে মান্নান ভূঁইয়া নিজের মুখে কখনো ‘মান্নান ভূঁইয়া বাহিনি’ কথাটি উচ্চারণ করেননি। তিনি বামপন্থী মুক্তিযোদ্ধাদের সমান কৃতিত্বের অধিকারী মনে করতেন। মজলুম জননেতা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর সরাসরি রাজনৈতিক সহচর ছিলেন তিনি। জীবনের  বড়ো একটা অংশ কৃষক আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। শিবপুর কৃষক সম্মেলন, হাতিরদিয়া বাজার হাট-হরতাল সফল করে জাতীয় রাজনীতিতে পরিচিতি লাভ করেন। মান্নান ভূঁইয়া  ছাড়াও শিবপুরের আসাদুজ্জামান আসাদ ভাসানী সমর্থক ও স্থানীয় কৃষক নেতা। মান্নান-আসাদের নেতৃত্বে শিবপুর, মনোহরদী, বেলাব ও রায়পুরায় ব্যাপক কৃষক আন্দোলন চলতে থাকে। তাঁদের সভা-সম্মেলনে ভাসানী সভাপতিত্ব করে জ্বালাময়ী বক্তব্য রেখেছিলেন। এই আসাদুজ্জামান আসাদ ঊনসত্তরে বুকের তাজা রক্ত দিয়ে অভ্যুত্থানকে সফলতার পথে নিয়ে গিয়েছিলেন। শহীদ আসাদের মৃত্যুর পর মূলত স্থানীয় কৃষক আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিলেন মান্নান ভূঁইয়া। ২০১০ সালের ২৭ জুলাই ফুসফুসে ক্যান্সার হয়ে মৃত্যু হলে রাজনীতির একটা অধ্যায়ের যবনিকাপাত ঘটে। ধীর-স্থির ও গম্ভীর চিন্তা-চেতনা পোষণকারী এই রাজনৈতিক নেতার মৃত্যুতে দেশের রাজনীতিতে যে-শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে, তা এখনো পূরণ হয়নি। বিশেষ করে, নরসিংদীর শিবপুরের মানুষ তাঁর অভাব হারে হারে টের পাচ্ছেন।

শিবপুর-মনোহরদীর বিভিন্ন এলাকায় তথ্য সংগ্রহ করতে  গিয়ে অবাক হয়েছি। ছাত্র জীবন থেকেই মান্নান ভূঁইয়া প্রগতিশীল চিন্তা-ভাবনায় পরিপক্বতা অর্জন করেছিলেন। মাছিমপুর গ্রামে এক সাধারণ কৃষক পরিবারে ১৯৪৩ সালের ১ মার্চ জন্ম নেয়া এ-রাজনৈতিক নেতাকে জাতীয় পর্যায়ে আসতে কঠোর পরিশ্রম ও সাধনা করতে হয়েছে। গ্রামের প্রাইমারি স্কুল, শিবপুর স্কুল থেকে মেট্রিক পাশ করে নরসিংদী কলেজে পড়াশোনা করেছেন তিনি। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রির পাশাপাশি এলএলবি ডিগ্রি অর্জন করেন। পিতা আবদুল হাই ভূঁইয়া আপাদমস্তক একজন কৃষক ছিলেন। শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করলেও রাজনৈতিক প্রবল স্রোতে এ-পেশা ভেসে যায়। রাজনীতি তাঁর অস্থি-মজ্জায় বাসা বেঁধেছিলো। যার কারণে ছাত্র জীবনে ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত হন।

নরসিংদী কলেজে পড়ার সময় তিনি ছাত্র ইউনিয়ন থেকে ছাত্র সংসদের সমাজ সেবা সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৬২ সালে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সংগঠক হিসেবে তিনি আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। ১৯৬৪ সালে ছাত্র ইউনিয়নের সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হয়ে জাতীয় রাজনীতিতে বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৬৪-৬৫ সালে তিনি ডাকসু’র কার্যনিবার্হী কমিটির সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। তিনি ছাত্র ইউনিয়নের মেনন গ্রুপ করতেন।

ছাত্র জীবন শেষে মান্নান ভূঁইয়া মূলত মওলানা ভাসানীর আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে ন্যাপে যোগদান করেন। ১৯৬৯ সালে গণঅভ্যুত্থানে বিশেষ ভূমিকা রাখেন। ন্যাপের রাজনীতিতে থাকার সময় তিনি বেশিরভাগ সময় কৃষক সমিতির হয়ে গ্রামাঞ্চলের অবহেলিত কৃষকদের পক্ষে কাজ করেছেন। শিবপুর, মনোহরদী ও নরসিংদী সদরে অনেক বড়ো বড়ো কৃষক আন্দোলন করেছেন তিনি। কৃষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে বেশ কয়েক বছর তিনি বরেণ্য কৃষক নেতা জিতেন ঘোষ, হাতেম আলী খান, অন্নদা পাল ও সরদার ফজলুল করিম প্রমুখের সঙ্গে কাজ করেন।

তাঁর রাজনৈতিক জীবনে অনেক উত্থান-পতন আর ঘাত-প্রতিঘাত থাকলেও একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অসামান্য অবদান রয়েছে। শিবপুর রণাঙ্গনকে তিনি শত্রুমুক্ত রেখেছিলেন। ভারতের কোনো সাহায্য-সহযোগিতা ছাড়াই তিনি স্থানীয় এবং ঢাকার বেশকিছু বামপন্থী নেতাকর্মীদের মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন, যা ছিলো মুক্তিযুদ্ধের অনন্য নজির। নরসিংদী জেলার উত্তরাঞ্চলের পাহাড়ি এলাকা হিসেবে খ্যাত সেই শিবপুর, বেলাব, মনোহরদী এবং রায়পুরার অংশবিশেষ ছিলো হাজার হাজার বামপন্থী মুক্তিযোদ্ধাদের বিচরণ ক্ষেত্র। কমিউনিস্ট, ন্যাপ ও সর্বহারা পার্টির নেতাকর্মীরা বেশ কিছু প্রশিক্ষণ ক্যাম্প, আশ্রয় শিবির ও মুক্তিযোদ্ধাদের সংগ্রহ কেন্দ্র খুলে পুরো এলাকাটিকে মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাস মুক্তাঞ্চল হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন। প্রখ্যাত  বামপন্থী নেতা ও লেখক হায়দার আকবর খান রনো, হায়দার আনোয়ার খান জুনো ও রাশেদ খান মেনন, চলচ্চিত্রকার  জহির রায়হান তাঁর দলবলসহ শিবপুরের রণাঙ্গনে এসেছিলেন। একাধিক বামপন্থী নেতা সেই রণাঙ্গন নিয়ে বই কিংবা প্রবন্ধ লিখেছেন। তাঁরা সবাই মান্নান ভূঁইয়ার কমান্ডে মুক্তিযুদ্ধ করেছিলেন। ভারতের সাহায্য ছাড়া যে-কয়েকটি দল দেশের ভিতরে থেকে মুক্তিযুদ্ধ করেছিলো, তার মধ্যে মান্নান ভূঁইয়ার গ্রুপ ছিলো সবচেয়ে বেশি শক্তিশালী। বরিশাল পেয়ারা বাগান এলাকায় আরেকটি দল কোনো রকম সাম্রাজ্যবাদী শক্তির সাহায্য ছাড়া মুক্তিযুদ্ধ করেছিলো। সেই দলের নেতৃত্বে ছিলেন কমরেড সিরাজ শিকদার।

‘শিবপুর মুক্তিযুদ্ধের এক সশস্ত্র ঘাঁটি’ শীর্ষক প্রবন্ধে হায়দার আনোয়ার  খান জুনো বলেন, “একাত্তরের বেশ আগে থেকেই শিবপুর বামপন্থীদের একটা শক্তিশালী ঘাঁটি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত ছিলো। মান্নান ভূঁইয়ার নেতৃত্বে সেখানে  জঙ্গি কৃষক সংগঠন গড়ে ওঠেছিলো। শিবপুরে বামপন্থী ছাত্র ইউনিয়নও খুব শক্তিশালী ছিলো। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে শিবপুর যথেষ্ট অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। ঊনসত্তরের শহীদ আসাদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকা অবস্থায়ই শিবপুরে কৃষক আন্দোলনের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিলেন।”

পঁচিশে মার্চ পাক হানাদার বাহিনি নিরীহ মানুষের উপর হামলা চালালে মান্নান ভূঁইয়ার নেতৃত্বে সে-হামলার প্রতিরোধ প্রস্তুতি নেয়া হয়। এপ্রিলের প্রথমদিকে পাঁচদোনায় ইপিআর ও বেঙ্গল রেজিমেন্টের বাঙালি সৈনিকদের সঙ্গে পাকিস্তানি মিলিটারির যুদ্ধ হয়। সেই যুদ্ধে ফেলে যাওয়া কিছু অস্ত্র এবং শিবপুর থানা লুট করে কিছু রাইফেল পাওয়া যায়। প্রাথমিকভাবে সেসব অস্ত্রশস্ত্র দিয়েই মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ শুরু করা হয়। মান্নান ভূঁইয়ার নির্দেশ পেয়ে বেঙ্গল রেজিমেন্টের হাবিলদার মজনু মৃধা ও হারিস মোল্লা প্রশিক্ষণের দায়িত্ব পান। তদারকিতে ছিলেন ঝিনুক খান, কালা মিয়া, আবদুল আলী মৃধা, তোফাজ্জল হোসেন, মান্নান খান ও আওলাদ হোসেন প্রমুখ। শিবপুর থানা সদরে পাকিস্তানি আর্মির ক্যাম্প থাকায় বিপ্লবী মুক্তিযোদ্ধারা শিবপুর পাহাড়ি এলাকায় গোপনে সংগঠিত হয়ে প্রশিক্ষণ শুরু করেন।

মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক একাধিক গ্রন্থ ও মুক্তিযোদ্ধাদের বয়ান থেকে জানা যায়, শিবপুর, মনোহরদী, বেলাব ও রায়পুরা এলাকায় কয়েকটি দলে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিলো। তাঁদের রাজনৈতিক পরিচয় আলাদা হলেও সবাই মান্নান ভূঁইয়ার নেতৃত্ব মেনে নিয়েছিলেন। যুদ্ধের ৯ মাস বিভিন্ন এলাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে পাকবাহিনির ছোটো ছোটো কিছু যুদ্ধ হয়েছিলো। তবে  উল্লেখযোগ্য যুদ্ধটি হয় ১৩ আগস্ট পুটিয়া বাজারে। নরসিংদীর টি এন্ড টি ভবনে অবস্থিত পাকিস্তানি বাহিনির মূল ঘাঁটির সাথে শিবপুর এলাকার যোগাযোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থল ছিলো পুটিয়া ব্রিজ। মূলত এই যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়ার জন্যেই পুটিয়া ব্রিজটি বিস্ফোরণে ধ্বংস করে মুক্তিযোদ্ধারা অপেক্ষা করতে থাকেন। তখনো পাক আর্মিরা সেখানে পৌঁছেনি। অনেকক্ষণ পর পাকবাহিনির বড়ো একটা দল সেখানে এসে মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হয়। যুদ্ধে তরুণ যোদ্ধা ফজলু নিহত হন। তিনি শিবপুরের প্রথম শহীদ।

হায়দার আনোয়ার খান জুনোর লেখা ‘একাত্তরের রণাঙ্গন : শিবপুর’ শীর্ষক গ্রন্থে উল্লেখ করেন। শিবপুরে বামপন্থী মুক্তিযোদ্ধাদের কয়েকটি বৈশিষ্ট্য সারাদেশে আলোচিত হয়েছিলো। শিবপুরে কোনো রাজাকার ছিলো না। দলমত নির্বিশেষে মান্নান ভূঁইয়ার নেতৃত্বে সবাই যুদ্ধ করেছিলো। যদিও তারা অন্যান্য এলাকায়ও যুদ্ধ করেছেন। পুরো শিবপুরকে মুক্তাঞ্চল ঘোষণা করা হয়েছিলো দীর্ঘ ৯ মাস পর। যুদ্ধ চলাকালীন শিবপুর এলাকায় কোনো ডাকাতি, ছিনতাই, চুরির ঘটনা ঘটেনি। মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষে কেউ জোরপূর্বক খাদ্য সামগ্রী ও নগদ তহবিল সংগ্রহ করেননি। ক্যাম্পগুলোতে মুক্তিযোদ্ধারা খাওয়া-দাওয়ার খুব কষ্ট করতেন। দলনেতা মান্নান ভূঁইয়া এসব কঠোর হস্তে দমন করে নিদের্শনা দিয়েছিলেন, “কোন ক্যাম্পের জন্য আলাদা ভাবে কিছু সংগ্রহ করা যাবে না। কেন্দ্রীয়ভাবে দেওয়া চাল, ডাল, তেল, নুনে চলতে হবে।” তাঁর  কঠোর মনোভাবের কারণেই এলাকার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হয়নি। গ্রাম্য কোন্দল, মারামারিও বন্ধ হয়ে গিয়েছিলো। ছোটোখাটো বিষয় মুক্তিযোদ্ধারাই মীমাংসা করতেন। বড়ো কোনো সমস্যা দেখা দিলে দলনেতা মান্নান ভূঁইয়া সমাধান করে দিতেন।

মান্নান ভূঁইয়া বাহিনির আরেকটি যুদ্ধ সংগঠিত হয়েছিলো চন্দনদিয়ায়। সেখানে হাবিলদার মজনু মৃধার দলের উপর পাকবাহিনি অর্তকিত হামলা চালায়। এই হামলায় মজনু মৃধা, আব্দুল আলী মৃধা, আমজাদ হোসেন, মানিক মিয়া, ইদ্রিস আলী, নজরুল ইসলামসহ অন্যান্য মুক্তিযোদ্ধারা হামলা মোকাবেলা করতে থাকেন। সেখানে বিভিন্ন পর্যায়ে তীব্র যুদ্ধ হয়। এতে পাকিস্তানি বাহিনির ৭ জন মারা গেলেও মান্নান ভূঁইয়া বাহিনির অনেক ক্ষয়-ক্ষতি হয়। মানিক ও ইদ্রিস শহীদ হন। আমজাদের পায়ে গুলি লাগে। নজরুল রাইফেলসহ পাকবাহিনির হাতে আটক হন।

মান্নান ভূঁইয়া বাহিনির এই সামান্য ক্ষতি পুষিয়ে নেয়া হয়েছিলো ভরতেরকান্দি অভিযানের সময়। নরসিংদী থেকে শিবপুর ও মনোহরদীর সাথে যোগাযোগ ব্যবস্থা অক্ষত রাখার জন্যে সেখানকার সেতুটি পাকবাহিনি সার্বক্ষণিক পাহারা দিতো। তাই একে ধ্বংস করে হানাদার বাহিনির নির্বিঘ্ন যাতায়াত বিঘ্ন করার জন্যে মান্নান ভূঁইয়ার নির্দেশে হাবিলদার মজনু মৃধার নেতৃত্বে একটি চৌকষ দল বাছাই করা হয়। তাঁদের হাতে তুলে দেয়া হয় দুটি এলএমজি, দুটি স্টেনগান, একটি এসএমজি, কয়েকটি রাইফেল এবং কয়েকটি হ্যান্ড গ্রেনেড ও গোলাবারুদ। নির্দেশ দেয়া হয় ভরতেরকান্দি ব্রিজটি উড়িয়ে দিতে। ব্রিজটি পাকিস্তানি বাহিনির কঠোর নজরদারিতে ছিলো। দু’পাশে ছিলো বাংকার। গোয়েন্দা তথ্যে জানা যায়, ভোর ৬ টার দিকে পাহারারত পাকসেনারা বাংকার থেকে বেরিয়ে এসে হাঁটাহাঁটি করে। এই সময় বাংকারের দু’দিক থেকে আক্রমণ করার পরিকল্পনা করা হয়। প্রথম আক্রমণেই চারজন পাকিস্তানি ধরাশায়ী হয়। এরপর পাকিস্তানিরা সেখান থেকে পালিয়ে যায়। পরে সেখানে ছয়টি মৃতদেহ পড়ে থাকে। বাংকার থেকে তিনটি চায়নিজ রাইফেল ও চার বাক্স গুলি উদ্ধার করা হয়। এরপর মান্নান বাহিনি বিস্ফোরকের সাহায্যে  ব্রিজটি ধ্বংস করে দেয়।

ভরতেরকান্দি ব্রিজ ধ্বংসের অপারেশনে একটি মর্মান্তিক হৃদয়স্পর্শী ঘটনার অবতাড়না হয়। হাবিলদার মজনু মৃধা ও হায়দার আনোয়ার খান জুনো সেখান থেকে ফিরে আসার সময় একজন পাক আর্মিকে সেখানে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় রাস্তায় পড়ে থাকতে দেখেন। প্রচুর রক্তক্ষরণ হচ্ছে। বাঁচার আশা না থাকলেও তাকে ধরাধরি করে পাশের একটি স্কুলঘরে নিয়ে যাওয়া হয়। তখন পাক আর্মি তাঁদের হাতে একটি পোস্টকার্ড তুলে দিয়ে বললো, “আমি জানি, আর বেশিক্ষণ বাঁচবো না। আমার একটা অনুরোধ, আমার বিবির কাছে এই পোস্টকার্ডটা পোস্ট করে দিও। আমার বিবি জানুক, আমি বেঁচে আছি।”

১২ ডিসেম্বর মুক্তিযোদ্ধারা নরসিংদীকে মুক্ত করেন। পরবর্তীতে টি এন্ড টি অফিসে অবস্থিত পাক আর্মির অফিসটি দখল করে সেখানে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উড়ানো হয়। টি এন্ড টি অফিসের ভেতর থেকে প্রচুর অস্ত্রশস্ত্র উদ্ধার করা হয়। থরে থরে  সাজানো রকেট লঞ্চার আর দুটি মর্টার, অনেক গোলাবারুদ আর গ্রেনেড। কিছুক্ষণ পর ভারতীয় বাহিনির হেলিকপ্টার নরসিংদীতে নামলো। অফিসারসহ ভারতীয় বাহিনির সদস্যরা টি এন্ড টি ভবনের অস্ত্রশস্ত্র ও গোলাবারুদ তাঁদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে যায়। শিবপুরে মান্নান ভূঁইয়া বাহিনিতে প্রায় ১৫০ জন মুক্তিযোদ্ধা ছিলো বলে ওয়ার্কার্স পার্টির প্রবীণ রাশেদ খান মেনন সূত্রে জানা গেছে। তিনি এক চিঠিতে তাঁদেরকে মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলেন।  চিঠির একাংশে উল্লেখ করেন, “মুক্তিযুদ্ধকালীন সর্ব সময় বর্তমান নরসিংদী জেলার শিবপুরে আমরা প্রধান কেন্দ্রস্থল করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ঘাঁটি স্থাপন করি। আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা বীরত্বের সাথে যুুদ্ধ করে শিবপুর অঞ্চলকে যুদ্ধের নয় মাস পুরোপুরিভাবে মুক্তি রাখে।” মান্নান ভূঁইয়ার নেতৃত্বে রাশেদ খান মেননসহ আরো অনেক বামপন্থী জাতীয় বীর দেশমাতৃকার টানে জীবন উৎসর্গ করার জন্যে প্রত্যয় গ্রহণ করেছিলেন।

বর্ষীয়ান বামপন্থী নেতা হায়দার আকবর খান রনো তাঁর আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থে উল্লেখ করেন, “২৭ মার্চ সকালে কাজী জাফর, রাশেদ খান মেনন, আমি, বিখ্যাত  চলচ্চিত্রকার জহির রায়হানের গাড়িতে করে ঢাকা ত্যাগ করি। শক্তিশালী কৃষক ঘাঁটিতে পৌঁছাই। গাড়িটি চালিয়ে নিয়ে যায় বীর মুক্তিযোদ্ধা হায়দার আনোয়ার খান জুনো। উল্লেখ্য, জহির রায়হান কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের পূর্ব বাংলা সমন্বয় কমিটির সদস্য ছিলেন। তিনি তার গাড়িটি মুক্তিযুদ্ধে ব্যবহারের জন্য আমাদের দান করেন। শিবপুরে আমরা হেডকোয়ার্টার করি। একই সঙ্গে বিভিন্ন কৃষক এলাকায় সশস্ত্র যুদ্ধ শুরু করার নিদের্শ দেই। কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের পূর্ব বাংলা সমন্বয় কমিটির অধীনের ১৪ টি মুক্ত আধামুক্ত এলাকা বা ঘাঁটি অঞ্চল গঠিত হয়েছিল। প্রায় ৩০ হাজার সশস্ত্র মুক্তিযোদ্ধা আমাদের নেতৃত্বে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। বাংলাদেশের ভেতর থেকেই। ১৯৮৫ সালে রাষ্ট্রীয়ভাবে ১৬ খণ্ডে প্রকাশিত বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও দলিলপত্রে এই সংখ্যাটি উল্লেখ আছে। ১৪ টি ঘাঁটি এলাকায়  মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা শতাধিক।”

হায়দার আকবর রনোর স্মৃতিচারণ থেকে আরো জানা যায়, সমন্বয় কমিটির অধীনস্থ ঘাঁটিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড়ো ঘাঁটি ছিলো শিবপুর, মনোহরদী, পলাশ, রায়পুরা ও নরসিংদীর কিয়দাংশ নিয়ে গঠিত বিস্তীর্ণ এলাকা। সেখানে আবদুল মান্নান ভূঁইয়ার নেতৃত্বে গঠিত  হয়েছিলো একধরনের পাল্টা প্রশাসন। শিবপুরের যুদ্ধে সরাসরি সামরিক কমান্ডার ছিলেন হাবিলদার মজনু মৃধা, হায়দার আনোয়ার খান জুনো ও মান্নান খান। মে মাসেই শিবপুরের অন্তর্ভুক্ত পুটিয়ার যুদ্ধে প্রথম শহীদ হন ১৪ বছরের কিশোর মানিক। কাজী সিরাজ এক লেখায় দাবি করেছেন, মান্নান ভূঁইয়া ছিলেন শিবপুর, মনোহরদী, বেলাব ও রায়পুরা অঞ্চলের প্রকৃত সেনাপতি। তিনি তখন কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের পূর্ব বাংলা সমন্বয় কমিটির অন্যতম নেতা। এই সংগঠনের প্রধান নেতা ছিলেন কাজী জাফর আহমেদ। অন্য কেন্দ্রীয় নেতারা ছিলেন রাশেদ খান মেনন, হায়দার আকবর খান রনো, মোস্তফা জামাল হায়দার প্রমুখ।  সেই সংগঠনের ১৪ টি ঘাঁটির মধ্যে শিবপুর ঘাঁটিটি ছিলো হেডকোয়ার্টার, যার সেনাপতি ছিলেন আবদুল মান্নান ভূঁইয়া। তিনি ২৫ মার্চ বিকেলে শিবপুরে জনসভা করে স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করেন। বঙ্গবন্ধুর পক্ষে মেজর জিয়ার কণ্ঠস্বর শোনার আগেই মান্নান ভূঁইয়া শিবপুরে মুক্তিযুদ্ধ শুরু করে দিয়েছিলেন। একই সঙ্গে যোদ্ধাদের সামরিক প্রশিক্ষণ দেয়া শুরু করেন। এক্ষেত্রে বামপন্থী মুক্তিযোদ্ধাদের ভরসার স্থল ছিলো শিবপুর, ভারত নয়। দেশে থেকে প্রশিক্ষণ শেষে অস্ত্রশস্ত্র সংগ্রহ করে মুক্তিযুদ্ধ করার জন্যে মান্নান ভূঁইয়া সবাইকে উৎসাহিত করতেন।

তখন বামপন্থী মুক্তিযোদ্ধাদের বাইরে যুদ্ধরত বেশ কয়েকটি গ্রুপ ছিলো। তার মধ্যে আওয়ামী লীগের গ্রুপটি ছিলো বৃহৎ। তাছাড়া পাঁচদোনার ন্যাভাল সিরাজের গ্রুপটি বিশেষভাবে আলোচিত ছিলো। তবে ন্যাভাল সিরাজ (বীর প্রতীক) খালেদ মোশাররফ ও মেজর হায়দার দ্বারা প্রভাবিত ছিলো বলে  তিনি বামপন্থীদের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন। যুদ্ধ জয়ের পর তিনি ন্যাপ (ভাসানী)-র রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু স্থানীয় নোংরা রাজনীতির শিকার হয়ে ১৯৭২ সালের সেপ্টেম্বরে নৃশংসভাবে খুন হন। শুধু ন্যাভাল সিরাজই নয়, যুদ্ধকালীন মান্নান ভূঁইয়ার বিরুদ্ধেও নানা ষড়যন্ত্র ও মিথ্যা প্রচারণা হয়েছিলো। ভিন্ন মতাবলম্বী মুক্তিযোদ্ধাদের কেউ কেউ রটিয়ে বেড়ায়, মান্না ভূঁইয়ার নেতৃত্বে নকশালরা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের হত্যা করছে। এই গুজবের কারণে মান্নান ভূঁইয়াকে হত্যারও পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিলেন কেউ কেউ। এই বিষয়ে হায়দার আনোয়ার খান জুনো তাঁর এক গ্রন্থে উল্লেখ করেন, “সেপ্টেম্বরের শেষের দিকেই বিএলএফ এর একটি দল শিবপুরে আসে মুক্তিবাহিনী বা এফএফ থেকে, এরা ছিল একটু ভিন্ন। মুক্তিবাহিনীর সদস্যদের প্রশিক্ষণ দিতেন বাঙালী সেনারা। কিন্তু বিএলএফ সদস্যরা প্রত্যক্ষভাবে ভারতীয় সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে ছিল। বিএলএফ এর ঐ দলের সঙ্গে ভারী অস্ত্রশস্ত্রও ছিল। তাদের উদ্দেশ্য ছিল মান্নান  ভূঁইয়াকে হত্যা করা। কিন্তু শিবপুরে এসে এবং কার্যক্রম দেখে তারা বুঝতে পারে, মান্নান ভূঁইয়াকে হত্যা করলে তারা কেউ অক্ষত অবস্থায় শিবপুর থেকে ফিরে যেতে পারবে না।”

হায়দার আনোয়ার খান জুনো ছিলেন শিবপুর মান্নান ভূঁইয়া বাহিনির সেকেন্ড ইন কমান্ড। তিনি তাঁর বইয়ে মান্নান ভূঁইয়া বাহিনির সদস্যদের একটি তালিকা দিয়েছেন এইভাবে : ন্যাভাল সিরাজ, মজনু মৃধা, মান্নান খান, ঝিনুক, আমজাদ, মিলন, ফজলু, বেনু, আফতাব, তোফাজ্জল হোসেন, তোফাজ্জল ভূঁইয়া, ইয়াসিন, ইদ্রিস, মানিক, মজিবুর রহমান, কফিল উদ্দিন, শাহ জাহান, শাহাবুদ্দিন, মিন্টু, সোলেমান, সিরাজ, হাবিবুর রহমান, সেন্ট আওলাদ, সাউদ ও ইকবাল প্রমুখ। তাঁদের  সঙ্গে ঢাকার বাসিন্দা শেখ কাদের ও কুমিল্লার সন্তান কাজী গোফরানও মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। যুদ্ধকালীন সার্বক্ষণিক শিবপুরে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন মান্নান ভূঁইয়া। তাঁকে অনুপ্রেরণা ও পরামর্শ দিতে সে-সময় শিবপুরে গেছেন কাজী জাফর আহমেদ রাশেদ খান মেনন, হায়দার আকবর খান রনো, জহির রায়হান, মোস্তফা জামাল হায়দার, লুৎফুন্নেসা বিউটি, মাহবুবা রশিদা চপল, শাহরিয়ার আখতার বুলু শিবপুরের হেডকোয়ার্টারের অন্তর্ভুক্ত মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে শহীদ হন ফজলু, ইদ্রিস, মানিক মিয়ার উদ্দিন, সাদেক ও ইব্রাহিম।

স্বাধীনতার পর আবদুল মান্নান ভূঁইয়া দেশ গঠনে মন দেন। সেজন্যে তিনি প্রথমে কৃষকদের ভাগ্য পরিবর্তনের কথা ভাবতে থাকেন। যারা মানুষের মুখে আহার যোগান, তাদের মুখেই খাদ্য জুটছে না। সঙ্গত কারণে মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে কৃষক আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন। কৃষক সমিতি প্রতিষ্ঠা করে এর শাখা সারা দেশে ছড়িয়ে দেন। তিনি দীর্ঘদিন মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে গঠিত কৃষক সমিতির সাধারণ সম্পাদকের পদ গ্রহণ করেছিলেন। ১৯৭৭ সালের দিকে ন্যাপ ভাসানী ও কৃষক সমিতি থেকে বেরিয়ে এসে কিংবদন্তীতুল্য কৃষক-শ্রমিক নেতা কাজী জাফর আহমদের ইউপিপিতে যোগদান করেন। তবে মান্নান ভূঁইয়ার রাজনৈতিক জীবনের ইউটার্ন হয়ে থাকবে ১৯৭২ সালে শিবপুরে অনুষ্ঠিত কৃষক সম্মেলনটি। মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বাধীন কৃষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে তাঁর রাজনৈতিক সক্ষমতা প্রমাণিত হয়েছিলো সেই কৃষক সম্মেলনের মাধ্যমে, যা সংবাদপত্রে প্রকাশিত হলে নরসিংদী এলাকা ছাড়াও নারায়ণগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, গাজীপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও ময়মনসিংহ এলাকায় চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়। সম্মেলনটি সফল করার জন্যে বেশ কয়েকটি প্রস্তুতি সভা হয়, যাতে প্রতিদিন দেড়-দুই হাজার কৃষক উপস্থিত থাকতেন। ১৯৭২ সালে ২৯ ও ৩০ এপ্রিল দুইদিনব্যাপী সেই সম্মেলনে ব্যাপক প্রস্তুতি নেয়া হয়েছিলো। সেখানে লাখ লাখ কৃষক উপস্থিত হয়েছিলো বলে সংবাদপত্রে লেখা হয়। ২৯ এপ্রিল মওলানা ভাসানী দীর্ঘক্ষণ বক্তব্য রেখেছিলেন, যা ‘তোমরা প্রস্তুত হও’ শিরোনামে বুকলেট হিসেবে ছাপা হয়। সেখানে ভাসানী বলেন, “বাংলার কৃষক! তোমরা প্রস্তুত হও, দুনিয়ার নিপীড়িত মানুষ, দুনিয়ার মজলুম মানুষ, দুনিয়ার নির্যাতিত মানুষ, শোষিত মানুষকে তোমরা মুক্ত কর। আমরা মুক্ত করবোই করব। শুধু বাংলাদেশের কৃষকদের জন্য আমরা কৃষক সমিতি গঠন  করিনি। শুধু বাংলাদেশের কৃষকদের মুক্তির জন্য কৃষক সমিতি গঠিত হয়নি। শুধু বাংলার মানুষের জন্য বাংলার কৃষক সমিতি  গঠন করা হয়নি। দুনিয়ার কৃষক, দুনিয়ার মজলুম মানুষের জন্য বাংলার কৃষক সমিতি গঠন করা হয়েছে।”

শিবপুরের কৃষক সম্মেলনে ভাষণ দিচ্ছেন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, ১৯৭২

 

৩০ এপ্রিল ঐতিহাসিক কৃষক সম্মেলনে লাখ লাখ কৃষক, শ্রমিক, মেহনতি মানুষের উদ্দেশ্যে মওলানা ভাসানী বলেন, “আজ আমাদের সর্বপ্রধান দায়িত্ব ও কর্তব্য হলো লক্ষ লক্ষ মানুষের রক্ত দিয়ে, জীবন দিয়ে, মা বোনের ইজ্জত দিয়ে যে স্বাধীনতা আপনারা অর্জন করেছেন, সে স্বাধীনতা ঠিকভাবে রক্ষার জন্য গোটা বাংলাদেশের মানুষ, কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র-যুবক, কামার-কুমার, জেলে-তাতী, পিয়ন, আর্দালী সর্বস্তরের নিপীড়িত মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়ে আওয়াজ তুলুন, আগামী ১৬ মে তারিখে আওয়ামী লীগ সরকার যে শাসনতন্ত্র আপনাদের সামনে পেশ করবে, আপনাদের জন্য তৈরি করে পাঠাবে, এই সভা থেকে আমি জানিয়ে দিচ্ছি, শেখ মুজিবুর রহমান, গণতন্ত্রের নিয়মে যারা সংখ্যাগরিষ্ঠ, যারা সংখ্যায় বেশি, তারাই দেশ শাসন করবে, তারাই দেশ পরিচালনা করবে। এই দেশের  কৃষক-মজুরের সংখ্যা শতকরা ৯৫ ভাগ। তারাই এদেশের শাসক হতে পারে।” শিবপুরের কৃষক সম্মেলনে প্রস্তুতি কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন আবদুল মান্নান ভূঁইয়া। তিনি মওলানা ভাসানীর পর গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে সম্মেলনে বক্তব্য রেখেছিলেন। তাঁর বক্তব্যের একটি ছাপা বুকলেট সম্মেলনস্থলে বিতরণ করা হয়েছিলো। বক্তব্যে তিনি বলেছিলেন, “স্বাধীনতার অগ্রনায়ক মজলুম জনতার নির্ভীক সেনানী, কৃষকের নয়নমণি মওলানা ভাসানী নব্বই বছর বয়সেও এতো দূরে, শিবপুরে এসে আজিকার এই সম্মেলনের সভাপতির আসন গ্রহণ করে আমাদেরকে গৌরবান্বিত করে তুলেছেন। এ গৌরব শুধু আমাদের সংগঠনেরই নয়, এ গৌরব সমগ্র শিবপুরবাসীর। তিনি তাঁর সারা জীবনের অভিজ্ঞতা ও প্রখর দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে বর্তমান পর্যায়ের কৃষক আন্দোলন সম্পর্কে যে বক্তব্য দিয়েছেন, তারই ভিত্তিতে এই সম্মেলন রচনা করবে আগামী দিনের কাজের ধারা। বাংলাদেশের মহান নেতা মওলানা ভাসানীকে আমরা জানাই বিপ্লবী অভিনন্দন। শিবপুরবাসী তাঁকে জানায় তাদের প্রাণঢালা ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা।”


আপেল মাহমুদ
সাংবাদিক, গবেষক ও দুষ্প্রাপ্য গ্রন্থ সংগ্রাহক

পাগল দ্বিজদাস, তাঁর উত্তরসুরী ও কবিগানের পরম্পরা

লোকসঙ্গীতের সমৃদ্ধ ভাণ্ডার ভাটির দেশ নিয়ে আমার দীর্ঘদিনের একটা কৌতূহল ছিলো। সেই কৌতূহলটা যে এখন আমার মিটে গেছে, তেমন নয়। তবে একটা প্রশ্নের জবাব আমি পেয়েছি সেখানকার লোকসঙ্গীতের কয়েকজন কিংবদন্তীর জবানবন্দী থেকে। ভাটির দেশ খ্যাত সুনামগঞ্জ, নেত্রকোণা ও কিশোরগঞ্জের কিয়দংশ ঘিরে এতো সমৃদ্ধ কবি-মালজোড়া গান, বাউল, জারি-সারি, ভাটিয়ালি ও বিচ্ছেদ গানের উর্বরভূমি কীভাবে গড়ে ওঠলো? এমন প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে আমি অবিভক্ত বাংলার লোকসঙ্গীতের কিংবদন্তী হেমাঙ্গ বিশ্বাসের (১৯১২-১৯৮৭) লেখা ‘উজান গাঙ বাইয়া’ গ্রন্থটি সংগ্রহ করি। বইটি পড়ে জানতে পারি, তাঁর সঙ্গীতের মূল অনুপ্রেরণা হলেন পাগল দ্বিজদাস ও তাঁর শিষ্য হরিচরণ আচার্য্য। তাঁদের কবিগান শুনে ছেলেবেলায় তিনি মাতোয়ারা হয়ে ওঠেছিলেন। তাঁদের গানে বুঁদ হওয়ার পথ থেকে আমৃত্যু ফিরতে পারেননি।

তাঁর স্মৃতিচারণ থেকে জানা যায়, খুব ছোটোবেলায় পূজা ছিলো তাঁর আনন্দের অন্যতম সঙ্গী। সে-সময় তাঁদের জমিদার বাড়ির নাটমন্দিরে পাগল দ্বিজদাস আর হরিচরণ আচার্য্যরে কবিগান ছিলো অন্যতম আকর্ষণ। কবিয়ালরা পানসি নৌকায় চড়ে পূজার সময় তাঁদের বাড়িতে এসে গান গাইতেন। দোহারা-নট্ট সহকারে তারা যখন বাড়িতে আসতেন, তখন পুরো হবিগঞ্জ জুড়ে হৈচৈ পড়ে যেতো। হাজার হাজার মানুষ কবিগান শুনতে আসতেন। এদের শিডিউল ঠিক রাখার জন্যে পূর্ব থেকেই জমিদার হরকুমার বিশ্বাস বায়না করে রাখতেন।

কবিয়াল দ্বিজদাস ছিলেন একজন তাত্ত্বিক ব্যক্তি। তিনি গান গাওয়ার চেয়ে কবিগান রচনা, কবির জবাব, টপ্পা প্রভৃতি রচনায় ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী। প্রচ্ছন্ন কবি হিসেবে গানের আসরে তিনি অনেক টপ্পা, গান মুখে মুখে রচনা করে দিতেন। তিনি যার পক্ষে থাকতেন, সেই কবিয়াল গানের আসর মাত করতে পারতেন। যার কারণে অবিভক্ত বাংলায় তাঁর কদর ছিলো সবচেয়ে বেশি। অনেক কবিয়াল দিনের পর দিন তাঁর কাছে বসে থাকতেন গান কিংবা টপ্পা লিখে নেয়ার জন্যে। বাস্তবে দেখা গেছে, যে-কবিয়াল যতো বেশি দ্বিজদাসের কাছ থেকে টপ্পা ও গান লিখিয়ে নিতে পারতেন, তিনি গানের আসর ততো মাত করতে পারতেন। এর জলজ্যান্ত উদাহরণ হলেন অবিভক্ত বাংলার সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ কবিয়াল হরিচরণ আচার্য্য কবিগুণাকর (১৮৬১-১৯৪১)। তিনি নিজে একজন প্রতিভাবান ও দক্ষ কবিয়াল ছিলেন। এর সঙ্গে গানের গুরু দ্বিজদাসের লেখা গান, জবাব ও টপ্পা যোগ করে তিনি প্রতিটি আসর মাতিয়ে তুলতেন। ডাকছড়া গেয়ে দর্শক শ্রোতাদের মন জয় করে নিতেন।

পাগল দ্বিজদাস নিয়ে বাউল সম্রাট শাহ আবদুল করিম (১৯১৬-২০০৯) চমৎকার একটা মূল্যায়ন করেছেন। সিলেটের খ্যাতনামা সাংবাদিক ও লোকগবেষক সুমন কুমার দাশ ভাটির লোকসঙ্গীত নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করেছেন। এই সংক্রান্ত তাঁর অনেকগুলো গবেষণা গ্রন্থ রয়েছে। দ্বিজদাসের গান নিয়েও তাঁর গবেষণা রয়েছে। সেখানে তিনি সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন, শাহ আবদুল করিম পাগল দ্বিজদাসের গানের অত্যন্ত অনুরক্ত ছিলেন। তাঁর সঙ্গীত জীবনে দ্বিজদাসের প্রভাব উল্লেখযোগ্য। তিনি তাঁর গান গেয়ে আসর জমাতেন। ভাটির দেশের বিভিন্ন স্থানে পাগল দ্বিজদাসের অসাম্প্রদায়িক ও মানবতাবাদী সঙ্গীতের প্রভাব ছিলো প্রকট। তাঁর লেখা গান ছিলো দর্শক-শ্রোতাদের কাছে লোভনীয়। ভাটির দেশে কোথাও তাঁর গান হলে নানা স্থান থেকে সেখানে হাজার হাজার দর্শক হাজির হতেন। সেটা আর কোনো কবিয়াল বা শিল্পীর ক্ষেত্রে ঘটেনি। শাহ আবদুল করিম গান রচনার আগে, শিল্পী জীবনের প্রথমদিকে, দ্বিজদাসের গান গেয়ে গ্রাম্য আসর থেকে শুরু করে সারস্বত সমাজ মাত করেছিলেন। শাহ করিমের উত্থানের পেছনে দ্বিজদাসের গান যে জাদুর মতো কাজ করেছিলো, সেটা করিম বিভিন্ন আলোচনা, বিতর্ক কিংবা সাক্ষাতকারে নির্মোহভাবে স্বীকারোক্তি দিয়েছেন।

ভাটির দেশের আরেক কালজয়ী সঙ্গীতজ্ঞ দূরবীন শাহ (১৯২০-১৯৭৭) ছিলেন পাগল দ্বিজদাসের গানের অনুরক্ত। তিনিও শাহ করিমের মতো বিভিন্ন আসরে দ্বিজদাসের গান গাইতেন। তাঁর গান গাইতে গাইতেই দূরবীন শাহ একসময় বাউল সাধক হয়ে ওঠেন। দূরবীনের ছেলে আলম শাহ সুমন কুমার দাশের সঙ্গে এক সাক্ষাতকারে বলেছেন, তাঁর বাবা পাগল দ্বিজদাসের অনুসারী ছিলেন। দ্বিজদাসের গান তাঁর নমস্য ছিলো। তাঁর গানের খাতায় নিজ হাতে দ্বিজদাসের কিছু গান লিখে রেখেছিলেন। তিনি পাগল দ্বিজদাসকে গানের মুর্শিদ হিসেবে গণ্য করতেন।

মালজোড়া গানের জন্ম ভাটির দেশ নেত্রকোণা ও সুনামগঞ্জের বিভিন্ন বাউল ও লোকসঙ্গীত শিল্পীদের মাধ্যমে। শুধু সিলেট-সুনামগঞ্জ অঞ্চলেই নয়, নেত্রকোণা-কিশোরগঞ্জ এলাকায় মালজোড়া গানের যে-প্রভাব-প্রতিপত্তি, সেখানেও পাগল দ্বিজদাসের প্রভাব প্রকট ছিলো। সেখানকার কিংবদন্তীতুল্য বাউল রশিদ উদ্দিন (১৮৮৯-১৯৬৪), উকিল মুন্সি (১৮৮৫-১৯৭৮) ও জালাল খাঁ (১৮৯৪-১৯৭২) প্রমুখ ছিলেন পাগল দ্বিজদাসের গুণমুগ্ধ। একসময় নেত্রকোণা ও কিশোরগঞ্জের আনাচে-কানাচে শিল্পীরা পাগল দ্বিজদাসের গান গাইতেন। অনেক শিল্পী-গীতিকার তাঁর গানে উদ্বুদ্ধ হয়ে সেই ঘরানায় অনেক গান লিখেছেন। নেত্রকোণার বাউল সুনীল কর্মকার আর সালাম সরকাররা এখনো দ্বিজদাসের গানকে প্রাসঙ্গিক করে তুলেছেন। সেখানকার অত্যন্ত গুণীজন উকিল মুন্সি, রশিদ উদ্দিন আর জালাল খাঁর অসংখ্য কালজয়ী গান থাকার পরও পাগল দ্বিজদাসের গানের মূল্য আকাশচুম্বি। অনেক নবীন শিল্পীর গানের খাতা নিরীক্ষা করলে দু-চারটা দ্বিজদাসের গান পাওয়া যাবে। বাউল, কবিগান, মুর্শিদী ও ভাটিয়ালি গানের তাত্ত্বিক পুরুষ হিসেবে তাঁরা দ্বিজদাসের গানকে সর্বাগ্রে স্থান দিয়ে থাকেন। পাগল দ্বিজদাসের পারিবারিক নাম শ্রী বৈকুণ্ঠনাথ চক্রবর্তী (১২৫২-১৩৪২ বঙ্গাব্দ)। পাগল দ্বিজদাস তার কবিনাম। এই নামের ভনিতায়ই তিনি গান রচনা করতেন। কোনো কোনো ঐতিহাসিক মনে করেন, বৈকুণ্ঠনাথ চক্রবর্তী শিবপুরস্থ যোশর পাদরী এস্টেটের নায়েব হিসেবে চাকুরি করতেন। এই পাদরী এস্টেটটি ছিলো নাগরী খ্রিস্টানপল্লী পর্তুগীজ জমিদারির একটি অংশ। তিনি সেই জমিদারির একজন নায়েব হয়ে কৃষকের পক্ষে গান লিখতেন।

দ্বিজদাসের জন্মস্থান পারুলিয়া গ্রাম ছিলো প্রাচীন ব্রহ্মপুত্র নদের তীরবর্তী একটি সমৃদ্ধ গ্রাম। অনেক ভাবুক, সাধক, পণ্ডিত ও ইংরেজি শিক্ষিত লোকের বাস ছিলো সেখানে। প্রাচীনকালে টোল-চতুষ্পাঠীর জন্যে পারুলিয়ার নাম বিক্রমপুর, নদীয়া, কমলাকান্ত (কুমিল্লা), বোয়ালিয়া (রাজশাহী) প্রভৃতি স্থানের সঙ্গে তুলনীয় ছিলো। তেমন টোল-চতুষ্পাঠীতেই পাগল দ্বিজদাস প্রাথমিক পড়াশোনা শেষ করেন। ছোটোবেলা থেকেই তিনি ভাবুক প্রকৃতির মানুষ ছিলেন। একাডেমিক শিক্ষা বাদ দিয়ে তিনি প্রকৃতি, স্রষ্টা, সৃষ্টি রহস্য, রূপবৈশিষ্ট্য, সমাজ-সংস্কৃতি, জন্ম-মৃত্যু, রোগ-শোক ও মনুষ্য জগতের বিচিত্র ঘটনাবলি নিয়ে ভাবতে থাকেন। একপর্যায়ে আধ্যাত্মিক সাধনায় নিয়োজিত হয়ে ইহলোক-পরলোক নিয়ে গভীর ভাবনায় নিয়োজিত হন। এটাকে পূর্ণাঙ্গতা দিতে তিনি বাড়ির পাশে উঁচু ঢিবিতে গড়ে তোলেন ‘শক্তিমঠ’ নামে একটি আধ্যাত্মিক সাধনা কেন্দ্র। তা একসময় সারা ভারতবর্ষের খ্যাতিমান কেন্দ্রে পরিণত হয়। বিভিন্ন স্থান থেকে সাধক, বাউল, আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব, ধার্মিক, পণ্ডিত প্রমুখরা সেখানে গিয়ে আশ্রয় নেন। তাঁদের সাধন-ভজন ও থাকা-খাওয়ার জন্যে তিনি বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ করে দেন। আশ্রমের আদলে মাটির ঘর আর গাছ-গাছালি আবৃত ‘শক্তিমঠ’ ভাবুকদের কাছে ‘শান্তিনিকেতন’ হয়ে ওঠে। পারুলিয়ার চক্রবর্তী বংশ সে-সময় ধনে-মানে বেশ সম্পদশালী। তাই দ্বিজদাস শক্তিমঠের খরচ যোগাতেন তালুকদার তহবিল থেকে। দেশি-বিদেশি অনেক আধ্যাত্মিক সাধক, সাধু-সন্ন্যাসী শক্তিমঠে অবস্থান করে সাধন-ভজন করতেন। যেখানে ধর্মীয় শাস্ত্র, অঙ্ক, জ্যোতিষশাস্ত্র, সংস্কৃত শ্লোক, স্রষ্টা, সৃষ্টিতত্ত্ব ও জীবন-মৃত্যুর রহস্য বিষয়ক শিক্ষা দেয়া হতো। সেখানেই পাগল দ্বিজদাস আধ্যাত্মিক জ্ঞানচক্ষু লাভ করেন। সাধনার মাধ্যমে সৃষ্টি-স্রষ্টার রহস্য, জন্ম-মৃত্যুতত্ত্ব নিয়ে চিন্তা-ভাবনার খোরাক পান। একই সঙ্গে সঙ্গীত রচনা শুরু করেন। সঙ্গী হিসেবে পান শ্রী জ্ঞানানন্দ গোস্বামী নামে আরেক পণ্ডিতকে। তিনি পারুলিয়া তথা নরসিংদী এলাকার মানুষ ছিলেন না। পণ্ডিতের ভিটা নামে খ্যাত চট্টগ্রামের পটিয়া থেকে তিনি পাগল দ্বিজদাসের ডাকে সাড়া দিয়ে পারুলিয়ায় চলে এসেছিলেন। তাঁকে স্থানীয়ভাবে দ্বিজদাসের দক্ষিণহস্ত হিসেবে গণ্য করা হতো।

জ্ঞানানন্দ গোস্বামী প্রথমে শক্তিমঠের কর্মাধ্যক্ষ হিসেবে কাজ শুরু করেন। পরে শক্তিমঠের পাশাপাশি সেখানে ‘শ্রীকৃষ্ণ পাঠশালা’ নামে একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন দ্বিজদাস। তাঁকে সার্বিকভাবে সহযোগিতা করেন জ্ঞানানন্দ গোস্বামী। সঠিকভাবে শক্তিমঠ ও শ্রীকৃষ্ণ পাঠশালা প্রতিষ্ঠার সময়কাল জানা না গেলেও পাঠশালাটি ইংরেজি স্কুল হিসেবে ঘোষিত হয় ১৯৩৩ খ্রিস্টাব্দে। বর্তমানে শ্রীকৃষ্ণ পাঠশালা নামটি পুরোনো দলিল-দস্তাবেজ ছাড়া আর কোথাও পাওয়া যায় না। উঁচু টিলার উপর শ্রীকৃষ্ণ পাঠশালার জায়গায় সাইবোর্ড উঠেছে পারুলিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের। একই সঙ্গে শক্তিমঠটি মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেয়া হয়েছে। পারুলিয়ার অনেক শিক্ষিত ও গুণীজনের সঙ্গে কথা বলে এই ধ্বংসযজ্ঞের কারণ জানতে পারিনি। এমনকি পাগল দ্বিজদাসের বাড়িঘর কীভাবে প্রভাবশালী মহলের কব্জায় চলে গেছে, সে-বিষয়ে মুখ খোলার কাউকে পাওয়া যায়নি। এতোকিছুর পরও পাগল দ্বিজদাসকে দুনিয়া থেকে একেবারে মুছে ফেলা সম্ভব হয়নি। উত্তরসুরীদের মাধ্যমে তাঁর গান, পদ, ছড়া, মালসী ও ডাক বাংলার আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে রয়েছে। অনেকের হৃদয়ে রাখা আছে দ্বিজদাসের গান। সেখান থেকে তা বের করে এনে আর ধ্বংস করা যাবে না। পাগল দ্বিজদাস ছিলেন একজন যুক্তিবাদী, বস্তুবাদী মানবিক মানুষ। তাঁর গানের মাধ্যমে সেটাই প্রমাণিত হয়। সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব বিষয়ক অনেক গান রচনা করে তিনি বিষয়টিকে এক রহস্যময় বিষয় করে তুলেছেন। যুক্তিবাদকে তিনি বুকে ধারণ করে অসংখ্য গান লিখেছেন। যার সিংহভাগই হারিয়ে গেছে। যা অক্ষত আছে, সেটা টিকিয়ে রাখার কৃতিত্ব হলো শক্তিমঠের কর্মাধ্যক্ষ জ্ঞানানন্দ গোস্বামীর। তিনি প্রথমবার দ্বিজদাসের গানগুলো সংকলনের উদ্যোগ গ্রহণ করেন ১৯২৪ খ্রিস্টাব্দে। ‘শক্তিমঠ গ্রন্থমালা-১’ নামে তিনি প্রথমবার ১৭৫ টি গান সংকলন করেন সেই বইয়ে। বইয়ের আখ্যাপত্রে উল্লেখ করা হয় :

পাগল
দ্বিজদাসের গান।

শ্রীযুত বৈকুণ্ঠনাথ চক্রবর্ত্তী
বিরচিত

প্রথম সংস্করণ

প্রকাশক—
ব্রহ্মচারী শ্যামানন্দ।
পো. : পারুলিয়া, ঢাকা।
১৩৩২।

সর্ব্বস্বত্ব সুরক্ষিত       মূল্য— পাঁচ সিকা।

Printed by Gopal Chandra De
at The Hena Press, Lakshmibazar,
Dacca.

পাগল দ্বিজদাসের গান’ বইয়ের ভূমিকা লিখেছেন জ্ঞানানন্দ। আসলে এই নামটি শক্তিমঠের কর্মাধ্যক্ষ জ্ঞানানন্দ গোস্বামী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তিনি সংক্ষেপে নাম লিখতেন জ্ঞানানন্দ। ভূমিকায় তিনি লিখেন :

আমি কবি অথবা গায়ক নহি। সুতরাং গানের ভাল-মন্দ বিচার করিবার অধিকার আমার নাই। তবে কবি অথবা গায়েকরা যে গান রচনা করেন, তাহা শুধু তাঁদের নিজেদের জন্য নহে, আমাদের সকলের। এই ভরসাতেই সাধারণ জ্ঞানের দিক দিয়া আজ দ্বিজদাসের গান সম্বন্ধে দু’ একটি কথা বলিব।
প্রথমেই বলিয়া রাখি, পারুলিয়ার স্বনামধন্য শ্রীযুত বৈকুণ্ঠনাথ চক্রবর্তী মহাশয় নিজেকে দ্বিজদাস পরিচয় দিয়া এই গানগুলি রচনা করেন। মহা-পাগলেরাই এমন করিয়া নিজের নামের আকাঙ্ক্ষাকে কাজের পশ্চাতে লুকাইয়া রাখিতে চাহে। তাই প্রকাশক দ্বিজদাসকে পাগল খেতাব দিয়াছেন। পৃথিবীর মহাপ্রাণ ব্যক্তিদের আর এক নাম পাগল।
‘দ্বিজ-দাসের গান’ বাঙ্গলার পূর্ব্ব প্রান্তে বহু পূর্ব হইতে প্রচলিত। বাউল সম্প্রদায়ের অনেকেই এই গান গাহিয়া দেশ দেশান্তরে ভিক্ষা সংগ্রহ করে। অধিকাংশ গানের বর্ণিত ঘটনা সমূহ কবি বৈকুণ্ঠনাথের নিজের জীবনের উপর দিয়া ঝড়ের ন্যায় বহিয়া গিয়াছে বলিয়াই গানগুলি এমন করিয়া ফুটিয়া উঠিয়াছে। ঘটনার স্রোতের সহিত কবি আপনাকে ভাসাইয়া দিতে পারিয়াছিলেন বলিয়াই আজ ঐ গানে উন্মাদনা আসে, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ অনুভূতির তরঙ্গ-সঙ্গে নিজে নৃত্য করিতে পারিয়াছিলেন বলিয়াই আজ ঐ গান মর্ম স্পর্শ করে। সমাজ, ধর্ম ও দেশের আকুলতায় কবি নিজে ব্যাকুল হইয়া গাহিয়াছিলেন বলিয়াই আজ ঐ গানে চোখে জল আসে, ঘন ঘন রোমাঞ্চ হয়, পলকে পলকে পুলক জন্মে। এক কথায় বৈকুণ্ঠনাথের গান তাঁর কর্ম ও অনুভূতির উলঙ্গ বিকাশ। বৈকুণ্ঠনাথ চিরকাল খেয়ালে চলিয়াছেন। তাই যখন যাহা সত্য বলিয়া বুঝিয়াছেন, জন-মতের অপেক্ষা না করিয়াও তাহা নির্ভয়ে প্রকাশ করিয়াছেন। তাঁর প্রাণের ও গানের এই সারল্যে আমি মুগ্ধ। তাঁর ধর্মমত মহান, উদার। নিদর্শনÑ ‘হরি কি কালী বলা ভুল’। সমাজ-মত সঙ্কীর্ণতা-রহিত। পরোপকার তাঁর দৈনিক ব্রত। তাঁর গানে বাঙ্গালার তথা বাঙ্গালীর খাঁটি প্রাণের স্পন্দন পাওয়া যায়।
‘দ্বিজ-দাস’ বৈকুণ্ঠনাথ আজও জীবিত। বয়স প্রায় আশীর কাছাকাছি। অদ্যাপি চশমার প্রয়োজন হয় না। শিশুকালে মাতৃ-হীন, পিতার দুলাল ছিলেন। তথাপি তাঁকে জীবন সংগ্রামে বুঝিতে হইয়াছিল যে, ‘মানুষ মনীব ভয়ানক জীব’। সংসারে তাঁর দুই গৃহিণী, আজও সমভাবে বর্ত্তমান। আত্মজ পুত্র নাই, দত্ত্ক গ্রহণে পিন্ড রক্ষার বন্দোবস্ত করিয়াছেন। সংসারকে হাড়ে হাড়ে চিনিবার মতন সকল সুযোগই তাঁর ছিল। তাই তিনি বুঝিয়াছেন ‘ধনী আর রমণী জীবন্তে খায় প্রাণ’। বৈকুণ্ঠনাথ জীবনে অনেক উপার্জন করিয়াছেন, ব্যয়ও যথেষ্ট করিতেন। তাঁর অন্নে অনেক গরীব পরিবার প্রতিপালিত হয়।
‘পারুলিয়া শক্তিমঠ’ তাঁর শেষ জীবনের একটা উল্লেখযোগ্য অনুষ্ঠান। মঠের অধিকাংশ ভূমি বৈকুণ্ঠনাথের দান।
বৈকুণ্ঠনাথ দ্বিজের সেবায় আত্মপ্রসাদ লাভ করেন। তাই তিনি স্বেচ্ছায় ‘দ্বিজ-দাস’ নামে আত্ম-পরিচয় দিয়াছেন।
কবি বা গায়কের রচিত গানের বইয়ের ভূমিকায় রচয়িতার সংক্ষিপ্ত জীবন-কথা আনুষঙ্গিক না হইলেও নিতান্ত অপ্রাসঙ্গিক নহে। বিশেষত: আত্ম-গোপন পটু ‘দ্বিজ-দাস’ বৈকুণ্ঠনাথ যে আজ নিজের রচিত গীতি-মাল্যে ভূষিত হইয়া হাতে হাতে ধরা পড়িলেন, ইহাতেই আমার আনন্দ।
নানা কারণে বইখানা অত্যন্ত ক্ষিপ্রতা সহকারে প্রকাশিত হয়। ফলত: অনেক স্থলে গ্রাম্যতা-দুষ্ট শব্দগুলির পরিবর্তন ঘটিয়া উঠে নাই। স্থানে স্থানে মুদ্রাকর-প্রমাদও রহিয়া গিয়াছে। তথাপি প্রার্থনা করি, ‘পাগল দ্বিজদাসের গান’ বাঙ্গালার প্রতি পল্লী বাট মাতাইয়া তুলুক, রাজপথ মুখরিত করুক, ঘরে ঘরে বিরাজিত হোক।

‘শক্তিমঠ’।                   ইতি—
তারিখ— মহাকাল।         শ্রীনারায়ণে—
তিথি— মহামায়া।           জ্ঞানানন্দ

১৯৮১ খ্রিস্টাব্দে ঢাকার সালমা বুক ডিপো থেকে ‘পাগল দ্বিজদাসের গান’ বইটির একটি সস্তা সংস্করণ বের করা হয়। এতে প্রথম সংস্করণের ৩৩ টি গান বাদ দেয়া হয়। তবে এই সস্তা সংস্করণে নতুন করে ৪ টি গান সংযুক্ত করা হয়। এসব অসঙ্গতি কিছুই সালমা বুক ডিপোর সংস্করণে বলা হয়নি। ১২ টাকা মূল্যের নিউজপ্রিন্টের ছাপা বইটিতে দ্বিজদাস সম্পর্কে কিছুই বলা হয়নি। তবে পশ্চিমবঙ্গ থেকে ২০১২ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত ‘বাউল-ফকির উৎসব কমিটি’ কর্তৃক ‘পাগল দ্বিজদাসের গান’ বইটি ১৯২৪ খ্রিস্টাব্দে পারুলিয়া শক্তিমঠ থেকে প্রকাশিত বইয়ের অনুরূপ। প্রথম সংস্করণের দাঁড়ি-কমা পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গের বইয়ে অনুসরণ করা হয়েছে। এই বইয়ের ভূমিকা থেকে জানা যায়, পাগল দ্বিজদাসের পৌত্রী ছিলেন শ্রী লক্ষ্মী চক্রবর্তী। তারই ছেলে গৌতম চক্রবর্তী প্রথম সংস্করণটি বাউল-ফকির উৎসব কমিটির হাতে তুলে দিয়েছিলেন। লক্ষ্মী চক্রবর্তী বইটি পেয়েছিলেন তাঁর কাকিমা মায়া চক্রবর্তীর কাছ থেকে। এতে বোঝা যায়, পাগল দ্বিজদাসের বংশধররা পারুলিয়া ছেড়ে ভারতের কোচবিহার গিয়ে বসতি স্থাপন করার সময় সর্বস্ব হারালেও পূর্বপুরুষদের মেধার সৃষ্টি স্বরচিত বইটি যক্ষের ধনের মতো বুকে লালন করেছিলেন। যার কারণে একশত বছরের পুরোনো সেই মহামূল্যবান দলিলটি নতুন করে প্রকাশিত হয়েছে। সেই মহামূল্যবান দলিলের ভূমিকায় পার্থ মজুমদার উল্লেখ করেন, “নরসিংদী তার বাউলদের জন্য বিখ্যাত। পাগল দ্বিজদাস সেখানকারই লোক আর তাঁর গান বহুকাল ধরে বাউলদের মুখে মুখে ফিরছে। তিনি কখনো আসরে গান গাইতে যেতেন না। জমিদারী সেরেস্তার কর্মাধ্যক্ষ হিসাবে কাজ সামলাতেন আর পদ রচনা করতেন। সেই পদ বাউলদের মুখে মুখে সারা বাঙলায় ছড়িয়ে পড়েছে। এখানে উল্লেখ্য, পাগল দ্বিজদাস তাঁর সাংসারিক জীবনে দুটি বিয়ে করেছিলেন। কিন্তু তাঁর ঔরসজাত কোনো সন্তান ছিলো না। তিনি একজন পুত্রসন্তান দত্তক নিয়েছিলেন। ধারণা করা যায়, লক্ষ্মী চক্রবর্তী তারই মেয়ে।

পশ্চিমবঙ্গ থেকে প্রকাশিত বইয়ের সংস্করণে একটি চিঠি ছাপা হয়, যা লিখেছিলেন আইনসভার সদস্য ও ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট রায়বাহাদুর গিরিশচন্দ্র নাগ। তিনি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ছাত্রী লীলা নাগের বাবা। তিনি ম্যাজিস্ট্রেসি জীবনের উপর ভিত্তি করে লিখেছিলেন ‘ডেপুটি জীবন’ গ্রন্থটি। তিনি পাগল দ্বিজদাসের গান শোনার সৌভাগ্য অর্জন করেছিলেন। যার প্রতিক্রিয়াস্বরূপ তিনি দ্বিজদাসকে চিঠিটি দিয়েছিলেন। যা তাঁর পালকপুত্রের বংশধরদের কাছে সংরক্ষিত ছিলো। চিঠিটি নিম্নে উল্লেখ করা প্রাসঙ্গিক মনে করছি।

শ্রীচরণকমলেষু—
আজ একটি বিষয় আপনাকে লিখিতে ইচ্ছা হইল। আপনাকে অযথা তোষামোদ করিবার অভিপ্রায়ে নয়, আপনার গুণাবলীর কথা মনে হওয়াতেই লিখিতেছি।
কয়েক মাস পূর্বে আমি ‘ঢাকা শক্তি ঔষধালয়ের’ অধ্যক্ষ শ্রীযুক্ত মথুরা মোহন চক্রবর্তী মহাশয়ের স্বামীবাগের কারখানায় বাৎসরিক উৎসবে নিমন্ত্রিত হইয়া তথায় গিয়াছিলাম। সেখানে বাউল সঙ্গীত হইতেছিল। একদল বাউল গায়ক বড় মনোহর দেহতত্ত্ব বিষয়ক অতি উৎকৃষ্ট গান শুনাইয়াছিল। ঢাকার অনেক গণ্যমান্য লোক তথায় উপস্থিত ছিলেন। গানগুলি অতি মনোহর বোধ হওয়ায় আমি জিজ্ঞাসা করিলাম গানগুলি কার রচিত? তখন তাহারা বলিল, অধিকাংশ গান আপনার রচিত। আপনাকে আমি একজন দক্ষ জমিদারের কর্মকুশল কার্য্যাধ্যক্ষ বলিয়া জানতাম; কিন্তু গানগুলি শুনিয়া বুঝিলামÑ আপনি একজন ভাবুক, দার্শনিক ও আধ্যাত্মিক কবি। আপনার প্রতি আমার ভক্তি বর্ধিত হইল। আমি উপস্থিত ভদ্রমণ্ডলীকে আপনার পরিচয় দিলাম। তাঁহারাও একবাক্যে আপনার প্রশংসা করিলেন। দেহতত্ত্ব, বৃন্দাবনলীলা, অদ্বৈত ও দ্বৈতবাদ, সাকার নিরাকার প্রভৃতি মীমাংসা অতি মনোমুগ্ধকর ভাষাতে আপনার গানে করিয়াছেন। ভাষা যেমন সরল তেমন মধুর। আপনি আমাদের দেশে গোপন থাকিয়া এমন সুন্দর কবিত্ব প্রকাশ করিয়াছেন, ইহা দেখিয়া আমি বড় আহ্লাদিত হইলাম। আপনি এ সব গান কোন গ্রন্থাকারে প্রকাশ করিয়াছেন কি না, জানি না। না করিয়া থাকিলে সত্বর প্রকাশ করা উচিত। সাহিত্য জগতে উহা অত্যন্ত আদৃত হইবে। যদি কোন বই থাকে, তাহা হইলে আমি একখানা বই পাইতে লালায়িত। আমার মনের প্রকৃত ভাব লিখিলাম। আপনাকে সন্তুষ্ট করার উদ্দেশ্যে নয়। ইতি—

10E, Qieemswau Raosoma
Delhi
2nd, March, 1924

সেবক
(স্বাক্ষর) শ্রীগিরিশ চন্দ্র নাগ।

প্রখ্যাত প্রত্নতত্ত্ববিদ, লোকগবেষক ও ইতিহাসবিদ মুহাম্মদ হাবিবুল্লা পাঠান তাঁর ‘নরসিংদীর লোককবি’ গ্রন্থে পাগল দ্বিজদাস সম্পর্কে কিছু অভূতপূর্ব তথ্য উপস্থাপন করেন। সেই তথ্যমতে, পাগল দ্বিজদাস টাঙ্গাইলের আটিয়া পরগণার জমিদার এস্টেটের নায়েব হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেছিলেন। কিন্তু সেখানকার জমিদার ছিলেন অত্যাচারী ও অযোগ্য। খাজনা আদায়ের জন্য প্রজাদের উপর নির্যাতন চালাতেন। যার কারণে তিনি সেখানে বেশিদিন চাকুরি করেননি। সেখানকার পরিস্থিতি নিয়ে তাই তিনি গান বাঁধলেন :

ইস্তফা করি নায়েবগিরি, আমি চাই না এ চাকুরি আর।
নাহি বুঝ ভালো-মন্দ তুমি নিজে অন্ধ জমিদার।।
১ নম্বর আটিয়া পরগণা, কেহ আটিয়া ওঠেনা।
আমার আগে কত জনা পালিয়েছে পদ্মাপার।

আটিয়া জমিদারের নায়েবের চাকুরি ছেড়ে এসে তিনি যোশর পর্তুগীজ জমিদারি এস্টেটের নায়েব হিসেবে যোগদান করেন। নায়েবের কাজ করলেও প্রজা নিপীড়ন কখনো সমর্থন করেননি। কাজকর্মে করিৎকর্মা ছিলেন বলে খ্রিস্টান পাদরীরা তাঁকে তেমন ঘাটাতেন না। অপরদিকে দ্বিজদাস স্বাধীনচেতা হিসেবে কবিগান নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন। তবে অনেক সময় কৌশলে প্রজাদের খ্রিস্টান জমিদারদের হাত থেকে রক্ষাও করতেন।

তেমন একটি ঘটনা নিম্নে বর্ণিত হলো। বছরের নির্দিষ্ট সময়ে কালীগঞ্জের নাগরী-ধর্মপল্লীর পর্তুগীজ জমিদার হাতিতে চড়ে যোশর কাচারিতে আসতেন। মূলত খাজনা আদায়ের তদারকি করার জন্যেই আসা। বাকি খাজনা আদায় করার জন্যে জমিদারি এস্টেটের বিভিন্ন গ্রামে সফর করতেন পাইক বরকন্দাজসহ। একবার খাজনা অনাদায়ের কারণে পাদরী জমিদার ছুটাবন্দ গ্রামে ছুটলেন। হাতির গলায় ঘণ্টা বেজে চলেছে। এই আওয়াজে অনেক প্রজা ভয়ে গ্রাম ছেড়ে গেলেন। কিছু প্রজা সঙ সেজে অদ্ভুত পোশাক পরে হাতির গায়ে ঢিল ছুঁড়তে লাগলেন। এতে জমিদার রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে ওঠলেন। পাইক-পেয়াদারা প্রজাদের উপর লাঠিচার্জ করার প্রস্তুতি নিলো। ঠিক তখনই নায়েব বৈকুণ্ঠনাথ চক্রবর্তী তথা পাগল দ্বিজদাস বুদ্ধি খাটিয়ে বললেন, জমিদার মহাশয়, এরা আসলে পাগল, তাই এমন ব্যবহার করছে। এদের বেশভূষা দেখেন না কেমন বিশ্রী। পাগলের সঙ্গে কি বিবাদ করা সাজে? পাদরী জমিদার নায়েব দ্বিজদাসের কথা শুনে শান্ত হলেন। বললেন, সত্যিই এরা বদ্ধ পাগল। পাগলের আবার খাজনা কীসের? চলো সবাই কাচারিতে ফিরে যাই। এভাবে দ্বিজদাস তাঁর মানবিক গুণ ও বুদ্ধি দিয়ে ছুটাবন্দ গ্রামের অসহায় প্রজাদের রক্ষা করেছিলেন।

কবিগানের আসরে মুকুটহীন সম্রাট ছিলেন পাগল দ্বিজদাস। কণ্ঠে গান না তুলেও অসংখ্য গান, টপ্পা, ছড়া রচনা করে কবিয়ালদের মাথার তাজ হয়ে বেঁচে ছিলেন। তাঁর শিবলিঙ্গের টপ্পা, অগ্নিদেব ঘরজামাইয়ের টপ্পা, বসুমতির টপ্পা একসময় সারাদেশ মাতিয়ে রেখেছিলো। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে সেগুলো হারিয়ে গেছে। তিনি কবিগানের আসরে ছুটে যেতেন। কোনো পারিশ্রমিক ছাড়াই কবিদের প্রশ্ন ও উত্তর বাতলে দিতেন। ছড়া, টপ্পা, গান রচনা করে দিতেন। একবার শিবপুর এলাকার নৌকাঘাটা গ্রামে হিন্দুপাড়ায় হরিচরণ আচার্য্য ও আলগীর পঞ্চানন আচার্য্যরে কবিগান হয়। পাগল দ্বিজদাস তখন অদূরবর্তী যোশর কাচারিতে ছিলেন। তিনি নৌকাঘাটা গ্রামে উপস্থিত হলেন। তিনি সন্তানতুল্য শিষ্য হরিচরণ আচার্য্য কবি গুণাকরকে সেখানে গান, ছড়া, টপ্পা প্রভৃতি যোগান দেওয়ায় সেই আসরে পঞ্চানন আচার্য্যরে পরাজয় ঘটেছিলো।

শিষ্য হরিচরণ আচার্য্যকে অবিভক্ত বাংলার সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ কবিয়াল হিসেবে গড়ে তোলার নেপথ্য কারিগর ছিলেন গুরু পাগল দ্বিজদাস। তেমন আরো অনেক কবিগানের আসরে তিনি ছুটে গেছেন শিষ্যের মাথায় আশীর্বাদের হাত রাখার জন্যে। হরিচরণ আচার্য্যও গুরু দ্বিজদাসকে পিতৃতুল্য জ্ঞান করতেন। হরিচরণ ‘বঙ্গের কবির লড়াই’ বইটি গুরু পাগল দ্বিজদাসকে উৎসর্গ করে লিখেছিলেন, “আপনি দেশবিশ্রুতে পরম রসজ্ঞ কবি। আপনার ছদ্ম নামের ‘দ্বিজদাসের গান’ কাব্যজগতের অমূল্য সম্পদ। আপনার মর্ম্মস্পর্শী রচনা কৌশল অতুলনীয়। আপনি আমাকে পুত্রাধিক স্নেহ করেন। কবিগান আপনার চিরপ্রিয়-কাব্য-সাহিত্যে আমার যা কিছু সুকৃতি তাহা আপনারই প্রতিভা প্রভাবের ফল।”

কবিগানের মুসলমানকরণই মালজোড়া গান। ভাটির দেশের মুসলিম কবিয়ালরা মালজোড়া গানের প্রবর্তক। এর মধ্যে নেত্রকোণার রশিদ উদ্দিনকে কেউ কেউ মালজোড়া গানের পথিকৃৎ বলে থাকেন। যা পরবর্তীতে বাউল গান হিসেবে খ্যাতি লাভ করে। এলাকাভেদে বাউল গান কোথাও শরীয়তি-মারফতি, কোথাও বিচার গান, কোথাও পালাগান আবার কোথাও বয়াতি গান হিসেবে পরিচিত। ঢোল, হারমোনিয়াম, দোতারা, বেহালা, সারিন্দা, মন্দিরা, বাঁশি সহযোগে সারারাত পক্ষ-প্রতিপক্ষ গান গেয়ে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের চেষ্টা করেন। এতে দোহারের উপস্থিতিও থাকে। ভাটির দেশ ছাড়াও কবিগান বা মালজোড়া গানের একটি বড়ো ঘরানা রয়েছে ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদীর দক্ষিণপাশে, বামনসুর গ্রামে। যা দেওয়ান ঘরানা হিসেবে পরিচিত। শত শত বাউল শিল্পী এই ঘরানার অধীনে গান গেয়ে আসর মাত করে যাচ্ছেন। বামনসুর গ্রামের দেওয়ান ঘরানার আদিপুরুষ হলেন আলফু দেওয়ান। তিনি একজন আধ্যাত্মিক সাধক এবং লোক- সঙ্গীতের খ্যাতিমান শিল্পী। তাঁর দুই সন্তান মালেক দেওয়ান ও খালেক দেওয়ান প্রায় ৩ হাজার বাউল, মুর্শিদী, বিচ্ছেদ, ভাটিয়ালি প্রভৃতি গান লিখে এবং মঞ্চে পরিবেশন করে সুনাম অর্জন করেছেন। তাঁদের তৃতীয় পুরুষ আরিফ দেওয়ান, মাখন দেওয়ানসহ আরো অনেকে বাউল গানে খ্যাতি অর্জন করেছেন। এদের মধ্যে খালেক দেওয়ান ও তাঁর শিষ্য মাতাল কবি রাজ্জাক দেওয়ান বাউল বা আধ্যাত্মিক গানকে অনেক উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। তাঁদের লেখা ও সুর দেওয়া অনেক গান এখন বাংলার সর্বত্র গাওয়া হয়। এমনকি পশ্চিমবঙ্গে তাঁদের গান নিয়মিত গাওয়া হয়। মাতাল রাজ্জাক এবং তাঁর গুরু খালেক দেওয়ান ছিলেন পাগল দ্বিজদাসের অনুরক্ত। তাঁরা প্রথম জীবনে পালাগান বা বাউল গানে দ্বিজদাসের অসংখ্য গান গেয়ে আসর মাত করেছিলেন। তাঁদের গানের খাতায় দ্বিজদাসের অনেক গান লিপিবদ্ধ থাকতো। তাছাড়া তাঁদের লেখা গানে দ্বিজদাসের গানের অনেক প্রভাবও লক্ষ্য করা যায়। তাঁরা মনে করতেন, দ্বিজদাসের মতো সহসী, অসাম্প্রদায়িক ও মানবতাবাদী সঙ্গীতজ্ঞ বাংলায় বিরল।

লেখাটি শেষ করবো একটি ঘটনা দিয়ে। বামনসুরের খালেক দেওয়ান তখন ভারবর্ষব্যাপী খ্যাতি অর্জন করেছেন। কলকাতা এইচএমভি থেকেও তাঁর গানের রেকর্ড বের হয়েছে। গ্রাম বাংলার বিয়েতে খালেক দেওয়ানের গান রেকর্ডে না বাজালে সেই বিয়ে ভেঙে যেতো। এমন পরিস্থিতিতে অনেকেই খালেক দেওয়ানের কাছে গান শেখার জন্যে ভিড় করতে থাকতেন। তেমন দুজন ছাত্র ছিলেন অন্ধ গায়ক শামসু দেওয়ান ও পাগল বাচ্চু। দুজনেই পরবর্তীতে বাংলায় বাউল গানের আসর মাত করে সুনাম অর্জন করতে সক্ষম হন। এই পাগল বাচ্চু পরে বাংলায় ‘পাগল’ পদবী দিয়ে নতুন ঘরানার সৃষ্টি করেন। তাঁর ছোটো ভাই মনির হোসেনও ‘পাগল মনির’ নাম ধারণ করে বাউল-বিচ্ছেদ গানে নাম করেন। তাঁরও অনেক শিষ্য-সাগরেদ গানের আসরে গুরুর নাম-যশ বজায় রাখছেন। তবে এই ‘পাগল’ উপাধিটা গায়ক বাচ্চু পেলেন কোথায়? এমন প্রশ্নের জবাব খুঁজতে গেলে আবার খালেক দেওয়ানের কাছে ফিরে যেতে হবে। তিনি যখন অসংখ্য শিষ্যকে বাউল, মারফতি গান শেখাতেন, তাঁদের মধ্যে বাচ্চুকে তাঁর আলাদা প্রতিভার মনে হয়েছে। ভবিষ্যতে সে যোগ্য শিষ্য হয়ে ওঠতে পারবে বলে ‘পাগল’ সম্বোধন করতেন তাঁর আধ্যাত্মিক গুরু পাগল দ্বিজদাসকে স্মরণ করে। গুরুর ভবিষ্যতবাণী প্রমাণ করেছিলেন পাগল বাচ্চু।


আপেল মাহমুদ
সাংবাদিক, গবেষক ও দুষ্প্রাপ্য গ্রন্থ সংগ্রাহক

পাগল দ্বিজদাসের গান

বৈকুণ্ঠনাথ চক্রবর্তী। মাতৃহারা; পিতার আদরের দুলাল। দুই বিবাহ করেছিলেন। নিঃসন্তান। পালক পুত্র ছিলো। ছিলেন রাজকর্মচারী। জমিদারের সেরেস্তাদার। কালীগঞ্জ-আড়িখোলা খ্রিস্টান মিশন, নরসিংদীর শিবপুরের যোশর কাচারি বাড়ি, দেওয়ান শরীফ খাঁ-জয়নব বিবির নগর নরসিংহপুর— এসব জায়গায় তাঁর কর্ম ও সম্পর্ক ছিলো বলে জনশ্রুতি। জ্ঞানানন্দ গোস্বামী, যিনি মাস্টার দা’ সূর্যসেনের সাথী। তিনি একবার এসেছিলেন বৈকুণ্ঠনাথের কাছে। দুজনে মিলে গড়ে তুলেছিলেন শিক্ষালয় ‘শ্রীকৃষ্ণের পাঠশালা’, ‘শক্তিমঠ’, দেবালয় ও চিকিৎসালয়।

বৈকুণ্ঠনাথের আড়ালে থাকার স্বভাব ছিলো। তাঁর উপার্জন যথেষ্ট ছিলো। মানুষের পাশে দাঁড়াতেন সহযোগিতার হাত প্রসারিত করে। ছিলেন রাজকর্মচারী। আসা-যাওয়ার পথে গান লিখতেন। জ্ঞানানন্দ গোস্বামীর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ‘শক্তিমঠ’ থেকে প্রকাশ করা হয়েছিলো ‘পাগল দ্বিজদাসের গান’। সংরক্ষণের অভাবে অনেক গান হারিয়ে গেছে। তাঁর আত্মীয়-স্বজনের অধিকাংশই ভারতে চলে গেছেন। তাঁরা গানগুলো সাথে করে নিয়ে গেছেন বলে মনে করা হয়। পৈতৃক ভিটা জন্মস্থান পারুলিয়ায় তাঁর কোনো স্মৃতিচিহ্ন নেই। চিকিৎসালয় নেই। শক্তিমঠ নেই। তবে পাঠশালাটি আছে নবরূপে। অত্র এলাকার আলোকবর্তিকা ঐতিহ্যবাহী ‘পারুলিয়া উচ্চ বিদ্যালয়’ নামে।

দ্বিজদাস ও জ্ঞানানন্দ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত ‘শ্রীকৃষ্ণ পাঠশালা’, যা বর্তমানে ‘পারুলিয়া উচ্চ বিদ্যালয়’ নামে পরিচিত

বৈকুণ্ঠনাথ চক্রবর্তী সম্পর্কে যতোটুকু জানা যায়, ততোই ধোঁয়াশা বাড়ে। তাঁর সম্পর্কে প্রকৃত সত্য ও বিস্তারিত জানা একান্ত প্রয়োজন। যার স্মৃতিচিহ্নসহ সব মুছে গেছে। এমন একজন মহামানবকে কালের গহ্বরে হারিয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করতে এই সমাজ, এই রাষ্ট্রের কি কোনো দায়িত্ব নেই?

বৈকুণ্ঠ গান লিখতেন ‘দ্বিজদাস’ ছদ্মনামে। নিদারুণ জীবন বাস্তবতা ও স্পষ্টভাষ্যে। গানের কথায় গভীর জীবনবোধ নিরপেক্ষ বাস্তবতার আলোকে তাঁকে বস্তুবাদী বলে থাকেন অনেকে। এ-কথার সত্যতা কতোটা? জানতে হলে ডুব দিতে হবে দ্বিজদাসের গানের ভুবনে। তাঁর গানের কথায় যেমন সত্যতা আছে, আবার আছে ভাবনার উদ্রেককারী অনেক উপসর্গ। বরাক নদীর জল যেখান থেকে বাংলায় প্রবাহিত হয়, দ্বিজদাসের জন্মস্থান থেকে সে-পর্যন্ত তাঁর গানের ব্যপক প্রভাব। গ্রামীণ জনপদে ও পদাবলির আসরে তাঁর গান প্রাণে শিহরণ জাগায়। নাগরিক সমাজেও তিনি সমাদৃত। হালের জনপ্রিয় বাউল সম্রাট শাহ আবদুল করিম, দূরবীন শাহ প্রমুখ তাঁর গানে গভীরভাবে প্রভাবিত। প্রখ্যাত বাউল সাধক সুনীল কর্মকারসহ বর্তমানের প্রায় সব বাউল শিল্পীর মুখেই ভাসে দ্বিজদাসের গান। হেমাঙ্গ বিশ্বাস লিখেছেন তাঁর গান নিয়ে। কবিয়াল হরিচরণ আচার্য্য সরাসরি দ্বিজদাসের দীক্ষায় ধন্য হয়েছেন। জ্ঞানানন্দ গোস্বামী বামপন্থী ছিলেন। দ্বিজদাসের বাড়ি পারুলিয়া এলাকার অনেকেই বামপন্থী স্বদেশী আন্দোলনের কর্মী ছিলেন। তাঁর গানের কথাকে বামপন্থীরা একান্ত আপন বলেই মনে করেন। সেই সাথে তাঁকে বস্তুবাদী বলে থাকেন অনেকে। তাঁর বিখ্যাত গান :

কেহ শোনো বা না-শোনো, মানো বা না-মানো,
তাতে আমার নাই কোনো লাভ-লোকসান।

শুনে যারে ওরে পাগল দ্বিজদাসের গান।

 

দ্বিজদাসের ভাবনায় সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব নিয়ে অমীমাংসিত সাবলীল উচ্চারণ আছে এ-গানে। এক পর্যায়ে অকপট উচ্চারণ :

কেহ বলে আছ তুমি, কেহ বলে নাই,
আমি বলি থাকো থাকো না থাকলে নাই।
…মানতে মানতে শাস্ত্র— পাই না অন্ন বস্ত্র,
লোটা বটি অস্ত্র ক্রমে তিরোধান
শুনে যারে ওরে পাগল দ্বিজদাসের গান।।

এ-কথার উপর ভিত্তি করেই তাঁকে বস্তুবাদী বলাটা যৌক্তিক হবে? নিজ ধর্ম চেতনায় অন্তিম পর্ব শ্মশানের কথা বহুবার এসেছে তাঁর কথায় :

তরুলতা কন্যার সাথে বিয়া হবে বিধি মতে
সমন ঠাকুর ঘটক তাতে, রাজ ঝোটক সম্মেলন
কর হে বিয়ার আয়োজন।

তাঁর গানের প্রতিটি কথাই গভীর চিন্তার উদ্রেক ও সাধনার পথ উন্মোচিত করে।

আমি বিনে তোমার কিসের বড়াই
আবার
পঞ্চত্বের কালে, পঞ্চে পঞ্চ মিলে
পাঁচ গেলে, পাছে রলো না রলো না।

দর্শনে স্পর্শনে শ্রবণে কি ঘ্রাণে
কিছুতেই না হয় ঠিকানা।

এ-গানগুলো প্রতিটি ভাবুক হৃদয়ে ভাবনার খোরাক জোগায়। তাঁর গানে মানুষ ও গুরু ভজনার কথাও এসেছে সহজ সারল্যে।

মানুষে মানুষ বিরাজে খুঁজে নেওয়া বড় দায়
মানিক চিনে, দুই এক জনে, শ্রীমহাজনের কৃপায়।

সংসারের যাতনা ও পারিপার্শ্বিক প্রভাব দ্বিজদাসকে তিক্ত স্বাদ দিয়েছিলো ষোলোআনা। গানে যার যথার্থ প্রমাণ রয়েছে অনেকটা অংশজুড়েই :

সংসারের সংসারী, মাইনা নাই চাকরী
এ ঝকমারি করে দেখেছি
এবার হলো যা হবার, বাকি নাই রে আর
সকাল সকাল গেলে বাঁচি।

এই জীবন-সংসারের প্রতি তীব্র বিতৃষ্ণাও প্রকাশ পেয়েছে তাঁর কথায়। মৃত্যু-শ্মশান-অন্তিম যাত্রাÑ এসবে আচ্ছন্নতা প্রকাশ পায় :

এই যে সংসার সকলই অসাড়

পবনের যেদিন গতি রুদ্ধ হবে
ভুজঙ্গ গিয়া গুরুকে দংশিবে
পতঙ্গ সেই দিন মাতঙ্গে নাশিবে
সিংহের হবে শিয়ালের ভয়
একদিন নিরাকার হবে জলে জলাময়।

লালনের গান আর দ্বিজদাসের গানের মৌলিক পার্থক্য হলো, লালন যেখানে ভাববাদী, দ্বিজদাস সেখানে যুক্তিবাদী। লালনের গানে সাধন-ভজনের সাথে কর্মপরিণতি ও মুক্তির বাসনায় করুণ মিনতি আছে। আর দ্বিজদাসের আছে সত্যের মুখোমুখি দাঁড়ানোর নিঃসঙ্কোচ অভিপ্রায়। দ্বিজদাস বলেছেন :

আমি তোমার অধীন, হই চিরদিন, তোমার প্রত্যাশী
আনিয়াছ, আসিয়াছি, যেতে বললে তৈয়ার আছি
নাচাইতেছ, নাচিতেছি, বসতে বললে বসি
তুমি করাও আমি করি, না করাইলে কি আর পারি
কাঁদাও যখন কেঁদে মরি, হাসাইলে হাসি
আমি কিসে দোষী দয়াল আমি কিসে দোষী।

তাঁর জন্মস্থান নরসিংদী-পলাশ-পারুলিয়ায় পূর্ব থেকেই বাউল-ফকিরদের পদচারণা ছিলো। ছিলো কবিগানের চারণভূমি। নানা ধর্ম-বর্ণের মানুষের মিলে-মিশে বাস। সকালে ঘুম থেকে উঠার পর রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগ পর্যন্ত তাঁরা একসাথেই থাকে। স্বাভাবিকভাবেই তা দ্বিজদাসকেও প্রভাবিত করেছে। এক জায়গায় লিখেছেন :

রাম রহিম না জুদা ভাবো আসল ঠিক রাখিও ভাই।

ধর্মতত্ত্ব সম্পর্কে দ্বিজদাস গভীর জ্ঞান রাখতেন, যা তাঁর গানের কথায় বিভিন্ন জায়গায় এসেছে।

এক বিনে দুজন নাই।

আবার মৃত্যু নিয়ে তাঁর কতো চমৎকার অভিলাষ :

যে জন জানে, মরণ কি বিষয়
মধুরেণ সমাপণ, তার মরণ মধুমেয়।

জন্মান্তরবাদ, সমাজ-সংসার, যুক্তি, কামতত্ত্ব, মানুষ ভজন, শ্যামাসঙ্গীত, দেশাত্ববোধক প্রভৃতি বহুমাত্রিক বৈচিত্র্যময় গানের ঝাপি নিয়ে বাংলা সঙ্গীতকে সমৃদ্ধ করে গেছেন দ্বিজদাস। অথচ আজ কোথাও তাঁর স্মৃতিচিহ্নটুকু পর্যন্ত নেই। এর ফলে একদিকে তাঁর মহামূল্যবান সৃষ্টিগুলো যেমন হারিয়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে হচ্ছে বিকৃত ব্যবহার। তাঁর সৃষ্টি-সঙ্গীত ও সামাজিক অবদানগুলো সংরক্ষণ করে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেয়ার জন্যে রাষ্ট্র উদ্যোগী হবে, এটাই প্রত্যাশা। শেষ কথা, দ্বিজদাসের স্বপ্নের ভাষায় আশাবাদী উচ্চারণ :

সময়ে ফুল ফুটবে সত্য
গোড়ায় জল ঢাল নিত্য।


মো. জাকারিয়া
কবি ও গবেষক।

আমীরগঞ্জের ইতিহাস | পর্ব ৩

0

ফরাজে ও লাখেরাজ ভূমি ও পত্তনী মালিকানা ১৪৭ টাকা মূল্যে বিক্রয়ের সাফ কবলা হইয়াছে বির্দ্দরী মির্জা মোহাম্মদ, পিতা- মৃত মির্জা মোহাম্মদ কাজেম, সাকিন- চান্দখার পোল ও শ্রীমতি বনী বেগম, পতি- শ্রী মৌলভী মকরেম আলী, সাকিন- বড় কাটারা, থানা- সদর, জাতি- মোসলমান, পেশা- তালুকদারী, জেলা- ঢাকা স্থানে লিখিতং, শ্রী মীর গোলাম হোসেন, পিতা- মৃত ইয়াদ ওয়ারেছ আলী, জাতি- মোসলমান, পেশা- জমিদারী, সাকিন- গের্দ্দ হুসনি দালান, ঢাকা সদর, জেলা- ঢাকা কোট মৌজাস্থিত লাখেরাজ জমি ও পত্তনী ও মিরাশি জমি ও ওয়ার্কফ ইষ্টাটের মোল হেবা ও হাবেলী ঘর তৎতহতি জমিন ইসাদি বিক্রয় সাফ কবলা পত্র মিদং কার্যাঞ্চে আমি আমার কন্যা মৃত মরিয়ম নেছা বেগমের ওয়ারিশপ্রাপ্ত নিম্ন তফসিলের লিখিত চৌহদ্দি ভুক্ত ষোল আনি বিত্তের দুই আনা অংশ অন্যের নিরাপত্তে মালিক দখলকার আছি ঐ বিষাদির দুই আনা হিস্যা আমি আপন অধিকার মতে উচিত মূল্য মবলক ১৪৭ টাকাতে সাফ বিক্রয় করার উদ্যত হইলে, তোমরা উক্ত মৃত বেগমের পুত্র ও কন্যা ও আমার দৌহিত্র দৌহিত্রি বিধায় এবং মৃত বেগমের বক্রি দুই আনা অংশের মালিক তোমরা যথায় আমা হইতে ঐ দুই আনা অংশের খরিদ করার উদ্যত হওয়ায় আমি আমার প্রাপ্য দুই আনা অংশের মধ্যে এক আনা অংশ তুমি মির্জা মোহাম্মদ নিকট মং ৭৩ টাকা আট আনা মূল্যে ও এক আনা অংশ তুমি শ্রী মতি বনি বেগম নিকট মং ৭৩ টাকা আট আনা মূল্যে একুনে উভয়ের নিকট মং ১৪৭ একশত সাত চল্লিশ টাকা নগদ দস্ত বদস্ত বেবাক বুঝিয়া পাইয়া আপন ইচ্ছায় ও সৎজ্ঞানের রাজি রগবতে বহাল তবিয়তে সাফ বিক্রয় করিয়া লিখিয়া দিতেছি ও অঙ্গিকার করিতেছি যে, নিম্নের তপসিলের লিখিত বিষাদির আমার প্রাপ্ত দুই আনা অংশ কাত তোমরা উপরোক্ত অংশানুসারে আপন ২ পুত্র ওয়ারিশ ও স্থলবর্তি গণক্রমে অংশানুসারে সদর খাজনা ও মিউনিসিপালিটি টেকস মতে আদায় করিয়া আমার নাম খরিজে আপন ২ নাম অংশ মতে রেজিষ্ট্রারী করিয়া প্রজা উঠাইয়া কি বানাইয়া রাস্তা বাগান বানাইয়া হাবেলী ইসাদি ভাংগিয়া কি উক্ত নাল করিয়া প্রজাগণ হইতে কর কবুলিয়ত লইয়া দিঘি পুস্কনি খনন করিয়া দান বিক্রয় সর্ব প্রকার কন্যধিকারী হইয়া পরম সুখে ভোগ বিনিত্তগ দান বিক্রয় দখল তছরূপ করিতে রহেন। নিম্ন লিখিত বিষাদির আমার ওয়ারিশ প্রাপ্ত উক্ত দুই আনা অংশে আমি ও আমার পুত্র পৌত্রাদি ওয়ারিশ ও স্থবর্ত্তি গণ ও ভাবি উত্তরাধিকারীগণের সর্ব প্রকার দাবী দাওয়া সম্পূর্নরূপে রহিল না ও রহিলেক না, করিলে অগ্রাহ্য হইবেক। আর প্রকাশ থাকে যে, নিম্নের লিখিত ২/৩/৪/৫ নং সম্পত্তি ভিন্ন অন্য কোনো সম্পত্তি কেহর নিকট দায়বদ্ধ নাই। তপছিলের লিখিত ২/৩/৪/৫ নং সম্পত্তি দায়বদ্ধ থাকা ও বক্রি সম্পত্তি নির্দায় অবস্থায় থাকা এবং তপছিলের লিখিত সমস্ত সম্পত্তি কেহর নিকট কোন বয়, হেবা ও দান বিক্রয় মিরাশ পত্তনী কি দর পত্তনি কি কম জমায় ইজারা ইসাদি করি নাই ও দেই নাই তাহা তোমাদের নিকট প্রকাশ করায় তোমরা আমার আত্মীয় বিধায় আমার কথা বিশ্বাস করিয়া বিনা অনুসন্ধানে ও বিনা যাচাইতে খরিদ করিলা যদি খরিদের পর আমার উল্লেখিত কোন কার্য প্রকাশ পায় তাহাতে তোমাদের অনিষ্ট ঘটে তাহা হইলে আমি আইনানুসারে ফৌজদারিতে দণ্ডনিয় হইব, এতদ্বার্থে মূল্যের সমস্ত টাকা অংশানুসারে তোমাদের স্থানে নগদ দস্ত বদস্তে বুঝিয়া পাইয়া আপন ইচ্ছায় দলিলের সমস্ত মর্মর্থ ভাল মত পাঠ করিয়া ও বুঝিয়া শুনিয়া অত্র সাফ কবলা লিখিয়া দিলাম। ইতি সন ১৩০৮ সন ২১ শে অগ্রাহায়ন তপছিল সম্পত্তি ১/১২৬৯ সালের ১৪ ভাদ্রের লিখিত মৃতে ছৈয়দ আলী মেহেন্দী খা বাহাদুরের স্ত্রী মৃত মরিয়ম বেগম সাহেবার ওয়ার্কফ নামার লিখিত জেলা ঢাকার কালেক্টরীর তৌজি ভূক্ত ৯৯৬৫ নং জমিদারী তপে রন ভাওয়াল হিঃ। চার আনা ১৫ গন্ডা মরিয়ম বেগম ও আমিনদ্দিন হায়দর ও ৬৪৪৭ নং ডেয়ারা বন্দবস্ত ভূমি চরকান্দা ও পাবনীরা ও রায়পুরা পোলিশ স্টেশন ও সাব রেজিষ্টারের অধীন জোয়ার হাসনাবাদ তাহার চার আনা নয় গন্ডা ও ৯৯৫৪ নং তালুকের হিঃ চার আনা ১৫ গন্ডা অংশ স্থাবর তাহার মোতাউল্ল আমি গোলাম হোসেন ঐ মোতাউল্ল ইষ্টেটের হইতে মৃত মরিয়ম নেছা বেগম বার্ষিক ৬০ টাকা মালিকানা পাওয়ার অধিকারী ছিল। ঐ ৬০ টাকা মালিকানা ষোল আনা বয়সে মৃত মরিয়ম নেছা বেগমের ওয়ারিশ সূত্রে দুই আনা অংশ আমি অত্র সিকিউরিটি ঐ দুই আনা অংশের রাখা ৭ টাকা ৫ আনা বার্ষিক মালিকান বিক্রি করিলাম (১২৯৮ সালের ১৯ পৌষের লিখিত পত্তনী কবুলত পাট্টা আবু আহাম্মদ আবদুল বাছেদ লকনগ মোতউল্লির পক্ষে উনছ খান, পিতা মৃত মৌলভী আলীমুদ্দিন আহম্মদ নিকট প্রাপ্ত ৯৯৬৫ নং জমিদারী তপে রনভাওয়াল হিঃ চার আনা ১৫ গন্ডা জমিদারী বনামে আমিরদ্দিন হায়দর ও মরিয়ম বেগম সদর জমা ১৭১৯ টাকা ছয় আনা ৮ পাই জেলা ঢাকার রায়পুরার পুলিশ ষ্টেশন ও সাব রেজিষ্টারের অধিন পোক্তার চর মধুয়া মধ্যে মৌজা বিরগাও ও আলিয়াবাদ ও লক্ষীপুরা ও মরিয়ম নগর ও গাজীপুরা গং পোক্তার হাসনাবাদ মধ্যে মৌজা ফতেপুর, দরি হাইর খারা ও বির হাইর খারা ও জেলা ত্রিপুরার অধিন দাউদকান্দি থানা ও সাব রেজিষ্টারের অধীন পোক্তার মৃজার চর ও মৌজা আমিরাবাদ ও ভিটিগাও বাঘাকান্দি ও গোদাকান্দি মৌজা রায়পুর ও সিন্দি ও মুরাদনগর পোলিশ ষ্টেশন ও সাব রেজিষ্টারের অধীন মৌজে খোয়ার চর ও জেলা ফরিদপুরের অধিন পালঙ্গের থানা সাব রেজিষ্টারের অধীন মৌজে পাইকতলি ও শখিপুরা ৯৯৫৪ নং তালুক খলিলের রহমান সদর পক্ষে ২১০ টাকা ৭ আনা ২ পাই যে নিযুক্ত আছে উক্ত তালুকের ভুমি জেলা ঢাকার রায়পুরার পোলিশ ষ্টেশন ও সাব রেজিষ্টারের অধিন পোক্তার হাসনাবাদ মধ্যে মৌজে নলবাটা ও আমির গঞ্জ ও করিম গঞ্জ ও আগানগর ও হাসনাবাদ মৌজে পূর্ব পারা ও পশ্চিম পারা ও বিঃ পূর্ব পারা ও মির কান্দি ও নেবুর কান্দি ও আট কান্দি ও হাট হাসনাবাদ উক্ত জমিদারী (৯৯৬৫ নং তালুক) ও তালুকের (৯৯৫৪ খারেজী তালুক খলিলুর রহমান) সোলা আনার সে হিঃ ৭ আনা ৮ গন্ডা মৃত মরিয়ম নেছা বেগমের মৃত মাতা খায়রুন নেছা ওরফে নতে বেগমের ওয়ারিশি মতে ও মৃত মরিয়ম নেছা বেগমের পিতা মির গোলাম হোসেনের হেবা সূত্রে ২ আনা ৮ গন্ডা একুনে ১০ আনা অংশ জাহা উক্ত সন তারিখের পত্তনী কবুলত পাট্টা অনুসারে সদর খাজনা ও পথবর পাবলিক ওয়ার্ক ছেদ ও ডাক টেকস ইসাদি বাদে জমিদারীর বার্ষিক পত্তনী খাজনা ১০০ টাকা তালুকের বার্ষিক পত্তনী খাজনা ৪৪ টাকা একজাই মং ১৪৪ টাকা মালিকানা খাজনা উক্ত আবু আহাম্মদ আবদুল বাছেদ নিকট পাত্তা ন্যায় উক্ত মালিকানা খাজনার টাকার মধ্যে ষোল আনা রকমের ২ আনা অংশে বার্ষিক মং ১৮ টাকা পাত্তা জায় তাহা…

এমতাবস্থায় ৯,৯৬৫ নং জমিদারি ঢাকা কালেক্টরিতে প্রায় ১৪ বছর অংশীদারদের যথাযথ স্বত্ব বণ্টনাধীনে থাকে তদোপলক্ষে মীর গোলাম হোসেন সাহেব এর কতোক অংশ (সম্ভবত শুধু খলিলুর রহমানের তালুক থেকে সৃষ্ট ১৩,১৭৩ নং মহালটি) বাংলা ১৩১২ সনের ২৯ শ্রাবণ তারিখে ওয়াকফনামাভুক্ত সম্পত্তি দাউদকান্দি থানার কাশীপুর গ্রাম নিবাসী পোকন চন্দ্র কর্মকারের পুত্র রাজচন্দ্র কর্মকারের নামে পত্তনী বিলি করেন, যা আইনত বে-আইনি ও অগ্রহণযোগ্য। কারণ, গোলাম হোসেন মরিয়ম বেগমের ওয়াকফ সম্পত্তির তার প্রাপ্য সমুদয় স্বত্ব ইতোপূর্বে বাংলা ১৩০৮ সনের ২১ অগ্রহায়ণ তারিখে বিক্রি করে দিয়েছেন। তদানুসারে রাজচন্দ্র কর্মকার ও তাহার ভ্রাতা ও ভ্রাতুষ্পুত্র ঐ-সকল সম্পত্তি দখল করতে থাকে। প্রায় চার বছর পর রাজচন্দ্র কর্মকার উক্ত পত্তনপ্রাপ্ত ১৩,১৭৩ নং মহালের তালুকদারির স্বত্বের আট আনা অংশ ঢাকার ১৩ নং বেচারাম দেউরী নিবাসী মৌলভী আলীমুদ্দিনের নিকট বাংলা ১৩১৬ সনের ২২ মাঘ তারিখে বিক্রি করে দেন। উল্লেখ্য যে, এই মৌলভী আলীমুদ্দিনের জন্মস্থান হাসনাবাদ গ্রামে, তার পিতার নাম মৌলভী জমির উদ্দিন। তিনি ঢাকার নবাব বাড়িতে মুন্সির চাকরি করতেন এবং বগুড়ার নবাব বাড়ির নবাব কন্যাকে ছলচাতুরির মাধ্যমে বিবাহ করেন। তিনি আটকান্দির কুঠিবাড়ি মসজিদ নির্মাণ করেন। উল্লেখ্য যে, আমার গ্রাম আমীরগঞ্জ ও করিমগঞ্জের ১৩,১৭৩ নং তৌজি বা মহালের সেটেলমেন্ট জরিপের সিএস পর্চায় পত্তনী তালুকদারের নাম রাজচন্দ্র কর্মকার উল্লেখ দেখতে পাওয়া যায়। রাজচন্দ্র কর্মকারের ৪৬৮ নং তালুকের অংশ আট আনা এবং মৌলভী আলীমুদ্দিনের ৪৬৯ নং তালুকের অংশ আট আনা ও রাজচন্দ্র কর্মকার আবার তার তালুক নং ৪৬৮-র আট আনার খাজনা আদায় করে দেয়ার শর্তে অর্ধেক অর্থাৎ চার আনা আমীরগঞ্জ নিবাসী সদর উদ্দিন বেপারী গংদের নিকট দরপত্তন দেন। অর্থাৎ সদর উদ্দিন গং রাজচন্দ্রের অবশিষ্ট পত্তনী তালুকের খাজনা আদায় বাবদ ৪৬৮-ক নামীয় তালুকের একটি মধ্যস্বত্ব লাভ করেন।

এদিকে মির্জা মোহাম্মদ, মরিয়ম বেগমের মৃত্যুর প্রায় ৩৩ বছর পর মরিয়ম বেগম পাবলিক ওয়াকফ এস্টেটের মালিকানা ও দখল পুনরুদ্ধার নেয়ার নিমিত্তে অপেক্ষমান থাকেন। পরবর্তীতে তিনি ঢাকা কালেক্টরিতে ওয়াকফ এস্টেটের বেনিফিশিয়ারি ও মোতয়াল্লী হিসেবে নিজের আইনগত ভিত্তি ও মালিকানার অধিকার অর্জনের অপেক্ষমান থাকাবস্থায় বৃটিশ সরকার কর্তৃক ১৯১৩ সালে ভারতীয় মুসলমান ওয়াকফ ভেনিডেটিং আইন গঠিত হয় এবং ১৯৩৪ সালের বঙ্গীয় ওয়াকফ আইন জারি হয়। কিন্তু ইতোমধ্যে কোনো-এক সময়ে মির্জা মোহাম্মদের মৃত্যু হয়। মির্জা মোহাম্মদের মৃত্যুর পর তার পুত্র মির্জা মোহাম্মদ আশরাফ ঢাকা কালেক্টরির তৌজিভুক্ত ৯,৯৫৪ নং মহালের ষোলো আনা (চার আনা ১০ গণ্ডা) ও ৯,৯৬৫ নং মহালের (তিন আনা ১০ গণ্ডা)-সহ অন্যান্য মহালকে ওয়াকফ সম্পত্তি হিসেবে গণ্য করার জন্যে ১৪ঃয ঈডঘ কলিকাতা হাইকোর্টে এক আর্জি দায়ের করেন। ফলে কলকাতা হাইকোর্ট ‘মরিয়ম বেগম ওয়াকফ এস্টেট’কে পাবলিক ওয়াকফ সম্পত্তি হিসেবে বৈধ প্রমাণ করেন। তারপর তিনি কলকাতা রাইটার্স বিল্ডিংয়ে অবস্থিত বঙ্গীয় ওয়াকফ প্রশাসকের কার্যালয়ে ১৯৩৪ সালের বঙ্গীয় ওয়াকফ আইনের ৪৪ ধারা মোতাবেক মরিয়ম বেগম ওয়াকফ এস্টেটকে ওয়াকফ সম্পত্তি হিসেবে তালিকাভুক্ত করার লক্ষ্যে বঙ্গীয় ওয়াকফ কমিশনার সাহেব বাহাদুর বরাবর প্রয়োজনীয় দালিলিক প্রমাণাদিসহ দরখাস্ত দাখিল করেন। ফলে মরিয়ম বেগম ওয়াকফ এস্টেটকে বঙ্গদেশীয় মহামান্য ওয়াকফ বোর্ড ও কমিশনার কর্তৃক উক্ত এস্টেট ওয়াকফ আইনের ৪৬ (ক) ধারার বিধান মোতাবেক ওয়াকফ সম্পত্তি হিসেবে মীমাংসিত হইয়া ওয়াকফ বোর্ডে রক্ষিত রেজিস্ট্রারিতে ৪,৭২১ নং ওয়াকফ এস্টেট হিসেবে ইনরোলড হয়। পরবর্তীতে মির্জা মোহাম¥দ আশরাফ ২২ নভেম্বর ১৯৩৭ তারিখে সেন্ট্রাল কোর্ট, ২ চিত্তরঞ্জন এভিনিউয়ে অবস্থিত ওয়াকফ বোর্ডের কমিশনার বরাবর কমিশনার কর্তৃক পূর্বে প্রেরিত পত্র, যার স্মারক নং সি/৮২৫১, তারিখ ১০ নভেম্বর ১৯৩৭-এর জবাবে মরিয়ম বেগম ওয়াকফ এস্টেটের তার মালিকানার স্বপক্ষে ঢাকা কালেক্টরির ৯,৯৫৪ ও ৯,৯৬৫ নং তৌজিভুক্ত তালুকদার ও কবুলিয়ত প্রজাদের দুটি পৃথক তালিকাসহ দালিলিক প্রমাণাদি দাখিল করে তাকে উক্ত ওয়াকফ স্টেটের দখলদারের ক্ষমতা প্রদান ও মোতওয়াল্লী হিসেবে গ্রহণ করার জন্যে আবেদন করেন। আবেদনে তিনি ৯,৯৫৪ নং মহালের চার আনা ১০ গণ্ডা (ষোলো আনা) ও ৯,৯৬৫ নং মহালের তিন আনা ১০ গণ্ডা (ষোলো আনা) শেয়ার দাবি করে নির্দিষ্ট প্রজাদের নিকট থেকে খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে তার নামে দুটি মহালের নাম জারি করতে এবং ঢাকা কালেক্টরির ‘ডি’ রেজিস্ট্রার সংশোধন করতে ঢাকা কালেক্টরকে আদেশ প্রদান করার জন্যে অনুরোধ করেন। মির্জা মোহাম্মদ আশরাফ স্বাক্ষরিত এক প্রতিবেদনে মরিয়ম বেগমের ওয়াকফ সম্পত্তির মূল্য উল্লেখ করেছেন তৎকালীন সময়ের ২,০৫,০০০ টাকা। উপর্যুক্ত বিষয়ের প্রামাণিক দলিলাদির ছায়ালিপি এই নিবন্ধের লেখকের নিকট রক্ষিত আছে।

অবশেষে মির্জা মোহাম্মদ আশরাফ তার আবেদনের প্রেক্ষিতে মরিয়ম বেগম ওয়াকফ এস্টেটের ৯,৯৫৪ ও ৯,৯৬৫ নং তৌজিভুক্ত তালুকের মোট দশ আনার স্বত্ববান ও মোতয়াল্লী হিসেবে ওয়াকফ আইনের ৪০ ধারার বিধান মোতাবেক বেঙ্গল ওয়াকফ বোর্ডের কমিশনার কর্তৃক গণ্য হন।

অতঃপর মির্জা মোহাম্মদ আশরাফ সম্পূর্ণ ওয়াকফ এস্টেটের মোতয়াল্লীভাবে দখল করে ঢাকা দ্বিতীয় সাব-জজ আদালতের ১৯৪০ সালের ২১ নং দেওয়ানী মোকদ্দমা স্থাপনে ডিক্রি লাভ করেন এবং ঢাকা কালেক্টরিতে ওয়াকফকৃত উপর্যুক্ত মহাল (৯,৯৫৪ এর ১৩,১৭৩, ১৫,৭৮৩ ও ১৫,৭৮৪ এবং ৯,৯৬৫ নং মহাল) ও অন্যান্য মহালসমূহের নামজারিক্রমে মোতওয়াল্লীভাবে মালিক ও দখলকার হিসেবে ঢাকা কালেক্টরিতে রক্ষিত ‘ডি’ রেজিস্ট্রার সংশোধন হয়ে মির্জা মোহাম্মদ আশরাফের নাম লিপিবদ্ধ হয়। উক্ত দ্বিতীয় সাব-জজ আদালতের উক্ত মামলার রায় ও ডিক্রি দ্বারা মরিয়ম বেগম ওয়াকফ এস্টেটের ওয়াকফ প্রভৃতির বিরুদ্ধে যেসব হস্তান্তর বা অষরবহধঃরড়হ হয়েছে, উক্ত সমুদয় হস্তান্তরই আইনত পণ্ড, ভুয়া, তঞ্চকী ও যোগসাজসী বলে সাব্যস্ত হয়েছে এবং উক্ত ডিক্রিবলে উপর্যুক্ত ওয়াকফ মহালান্তর্গত যে সমুদয় পত্তনী, সিকিমী পত্তনী, দত্ত পত্তনী বা অন্য প্রকার স্থায়ী মধ্যস্বত্বের লিপি সেটেলমেন্ট জরিপী (সিএস) রেকর্ডে প্রকাশ পায়, তা সমুদয়ই পণ্ড, ভুয়া, বে-আইনি, তঞ্চকী ও যোগসাজসী। অতঃপর তিনি অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) ঢাকার কোর্ট বরাবর বিবাদী রাজচন্দ্র কর্মকারের বিরুদ্ধে একটি মিস কেইস (নং ৬৪) দাখিল করেন, পূর্বের বে-আইনিভাবে নামজারি বাতিল ও মরিয়ম বেগমের ওয়াকফ এস্টেটের মোতওয়াল্লী হিসেবে তার ব্যক্তিগত বার্ষিক আর্থিক ভিত্তি নির্ধারণের জন্যে। বার্ষিক আর্থিক ভিত্তি নির্ধারণের পর মির্জা মোহাম্মদ আশরাফ রাজচন্দ্র কর্মকার, আলীমুদ্দিন মৌলভী ও অন্যান্য ভূমধ্যধিকারীর নিকট অদ্যাবধি ১ নং তফসিলের তার আইনত প্রাপ্ত জোতের ষোলো আনার অর্থ এবং ২ নং তফসিলের সমুদয় পথকরসহ বকেয়া কর পরিশোধের জন্যে তাগাদাপত্র প্রেরণ করেন। কিন্তু বিবাদীগণ উক্ত টাকা পরিশোধ করেন নাই। ফলত পরবর্তীতে মির্জা মোহাম্মদ আশরাফ উপর্যুক্ত বে-আইনি হস্তান্তরের জন্যে দাতা মীর গোলাম হোসেন ও হস্তান্তর গ্রহীতা পত্তনী তালুকদার রাজচন্দ্র কর্মকার, ভূমধ্যধিকারীর বিরুদ্ধে ক্ষতিপূরণ চাহিয়া ঢাকা মুন্সেফ আদালতে এক নালিশী মামলা দায়ের করেন। এদিকে আমীরগঞ্জ, করিমগঞ্জ ও নলবাটায় রাজচন্দ্র কর্মকার থেকে চার আনা দরপত্তনধারী সদর উদ্দিন বেপারীগণ খাজনা আদায়ের চেষ্টা করলে আমীরগঞ্জ নিবাসী আফসার উদ্দিন মৌলভী, ছৈযুদ্দিন মৌলভী, সুরুজ খা এবং করিমগঞ্জের কাবিল মৃধা, পিতা : আলাবক্স মৃধা, ওয়াকফ সম্পত্তিতে বে-আইনিভাবে পত্তন পাওয়া জমিতে খাজনাদি পরিশোধে অস্বীকার করেন এবং সদর উদ্দিন বেপারী গংদের বিরুদ্ধে নারায়ণগঞ্জ মুন্সেফ আদালতে নালিশী মামলা দায়ের করেন, যা এই প্রতিবেদক খাঁ বাড়ির রুকুন উদ্দিন খাঁ’র মুখে ও অন্যান্য বয়স্কদের মুখে শুনেছেন।

প্রাপ্ত উপর্যুক্ত কার্যাদি সমাধান্তে পূর্ব বাংলায় কৃষক প্রজা পার্টি আনিত জমিদারি উচ্ছেদ তথা রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন ১৯৫০ এসে যাওয়ায় মির্জা মোহাম্মদ আশরাফ জমিদার সাহেব মরিয়ম বেগমের জমিদারি ও খলিলুর রহমানের খারেজী তালুকের নিজ স্বত্ব ও মোতয়াল্লী হিসেবে বেশি সুবিধা করতে পারেননি। খাজনা আদায়ের রশিদ প্রমাণে দেখা যায়, এ-জনপদে মির্জা মোহাম্মদ আশরাফ ২৪ আষাঢ় ১৩৬৫ বঙ্গাব্দ তারিখ পর্যন্ত কর্মচারীসহ নিজে খাজনাদি আদায় করতে পেরেছিলেন। অবশেষে মির্জা মোহাম্মদ আশরাফ ১৯৮১ সনের ১৭ জুলাই ৮১ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন (মৃত্যুসনদ মোতাবেক)। মৃত্যুকালে তিনি পাঁচ ছেলে ও দুই কন্যা রেখে যান। প্রথম পুত্রের  নাম মির্জা খোরজো আয়ায, দ্বিতীয় পুত্রের নাম মির্জা খুসরু, তৃতীয় পুত্রের নাম মির্জা খোরুম, চতুর্থ পুত্রের নাম মির্জা দিলশাদ ও পঞ্চম পুত্রের নাম মির্জা নেহাল। কন্যাগণ হলেন নাজমা ও নিজাকাত। পুত্রদের মধ্যে দুজন জীবিত আছেন। একজন ইরানে বসবাস করেন এবং বাংলাদেশে মির্জা নেহাল সাহেব সপরিবারে বসবাস করছেন। জাতীয় পরিচয়পত্রে মির্জা নেহাল সাহেবের ঠিকানা উল্লেখ করা হয়েছে ১ নং ইটাওয়ালা ঘাট, ইসলামবাগ পশ্চিম, লালবাগ, ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন, ঢাকা। এনআইডি নং ২৩৫৯১৪০০২৩। বর্তমানে তিনিই বাপ-দাদাদের হারানো জমিদারির প্রামাণি, দলিল-দস্তাবেদ সংরক্ষণ করছেন, যদি কখনো হারানো জমিদারি পুনরুদ্ধার বা ক্ষতিপূরণ আদায়ে প্রামাণ্য দলিল-দস্তাবেজের প্রয়োজন হয়।

উপর্যুক্ত আলোচনা, বিভিন্ন প্রামাণিক দলিল-দস্তাবেজ, তৎকালীন ভূমি বন্দোবস্ত, একসালা, দশসালা, চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত আইন ও ওয়াকফ আল আওলাদ আইন পর্যালোচনায় প্রতীয়মান হয় যে, আমার আমীরগঞ্জ গ্রাম বা এ-জনপদে স্থানীয় কোনো ভূস্বামী জমিদার বা তালুকদার শ্রেণির কেউ ছিলো না। দাউদকান্দির রাজচন্দ্র কর্মকার এই জনপদের খলিলুর রহমান নামীয় খারেজী তালুকের কিয়দাংশ (যা মরিয়ম বেগমের জমিদারি ও পরে মরিয়ম বেগম ওয়াকফ এস্টেট হিসেবে গণ্য ছিলো) অবৈধভাবে মীর গোলাম হোসেন থেকে পত্তন নিয়েছেলেন। তবে একসময়ের হাসনাবাদ নিবাসী আটকান্দি মসজিদের প্রতিষ্ঠাতা মৌলভী আলীমুদ্দিন এবং তার সুযোগ্য পুত্র মৌলভী আবু আহম্মদ বাছেতের মির্জানগর, আটকান্দি, বীরকান্দি, আব্দুল্লাপুরসহ ঢাকার কেরানীগঞ্জের মতো দূর জনপদে কয়েকটি বৈধ তালুক ছিলো, যা তিনি ইংরেজ নীলকর ও মুঘল ঘরানার জমিদার থেকে পত্তন নিয়েছিলেন। আলীমুদ্দিন মৌলভী তার পত্নী (বগুড়ার নবাবের মেয়ে) বিয়োগের পর আমীরগঞ্জ ও করিমগঞ্জের ১৩,১৭৩ নং মহালের তার আট আনার অংশ ওয়াকফ করে দেওয়ায় উক্ত গ্রামদ্বয়ের রায়তদের কোনো খাজনা পরিশোধ করতে হয় নাই। অনেকেই আমীরগঞ্জের সদু বেপারী গংদের দৃষ্টিনন্দন দ্বিতল কোঠাবাড়ি ও একতলা বৈঠকখানা দর্শন করে সদু বেপারী গংদের জমিদার মনে করে বিভ্রান্ত হন। মূলত তারা ছিলেন হলুদ, গুড়, পাটের বেপারী ও রেলওয়ে জমির ইজারাদার এবং  অবৈধ ও বে-আইনিভাবে প্রাপ্ত পত্তনী তালুকদার রাজচন্দ্র কর্মকারের অবশিষ্ট আট আনা পত্তনী তালুকের চার আনার মধ্যস্বত্বাধিকারী, যা তারা রাজচন্দ্র কর্মকারের পক্ষে খাজনা আদায় করার শর্তে প্রাপ্ত হয়েছিলেন। তবে মির্জা মোহাম্মদ আশরাফ মরিয়ম বেগমের জমিদারির আইনগত মোতওয়াল্লী হলে এবং আমীরগঞ্জ ও করিমগঞ্জের রায়তগণ সদু বেপারী গংদের খাজনা দিতে আপত্তি জানালে সদু বেপারী গং এই মধ্যস্বত্বের কোনো ফায়দা নিতে পারেন নাই। রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন ১৯৫০ পাশ হয়ে গেলে ১৯৫৭ সাল থেকে ভূমির মালিকানা হয়ে যায় রাষ্ট্রের। তখন থেকে বঙ্গীয় কৃষক ও রায়তগণ জমিদার ও তালুকদারদের পরিবর্তে রাষ্ট্রকে খাজনা দিতে শুরু করেন। (সমাপ্ত)


আমির হোসেন
গবেষক, আয়কর পরিদর্শক

আমীরগঞ্জের ইতিহাস | পর্ব ২

0

রাণী ভিক্টোরিয়ার আমলে ভূমি বন্দোবস্ত (১৮৫৭-১৯৪৭)
পরবর্তীকালে খলিলুর রহমান তালুকের অংশীদারদের উত্তরাধিকার বা বেনেফিশিয়ারগণ হাসনাবাদ মৌজায় আমীরগঞ্জ বা হাসনাবাদ বাজারের মূল অংশ তিনজন ভূমধ্যধিকারীর নিকট কবুলত পাট্টা দেন। পূর্বোক্ত হাসনাবাদ বাজারস্থ তিনটি  সিএস পর্চার খতিয়ান নং যথাক্রমে ৩৭৫, ৩৭৬, ৩৭৭।  সিএস পর্চার ক্রমানুসারে এই তিনটি ভূমধ্যধিকারীগণ হলেন (খতিয়ানের ক্রমানুযায়ী) আমীরগঞ্জের সোনা উল্লাহ ভূঁইয়া (পিতা : কোবাদ ভূঁইয়া), রহিমাবাদের হরচন্দ্র সাহা (পিতা : কিশোর সাহা) ও আমীরগঞ্জের সদর উদ্দিন বেপারী (পিতা : আছান উল্লাহ বেপারী)। খলিলুর রহমান তালুকের পশ্চিম অংশ, আড়িয়াল খাঁ নদের তীরঘেঁষা বর্তমান আমীরগঞ্জ ও বৃহত্তম করিমগঞ্জ, ১৩১৭৩ নং মহালটিকে রাজচন্দ্র কর্মকারের নিকট পত্তনী তালুক হিসেবে পত্তন দেয়া হয়। বর্তমানে উক্ত গ্রামদ্বয়ের সিএস পর্চা তার সাক্ষ্য বহন করছে। উল্লেখ্য, উপর্যুক্ত খলিলুর রহমানের খারেজী তালুকটি বিস্তৃত ছিলো আমীরগঞ্জের পূর্ব ও পশ্চিম চক করিমগঞ্জ, নলবাটা, আগানগর, হাসনাবাদ পূর্বপাড়া, পশ্চিমপাড়া, মীরকান্দি (বীরকান্দি), নেবুরকান্দি, আটকান্দি ও হাসনাবাদ বাজার পর্যন্ত। পরে আমার এক অনুসন্ধানে তার সঠিক ইতিহাস বের হয়ে আসে, যার বিস্তারিত বিবরণ সামনে পর্যায়ক্রমে আসবে। এ-সকল গ্রাম ছিলো খলিলুর রহমান তালুকের ৪ আনা ১০ গণ্ডার অংশ, যা জমিদার মরিয়ম বেগমের অংশ। অবশিষ্ট অংশ ছিলো অন্যান্য শরিকগণের। এখানে উল্লেখ্য যে, মৃত মরিয়ম বেগমের ১৩১৭৩ নং মহালের রায়ত ছিলেন পুটিয়ার রাম কুমার নাথ (ঠিকানা উল্লেখ করা হয়েছেÑ থানা : রায়পুরা, জেলা : নরসিংদী) নরসিংদী সদর উপজেলাধীন বীরপুরের রামারুদ্দিন, মুলকজান, রাধা গোবিন্দ সাহা ও হরি গোবিন্দ সাহা। বর্তমান এ-নিবন্ধ লেখার (১১ এপ্রিল ২০২২) খানিক পূর্বে আমার অগ্রজ জাকির ভাই (দলিল লেখক)-এর কল্যাণে আমাদের গ্রামের এক কৃষক পরিবার কর্তৃক জমিদারদের জমির খাজনা প্রদানের প্রমাণপত্র (প্রজার অংশ) দাখিলা আমার হস্তগত হয়। ২৪ আষাঢ় ১৩৬৫ বঙ্গাব্দ তারিখে আদায়কৃত ১৩৬০-৬১ বাংলা সনের খাজনার লিখিত দাখিলা পাঠে দেখা যায়, জিলা ঢাকা কালেক্টরির তৌজিভুক্ত ১৩১৭৩ নং মহাল, ১০ ওয়াকফ এস্টেট, থানা : রায়পুরা, ৩৭২ নং মৌজা হাসনাবাদ প্রকাশ রণভাওয়াল হিং ১, ষোল আনা মালিক দখলকার মোতোয়াল্লী মৌলভী মির্জ্জা মোহাম্মদ আশ্রাফ জমিদার সাহেব, সাকিন : ২৫ নং বড় কাটারা, থানা : লালবাগ, ঢাকা। উক্ত দাখিলায় মরিয়ম বেগম জমিদারির নিচে ব্র্যাকেটবন্দী খারিজা তালুকদার খলিলুর রহমানের নাম উল্লেখ আছে, প্রজার নাম ছমির খা (পিতা : মৃত আমির খাঁ, গ্রাম : আমীরগঞ্জ। দাখিলায় যার মাধ্যমে খাজনা প্রদান করা হয়েছে, তার দস্তখতে নাম লিখা আছে রুকুন উদ্দিন খাঁ (পিতা : ছমির খা)। সেই হিসেবে রুকুন উদ্দিন খাঁ’র সাথে দাখিলার সত্যতা নিয়ে আমার সাথে কয়েকবার আলাপচারিতা হয়। তিনি জানান, তিনি নিজে এই স্বাক্ষর দিয়েছেন এবং মির্জা মোহাম্মদ আশ্রাফকে স্বচক্ষে দেখেছেন। এটি পাওয়ার পর আমার এ-জনপদের পূর্বের জমিদার ও তালুকদারদের ধারণা পাল্টে যায় এবং আমি এ-জনপদের ভূমি মালিকানা ইতিহাসের এক তমসাচ্ছন্ন অধ্যায়ে পড়ি। ভাবতে থাকি, কে কার থেকে পত্তনী নিয়েছেন? এই জনপদের সিএস পর্চায় উল্লেখিত রাজচন্দ্র কর্মকার কার থেকে পত্তনী নিয়েছেন?  কারণ, দাখিলা পাঠে জানা যায় যে, এ-জনপদ ঢাকা (২৫ নং বড় কাটারা, থানা : লালবাগ) নিবাসী মুঘল অমাত্যের বংশধর মরিয়ম বেগমের ওয়াকফ এস্টেট এবং এই মরিয়ম বেগম ওয়াকফ এস্টেটের সর্বশেষ মোতয়াল্লী ও মালিক হলেন মির্জা মোহাম্মদ আশ্রাফ। কয়েক বছর পূর্বে আমার চাচাতো ভাই জনাব কাঞ্চনের কাছে স্থানীয় জমিদারদের নাম জানতে চাইলে তিনি ঢাকার লালবাগের এক মির্জা আলীর নাম বলেন, যিনি আমীরগঞ্জে আগমন করতেন মরিয়ম বিবির মাজারের বাতি খরচ নিতে। কাঞ্চন ভাই তার পিতা রমিজ উদ্দিন মুন্সির সাথে বালক বয়সে এই মির্জাকে সিকদার বাড়ি (বর্তমান চুন্নু ও ইকবাল ভাইদের বাড়ি), বড় বাড়ি (সদু বেপারীর বাড়ি) ও খাঁ বাড়িতে দেখতে পেয়েছেন। দাখিলা পাঠের পর প্রাচীন ঢাকার উল্লিখিত ঠিকানায় সফর করার ইচ্ছে জাগে। কিন্তু সরকারি চাকরি ও আমার অসুস্থতা এই সফরের প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়ায়। গত ১ এপ্রিল ২০২২ তারিখের কয়েক সপ্তাহ পূর্বে আমি ২৫ নং বড় কাটারা সফর করি এবং জমিদার মির্জা মোহাম্মদ আশ্রাফের খান্দানের সত্যতা পাই এবং তাঁর পুত্র-কন্যাদের নাম-ঠিকানা সংগ্রহ করি। আরো জানতে পারি যে, ২৫ নং বড় কাটারা, জমিদার মির্জা মোহাম্মদ আশ্রাফের বসত বাড়িটি ও তার পাশের ভিটি ১৯৮৬ সালে হাজী মোহাম্মদ সেলিম (একসময়ের বিএনপির এমপি, পরবর্তীতে আওয়ামী লীগের এমপি) কমিশনার থাকাবস্থায় খরিদ করে নিয়েছেন, যা বর্তমানে ৩০ নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যালয়। গত ১ এপ্রিল ২০২২ তারিখে বিকাল ৪ ঘটিকায় মরিয়ম বিবি ওয়াকফ এস্টেটের মোতোয়াল্লী মির্জা মোহাম্মদ আশ্রাফের ছেলে মির্জা নেহালের সাথে দেখা হয় এবং তার সাথে মরিয়ম বিবির জমিদারি ও ওয়াকফ এস্টেট নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয় এবং তিনি মরিয়ম বিবির জমিদারি ও ওয়াকফ এস্টেটের প্রায় সমস্ত দালিলিক প্রমাণাদির ফটোকপি আমাকে দেন। উক্ত প্রমাণাদি প্রাপ্তির পর উক্ত জনপদে জমিদারি ও তালুকদারির ইতিহাস আমাকে নতুন করে লিখতে হচ্ছে। প্রমাণাদি পর্যালোচনা করে অবগত হওয়া যায় যে, আমাদের এই জনপদসহ অন্যান্য স্থানের জমিদার ছিলেন মরিয়ম বেগম, যার ঢাকা কালেক্টরির তৌজি নং ৯৯৬৫ (সদর জমা ছিলো ১৭১৯ টাকা)। তবে রায়পুরার কয়েকটি ইউনিয়নে আমির উদ্দিন হায়দার ও মরিয়ম বেগমের যৌথ জমিদারি ছিলো। গুগলক্রমে বরদাখাত (ত্রিপুরার একটি পরগণার নাম) লিখে সার্চ দিলে একটি ফিচার আসে, সেখানে উপরে লেখা আছে, গভর্নমেন্ট গেজেট ১৮৯৪ সাল ১৩ই মার্চ এবং মরিয়ম বিবি হিং। ১৫ (চার আনা ১৫ গণ্ডা) পরগণা রণভাওয়াল, তৌজি নং ৯৯৬৫ নং জমিদারির অংশ দেখতে পাওয়া যায়। এই মরিয়ম বিবির জমিদারি বিভিন্ন জেলায়, বিভিন্ন পরগণায় তালুক অবস্থান ছিলো। যেমন : সাবেক ত্রিপুরা হালে কুমিল্লার হোমনা, মুরাদনগর ও দাউদকান্দি, সাবেক ফরিদপুর জেলার বেদেরগঞ্জ, সাবেক ত্রিপুরা জেলার হালে নারায়ণগঞ্জ জেলার বৈদ্যের বাজার, বর্তমান নরসিংদীর সাটিরপাড়ার তালুকদারের (সাটিরপাড়া বয়েজ ও গার্লস স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা ললিতমোহন রায় গং)-এর ঢাকা জিলার কেরানীগঞ্জের ২৭৬ নং তালুক, ঈশানচন্দ্র পাল গংয়ের ২৭৩ নং তালুক, মৌলভী আলীমুদ্দিন আহম্মদের ২৭৪ ও ২৭৭ নং তালুক, মৌলভী আবু আহাম্মদ আবদুল বাছেদের (যিনি মৌলভী আলীমুদ্দিনের পুত্র) ২৭৫ নং তালুক, আছমতন্নেছার ২৭৮ নং তালুকসহ সবই তপ্পা রণভাওয়াল পরগণাস্থিত, যার ভূমির অবস্থান ছিলো ঢাকা কেরানীগঞ্জ থানার ২৭৯ নং কামারঘোপ মৌজাস্থÑ এ-সকল ভূমিই মরিয়ম বিবির জমিদারি থেকে বন্দোবস্ত নেওয়া। জাহাঙ্গীরনগর পরগণার লালবাগ থানার লাখেরাজ এস্টেট, যার একজন মধ্যস্বত্বাধিকারী ছিলেন রায় আনন্দলোচন মিত্র, যা মরিয়ম বিবি ভারত সম্রাট থেকে লাখেরাজ সম্পত্তি হিসেবে বংশ পরস্পরায় মালিক হয়েছিলেন। এ-জনপদের পূর্বোক্ত আরেকজন তালুকদার ছিলেন, যার নাম খলিলুর রহমান। তার তালুকটি খারেজী তালুক ছিলো, যা অন্য কোনো বৃহৎ তালুক থেকে বের হয়ে নতুন মালিকানা সৃষ্টি হওয়াকে বোঝায়। এ-তালুকের অবস্থান ও জোত কবুলতদের বাসস্থান ছিলো বর্তমান রায়পুরা থানার আমীরগঞ্জ (বর্তমানে লেখকের জন্মস্থান) বৃহত্তর করিমগঞ্জ, হাসনাবাদ ও হাসনাবাদ বাজার, নলবাটা, আগানগর, মির্জানগর, আটকান্দি, চরসুবুদ্ধি, হাইরমারা ইউনিয়নসহ বীরকান্দি, মেহেন্নাঘর, আদিয়াবাদ, খাস উল্লাহ, পুটিয়া ও বীরপুরে (নরসিংদী)। খলিলুর রহমান তালুকের ঢাকা কালেক্টরির তৌজি নং ৯৯৫৪ এবং তার  (খারেজী তালুক খলিলুর রহমান), যার সদর জমা ২১০ টাকা। এ-তালুকে হাসনাবাদ মৌজাস্থ আরেকটি ঈশানচন্দ্র পালের ১০৪ নং মধ্যস্বত্ব দেখতে পাই, যার জোতের মালিক ছিলেন সোনা গাজী এবং দখলদার নাম হরিচরণ নাথ (পিতা : মৃত স্বরূপ নাথ)। এই খারেজী তালুকটি বিভিন্ন মহালে যেমন : ১৩১৭৩, ১৫৭৮৩ ও ১৫৭৮৪-এ বিভক্ত ছিলো। উক্ত তালুকের চার আনা ১০ গণ্ডার মালিক ছিলেন এই মরিয়ম বিবি। উপর্যুক্ত পরগণায় বিভিন্ন তালুক নিয়ে গঠিত ছিলো মরিয়ম বিবির জমিদারি।

কে এই জমিদার মরিয়ম বেগম
মরিয়ম বেগমের পিতার নাম জানা না গেলেও তার এক ভাইয়ের নাম ছিলো ইয়াদ ওয়ারেছ। তিনি মীর গোলাম হোসেনের পিতা ছিলেন। মরিয়ম বেগমের স্বামীর নাম সৈয়দ আলী মেহেন্দী খাঁ বাহাদুর, মেয়ের নাম খায়রুন নেছা ওরফে নতে বেগম এবং খায়রুন নেছার স্বামীর নাম মীর গোলাম হোসেন। খায়রুন নেছার কন্যার নাম মরিয়ম নেছা বেগম। উল্লেখ্য যে, এখানে দুইজন মরিয়মের নাম পাওয়া যায়, যার একজন হলেন জমিদার মরিয়ম বেগম এবং অপরজন জমিদার মরিয়ম বেগমের মেয়ের ঘরের নাতনি মরিয়ম নেছা বেগম। মরিয়ম নেছা বেগমের নিজ বসতির ঠিকানা ওয়াকফ ও মীর গোলাম হোসেন কর্তৃক মির্জা মোহাম্মদের নিকট বিক্রিত দলিলে নিম্নোক্তভাবে উল্লেখ করা হইয়াছে :

“ঢাকা জেলার সদর পুলিশ স্টেশন মহালে চাঁদখার পোল স্থিত মৃত মরিয়ম নেছা বেগমের নিজ বসতি ভাদ্রাসন বাড়িময় নিষ্কর ভূমি তাহার চৌহদ্দি পশ্চিমে সড়ক দক্ষিণে কুচা রাস্তা উত্তরে মহালে আলি নকিছ ডেউরী স্থিত লাখেরাজ জমি পূর্বে মৃত ফজলে মিরনের জমিন।”

সহোদর ভ্রাতার পুত্র ও কন্যা খায়রুন নেছার স্বামী জনাব মীর গোলাম হোসেনকে মোতাওয়াল্লী নিযুক্ত করেন এবং উল্লিখিত ওয়াকফকৃত সম্পত্তির নিকট উপস্বত্ব হইতে সুবিধাপ্রাপ্ত হিসেবে তার ঘনিষ্ট আত্মীয় কতিপয় ব্যক্তিদিগের পুত্র, পৌত্রাদি ও ওয়ারিশানক্রমে মাসিক ৭৮ টাকা হিসেবে বার্ষিক ৯৩৬ টাকা এবং অপর কয়েক আশ্রিত ব্যক্তিকে তাদের জীবদ্দশা পর্যন্ত মাসিক ৫ টাকা হিসেবে বার্ষিক ৬০ টাকাসহ মোট ৯৯৬ টাকা খোরপোষ দেওয়ার নিয়ম অবধারিত করেন। ঐ-সম্পত্তির নিট লাভ হতে যা উদ্বৃত্ত হবে, তা দ্বারা ওয়াকফকারীর (মরিয়ম বেগম) বসতবাড়ি স্থিত ইমামবাড়া (শিয়া মুসলিমদের প্রধান এবাদতখানা হোসেনী দালান)-এর খরচ হবে মর্মে শর্তে উল্লেখ করেন। কিন্তু বঙ্গাব্দ ১২৭৪ সনের মাঘ মাসে মরিয়ম বেগমের মৃত্যু হওয়ার পর ৯৯৫৪ নং তালুক ঢাকা কালেক্টরির অফিস কর্তৃক বণ্টন হয়ে কথিত একরভুক্ত চার আনা ১০ গণ্ডা অংশের বাবদ স্বতন্ত্র একটি ছাহাম হয়ে ১৩১৭৩ নং তৌজি সৃষ্টি হয়েছে, যাতে আমীরগঞ্জ ও করিমগঞ্জের গ্রাম ও চকের জমিগুলিও উল্লেখ দেখতে পাওয়া যায়। উক্ত সৃজিত মহাল বা তালুকের বার্ষিক ৫৯৮ টাকা সদর জমা ধার্য এক মহাল সৃষ্টি হয়েছে। এটি ছাড়া এই তালুকে ১৫৭৮৩ ও ১৫৭৮৪ নং আরো দুইটি ভিন্ন মহাল বা তৌজি সৃষ্টি হয়। মরিয়ম বেগমের মৃত্যুর ওয়াকফের মোতাওয়াল্লী জনাব মীর গোলাম হোসেন বাংলা ১৩০৮ সনের ২১শে অগ্রহায়ণ ১৯০১ সালের ৭ই ডিসেম্বর তারিখে সম্পাদিত ৩৩ ফর্দে এক সাফকাবলা ওয়াকফ দলিলে উল্লেখিত মরিয়ম বেগমের জমিদারি ও খলিলুর রহমানের তালুকের তার স্বত্ব (মীর গোলাম হোসেনের), মরিয়ম বেগমের কন্যা খায়রুন নেছার হেবায় প্রাপ্ত সম্পত্তি, ফরাজে ও লাখেরাজ ভূমি ও পত্তনী মালিকানা মির্জা মোহাম্মদ, পিতা : মির্জা কাজিম ও মির্জা মোহাম্মদের আপন বোন জনাবা বনি বেগমের (মীর গোলাম হোসেনের ভাগনি) নিকট বিক্রয় করে নিস্বত্ববান হন। তখন ভূমি রেজিস্ট্রেশন আইন ১৯০৮ প্রণীত হয় নাই বিধায় ১৮৮২ খ্রিস্টাব্দের সম্পত্তি হস্তান্তর আইন মোতাবেক দলিল লেখক শ্রী জজ্ঞেশ্বর দত্ত সাং হাল ঢাকা কবিরাজের গল্লি, স্টেশন সদর, ঢাকা ও আপন সাকিন বা স্থায়ী ঠিকানা : টিন কোর্ট স্টেশন শ্রীনগর ৩৬০৪ নং (মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগর) এবং দলিলটি দুই টাকা মাত্র স্ট্যাম্পে প্রহলদ চন্দ্র ধর বেন্ডার কাঃ আদালতে জিলা : ঢাকা মির গোলাম হোসেনের সহি-স্বাক্ষরে ৩৩ ফর্দের আঠারো পাতার সাফকাবলা দলিল সংগঠিত হয়। আমার নিকট উক্ত দলিলের একটি ছায়ালিপি রক্ষিত আছে, যার চৌম্বক অংশ পরবর্তী পর্বে তুলে ধরা হবে।


আমির হোসেন
গবেষক, আয়কর পরিদর্শক

আমীরগঞ্জের ইতিহাস | পর্ব ১

0

কিশোর ও তারুণ্যকালীন সাহিত্য পাঠের হিরণ্ময় দিনগুলিতে কখন যে হৃদয়ের মণিকোঠায় ইতিহাস-ঐতিহ্যও স্থান করে নিয়েছে, তা সত্যিই ভাবনার বিষয়। প্রাথমিক স্কুলের পাঠ্যপুস্তকে সুলতানী ও মুঘল আমল সম্পর্কিত পাঠচর্চায় ঈসা খাঁ ও তাঁর মিত্র বারো ভূঁইয়া, চাঁদ রায়, কেদার রায়, মজলিস কুতুব ও গাজীপুরের ফজল গাজীর (পাহ্ লাওয়ান গাজীর বংশধর) নাম শুনেছি। মুঘলদের সেনাপতি মান সিংহের সাথে ঈসা খাঁ’র মল্লযুদ্ধের ছবি ও মুঘল সুবেদার শায়েস্তা খাঁ ও নবাব মুর্শিদকুলি খাঁ’র ছবি পাঠ্যপুস্তকে দেখেছি। ১৯৮২ সালে ব্রাহ্মন্দী স্কুল থেকে সোনারগাঁয়ে শিক্ষা সফরে গিয়ে লোকশিল্প জাদুঘর ও ঈসা খাঁ’র আমলের পুরোনো জীর্ণ দালানকোঠা, পানাম নগর ও পুকুর-পরিখা পরিদর্শন করে জমিদার ও রাজা-বাদশাহদের ইতিহাস জানতে আগ্রহী হয়ে ওঠি।

গ্রামের মুরুব্বিদের আড্ডা ও মজলিস থেকেও অনেক পুরোনো ইতিহাস সম্পর্কে অবগত হয়েছি। বয়োবৃদ্ধদের মুখনিঃসৃত ঐতিহাসিক শ্রুতি, বংশপরম্পরায় চলে আসা কিংবদন্তী ও লোককাহিনিগুলোও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। ইতিহাসের ভিত্তি ও কাঠামো এভাবে সংরক্ষিত হয়ে ইতিহাসবিদের চুলচেরা বিশ্লেষণ ও প্রামাণিক মানদণ্ডে ইতিহাস গ্রন্থিত হয়েছে। আমার গ্রামের মধ্যাংশে এরকম আড্ডা দুই জায়গায় ও দক্ষিণাংশে একটি আড্ডা বা মজলিস বসতো। সেখানে বেশি আলোচিত হতো বিগত ও চলমান রাজনীতি, পুরোনো দিনের দুর্ভিক্ষ, পুঁথিপাঠ, মাছধরা, গরুদৌড় ও গ্রাম্য কিংবদন্তী। মুচন্দালীর মুখে প্রথম শুনি, এই গাঁয়ের পূর্বনাম ছিলো ‘ঐছার চর’, যা পরবর্তী সময়ে আমীরগঞ্জ নাম ধারণ করে। যখন এখানে বসতিও গড়ে ওঠেনি, সে-কালে এখানে জাল্লাদের জালে প্রচুর ইছা (চিংড়ি) ধরা পড়তো। লোকমুখে প্রথমে ‘ইছার চর’ হিসেবে পরিচিত ছিলো এবং ইছা নামের অপভ্রংশ ‘ঐছার চর’ নাম ধারণ করে। পরবর্তীতে আমি ঢাকার জাতীয় আর্কাইভে এ-গ্রামের থাকবাস্ত জরিপের (পরগণা ম্যাপ, যা ১৮৫৬ সালে প্রণীত হয়) পাণ্ডুলিপি উদ্ধার করলে ‘ঐছার চর’ নামের অস্তিত্ব খুঁজে পাই। কিন্তু পরে জানতে পারি, তা ছিলো নীলক্ষ্যার ঐছার চর। আমার গ্রামের আদি নাম ‘ঐছার চর’ কি না, তার প্রামাণিক তথ্য উদ্ধারের চেষ্টা এখনো চালিয়ে যাচ্ছি।

সুলতানী আমলে আমাদের আমীরগঞ্জ জনপদ মেঘনা ও আড়িয়াল খাঁ’র পানির নিচে ছিলো। তখন এ-জনপদের কোনো অস্তিত্বও ছিলো না। তবে এ-জনপদের মাইল দুয়েক উত্তরে পুরান কুঠির বাজার সন্নিহিত আড়িয়াল খাঁ’র উত্তর ও পশ্চিম অংশে (লাল বা গৈরিক মাটির অঞ্চল) মানব বসতি ছিলো। কারণ, সোনাইমুড়ি পাহাড়, যা এ-জনপদ থেকে মাইল তিনেক উত্তরে, তার পাদদেশের এক গ্রামে গভীর নলকূপ স্থাপনকালে কয়েকশো ফুট নিচ থেকে ধানের ছরা উঠে আসলে প্রত্নতত্ত্ববিদগণ মনে করেন, দুই হাজার বছর পূর্বের এই গৈরিক ভূমিতে মানব বসতি ছিলো। কেননা, আমীরগঞ্জ থেকে প্রায় ১০ মিটার উঁচু গৈরিক এই ভূমি মধুপুর গড়ের বহিরাংশ।

বখতিয়ার খিলজির বঙ্গ বিজয়ের প্রাক্কালে পূর্ব বাংলায় মুসলিমদের কোনো অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় না। পূর্বে এই এলাকায় মুণ্ডা, সাওতাল ও রাজবংশীদের বসবাস ছিলো। আশরাফপুরের সুলতানী আমলের মসজিদটি মুসলিম অস্তিত্ব বহন করে বটে।

দিল্লির সুলতান গিয়াসউদ্দিন তুঘলক (১৩২০-১৩২৫)-এর সময় থেকে ইতিহাসের পাতায় সোনারগাঁয়ের নাম পাওয়া যায়। গিয়াসের পুত্র সুলতান মুহম¥দ তুঘলক (১৩২৫-১৩৫১)-এর সময় সোনারগাঁয়ের শাসনকর্তা ছিলেন বাহরাম খান (১৩২৮-১৩৩৮)। ১৩৩৮ সালের বাহরাম খানের মৃত্যুর পর তাঁর সিলাহদার (বর্ম-রক্ষক) ফখরউদ্দীন মুবারক শাহ শাসন ক্ষমতা দখল করে সোনারগাঁকে স্বাধীন বলে ঘোষণা করেন। সুলতান ফখরউদ্দীন মুবারক শাহের আমলের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হচ্ছে মরক্কোর পর্যটক ইবনে বতুতার বাংলা সফর। তিনি সম্ভবত ১৩৪৬ সালে তাঁর রাজধানী সফর করেন। বাংলা ভ্রমণকালে ইবনে বতুতার বিবরণীতে রায়পুরা, নবীনগর ও নরসিংদী সদরের চর এলাকার গ্রামগুলোর নৈসর্গিক সৌন্দর্য ও নান্দনিকতার চিহ্ন পাওয়া যায়। তাঁর আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘নিহালা’ থেকে জানা যায়, তিনি সোনারগাঁয়ের স্বাধীন সুলতান ফখরউদ্দীন মুবারক শাহের সময় ১৩৪৬ সালের জুলাই মাসে চাটগাঁও (চট্টগ্রাম) দিয়ে বঙ্গে প্রবেশ করে একমাসে কামরূপ ভ্রমণ করে সিলেটে হযরত শাহজালালের সাথে সাক্ষাত করেন এবং তিনদিন তাঁর আতিথেয়তা গ্রহণ করেন।

সিলেট থেকে সোনারগাঁ আসার পথে তিনি সুরমা নদী দিয়ে এসে এ-জনপদের অতি নিকটে মেঘনা নদী দিয়েই পনেরো দিনে সোনারগাঁ আসেন। তিনি মেঘনা নদীর দু’পাড়ের প্রাকৃতিক শোভায় মুগ্ধ হয়েছিলেন। দিগন্ত বিস্তৃত শস্য ¶েত্র, নদীপথের বাঁকে বাঁকে গ্রাম ও কিছুদূর পরপর হাট-বাজার, চারিদিকে সবুজের সমারোহ দেখে তাঁর বিবরণীতে উল্লেখ করে মন্তব্য করেন, তিনি যেন বাগানের মধ্য দিয়ে চলেছেন। তিনি যখন সুরমা নদী পেরিয়ে আসছিলেন, তখন তাঁর অভিব্যক্তি এমন হয়েছিলো যে, মিশরের নীল নদের তীরভূমির স্মৃতিকথাই তাঁকে বারবার স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলো।

আমীরগঞ্জের মনুষ্যবসতি, ভূমিচাষ, জমিদার, তালুকদার, পত্তনীদার ও ভূমধ্যধিকারীর উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ
মুঘলদের পূর্ব বাংলা জয়ের পর সীমান্ত অঞ্চলের জেলাগুলোর ন্যায় ঢাকা জেলাও (সোনারগাঁ) বহিঃআক্রমণের শিকার হয়েছিলো। মুঘল যুগের প্রথমদিকে এ-জনপদে সবেমাত্র নদী ও জলাশয়ের উঁচু পাড়গুলোতে মনুষ্যবসতি গড়ে ওঠতে থাকে। বর্তমান রায়পুরা থানার আমীরগঞ্জ ইউনিয়নসহ পশ্চিমাঞ্চলীয়  আটটি ইউনিয়নের অধিবাসীগণ ঝোপ-জঙ্গল পরিষ্কার করে ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনার উদীয়মান চর ও উঁচু ভূমিতে নিজেদের আবাসস্থল নির্মাণ করে। তারা নিকটের ও দূরের জমিতে ধান, আখ, তিল, সরিষা ও বিভিন্ন সবজির চাষাবাদ করতো। নতুন শাসক মুঘলরা এসে বহিঃআক্রমণ থেকে বিজিত অঞ্চল রক্ষা ও রাজস্ব বৃদ্ধির জন্যে এ-জনপদের কতোগুলো মহাল (বর্তমান নরসিংদী জেলার মেঘনার উদীয়মান চরসমূহ, যেমন : জোয়ার হাসনাবাদ মৌজার হাইরমারা, দড়িহাইরমারা, চরমধূয়া, মধ্য মৌজার বিরগাঁও, আমীরাবাদ, লক্ষ্মীপুরা, গাজিপুরা, মরিয়মনগর, হাইরমারা, দড়িহাইরমারা, ফতেপুর, বীরকান্দি, আদিয়াবাদ, রহিমাবাদ, হাসনাবাদ) মুঘলদের সেনা ও উচ্চ রাজকর্মচারীর নিকট বন্দোবস্ত দেন।

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ও ইংরেজ আমলে এ-জনপদের ভূমি বন্দোবস্ত (১৭৬৫-১৮৫৭)
১৭৫৭ সালের ২৩ জুন এ-দেশীয় রাজবল্লভ, উমিচাঁদ, ঘসেটি বেগম, মীরজাফরসহ অনেকে লর্ড ক্লাইভের সাথে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়ে পলাশীর প্রান্তরে দেশপ্রেমিক সিরাজউদ্দৌলার পতন ঘটায়। ফলে সুবিধাবাদী মুসলিম ও ষড়যন্ত্রপিয়াসী বর্ণহিন্দুদের জয়জয়কার হয়। মুঘল আমল থেকেই চতুর বর্ণহিন্দুগণ মুসলিমদের সহযোগী হিসেবে অভিনয় করে মুর্শিদাবাদের রাজকর্মচারী হিসেবে নিয়োগ পেতে থাকে। ১৭৬৫ সালের ১২ আগস্ট ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তৎকালীন মুঘল বাদশাহ দ্বিতীয় শাহ আলমের নিকট থেকে বাংলা, বিহার ও ওড়িষ্যার দেওয়ানী লাভ করে। পূর্বের মুঘল যুগে দেওয়ান ও সুবেদার মুর্শিদকুলি খাঁ তাঁর মালজামিনী রাজস্বনীতিতে বাংলায় ভূমি রাজস্ব আহরণে এক নবপ্রথার আনয়ন করেন। অধিক রাজস্বের আশায় তিনি অনেক সম্ভ্রান্ত মুসলিমদের জমিদারি কেড়ে নিয়ে অমুসলিম হিন্দুদের নামে জমি বন্দোবস্ত দিতে থাকেন, যারা পূর্বে মুর্শিদাবাদে তাঁর সেরেস্তায় গোমস্তা পেশায় কর্মরত ছিলেন। এমন দুজন জমিদার ছিলেন ভাওয়াল জমিদার ও মুক্তাগাছার জমিদার। তাঁদের পূর্বের মুসলিম জমিদার ছিলেন গাজীরা ও ভাটির রাজা ঈসা খাঁ’র বংশধরদের বাইশ পরগণা। পরবর্তীতে লর্ড কর্নওয়ালিশ ১৭৯৩ সালে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত বিধিতে ভাওয়াল রাজা ও মুক্তাগাছার জমিদারি পাকাপোক্ত করেন।

কোম্পানি আমল (১৭৬৫-১৮৫৭)
এ-সময়ের গুরুত্বপূর্ণ দুটি ইতিহাস গ্রন্থ জেমস টেলরের ‘কোম্পানি আমলে ঢাকা’ ও উইলিয়াম উইলসন হান্টারের ‘দি ইন্ডিয়ান মুসলমানস’। গ্রন্থ দুটি থেকে অবহিত হওয়া যায়, নবাব সিরাজের পরাজয়ের পর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলমের নিকট থেকে ২৫,০০,০০০ + ৫৫,০০,০০০ টাকায় বাংলা, বিহার ও ওড়িষ্যার দেওয়ানী লাভ করে। শর্ত মোতাবেক, সম্রাট পাবেন ২৫,০০,০০০ টাকা এবং সুবে বাংলার নায়েব নিজামতের জন্যে খরচ হিসেবে পাবেন ৫৫,০০,০০০ টাকা। দেওয়ান রেজা খান কোম্পানির হয়ে দেওয়ানী পদ লাভ করেন। বাদশাহী লাখেরাজ বিধি ১৭৯৩ এবং অ-বাদশাহী লাখেরাজ ১৭৯৩ জারি করে কোম্পানি মুসলিম জায়গীরদার ও ধর্মীয় হিতকর কাজের নিমিত্তে প্রাপ্ত ভূমি (মুঘল সম্রাট কর্তৃক প্রদত্ত লাখেরাজ ভূমি) বন্দোবস্তকে নিয়ন্ত্রণ ও ক্রমান্বয়ে বিলুপ্ত করে দেয়। ফলে জরিপে দেখা যায় যে, পূর্ব বাংলায় শুধুমাত্র দুজন শরীফ মুসলিম ছাড়া কোনো মুসলিম জমিদার ছিলো না, তাঁরা ব্যতিত সকলেই হিন্দু জমিদার ছিলেন।

এখানে উল্লেখ্য যে, ভাওয়াল পরগণার জমিদার ছিলেন ফজল গাজী। তিনি পবিত্র হজ্বব্রত পালনের উদ্দেশ্যে মক্কায় গমনকালে তাঁর জমিদারি সূর্যাস্ত আইনে নিলামে উঠলে ভাওয়াল রাজার পূর্বপুরুষ মুর্শিদাবাদের রাজস্ব কর্মচারী থাকাকালে দেওয়ান মুর্শিদকুলি খাঁ’র নিকট থেকে জমিদারি বন্দোবস্ত নিয়ে নেন। ঠিক তেমনই মুক্তাগাছার জমিদারের পূর্বপুরুষও মুর্শিদাবাদের রাজস্ব কর্মচারী থাকাকালে ঈসা খাঁ’র ২২ পরগণার আলাপ সিংসহ দুটি পরগণার জমিদারি ক্রয় করেন। নতুন হিন্দু জমিদারদের মধ্যে কয়েকজন পূর্বের মুসলিম জমিদারদের নায়েব ছাড়া সিংহভাগই ছিলো সুদী ব্যবসায়ী ও রাজকর্মচারী, যাদের জমিদারি পরিচালনায় কোনো অভিজ্ঞতাই ছিলো না।

কোম্পানি প্রথম পাঁচশালা ইজারা নীতিতে প্রথম বছরই বিহার থেকে রাজস্ব প্রাপ্ত হয় ৫০,০০,০০০ টাকা। কোম্পানি প্রথমে দেওয়ানী কাজে দ্বৈত নীতিতে দেশীয় অমাত্য রেজা খানকে নিয়োগ দেন। রেজা খানের কর্মচারীদের রাজস্ব ফাঁকি ও তছরুপের কারণে কোম্পানি অধিক মুনাফার আশায় এক বছরব্যাপী ইজারা দিতে থাকে। কিন্তু প্রাপ্তি কম হওয়ায় ইংল্যান্ড থেকে কোম্পানির হাল ধরতে আসেন ওয়ারেন হেস্টিংস। দ্বৈত শাসনের অবসান করে ১৭৭২ সালে রেজা খানকে বরখাস্ত করেন এবং দশশালা নীতিতে ভূমি বন্দোবস্ত দেন। তারপর লর্ড কর্নওয়ালিশ এসে দশশালা বন্দোবস্তকে ১৭৯৩ সালের বিধিতে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত হিসেবে ঘোষণা করে জমিদারদের জমির চিরস্থায়ী মালিক করে দেন।

পরগণা (তপ্পা রণ ভাওয়াল)
আমাদের এলাকায় প্রচলিত আছে যে, রায়পুরার ভূমি ১৯৫০ সালের রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইনের আগপর্যন্ত ময়মনসিংহ কালেক্টরিতে ছিলো। কথাটি যে কতো অসত্য, তার প্রমাণ পাওয়া যায় সাম্প্রতিককালে কেদারনাথ রচিত ‘ময়মনসিংহের বিবরণ’ নামক একটি পিডিএফ পুস্তক থেকে। উক্ত বিবরণ থেকে জানতে পারি, রায়পুরার প্রায় সমগ্র অঞ্চল পূর্বে ময়মনসিংহ কালেক্টরিতে ছিলো ঠিকই, তবে তা একটি তপ্পার অধীনে রণ ভাওয়াল পরগণার অন্তর্ভুক্ত হয়। আমাদের আমীরগঞ্জ, হাসনাবাদ মহালটি ঈসা খাঁ’র সময় মনুষ্যবসতির উপযোগী ছিলো না। মুঘলদের শেষ পর্যায়ে এখানে বসতি গড়ে ওঠে। বিবরণীতে উল্লেখ আছে : ভাওয়ালের উত্তর অংশের জমিদারী ভাওয়াল পরগণার অন্তর্ভুক্ত থাকিয়া আকবর শাহের সময়ে ভাওয়াল বাজু নামে পরিচিত ছিল। রাজস্ব-সচিব টোডরমল এই সমস্ত মহালের রাজস্ব ১৯,৩৫,১৬০ দাম বা ৪৮,৩৭৯/- নির্ধারণ করেন। ষোড়শ শতাব্দীতে ভাওয়াল পরগণায় বঙ্গীয় দ্বাদশ ভৌমিকের অন্যতম ভৌমিক ফজল গাজীর আবির্ভাব হয়। গাজী বংশ ইহার পূর্ব হইতে ভাওয়ালে আধিপত্য করতে ছিলেন। ডাঃ ওয়াইজ লিখিয়াছেন, খৃস্টীয় চতুর্দশ শতাব্দীতে পালওয়ান শাহের পুত্র কায়েম খাঁ দিল্লীর সুলতান হইতে ভাওয়াল পরগণার আধিপত্য গ্রহণ করিয়া লক্ষ্যা নদীর তীরে স্বীয় আবাসস্থল নির্ধারিত করেন। অতঃপর আকবর শাহের সময় ইহার বংশধর ফজল গাজী অপর একাদশ ভূমধ্যধিকারীর সহিত জোট বেঁধে সম্রাটের বিরুদ্ধাচারণ করিয়া স্বীয় স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। ঈসা খাঁ এই দ্বাদশ ভৌমিকের নেতা ছিলেন। ঈসা খাঁ আকবর শাহের বশ্যতা স্বীকার করিলে দ্বাদশ ভৌমিকের ক্ষমতা বিলুপ্ত হয়ে যায়। অতঃপর তিনি (ঈসা খাঁ) ভাওয়াল পরগণার উত্তর অংশ (রণ ভাওয়াল) সম্রাট আকবর শাহীর নিকট থেকে নিজ বাইশ পরগণার সঙ্গে বন্দোবস্ত করিয়া আনেন। এই উত্তর অংশেই পূর্বে আকবর সেনাপতি রাজা মানসিংহের সহিত এগার সিন্ধুতে ঈসা খাঁর যুদ্ধ হয়েছিল। এই যুদ্ধ বা রণস্থল হইতে ভাওয়াল পরগণার এই অংশের নাম হয় রণ ভাওয়াল। ক্রমে ঈসা খাঁর বংশধরগণ রণ ভাওয়ালকে আলাপ সিংহের অন্তর্ভুক্ত করিয়া নিজ নিজ বিভাগ ক্রিয়া সম্পাদন করেন। অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রথম ভাগের নবাবী আমলের কাগজপত্রে (নবাব মুর্শিদকুলি খাঁর ১৭২৭ সন পর্যন্ত) রণ ভাওয়ালকে অন্তর্ভুক্ত তপ্পা বলিয়া উল্লেখ করা হইয়াছে। ঈসা খাঁর বংশের পর এই তপ্পা ঢাকার মোগলদিগের হস্তগত হয়, মোগলরা রণ ভাওয়ালের তালুকগুলোকে তাদের অনুগত মোগল ও ইরানীদের নিকট নওয়ারা তালুক হিসাবে বন্দোবস্ত দেন এবং চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের পর পর্যন্ত, তাহাদিগের হস্তেই পরিচালিত হয়। ১৭৮৭ সনে এই তপ্পার (জমিদারী) ছয় আনা অংশ মহম্মদ করিম, ছয় আনা অংশ হোসেন আলী ও অবশিষ্ট চার আনা অংশ মহম্মদ আলীর নামে লিখিত ছিল। ইতিপূর্বে এই মহাল হইতে কয়েকটি বড় বড় তালুক বাহির হইয়া যাওয়ায়, মালিক গণের পক্ষে রাজস্ব চালাইয়া জমিদারী রক্ষা করা কঠিন হইয়া উঠে। অতঃপর চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের পর জমিদারীর অংশ রাজস্ব বাকীর জন্য নীলাম হইয়া যায় এবং ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর রাজস্ব বোর্ডের ১৭৯৪ সনের ২৬ শে ফেব্রুয়ারীর চিঠি অনুসারে ৩৪ টি তালুকসহ এই পরগণার (তপ্পা রণ ভাওয়াল) অংশ ঢাকা জেলার তৌজিতে পরিবর্তিত হয়। অতঃপর ইহার বাকী অংশ ত্রিপুরার কালেক্টরীর ভুক্ত হইয়া গিয়াছে। বর্তমান সময়ে ময়মনসিংহ জেলায় রণ ভাওয়ালের জমিদারীর কোন অংশ নাই। এই পরগণার মোট জমি ২,০৩,৫৪০ একর, পরিমাণ ফল ৩১৮.০৩ বর্গমাইল, ও গ্রাম সংখ্যা ২৭৯ টি।

বর্তমান সিএস পর্চায় আমীরগঞ্জ ইউনিয়নসহ রায়পুরা থানার পশ্চিমাঞ্চল এই তপ্পা রণ ভাওয়াল পরগণার অন্তর্ভুক্ত দেখতে পাওয়া যায়। আবার রণ ভাওয়ালের কিয়দংশ বরদাখাত (যা পূর্বে বরদাখাল নামে অবহিত ছিলো) পরগণা হয়ে ত্রিপুরা জেলার অন্তর্ভুক্ত হয়ে আবার ঢাকা কালেক্টরির তৌজিভুক্ত হয়। সর্বশেষ সিএস পর্চায় হাসনাবাদ, হাসনাবাদ বাজার, করিমগঞ্জ, আমীরগঞ্জ ও নলবাটা তালুকটি খারেজি তালুক হিসেবে খলিলুর রহমানের নামে রেকর্ডভুক্ত, যা ১৭৯৪ সালে ঢাকা কালেক্টরির তৌজিভুক্ত হয়। উল্লেখ্য, খলিলুর রহমানের তালুকটি ছিলো একটি স্বাধীন তালুক, যা মুঘল আমলে বন্দোবস্ত নেয়া। একে হুজুরী তালুক নামে ডাকা হতো। হুজুরী তালুকদারগণ জমিদারকে খাজনা না দিয়ে সরাসরি সরকার বাহাদুরকে খাজনা দিতেন এবং বংশানুক্রমে ভূমির মালিকানার অধিকারী ছিলেন। নওয়ারা তালুকের অন্য দুটি তালুক আমরা খুঁজে পাইÑ রহিমাবাদ ও মির্জানগরের মির্জা মুহাম্মদের খারেজি তালুক অন্যটি বালুয়াকান্দি ও আব্দুল্লাপুরের মীর আলী বা আমীর উদ্দিন হায়দার জমিদারের তালুক। মীরগণ ছিলেন মুঘল নৌ-অধ্যক্ষ। মীরদের অধীনে অনেক নৌ-সৈন্য থাকতো। পরবর্তী মুঘল সুবেদারদের অসম রাজ্য, কামরূপ ও ত্রিপুরা অভিযানে এখানকার নৌ-সেনাগণ অংশগ্রহণ করেন।

ভূমি বন্দোবস্তপ্রাপ্ত তালুকদার ও জায়গীরদারগণ সকলেই শরীফ মুসলিম ও মুঘলদের অমাত্য/ওমরাহ ছিলেন এবং তারা ইরান ও মধ্য এশিয়া থেকে ভারতে ভাগ্যান্বেষণে মুঘল দরবারে চাকুরির সুবাদে আসেন। খলিলুর রহমানের তালুকের হাসনাবাদ বাজারস্থ তিনটি সিএস পর্চা (যার খতিয়ান নং যথাক্রমে ৩৭৫, ৩৭৬, ৩৭৭ এবং প্রত্যেকটির উপরে স্বত্বের কলামে লেখা আছে ‘ভারত সম্রাট’) থেকে প্রতীয়মান হয় যে, তিনি মুঘল আমলের জায়গীরদার। এসব তালুক ১৮০২ সালের পূর্বের ছিলো এবং এরপর আর কোনো স্বাধীন তালুকের সৃষ্টি হয়নি। কারণ, এরপর থেকে ব্রিটিশ শাসকগণ এই স্বাধীন ও হুজুরী তালুকগুলো নানা অজুহাতে বাদশাহী ও অ-বাদশাহী লাখেরাজ বিধি ১৭৯৩ জারি করে অধিগ্রহণ করে অন্যদের বরাদ্দ দিয়ে দেন। এতে শরীফ মুসলমানগণসহ মধ্যবিত্ত পরিবারে ধস নেমে আসে। পরবর্তীতে আমাদের আমীরগঞ্জ জনপদটি এই রণ ভাওয়াল হিং-এর একটি তপ্পার অন্তর্ভুক্ত হয়।


আমির হোসেন
গবেষক, আয়কর পরিদর্শক

সুরেন্দ্রমোহন পঞ্চতীর্থের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পত্র বিনিময়

সুরেন্দ্রমোহন ভট্টাচার্য (পঞ্চতীর্থ) একাধারে একজন পণ্ডিত, ইতিহাসকার, নাট্যকার, ভাষাবিদ। গ্রামের ছাত্রটোলের পণ্ডিত ছিলেন। বাস করতেন গ্রামেই। বিশ শতকের যে-সময়ে তাঁর বিচরণ, সে-সময়ে ইতোমধ্যে বাঙলা ভাষা ও সাহিত্য আধুনিক যুগ অতিবাহিত করছিলো।

জন্মেছেন ১২৯৮ বঙ্গাব্দে, খ্রিস্টসন অনুসারে ঊনিশ শতকের শেষার্ধে, তৎকালীন মহেশ্বরদী পরগণার অজপাড়াগাঁ আলগিতে। বর্তমানে এটা নরসিংদী জেলার মাধবদী পৌরসভায় পড়েছে। এই গ্রামেই তাঁর বসবাস ও পণ্ডিতি করেছেন মৃত্যু অবধি। অবশ্য তাঁর মৃত্যু ঘটেছিলো ঢাকায়, ১৩৬১ বঙ্গাব্দে।

স্ত্রী ও কন্যার সাথে সুরেন্দ্রমোহন পঞ্চতীর্থ, সময়কাল ১৯২৯/৩০

‘পূর্ব্ববঙ্গে মহেশ্বরদী’ তাঁর বহুল পঠিত নন্দিত ইতিহাস-গ্রন্থ। এই গ্রন্থের সাথে সমকালীন পাঠকদের পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন শেকড় সন্ধানী লেখক হিসেবে খ্যাত সরকার আবুল কালাম (মৃত্যু : ৩০ আগস্ট ২০২১)। সুরেন্দ্রমোহন পঞ্চতীর্থের কোনো গ্রন্থেরই তেমন খোঁজ-খবর পাওয়া যায় না। অবশেষে এই অঞ্চলের সামাজিক-সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক নানা উপাদানসমৃদ্ধ এই ইতিহাস গ্রন্থের সন্ধান পাওয়া যায় দুষ্প্রাপ্য গ্রন্থ সংগ্রাহক শাহাদাত হোসেন মন্টুর কল্যাণে, যা পরে সরকার আবুল কালাম সম্পাদনা করেছেন সমকালীন পাঠকদের জন্যে। সেই সাথে এই গ্রন্থের কল্যাণে তাঁর আরো ২৬ টি গ্রন্থের নামের সন্ধান পাওয়া যায়। একনজরে তাঁর গ্রন্থরাজির দিকে চোখ বুলানো যাক :

১. বেদশতক (চারি বেদের একশত শ্রেষ্ঠ মন্ত্রের তাৎপর্য);
২. আদর্শ হিন্দু বিবাহ;
৩. বঙ্গ-গৌরব হোসেন শাহ (পঞ্চাঙ্ক নাটক);
৪. ভক্তের ভগবান (ছেলেদের নাটক);
৫. আত্মদান (ছেলেদের নাটক);
৬. দক্ষিণা (ছেলেদের নাটক);
৭. ছাত্র জীবনে শক্তি সঞ্চয়;
৮. ব্রাহ্মণ ও হিন্দু;
৯. গৃহস্থের শ্রীকৃষ্ণ সাধন;
১০. বিশ্ব-বীণা (বাংলা কবিতা);
১১. বিশ্ব-বীণা (সংস্কৃতে আবৃত্তি);
১২. যুগের মশাল জ্বালল যারা (কবিতা);
১৩. বরযাত্রী বা কন্যাদায়;
১৪. গোধন;
১৫. সমাজ;
১৬. ব্রাহ্মণ;
১৭. তীর্থরাজ;
১৮. প্রাচীনযুগে সমরবিজ্ঞান;
১৯. বানান সমস্যা সমাধান;
২০. ভ্রমণে সাহিত্য;
২১. সংহিতা যুগের সভ্যতা;
২২. ছেলেদের গল্প;
২৩. বড়দের গল্প;
২৪. অনার্য্য বিজয় (পঞ্চাঙ্ক নাটক);
২৫. বিবিধ প্রবন্ধ ও
২৬. পূর্ববঙ্গে মহেশ্বরদী।

‘পূর্ব্ববঙ্গে মহেশ্বরদী’ একটি আকর গ্রন্থ। ইতিহাসের পৃষ্ঠা উল্টালে গন্ধ পাওয়া যায় সে-সময়কার মাটির ঘরের মাটির মানুষদের। ডোয়াই, গারুতি, খালোমালোদের জীবনাচার ও সংগ্রামী জীবন। খুঁজে পাওয়া যায় আমাদের পূর্বপুরুষদের যাপিত জীবনচিত্র, লোকাচার, ধর্মীয় ও সামাজিক আচার-আচরণের। মনে হয় সুরেন্দ্রমোহনের চেতনায় ঐতিহাসিক সত্যের চেয়ে মুখ্য হয়ে দেখা দিয়েছে চলমান জীবন। সেই সময়ের বাস্তবতায় জীবন ছিলো নদীকেন্দ্রিক। যে-এলাকায় সুরেন্দ্রমোহনের বসবাস, সেই এলাকার পূর্বদিকে বহমান মেঘনা, যা মেঘনাদ বা মেঘন নামে পরিচিত ছিলো। পশ্চিমদিকে শীতলক্ষ্যা আর প্রায় মধ্যভাগ দিয়ে বয়ে গিয়েছে এক সময়ের খরস্রোতা ও ভয়ঙ্কর নদ ব্রহ্মপুত্র। তার শাখা হাড়িধোয়া, আড়িয়াল খাঁ। আজকের ব্রহ্মপুত্র দেখে সেই চিত্র কল্পনা করা কঠিন।

প্রফেসর মনিরুজ্জামান ‘মহেশ্বরদীর ইতিহাস’ সম্পাদিত গ্রন্থের ভূমিকায় বলেন, “আঞ্চলিক ইতিহাস রাজনৈতিক ইতিহাস অপেক্ষা ভিন্ন এবং সে কথা রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, যদুনাথ সরকার প্রমুখের ঐতিহ্য ভাঙতে গিয়ে নীহাররঞ্জন রায় তাঁর প্রথম জীবনে ‘বাঙ্গালীর ইতিহাস’ লিখে প্রমাণও করেন। তারপর থেকে ইতিহাস রচনার ধারাকে যাঁরা এগিয়ে নিয়ে এসেছেন সেই সোনার গাঁ, বিক্রমপুর, ময়মনসিং ভাওয়াল প্রভৃতি পরগণার ইতিহাসকারদের কথা এ গ্রন্থে উল্লেখিত হয়েছে। অধ্যাপক সুরেন্দ্রমোহন পঞ্চতীর্থের অবদানও তাঁদেরই তুল্য। এদের হাতে ইতিহাস রচনার যে আদর্শ গড়ে ওঠে তা জেলা গেজেটিয়ার ও বিভিন্ন ভৌগোলিক ও স্থানিক পরিচিতিমূলক গ্রন্থেও অনুসৃত হতে দেখা যায়।”

সুরেন্দ্রমোহন পঞ্চতীর্থ ভাষাবিদ ও ব্যাকরণবিদ হিসেবে কতোটা পণ্ডিত ছিলেন, তৎকালীন তাঁর নিজের সময়ের সাহিত্য-ইতিহাস ইত্যাদি বিষয়ে কতোটা প্রাজ্ঞ ছিলেন, তা আমরা সম্প্রতি আবিষ্কার করেছি  বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাথে তাঁর পত্রবিনিময়ের দুর্লভ তথ্যাবলি ও পত্রপাঠ করার মাধ্যমে।

গত শতকের তিরিশের দশকে এই পত্র বিনিময় ঘটেছিলো। তার মধ্যে দুটি পত্র নিয়ে কথা বলাই আমাদের আজকের আলোচ্য বিষয়।

আমরা এই পত্র বিনিময়ের তথ্যটি পাই সুরেন্দ্রমোহন পঞ্চতীর্থের নাতি সঞ্জয় ভট্টাচার্যের কল্যাণে। সুরেন্দ্রমোহনের তিন পুত্রের মধ্যে মধ্যম পুত্র হলেন সুখেন্দ্র ভট্টাচার্য। তিনি একজন প্রথিতযশা লেখক ও প্রাবন্ধিক ছিলেন। মূলত তিনি তাঁর সম্পাদিত এক গ্রন্থে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে সুরেন্দ্রমোহনের পত্র বিনিময়ের আলাপ তোলেন এবং দুটি পত্র উক্ত গ্রন্থে ছাপানোর ব্যবস্থা করেন। আর সেই সাথে ইতিহাসের এক দুর্লভ ঝাঁপি খুলে দেন।

এই পত্র বিনিময়ের মহৎ কর্ম ঘটেছিলো ১৯৩৬ সালে। সুরেন্দ্রমোহন পঞ্চতীর্থ রবীন্দ্রনাথকে প্রথমে এই পত্র লেখেন রবীন্দ্রনাথের বিশেষ গ্রন্থ পাঠপূর্বক ভাষা ও বানান সংক্রান্ত প্রমাদের জন্যে।  রবীন্দ্রনাথ সেই পত্রের উত্তরও দেন। আমরা রবীন্দ্রনাথের পাঠানো উত্তরসম্বলিত দুটি পত্রই পেয়েছি কেবল।

সুরেন্দ্রমোহনকে লিখিত রবীন্দ্রনাথের পত্র (পাতা ১ ও ২)

সুরেন্দ্রমোহন রবীন্দ্রনাথকে মহাকাব্য রচনার কথা বলেছিলেন সম্ভবত। রবীন্দ্রনাথ তার উত্তরে লেখেন, “…মহাকাব্য রচনা আমার আয়ত্তের অতীত, সেই কারণেই সহজেই তাহাতে আমার প্রবৃত্তি হয় নাই। মহাকাব্য সম্বন্ধে আমার অশ্রদ্ধা নাই, অক্ষমতা আছে।”

রবীন্দ্রনাথের এই স্বীকারোক্তি মহাকাব্য সম্বন্ধে তাঁকে জানা-বোঝার ক্ষেত্রে মূল্যবান মন্তব্যের দলিল হয়ে রইলো।

দ্বিতীয় পত্রে রবীন্দ্রনাথের কবিতায় শব্দের বানানগত ভুল, সংস্কৃত শব্দের প্রয়োগ এমনকি কবিতার পঙক্তি বিভ্রম নিয়েও আলাপ তুলেছেন। রবীন্দ্রনাথ প্রত্যেকটি বিষয়ের যথাযথ জবাব দিয়েছেন। আমরা অবশ্য রবীন্দ্রনাথের পত্র দেখিয়াই সুরেন্দ্রমোহনের পত্রের বিষয় উপলব্ধি করে কথা বলছি।

সুরেন্দ্রমোহনকে লিখিত রবীন্দ্রনাথের পত্র

সুরেন্দ্রমোহন পঞ্চতীর্থ একজন বহুভাষাবিদ পণ্ডিত ছিলেন। রবীন্দ্রনাথ যে তা সম্যক বুঝেছিলেন, তা তাঁর প্রত্যুত্তর দেখেই বোঝা যায়।

দুটি মূল্যবান পত্রেরই সন তারিখ উল্লেখ করেছেন রবীন্দ্রনাথ।  এই হিসেবে সময়কাল সম্পর্কে ধারণা করে সুরেন্দ্রমোহন ও রবীন্দ্রনাথের জীবন ও সাহিত্য নিয়ে গবেষকেরা প্রভূত উপকৃত হবেন, সন্দেহ নেই।

পত্রদুটির সাথে খামও উক্ত সস্পাদিত গ্রন্থে ছেপেছেন সুখেন্দ্র ভট্টাচার্য। আমরা খামের উপরে দেখতে পাই ‘আলগি, পো. মাধবদী’। রবীন্দ্রনাথের স্বহস্তে লিখিত ‘মাধবদী’ অবশ্যই মাধবদীবাসীর জন্যে বিরাট পুলকের বিষয় হতে পারে।

সুরেন্দ্রমোহনকে লিখিত রবীন্দ্রনাথের পত্রের খাম

রবীন্দ্রনাথ বাংলা সাহিত্যের এমন এক মহীরুহ যার সঙ্গে সমকালীন কবি-লেখক-পাঠক-গুণগ্রাহী সবার সাহিত্য সংশ্লিষ্ট বহুমাত্রিক যোগাযোগ ঘটেছিলো চিঠিপত্র আদান-প্রদানকে কেন্দ্র করে। আমরা রবীন্দ্রজীবনী এবং সমকালীন ও পরবর্তী বাংলা সাহিত্যের কবি-লেখকদের জীবনী ও চিঠিপত্র সংকলন থেকে এসব তথ্য জানতে পারি। একদম অজপাড়াগাঁর লেখক-পাঠকদের পত্রের জবাবও রবীন্দ্রনাথ সমান গুরুত্ব সহকারে প্রদান করতে কুণ্ঠা বোধ করেননি।

আমাদের সুরেন্দ্রমোহন পঞ্চতীর্থ এমন একজন ভাষাবিদ পণ্ডিত লেখক ছিলেন যে, বিশেষত রবীন্দ্রনাথের ‘সঞ্চয়িতা’য় ছাপা হয়ে যাওয়া কবিতার পঙক্তি বিভ্রম নিয়েও যিনি আলাপ তুলতে পারেন। তাঁর পত্রের জবাব রবীন্দ্রনাথ সম্মান ও গুরুত্বের সাথে দেবেন, এটাই কাঙ্ক্ষিত।

এই ঐতিহাসিক গুরুত্ববাহী পত্র বিনিময়ে গবেষকদের জন্যে নানা উপাদান তো রয়েছেই, নরসিংদীবাসী তথা মাধবদীবাসীর জন্যেও রয়েছে প্রভূত মর্যাদা ও ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকার বিরল অর্জন।