সাত কবির সাতটি কবিতা

বাঁধাকপি
ম হ সি ন  খো ন্দ কা র

শেফালির হাসির ভেতর
বিস্তৃত বাঁধাকপি, পরতে পরতে রেসিপি, তারপর
নরম রোদের রেজালা

বাইরে থেকে সস নিয়ে গেলেই
খুলে যায় বহুগামী দরজা, প্লেটে বেড়ে দেয় বোধের বুদবুদ
আর রকমারি রোদ!

চোখ দিয়ে কপি খুললেই খুশির পিনকোড,
রক্তের আশ্চর্য উল্লম্ফনে এসে দাঁড়াবে
ডবল হলিডে!

আমাদের পরাণ চাকমা
র বি উ ল  আ ল ম  ন বী

অং সু— ভুটানের ছেলেটা; আমাদের হোস্টেলে
গরু-শুকর কোনোটাই খায় না— গৌতমের ক্ষুদ্র সংস্কার
আমরা— মুসলমানেরা, ভুবনডাঙার মুসলিম পল্লী গিয়ে
গরুর মাংস কিনি খুব গোপনে— আমাদের শান্তিনিকেতনে।
হিন্দু ছেলেগুলি নাক সিটকায়।

চাকমা ছেলে পরাণ, ধর্ম, বিজু সাঁওতাল পাড়া ঘুরে
খুব সকালে কিনে নিয়ে আসে শুকরের মাংস।
মুসলমান ছেলেগুলি নাক সিটকায়।

পাশাপাশি বেসিনের ট্যাপ ছেড়ে মাংস ধুই
গরু আর শুকরের রক্ত জলে মিশে গড়িয়ে যায়
দুই চুলায় দুই জাতের মাংস রান্না হয়
দুই গন্ধ মিলেমিশে এক সুগন্ধ ছড়ায়।
সেই গন্ধে হোস্টেলমেট কুমিল্লার সৌধ দাশ
আইপিএল ফাইনাল ফেলে বমি করতে দৌড়ে বের হয়ে যায়।

অথচ আমাদের পরাণ চাকমা— উপজাতি ছেলে
লবণ চাখবে বলে
গরু আর শুকরের মাংস একসাথে মুখে নিয়ে
পরম তৃপ্তিতে চোখ বন্ধ করে খায়।

হোয়ার ইজ মাই ফ্রেন্ডস হাউজ : রিপন ইউসুফ
না জ মু ল  শা হ রি য়া র


তোমাদেরকে বিদায়, হে মাকোন্দো’র জনগণ
এই দিন সমাপ্ত হয়েছে।

এটা আমাদের উপর বন্ধ হয়ে আসছে, যেভাবে শাপলা ফুল বন্ধ হয়ে যায় তার নিজের আগামীকালের উপর। তোমাদেরকে বিদায় এবং ওই যৌবনকেও, যা আমি তোমাদের সঙ্গে কাটিয়েছি। তোমরা যারা পাহাড়ের উপরে বসবাস করো এবং বাতাসের সঙ্গে ঘুরে বেড়াও, তোমরা কি জানো না, স্বচ্ছতা হচ্ছে ক্ষয়প্রাপ্ত কুয়াশা? তোমরা কি দেখেছো এই নিঃশ্বাসের স্রোতকে, যা তোমাদেরকে ক্ষান্ত করে অথবা শুনেছো স্বপ্নের ফিসফিসানি শরতের অলিন্দে, যা আর কোনোদিন শুনতে পাবে না।


আমার অনুতাপ যখন আমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে ক্ষুধার্ত ঈশ্বরের জন্যে খাবার তৈরি করতো, তখন আমার চিৎকার বিদ্ধ করতো কোনো নগ্ন রাত্রিকে এবং ধীরে ধীরে সেই ঈশ্বর হয়ে ওঠেন আমার গুরু, যিনি অবিশ্বাস করতেন অন্য কোনো ঈশ্বরে, শেখাতেন সংশয় এবং আচ্ছাদিত জীবনের সুবাস। আমার ঘাম চাষ করতো সেই উর্বর নারীদের, যাদের ছিলো পাথুরে ঠোঁট। ও… বিষাদ ভারাক্রান্ত দেলগাদিনারা, তোমরা কি এখনো হামাগুড়ি দাও মৃত্যুর নিচে ধুলাবালির মাঝে? তোমাদের চোখে কি এখনো বাস করে সেই প্রাচীনকাল, যখন পৃথিবী মানুষ চিনতো না এবং সাথে নিজেকেও। তোমরা বিশ্বাস করতে আমার কথায় আর আমি বলতাম, একটা পাকা মাল্টাফলের দু’ফালি হচ্ছে তোমাদের স্তন।

তোমাদের নিঃশ্বাস ছিলো আমার সুগন্ধী
যা আমাকে পরিণত করেছিলো শিশিরে;
শিশির থেকে মেঘে, মেঘ থেকে বৃষ্টিতে।

আমার পিতার মতো আমিও ভালোবাসতাম জ্যোৎস্নার কেশ ও কামড়ানো আপেলের বীজ, যা বেঁচে থাকবে আমার শরীরে। আমার দেহ ভাসবে কোনো শ্বাশত পানপাত্রে সেই নিরবতার অপেক্ষায়, যারা গিলে ফেলে পাহাড়কে। যারা অন্ধকারের মতো দৃষ্টি হারিয়েছিলো এবং ধুলোর মতো হয়েছিলো বধির। আসলে তাদের সুখগুলো ছিলো তাদের মুখোশহীন দুঃখ। আমি তাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলাম সেই কবে।

মানুষের মতো আমার হৃদয় আমার ভেতরেই জেগে ওঠে আর আমাদের ভেতর একটি কণ্ঠস্বর তোমাকে ও আমাকে ডেকে নিয়ে যায় গাঢ় শীতলতায়, যেখানে নোঙর করা থাকতো আমাদের চোখ।

নষ্ট গর্ভ
চাঁ দ নী  মা হ রু বা

ঘনহরিৎ এ-শহরে, কোনোভাবেই কোনো ঋতুমতী নারীকে মনে করতে পারি না। তলপেটের মসৃণ নিয়ে একটা ছবি আঁকার চেষ্টা করি। ঠিক যেন ঋতুমতীদের ভুলের মতো। আনখ, লাল নাগলিঙ্গম ফুল।

তাদের জঠরকল থেকে বেরিয়ে আসা শিশুরা পাজরের উপর গ্যাট হয়ে বসে থাকে, ওসিরিসের সাথে করে সন্ধি।
মানুষের আদলে গড়া…
রক্ত-মাংসের ঢিবি
মানুষ দেখতে যেমন—

হে, ভুল করে তুলে নেয়া বীজ
নারীর জঠর বেদনা কেমন?

আদম আপেল ছিঁড়ে ফেলে পাতালের দেবতারা।
পবিত্র প্রাণীদের জন্মলগ্ন ঘুচে যায় অন্ধকারে।
ঘুমের মধ্যে ঝরে যায়, সকল ব্যথাতুর নারীদের গর্ভফুল।

যে-সম্পর্ক আলো পেলে মরে যাবে
ম মি ন  আ ফ্রা দ

অতো আলো সহ্য হয় না চোখে
তাই দরোজা-জানালা বন্ধ থাকে প্রায়শই
তাছাড়া ঘুমোতে যাই
রাত্রির শ্যাষ প্রহরে
ভোরের প্রারম্ভে আমারই ছোটো বোনের সাথে হয় দেখা
আমারই বিছানার পাশে পেতেছে সে মাশরুমের আখড়া
সকাল-সন্ধ্যা পারফিউম মাখার মতো জল মাখায়
স্যাঁতসেঁতে রাখে পরিবেশ
উপযুক্ত স্থানে উপযুক্ত কর্ম বটে
বাড়ির কোথাও এমন নিবিড় ঘন অন্ধকার নেই
যেমনটা আছে আমার কক্ষে
অই মাশরুমের মতো অন্ধকার চুষে আমি হচ্ছি বড়ো
প্রতিনিয়ত ভাবি,
শৈশবের আদর্শলিপির ভেতর
ভোরের মেইল ট্রেনের মতো
সূর্যের প্রারম্ভে জেগে ওঠবো
কিন্তু হয়নি কখনো
এখন এই মাশরুমের সাদা আবেদন
আমাকে জাগিয়ে দিচ্ছে
তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে।

সর্বনাশা
হা মি দা  আ ন জু মা ন

তোমার চোখে সর্বনাশা আগুন করে খেলা
পুড়িয়ে রঙিন করেছিলো আমার ছেলেবেলা।
সেই সে-নেশা আজো করে বিবশ বসন নদী
হাসির জাদু ছড়িয়ে তুমি আয়নাটা হও যদি।

রাত ডেকে যায় দূর ইশারায় তোমার কথা বলে
আর কী বাকি যখন তুমি পূর্ণিমা চাঁদ হলে!
পাই না ছুঁতে পেলব ত্বকে আবেশ মাখা মায়া
এই ধরা দাও, হাতছানিতে দেখি কেবল ছায়া।

জ্যোৎস্না আলো মৃদু হাসে কল্পলোকের চাবি
দাও না শত দুঃখ-জরা, তোমার কথাই ভাবি।
ভালোবাসার আঁচল পেতে বেঁচে থাকা ঠিক
স্মৃতির মিনার ঘড়ির কাঁটায় ডাক দিয়ে যায় টিক।

আসো যদি এই পথে আর সুবাস দেবে হাওয়া
কেমন করে এলোমেলো আমার নাওয়া-খাওয়া।
আলিঙ্গনে বাঁধতে যদি দু’হাত বাড়াও তবে
মিলন সুরে গাইবে ধরা আমার তুমি হবে।

তিনটি পৃথিবীর কথোপকথন
র ও ন ক  জা হা ন  মু ন

কবিকে জিজ্ঞেস করলাম, “তারপর ওই তিনটি পথের মধ্যে আপনি কোনটিকে বেছে নিলেন?”

কবি বললেন, “যতোটা ধীরে ধীরে নিয়ন বাতির আলোয় চোখ বুজে আসে, ততোটা তীব্র হয়ে ওঠে জীবনের সামনে খোলা থাকা তিনটি পথ। যে পথে পা বাড়িয়েছি কৈশোরের হারিয়ে যাওয়া আলোর সন্ধানে, সে-পথটি ছিলো আমার লেখার পথ, আঁকার পথ, নিজের বাঁচার পথ। অপর দুটি পথের কিনারায় কে ছিলো, তা কে জানে? শুধুই আবছা কিছু প্রতিবিম্ব ভেসে ওঠে চোখে। দ্বিতীয় যে-পথটি বেছে নিইনি আমি, তা ছিলো আমার হেরে যাওয়ার পর জিতে যাওয়ার পথ। যে-পথের শেষ প্রান্তে গেলে আমি দেখতে পেতাম হারিয়ে যাওয়া ‘আমি’র এক প্রতিচ্ছবি। যে-প্রতিচ্ছবিটি জোর করে বন্ধ করেছিলো কিছু দরজা; যে-দরজাগুলো ছিলো সহজ হওয়ার, নিজেকে হারিয়ে ফেলার, কিংবা মানুষকে ক্রমাগত আঘাত করতে দেয়ার সুযোগের। সেই দরজাটি আমি বন্ধ করিয়েছিলাম ওই প্রতিচ্ছবিকে দিয়ে, নিজেরই প্রতিচ্ছবি।”

আবার কবিকে জিজ্ঞেস করলাম, “তৃতীয় পথটিকে নিয়ে কিছু বলুন।”

একটু থেমে কবি আবার বললেন, “তৃতীয়টি, মানে যে-দরজাটি সেভাবে খুলিনি আমি… সে-দরজার ওপাশে কী ছিলো, তারও আবছা দৃশ্য ভেসে ওঠে; কোনোদিন স্বপ্নে, কোনোদিন জাগরণে। তৃতীয় দরজাটির ওপাশে ছিলো হারিয়ে যাওয়া কৈশোর, কৈশোরের সুগন্ধ, কৈশোরের সহজিয়া, মুগ্ধতা আর স্নিগ্ধতা; এবং আরো এক টুকরো ‘আমি’। যদিও জানি, কোনো-না-কোনোভাবে সেই পথটিই আমাকে বেছে নিয়েছে, আমাকেই। এবং থেকে গেছে আমারই সাথে। যদি কোনোদিনও যেকোনো পথ থেকে ভুলে বাঁক বদলে নেয়া যায়, আমি তবে তৃতীয় পথেই আসতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করবো। যেমন স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে মায়ের কোলে ঘুমিয়ে থাকা শিশু; যেমন স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে নগরায়নে চাপা পড়ে থাকা দুটি অদ্ভুত পাখি, ডানা মেলার ফের সুযোগ পেলে; যেমন করে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে তরুণী কিশোরী, পছন্দের মানুষটির সাথে হঠাৎ চোখাচোখি হলে। ঠিক সেই রকম স্বাচ্ছন্দ্য বোধ আমি করবো, করতে চাই। প্রথম পথটি বেছেছি, কারণ পথ আর খোলা ছিলো না একটাও। তিনটি পথের মাত্র একটিই বেছে নিতে পারতাম আমি; বাকি দুটো পথ চাইলেও নেয়া সম্ভব ছিলো না। যদিও জানি তৃতীয় পথটির সাথেও আমার প্রায়ই দেখা হয়। কোনো স্নিগ্ধ দীঘির জলে অথবা কোনো বেড়ালের চোখে যখন তাকাই, তখনই।”

তৃতীয় সে-পথটি কে, আমি আর কোনো কিছু জিজ্ঞেস করিনি। প্রয়োজন হয়নি। কারণ, ততোক্ষণে সে এসে চুপচাপ কবির পাশে তাঁর কাঁধ ছুঁয়ে বসে রইলো অনন্তকাল। যেমন করে না ঘুমিয়ে জেগে থাকে অনন্ত রাত্রির কিশোরেরা।

সম্পর্কিত

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সর্বশেষ