১০ জনের একটা মহিলা দল গঠিত হলো। এখন তাঁদের যুদ্ধের প্রশিক্ষণ দরকার। আর সেজন্যে প্রথমেই দরকার একটি আদর্শ স্থান। পাকিস্তানি আর্মি ও রাজাকার বাহিনীর চোখের অন্তরালে তাঁদের প্রশিক্ষিত করার দায়িত্ব নিজেদের কাঁধেই তুলে নেন দুই কমান্ডার— ন্যাভাল সিরাজ ও ইমাম উদ্দিন। স্থান নির্ধারিত হয় আলগী গ্রামের শরীফুন্নেছা ঝিনুর বাড়িতেই। এই বাড়িটি গাজী বাড়ি হিসেবে পরিচিত। শরীফুন্নেছা ঝিনুর চাচা বীর মুক্তিযোদ্ধা গাজী আলাউদ্দিন। তাঁর চাচা ও অন্যান্য ভাইয়েরা সবাই মুক্তিযুদ্ধে যুদ্ধরত। তাই পারিবারিক আবহ তাঁর রক্তের ভেতর দেশপ্রেমের বীজ আগেই রোপিত করেছিলো।
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ আপামর মানুষের সম্মিলিত অবদানে ভাস্বর হয়ে আছে ইতিহাসে। নারী-পুরুষের মিলিত অংশগ্রহণ ছিলো যুদ্ধের নয় মাস জুড়েই। নরসিংদী সদর, পাঁচদোনা, ঘোড়াশাল, কালীগঞ্জসহ ব্যাপক এলাকা ছিলো বীরপ্রতীক ন্যাভাল সিরাজের অধীনে। ন্যাভাল সিরাজ আর সাব ইউনিট কমান্ডার ইমাম উদ্দিনের প্রচেষ্টা আর উদ্যোগে নরসিংদী সদরের আলগী গ্রামে গড়ে ওঠে মহিলা ট্রেনিং সেন্টার।
মুক্তিযুদ্ধে এ-অঞ্চলের সাহসী নেতৃবৃন্দ বুঝতে পেরেছিলেন, সকল বয়সের নারীদেরও যুদ্ধে অংশগ্রহণ জরুরি। তাঁরা নারীদের খুঁজতে থাকেন। একসময় পেয়ে যান নরসিংদী কলেজে একাদশ শ্রেণিতে অধ্যয়নরত আলগী গ্রামের শরীফুন্নেছা ঝিনুকে। যুদ্ধের কোনোকিছুই না জানা ও না বোঝা গ্রামের এক লাজুক তরুণী এই ধরনের দায়িত্বের কথা শুনে ভড়কে যান। কিন্তু ন্যাভাল সিরাজের অসীম সাহস ও উৎসাহে ভেতরে সাহস সঞ্চয় করেন। শরীফুন্নেছা ঝিনুর উপর দায়িত্ব অর্পিত হয় আরো কয়েকজন মেয়েকে যুক্ত করার। অবশেষে খুঁজে বের করে যুক্ত করেন আলগী গ্রামেরই আরো ৯ জনকে। তারা হলেন— মমতাজ বেগম (পিতা : আবদুল মালেক), সখিনা বেগম (পিতা : আ. আহাদ), খোদেজা বেগম (পিতা : হাজী নোয়াব আলী), সুরাইয়া বেগম (পিতা : মজিদ ভূঁইয়া), মোহছেনা বেগম (পিতা : মজিদ ভূঁইয়া), রোকেয়া বেগম (পিতা : আবদুস সামাদ), দিলরুবা বেগম (পিতা : মজিদ ভূঁইয়া), আফজল বেগম ও নূরজাহান বেগম।
১০ জনের একটা মহিলা দল গঠিত হলো। এখন তাঁদের যুদ্ধের প্রশিক্ষণ দরকার। আর সেজন্যে প্রথমেই দরকার একটি আদর্শ স্থান। পাকিস্তানি আর্মি ও রাজাকার বাহিনীর চোখের অন্তরালে তাঁদের প্রশিক্ষিত করার দায়িত্ব নিজেদের কাঁধেই তুলে নেন দুই কমান্ডার— ন্যাভাল সিরাজ ও ইমাম উদ্দিন। স্থান নির্ধারিত হয় আলগী গ্রামের শরীফুন্নেছা ঝিনুর বাড়িতেই। এই বাড়িটি গাজী বাড়ি হিসেবে পরিচিত। শরীফুন্নেছা ঝিনুর চাচা বীর মুক্তিযোদ্ধা গাজী আলাউদ্দিন। তাঁর চাচা ও অন্যান্য ভাইয়েরা সবাই মুক্তিযুদ্ধে যুদ্ধরত। তাই পারিবারিক আবহ তাঁর রক্তের ভেতর দেশপ্রেমের বীজ আগেই রোপিত করেছিলো।
এই প্রতিবেদকের সাথে সম্প্রতি কথা হয় শরীফুন্নেছা ঝিনুর। ৭১ বছর বয়স হয়ে গেছে তাঁর। অনেক কথাই মনে করতে পারেন না। তবে তিনি বলেন, “ন্যাভাল সিরাজ আমাদের বাড়িতে এলেন। আমাকে দেখে তাঁর মনে হলো মহিলাদের ট্রেনিং সেন্টার খোলার কথা। আমাকে বললেন, আরো মেয়ে জোগাড় করতে হবে। আমার গ্রাম থেকে অনেককে জোগাড় করলাম। তারা আসতে চায় না। বাবা-মা তাদের আসতে দিতে চায় না। …আমাদের বাড়িতেই সেন্টার খোলা হলো। …আমরা থ্রি নট থ্রি, পিস্তল আর স্টেনগান চালানো শিখেছিলাম।”
কখনো সম্মুখযুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে হয়েছে কি না, এই প্রশ্নের উত্তরে তিনি জানান, “একবার শুধু পাঁচদোনা ব্রিজের কাছে গিয়েছিলাম সশস্ত্র অবস্থায়। শুনেছিলাম ওখানে বিরাট গণ্ডগোল হচ্ছে। আমরা সবাই প্রস্তুতি নিয়েই গিয়েছিলাম। কিন্তু যুদ্ধ করতে হয়নি। দু’-একজন আহত মুক্তিযোদ্ধাকে ওখানে সেবা করেছিলাম আমরা।”
বর্বর পাক বাহিনী অবশ্য এই মহিলা প্রশিক্ষণ কেন্দ্রটির খবর জেনে গিয়েছিলো। তাছাড়া এই বাড়ির আরো কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধার কথাও তাদের জানা হয়ে গিয়েছিলো। অবশেষে একদিন এই সেন্টারটি পাক বাহিনী পুড়িয়ে ফেলে সম্পূর্ণভাবে। অবশ্য কারো কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। শরীফুন্নেছা ঝিনু ও তাঁর দল এবং বাড়ির অন্যান্য বাসিন্দারা আগেই অন্যত্র অবস্থান নিয়েছিলো ন্যাভাল সিরাজের নির্দেশে।
মুক্তিযোদ্ধা শরীফুন্নেছা ঝিনু পরবর্তীতে নরসিংদী কলেজ থেকে বিএসসি পাশ করেছিলেন। তিনি বর্তমানে বিবাহ সূত্রে চট্টগ্রামে বসবাস করেন।
এমনি অনেক ঘটনা-দুর্ঘটনায় ভারাক্রান্ত আমাদের একাত্তর। অনেক মানুষের আত্মত্যাগ জড়িত। আমাদের নরসিংদী জেলার নারীরা কোনোভাবেই পিছিয়ে ছিলো না মুক্তিযুদ্ধের অবিনাশী নয় মাসে। শরীফুন্নেছা ঝিনু ও তাঁর দল ইতিহাসের শ্যামল ছায়ায় মিশে থাকবেন সমগ্রকাল।

