মুক্তিযুদ্ধে রায়পুরা

তিন নদীর বাহুবন্ধ পললে গঠিত রায়পুরায় সুপ্রাচীনকাল থেকেই গড়ে ওঠেছিলো কৃষিশিল্প। পরে তাঁতশিল্পে সমৃদ্ধ হয় এই জনপদ। সামন্ত যুগে ও জমিদারি ব্যবস্থায় অনেক জমিদার, অমাত্য, ভূ-স্বামী, তালুকদার, সামন্তপ্রভু পালাক্রমে শাসন ও শোষণ করেছেন এই রায়পুরাকে। তাই মুক্তিযুদ্ধের পূর্বেই এই মাটির মানুষ লড়াই-সংগ্রাম করেছে জমিদারি প্রথার বিরুদ্ধে, নীল চাষের বিরুদ্ধে, ইজারা প্রথার বিরুদ্ধে ও জলমহাল ইজারার বিরুদ্ধে, সর্বোপরি শোষণ ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে। এই মাটি কালে কালে হয়েছে আন্দোলন ও লড়াই-সংগ্রামের অগ্নিগর্ভ, বঞ্চিত মানুষ হয়েছে অধিকার সচেতন, হয়েছে সাহসী ও সংগ্রামী।

লড়াই-সংগ্রামে, বিদ্রোহ-বিপ্লবে রায়পুরার মাটি ও মানুষ যখন ঋদ্ধ-সমৃদ্ধ, দগ্ধ-বিদগ্ধ, তীব্র তাঁতানো, ঠিক ঐ-সময়ই বেজে ওঠে স্বাধীনতা সংগ্রামের মহাঢঙ্কা। ভাষা আন্দোলনের বারুদপোড়া রক্তের তেজ, বাষট্টির হামুদুর রহমান শিক্ষা কমিশন বিরোধী আন্দোলন, ছেষট্টির ছয়দফা আন্দোলন বেয়ে জাতীয় আন্দোলন যখন ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের দিকে ধাবিত হচ্ছিলো, রায়পুরা তখন তেঁতে ওঠেছিলো সেই আন্দোলনের অগ্নিচ্ছটায়।

বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণেই মুক্তিযুদ্ধের স্পষ্ট দিক-নির্দেশনা পাওয়া যায়। প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো, তোমাদের যা কিছু আছে, তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে… মনে রাখবা, রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দেবো। এ-দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাআল্লাহ…— এসব কথায়ই মুক্তিযুদ্ধের দিক-নির্দেশনা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ৭ মার্চের পর থেকেই রায়পুরার সংগ্রামী জনতা, মুক্তিকামী মানুষ যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুত হতে থাকে। রায়পুরার স্থানীয় নেতৃবৃন্দ ছাত্র, যুবক, জনতা, কৃষক, কামার, কুমার সবাইকে উদ্বুদ্ধ করতে লাগলেন। প্রাথমিক পর্যায়ে আড়াই হাত লম্বা বাঁশের লাঠি হাতে চললো গোপন প্রশিক্ষণ।

রায়পুরায় সবচেয়ে ভয়াবহ যুদ্ধ হয়েছে রামনগরের পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে। ডিসেম্বরের ৬ তারিখ থেকে ৩/৪ দিনব্যাপী রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে উভয়পক্ষের অনেক যোদ্ধা নিহত হয়। ব্রহ্মপুত্রের পশ্চিমপাড় থেকে মিত্রবাহিনি ও মুক্তিবাহিনি যৌথ আক্রমণ চালায় পাকবাহিনির ঘাটিতে। অপর পাড়ে জগন্নাথপুর, নদীর তীরে পাকবাহিনির ঘাঁটি লক্ষ্য করে অবিরাম গোলাবর্ষণ করে মিত্রবাহিনি। পাশাপাশি শুরু করে বিমান হামলা। দুই ধরনের আক্রমণের মুখে পাকসেনাদের প্রতিরোধ ব্যূহ ভেঙে তছনছ হয়ে যায়।

আর কে আর এম উচ্চ বিদ্যালয় মাঠ, পিরিজকান্দি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠ, লক্ষ্মীপুর উচ্চ বিদ্যালয় মাঠ, রাজারবাগ উচ্চ বিদ্যালয় মাঠ, নারায়ণপুর সরাফত আলী উচ্চ বিদ্যালয় মাঠ, পলাশতলী বাজার সংলগ্ন মাঠ ও রহিমাবাদের একটি খোলা জায়গায় প্রশিক্ষণ চলতো প্রাথমিকভাবে। ইপিআর ও সেনাবাহিনির অবসরপ্রাপ্ত সদস্যরা এসব ক্যাম্পে প্রশিক্ষণ দিতেন ছাত্র-যুবকদের। পিরিজকান্দির তালেব হোসেন, কাঙ্গালিয়ার লাল মিয়া, জালালাবাদের সার্জেন্ট (অব.) আব্দুল কাদের, ইদ্রিস কমান্ডার— তাঁরাই প্রশিক্ষণ দিতেন ক্যাম্পে।

একাত্তরে রায়পুরা ছিলো ঢাকা-আগরতলা পথের নিরাপদ ট্রানজিট। একাত্তরে এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহেই অনেক বরেণ্য নেতৃবৃন্দ ঢাকা থেকে রায়পুরা হয়ে নিরাপদে ভারতে গমন করেছেন। তাদের মধ্যে অগ্নিকন্যা মতিয়া চৌধুরী, নারী নেত্রী আয়েশা খানম, বাম রাজনীতিবিদ কমরেড খোকা রায়, জিতেন ঘোষ, বারিণ দত্ত ও জ্ঞান চক্রবর্তী অন্যতম।
৯ এপ্রিল পাকবাহিনি রায়পুরায় প্রবেশ করে। সেদিন তারা ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথ ধরে ভৈরবের দিকে মুভ করে। রায়পুরায় ঢুকতে তারা তেমন কোনো প্রতিরোধের মুখে পড়েনি। পরের দিনই পাকবাহিনি রায়পুরায় ক্যাম্প স্থাপন করে রেললাইনের পাশে (যে-স্থানকে সবাই কলোনি বলে ডাকে)। রায়পুরায় পাকবাহিনি স্থানীয় রাজাকারদের সহযোগিতায় বিভিন্ন জায়গা ও মুক্তিযোদ্ধাদের ঘরবাড়ি রেকি করতে থাকে। পরবর্তীতে হানাদার বাহিনি রায়পুরায় গণহত্যা ও ঘর-বাড়িতে অগ্নিসংযোগ শুরু করলে অনেকেই ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ জায়গায়, বিশেষ করে নদীবেষ্টিত অপেক্ষাকৃত দুর্গম এলাকায় আশ্রয় নেয়, অনেকেই পালিয়ে ভারতে চলে যায়। পাকবাহিনি রাজাকারদের সহযোগিতায় হাশিমপুর মৌলভীবাজারে, মামুদপুর ডাকের বাড়িতে, বাহেরচর খোন্দকার বাড়িতে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট চালায়।

রায়পুরার অনেক ছাত্র-যুবক স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেয় মুক্তিযুদ্ধে। ছাত্র-যুবকরা অনেকেই পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত গমন করে মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং গ্রহণ করে। রায়পুরা এলাকা থেকে এতো বেশি ছাত্র-যুবক ভারতে গিয়েছিলো যে, আগরতলা প্রশিক্ষণ ক্যাম্পগুলো রায়পুরাকে জেলা মনে করতো। এলাকায় বাম রাজনীতির প্রভাব থাকায় অনেক ছাত্র-যুবক ভারতে ট্রেনিং গ্রহণ করে ন্যাপ-সিপিবি-ছাত্র ইউনিয়নের বিশেষ গেরিলা বাহিনি গঠন করে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে।

একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে রায়পুরায় যারা শীর্ষ সংগঠকের ভূমিকা পালন করেছেন, তাঁদের মধ্যে কৃষকনেতা ফজলুল হক খোন্দকার, সাবেক সাংসদ মরহুম আফতাব উদ্দিন ভূঁইয়া, বর্তমান সাংসদ ও সাবেক মন্ত্রী রাজিউদ্দিন আহমেদ রাজু, গয়েছ আলী মাস্টার, কমরেড শামসুল হক, কমরেড বাবর আলী মাস্টার, আফজাল হোসাইন, আব্দুল হাই (চর উজিলাব), খালেক মাস্টার (পাহাড় উজিলাব), সাইদুর রহমান সন্দু মিয়া, আব্দুল বাছেদ চৌধুরী (ভেলুয়ারচর), বজলুর রহমান (আলীনগর) ও সুভাষ সাহা (রহিমাবাদ) প্রমুখ অন্যতম।

একাত্তরে অস্ত্র হাতে রায়পুরার যে-সকল সাহসী বীরপুরুষ হানাদার বাহিনির বিরুদ্ধে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে বীর মুক্তিযোদ্ধা গয়েছ আলী মাস্টার (থানা কমান্ডার), জয়ধর আলী ভূঁইয়া (গ্রুপ কমান্ডার), শহীদ সুবেদার মেজর আবুল বাশার (বীরপ্রতীক), কমান্ডার নজরুল ইসলাম (যুদ্ধাহত), আফজাল হোসাইন, জালাল উদ্দিন ভূঁইয়া, হারুন-অর-রশীদ, সুবেদার আব্দুল ওয়াহিদ (গ্রুপ কমান্ডার), ইদ্রিস হাবিলদার (গ্রুপ কমান্ডার), নূরুজ্জামান জহির (গ্রুপ কমান্ডার), সুবেদার আজিম চৌধুরী (গ্রুপ কমান্ডার), মো. শহীদ উল্লাহ, সাদত আলী মোক্তার (জাহাঙ্গীরনগর), সাহাবুদ্দিন, কর্পোরাল শাহজাহান, কর্পোরাল মো. নূরুল হক, সিপাহি সোহরাব হোসেন, শহীদ আব্দুস সালাম কাওসার (গ্রুপ কমান্ডার), হাবিলদার মোবারক হোসেন, বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ সাহাবুদ্দিন নান্টু (বীরবিক্রম), শহীদ আমান খান, শহীদ বশিরুল ইসলাম, শহীদ জহিরুল হক দুদু, শহীদ এ কে এফ এম শামসুল হক ডেপুটি, জলিলুর চৌধুরী মন্টু (গ্রুপ কমান্ডার), গোপাল চন্দ্র সাহা (গ্রুপ কমান্ডার), আবু সাইদ সরকার (গ্রুপ কমান্ডার), মজনু মৃধা, নূরুল ইসলাম কাঞ্চন, কাজি হারুন-অর-রশিদ ও খন্দকার শাহ আলম অন্যতম। আরো অনেক সাহসী ছাত্র-যুবক যুদ্ধে অংশ নিয়েছেন, যাঁদের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে ইতিহাসের পাতায়। ক্ষুদ্র পরিসরে আমাদের সকল বীর মুক্তিযোদ্ধাদের নাম লেখা সম্ভব নয়।

রায়পুরায় স্থানীয় উদ্যোগেও মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে। ইপিআর ও বেঙ্গল রেজিমেন্টের সদস্যরা এবং ন্যাপ-সিপিবি-ছাত্র ইউনিয়নের মুক্তিযোদ্ধারা রায়পুরার বিভিন্ন স্থানে মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্প স্থাপন করেছিলেন। নারায়ণপুরে বাবর আলী মাস্টারের বাড়িতে, গোকূলনগরে মান্নান মাস্টারের বাড়িতে, জালালাবাদে বলরাম সাহার বাড়িতে, চর উজিলাব’র আব্দুল হাইয়ের বাড়িতে ও হাইরমারা গ্রামে মুক্তিযোদ্ধারা ক্যাম্প স্থাপন করেছিলেন।

একাত্তরে বৃহত্তর রায়পুরায় (২৮ ইউনিয়ন) অনেকগুলো রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ হয়েছে। এসবের মধ্যে বেলাব বড়িবাড়ির যুদ্ধ, হাটুভাঙ্গার যুদ্ধ, বাদুয়ারচর রেলওয়ে ব্রিজের যুদ্ধ, রামনগরের যুদ্ধ, বাঙালিনগরের যুদ্ধ, হাইরমারায় ক্যাম্প আক্রমণ, ব্রজভাঙ্গার যুদ্ধ, তেলিপাড়ার যুদ্ধ, রায়পুরা থানার অস্ত্র লুণ্ঠন, মেথিকান্দা কলোনির যুদ্ধ অন্যতম। এছাড়াও মুক্তিযোদ্ধা ও পাক হানাদার বাহিনির মধ্যে বিচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন স্থানে আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণ হয়েছে। মুক্তিসেনারা ঢাকা-চট্টগ্রাম রেল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করার জন্যে একাত্তরের মাঝামাঝি সময়ে আশারামপুরের কাছে ব্রজভাঙ্গার রেলব্রিজ উড়িয়ে দেয় ডিনামাইট দিয়ে। ফলে হানাদার বাহিনির রেলপথে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। এই ঘটনায় পাকবাহিনি ক্ষুব্ধ হয়ে ব্রিজের পাশের গ্রাম শ্যাওড়াতলীতে আগুন দেয়। ব্যাপক ধর-পাকড় চালায়।
একাত্তরের ৩১ মে রেলপথে কয়েকটি বগি বোঝাই পাকসেনার নরসিংদী থেকে ভৈরবের দিকে যাওয়ার খবর শুনে মুক্তিবাহিনি শ্রীনিধি রেলস্টেশনের অদূরে মাইন স্থাপন করে। কিন্তু সেই মাইন স্থাপনের ঘটনা কীভাবে যেন টের পেয়ে যায় পাকসেনারা। ট্রেন আউট সিগনালে থামিয়ে পাকসেনারা স্টেশন মাস্টারের কাছে এলে স্টেশন মাস্টার চিৎকার দিয়ে বলেন, মন্টু ভাই, আর্মি আইছে। পাকসেনারা স্টেশন মাস্টার মওলা আলী দেওয়ানকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায় আশুগঞ্জ (৩১ মে) এবং পরের দিন (১ জুন) তাকে নির্মমভাবে হত্যা করে।

স্থানীয় রাজাকারদের সহযোগিতায় পাকসেনারা প্রায় প্রতিদিনই গ্রামে ঢুকে নিরীহ মানুষ ধরে আনতো মেথিকান্দার ক্যাম্পে। পাকসেনাদের মেথিকান্দা ক্যাম্পের প্রধান ছিলেন মেজর মঞ্জুর। সারারাত তাদের উপর চলতো অমানুষিক নির্যাতন। ভোরের দিকে তাদের রেললাইনের পাশে বধ্যভূমিতে নিয়ে গিয়ে গণহারে হত্যা করা হতো। পাকসেনারা প্রায়ই বিভিন্ন গ্রাম থেকে ধরে আনতো যুবতী মেয়েদের। তাদের উপর চলতো পাশবিক নির্যাতন। মাঝে মাঝে তাদের আর্তনাদ অনেক দূর থেকে শোনা যেতো বলে জানান মেথিকান্দা সেনাক্যাম্পের তৎকালীন কেয়ারটেকার জাফর।

পাকসেনারা স্থানীয় রাজাকারদের নিয়ে প্রায়ই বিভিন্ন গ্রামে ঢুকে লুটে নিতো হাঁস-মুরগী-গরু-ছাগল। এসব লুটের ভাগ রাজাকাররাও পেতেন। রায়পুরায় পাকসেনাদের সহযোগিতা করেছিলো স্থানীয় রাজাকারেরা। একাত্তরে রায়পুরায় যারা শান্তি কমিটি গঠন এবং নেতৃত্ব দিয়েছিলো, তাদের মধ্যে আব্দুল মতলেব ভূঁইয়া, মাওলানা খলিল উল্লাহ, সাঈদ উদ্দিন চৌধুরী, ময়ধর আলী, আব্দুল জলিল, আবু সাঈদ পণ্ডিত অন্যতম। তারা মুক্তিযোদ্ধাদের গোপন খবর, উপস্থিতি, কার্যক্রম, মুক্তিযোদ্ধা গ্রেফতারে সহযোগিতা, ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগে সহযোগিতা, পথ-ঘাট চিনিয়ে দেয়া, এলাকার পরিস্থিতি সম্পর্কে আগাম খবর দেয়া, ক্যাম্পে যুবতী নারী সরবরাহ, খাবার সরবরাহসহ নানাভাবে সহযোগিতা করতো পাকবাহিনিকে। একাত্তরের মাঝামাঝি সময় থেকে আমাদের বীর সাহসী মুক্তিযোদ্ধারা পাকবাহিনির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। মুক্তিযোদ্ধারা ধীরে ধীরে সংগঠিত হয়ে পাল্টা গুপ্ত হামলা শুরু করে বিভিন্ন স্থানে। মুক্তিবাহিনির একটি সফল অ্যাম্বুশ যুদ্ধ হলো হাটুভাঙ্গার যুদ্ধ। একাত্তরের ডিসেম্বরে পাকসেনারা রেললাইন ধরে পিছু হটার সময় হাটুভাঙ্গায় মুক্তিবাহিনির অ্যাম্বুশে পড়ে মারা যায় ৩০/৩৫ জন পাকসেনা। ব্রজভাঙ্গা ব্রিজের উপরও পাকসেনাদের উপর আক্রমণ চালায় আমাদের সাহসী মুক্তিযোদ্ধারা। সে-যুদ্ধে রাজাকার ময়ধর আলীসহ নিহত হয়েছিলো ৫/৬ জন পাকসেনা। বাদুয়ারচর ব্রিজের কাছেও তুমুল যুদ্ধ হয়েছে পাকসেনাদের সাথে। সেখানে নিহত হয়েছিলো কয়েকজন পাকসেনা। তবে বেলাব বড়িবাড়ির যুদ্ধ ছিলো আরো ভয়াবহ। সেই যুদ্ধে মুক্তিবাহিনির গ্রুপ কমান্ডার সুবেদার মেজর আবুল বাশারসহ ৮/৯ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। সেটি ছিলো মুক্তিযোদ্ধাদের অনেকটা ব্যর্থ অপারেশন। তেলিপাড়া যুদ্ধে ১০/১২ জন পাকসেনা খতম করেন মুক্তিযোদ্ধারা। মে মাস থেকে পাকসেনারা ভৈরব থেকে অবিরাম শেল নিক্ষেপ করতে থাকে। এতে অনেক জনসাধারণ আহত-নিহত হয়েছে, ঘরবাড়ি-গবাদিপশু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একাত্তরে হিন্দুদের ঘরবাড়িতে হামলা ও অগ্নিসংযোগ ছিলো এক ভয়াবহ ঘটনা। জুলাই মাসের মাঝামাঝি কড়ইতলা গ্রামের দুই হিন্দু লোককে পাকবাহিনি ধরে নিয়ে মেরাতলীর রেলব্রিজে দাঁড় করিয়ে গুলি করে হত্যা করে।

রায়পুরায় সবচেয়ে ভয়াবহ যুদ্ধ হয়েছে রামনগরের পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে। ডিসেম্বরের ৬ তারিখ থেকে ৩/৪ দিনব্যাপী রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে উভয়পক্ষের অনেক যোদ্ধা নিহত হয়। ব্রহ্মপুত্রের পশ্চিমপাড় থেকে মিত্রবাহিনি ও মুক্তিবাহিনি যৌথ আক্রমণ চালায় পাকবাহিনির ঘাটিতে। অপর পাড়ে জগন্নাথপুর, নদীর তীরে পাকবাহিনির ঘাঁটি লক্ষ্য করে অবিরাম গোলাবর্ষণ করে মিত্রবাহিনি। পাশাপাশি শুরু করে বিমান হামলা। দুই ধরনের আক্রমণের মুখে পাকসেনাদের প্রতিরোধ ব্যূহ ভেঙে তছনছ হয়ে যায়। এই যুদ্ধে ৪০/৫০ জন পাকসেনা নিহত হয়। অন্যদিকে মিত্রবাহিনি ও মুক্তিসেনা নিহত হয় ১০/১২ জন। মিত্রবাহিনির নিহত হিন্দু সৈনিকদের রায়পুরার দৌলতকান্দি এনে দাহ করা হয়।

নভেম্বরের শেষদিকে মিত্রবাহিনি, মুক্তিযোদ্ধা ও সাধারণ মানুষের সম্মিলিত প্রতিরোধের মুখে পাকসেনাদের আক্রমণ ও অভিযান ক্রমশ থিতিয়ে আসে। সর্বশেষ ও চূড়ান্ত পর্যায়ের যুদ্ধে বাংলাদেশের পূর্ব রণাঙ্গণে মুক্তিবাহিনি ও মিত্রবাহিনির যৌথ ও তীব্র আক্রমণে টিকতে না পেরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনি ভৈরব ও তার আশেপাশের এলাকায় অবস্থান নিতে থাকে। ঊর্ধ্বতন কমান্ডারের নির্দেশ মোতাবেক, পাকবাহিনি যাতে ঢাকার দিকে পলায়ন করতে না পারে, সেজন্যে রায়পুরা থানার পূর্বাঞ্চলে ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনার তীরবর্তী এলাকায় ৬ ডিসেম্বর থেকে মুক্তিবাহিনি ব্যারিকেড ও প্রতিরোধ ঘাঁটি স্থাপন করে এবং তুমুল আক্রমণ চালায়। ৯ ডিসেম্বর চতুর্থ গার্ড রেজিমেন্ট হেলিকপ্টারে রায়পুরার পূর্ব-দক্ষিণ এলাকায় অবতরণ করতে থাকে। ১০ ডিসেম্বর ভারতীয় ১০ বিহার রেজিমেন্ট ও ১৮ রাজপুত রেজিমেন্ট রায়পুরায় পৌঁছায় এবং স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে যৌথ আক্রমণ চালায়। ফলে পাকসেনারা নরসিংদী হয়ে ঢাকার দিকে পলায়ন করে এবং রায়পুরা হানাদার মুক্ত হয়। তারিখটি ছিলো ১০ ডিসেম্বর।
প্রকৃতপক্ষে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ছিলো একটি জনযুদ্ধ। এ-যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন আবালবৃদ্ধবণিতা। অনেক গরীব মানুষ নিজেরা অভুক্ত থেকে খাবার তুলে দিয়েছিলেন অভুক্ত মুক্তিযোদ্ধাদের মুখে। অনেক মা-বোন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দিয়েছেন, নিরাপদে রেখেছেন, গোপনে খাবার সরবরাহ করেছেন। এক টুকরো পোড়া আলু, সেদ্ধ শালুক, চটা পিঠার কণা দিয়ে আপ্যায়ন করেছেন অভুক্ত মুক্তিযোদ্ধাদের। আড়ালে পড়ে থাকা গণমানুষের এমন ত্যাগ-তিতিক্ষাকে ক্ষুদ্র করে দেখার কোনো অবকাশ নেই। তাই আমাদের মুক্তিযুদ্ধ হলো আমাদের জাতিসত্তার এক মৌলিক তাড়না, অস্তিত্বের অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ, নিজস্ব ঠিকানা খোঁজার এক রক্তাক্ত সংগ্রাম।


মহসিন খোন্দকার
সাধারণ সম্পাদক, প্রগতি লেখক সংঘ, নরসিংদী

সম্পর্কিত

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সর্বশেষ