নরসিংদীতে বিলুপ্তির পথে পাট চাষ

ফাল্গুনের মাঝামাঝি (মার্চের প্রথম সপ্তাহ) থেকে পুরো চৈত্র মাস (এপ্রিলের মাঝামাঝি) পর্যন্ত চলে পাটের বীজ বপন। এই সময়টা ব্যস্ততার মধ্যেই কাটে কৃষকের। বীজ বপনের পর শুরু হয় পাটের চারার যত্ন, নিড়ানি দিয়ে ঘাস উপড়ে ফেলে চারা পাতলাকরণ করা হয়। কৃষকের হাতের ছোঁয়ায় পরম যত্নে বেড়ে ওঠে পাটের চারা। বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠে যতোদূর চোখ যায়, পুরো গ্রীষ্মের মাঠ জুড়ে সবুজের সমারোহ, বাতাসে হেলেদুলে নেচে বেড়ায় পাট গাছ, এ যেন প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক অপার্থিব দৃশ্যপট। বর্ষার পানিতে আরো ফুলে-ফেঁপে ওঠে পাটের গাছ। চার মাস প্রতীক্ষার পর আষাঢ়ের পানিতে গাছ কেটে জাগ দিয়ে পচিয়ে কৃষক সংগ্রহ করেন পাট। সেই পাট রোদে শুকিয়ে কৃষকেরা ঘরে তুলে নেন। এ-সময় পাট বিক্রি করে বাড়তি আয় করেন কৃষক, যা দিয়ে পুরো বর্ষাটা কাটিয়ে আবার মাঠের ব্যস্ততায় ফিরে আসেন। এরকম চিত্রের দেখাই মিলতো এক যুগ আগের নরসিংদীর অধিকাংশ গ্রামে।

কালের পরিক্রমায় হারিয়ে যাচ্ছে সেসব সোনালি দিন। এখন আর বিস্তর ফসলের মাঠ জুড়ে দেখা মেলে না পাট ক্ষেতের। প্রতিনিয়ত পাট চাষে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন কৃষকেরা। বর্ষায় পর্যাপ্ত পানির অভাব, ভালো বীজের ঘাটতি, জমি চাষে খরচ বৃদ্ধি, শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধি, বীজ ও সারের চড়া দাম— সব মিলিয়ে পাট চাষে গুণতে হয় বাড়তি খরচ।

কোনোরকমে খরচ উঠিয়ে, লাকড়ি হিসেবে পাটকাঠিই প্রাপ্য মুনাফা। কখনো কখনো পাটের ফলন কম হলে গুণতে হয় লোকসান। এসব কারণেই কৃষকেরা এখন পাট চাষে আগ্রহী না। প্রতিনিয়ত কমে যাচ্ছে পাটের আবাদ।

রায়পুরা উপজেলার চর মধুয়ার কৃষক মোস্তফা মিয়া (৪৮) জানান, পাট চাষে এখন অনেক খরচ, পরিশ্রম বেশি, সেই অনুপাতে লাভ হয় না। তাই এখন শুধু লাকড়ির জন্যে অল্প পরিমাণ পাট চাষ করেন।

শিবপুর উপজেলার জাঙ্গালিয়ার কৃষক নূরু মিয়া (৫৯) জানান, আগে তিনি চার-পাঁচ বিঘা জমি পাট চাষ করতেন। এখন বর্ষায় তেমন পানি না হওয়ায় পাটের জাগ দিতে সমস্যা হয়। তাছাড়া ভালো বীজ পাওয়া যায় না, বেপারিরা পাটের দাম কম দেয়। পাট চাষ করে এখন আর লাভবান হওয়া যায় না। সেজন্যে এখন পাটচাষে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন।

বিঘা প্রতি প্রায় ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকা খরচ হয় পাট চাষে। বিঘা প্রতি পাটের ফলন হয় ৫ থেকে ৬ মণ। বিপরীতে বাজারে পাটের দাম কম, ন্যায্য দামে পাট বিক্রি হয় না। বেপারির কাছে অল্প দামে বিক্রি করতে হচ্ছে পাট। গড়ে মণপ্রতি ১,৫০০ থেকে ২,০০০ টাকা পাওয়া যায়।

নরসিংদী সদরের নজরপুরের কৃষক সুলমান মিয়া (৫১) বলেন, “পাট চাষে এখন অনেক খরচ। আগে পাটের মণ বিক্রি করতাম আটশো থেকে এক হাজার টাকা, তখন শ্রমিকের মজুরি ছিলো দেড়শো-দুইশো। আর এখন পাটের মণ দেড়-দুই হাজার, শ্রমিকের মজুরি ছয়-সাতশো। সব মিলায়া খরচ অনেক বেশি, বিক্রি করে লাভ আসে না।”

কোনোরকমে খরচ উঠিয়ে, লাকড়ি হিসেবে পাটকাঠিই প্রাপ্য মুনাফা। কখনো কখনো পাটের ফলন কম হলে গুণতে হয় লোকসান। এসব কারণেই কৃষকেরা এখন পাট চাষে আগ্রহী না। প্রতিনিয়ত কমে যাচ্ছে পাটের আবাদ।

নরসিংদী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে নরসিংদীতে পাট চাষ হয় ৪,৪১৪ হেক্টর জমিতে। পরবর্তীতে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় ৩,০৪৩ হেক্টর জমিতে। ২০২০-২১ অর্থবছরে এর পরিমাণ আরো কমে আবাদী জমির পরিমাণ হয় ২,৬৮৫ হেক্টর। সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২,৮৭০ হেক্টর জমিতে পাট চাষ করা হয়। ২০১৩ সালের আগের কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। এক দশকেই পাটের চাষ কমে অর্ধেকে নেমে এসেছে। আনুমানিক দুই দশকে প্রায় ৭০ শতাংশ কমে গেছে পাট চাষ।

এ-বিষয়ে কথা হয় নরসিংদী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক সালাউদ্দিন টিপুর সাথে। তিনি বলেন, “পাটের জীবনকাল একটু বেশি, একশো বিশ থেকে একশো তিরিশ দিন। পাট চাষে কৃষকের নিরুৎসাহিত হওয়ার অন্যতম কারণ পাটের দাম, পাটের দাম তুলনামূলক কম হওয়ায় কৃষকরা পাট চাষ করে লাভবান হচ্ছেন না। সেজন্য আমরা চেষ্টা করছি যে, সরকার রাষ্ট্রীয়ভাবে ধান ও গম ক্রয়ের সাথে যদি পাটও ক্রয় করে, তাহলে কৃষকরা পাটের বাজারমূল্য ভালো পাবে। এছাড়াও নরসিংদীতে যেসব পাটকল আছে, সেখানে আমরা যোগাযোগ করছি, তারা যেন কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি পাট ক্রয় করে। এই প্রক্রিয়াটা হয়ে গেলে কৃষকের আর বেপারির কাছে কম দামে পাট বিক্রি করতে হবে না। আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবন্ধকতা হচ্ছে, পাটের উন্নতমানের ভালো বীজ কৃষকরা সংগ্রহ করতে পারছেন না, ফলে পাটের ফলন কম হচ্ছে। সেজন্য আমরা কৃষকদের ট্রেনিং দিচ্ছি, উন্নতমানের বীজ দিয়ে পাট চাষে উদ্বুদ্ধ করার চেষ্টা করছি।”

সম্পর্কিত

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সর্বশেষ