দখল ও দূষণ কবলিত নরসিংদীর নদ-নদী

প্রফেসর আব্দুর রাজ্জাকের একটা ভবিষ্যতবাণী ছিলো এমন, “বাংলাদেশের প্রধান সমস্যা হবে পানির সমস্যা।” অন্যদিকে, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে উইলিয়াম উইল কক্স তার ঐতিহাসিক বক্তৃতা ‘লেকচারস অন দি রিভার সিস্টেম অব বেঙ্গল’-এ মূলত ব্রিটিশ ভারতে নদীগুলোর গুরুত্ব এবং তাদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব নিয়ে আলোচনা করেছিলেন। বক্তৃতাটিতে তিনি এই অঞ্চলের নদীর ভবিষ্যত সমস্যাবলির কথা আলোচনা করেছিলেন। আসলে সভ্যতার প্রাচীন চিহ্ন বয়ে চলার পথ পরিক্রমায় নদী এক বহুমাত্রিক বিচিত্র প্রাকৃতিক সম্পদ। নদী ব্যতিত প্রাণ অচল। বয়সের দিক থেকেও বিবেচনা করলে নদী হচ্ছে মহাপ্রাচীন এক সত্তা। পাহাড়-পর্বত, সমুদ্র, মরুভূমি কিংবা মাটির মতোই নদী বিরাট শক্তিশালী। নদী সৃষ্টি করতে পেরেছে এমন কোনো জাতি পৃথিবীতে দেখানো যাবে না। কিন্তু নদী ধ্বংসের উদাহরণ অহরহ। আধুনিক টেকনোলজি আবিষ্কারের পূর্ব পর্যন্ত মানুষের দৈনন্দিন কর্মকাণ্ড ছিলো নদী কেন্দ্রিক। নদীর অশেষ ব্যবহার মানুষের জীবনে কতোটুকু প্রভাব ফেলতো, সেটা বইপত্র ঘাটাঘাটি করলেই প্রমাণ মেলে। নদীর দর্শন মানবজাতির ইতিহাসের এক নিগূঢ় রহস্যে আবৃত। বিভিন্ন নদী-কেন্দ্রিক জাতির যে-ইতিহাস, তা মূলত মানবজাতির প্রাকৃতিক ইতিহাস। কিন্তু আধুনিক সভ্য জাতিকুল নদীকে শাসন করছে, দূষণ করছে এবং ধ্বংসলীলায় মেতে ওঠছে। ফলে ভবিষ্যত প্রজন্মকে ঠেলে দিচ্ছে অবিরাম ধ্বংসের দিকে। নদী এখন রাজনীতির শিকার। পুঁজিবাদের লক্ষ্যবস্তু দেশের নদীগুলোর চেহারা এখন রুগণপ্রায়। মানবজাতির অস্তিত্বের নির্মাতা এসব নদ-নদী এখন মানুষের কাছে পরিত্যাজ্য। দুর্গন্ধ আর দূষণে নদীগুলোর দেহ থাকলেও প্রাণহীন। যে-নদী মানুষকে তার সুস্বাদু মাছ দিয়ে আমিষের চাহিদা মেটাতো, জলপথে অল্প খরচে দূর-দূরান্তে পণ্য আনা-নেয়ায় সাহায্য করতো, যে-নদী পৃথিবীর প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা করতো, আজ মানুষই তার বুকে ছুরি চালাচ্ছে।

নরসিংদীতে নদীর সংখ্যা
দেশে ৫৭ টি আন্তর্জাতিক নদ-নদী রয়েছে। কোনো কোনো পরিসংখ্যানে শাখা-প্রশাখাসহ বাংলাদেশে নদ-নদীর সংখ্যা ৭০০ টিরও বেশি। সরকারি সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী দেশে ২৩০ টি নদ-নদী আছে। শিশু একাডেমির শিশু বিশ্বকোষে বলা হয়েছে, দেশে নদ-নদী ৭০০ টি। উইকিপিডিয়ার তথ্যমতে, নদ-নদীর সংখ্যা ৪০৫ টি। পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) অনুসারে নরসিংদীতে ১১ টি নদী রয়েছে। মেঘনা, ব্রহ্মপুত্র, শীতলক্ষ্যা এবং আড়িয়াল খাঁর মতো নদীগুলো নরসিংদীর উপর দিয়ে বয়ে গেছে। পৃথিবীর সবখানে নদীকে কেন্দ্র করেই সভ্যতা ও সংস্কৃতি ব্যাপকভাবে গড়ে ওঠেছে। নরসিংদীতেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। ভৌগোলিক গঠন, ভূতত্ত্ব, শিল্প-সাহিত্য, সংস্কৃতি ও ভাষা, ইতিহাস-ঐতিহ্য, পৌরাণিক উপাখ্যান, ধর্মীয় তীর্থস্থান, গল্প-কাহিনি, কবিতা, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক জীবনব্যবস্থা, কৃষি ও মৎস্য পালন, ব্যবসা-বাণিজ্য, যাতায়াত, জীববৈচিত্র্য, পরিবেশ ও জীবন-জীবিকার এক বিশাল অনুষঙ্গ গড়ে ওঠেছে নরসিংদীর এসব নদীকে কেন্দ্র করেই। নরসিংদীর উয়ারী-বটেশ্বর তার জ্বলন্ত উদাহরণ। একসময় গ্রিসের সাথে নদীপথে এই অঞ্চলের বাণিজ্যের তথ্য মেলে হেরোডেটাসের ইতিহাসের বইয়ে। অন্যদিকে, পৃথিবীর শীর্ষ দূষিত নদীগুলোর অবস্থান এখন নদীমাতৃক বাংলাদেশেই। আর এর মধ্যে নরসিংদী অন্যতম। বিবিসির সমীক্ষায় বলা হয়েছে, দেশের ৪৩৫ টি নদী এখন প্রকটভাবে হুমকির মুখে। ৫০-৮০ টি নদী বিপন্নতার শেষ প্রান্তে। যেখানে নরসিংদীর হাড়িধোয়া, ব্রহ্মপুত্র, শীতলক্ষ্যা এবং মেঘনার দূষণ প্রকট। আর এই দূষণ ক্রমাগত চলতে থাকলে ২০৫০ সাল নাগাদ শীতলক্ষ্যা আর মেঘনা ব্যতিত বাকি নদীগুলো শুকিয়ে যাবে। সেই সাথে ধ্বংস হবে বিরাট ইকোসিস্টেম এবং এর প্রভাব পড়বে জনসাধারণের উপর। দেশে নদী থেকে সৃষ্ট খালের সংখ্যাও বিশাল— ২৪ হাজার। নরসিংদীর খালগুলো হয় এখন ময়লার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে অথবা শুকিয়ে যাচ্ছে। উইকিপিডিয়ার তথ্যানুসারে নরসিংদীতে মোট ১১ টি নদ-নদী রয়েছে। এর মধ্যে মূলত চারটি নদীই প্রধান। এগুলো হচ্ছে মেঘনা, শীতলক্ষ্যা, ব্রহ্মপুত্র, আড়িয়াল খাঁ। অন্যদিকে, হাড়িধোয়া, পাহাড়িয়া, মরা ব্রহ্মপুত্র, নাগদা, সোনাখালী, কয়রা ও গঙ্গাজলী শাখা নদী। কয়রা ও গঙ্গাজলী এখন বিলুপ্তির পথে, ড্রেনের মতো অথবা কিছু কিছু জায়গায় দেখা মেলে এদের।

মোট দৈর্ঘ্য
জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের সাবেক প্রধান হাইড্রোলজিস্ট মো. আখতারুজ্জামান তালুকদার জানান, দেশে বর্তমানে ২০০ কিলোমিটারের বেশি দীর্ঘ নদী রয়েছে ১৪ টি, ১০০ থেকে ১৯৯ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের নদী রয়েছে ৪২ টি, ১০ থেকে ৯৯ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের নদী ৪৮০ টি এবং ১ থেকে ৯ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের নদীর সংখ্যা ৩৭৬ টি। ১ কিলোমিটারেরও কম দৈর্ঘ্যের নদী রয়েছে ৪১ টি। সবচেয়ে বেশি নদী রয়েছে সুনামগঞ্জ জেলায়— ৯৭টি। নদ-নদীর এই তালিকা তৈরির কাজ শুরু হয় ২০১৯ সালে। তালিকা তৈরিতে তথ্যের প্রধান উৎস ছিলো জেলা প্রশাসন। এছাড়া বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃক ছয় খণ্ডে প্রকাশিত নদ-নদীর তালিকা সার্ভে অব বাংলাদেশ কর্তৃক প্রকাশিত প্রশাসনিক ম্যাপ ও পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের ট্রাস্টি প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিসেসের (সিইজিআইএস) ম্যাপ মাধ্যমিক (সেকেন্ডারি) উৎস হিসেবে ব্যবহার করা হয় এই গবেষণায়।

উইকিপিডিয়ার তথ্য অনুসারে, বাংলাদেশে মোট নৌপথের দৈর্ঘ্য ২৪,০০০ কিলোমিটার হলেও নৌপরিবহনযোগ্য নৌপথের দৈর্ঘ্য মাত্র ৫,৯৬৮ কিলোমিটার, তা-ও শুষ্ক মৌসুমে আবার সেটি কমে গিয়ে দাঁড়ায় ৩,৮৬৫ কিলোমিটারে। নৌপথের সম্ভাব্য ন্যূনতম গভীরতার (Least Available Depth, LAD) উপর ভিত্তি করে বাংলাদেশের এই অভ্যন্তরীণ নৌ চলাচল গতিপথকে চারটি ভাগে ভাগ করা যায় : শ্রেণি ১, শ্রেণি ২, শ্রেণি ৩ এবং শ্রেণি ৪। এদের সম্ভাব্য ন্যূনতম গভীরতা যথাক্রমে ৩.৬৬ মিটার, ২.১৩ মিটার, ১.৫২ মিটার এবং ১.৫২ মিটারের কম। এই চার ধরনের নৌপথের মধ্যে শ্রেণি ৪-এর নৌপথগুলি মূলত মৌসুমী আর বাকি নৌপথগুলি সারা বছর ধরে চালু থাকে। উপরের তথ্যসূত্রের আলোকে বলা যায়, নরসিংদীতে ১৩ থেকে ১৬৫ কিলোমিটারের নয়টি নদ-নদী রয়েছে। যেগুলো বর্ষা মৌসুমে নৌ চলাচলে সক্ষম, তার মোট দৈর্ঘ্য ৫৩৮ কিলোমিটার। আর এর মধ্যে সারা বছর নৌকা চলাচলে সক্ষম ১০০ কিলোমিটারের দৈর্ঘ্যের নদীপথ। আবার এসব নৌপথের অধিকাংশই মেঘনা, শীতলক্ষ্যা আর আড়িয়াল খাঁ নদীতে।

শিল্প কারখানা বৃদ্ধির ফলে প্রচুর পরিমাণ রাসায়নিক বর্জ্য নদীতে ফেলা হচ্ছে। দূষিত হচ্ছে পানি। এই বিশাল পরিমাণ পানি সহজে পিউরিফাই করা সম্ভব নয়। কিন্তু নদীতে ফেলা ইন্ডাস্ট্রিয়াল বর্জ্য পদার্থের কারণে নদীর দূষণ রোধে বড়ো ভূমিকা রাখতে পারে ম্যানগ্রোভ।

কীভাবে দূষণ হচ্ছে
পৃথিবীর মাত্র ১ শতাংশ মিঠা বা স্বাদু পানি আমরা ব্যবহার করতে পারি। এই মিঠা পানির ৭০ শতাংশ ব্যবহার করা হয় কৃষিকাজে। কিন্তু নানা কারণে নদ-নদীগুলো শুকিয়ে যাচ্ছে এবং ধ্বংস হচ্ছে। ফলে পানির সংকট দিন দিন প্রকট হচ্ছে। এর মধ্যে দুটি কারণ উল্লেখযোগ্য। প্রথমত ভারতের বাঁধ, দ্বিতীয়ত দেশের শিল্প-কারখানা। ভারতের সাথে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক নদীর সংখ্যা ৫৭ টি। দেশের প্রায় সবগুলো নদীই ভারত থেকে সৃষ্ট। এগুলো দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশের উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে সমুদ্রে পতিত হয়েছে। কিন্তু নব্য যুগে এসে ভারত তার অভ্যন্তরীণ চাহিদার কথা বলে উজানে বাঁধ নির্মাণ করে নদীর স্রোত ঘুরিয়ে দিচ্ছে। এতে ক্ষতির শিকার হচ্ছে ভাটির ভূমি বাংলাদেশ। আন্তর্জাতিক আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে যা ইচ্ছে, তাই করে যাচ্ছে ভারত। এটা নিয়ে ভারতের অনেক পরিবেশ বিজ্ঞানীও সতর্ক করেছিলো, ভারত সরকার তা কানে নেয়নি। আগে বর্ষার মৌসুমে ফসলের জমিগুলো পানিতে টইটুম্বুর করতো। সেখানে নতুন পানির সাথে জমিনে পলি জমতো। ফলে মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি পেতো এবং ভালো ফসল ফলতো। কিন্তু এখন আর সেটা চোখে পড়ে না। অন্যদিকে আবর্জনা, রঙের পানি, কীটনাশক, অতিমাত্রায় নগরায়ন, শিল্প-অঞ্চল ইত্যাদির কারণে ও কর্তৃপক্ষের অবহেলায় দিন দিন বেড়েই চলেছে দূষণের মাত্রা। যত্রতত্র জলাশয় ভরাট করে কারখানা গড়ে তোলা হচ্ছে এবং সেই কারখানার দূষিত তরল বর্জ্য ফেলা হচ্ছে নদ-নদীতে। জলাশয় ভরাটের ফলে একদিকে পরিবেশ ধ্বংসের মাধ্যমে, জীববৈচিত্র্যের ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতি হচ্ছে, অন্যদিকে জলাশয়গুলো ভরাটের কারণে তাপ শোষণের মাত্রা কমে এসেছে, যার দরুণ আজকাল এতো গরম লাগছে।

পানির ফরেনসিক পরীক্ষা
নরসিংদীর চারটি নদীতে ১২৯ টি তরল বর্জ্য পদার্থের প্রতিষ্ঠান থেকে রাসায়নিক বর্জ্যমিশ্রিত পানি সরাসরি নদীগুলোকে দূষিত করছে। নদীগুলো হচ্ছে মেঘনা, শীতলক্ষ্যা, ব্রহ্মপুত্র এবং হাড়িধোয়া। এই নদীগুলোর PH (Potential Hydrogen) স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি। পানির BOD (Biological Oxygen Demand) এবং COD (Chemical Oxygen Demand) অত্যন্ত উদ্বেগজনক অবস্থায় আছে। উল্লেখ্য, BOD একটি জৈবিক প্রক্রিয়া। অন্যদিকে, COD একটি রাসায়নিক প্রক্রিয়া।

এবার বুড়িগঙ্গা নদীর ফরেনসিক রিপোর্টটি দেখে নেয়া যাক। “এই নদীর পানিতে অদ্রবণীয় ক্ষুদ্র কঠিন পদার্থ (টোটাল সাসপেন্ডেবল সলিডস, টিএসএস) পাওয়া গেছে ১০৮, ৫৭ ও ১৯৫। অথচ পানিতে এর আদর্শ মান ১০। বুড়িগঙ্গার শ্যামপুর এলাকার পানিতে অদ্রবণীয় ক্ষুদ্র কঠিন পদার্থ (টোটাল সাসপেন্ডেবল সলিডস, টিএসএস) পাওয়া গেছে ১০৮, ৫৭ ও ১৯৫। অথচ পানিতে এর আদর্শ মান ১০। গবেষকেরা বলছেন, এর মানে সম্পূর্ণরূপে মিশে না যাওয়া কঠিন পদার্থ নদীর পানিতে আস্তরণ তৈরি করছে, যা জলজ উদ্ভিদের বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। পানিতে অক্সিজেন চাহিদার পরীক্ষায় দেখা যায়, রাসায়নিক অক্সিজেনের চাহিদা (সিওডি) ১৯০, ২২৭ ও ২৭৬। অথচ আদর্শমান হচ্ছে ৪। আর জৈবিক অক্সিজেন চাহিদা (বিওডি) ৮৭, ৭২, ও ১০৬। অথচ আদর্শ মান হিসেবে বিওডি থাকার কথা ০.২।” (সূত্র : আহমেদ দীপ্ত, প্রথম আলো)

উপরের তথ্য বিশ্লেষণ করে বলা যায়, নরসিংদীর উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ব্রহ্মপুত্র নদটি বুড়িগঙ্গা নদীর চেয়েও ভয়াবহ। এটা নরসিংদীর নদীগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি দূষণের শিকার। মাধবদী, শেখেরচর এবং সদরের আশপাশের এলাকায় মূলত ডাইং মিল এবং তরল বর্জ্য নিঃসরণকারী প্রতিষ্ঠান থেকে প্রতিদিন টনের টন রাসায়নিক বর্জ্যের পানি নদে পড়ছে। ফলে আশপাশের এলাকায় দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে। ব্যাহত হচ্ছে জনজীবন। তাই সামগ্রিক বিষয়ের প্রেক্ষিতে অনুমান করা যায় যে, নরসিংদীর নদীগুলোর পানির কোয়ালিটি ইনডেক্স পরীক্ষা করলে এর দূষণ বুড়িগঙ্গার পানির সমপর্যায়ে হওয়ার সম্ভাবনাই প্রবল। সরকারিভাবে জেলার নদ-নদীগুলোর পানির কোয়ালিটি ইনডেক্স পরীক্ষা করা জরুরি। তাহলেই নদ-নদীগুলো কতোটুকু রুগ্ণ, তা বেরিয়ে আসবে।

বর্জ্যপ্রবাহের উৎসসমূহ
নরসিংদী পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, নরসিংদীতে তরল বর্জ্য নিঃসরণকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ১২৯ টি। এর মধ্যে ETP (Effluent Treatment Plant) আছে ১১৭ টিতে। ৩ টি প্রতিষ্ঠানের কোনো ইটিপি নেই। ১ টি বন্ধ আছে এবং ৪ টি প্রতিষ্ঠানে নির্মাণাধীন। আর বাকি ৪ টির তথ্য পাওয়া যায়নি। এসব কারখানার তরল বর্জ্য সরাসরি নরসিংদীর নদীগুলোতে ফেলা হচ্ছে। মারাত্মকভাবে দূষণের শিকার নদীগুলো হচ্ছে মেঘনা, শীতলক্ষ্যা, ব্রহ্মপুত্র এবং হাড়িধোয়া।

পত্রিকার স্থান সংকুলানের কথা বিবেচনা করে নিচে শুধু হাড়িধোয়া নদীতে বিষাক্ত বর্জ্য ফেলার ফ্যাক্টরিগুলোর একটি তালিকা তুলে ধরা হলো।

১. থার্মেক্স গ্রুপ (৭ টি);
২. আবেদ টেক্সটাইল এন্ড ডাইং (৩ টি);
৩. আব্দুছ সোবান ডাইং (১ টি);
৪. শিল্পী ডাইং (১ টি);
৫. হাজী ডাইং (১ টি);
৬. রাজ্জাক ডাইং (১ টি);
৭. চৌধুরী ডাইং (১ টি);
৮. গ্রিন বাংলা ডাইং (১ টি);
৯. ক্রিয়েটিভ প্রাইম ডাইং (১ টি) এবং
১০. শায়লা ডাইং (১ টি)।

উল্লেখ্য, পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী থার্মেক্স গ্রুপের ৭ টি ফ্যাক্টরির বিপরীতে একটি সেন্ট্রাল ইটিপি, আবেদ টেক্সটাইল এন্ড ডাইংয়ের ৩ টি ফ্যাক্টরির বিপরীতে একটি সেন্ট্রাল ইটিপি এবং বাকিদের একটি করে ইটিপি রয়েছে। কিন্তু বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে সরেজমিনে গিয়ে এবং খবর নিয়ে জানা গেছে, কারোর ইটিপিই সচল নয়। এলাকাবাসীর মতে, তারা রাতের আঁধারে অথবা কোনো গোপন ড্রেনের মাধ্যমে বিষাক্ত তরল বর্জ্য সরাসরি নদীতে ফেলছে। ফলে নদীর প্রাকৃতিক জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হচ্ছে। মাছ বিলুপ্তির পাশাপাশি জনজীবনেও ব্যাপকভাবে প্রভাব ফেলছে এই দূষণ প্রক্রিয়া। দূষিত পানির দুর্গন্ধে অতিষ্ঠ হয়ে অনেকে বিভিন্ন জায়গায় অভিযোগ দিয়েও কোনো বিচার পাচ্ছেন না। ফলে তারা অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছেন এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়েই বসবাস করতে বাধ্য হচ্ছেন।

নরসিংদীর প্রধান চারটি নদী দূষণ ও ক্ষয়-ক্ষতির পরিমাণ
নরসিংদীর পরিবেশ দূষণের অন্যতম কারণ জেলার অপরিকল্পিত কল-কারখানা। শত শত কল-কারখানা যত্রতত্র গড়ে ওঠেছে, যার ফলে নদীগুলোর এখন জীর্ণ-শীর্ণ দশা। নিচে জেলার গুরুত্বপূর্ণ চারটি নদীর দূষণ চিত্র নিয়ে আলোচনা করা হলো :

নরসিংদীর প্রাণকেন্দ্রের মধ্যদিয়ে বয়ে গেছে মৃতপ্রায় ব্রহ্মপুত্র এবং হাড়িধোয়া নদী দুটি। অন্যদিকে জেলার পূর্ব ও পশ্চিম দিক দিয়ে যথাক্রমে মেঘনা ও শীতলক্ষ্যা দীর্ঘপথ অতিক্রম করেছে। নরসিংদীর এসব নদীতে একসময় শত শত নৌকা চলাচল করতো, যদিও মেঘনা ও শীতলক্ষ্যায় সেটা এখনো আছে। কিন্তু ব্রহ্মপুত্র আর হাড়িধোয়া নদীতে তার দেখা মেলে না এখন আর। জেলেরা জীবিকা নির্বাহ করতো মাছ ধরে। নদীগুলো নানা প্রজাতির দেশীয় মাছে ভরপুর ছিলো একসময়। স্থানীয় আমিষের একটা বড়ো অংশ আসতো এই নদীগুলোর মাছ থেকে, যেটা বাৎসরিক জাতীয় আমিষের একটা ভালো অংশের যোগান দিতো। হাজার হাজার জেলে তাদের জীবিকা নির্বাহ করতো এই নদীগুলোর মাছ ধরে এবং বিক্রি করে। কিন্তু বিগত কয়েক বছর যাবত নদীগুলো (প্রধানত দুটি নদী) আক্রমণের শিকার হয়েছে। প্রথমত নরসিংদীর বিভিন্ন কারখানার রঙমিশ্রিত তরল বর্জ্য নদীতে ফেলা। আর দ্বিতীয়ত নদী দখল। মূলত হাড়িধোয়া এবং ব্রহ্মপুত্র নদী দুটি এখন প্রায় ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। জেলার ১২৯ টি তরল বর্জ্য নিঃসরণকারী ফ্যাক্টরি, ১২ টি অবৈধ ব্যাটারি ফ্যাক্টরি, প্রচুর মিষ্টির দোকানের রাসায়নিক বিষাক্ত বর্জ্য এবং শহরের ড্রেন দিয়ে আসা ময়লার পানি মূলত নদীগুলোকে দূষিত করছে। বিভিন্ন গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, প্রতিটি ডাইং ফ্যাক্টরি প্রতি টন ফেব্রিক ডাইংয়ের জন্যে ২০০ টন সফট ওয়াটার ব্যবহার করে। আর প্রতিটি কারখানা অন্তত দৈনিক কয়েক টন কাপড় ডাইং করে থাকে। এসব ডাইংয়ের ব্যবহৃত পানি সরাসরি নদীতে ফেলা হচ্ছে। সেই হিসেবে হাড়িধোয়ার পাড়ের ১৮ টি ফ্যাক্টরি থেকে দৈনিক কমপক্ষে ফ্যাক্টরিপ্রতি সর্বনিম্ন ৫ টন কাপড় ধরলে ফ্যাক্টরিপ্রতি ১,০০০ টন তরল বর্জ্য সরাসরি নদীতে ফেলা হচ্ছে। সেই হিসেবে ১৮ টি ফ্যাক্টরি থেকে ১৮,০০০ টন রঙমিশ্রিত পানি নদীতে ফেলা হচ্ছে। তাহলে মাসে দাঁড়ায় ৫,৪০,০০০ টন। এবং এই পানি প্রবাহিত হয়ে এর মোহনা মেঘনা নদীতে গিয়ে পড়ছে। এটা নিঃসন্দেহে খুবই ভয়ঙ্কর ব্যাপার।

এবার আসা যাক আর্থিক ক্ষতির হিসাবে। নদীটির ধ্বংসকারী আঠারোটি ফ্যাক্টরির প্রতিটির বয়স গড়ে ১৫ থেকে ২০ বছর। তাহলে প্রতিটি ফ্যাক্টরি এই ১৫ থেকে ২০ বছরে আনুমানিক কমপক্ষে ১০০ কোটি টাকার ক্ষতি করেছে শুধু হাড়িধোয়া অঞ্চলেই। হিসাবটি পরিবেশ, মানুষের জীবিকা, স্বাস্থ্য এবং কৃষিকে আনুষাঙ্গিক ধরে করা হয়েছে। আরেকটু পরিষ্কার করে বললে, বিশ বছর যাবত ফ্যাক্টরিগুলো যেভাবে নদী দূষণ করে আসছে, ফলে শত শত পরিবার যে-পরিমাণ হাঁস পালন করতো এবং এতে হাঁসের ডিম ও মাংস, শত শত জেলের মাছ ধরে জীবিকা, কৃষকের নদীর পানির বিকল্প হিসেবে বিদ্যুৎ ব্যবহার করে ভূগর্ভের পানি তুলে সেচ কাজে ব্যবহার ইত্যাদি নানা বিষয় অন্তর্ভুক্ত এবং হিসাবটি ২০ বছর ধরে করতে হবে। উক্ত বছরগুলোতে এই নদীটি জাতীয় মোট কী পরিমাণ আমিষ হারিয়েছে, তা হিসাব করলে বের হয়ে আসবে। তাছাড়াও অসংখ্য মানুষ না জেনে-না বুঝে এখানে গোসল করছে। ফলে তাদের চর্মরোগসহ নানাবিধ পানিবাহিত রোগ হচ্ছে। কতো লোক শ্বাসকষ্টজনিত কারণে মারা পড়েছে কিংবা ভুগছে। ফলে ডাক্তারের শরণাপন্ন হতে হচ্ছে, সেই সাথে ঔষধপত্র। পানি দূষণের কারণে বিভিন্ন ধরনের রোগবালাই নদীপাড়ের মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। এটা নিয়ে রাষ্ট্র কোনোদিন গবেষণা করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে বলে চোখে পড়েনি। হয়তো গবেষণা করলে বেরিয়ে আসতো, প্রতি বর্গমাইলে কী পরিমাণ মাছ থাকতো, সেই হিসেব এবং কী পরিমাণ অর্থ রাষ্ট্র হারিয়েছে আর এ-যাবত কতো লোক অসুস্থ হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন ইত্যাদি।

নদী পাড়ে হাঁস পালন অর্থনীতি
নদীপাড়ের হাজার হাজার পরিবারের নারীরা হাঁস পালনের মাধ্যমে তাদের হাতখরচের যোগান দিতেন। হাঁস বিক্রি কিংবা হাঁসের ডিম বিক্রি করে সারা বছরই তারা নিজেদের স্বাবলম্বী করার চেষ্টা করতেন। এটাকে ছোটো পরিসরে নদীপাড়ের অর্থনীতি বলা যেতে পারে। হাঁসের জন্যে অতিরিক্ত খাদ্যের প্রয়োজন পড়ে না। হাঁসগুলো নদী থেকে শামুক আর ছোটো মাছ খেয়ে পাকস্থলী পূর্ণ করে ঘরে ফেরে। যদি হাড়িধোয়া নদীকে ধরেই একটা আনুমানিক হিসাব করি, তাহলে এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণটা বের হয়ে আসবে। ৩৮ কিলোমিটার নদীটির পাড়ে হাজার হাজার পরিবারের বসবাস। তার মধ্য থেকে যদি ১,২০০ পরিবার অন্তত ৩ টি করে হাঁস পালন করে আর দৈনিক গড়ে ৩,০০০ ডিম দিলে বছরে (গড়ে ১৫ টাকা ধরে হিসেব করলে) এক কোটি চৌষট্টি লাখ পঁচিশ হাজার টাকা আসবে, যা ২০ বছরে বত্রিশ কোটি পচাশি লাখ টাকা। এখন যদি ব্রহ্মপুত্র নদের হিসাব করি, তাহলে এটি হাড়িধোয়ার তিনগুণ। তাহলে এই নদের পাড়ে হাঁসের ডিমের হিসাবটি দাঁড়ায় আটানব্বই কোটি পঞ্চান্নো লাখ টাকা। আর ১০৮ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের শীতলক্ষ্যাও প্রায় সাতানব্বই কোটি টাকার নদীপাড়ের ডিম অর্থনীতি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এ তো গেলো শুধু ডিমের হিসাব। যদি হাঁসের মাংসের হিসাব করা হয়, তাহলে প্রতিটি পরিবার বছরে গড়ে একটি করে হাঁস বিক্রি করলে এবং গড় মূল্য হাঁসপ্রতি অন্তত ৫০০ টাকা ধরে বছরে ছয় লাখ এবং বিশ বছরে এক কোটি বিশ লাখ টাকা হয়। সেই হিসেবে ব্রহ্মপুত্র তিন কোটি এবং শীতলক্ষ্যা আড়াই কোটির উপরে। তাহলে দেখা যাচ্ছে নদী দূষণের ফলে নদীপাড়ের এই অর্থনীতি ভেঙে পড়েছে। সেই সাথে পাড়ের জনবসতিও আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে।

নদী দখল ও ভুলভাবে খনন
ব্রহ্মপুত্র, আড়িয়াল খাঁ, নাগদা, কলাগাছিয়া, সোনাখালী, হাড়িধোয়া ও কয়রা নদ-নদীগুলো বেহাত হয়ে যাচ্ছে। নাগদা, কয়রা ও সোনাখালীর অস্তিত্ব এখন বিভিন্ন সরকারি নথিপত্রে, বাস্তবে এর দেখা মেলা কষ্টকর। ব্রহ্মপুত্র ও হাড়িধোয়া বিভিন্ন প্রভাবশালী মহল কর্তৃক দখল হয়ে যাচ্ছে। এছাড়াও যখন নদী খনন প্রকল্পের কাজ চলমান ছিলো, তখন এলাকার প্রভাবশালী মহল প্রভাব বিস্তার করে নিজেদের দখলকৃত ভূমির পরিমাণ ঠিক রেখেছে। সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, নদীর ভূমি দখল করে প্লট বানিয়ে বিক্রি করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে প্রভাবশালী মহল। ঘটনাটি ব্রহ্মপুত্র ও হাড়িধোয়া দুই নদীর বেলায়ই দেখা গেছে। এগুলো মানুষের চোখে পড়লেও ভয়ের কারণে কেউ কোনো প্রতিবাদ করার সাহস করে না কেবল আক্রমণের শিকার হবে, এমনটা ভেবে। অন্যদিকে খনন কাজে সবচেয়ে চোখে পড়ার মতো যে-ঘটনাগুলো ঘটেছে, সেটা হলো নদীগুলো খনন করার সময় পাড় থেকে স্লোপ করে একটি ফুটপাতের মতো রাস্তা তৈরি করা হয়। পরে সেখান থেকে আবার কিছুটা স্লোপ করে মাটি কেটে নদীর তলদেশ সমান করা হয়। এতে নদীর প্রস্থ কমে আসে। ব্যাপারটি আরো সহজভাবে বললে, হাড়িধোয়ার ৬২ মিটার প্রস্থের নদীটি উপরের বর্ণনা অনুযায়ী খনন করার ফলে দুইপাশের প্রস্থ মিলে অর্ধেক নদী গায়েব করে ফেলা হয়েছে। ব্রহ্মপুত্র নদের উপর অসংখ্য ব্রিজকে কালভার্ট বানিয়ে ফেলা হয়েছে। এগুলো নদীর প্রস্থকে অনেক কমিয়ে দিয়েছে। নরসিংদী জেলার পলাশ উপজেলার চরনগরদী বাজারের প্রবেশপথে ব্রহ্মপুত্রের ছোটো ব্রিজটিই তার চাক্ষুষ প্রমাণ। কালভার্টটি (কালভার্টের দৈর্ঘ্যকে ব্রিজ বলা যাচ্ছে না) আবার নদের তলদেশ থেকে কয়েক মিটার উপরে অবস্থিত। এটা কীসের জন্যে তৈরি করা হয়েছে, সেটা প্রকৌশল অধিদপ্তরের লোকজন আর ঠিকাদারগণ ভালো বলতে পারবেন। এটা পরিকল্পনা কমিশনের প্ল্যানে নদীর উপর ব্রিজের যে-ম্যাপ তৈরি করা হয়েছে, সেটা দেখলে বলা যাবে, তারা এই নদ থেকে কী পরিমাণ লুটপাট করেছে। এটা ঘটছে প্রশাসন, ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের নেতা এবং ঠিকাদারদের যোগসাজশে। যদি হাড়িধোয়া নদী ধরেই হিসাব করি, তাহলে বলা যায়, ৩৮ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য ও ৬২ মিটার প্রস্থের নদীটির আয়তন অর্ধেকে নেমে এসেছে। ফলে নদীর পানি কমে গিয়ে নানাবিধ সমস্যা দেখা দিচ্ছে। নদীতে পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি থাকলে সেটা সূর্যের কড়া তাপকে শোষণ করে। ফলে, আবহাওয়া শীতল থাকে। অন্যদিকে, নদী দখলের মধ্য দিয়ে কেটে ফেলা হচ্ছে হাজার হাজার বৃক্ষ। এটা জলবায়ু পরিবর্তনে ব্যাপক প্রভাব ফেলছে।

হাড়িধোয়া নদীর বীরপুর অংশে ঘুরে দেখা যায়, নদীর সীমানা পিলার থেকে কমপক্ষে ১০০ ফুট নদীর জায়গা ভরাট করে বাড়িঘর করেছে অনেকে। সেই সাথে দেয়াল টেনে প্লট করেও রাখা আছে বিভিন্ন স্থানে। ছবির ডানপাশে হলুদ রঙের সীমানা পিলারটি দেখা যাচ্ছে | ছবি : গঙ্গাঋদ্ধি

গার্মেন্টস ও কল-কারখানার বর্জ্য
শিল্প কারখানা ও গার্মেন্টস খাত থেকে বিশ্বের ২০ শতাংশ বর্জ্যপানি ও ১০ শতাংশ কার্বন-ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ হয়। বিশ্বব্যাপী যে-পরিমাণ পানি ব্যবহার হয়, তার প্রায় ২.৬% টেক্সটাইল মিলে ব্যবহার করা হয়। অনুমান করা হয় যে, টেক্সটাইল ইন্ড্রাস্ট্রিগুলোর ডাইং করার সময় প্রতি বছর ২.৪ ট্রিলিয়ন গ্যালন পানি লাগে। পোশাক শিল্প এবং ফ্যাশন ওয়াটার ফুটপ্রিন্ট অনুযায়ী এটি অনুমান করা হয় যে, বিশ্বব্যাপী ইন্ড্রাস্ট্রিয়াল পলিউশনের ২০% পলিউশন আসে টেক্সটাইলের ট্রিটমেন্ট এবং ডাইং ইন্ড্রাস্ট্রি থেকে। আনুমানিক ৮,০০০ প্রকারের সিনথেটিক কেমিক্যাল কাঁচামালকে টেক্সটাইল ম্যাটারিয়ালে পরিণত করতে ব্যবহৃত হয়।

প্রতি বছর, টেক্সটাইল মিলগুলো লক্ষ লক্ষ গ্যালন কেমিক্যাল কন্টামিনিটেড ইফ্লুয়েন্ট আমাদের নদীতে ডিসচার্জ করে। এটি অনুমান করা হয় যে, একটি টেক্সটাইল মিল প্রতি টন ফেব্রিকের ডাইংয়ের জন্যে ২০০ টন সফট ওয়াটার ব্যবহার করে। সুতরাং এটি কেবল পানি শোষণ করে না, কেমিক্যালগুলো পানিকে দূষিত করে, যা উন্নয়নশীল দেশের সর্বত্র পরিবেশগত ক্ষতি এবং রোগ— উভয়ই সৃষ্টি করে।

২০১৭ সালের এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে যে, কেবলমাত্র ২০১৫ সালে, ফ্যাশন শিল্প ৭৯ বিলিয়ন ঘনমিটার পানি কনজিউম করেছিলো, যা কি না ৩২ মিলিয়ন অলিম্পিক আকারের সুইমিংপুল পানি দ্বারা পরিপূর্ণ করার পক্ষে যথেষ্ট ছিলো। ২০৩০ সালের মধ্যে এই সংখ্যা ৫০% বৃদ্ধি পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

কনভেনশনাল টেক্সটাইল ডাইং এবং ফাইবার ফিনিশিং— উভয়ই ওয়াটার কনজিউমিং এবং পলিউটিং শিল্প। অনুমান করা হয় যে, (স্পিনিং, ডাইং, ফিনিশিংসহ) এক কেজি ফাইবার প্রসেস করতে (তুলা, পলিয়েস্টার এবং অন্যান্য ম্যাটারিয়ালস) ১০০ থেকে ১৫০ লিটার পানির প্রয়োজন।
ফ্যাশন শিল্প বর্তমানে সারা বছর ধরে যে-পরিমাণ পানি ব্যবহার করে, তা ১১০ মিলিয়ন মানুষের ৫ বছরের তৃষ্ণা নিবারণের জন্যে যথেষ্ট।

ডয়েচে ভেলের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এলেনমার্ক আর্থার ফাউন্ডেশন বলছে, প্রতি বছর ঢাকার চারপাশের নদীতে যে-পরিমাণ রঙ মিশছে, তা দিয়ে অলিম্পিকের ৩৭ মিলিয়ন সুইমিংপুল পূর্ণ করা সম্ভব। আর ঢাকার আশপাশের নদ-নদী বলতে নরসিংদীর ব্রহ্মপুত্র, হাড়িধোয়া, শীতলক্ষ্যা এবং মেঘনাকেও বোঝানো হয়েছে।

ইন্ডাস্ট্রিগুলো এসব ব্যবহৃত পানি নামমাত্র পরিশোধন করে সরাসরি নদীতে ফেলছে। এটা অত্যন্ত গর্হিত কাজ। মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক পদার্থ মিশ্রিত পানি নদীতে ফেলার ফলে জনজীবন বিপর্যস্ত হচ্ছে। নির্বংশ হচ্ছে মাছসহ অসংখ্য জলজ প্রাণির জীবন। পশু-পাখির তৃষ্ণা মেটাবার জন্যে যে-পানির প্রয়োজন, সেটা ধ্বংস করা হচ্ছে। পশু-পাখির শরীরে অবলীলায় প্রবেশ করছে বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক পদার্থ। ফলে পশু-পাখি বিলুপ্তির পথে এগিয়ে যাচ্ছে এবং প্রভাব পড়ছে বাস্তুসংস্থানের উপর। নদীর পানি ব্যবহার করে কৃষক যে-কৃষিকাজ করতেন, অতিমাত্রায় রঙের কারণে এখন আর সেই পানি ব্যবহার করতে পারছেন না। ফলে রাষ্ট্র বঞ্চিত হচ্ছে জিডিপি আর জাতীয় মোট আমিষ থেকে।

হোটেল ও বাসা-বাড়ির বর্জ্যের রস
দেশের প্রায় বেশিরভাগ শহর কিংবা বাজার নদীর পাড়ে গড়ে ওঠেছে। ছোটো-বড়ো অসংখ্য বাজারের বর্জ্য নদীর পাড়ে ফেলা হচ্ছে, যার পরিমাণ দৈনিক লক্ষ বা কোটি টন। এসব বর্জ্য থেকে প্রচুর জীবাণু মিশ্রিত রস নদীর পানির সাথে মিশে যাচ্ছে। এতে পানির দূষণ ঘটছে এবং সেই সাথে জীবাণু বিভিন্নভাবে মানবদেহে প্রবেশ করছে। বাজারের হোটেল-রেস্তোরাঁ থেকে ফেলে দেয়া খাদ্য পচে পানির সাথে মিশে নদীর দূষণ ঘটাচ্ছে। আবার অনেক বড়ো বড়ো ময়লার ভাগাড় আছে, যেগুলো নদীর পাড়ে অবস্থিত, সেগুলো থেকে গড়িয়ে পড়া বর্জ্যের রস গিয়ে পড়ছে নদীর পানিতে। এটা মারাত্মক ক্ষতিকর। কারণ, এসব বর্জ্যের রসে রয়েছে ক্ষতিকারক উপাদান। মূলত যারা যেভাবে পারছে, যত্রতত্র ময়লা ফেলছে। ফলে নদীর পাড়গুলোতে যাওয়াই দুষ্কর হয়ে পড়ছে দুর্গন্ধের কারণে। এসব বর্জ্যের রস ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। এগুলো থেকে সৃষ্টি হওয়া মশা-মাছি বাজারের পরিবেশ নষ্ট করছে। ক্ষতি করছে পরিবেশের। এখানে মূলত বাজারের ব্যবসায়ীরা দায়ী। তারা তাদের ব্যবহৃত বর্জ্য নির্দিষ্ট স্থানে না ফেলে নিজেদের সুবিধামতো নদীর পাড়গুলোতে ফেলছে। দায়ী করা যায় পৌর কর্তৃপক্ষকেও। তাদের তদারকির অভাবে শহর, নগর, বাজার এবং বন্দরের নদীর পাড়গুলো কদাচার হয়ে গেছে। যদি যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হতো, তাহলে নদীর পাড়গুলোর এই বেহাল দশা হতো না।

ভেলানগর ব্রিজের পাশে স্তূপীকৃত বর্জ্য গড়িয়ে পড়ছে হাড়িধোয়া নদীতে | ছবি : গঙ্গাঋদ্ধি

মাইক্রোপ্লাস্টিক
সম্প্রতি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের অভ্যন্তরীণ নদীগুলোতে প্রতি বর্গকিলোমিটার পানিতে ২৫ লাখেরও বেশি ভাসমান মাইক্রোপ্লাস্টিকের কণা (১-১০০০ ন্যানোমিটার) পাওয়া গেছে। এছাড়াও নদীর তলদেশের প্রতি কেজি পলিতে ৪৫০ টি পর্যন্ত এই ক্ষুদ্র কণা পাওয়া গেছে। এর অন্যতম কারণ প্রতিবেশি দেশ ভারতের দৈনিক ৭৩ হাজার টন প্লাস্টিক বর্জ্য বিভিন্ন নদীর অববাহিকার মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরে পতিত হওয়া। পরবর্তীতে এসব প্লাস্টিকের কণা জোয়ারের টানে দেশের অভ্যন্তরে (যমুনা ও ব্রহ্মপুত্র নদীতে) প্রবেশ করে। বাংলাদেশ, ভারত এবং ভূটানের যৌথ অংশগ্রহণে গবেষণাটি পরিচালিত হয়েছিলো।

এছাড়াও দেশের প্রতিটি শহর, বাজার, বন্দর কিংবা নগরের বাজারগুলো থেকে প্রচুর বর্জ্য নদীতে ফেলা হচ্ছে। নদীর পাড়ে পড়ে থাকা প্লাস্টিকের বর্জ্য এবং পলিব্যাগ রোদের তাপে বা প্রাকৃতিক ক্রিয়া-বিক্রিয়ার কারণে গলে গিয়ে পানি বৃদ্ধির সাথে সাথে নদীতে মিশে যাচ্ছে এবং বয়ে যাচ্ছে মাইলের পর মাইল। ফলে মানুষ যখন নদীতে গোসল করতে নামে, তখন অনায়াসেই তাদের শরীরে ঢুকে পড়ছে প্লাস্টিকের এসব ক্ষতিকর কণা। এসব প্লাস্টিকের কণা প্রবেশ করছে মাছের শরীরেও। আর মানুষ যখন এই মাছ বাজার থেকে কিনে আনে, সাথে কিনে আনে মাইক্রোপ্লাস্টিকও। এসব প্লাস্টিকের কারণে শরীরে নানাবিধ রোগবালাই হচ্ছে। মানুষ ও মাছ— উভয়ের প্রজননে প্রভাব ফেলছে এসব মাইক্রোপ্লাস্টিক।

নেচার মেডিসিনে প্রকাশিত এক স্টাডি বলছে, ১-১০০০ ন্যানোমিটার সাইজের প্লাস্টিক (যথাক্রমে ন্যানো ও মাইক্রোপ্লাস্টিক) ব্রেনে জমা হতে পারে, এবং সেটা লিভার ও কিডনির তুলনায় অনেক বেশি পরিমাণে (৭-৩০ গুণ)! গবেষকদল ২০১৬ সালের একটা নমুনার সাথে এই নমুনা মিলিয়ে দেখেছেন যে, মাইক্রোপ্লাস্টিকের ডিপোজিট বেড়েছে বহুগুণ। মাইক্রোপ্লাস্টিক ও ন্যানোপ্লাস্টিক শুধু সামুদ্রিক মাছ বা প্রাণির চর্বিতেই থাকে না, আমাদের ঘর-বাড়ির পরিবেশেও থাকে, বাইরের বাতাসের চেয়ে একটু বেশি পরিমাণেই। এগুলো আসে গৃহস্থালির কাজে ব্যবহৃত প্লাস্টিক সামগ্রী থেকে। আমরা শ্বাসের সাথে তা গ্রহণ করি এবং আল্টিমেটলি এগুলো গিয়ে জমা হয় লিভার, কিডনি, ফুসফুস, প্লাসেন্টা (যেখান থেকে ভ্রূণেও যেতে পারে) এবং অস্থিমজ্জায়। আগে ভাবা হতো, শুধু ন্যানোপ্লাস্টিকই ব্লাড-ব্রেইন ব্যারিয়ার পাস করতে পারে। ব্যারিয়ার কী? রক্তবাহিকা ও মস্তিষ্কের টিস্যুর মধ্যকার ব্যারিয়ার, যেটা কি না এখন মাইক্রোপ্লাস্টিকও ভেদ করে যেতে পারে! এসব মাইক্রোপ্লাস্টিকের বেশিরভাগই আসে পলিইথিলিন থেকে, যেটা বিশ্বে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত প্লাস্টিক।

এসবের উপস্থিতিকে কার্ডিওভাস্কুলার ডিজিজের জন্যে দায়ী করা হয়েছে। পাকস্থলির ক্যান্সার কোষকে প্লাস্টিকের সংস্পর্শে আসার পর আরো দ্রুত ছড়াতে দেখা গিয়েছে। ব্রেনে গিয়ে এরা কী তাণ্ডব চালাবে, সেটা না হয় সময়ই বলুক। কিন্তু চিকিৎসক ও গবেষকদের কপালে দুশ্চিন্তার যে-কয়েকটা বাড়তি ভাঁজ তৈরি হয়েছে ও হবে, তা বলাই বাহুল্য।

নরসিংদী সদর, মাধবদী এবং জেলার অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বাজারের পাড়ে এমন অসংখ্য টন পলিথিন ফেলা হচ্ছে। ফলে রোদের কড়া তাপে সেগুলো গলে পড়ছে নদীতে। আর এভাবেই দূষণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হচ্ছে।

কৃষি
মানুষের সংখ্যা বাড়ার সাথে সাথে খাদ্যের চাহিদাও বাড়ছে। আর খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধির জন্যে একই জমিতে বারবার ফসল ফলানো এবং পোকামাকড়হীন উৎপাদন বৃদ্ধির জন্যে বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার করা হচ্ছে। ফলে বৃষ্টি হলে এসব জমির সার এবং কীটনাশক বৃষ্টির পানিতে ভেসে নদীতে গিয়ে পড়ছে। এভাবে জেলার লক্ষ লক্ষ হেক্টর জমিতে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহারের ফলে নদীর পানি দূষিত হচ্ছে। অথচ প্রাকৃতিক উপায়ে কী করে পোকামাকড়হীন উৎপাদন বৃদ্ধি করা যায়, সেদিকে কোনো কর্ণপাতই করা হচ্ছে না বা কর্তৃপক্ষ করছে না। গবেষণায় পর্যাপ্ত বরাদ্দ দিলে কৃষিবিজ্ঞান এক্ষেত্রে দারুণ সাফল্য অর্জন করতে পারতো। কিন্তু কর্তৃপক্ষের সদিচ্ছা আর রাজনৈতিক ফ্যালাসির কারণে দেশের পরিবেশ ধ্বংস হচ্ছে এবং এটা হচ্ছে সকলের চোখের সামনেই। অথচ আজ থেকে শত বছর আগেও কয়েক কোটি মানুষ বাস করতো এদেশে। তখন কীটনাশকের এতো ব্যবহার হতো বলে এমন তথ্য পাওয়া যায় না। কিন্তু তারা না খেয়ে ছিলো বা ফসল কম হতো এমনটা কখনোই বলা যাবে না। বরং আমাদের দেশে একটা প্রবাদ প্রচলন আছে যে, আমরা মাছে-ভাতে বাঙালি। অর্থাৎ গোলা ভরা ধান আর পুকুর ভরা মাছ এবং গোয়াল ভরা গরু আমাদের ধন-সম্পদে পরিপূর্ণ করে রেখেছিলো। সারা বছর জমানো গরুর গোবর জমির উৎকৃষ্ট সার হিসেবে বিবেচিত। জমিতে গোবর ব্যবহার করলে যেমন প্রচুর ফসল পাওয়া যেতো, তেমনি আমাদের নদীগুলোও রাসায়নিক সার আর কীটনাশকের করাল থাবা থেকে রক্ষা পেতো। আর রাষ্ট্রের বেঁচে যেতো হাজার হাজার কোটি টাকা। অথচ এখন এগুলো পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করা হচ্ছে। সবুজের সমারোহ বাংলার পথে-ঘাটে চোখ মেললেই দেখা যেতো। বিশাল বড়ো বড়ো বন-জঙ্গল সার এবং কীটনাশকের ব্যবহার ছাড়াই হাজার হাজার বছর ধরে টিকে আছে।

ড্রেনের বর্জ্য
মানুষ বাড়ার সাথে সাথে শহরের চাপও বাড়ছে। মূলত উন্নত জীবনযাপন আর শহরের অধিক কর্মসংস্থান গ্রাম থেকে মানুষকে শহরের দিকে নিয়ে আসে। ফলে অতিরিক্ত মানুষের আবাসস্থলের চাহিদা মেটাতে এবং ভাড়া পাওয়ার আশায় অসংখ্য ইট-পাথরের দালান একের পর এক গড়ে ওঠতে থাকে। ফলে শহুরে জীবনে নানাবিধ সংকট সৃষ্টি হতে থাকে। বিভিন্ন সমস্যার সাথে সাথে শহরের ড্রেনেজ ব্যবস্থার উপরও চাপ পড়ে। কোটি কোটি মানুষ তাদের ব্যবহৃত পানি এবং বর্জ্য ড্রেনে ছেড়ে দেয়। আর এভাবেই শহরের শত শত কিংবা হাজার হাজার ড্রেন নদীতে তরল বর্জ্য নিয়ে আসে। কিন্তু কী পরিমাণ বর্জ্য একটি শহর কিংবা সারা দেশ থেকে ড্রেনের মধ্য দিয়ে নদীতে পড়ছে, সেটার হিসাব এখনো পর্যন্ত বাংলাদেশে হয়নি। আর এই অবস্থা থেকে উত্তরণের কোনো পদক্ষেপও নেয়া হয়নি এখনো পর্যন্ত। এটা নিয়ে আলোচনাই হয়নি কোথাও। এসব ড্রেনের বর্জ্য নদীগুলো দূষণেও কম ভূমিকা রাখছে না। শীতলক্ষ্যা নদীর আশপাশের এলাকায় গড়ে ওঠা প্রায় ৪০০ ফ্যাক্টরির তরল বর্জ্য বিভিন্ন ড্রেন আর নালার মাধ্যমে নদীতে পড়ছে। এর পরিমাণ প্রায় দৈনিক ২০ কোটি লিটার। হোটেল, রেস্তোরাঁ এবং বাজারের বিশাল পরিমাণ বর্জ্য সরাসরি নদীতে ফেলা হচ্ছে, যা নদীর দূষণকে আরো তরান্বিত করছে। ব্রহ্মপুত্র, শীতলক্ষ্যা ও হাড়িধোয়া নদীতে প্রতি লিটার পানিতে ডিও মেনাস ডিজলভ অক্সিজেন থাকার কথা ৪-৬ মিলিগ্রাম। কিন্তু দুঃখের বিষয়, বর্তমানে তা মাত্র ১-২ মিলিগ্রাম। এটা জলজ প্রাণির বেঁচে থাকার জন্যে একেবারেই নগণ্য। অনেক প্রতিষ্ঠান ইটিপি স্থাপন করলেও কার্যত এসব লোক দেখানো এবং রাতের বেলায় অপরিশোধিত পানি ড্রেনের মাধ্যমে সরাসরি নদীগর্ভে ফেলা হচ্ছে। আর এভাবেই দেশের অসংখ্য নদ-নদী মানুষের জীবনের ন্যায় অসুস্থতায় ভুগছে।

দূষণ রোধে ম্যানগ্রোভ
শিল্প কারখানা বৃদ্ধির ফলে প্রচুর পরিমাণ রাসায়নিক বর্জ্য নদীতে ফেলা হচ্ছে। দূষিত হচ্ছে পানি। এই বিশাল পরিমাণ পানি সহজে পিউরিফাই করা সম্ভব নয়। কিন্তু নদীতে ফেলা ইন্ডাস্ট্রিয়াল বর্জ্য পদার্থের কারণে নদীর দূষণ রোধে বড়ো ভূমিকা রাখতে পারে ম্যানগ্রোভ। প্রাকৃতিক উপায়ে এটা সম্ভব। দেশের নদীগুলোর পানি পরীক্ষা করলে দেখা যাবে যে, Biological Oxygen Demand and Chemical Oxygen Demand অত্যধিক বেশি। এক্ষেত্রে ম্যানগ্রোভ প্রাকৃতিক ফিল্টার হিসেবে কাজ করতে পারে। এক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ চাইলে একটা পাইলট প্রকল্পের সূচনা করতে পারে। অনেকেই বলে থাকবেন, ম্যানগ্রোভ তো লবণাক্ত পানি ছাড়া জন্মায় না। হ্যাঁ, কথা সত্যি, এটা লবণাক্ত পানি ছাড়া জন্মায় না। কিন্তু কিছু প্রজাতি নিয়ে কলাকাতায় একটি পাইলট প্রকল্প চালু করে তারা সফল হয়েছে। তারা প্রমাণ পেয়েছে যে, ম্যানগ্রোভ ব্যাপকভাবে পানির দূষিত পদার্থ শুষে নেয় এবং পানি পরিষ্কার করে। পরিবেশবাদীরা শিল্পায়নের বিরুদ্ধে নয়। কিন্তু সেটা হতে হবে সুষ্ঠু প্রক্রিয়ায়। জেলার ১২৯ টি তরল বর্জ্য নিঃসরণকারী প্রতিষ্ঠান যদি একসাথে বসে আলোচনা সাপেক্ষে একটা ফান্ডিং করে এবং সেটা দিয়ে নদীর পাড়ে ম্যানগ্রোভ লাগায়, তাহলে ন্যূনতম হলেও ক্ষতি থেকে বাঁচা যেতো।

জার্মানির পানি পরিষ্কার করার পদ্ধতি
সম্প্রতি জার্মানির এরলাঙ্গেন-নুরেমবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যাটারিয়াল সায়েন্টিস্ট মার্কুস হালিক পানি বিশুদ্ধকরণ প্রক্রিয়া নিয়ে গবেষণা করে সফলতার মুখ দেখেছেন। তার উদ্ভাবিত পদ্ধতিটি এতোটাই কার্যকর যে, এটার মধ্য দিয়ে যতো প্রকার দূষিত পানি আছে, তার বর্জ্যকে পানি থেকে আলাদা করে ফেলে। তিনি ম্যাগনেটিক আয়রন অক্সাইড ন্যানো পার্টিকেল ব্যবহার করে অনেক ধরনের দূষণ অপসারণ করতে সক্ষম হয়েছেন। তারা পার্টিকেলগুলোর পৃষ্ঠকে মলিকিউল দিয়ে আবৃত করে আর সেই কারণে পার্টিকেলগুলো বিভিন্ন ধরনের দূষণ শনাক্ত করতে পারে। পার্টিকেলগুলো ডিজেলের সাথে যুক্ত হয়ে জমাট বাঁধে, যা চুম্বক দিয়ে সহজেই টেনে বের করা যায়। এই ধরনের আরো কী কী পদ্ধতি আছে, রাষ্ট্রকে সেগুলো বিভিন্ন দেশের সাথে যোগাযোগ করে বের করতে হবে। এতে নদীগুলো কিছুটা হলেও বেঁচে যাবে।

নদীর লিভিং এনটিটি
বাংলাদেশের উচ্চ আদালত ২০১৯ সালে দেশের সব নদীকে ‘লিভিং এনটিটি বা জীবন্ত সত্তা’ হিসেবে ঘোষণা করেছেন। ফলে এখন থেকে দেশের নদীগুলো মানুষ বা অন্যান্য প্রাণির মতোই আইনী অধিকার পাবে। আদালতের রায় অনুযায়ী নদীগুলো ‘জুরিসটিক পারসন বা লিগ্যাল পারসন’। এর মধ্য দিয়ে নদীগুলোরও মানুষের মতো মৌলিক অধিকারের স্বীকৃতি রয়েছে। নদীগুলোকে বাঁচাতে হলে সম্মিলিতভাবে সচেতন নাগরিকদের এগিয়ে আসতে হবে। বিভিন্ন সংগঠন একসাথে হয়ে একটা কঠোর আন্দোলনের দিকে যেতে পারে। এখানে বিভিন্ন স্কুল, কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্যাম্পেইন করে তরুণদের সম্পৃক্ততা বাড়ানো যেতে পারে। নদীগুলো বাঁচানোর জন্যে সরকারকে বাধ্য করতে হবে এজন্যে যে, যারা নদী দূষণের সাথে জড়িত, তাদের সরকারি সুবিধা বাতিল করে আইনের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। আর বিভিন্ন কারখানার বিষাক্ত বর্জ্য নদীতে পড়ছে কি না, সেটা সর্বসাধারণের দেখার জন্যে পরিবেশ অধিদপ্তরের সিসি ক্যামেরাগুলো ওপেন করে দেয়ার জন্যে সরকারকে পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করা। কারণ সেখানেই একটা গণ্ডগোল আছে। দেশের পরিবেশ আন্দোলনের যেসব সংগঠন আছে, সেগুলো এক্টিভ করে তুলতে হবে। পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের ভূমিকাকে মিডিয়ার মাধ্যমে সামনে নিয়ে আসতে হবে। নয়তো নদীগুলোকে বাঁচানো সম্ভব হবে না। নদীর লিভিং এনটিটির সর্বোচ্চ ব্যবহার এখন অত্যাবশ্যকীয় হয়ে পড়েছে। দেশের নদ-নদী এবং জলাভূমি ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় কঠোর পরিবেশগত নীতি এবং আইন তৈরি করেছে। নিম্নলিখিত চারটি আইন এক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক :

বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫ (পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়, ১৯৯৫), বাংলাদেশ পানি আইন ২০১৩ (বাংলাদেশ, ২০১৩ক), জাতীয় নদী সংরক্ষণ কমিশন আইন ২০১৩ (বাংলাদেশ, ২০১৩খ) এবং বাংলাদেশ জীববৈচিত্র্য আইন ২০১৭ (বাংলাদেশ, ২০১৭)।

কিন্তু এগুলোর প্রয়োগ নেই বললেই চলে। আর আইনগুলোরও সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তন অনিবার্য হয়ে পড়েছে। আইনগুলোতে শাস্তির বিধান এমনভাবে রাখা হয়েছে যে, এগুলো দেশের পরিবেশের সর্বনাশকারী পুঁজিবাদীদের পরিবেশ দূষণে আরো উৎসাহিত করছে। আইনগুলোতে বিশ হাজার থেকে দুই লাখ টাকা জরিমানার বিধান এবং অনাদায়ে দুই মাস জেল থেকে দশ বছর পর্যন্ত করা হয়েছে। অর্থাৎ যতো বড়ো অপরাধই করুক না কেন, টাকার জোরে তিনি পার পেয়ে যাবেন, এটি এমনই এক অদ্ভূত ও হাস্যকর আইন। টাকার জোরে যাতে অপরাধী পার পেয়ে যেতে না পারে, পরিবেশ বাঁচাতে সেই আইন তৈরি এখন অনিবার্য। শাস্তির বিধানে কোটি টাকা পর্যন্ত জরিমানা রাখা উচিত। আর জেল হলে সেটা তাকে যেন ভোগ করতেই হয়, এমন আইন তৈরি করা ফরজ হয়ে গেছে। আর আইন তৈরির পর প্রয়োগ না হলে সেটা আরো ভয়ানক হবে। পানি আইন নীতিমালা এবং বিধিমালা— এসবের কোনোটাই বাংলাদেশে এখনো পর্যন্ত হয়নি, এটি অত্যন্ত দুঃখজনক। কয়েক বছর আগে হাড়িধোয়া নদী নিয়ে মামলা হয়েছিলো। কিন্তু এখনো সেই মামলার রায় আসেনি। নদী পুনরুদ্ধারে দেশের তিনটি পাইলট প্রকল্পের মধ্যে একটি হাড়িধোয়া। সেটিও জেলার প্রভাবশালী মহলের চাপের মুখে বন্ধ হয়ে গেছে। তাহলে এভাবে চলতে থাকলে দেশের যে বিপন্ন অবস্থা, এটা তো বাড়তেই থাকবে। আর এর ক্ষতির সম্মুখীন হবে সাধারণ ও প্রভাবশালী সকলের সন্তানেরা।

রাজনৈতিক বন্দোবস্ত চাই
দেশের বিদ্যমান রাজনৈতিক দলগুলো থেকে এখন পর্যন্ত নদীগুলো রক্ষায় কার্যকরী কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করতে দেখা যায়নি। সরকার আসে, সরকার যায়, কিন্তু নদী দূষণ চলতে থাকে আগের মতোই কিংবা তারচেয়ে বেশি। রাজনীতির সাথে জড়িত বহু নেতা রয়েছেন, যারা সরাসরি নদী দূষণের সাথে জড়িত। নদী নিয়ে সরকার যেভাবে কৃচ্ছসাধন করছে, এভাবে চলতে দিলে নদীগুলোর তলদেশ গরু-ছাগলের তৃণভূমিতে পরিণত হতে খুব বেশি সময় লাগবে বলে মনে হয় না। নির্বাচনের ইশতেহারে পরিবেশ রক্ষার ব্যাপারে কোনো দলই বিগত সময়ে আগ্রহ প্রকাশ করেনি। এটা অত্যন্ত দুঃখজনক। দেশের বিদ্যমান রাজনৈতিক দলগুলো যদি একসাথে বসে এটা নিয়ে আলাপ-আলোচনা করে, তাহলে একটা মীমাংসা হতে বাধ্য। এখানে রাজনৈতিক সদিচ্ছার চরম ঘাটতি দেখছি। তারা পরিবেশ নিয়ে মাথা ঘামিয়ে সময় নষ্ট করার পক্ষে নয়। ক্ষমতায় গেলে সবাই ভুলে যায়, কার কী দায়িত্ব বা কী প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসেছিলো। তাই এমন কিছু নিয়ে ভাবা উচিত, যেন তারা সেটা ভোলার অবকাশ না পান। এখানে বলে রাখা ভালো যে, কোনো দলই এটার বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস করে না এবং এটা যে প্রয়োজন, তার গুরুত্ব বিনাবাক্যে স্বীকার করে। কিন্তু জনগণের জন্যে কিছু করতে হলে সেটা তো দেখাতে হবে। তারা যেন পরিবেশ দূষণ রোধে রাষ্ট্রীয়ভাবে সকলকে সাথে নিয়ে কিছু একটা করে, সেই বন্দোবস্ত এখনই করতে হবে। আগামীতে করতে চাইলে সেই ‘আগামী’ কবে আসবে, তা আমরা জানি না। আমরা জানতেও চাই না।


বালাক রাসেল
সম্পাদক, ঢেঁকি

সম্পর্কিত

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সর্বশেষ