Home Blog

ইতিহাসের আলোঘেরা এ-অঞ্চলের পাঁচজন নারী

প্রসন্নতারা গুপ্তা
প্রসন্নতারা গুপ্তার জন্ম ১৮৫৫ সালের ২ এপ্রিল। তাঁর পৈতৃক নিবাস নারায়ণগঞ্জ জেলার আড়াইহাজারের দুপতারা। দুুপতারার এই গুপ্ত জমিদার পরিবার প্রভাব-প্রতিপত্তি, শিক্ষা-দীক্ষায় এগিয়ে ছিলেন বলে জানা যায়। তিনি স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী ছিলেন। ভাটপাড়া গুপ্ত পরিবারের সাথে দুুপতারা গুপ্ত পরিবারের আন্তরিক যোগাযোগ ছিলো, ছিলো গভীর সম্পর্ক। কে জি গুপ্তের বাবা কালীনারায়ণ গুপ্ত ছিলেন একজন বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী আলোকিত মানুষ। তিনি সমাজসেবা ও নারী জাগরণের বলিষ্ঠ প্রবক্তা ছিলেন। ১৮৭০ খ্রিস্টাব্দে নারী জীবনের উন্নয়নের লক্ষ্যে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘অন্তঃপুরে স্ত্রী শিক্ষা সভা’। নামই বলে দেয় তার কার্যক্রম, লক্ষ্য ও আদর্শ কী ছিলো। ‘অন্তঃপুরে স্ত্রী শিক্ষা সভা’ সংগঠনটির আত্মপ্রকাশের সময়ে (১৮৭০) প্রসন্নতারা গুপ্তা একজন তরুণী। তিনি এ-সংগঠন গঠনে আন্তরিক প্রয়াস চালান। তা দেখে কালীনারায়ণ অত্যন্ত প্রীত হন। সে-সময় কে জি গুপ্ত মাত্র ১৯ বছরের তরুণ (১৮৫১ সন)। ধারণা করা যায় যে, প্রসন্নতারার মেধা-প্রজ্ঞা ও কর্মনিষ্ঠা লক্ষ্য করেই কালীনারায়ণ তাঁকে পুত্রবধূ হিসেবে বেছে নেন।

১৮৮৬ খ্রিস্টাব্দে কলকাতার অভিজাত শিক্ষিত পরিবারের মেয়েরা ‘সখি সমিতি’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এর প্রধান উদ্যোক্তা স্বর্ণকুমারী দেবী। তাঁর অন্যতম প্রধান সহযোগী ছিলেন এই প্রসন্নতারা গুপ্তা। উক্ত সমিতিতে একমাত্র মুসলিম সদস্য ছিলেন লাকসামের জমিদার নবাব ফয়জুন্নেসা চৌধুরাণী। উক্ত সমিতির মাধ্যমে কে জি গুপ্তের স্ত্রী প্রসন্নতারা স্ত্রী শিক্ষা, বিধবা বিয়ের প্রচলন, সহমরণ প্রথা রোধ তথা মেয়েদের স্বাবলম্বী করার জন্যে অনেক কাজ করেছেন। এই ‘সখি সমিতি’র আরো একজন সুহৃদ ও সহযোগী ছিলেন ভাই গিরিশচন্দ্র সেন। তাঁর আত্মচরিত থেকে জানা যায়, তিনি নারী শিক্ষা ও নারী জাগরণের একজন প্রবক্তা। এমনকি মুসলিম নারী জাগরণের পথিকৃৎ বেগম রোকেয়ার সাথেও তাঁর নিয়মিত পত্রালাপ চলতো, চলতো মতবিনিময়।

প্রসন্নতারা গুপ্তার ডাকনাম ‘তুফানি’। তিনি যথার্থভাবে তুফানের ন্যায় কাজ করতেন বলে জানা যায়। তাঁর কর্মবহুল জীবন মোটেই দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। মাত্র ৫৩ বছর বয়সে এ-বিদুষী ও প্রগতিশীল মহিলা ১৯০৮ সালের ১৫ আগস্ট লন্ডনে মৃত্যুবরণ করেন।

তাঁর একমাত্র প্রবন্ধ গ্রন্থ ‘পারিবারিক জীবন’ প্রকাশিত হয় ১৩১০ বঙ্গাব্দে। ঈর্ষণীয় সামাজিক জীবনের পাশাপাশি প্রসন্নতারা ও কে জি গুপ্তের দাম্পত্য জীবন তথা পারিবারিক জীবনও ছিলো সাবলীল। সংসারে সাফল্যের কোনো অন্ত ছিলো না। মোট চার সন্তান জন্ম নেয় তাঁদের ঘরে। বীরেন্দ্র চন্দ্র গুপ্ত, ধীরেন্দ্র চন্দ্র গুপ্ত, যতীন্দ্র চন্দ্র গুপ্ত ও হেমকুসুম। এই হেমকুসুমই বাংলার প্রসিদ্ধ গীতিকবি অতুলপ্রসাদ সেনের স্ত্রী।

অবিভক্ত বাংলাদেশের শিক্ষা-দীক্ষা, সমাজ, ধর্ম সংস্কার, বিধবা বিবাহ, সহমরণ প্রথা বাতিলসহ আরো অনেক জনহিতকর কার্যে কে জি গুপ্তের অবদান যেমন চিরস্মরণীয় হয়ে আছে, তেমনই স্মরণীয় হয়ে আছেন প্রসন্নতারা গুপ্তা।

প্রিয়বালা গুপ্তা
বিশ শতকের একটা কুসংস্কারাচ্ছন্ন ও প্রতিকূল সমাজে নারী শিক্ষা ও সমাজ সংস্কারের অদম্য তাগিদ নিয়ে জন্মেছিলেন একজন নারী। নাম প্রিয়বালা গুপ্তা। ১৮৯৯ সালে ভাগলপুরে জন্ম হলেও পৈতৃক বাড়ি নরসিংদীর পাঁচদোনায়। শৈশবেই মেধার পরিচয় দিলেও অল্প বয়সেই পড়াশোনায় ছেদ পড়ে। এবং ১৩ বছর বয়সেই মাধবদীতে বনেদি রায় পরিবারে বিবাহিত জীবন শুরু করতে বাধ্য হন। একান্নবর্তী রায় পরিবারে মানসিকভাবে বিচ্ছিন্ন প্রিয়বালার সংবেদনশীল মনে সৃজনশীলতার বিকাশ ঘটে। সাহিত্যচর্চার দিকে ঝুঁকে পড়েন। এই সময়ই গ্রামের নিরক্ষর বধূদের নিয়ে সপ্তাহের প্রতি রোববার আসর বসাতেন। সেখানে গল্পের ছলে দেশ, সমাজ, ভূগোল, বিজ্ঞান নিয়ে আলোচনা হতো। এই আসরই পরবর্তীতে মেয়েদের জন্যে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ভিত তৈরি করে। সেই সময় পঞ্চাশের মন্বন্তর বা বাংলার দুর্ভিক্ষ দেখা দিলে ‘মহিলা আত্মরক্ষা সমিতি’র সাথে যুক্ত হয়ে স্বেচ্ছাসেবীর ভূমিকা পালন করেন। ১৯৪৪ সালে প্রিয়বালার উদ্যোগে যাত্রা শুরু করে কাঙ্ক্ষিত বিদ্যালয় ‘মাধবদী শিশু সদন বিদ্যা নিকেতন’। স্বামী যতীন্দ্রমোহন রায় ও তৎকালীন মাধবদী হাই স্কুলের হেডমাস্টার শচীনন্দন সাহেবের সহায়তায় বাড়ির বৈঠকখানায় মাত্র দুজন মেয়ে নিয়ে এর সূচনা হয়। প্রারম্ভে চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত খোলার প্রস্তাব থাকলেও শিশু শ্রেণি ও প্রথম শ্রেণিতে শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ ছিলো। ধীরে ধীরে শিক্ষার্থীদের সংখ্যা বাড়তে থাকে। মাধবদীর পাশাপাশি সংলগ্ন বিভিন্ন এলাকা থেকে ছাত্রীরা আসতো। নানা বিপত্তি পেরিয়ে স্কুলে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠের ব্যবস্থা হয়।

প্রিয়বালা গুপ্তা

১৯৪৭ সালে পঞ্চাশোর্ধ্ব বয়সে বিশ্বভারতী লোকশিক্ষা সংসদের একটি কেন্দ্রের অধীনে পরীক্ষায় অংশ নিয়ে কৃতিত্বের সঙ্গে ‘সাহিত্যভারতী’ উপাধি পান। ইতোমধ্যে গীতিনাট্য রচনায় তাঁর পারদর্শিতা প্রকাশ পায়। ঢাকা রেডিওতে তাঁর রচিত গীতিনাট্য ‘শকুন্তলা’, ‘শবরীর প্রতীক্ষা’, ও ‘উর্মিলা’ সম্প্রচারিত হয়। তৎকালীন সমাজে শিশু ও প্রসূতি পরিচর্যায় বিবিধ কুসংস্কারে বিচলিত হয়ে পড়েন প্রিয়বালা। সম্ভ্রান্ত পরিবারের গৃহিণী হয়েও ধাত্রীবিদ্যায় প্রশিক্ষণ নিয়ে এগিয়ে আসেন। এসব কাজের মাধ্যমে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রভাব ফেলেন।

বিদ্যালয়ের ছাত্রীদের মনোগঠন নির্মাণ ও বিকাশকল্পে মাধবদীর বদ্ধ সমাজে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করেন। নিয়মিত নাচ, গান, আবৃত্তি ও মূকাভিনয় হতো। হাতে লেখা সাহিত্য পত্রিকা ‘কিশলয়’ বের হতো। গান লেখার প্রতিভা ছিলো তাঁর। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ও সঙ্গীতশিল্পীদের অনুরোধে গান লিখে দিতেন। ১৯৪৭ সালে ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগের পর অনিরাপত্তায় হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের দেশত্যাগ বাড়তে থাকে মাধবদী অঞ্চলে। পড়াশোনার জন্যে পুত্র-কন্যাকে পার্শ্ববর্তী দেশে পাঠিয়ে দিলেও নিজে রয়ে যান এই দেশে। মানুষের ভালোবাসায় মাধবদী বালিকা বিদ্যালয়ের দিদিমণি হয়ে রয়ে গেলেন। ১৯৫৪ সালে প্রিয়বালার স্বামী মারা গেলেন। এক পর্যায়ে পশ্চিমবঙ্গে সন্তানদের দেখতে গিয়ে নানা জটিলতায় আর ফিরে আসতে পারেননি এই বাংলায়। মৃত্যুর পূর্বে ১৯৬৩ সাল থেকে তিনি ‘স্মৃতিমঞ্জুষা’ নামে আত্মজীবনী লিখতে থাকেন। এই আত্মজৈবনিক রচনা তাঁর জীবনীর মধ্য দিয়ে তৎকালীন সমাজ-পরিবেশসহ নানা বিষয়ে এক ঐতিহাসিক ভাষ্য হয়ে রইলো। সমাজ সংস্কারক ও মহীয়সী প্রিয়বালা গুপ্তা ১৯৭৩ সালে মৃত্যুবরণ করেন। প্রিয়বালার দৃঢ় সংকল্প জীবনযাত্রা দেখিয়ে দেয়, পশ্চাৎপদ গ্রামীণ সমাজে কীভাবে শিক্ষা ও সংস্কারের ভিত্তিতে সচেতনতা ও মুক্তমনের প্রদীপ জ্বালানো যায়, ঘটানো যায় পরিবর্তন।

হিরণবালা রায়
এ-অঞ্চলের খুবই কম আলোচ্য, বলা যায়, ইতিহাস নিয়ে ঘাটাঘাটি করা লোকজনের আলোচনায় না থাকা একজন নারী ছিলেন হিরণবালা রায়। একজন নিবেদিতপ্রাণ সমাজকর্মী ছিলেন তিনি।

মাধবদীর আটপাইকা গ্রামটির তালুকদার ছিলেন মণীন্দ্র রায়, সতীন্দ্র রায় ভ্রাতৃদ্বয়। শুধু তাই নয়, তাঁরা ছিলেন স্বদেশি আন্দোলনের অকুতোভয় সৈনিক। বিপ্লবী সতীশ পাকড়াশীর সংস্পর্শে এসে দুই ভাই অনুশীলন পার্টি, পরে কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন। আটপাইকায় তাঁদের বাড়িটি কমিউনিস্ট পার্টির অঘোষিত কেন্দ্র ছিলো। তাঁরা আশেপাশের দশ-বারো গ্রামে কৃষক সমিতি’র কাজে নিয়ত ব্যস্ত ছিলেন। তাঁদের দিদি হিরণবালা থাকতেন আসামে, স্বামী চা বাগানের ডাক্তার, সাত সন্তানের জননী ছিলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে ছ’টি ছেলেই মারা যায়, স্বামীও কী এক অজানা রোগে মারা যান। সর্বশেষ ছেলেটি হঠাৎ একদিন বাড়ি থেকে পালিয়ে কোথায় চলে যায়, যোগাযোগ ছিন্ন। হিরণবালা রায়ের পাগল হতে বাকি। জীবনের এই চরম দুর্ভোগমুহূর্তে তিনি আটপাইকায় ভাইয়ের বাড়িতে থাকতে শুরু করেন। হতাশাগ্রস্ত এক বিষণ্ণ বিধবা। ক্রমে ভাইয়ের পরামর্শ ও চেষ্টার ফলে স্বাভাবিক হন ও মানুষের কল্যাণে কাজ করার সিদ্ধান্ত নেন। এই বাড়িটা যেহেতু একটা রাজনৈতিক আড্ডাখানা ছিলো, তাই হিরণবালাও দূরে থাকতে পারেননি এসব থেকে। সমাজের আর্তপীড়িত মানুষের সেবায় নিয়োজিত হলেন।

তিনি মহিলা আন্দোলন শুরু করলেন। হিরণবালা রায় ছিলেন নরসিংদী থানার প্রথম মহিলা সংগঠক। আটপাইকা থেকে সাটিরপাড়া, নরসিংদী; শেখেরচর, ভাটপাড়া, পাঁচদোনা থেকে মাধবদী, কাশীপুর, আলগী পর্যন্ত ছিলো তাঁর কর্মক্ষেত্র। সবই পায়ে হেঁটে। তিনি পরে নবপ্রতিষ্ঠিত মহিলা আত্মরক্ষা সমিতির নরসিংদী থানা কমিটির সম্পাদিকা নির্বাচিত হন। সম্ভবত পরে সমিতির জেলা কমিটির সদস্য হয়েছিলেন।

চল্লিশের দশকে যখন এ-অঞ্চলে দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়, হিরণবালা রায় গ্রামে গ্রামে লঙ্গরখানা খোলার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। সাথে ছিলেন মাধবদীর আরেক মহীয়সী নারী প্রিয়বালা গুপ্তা। দেশভাগের খড়গ যখন সাম্প্রদায়িকতার নীল রক্তে ভেসে যাচ্ছিলো, তখন হিরণবালা রায়ের মতো মানবতাবাদী মানুষেরা সর্বতোভাবে চেষ্টা করেছেন প্রতিবেশিদের রক্তে যেন রঞ্জিত না হয় প্রতিবেশির শরীর। দাঙ্গার বিরুদ্ধে জনমত গঠন করেছিলেন। কিন্ত শেষ পর্যন্ত তা পেরে না ওঠায় আর কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ হয়ে যাওয়ায় তিনি পঞ্চাশের দশকের প্রথমদিকেই ছদ্মবেশে ওপার বাংলায় পাড়ি দেন। পরে আর তাঁর খোঁজ পাওয়া যায়নি।

এই সাহসী নিবেদিতপ্রাণ সমাজকর্মী হিরণবালা রায় সব যুগের নারীদের জন্যে আদর্শ।

মতিজান খাদিজা খাতুন
তিনি শহীদ আসাদের মা হিসেবেই বেশি পরিচিত। তবে তিনি একজন সমাজ সচেতন ও রাজনীতি সচেতন মহীয়সী নারী ছিলেন। শিক্ষা বিস্তারে তাঁর ভূমিকা অনন্য। স্বামী প্রাজ্ঞ ইসলামী চিন্তাবিদ, ঋদ্ধ শিক্ষাবিদ শিবপুরের ধানুয়া গ্রামের মৌলানা মো. আবু তাহের। শুধু আসাদ নয়, তাঁর ছেলেমেয়েদের সকলেই সুপ্রতিষ্ঠিত। খাদিজা খাতুনের বড়ো পরিচয়, তিনি নারী স্বাধিকার আন্দোলনের সাহসী সৈনিক ও বরেণ্য শিক্ষাবিদ বেগম রোকেয়ার নারী জাগরণ তথা নারী আন্দোলনের অন্যতম সৈনিক ছিলেন। তাঁরই নেতৃত্বে ১৯৩২ সালে (বেগম রোকেয়ার মৃত্যুসন) নারায়ণগঞ্জে প্রতিষ্ঠিত হয় আইইটি অর্থাৎ ইসলামী এডুকেশন ট্রাস্ট। সেই আইইটির ফসল নারায়ণগঞ্জ আইইটি গার্লস স্কুল। শুধু তা-ই নয়, তিনি নিযুক্ত হন সেই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা হিসেবেও। সে-সময়ের বাস্তবতায় এমন সাহসী ও যোগ্যতাসম্পন্ন মুসলিম মহিলা খুঁজে পাওয়া কঠিন ছিলো। তাই তাঁকে যদি নরসিংদীর বেগম রোকেয়া বলা হয়, তাহলে খুব অন্যায় হবে বলে মনে করি না।

মতিজান খাতিজা খাতুন

খাদিজা খাতুন নারী স্বাধিকার আন্দোলনের নেত্রীই ছিলেন না শুধু, জাতীয় উন্নয়নেও তাঁর কর্মতৎপরতা ছিলো প্রশংসনীয়। বিশেষ করে, স্বামী মৌলানা মো. আবু তাহেরের ইসলামী উম্মাহর খেদমতে ও শিক্ষা বিস্তারে বরাবর তাঁর ভূমিকা ছিলো ইতিবাচক।

ঊনসত্তরের অগ্নিঝরা দিনগুলিতে তিনি হারান পুত্র আসাদকে। অন্য আট-দশজন মহিলার মতো তিনি কেঁদে-কেটে অস্থির হননি। তার প্রমাণ মেলে আসাদের শাহাদত বরণের মাত্র ১৫ দিন পর ১৯৬৯ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (রোকেয়া হল) থেকে প্রকাশিত স্মরণিকায় তাঁর লিখিত বাণীতে :
“আমার আসাদ মরেছে। কিন্তু আজ আমি লাখো আসাদ পেয়েছি। আমার আসাদ বলতো, মা, আগামী দশ বৎসরে আমরা এক নতুন দেশ গড়ে তুলব। তোমরা তার সাধ পূর্ণ করো।”

ড. আফিয়া খাতুন
ড. আফিয়া খাতুনের জন্ম ১৯২৭ সালে, ঢাকায়। পৈতৃক নিবাস বর্তমান নরসিংদীতে। তাঁর পিতা কিংবদন্তী সমাজ সংস্কারক ও শিক্ষাবিদ সেকান্দর আলী মাস্টার ও মা শফুরা খাতুন। ১৯৪০ সালে ইডেন স্কুল থেকে মেট্রিক পরীক্ষায় মুসলমান মেয়েদের মধ্যে কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হন। ইন্টারমিডিয়েটেও একই ফল। ইডেন কলেজের এই কৃতী ছাত্রী ১৯৪৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এমএ পাশ করেন। ভাষা সংগ্রামে তাঁর ভূমিকা ছিলো অভূতপূর্ব। তিনি ইডেন কলেজে অধ্যাপনার (১৯৫৪-১৯৬১) মধ্য দিয়ে শিক্ষকতা পেশায় প্রবেশ করেন। সেখানে কর্মরত অবস্থায় তিনি ১৯৫৩ সালে নিউজিল্যান্ডের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বৃত্তি লাভ করেন। ১৯৫৬ সালে লিডারশিপ এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রামের আওতায় পূর্ব পাকিস্তান থেকে আফিয়াই প্রথম যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার সুযোগ পান। তিনি ইউনিভার্সিটি অব নিউজিল্যান্ড ও যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান ইউনিভার্সিটিতে উচ্চশিক্ষা লাভ করেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। শিক্ষকতা করেছেন পূর্ব পাকিস্তান শিক্ষা সম্প্রসারণ সেন্টার, ঢাকা ও পশ্চিম পাকিস্তান শিক্ষা সম্প্রসারণ সেন্টার, লাহোরে। তিনি পড়িয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের মিজৌরি, কলাম্বিয়া ও সান ডিয়াগোর ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে।

ড. আফিয়া খাতুন

ড. আফিয়ার প্রথম স্বামী পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক (১৯১৮-৬৫)। শামসুল হক ও আফিয়া খাতুন দম্পতির দুই সন্তান উম্মে বতুল ফাতেমা জোহরা এবং উম্মে বতুল তাজমে তাহেরা। পরে ড. আফিয়ার আবার বিয়ে হয় সহকর্মী ভাষাবিজ্ঞানী, পাঞ্জাবের জলন্ধরের অধিবাসী অধ্যাপক আনোয়ার দিলের সঙ্গে।

ড. আফিয়া খাতুনের উল্লেখযোগ্য বইয়ের মধ্যে রয়েছে বেঙ্গলি ল্যাংগুয়েজ অ্যান্ড কালচার, বেঙ্গলি নার্সারি রাইমস : অ্যান ইন্টারন্যাশনাল পারসপেকটিভ, টু ট্র্যাডিশনস অব দ্য বেঙ্গলি ল্যাংগুয়েজ। বাংলা ভাষায় রচিত বইয়ের মধ্যে রয়েছে নিউজিল্যান্ডের পত্র, ক্যারোলাইন প্রাটের আই লার্ন ফ্রম চিলড্রেন (বাংলা অনুবাদ, ১৯৫৫), যে দেশ মনে পড়ে (১৯৫৭, ভ্রমণকাহিনি), হেলেন কেলারের লেখা মাই টিচার (বাংলা অনুবাদ : হেলেন কেলার আমার শিক্ষক)। এছাড়া সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর উপন্যাস ‘চাঁদের অমাবস্যা’ ও নাটক ‘তরঙ্গভঙ্গ’ তিনি বাংলা থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন। স্বামী আনোয়ার দিলের সঙ্গে যৌথভাবে লিখেছেন উইমেন্স চেঞ্জিং পজিশন ইন বাংলাদেশ : ট্রিবিউট টু বেগম রোকেয়া, ডেভেলপিং সেকেন্ডারি এডুকেশন ইন ওয়েস্ট পাকিস্তান। তাঁদের ৪০ বছরের যৌথ গবেষণার ফসল ইংরেজিতে রচিত ৭৭৬ পৃষ্ঠার গ্রন্থ বেঙ্গলি ল্যাঙ্গুয়েজ মুভমেন্ট অ্যান্ড ক্রিয়েশন অব বাংলাদেশ। বিশেষ করে, এই গ্রন্থটি ভাষা আন্দোলনের ফলাফলস্বরূপ সার্বিক বাংলা ভাষার প্রয়োজনীয়তা কেন্দ্রিক একটি আকর গ্রন্থ হিসেবে সমাদৃত হয়ে আছে। এই মহীয়সী নারী ২০১৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রে মৃত্যুবরণ করেন।


তথ্যসূত্র
১. কন্যা জায়া জননী, সরকার আবুল কালাম ও
২. আলোর অভিমুখে : প্রিয়বালা গুপ্তার জীবন ও সময়, রঞ্জন গুপ্ত

কালী নারায়ণ গুপ্ত ও ভাটপাড়ার জমিদার বাড়ির গল্প

0

নরসিংদীর ভাটপাড়া গুপ্ত জমিদার বাড়ি শুধু সাহিত্য-সংস্কৃতি, ইতিহাস-ঐতিহ্য ও কৃতী মানুষের পীঠভূমি নয়, তারা সমাজ সংস্কার, সঙ্গীত, চলচ্চিত্র, ব্রাহ্মধর্মকে টেনে নিয়েছিলেন ভারতবর্ষব্যাপী। এই জমিদার বাড়ির জিন থেকে জন্ম নেয়া বিশ্ববিখ্যাত চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায় তো নিজের ঘরে অস্কার তুলে এনেছিলেন। তাঁর মামা অর্থাৎ স্যার কে জি গুপ্ত’র ভাগ্নে সঙ্গীতজ্ঞ অতুলপ্রসাদ সেন তো অতুলপ্রসাদী সঙ্গীত ঘরানার জন্মদাতা। তেমনি পূর্ববঙ্গের প্রথম আইসিএস (ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিস) অফিসার স্যার কৃষ্ণ গোবিন্দ গুপ্ত’র মামা ভাই গিরিশচন্দ্র সেন শুধু কোরানের প্রথম বঙ্গানুবাদকারীই নন, বহু মুসলিম মনিষীর জীবনীকারও। মামা-ভাগ্নের এমন কীর্তি এদেশে সত্যিই বিরল, যা নরসিংদী জেলাকে গর্বিত করেছে। নরসিংদী তথা মহেশ্বরদী পরগণার মাটি সত্যিই উর্বর।

শিক্ষা-দীক্ষা, সাহিত্য-সংস্কৃতি, সমাজ সংস্কার আর আভিজাত্যের দিক দিয়ে বাংলাদেশে যে-ক’টি জমিদার বংশ খ্যাতির চরম শিখরে পৌঁছুতে পেরেছে, তাদের মধ্যে নরসিংদী জেলার ভাটপাড়া গুপ্ত জমিদার বংশটি অন্যতম। উক্ত বংশের প্রভাবশালী, জাঁদরেল ও প্রজাবৎসল জমিদার মহিন্দ্র নারায়ণ গুপ্তের নাম-ডাক ও সাফল্যের খ্যাতি চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছিলো। ভাটপাড়া এলাকা ছাড়াও গাজীপুর জেলার শ্রীপুর থানাধীন কাওরাইদ এবং ময়মনসিংহের ভাটি অঞ্চলে তাঁর বিশাল জমিদারি ছিলো। কিন্তু একটি ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন চরম ব্যর্থ ও অসুখী। ঘরে অর্থ-কড়ি, বিত্ত-বৈভবের চাকচিক্য বিরাজ করলেও বংশ রক্ষার জন্যে ছিলো না কোনো ছেলে সন্তান। সন্তান হারা মনে এক অসহনীয় যন্ত্রণা নিয়ে সময় কাটাতে থাকেন জমিদার মহিন্দ্র নারায়ণ গুপ্ত। অবশেষে বংশ রক্ষার জন্যে তিনি দত্তক গ্রহণ করতে সম্মত হন।

কালী নারায়ণ সেন নামে এক বালককে দত্তক নিয়ে লালন-পালন শুরু করেন। কালী নারায়ণ সেন সম্পর্কে জানা যায়, তিনি তৎকালীন রামপুরা থানা বর্তমানে মনোহরদী থানার ভুলা ইউনিয়নস্থ আকানগর গ্রামে ১৮৩০ খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম সুধারাম সেন। মাতা যশোদা দেবী। তাদের আর্থিক অবস্থা তেমন ভালো ছিলো না। এ-কারণে কালী নারায়ণ আকানগর গ্রাম থেকে পোষ্যপুত্ররূপে ভাটপাড়া জমিদার বাড়িতে গৃহীত হন। একই সাথে দীন কুটির থেকে একেবারে রাজ দরবারে পদার্পণে তাঁর ভাগ্যের সবগুলো দরোজা খুলে যায়। সেই সাথে পারিবারিক পদবী ‘সেন’ থেকে ‘গুপ্ত’-তে পরিণত হয়। পরবর্তী জীবনে এই কালী নারায়ণ গুপ্তই ভারতবর্ষের বরেণ্য ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়েছিলেন।

ইতিহাসে দেখা যায়, দত্তকপুত্ররা পরবর্তীতে যশ-খ্যাতি, অর্থ-সাফল্য অর্জন করেন। দত্তকপুত্র নাটোরের মহারাজ দীনেন্দ্রনাথ রায় তো খ্যাতির চরম শিখরে উঠতে পেরেছিলেন। খ্যাতিমান সত্যজিৎ রায়-সুকুমার রায়ের উদ্ভব হয়েছিলো দত্তকপুত্রের রক্ত থেকেই। কালী নারায়ণ গুপ্তও দত্তকপুত্র হিসেবে ভাটপাড়ার বিশাল জমিদারির হাল ধরে কর্মগুণে অমর হতে পেরেছিলেন। বিদ্যাশিক্ষার ক্ষেত্রে তাঁর বড়ো ধরনের কোনো অর্জন ছিলো না। শৈশবে মাতামহের কাছে বাংলা লেখাপড়া সমাপ্ত করে পরে কিঞ্চিত ফারসি ও সংস্কৃত অধ্যয়ন করেছিলেন। কিন্তু স্বাধীন চিন্তাধারা, বিচার-বুদ্ধি আর ঈশ্বরানুরাগ চিরদিন তাঁকে সম্মুখপানে এগিয়ে নিয়ে গেছে। একাডেমিক শিক্ষার কোনো ডিগ্রি না থাকলেও বিদ্যাশিক্ষার প্রতি আমৃত্যু স্পৃহা থাকার কারণে তিনি এক পর্যায়ে প্রাজ্ঞ-পণ্ডিত হয়ে ওঠেছিলেন। তরুণ বয়সে তিনি শক্তিমন্ত্রের উপাসক ছিলেন। কিন্তু পরবর্তী জীবনে একজন শুদ্ধ কৃষ্ণভক্ত হিসেবে খ্যাতিমান হন। ঢাকা এবং ময়মনসিংহ অঞ্চলে তাঁর জমিদারি থাকায় তিনি ব্রাহ্মমণ্ডলীর সংস্পর্শে আসেন। তবে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে ব্রাহ্ম ধর্মে দীক্ষিত হন ১৮৬৯ খ্রিস্টাব্দের দিকে। তিনি পুত্র-ভৃত্যসহ ব্রাহ্মসমাজে যোগদান করে তৎসময়ে রীতিমতো আলোড়ন তুলেছিলেন। তাঁর জমিদারির কেন্দ্রস্থল কাওরাইদের মতো একটি অজপাড়াগাঁয়ে ব্রাহ্ম সমাজের একটি শাখা প্রতিষ্ঠা করে বিশেষ সুনাম অর্জন করেছিলেন। তবে কালী নারায়ণ গুপ্তের সর্বোচ্চ আলোচিত ঘটনা হলো, মুন্সি জালালউদ্দিন মিয়া নামে ঢাকা ব্রাহ্মকুলের একজন মুসলমান ছাত্রকে তিনি প্রকাশ্যে ব্রাহ্ম সমাজভুক্ত করার ব্যবস্থা করেন। শুধু তা-ই নয়, এক বিবাহভোজ অনুষ্ঠানে সপুত্র উক্ত যুবক জালালউদ্দিনের সঙ্গে এক থালায় ভোজন করে প্রমাণ করেন, উদারতার কাছে কোনো বর্ণ-ধর্ম-জাত-পাতের প্রশ্রয় নেই। এই ঘটনা সমস্ত ভারতবর্ষের জ্ঞানী-সুধী সমাজে প্রশংসিত হলেও একযোগে হিন্দু-মুসলিম সমাজে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে।

হিন্দুরা ‘হিন্দু হিতৈষিণী’ পত্রিকায় এর প্রবল বিরোধিতা করতে লাগলেন। মুসলিম সম্প্রদায় তাঁকে মেরে ফেলার হুমকি পর্যন্ত দিয়েছিলো। এভাবে অনেক সামাজিক-ধর্মীয় লাঞ্চনা ভোগ করেও তিনি দমে যাননি। ব্রাহ্ম সমাজের অগ্রগতি ব্যাহত হলো না। বরং জমিদারি, ব্রাহ্ম সমাজ, সমাজ সংস্কার, শিক্ষা, বিধবা বিবাহ, সতীদাহ প্রথা রোধে কাজের পাশাপাশি ভাবসঙ্গীত, ভক্তিসঙ্গীত রচনা, সুর দেয়া এবং গেয়ে তিনি চারিদিকে হৈচৈ ফেলে দেন। বিমল ঈশ্বর ভক্তি ও সরল হৃদয়ের পরিচয় পাওয়া যায় তাঁর সঙ্গীতে। তিনি ভক্তি রসাত্মক সঙ্গীতসমূহ, ভাবসঙ্গীত ও সাধনালব্ধ তত্ত্ববিষয়ক ‘ভাবকথা’ রচনা করেছেন। ভক্তি ও ভাবসঙ্গীত রচনায় তাঁর এই স্বাভাবিক ক্ষমতা বহুল পরিমাণে দৌহিত্র (মেয়ের ঘরের নাতি) ব্যারিস্টার অতুলপ্রসাদ সেনের মধ্যে সত্যায়িত হয়েছে। কালী নারায়ণ গুপ্ত সম্পর্কে লোকসাহিত্যিক, প্রত্ন বিশারদ ও ‘নরসিংদীর কবি-সাহিত্যিক’ গ্রন্থের লেখক মুহাম্মদ হাবিবুল্লা পাঠান বলেন, “তিনি শিবানন্দ সেনের বংশধর ছিলেন।” তৎকৃত গ্রন্থ ‘আশালতা’। ‘আশালতা’ গ্রন্থ সম্পর্কে কোনো খোঁজ-খবর জানা যায়নি। তবে কালী নারায়ণ গুপ্তের জীবনীগ্রন্থ ‘ভক্ত কালীনারায়ণ গুপ্তের জীবন-বৃত্তান্ত’ ১৩৩১ বঙ্গাব্দে কলকাতা থেকে প্রকাশিত হয়েছিলো। গ্রন্থটি লিখেছিলেন ব্রাহ্মপণ্ডিত বঙ্কুবিহারী কর। ১৯০৩ খ্রিস্টাব্দে এই মহর্ষির মৃত্যু হয়।

ভাটপাড়ার জমিদার বাড়ি সম্পর্কে জানা যায়, একই সাথে তাঁদের ময়মনসিংহ ভাটি অঞ্চল, কাওরাইদ, ভাটপাড়া, ঢাকার লক্ষ্মীবাজার ও কলকাতার বালিগঞ্জের নিজস্ব বাড়ি ও প্রাসাদে বসবাস ছিলো। এ-প্রসঙ্গে বিখ্যাত স্মৃতিচারণামূলক গ্রন্থে শ্রীমতী মনোদা দেবী লিখেছেন, “স্যার কে. জি. গুপ্তের কন্যা হেমকুসুম (অতুলপ্রসাদ সেনের স্ত্রী) আমার ক্লাশফ্রেন্ড ছিলো কিছুদিন। ঢাকাতে কালীনারায়ণ বাবুর নিজের মস্ত বড় বাড়ী ছিল। বহুদিন সে বাড়ীতে আমরা ছোটর দল যাইয়া খেলাধুলা করিতাম। কালীনারায়ণ বাবু আমাদের লইয়া কোন খেলায় মত্য হইয়া যাইতেন।”

কালী নারায়ণ গুপ্তের জীবনাচরণ ও চরিত্র সম্পর্কে মনোদা দেবী তাঁর গ্রন্থে আরো উল্লেখ করেন, “কালীনারায়ণ রায় অতি সৎ ও সাধু প্রকৃতির লোক ছিলেন। মস্ত জমিদার হইলেও তিনি অতি সহজ-সরলভাবে জীবনযাপন করিতেন। বিলাসিতার ধার ধারিতেন না। কালী নারায়ণ বাবুর দৌহিত্র অতুলপ্রসাদ সেন ঢাকাতেই পড়াশুনা করতেন এবং তার এক খুড়তুত ভাই সত্যপ্রসাদ সেনও কালীনারায়ণ বাবুর বাসায় থাকিয়া পড়াশুনা করিত। তাহারা মাঝে মাঝে আমাদের ছোট দলের মধ্যে খেলায় হামলা দিতে চেষ্টা করিত, কিন্তু কালীনারায়ণ বাবু সেটাকে কিছুতেই বরদাস্ত করিতেন না, কারণ আমরা সকলেই ছোট ছোট মানুষ আর উনারা ১৪/১৫ বৎসরের ছেলে। উহাদের সঙ্গে আমরা কিছুতেই পারিয়া উঠিব না।”

কালী নারায়ণ গুপ্তের সৎ ও সাদাসিধে জীবনের একটি দৃষ্টান্ত হলো, তাঁর কন্যা বিমলা গুপ্তের সাথে বিক্রমপুরের তেলিয় বাগস্থ দুর্গামোহন দাশগুপ্তের জ্যেষ্ঠ পুত্র ব্যারিস্টার সত্যরঞ্জন দাশগুপ্তের বিয়ে হয়েছিলো। কোট-প্যান্ট পরিহিত বিলাত-ফেরত ব্যারিস্টার বর সাজানো ল্যান্ড গাড়িতে চড়ে বিবাহ সভায় হাজির হন। সবাই সতৃষ্ণ দৃষ্টিতে বিলাত-ফেরত ব্যারিস্টার বরকে দেখতে লাগলেন। কারণ তৎসময়ে বিলাত-ফেরত ব্যারিস্টার ছেলে বর হিসেবে পাওয়া দুঃসাধ্য বিষয় ছিলো। হঠাৎ দেখা গেলো, জমিদার কালী নারায়ণ গুপ্ত ড্রয়িংরুম থেকে একটি গরদের ধুতি ও একটি গরদের কোট নিয়ে বিবাহ সভায় ঢুকে হাত বাড়িয়ে এসব কাপড় ভাবী জামাতার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, “সাহেবি পোশাক ত্যাগ করে বাঙালি পোশাক পরে মানুষ হও।” এ-দৃশ্য দেখে আগত অতিথিরা আশ্চর্য হয়ে গেলেন। ছেলের বাবা দুর্গামোহন দাশগুপ্তও তা দেখে ছেলের দিকে তাকিয়ে রইলেন। সবাইকে অবাক করে ব্যারিস্টার বর সত্যরঞ্জন দাশগুপ্ত স্মিতহাস্যে তাঁর ভাবী শ্বশুরের হাত থেকে কাপড়গুলো নিয়ে সভার মধ্যেই পরিধান করলেন। এরপর ব্রাহ্ম ধর্মমতে তাদের বিবাহ হয়। ভাবী জামাই সত্যরঞ্জন কোনো আপত্তি ছাড়াই খুশি মনে ভাবী শ্বশুরের দেয়া দেশীয় গরদের পোশাক পড়ে বিবাহ সভায় বসেছিলেন। এতে কালী নারায়ণ গুপ্ত অত্যন্ত প্রীত হয়েছিলেন।

কালী নারায়ণ গুপ্তের স্ত্রীর নাম অন্নদা সুন্দরী দেবী। সন্তান-সন্ততি, বিষয়-সম্পত্তি আর যশ-খ্যাতিতে এই পরিবারটি ছিলো বাঙালিদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বিশেষ করে, কালী নারায়ণ গুপ্ত ও অন্নদা সুন্দরী দেবীর কোল জুড়ে এসেছে ষোলোজন সন্তান। এর মধ্যে ছয়জন শৈশবেই মৃত্যুবরণ করে। জীবিতদের মধ্যে জগদ্বিখ্যাত বাঙালি স্যার কে জি গুপ্ত ছিলেন বড়ো সন্তান। তাঁর আগে একজন সন্তান শৈশবে মারা গিয়েছিলো। স্যার কে জি গুপ্তের স্ত্রীর নাম প্রসন্নতারা গুপ্তা। তিনি তৎকালীন রূপগঞ্জ থানাধীন দুপতারা জমিদার বাড়ির মেয়ে। তিনি খুব মেধাবী ছিলেন। ১৮৭০ খ্রিস্টাব্দে শ্বশুর কালী নারায়ণ গুপ্তের প্রতিষ্ঠিত ঢাকার ‘অন্তপুর স্ত্রী শিক্ষা সভা’র মেধাবী ছাত্রী হিসেবে স্বামী স্যার কে জি গুপ্তের মুখোজ্জ্বল করতে পেরেছিলেন। ১৮৮৬ খ্রিস্টাব্দে কলকাতার অভিজাত ও সুশিক্ষিত সম্প্রদায়ের মেয়েরা ‘সখী সমিতি’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করে। এর প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন স্বর্ণকুমারী দেবী। তাঁর অন্যতম সহযোগী ছিলেন কে জি গুপ্তের স্ত্রী প্রসন্নতারা গুপ্তা। উল্লেখ্য, উক্ত সমিতিতে একমাত্র মুসলিম সদস্য ছিলেন লাকসামের জমিদার নবাব ফয়জুন্নেসা চৌধুরাণী। উক্ত সমিতির মাধ্যমে প্রসন্নতারা গুপ্তা স্ত্রী শিক্ষা, বিধবা বিবাহের প্রচলন, সহমরণ প্রথা রোধ এবং মেয়েদের স্বাবলম্বী করার জন্যে অনেক কাজ করেছেন। স্যার কে জি গুপ্ত ও প্রসন্নতারা গুপ্তার সংসারে সাফল্যের কোনো অন্ত ছিলো না। স্যার কে জি গুপ্তের পর কালী নারায়ণ গুপ্তের ঔরসে যে-সন্তান জন্ম নিয়েছিলো, তারও মৃত্যু হয়েছিলো শৈশবে। এভাবে দশম, দ্বাদশ, চতুর্দশ ও পঞ্চদশ সন্তানও শৈশবে মারা যায়। জীবিতদের মধ্যে দ্বিতীয় সন্তান ছিলেন প্যারীমোহন গুপ্ত। তিনি ছিলেন ভারতের খ্যাতনামা সিভিল মেডিক্যাল অফিসার। তাঁর স্ত্রীর নাম সরলা গুপ্তা। তৃতীয় ছেলে গঙ্গাগোবিন্দ গুপ্ত ওরফে পানি বাবু ছিলেন বিচিত্র প্রতিভার অধিকারী। তিনি ছিলেন কালী নারায়ণ গুপ্তের মতো সাদাসিধে সদানন্দ পুরুষ। বিলাসিতার কোনো বালাই ছিলো না তাঁর মধ্যে। ব্রাহ্ম ধর্মের একনিষ্ঠ ভক্ত ছিলেন। তাছাড়া ছিলেন ফুর্তিবাজ লোক। তিনি ছিলেন একজন উঁচুদরের চিত্রকর। ‘সীতার বনবাস’, ‘প্রহ্লাদ চরিত্র’ ইত্যাদি নাটক করার জন্যে তিনি বহু চেষ্টা ও অর্থ ব্যয় করে একটি বাড়ি ভাড়া করেন। নাটক মঞ্চায়নের জন্যে স্টেজও করেন সেই বাড়িতে। নিজ হাতেই বহু দৃশ্য নিপুণভাবে এঁকেছিলেন। সবাই তাঁর আঁকা এসব চিত্র ও দৃশ্য দেখে মুগ্ধ হয়ে প্রশংসা করেছিলেন। তৎকালীন সমাজে ঢাকার হোলি খেলার প্রাণপুরুষ ছিলেন গঙ্গাগোবিন্দ গুপ্ত।

বড়ো মেয়ে ছিলেন হেমন্ত শশী গুপ্তা। তিনি ছিলেন বিশিষ্ট সঙ্গীতজ্ঞ ও ব্যারিস্টার অতুলপ্রসাদ সেনের মা। দ্বিতীয় মেয়ের নাম চপলা গুপ্তা। তাঁর বিয়ে হয়েছিলো শশীভূষণ দত্তের সঙ্গে। তৃতীয় মেয়ে সৌদামিনী গুপ্তার ছেলের নাম চারুচন্দ্র। তার মেয়ে বিজয়া হলেন বিশ্ববিখ্যাত চলচ্চিত্রকার ও সাহিত্যিক সত্যজিৎ রায়ের স্ত্রী। অপরদিকে চতুর্থ কন্যা সরলা গুপ্তার মেয়ে সুপ্রভাকে বিয়ে করেন সত্যজিৎ রায়ের পিতা সুকুমার রায়। চতুর্থ পুতির নাম বিনয়চন্দ্র গুপ্ত। তিনি চন্দ্রপ্রভাকে বিয়ে করেছিলেন। সর্বকনিষ্ঠ কন্যা ছিলেন সুবলা গুপ্তা। প্রাণকৃষ্ণ আচার্যের সাথে তার বিয়ে হয়েছিলো। তারা স্ব স্ব ক্ষেত্রে সফল ও মহীয়ান ছিলেন।

স্যার কে জি গুপ্তের ছিলো তিন ছেলে— যতীন্দ্রমোহন গুপ্ত, বীরেন্দ্র চন্দ্র গুপ্ত ও শৈলেন্দ্র চন্দ্র গুপ্ত এবং পাঁচ মেয়ে— লাবণ্য গুপ্তা, হেমকুসুম গুপ্তা, নলিনী গুপ্তা, সরযু গুপ্তা ও ইলা গুপ্তা। প্যারীমোহন গুপ্তের সন্তানেরা হলেন— মলিনা গুপ্তা, অমিয়া গুপ্তা, নলিনী গুপ্ত, সুধাংশুমোহন গুপ্ত, অফলা গুপ্তা, সাহানা গুপ্তা ও লীনা গুপ্তা। গঙ্গাগোবিন্দ গুপ্তের ছেলে-মেয়েদের নাম হলো— সুধা গুপ্তা, হিমাংশুমোহন গুপ্ত, ধীরেন্দ্র চন্দ্র গুপ্ত। সর্বকনিষ্ঠ পুত্র বিনয়চন্দ্র গুপ্তের ছেলে-মেয়ে হলেন— বিমল চন্দ্র গুপ্ত, ক্ষণিকা গুপ্তা ও মণিকা গুপ্তা। এক কথায় বলা যায়, কালী নারায়ণ গুপ্তের বিশাল পরিবারের শাখা-প্রশাখা, আত্মীয়-স্বজন অবিভক্ত ভারতবর্ষব্যাপী সম্মান ও আভিজাত্যের সাথে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়েছেন। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয় নিয়ে এখানে আলোচনা করা হলো।
১৯৮৭ সালের ১৮ এপ্রিল ‘দেশ’ পত্রিকায় সত্যজিৎ রায়ের একটি আলোচিত সাক্ষাতকার প্রকাশিত হয়। উক্ত সাক্ষাতকারে সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায় তাঁর কাছে প্রশ্ন রাখেন, “আপনি এইবার বলুন, আপনি এত কাণ্ড করলেন, এর পেছনে, এই যে সাকসেস, সাকসেস অ্যান্ড সাকসেস, এর রহস্যটা কোথায়, আপনি কি কোনও দিন অ্যানালিসিস করেছেন? কি হলে কি হয়?” জবাবে সত্যজিৎ রায় বলেন, “রহস্যটা কোথায়! এই আমি, তাহলে সেই জিনের প্রশ্নে চলে যেতে হয়। কেননা, আমার মার দিক দিয়েও, মানে যে ফ্যামিলি থেকে আমার মা এসেছিলেন, তাঁরা অসম্ভব সঙ্গীত রসিক ছিলেন। অতুলপ্রসাদ সেন আমার মামা। কালী নারায়ণ গুপ্তের ফ্যামিলি থেকে উদ্ভব হয়েছিলেন এঁরা। তিনি নিজেও আশ্চর্য সুরকার ছিলেন। ব্রাহ্ম ছিলেন। ভাবসঙ্গীত বলে তাঁর একটা বই আছে। এবং আমার মায়ের দিকে প্রত্যেকে গাইতে পারে। এবং আমি ছেলেবেলা থেকে সেই গানের মধ্যে মানুষ হয়েছি। আমার ঠাকুরদাদার মধ্যেও গান ছিল। ঠাকুরদাদা নিজে বেহালা বাজাতেন, পাখোয়াজ বাজাতেন। বাঁশী বাজাতেন, সেতার বাজাতেন। তিনি সঙ্গীত সম্বন্ধে প্রবন্ধ লিখেছেন। গান রচনা করেছেন। সেই উত্তরাধিকার আমি হয় তো পেয়েছি।” সত্যজিৎ রায় জিনের প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে কালী নারায়ণ গুপ্তের কথা বলেছেন, সেই গুপ্তের পুত্র হলেন স্যার কে জি গুপ্ত। পুরো নাম স্যার কৃষ্ণ গোবিন্দ গুপ্ত। তিনি অতুলপ্রসাদ সেনের আপন মামা। কে জি গুপ্তের অপর তিন ভাই হলেন প্যারী গুপ্ত, বিনয় গুপ্ত ও গঙ্গাগোবিন্দ গুপ্ত। ছয় বোনের মধ্যে হেমন্ত শশী গুপ্তা ছিলেন সবচেয়ে বড়ো। আর এই হেমন্ত শশীর পুত্রই হলেন অতুলপ্রসাদ সেন। অপর তিন সন্তান ছিলো মেয়ে— হিরণ, কিরণ ও প্রভা।

হেমন্ত শশী গুপ্তা সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো, তিনি তৎসময়ে পুনর্বিবাহ করে ভারতবর্ষজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন তোলেন। ১৮৯০ সালে তিনি কলকাতায় দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জনের জ্যেষ্ঠ পুত্র দুর্গামোহন দাশকে বিয়ে করেন। এটাই ব্রাহ্ম সমাজে প্রথম বিধবা বিবাহের ঘটনা। ১৮৮৪ সালে অতুলপ্রসাদ সেনের বাবা রামপ্রসাদ সেন মাত্র সাইত্রিশ বছর বয়স্কা হেমন্ত শশীকে রেখে মারা যান। স্ত্রীর বয়সের কথা চিন্তা করে মৃত্যুর পূর্বে রামপ্রসাদ সেন একটি ঔদার্যপূর্ণ মন্তব্য করেন, “আমার অবর্তমানে তুমি পুনরায় বিবাহ করো।” কিন্তু অতুলপ্রসাদ সেন এই ঘটনায় প্রচণ্ড ব্যথিত হন। কারণ আজীবন তিনি মাকেই সবচে’ বেশি ভালবেসে গেছেন। মায়ের প্রতি এই সকরুণ অভিমান অতুলপ্রসাদ কোনোকালেই মুছে ফেলতে পারেননি। মার কারণে মায়ের পুনর্বিবাহের পর সৎ পিতার উদার আতিথেয়তা উপেক্ষা করে তিনি মেজো মামা প্যারী গুপ্তের কাছে আশ্রয় নেন। মামা তাঁকে ভর্তি করে দেন কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজে। মায়ের সঙ্গে তাঁর স্পর্শকাতর মনের যে গোপন সংঘর্ষ চলছিলো এবং ক্ষত-বিক্ষত হচ্ছিলো নিঃসঙ্গ হৃদয়, তা থেকে বাঁচতেই যেন ধনবান ও শিক্ষিত মাতুলরা তাঁকে ব্যারিস্টারি পড়াতে বিলাত পাঠান। অতুলপ্রসাদ বিলাতে সহপাঠী হিসেবে পান ভারতের নবযুগ নির্মাতা চিত্তরঞ্জন দাশ, শ্রী অরবিন্দ, সরোজিনী নাইডু, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, মনোমোহন ঘোষ প্রমুখকে। এর মধ্যে তাঁর নিঃসঙ্গ জীবনে আরেকটি আলোচিত ঘটনা ঘটে। বড়ো মামা স্যার কে জি গুপ্ত বিশেষ কাজে বিলাতে আসতেন। মামাতো বোন হেমকুসুমের সংস্পর্শে এসে ভিন্ন এক জীবনের সন্ধান পান। অতুলপ্রসাদের আহত হৃদয়ের অজান্তেই দুজন দুজনকে সহমর্মী মনের আবেগে শান্তি এনে দিতে ভালোবেসে ফেলে। তখন এই অসম সম্পর্ক কোনো সমাজেই গ্রহণযোগ্য ছিলো না। কিন্তু তৎকালীন অভিজাত পরিবারে সচ্ছল পরিবেশে বড়ো হয়ে ওঠা হেমকুসুম খুবই একরোখা ও জেদী ছিলেন। যার কারণে তিনি দুই পরিবারের কাছ থেকে বিবাহের অনুমতি আদায় করেছিলেন। কিন্তু সেকালে ভাই-বোনের বিচিত্র বিবাহ আইনে সায় ছিলো না বলে তাদেরকে স্কটল্যান্ডের গ্রেটনাগ্রিনে যেতে হয়। সেখানে এ-ধরনের বিবাহ রীতি বৈধ ছিলো। সময়টা ১৯০০ খ্রিস্টাব্দ। তাদের এই বিয়ে কারো কাছেই আশীর্বাদ ধন্য হয়নি। অতুলপ্রসাদ সেনের মা হেমন্ত শশী কোনোকালেই ভাইঝি হেমকুসুমকে পুত্রবধূ হিসেবে মেনে নেননি। অপরদিকে হেমকুসুমও সহ্য করতে পারেননি হেমন্ত শশীকে। এই জটিল পরিস্থিতিতে অতুলপ্রসাদ অভিমানে ক্ষুব্ধ হয়ে পড়েছিলেন। এসব তাঁর লেখা গানগুলোতেই ফুটে ওঠে। তাঁর লেখা একটি অসামান্য গান হলো :
“ওগো নিঠুর দরদী, একি খেলছ অনুক্ষণ!
তোমার কাঁটায় ভরা বন তোমার প্রেমে ভরা মন।
মিছে দাও কাঁটার ব্যথা, সহিতে না পারতা আমার আঁখি জল, তোমায় করে গো চঞ্চল—”

গুপ্ত জমিদার বংশের সকলের মধ্যে বিশিষ্ট স্থান অধিকার করে আছেন কে জি গুপ্ত। ধনাঢ্য জমিদার কালী নারায়ণ গুপ্তের পুত্র কিংবা প্রখ্যাত সঙ্গীত-ব্যক্তিত্ব ব্যারিস্টার অতুলপ্রসাদ সেনের মামা পরিচয় তাঁকে যতোটুকু না গৌরবান্বিত করেছে, তারচে’ অনেক বেশি মহৎ ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছিলো তাঁর প্রাজ্ঞ কর্মদক্ষতা। যা পুরো বাঙালি জাতি যুগ যুগ ধরে গর্বে ধারণ করে যাচ্ছে। শ্রেষ্ঠ বাঙালি হিসেবে কে জি গুপ্তের নাম স্বয়ং সত্যজিৎ রায় পর্যন্ত তাঁর সাক্ষাতকারে উচ্চারণ করতেন। এর অন্যতম কারণ হলো, তিনি ছিলেন ব্রিটিশ ভারতে ভাইসরয়ের ইন্ডিয়ান কাউন্সিলের প্রথম ভারতীয় সদস্য। তিনি আইসিএস (INDIAN CIVIL SERVICE) অফিসার হিসেবে এই সৌভাগ্য অর্জন করেছিলেন। তাঁর সাথে একই গৌরবের অধিকারী ছিলেন সৈয়দ হোসেইন বিলগ্রামী। কে জি গুপ্তই সর্বভারতীয় একমাত্র ব্যক্তি ছিলেন, যিনি ইংল্যান্ডের হাউজ অব কমন্সের সম্মানিত সদস্য নির্বাচিত হবার মতো গৌরব অর্জন করেছিলেন। ব্রিটিশ সরকার তাঁকে দুর্লভ সম্মানসূচক উপাধি কেসিএসআই (KNIGHT COMMANDER OF THE STARS OF INDIA)-তে ভূষিত করে। এই উপাধিটিও তাঁর আগে আর কোনো ভারতীয় অর্জন করেননি। সে-সময় ব্রিটিশ প্রশাসন ক্ষণজন্মা এই ভারতীয় বাঙালি রত্নকে ‘স্যার’ উপাধিতে ভূষিত করে।

অবিভক্ত ভারতের কৃতী পুরুষ স্যার কে জি গুপ্ত ২৮ ফেব্রুয়ারি ১৮৫১ খ্রিস্টাব্দে নরসিংদীর ভাটপাড়া গ্রামে গুপ্ত জমিদার বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা কালী নারায়ণ গুপ্ত শুধু জমিদার হিসেবে পরিচিত ছিলেন না, সমাজ সংস্কারক, প্রগতিশীল ধর্ম ব্রাহ্ম মতবাদের প্রচারক এবং প্রখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞ হিসেবে তাঁর খ্যাতি ছিলো ভারতবর্ষব্যাপী। কে জি গুপ্তের পড়াশোনার হাতেখড়ি হয় গ্রাম্য টোলে। কিন্তু গ্রাম্য বিরূপ পরিবেশের কথা চিন্তা করে কে জি গুপ্তকে পাঠানো হয় বিদ্যা অর্জনের জন্যে। প্রথমেই তাঁকে ঢাকার পগোজ স্কুলে ভর্তি করা হয়। পগোজ স্কুল থেকে পরবর্তীতে ট্রান্সফার হয়ে যান ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলে। এন্ট্রান্স পাশ করে উচ্চশিক্ষার জন্যে ইংল্যান্ডে পাড়ি জমান। সেখানকার বিশ্বখ্যাত অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বীয় প্রতিভার প্রমাণ রাখেন।

বাঙালি হয়েও তিনি বিলাতের অনেক প্রতিভাবান ছাত্রকে ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন। সে-সময়ে অবিভক্ত ভারতের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে শুধুমাত্র ইংরেজরাই চাকরি করতো। কে জি গুপ্ত তাঁর প্রতিভা ও যোগ্যতা দিয়ে ব্রিটিশ সরকারের এই প্রথা ভেঙে ভারতের প্রথম আইসিএস অফিসার হিসেবে চাকরিতে যোগ দেন। প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় ইংরেজ ট্যালেন্টদের পরাজিত করেই তিনি অফিসার হিসেবে চাকরি পান। তৎকালীন বাংলাভাষী ভারতীয়দের ব্রিটিশরা বড়জোর গৃহপালিত ভৃত্য হিসেবে বিবেচনা করতো। ঠিক এমন সময় স্যার কে জি গুপ্তের এই অবিস্মরণীয় সাফল্য বাঙালির অবস্থান অনেক উঁচুতে নিয়ে যায়।

স্যার কে জি গুপ্ত একই সাথে ইংল্যান্ড এবং ভারতে আইন ব্যবসা শুরু করেন। তীক্ষন প্রতিভা, মেধা, অভিনব কৌশলের গুণে তিনি আইনজীবী হিসেবে বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেন। বিশেষ করে, ইংল্যান্ডে অবস্থান করে ভারতে উদ্ভূত বিভিন্ন পরিস্থিতির সময় ভারতের পক্ষাবলম্বন করে ভারতের স্বাধীনতার পথকে সহজ করে তোলেন। সেই সাথে তিনি ইংল্যান্ডের মাটিতে একজন কালজয়ী বাঙালি হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করতে সক্ষম হন। স্যার কে জি গুপ্ত অত্যন্ত দেশপ্রেমিক ছিলেন। জীবনের শেষদিকে ইংল্যান্ডে বড়ো বড়ো চাকরির অফার, লাখ পাউন্ড কামানোর সহজ রাস্তা পরিহার করে তিনি স্বদেশে ফিরে আসেন। কলকাতার বালিগঞ্জ ও ঢাকার লক্ষ্মীবাজারে বাড়ি নির্মাণ করে আইন ব্যবসা শুরু করেন। শেষ জীবনটা তিনি কলকাতায় আইন ব্যবসা করে কাটিয়ে দিলেও মাঝে-মধ্যে ঢাকার লক্ষ্মীবাজারের বাড়িতে এসে থাকতেন। পরবর্তীতে লক্ষ্মীবাজারের বাড়ির রাস্তাটি স্যার কে জি গুপ্ত লেন হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়। ১৯২৬ সালের ২৯ মার্চ স্যার কে জি গুপ্ত বালিগঞ্জের নিজ বাসভবনে হইলোক ত্যাগ করেন। তিনি তৎকালীন নারায়ণগঞ্জ জেলার রূপগঞ্জ থানাধীন দুপতারা গ্রামের জমিদার পরিবারের প্রসন্নতারা গুপ্তাকে বিয়ে করেছিলেন। প্রসন্নতারা গুপ্তা তৎকালীন গ্র্যাজুয়েট ছিলেন।

ঢাকা ব্রাহ্ম সমাজের আওতাধীন রাজা রামমোহন রায় লাইব্রেরি গড়ে ওঠে ১৮৭১ সালে। উক্ত লাইব্রেরিটি প্রতিষ্ঠার পেছনে কালী নারায়ণ গুপ্ত ও স্যার কে জি গুপ্তের অবদান ছিলো সবচে’ বেশি। তাঁদের আর্থিক দানেই ঢাকা ব্রাহ্ম সমাজের গেইটের ডানপাশে দোতলা ভবনে রাজা রামমোহন রায় লাইব্রেরিটি গড়ে ওঠেছিলো। একসময় লাইব্রেরিটি ঢাকার অন্যতম লাইব্রেরি হিসেবে খ্যাতি পেয়েছিলো। দেশ-বিদেশের হাজার হাজার মহামূল্যবান গ্রন্থের কারণে রাজা রামমোহন রায় লাইব্রেরিটি পণ্ডিত ও শিক্ষিত মহলে বেশ নাম করেছিলো। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় লাইব্রেরিটি পাক হানাদার বাহিনি কর্তৃক আক্রান্ত হলে অধিকাংশ গ্রন্থ পুড়ে নষ্ট হয়ে যায়। কিন্তু স্বাধীনতা যুদ্ধের ৫৪ বছর পেরিয়ে গেলেও নতুন করে গড়ে তোলা হয়নি। প্রয়োজনীয় গ্রন্থের অভাবে লাইব্রেরিটি মুখ থুবড়ে পড়ার মতো অবস্থার সম্মুখীন। অথচ বর্তমানে ব্রাহ্ম সমাজের সম্পত্তির উপর সুমনা নামের বিশাল ক্লিনিক তুলে এবং দোকান ভাড়া দিয়ে লাখ টাকা আয় করা হচ্ছে। এই বিশাল অর্থের পাহাড় কীসের জন্যে আয় করা হচ্ছে, সেটা কারো বোধগম্য নয়। সবচেয়ে দুঃখজনক ব্যাপার হলো, ঢাকা ব্রাহ্ম সমাজের উপর ভিত্তি করে ইতিহাস বিষয়ক একটি গ্রন্থ আজ দুষ্প্রাপ্য হলেও অল্প কিছু টাকা খরচের অজুহাতে সংস্করণ বের করা হচ্ছে না।

এই ব্যাপারে বেশ কয়েকদিন ঘুরেও ঢাকার সেই ইতিহাস বিষয়ক গ্রন্থটি সম্পর্কে কোনো তথ্য উদ্ধার করা যায়নি। ব্রাহ্ম সমাজের আচার্য প্রাণেশ সমাদ্দার অন্যান্যদের ভয়ে মুখ খুলতে অপারগতা প্রকাশ করেন। স্যার কে জি গুপ্তের একটি অনন্য দৃষ্টান্ত হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কালী নারায়ণ গুপ্ত স্কলারশিপ (কেএনএস) প্রবর্তন। তিনি নিজ অর্থ ব্যয়ে এবং উৎসাহে পিতা কালী নারায়ণ গুপ্তের নামে এই স্কলারশিপ প্রবর্তন করেন। পিতার স্মৃতিকে ধরে রাখার জন্যে কে জি গুপ্তের এই দৃষ্টান্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে আজীবন থেকে যাবে। উক্ত স্কলারশিপের বৈশিষ্ট্য হলো, অধিভুক্ত সকল বিষয়ের অনার্স ও সাবসিডিয়ারি পরীক্ষার সম্মিলিতভাবে যিনি সর্বাধিক নম্বর পাবেন, তিনি এই পুরস্কার পাবেন। ইদানিং কালী নারায়ণ গুপ্ত স্কলারশিপটির অবস্থা কী, তা আমাদের জানা নেই। স্যার কে জি গুপ্তের আরেকটি দৃষ্টান্তমূলক কাজ হলো, তিনি নরসিংদী জেলার ঐতিহাসিক পাঁচদোনায় বিদ্যালয় গড়ে তোলেন ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে। তাঁর মৃত্যুর সাত বছর আগে গড়ে তোলা বিদ্যালয়টি আজো মাথা উঁচু করে গর্বের সাথে পথ চলছে। নরসিংদী জেলায় যে-ক’টি বিদ্যালয় বিশেষ কৃতিত্ব অর্জন করেছে, তার মধ্যে সাটিরপাড়া কালী কুমার উচ্চ বিদ্যালয় ও স্যার কে জি গুপ্ত উচ্চ বিদ্যালয়ের অবস্থান শীর্ষ পর্যায়ে। পাঁচদোনা ছিলো স্যার কে জি গুপ্তের মামার বাড়ি। তাঁর মামা ভাই গিরিশচন্দ্র সেন ছিলেন একজন জগতবিখ্যাত প্রতিভা। তিনি পবিত্র কোরআন শরীফের সর্বপ্রথম বঙ্গানুবাদ (তরজমাসহ) করে সকল বাঙালি মুসলমানদের কাছে অমর হয়ে আছেন। আলীবর্দী খাঁ’র দেওয়ান রাজা রামমোহন রায়ের বংশধর হলেন গিরিশচন্দ্র সেন। এই বংশেই বিয়ে করেন কালী নারায়ণ গুপ্ত। মায়ের ‘জিন’ই স্যার কে জি গুপ্তের সব প্রতিভার উৎস। মামা গিরিশচন্দ্র সেনকে স্যার কে জি অত্যন্ত শ্রদ্ধা করতেন। গিরিশচন্দ্র সেন যখন মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়েন, তখন স্যার কে জি গুপ্ত মামাকে তাঁর কলকাতাস্থ বালিগঞ্জের বাসায় এনে চিকিৎসা করান। কোনোভাবেই তাঁর শরীর সুস্থ হয়ে ওঠছিলো না। গিরিশচন্দ্র সেন বুঝে ফেলেন, তাঁর আয়ু ফুরিয়ে গেছে। এ-কারণে মৃত্যুর পূর্বে তিনি জন্মভূমিতে ফিরে আসেন। ১৫ আগস্ট ১৯১০, সকাল দশটায় ৭৬ বছর বয়সে গিরিশচন্দ্র সেন ইহলোক ত্যাগ করেন। তাঁর মরদেহ নিজ গ্রাম পাঁচদোনায় এনে শেষকৃত্য সম্পন্ন করা হয়। মামা গিরিশচন্দ্রের মৃত্যুর পর স্যার কে জি গুপ্ত ভাটপাড়ার সাথে যোগাযোগ বৃদ্ধি করেন। এলাকার শিক্ষা এবং সামাজিক অবক্ষয়ের কথা চিন্তা করে পাঁচদোনায় একটি উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। এলাকাবাসী বিদ্যালয়টি তার নামে নামকরণ করেন।


আপেল মাহমুদ
সাংবাদিক, গবেষক ও দুষ্প্রাপ্য গ্রন্থ সংগ্রাহক

মোমিন মোটর কোম্পানি : নরসিংদীর প্রথম বাস সার্ভিস

0

প্রাচীন মানুষের আলোচনায় এখনো মোমিন কোম্পানির বাস সার্ভিস নিয়ে নানা স্মৃতিচারণ শোনা যায়। চল্লিশ দশকের শুরুতে তারা ঢাকায় প্রথম সিটি সার্ভিস চালু করে ইতিহাসের অংশ হয়ে আছেন। তারপর সেই বাস সার্ভিস ঢাকা ছাড়িয়ে নারায়ণগঞ্জ, কেরানীগঞ্জ, রুহিতপুর, সাভার, ধামরাই, কালিয়াকৈর ও বাবুরহাট-নরসিংদী পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিলো। মফস্বলের কাঁচা সরু রাস্তা দিয়ে যেখানে স্টেট বাস (সরকারি বাস) চালানোর সাহস করা হয়নি, সেখানে পুরান ঢাকার ধনাঢ্য ব্যবসায়ী আব্দুল আজিজ সেই সাহস করে সফল হয়েছিলেন। বাস চলাচলের জন্যে তিনি নিজ খরচায় রাস্তাঘাট প্রশস্ত ও মেরামত করার মতো আর্থিক ঝুঁকি নিয়েছিলেন। তাঁর দেখানো পথেই পরবর্তীতে স্টেট বাস চালু হয়েছিলো। তখন মোমিন কোম্পানির বাস সার্ভিসের সাথে শুরু হয় স্টেট বাসের প্রতিযোগিতা। সেই প্রতিযোগিতার গল্প প্রবীণ মানুষের স্মৃতিচারণে পাওয়া যায়।

ঢাকার ইতিহাসে যোগাযোগ ব্যবস্থার অনেক প্রাচীন উপাদান পাওয়া গেলেও বাস সার্ভিসের বয়স খুব একটা বেশি নয়। ব্রিটিশ শাসনামলে ব্যক্তিগত ও সরকারি মোটরকারের আবির্ভাব ঘটলেও গণপরিবহনের সূচনা হয় অনেক পরে। প্রথমদিকে গণপরিবহন বা বাস সার্ভিস সবকারিভাবে হলেও পরবর্তীতে কিছু ধনাঢ্য ব্যবসায়ীর প্রচেষ্টায় বেসরকারি বাস চলাচল শুরু হয়। এক্ষেত্রে প্রথম নাম আসে মোমিন মোটর কোম্পানির। পুরান ঢাকার লালবাগ এলাকার এক পয়সাঅলা পরিবার প্রথম বেসরকারি বাস কোম্পানি গড়ে তোলে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরপর উক্ত কোম্পানির বাস চলাচল শুরু হয়।

মোমিন কোম্পানির বাস চলাচল কীভাবে শুরু হয়েছিলো, সেটা অনুসন্ধান করে জানা যায়, চল্লিশের দশকে পুরান ঢাকার উর্দু রোডের হরনাথ ঘোষ লেনের বাসিন্দা আব্দুল আজিজ ছিলেন সেই কোম্পানির কর্ণধার। তাঁর পিতা আব্দুর রহমান ছিলেন পুরোনো ব্যবসায়ী। উর্দুরোড-চকবাজারের ব্যবসায়ী হিসেবে এই পরিবারের সুনাম ছিলো পুরো ঢাকা জুড়ে। আব্দুল আজিজের আরেক ভাই আব্দুস সাত্তার ছিলেন একজন শিল্পপতি। তিনি ফার্মাদেশ ঔষধ কোম্পানি ও অভিজাত পূর্বাণী হোটেল প্রতিষ্ঠা করে অমর হয়ে আছেন। সেই সময় দুটি প্রতিষ্ঠানই ব্যাপকভাবে পরিচিত ছিলো। হোটল পূর্বাণীর অবস্থান ১ নম্বর দিলকুশা বাণিজ্যিক এলাকায়।

আব্দুল আজিজ

 

আব্দুস সাত্তার

১৯৬৪ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত আন্তর্জাতিক মানের আবাসিক হোটেলটি তখন থেকে এখন পর্যন্ত অনেক ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে আছে। আব্দুস সাত্তার ছিলেন বঙ্গববন্ধু শেখ মুজিবের ঘনিষ্ঠ সহচর এবং পৃষ্ঠপোষক। পাকিস্তান বিরোধী আন্দোলনে শুধু অংশগ্রহণই নয়, তিনি তাঁর হোটেলে বিনা ভাড়ায় আওয়ামী লীগের অনেক সভা-মিটিং করার সুযোগ দিতেন। অনেক নেতা পাকিস্তানি শাসকদের হুলিয়া নিয়ে কোথাও গা ঢাকা দেয়ার সুযোগ না পেলেও আব্দুস সাত্তার তাঁর পূর্বাণীতে নিরাপদ আশ্রয় দিয়েছিলেন। স্বাধীনতার পরও হোটেলটি বঙ্গবন্ধু ও তাঁর সহচরদের জন্যে উন্মুক্ত ছিলো। গবেষকদের মতে, ব্যবসায়ী আব্দুর রহমানের পরিবারটি একান্নবর্তী হওয়ায় মোমিন কোম্পানি প্রতিষ্ঠার সময় তাতে পরিবারের সবাই সংশ্লিষ্ট ছিলেন। এক ভাই দেখতেন ঔষধ ও হোটেল ব্যবসা। আরেক ভাই দেখতেন পরিবহন ব্যবসা। আব্দুর রহমানের মৃত্যুর পর দুই ভাইয়ের মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্প-কারখানা ভাগ-বাটোয়ারা হয়ে যায়।

আব্দুল আজিজ পরিবহনের জন্যে বাস সংগ্রহ করেন দুইভাবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইংল্যান্ডে নির্মিত অনেক জিপ ও ট্রাক পরিত্যক্ত হয়ে গ্যারেজে পড়ে থাকে। এক পর্যায়ে সেসব জিপ ও ট্রাক কম দামে অকশনে বিক্রি করে দেয়া হয়। সেসব কিনে ঢাকায় বডি বানানো হয়। স্থানীয়ভাবে বডি তৈরি হয় বিধায় তা দেখতে তেমন সুশ্রী ছিলো না। আবার সরাসরি এলসি করে ইংল্যান্ড থেকে ইঞ্জিন আমদানিও হতো। তখন বাস বডিসহ আমদানি হতো না বলে এগুলো স্থানীয়ভাবে নির্মাণ করা হতো। ফলে ইঞ্জিনগুলো নতুন-পুরাতন হলেও বডিগুলো দেখতে একই রকম ছিলো।

বাস মেরামত এবং গ্যারেজ হিসেবে ব্যবহার করা হতো ঢাকেশ্বরী মন্দির সংলগ্ন বিশাল এলাকা। সেখানে সাইনবোর্ড টাঙানো হয়— ‘মোমিন মোটর কোম্পানি’। লোকজন মুখে মুখে বলতো মোমিন মটর কোম্পানি। কিন্তু ‘মোমিন’ নামটি কীভাবে এলো? মনে করা হতো, আব্দুর রহমানের কোনো ছেলে কিংবা বংশধরের নাম অনুসারে নামকরণ করা হয়েছিলো। কিন্তু বাস্তবে তা নয়। ‘মোমিন’ একট আরবি শব্দ, যার অর্থ ঈমানদার বা বিশ্বাসী। এই ধর্মীয় আবেগ থেকেই কোম্পানির এই নাম রাখেন। এই তথ্য আব্দুর রহমানের ছেলে আব্দুস সাত্তার জীবিত থাকা অবস্থায়ই বলেছেন। তাঁদের প্রথম বাস সার্ভিস শুরু হয়েছিলো সদরঘাট থেকে রামপুরা পর্যন্ত। তখন রামপুরায় বেগুনবাড়ী খালের উপর কোনো ব্রিজ ছিলো না। প্রাচীন পাণ্ডু নদী শুকিয়ে একসময় সেটা খালে পরিণত হয়েছিলো। পরবর্তীতে তেজগাঁওয়ের পূর্বাঞ্চল বেগুনবাড়ীর দিক দিয়ে একটি খাল কেটে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা হয়। এজন্যে পুরোনো খালটাও একই নামে পরিচিত হয়ে ওঠে। পরে রামপুরা ব্রিজ নির্মিত হলে বাস সার্ভিস কুড়িল কাজীবাড়ি পর্যন্ত সম্প্রসারণ করা হয়। মধ্যবর্তী সময়ে গুলিস্তান থেকে নাবিস্কো হয়ে গুলশান রিংরোড দিয়ে কিছু হলার বাস বাড্ডা পর্যন্ত চলাচল করতো।

এরপর সদরঘাট থেকে মোমিন কোম্পানির বাস চকবাজার পর্যন্ত যাতায়াত করতো। তখন সদরঘাট, পাটুয়াটুলী, ইসলামপুর, মিটফোর্ড, মোঘলটুলী, বেগম বাজার ও চকবাজার ছিলো মূল ব্যবসা কেন্দ্র। তাই প্রতিদিন সেই পথে হাজার হাজার ব্যবসায়ী, সাধারণ মানুষ যাতায়াত করতো। তাদের কথা চিন্তা করেই মোমিন কোম্পানি সদরঘাট টু চকবাজার বাস সার্ভিস চালু করে। মুঘল আমলের এই রাস্তাটি ব্রিটিশ আমলে পাকা করা হলে বাস, টমটম, রিকশা ও সাইকেল যোগাযোগ সহজতর হয়। সদরঘাট-চকবাজার রোড থেকে বাস সার্ভিসটি সম্প্রসারণ করে গুলিস্তান টু চকবাজার করা হয়।

সেই সময় ঢাকাবাসীর বিনোদন বলতে ছিলো সিনেমা হলগুলো। ঢাকার লোকজন দল বেঁধে বিভিন্ন হলে সিনেমা দেখতে যেতো। তখন হলগুলোতে ভারতীয় ও পাকিস্তানি সুপারহিট হিন্দি ও উর্দু ছবি চলতো। দিলীপ কুমার, দেবানন্দ, মধুবালা, নার্গিস, নুরজাহান প্রমুখের ছবিগুলো দেখার জন্যে দর্শকদের ভিড় জমে যেতো। পুরান ঢাকার লায়ন, তাজমহল, মানসী, নাগরমহল, আজাদ, রূপমহল, শাবিস্তান প্রভৃতি সিনেমা হলে যেতে দর্শকেরা মোমিন কোম্পানির বাসে চড়তেন। তখন রিকশা, ঘোড়ার টমটম কিংবা গরুর গাড়ি এতোটা সহজলভ্য ছিলো না। তাছাড়া সব যানবাহনে ভাড়াও বেশি ছিলো। যার কারণে এক পয়সা, দুই পয়সা ভাড়া দিয়ে তারা মোমিন কোম্পানির বাসে গাদাগাদি করে চলাফেরা করতেন। তখন ঢাকার মধ্যে সবচেয়ে অভিজাত সিনেমা হল ছিলো ‘গুলিস্তান’। সেখানে লুঙ্গি পরে প্রবেশাধিকার নিষিদ্ধ ছিলো। সবসময় দর্শকদের প্রচণ্ড ভীড় থাকতো। ঢাকার বিভিন্ন এলাকা থেকে দর্শকরা সেই হলে যেতে বাস ব্যবহার করতো।

বাসগুলোর গতি তেমন ছিলো না। তবে গরুর গাড়ি, টমটম কিংবা রিকশার চেয়ে অনেক দ্রুত চলতো বাসগুলো। শহরের নতুন যান হিসেবে বাসের প্রতি ঢাকাবাসীর আলাদা একটা আকর্ষণ গড়ে ওঠেছিলো। তাই অনেকে শখ করেও বাসে যাতায়াত করতেন। ঢাকার বাস জনপ্রিয় হয়ে ওঠার কারণে বুড়িগঙ্গার ওপারে জিঞ্জিরা টু রুহিতপুর মোমিন কোম্পানির বাস চলাচল শুরু করে।

তখন জিঞ্জিরা ছিলো উদীয়মান ব্যবসা কেন্দ্র। রুহিতপুর ছিলো তাঁতশিল্পের জন্যে বিখ্যাত। তাদের কথা চিন্তা করে সেখানে বাস সার্ভিস চালু করা হয়। কেরানীগঞ্জের মানুষ বাস যোগাযোগকে সাদরে গ্রহণ করেন। কিন্তু তখন সেখানকার রাস্তাঘাট খুব একটা ভালো ছিলো না। ব্রিটিশ আমলে নির্মিত রাস্তাগুলো ছিলো জরাজীর্ণ। তাই মোমিন কোম্পানি নিজ খরচে রাস্তাগুলো সংস্কার করে বাস চলাচলের উপযোগী করে তোলে। মোমিন কোম্পানির দেখাদেখি সেখানে আরো কয়েকজন বাস কোম্পানি গড়ে তোলে। আশির দশক পর্যন্ত সেসব পুরোনো বাসগুলো কেরানীগঞ্জের জিঞ্জিরা-রুহিতপুর রোডে চলাচল করতে দেখা গেছে।

ঢাকা-কেরানীগঞ্জের পরিবহন ব্যবসার সাফল্যের হাত ধরে মোমিন কোম্পানি তাদের রুট নরসিংদী পর্যন্ত সম্প্রসারণ করে। নরসিংদী তখন তাঁতশিল্পের কেন্দ্রবিন্দু। বাবুরহাট, মাধবদী, হাসনাবাদ, পুরিন্দা, পাঁচরুখী ও গোপালদী জুড়ে ছিলো অসংখ্য তাঁত ব্যবসায়ী। কাপড় পরিবহনের কথা চিন্তা করে প্রায় ২০ মাইল কাঁচা সড়ক সংস্কার করার উদ্যোগ নেয় মোমিন কোম্পানি। নরসিংদী থেকে তারাব রাস্তাটি ছিলো ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের মলিাকানাধীন। তাই বেসরকারি বাস সার্ভিস চালু করতে গিয়ে কোম্পানিটিকে ডিস্ট্রিক্ট বোর্ড থেকে অনুমতি নিতে হয়। এজন্যে তাদেরকে লিজ মানিও পরিশোধ করতে হয়। ১৯৬২ খ্রিস্টাব্দের দিকে কাঁচা রাস্তায় ইট বিছানোর কাজ শুরু করে মোমিন কোম্পানি।

তখন অনেক সতকর্তার সঙ্গে সরু রাস্তা দিয়ে বাসগুলো চলতো। পরবর্তীতে রাস্তা প্রশস্ত এবং পাকা করা হলেও মোমিন কোম্পানির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সরকারি বাস চলাচল শুরু করে। সরকারি বাসগুলোকে তখন স্টেট বাস বলা হতো। কে বেশি যাত্রী পাবে, তা নিয়ে মোমিন কোম্পানি ও স্টেট বাসের মধ্যে ব্যাপক প্রতিযোগিতা শুরু হয়। তখন এক বাস আরেক বাসকে ওভারটেক করে সামনে যাওয়ার জন্যে সাইড দিতো না। যার ফলে অনেক সময় বাস রাস্তার পাশে ছিটকে পড়তো। ছোটোখাটো দুর্ঘটনা ঘটতো প্রায়ই। সময়ের ব্যবধানে সেই প্রতিযোগিতা অনেক কমে যায়। মোমিন কোম্পানি ও স্টেট বাসের পাশাপাশি আরো কয়েকটি কোম্পানি সেই রুটে বাস সার্ভিস শুরু করে। তারাব-ডেমরায় ফেরি সার্ভিস শুরু হলে নরসিংদী থেকে ঢাকায় সরাসরি যোগাযোগ স্থাপিত হয়।

পুরান ঢাকার একাধিক প্রবীণ বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঢাকার বাস সার্ভিসের শুরুতে মোমিন কোম্পানির দাপট ছিলো মফস্বল এলাকায়। তারা কেরানীগঞ্জ ও নরসিংদী এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে বিশেষ ভূমিকা রাখে। তারা সেখানে বাস সার্ভিসের পাশাপাশি রাস্তাঘাটের উন্নয়ন করেছে। অপরদিকে ঢাকায় পরিবহন সেক্টর নিয়ন্ত্রণ করতেন মাওলা বখত সরদার ও হাবিবুর রহমান খান। তারা ঢাকা-ধামরাই, ঢাকা-নবাবগঞ্জ রুটে পরিবহন সার্ভিস চালু করেন। ঢাকা ভ্যাহাইক্যাল এসোসিয়েশন টাউন সার্ভিস চালু করে ঢাকার যোগাযোগ ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনে। তারা দুটি রুটে বেশ কিছু গাড়ি চালাতো। তবে একক ব্যবসায়ী হিসেবে মোমিন কোম্পানির কর্ণধার বেশ প্রভাবশালী ছিলেন। তিনি ঢাকার ঈদ মিছিলের নেতৃত্ব দিতেন। দীর্ঘদিন সেই মিছিল আয়োজক কমিটির সেক্রেটারি ছিলেন আব্দুল আজিজ। সভাপতি ছিলেন জুম্মন সরদার।


আপেল মাহমুদ
সাংবাদিক, গবেষক ও দুষ্প্রাপ্য গ্রন্থ সংগ্রাহক

মোহাম্মদ হানীফ পাঠানের ‘বায়ান্নর পাণ্ডুলিপি’ : ভাষা আন্দোলনের এক দুর্লভ দলিল

মুসলমানের জন্মগত ও প্রকৃতিগত ভাষা উর্দু হইলে অন্যান্য মুসলিম রাষ্ট্রে উর্দু রাজভাষার মর্যাদা পায় নাই কেন? আমরা জন্ম হইতেই আজান, কলেমা শুনি বলিয়া এবং শত শত আরবী ফারসী শব্দ ব্যবহার করি বলিয়া উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করা উচিত ইহা একটি হাস্যকর যুক্তি।

জমিয়তে ওলামায়ে ইসলাম নামে ভারতবর্ষের একটা রাজনৈতিক দল, যেটা প্রতিষ্ঠা লাভ করে ১৯১৯ সালে জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ নামে, পরে পাকিস্তান আন্দোলনে ব্যাপক ভূমিকা পালন করে এটি আলাদা হয়ে যায় ১৯৪৫ সালে এবং স্বাধীনতার পর পাকিস্তানে তারা প্রভাবশালী রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তানের ‘রাষ্ট্রভাষা’ কী হবে, এই আলোচনা ও বিতর্কসমূহ যখন ব্যাপকভাবে চলছিলো, তখন এই সংগঠনটি উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে ৫০ টি যুক্তি তুলে ধরে। ১৯৫১ সালে তারা এ-বিষয়ে একটি পুস্তিকা প্রকাশ করে ‘উর্দুর পক্ষে পঞ্চাশ পয়েন্ট’ নামে।

তৎকালীন ঢাকা জেলার (বর্তমান নরসিংদী জেলাধীন বেলাব উপজেলার) বটেশ্বর গ্রামের স্কুলশিক্ষক মোহাম্মদ হানীফ পাঠান (১৯০১-১৯৮৯), যিনি একজন ইতিহাসকার, প্রত্ন অন্বেষক ও লোকগবেষক হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছিলেন এবং এই গ্রামে বসেই একটি মাসিক পত্রিকা প্রকাশের সাথে যুক্ত ছিলেন, তিনি জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের উর্দুর পক্ষের ৫০ যুক্তির বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে ৫২ টি যুক্তি তুলে ধরেন। এ-বিষয়ে তিনি একটি পাণ্ডুলিপি প্রস্তুত করেন। জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের প্রতিটি পয়েন্টের বিপরীতে তিনি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে মাতৃভাষা বাংলার প্রয়োজনীয়তা খুব সাবলিলরূপে তাঁর পাণ্ডুলিপিতে তুলে ধরেন। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, পাণ্ডুলিপিখানা তখন প্রকাশিত হয়নি। যদি প্রকাশিত হতো, তবে জাতীয়ভাবে ব্যাপক পঠিত হতো এবং আলোড়ন তুলতো।

এই পাণ্ডুলিপিখানা ‘বায়ান্নর পাণ্ডুলিপি : বাংলা বনাম উর্দূ রাষ্ট্রভাষা বিতর্ক’ নামে ২০০৫ সালে প্রকাশিত হয় বটেশ্বর গ্রাম থেকে। বোঝাই যায়, গ্রন্থটি খুব বেশি প্রসার ও প্রচার লাভ করেনি।

‘বায়ান্নর পাণ্ডুলিপি’টি অর্থাৎ ‘বাংলা ভাষার পক্ষে ৫২ পয়েন্ট’ মোহাম্মদ হানীফ পাঠান সমাপ্ত করেন ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির সেই রক্তঝরা ইতিহাস রচিত হবার পূর্বেই। আমরা এখানে কয়েকটি পয়েন্ট উদাহরণস্বরূপ উল্লেখ করছি :

জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের পয়েন্ট
মুসলমানের আল্লাহ এক, রছুল এক, কিতাব এক, ধর্ম এক, কেবলা এক, কাবা এক, পতাকা এক, লক্ষ্য এক। সুতরাং তাদের রাষ্ট্রভাষাও এক হওয়া চাই। আরবীকে রাষ্ট্রভাষা করাই ছিল সবচেয়ে বাঞ্ছনীয়। উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করা সেই লক্ষ্যের প্রথম ধাপস্বরূপ।

মোহাম্মদ হানীফ পাঠানের উত্তর
সব বিষয়ের উপর এক এর আরোপ করা যুক্তি নহে। যদি তাহাই হইত তবে মুসলমানের রাজা এক, রাজ্য এক, রাজধানী এক, মন্ত্রী এক, ভাষা এক, ফসল এক, জমি এক, খাদ্য এক ইত্যাদি সবই এক হইত। তবে আর পৃথক পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রয়োজন কি? আরব বা মিশরের সঙ্গে একত্রীভূত হইয়া যাওয়াই যুক্তি! কিন্তু আল্লাহ ঐক্যের ভিতর দিয়া বৈচিত্র্যকেই পছন্দ করেন। তিনি নর সৃষ্টি করিয়াই ক্ষান্ত হন নাই— নারীও সৃষ্টি করিয়াছেন। কেবল সাদা আদমীই সৃষ্টি করেন নাই— কালো আদমীও সৃষ্টি করিয়াছেন। কেবল গভীর সাগর সৃষ্টি করেন নাইÑ উচ্চ পাহাড় ও মরুভূমিও সৃষ্টি করিয়াছেন। এইরূপ দিবারাত্র, শীত গ্রীষ্ম, পণ্ডিত মূর্খ, দ্বীন বেদ্বীন ইত্যাদি কত বৈচিত্র্য দিয়াই না তিনি জগতকে সুন্দর করিয়া সাজাইয়া রাখিয়াছেন।
ভিন্ন ভিন্ন ভাষাও আল্লাহর এক একটি বিচিত্র সৃষ্টি। এই প্রকৃত বৈচিত্র্যকে অস্বীকার করিয়া কল্পনার ফানুসে ভাসিয়া প্রধানমন্ত্রীর বাড়ী ও আমার বাড়ী এক, প্রধানমন্ত্রীর খাদ্য ও আমার খাদ্য এক ভাবিলে কি আমার দিন সুখে গুজরান হইবে? না, পাকিস্তানকে অন্য কোনও মুসলমান রাজ্যের সঙ্গে এক করিয়া দিলে কোন গৌরব হইবে কি? ফলতঃ ধর্মের মৌলিকতা ও ইসলাম জগতের ঐক্য রক্ষার জন্য আরবী ভাষা অবশ্যই আমাদের শিখিতে হইবে। তাই বলিয়া আরবীকে রাষ্ট্রভাষা করিতে হইবে বা কিছুকাল উর্দুকে রাষ্ট্রভাষারূপে ব্যবহার করিতে হইবে, ইহা কোন যুক্তি নহে, নিছক ছুতা মাত্র। একই ভাষাভাষীদের মধ্যে এমনকি আরবেই ভিন্ন ভিন্ন রাষ্ট্র গঠন করিবার কারণ কি?

জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের পয়েন্ট
বাংলা, হিন্দি প্রভৃতি ভাষা হিন্দুর। আরবী, পারসী প্রভৃতি ভাষা মুসলমানের। এমন একটা উৎকট ও বাস্তব সত্যকে ধামাচাপা দিয়া যাহারা আজ বাংলার আশেক হইয়া পড়িয়াছেন তাহাদের জন্য বড়ই আক্ষেপ ও অনুতাপ।

মোহাম্মদ হানীফ পাঠানের উত্তর
আরবী, পারসী যথাক্রমে পৌত্তলিক ও অগ্নি উপাসকদের ভাষা ছিল। আর উর্দু ত দিল্লীর বাদশাহগণের সিপাহীদের ভাষা ছিল অথবা বিভিন্ন দেশ হইতে আগত দিল্লীর বাসিন্দাদের বাজারের ভাষা ছিল। তুর্কি শব্দ উর্দু অর্থ সৈনিক বা সেনানিবাস। সাধনা দ্বারা এইগুলিকে ইসলামী ভাষায় পরিণত করা হইয়াছে। তেমনি সাধনা দ্বারা ইসলামী ভাবসম্পদে পূর্ণ করিয়া বাংলা, হিন্দিকে ইসলামী ভাষায় পরিণত করিতে কোন নিষেধ নাই। কাজেই বাংলার আশেকগণের জন্য কাহার উৎকট আক্ষেপের প্রয়োজন নাই। বরং যাহারা এইরূপ সংকীর্ণ মনোভাব পোষণ করেন তাহারাই অনুতাপ করিতে পারেন।

জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের পয়েন্ট
…মুসলমানের ভাষা ও ভাবধারা জন্ম হইতেই এছলামিক। আমরা শত শত আরবী শব্দ ব্যবহার করি। এতে প্রমাণিত হইল উর্দু মুছলমানের জন্মগত ও প্রকৃতিগত ভাষা। কাজেই স্বভাব ও প্রকৃতির দাবী অনুসারেই উর্দুকে রাজভাষা করা উচিত।

মোহাম্মদ হানীফ পাঠানের উত্তর
মুসলমানের জন্মগত ও প্রকৃতিগত ভাষা উর্দু হইলে অন্যান্য মুসলিম রাষ্ট্রে উর্দু রাজভাষার মর্যাদা পায় নাই কেন? আমরা জন্ম হইতেই আজান, কলেমা শুনি বলিয়া এবং শত শত আরবী ফারসী শব্দ ব্যবহার করি বলিয়া উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করা উচিত ইহা একটি হাস্যকর যুক্তি। যেমন এখান থেকে মারলাম তীর লাগলো কলাগাছে, হাঁটু বেয়ে রক্ত পড়লো, চোখ গেলরে বাবা। বাংলা ভাষায়ও আমরা শত শত আরবী ফারসী শব্দ ব্যবহার করিতেছি এবং প্রয়োজনবোধে আরো করিব। কাজেই বাংলা ভাষাও স্বভাবের দাবি করিতে পারে।

জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের পয়েন্ট
পাকিস্তানের সংহতি ধর্মের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত। অতএব ধর্মভাবকে প্রবল ও বিস্তার করার জন্য ইসলামী ধর্মভাষা উর্দুকেই রাষ্ট্রভাষা করা উচিত ও যুক্তিসংগত।

মোহাম্মদ হানীফ পাঠানের উত্তর
ইসলামী ভাষা বলিয়া যদি কোন ভাষা থাকে তবে তাহা আরবী। যদি বলিলাম এইজন্য যে পূর্ব যমানায় আরবী ছাড়াও অন্যান্য ভাষায় আল্লাহর অহি নাজিল হইয়াছিল, তখন তাহাই ইসলামী ভাষা ছিল। যেমন ইনযিল সুরিয়ানী ভাষায় ও যবুর ইউনানী ভাষায় নাজিল হইয়াছিল। তাহাও তৎকালীন পয়গম্বরগণের মাতৃভাষাতেই হইয়াছিল। পৃথিবীর সকল ভাষাকেই সাধনা দ্বারা ইসলামী ভাষায় পরিণত করা যাইতে পারে; পারশী ভাষা ইহার নজির। আমরাও সেইসব দৃষ্টান্তে অনুপ্রাণিত হইয়া সাত আট কোটি লোকের মাতৃভাষাকে ইসলামী ভাবসম্পদে ভরপুর করিয়া ইসলামী ভাষায় পরিণত করিব। ইহার প্রথম এবং প্রধান সুযোগ মাতৃভাষা বাংলাকে রাষ্ট্র ভাষার মর্যাদা দান করা। ধর্ম, আইন, সাহিত্য, বিজ্ঞান, ইত্যাদি সর্ব সাধারণের মধ্যে দ্রুত প্রচার ও প্রতিষ্ঠা করিতে মাতৃভাষার সাহায্য ভিন্ন গত্যন্তর নাই।

জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের পয়েন্ট
…উর্দু আন্তর্জাতিক ভাষা। …বিজ্ঞান, দর্শন, রাজনীতি, শিল্প, বাণিজ্য সর্ব বিষয়ের প্রতিশব্দ উর্দুতে বিদ্যমান। …পক্ষান্তরে বাংলা প্রাদেশিক ও আঞ্চলিক ভাষা, ইহা আন্তর্জাতিক প্রতিভাশূন্য। এতে বিদেশী শব্দের বিকট দুর্ভিক্ষ।

মোহাম্মদ হানীফ পাঠানের উত্তর
ইহা হাস্যকর উক্তি। কারণ বাংলা প্রায় আট কোটি লোকের মাতৃভাষা সেইস্থলে উর্দু ভাষাভাষীর সংখ্যা দু’তিন কোটির বেশি হইবে না। সর্ব বিষয়ের প্রতিশব্দ কোনও ভাষাতেই সম্পূর্ণরূপে পাওয়া যায় না। এক ভাষার শব্দ অন্য ভাষাতে চিরকাল গ্রহণ করিয়াছে এবং করিবে, ইহাই বৈজ্ঞানিক সত্য। উর্দু এইরূপ স্বয়ংপূর্ণ ভাষা বলিয়া দাবি করা হাস্যকর শুনায়। সাত আট কোটি লোকের মাতৃভাষা যদি আঞ্চলিক ভাষা হয় এবং সেই ভাষ্য যদি আন্তর্জাতিক প্রতিভাশূন্য হয়, তবে জিজ্ঞাস্য এই যে, এই ভাষা তিন তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানো হইতেছে কিরূপে? সেই ভাষার কবি নোবেল প্রাইজ পান কীরূপে? সেই ভাষার কবি সাহিত্যিকগণ আন্তর্জাতিক খ্যাতি লাভ করেন কীরূপে? পরাধীন অবস্থায় যাহা হইয়াছে আযাদী পাওয়ার পর তাহার শত গুণ এবং বাংলা রাষ্ট্রভাষার মর্যাদায় সমাসীন হইলে সহস্র গুণ উন্নতি হইবে তাহা নিঃসন্দেহে বলা যায়।

পুরো ৫২ পয়েন্ট এখানে প্রকাশ করার সম্ভব নয়, তাই পাঠকের বোঝার স্বার্থে কয়েকটা যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করা হলো। মোদ্দা কথা হলো, বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার মহৎ আন্দোলনে সারা বাংলার শিক্ষিত প্রাজ্ঞ মানুষজন যার যার অবস্থান থেকে যেভাবে লড়াই করেছেন, মোহাম্মদ হানীফ পাঠানের এই বায়ান্নোটি পয়েন্ট প্রয়োজনীয় দুর্লভ এক অবদানের দলিল হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছে। নরসিংদীর বটেশ্বর গ্রামের এই স্কুলশিক্ষক বহুমাত্রিক জ্যোতির্ময় ছিলেন, এ-কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়।

হাবিবুল্লা পাঠানের কাছে গেলাম, যন্ত্র-রাষ্ট্রের খবর জানতে

0

মুহাম্মদ হাবিবুল্লা পাঠান। ইতিহাসে নিবেদিত যার চোখ ও হৃদয়। থাকেন নিজের গ্রামেই, যে-গ্রামে তাঁর জন্ম, বেড়ে ওঠা আর দৃপ্তভরে পদচারণা ৮৭ বছর ধরে। ৮৮ বছরে পা দিলেন এ-বছর ফেব্রুয়ারির ৭ তারিখে। নিজের গ্রাম আর গ্রামের মাটি তাঁর আরাধ্য বিষয়। মাটির গভীরে সঞ্চিত রাখা আছে যে-মহাকালিক অতীত; যে-অতীতের কোনো হদিস জানা ছিলো না কারোরই, তা তিনি ধীরে ধীরে মাটির উপরে পাদপ্রদীপের আলোয় উন্মোচিত করেছেন থরে থরে। সবাই বিস্মিত হয়েছে।

এটা তাঁর গ্রাম, বটেশ্বর। এখানেই থাকেন তিনি, তাঁর পথপ্রদর্শক পিতার ভূমিতে, যে-পিতা তাঁকে হাতেখড়ি দিয়েছেন কেবল মাটির দিকে গভীর অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে তাকিয়ে থাকার এক অবিনাশী অভ্যাসের, যা এই ৮৭ বছর বয়সেও এক মুহূর্তের জন্যে বিস্মৃত হতে পারছেন না।

আমরা কয়েকজন বাইকে চেপে চলে গেলাম গাছপালার অফুরান স্নেহচ্ছায়াঘেরা গ্রাম বটেশ্বরে। তখন দ্বিপ্রহর। খুঁজে পেতে কষ্ট হয় না এই বাড়ি। ১৯৭৪ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘বটেশ্বর প্রত্ন সংগ্রহশালা ও গ্রন্থাগার’ নামের চৌচালা টিনশেড ঘরটি দু’ কক্ষ বিশিষ্ট। হাবিবুল্লা পাঠান গত সাত দশক ধরে যা কুড়িয়েছেন মাটির নিচ থেকে আর আশপাশের গ্রামের নানা মানুষজনের নিকট থেকে, তা এখানে সঞ্চিত করে আগলে আছেন। আমরা যখন পৌঁছুলাম, তখন তিনি এর একটি কক্ষের চৌকিতে ঘুমোচ্ছেন। আমরা অপেক্ষা করছিলাম তাঁর জেগে ওঠার। আমরা জানতাম, তিনি ইদানিং প্রায়ই নানা অসুখে ভুগছেন। শরীর ও মন কোনোটাই তাঁর স্বস্তি শান্তি আর নিরুদ্বিগ্ন নাই— এগুলো আমরা আগেই জানতাম।

যাবতীয় আলাপ-সালাপের পর ঘুরে-ফিরে সেই একই জায়গায় তিনি এবং আমরা মিলিত হই, আর তা হচ্ছে— তাঁর দেহাবসানের পর কী হবে সবকিছুর? তিনি এবং আমরা যে-শব্দ উচ্চারণ করে তৃপ্তি (!) ও বিষাদাক্রান্ত হই, তা হলো, ‘লোপাট’, ‘বেহাত’, ‘দখল’ ইত্যাদি!

ঘুম থেকে জেগেই সহজাত ভঙ্গিতে কথা বলা শুরু করলেন। তাঁর পিতার কথা, তাঁর কথা, নানা ধরনের প্রত্নসামগ্রী সংগ্রহের গল্প। আমাদের প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছেন। জানালেন তাঁর মনের ভেতর সবসময়ই চেপে রাখা সেই অমোঘ অভিমান ও ক্ষোভের অনল! তাঁর মারা যাবার পর কী হবে এইসব সাতদশকের তিল তিল করে গড়ে তোলা সঞ্চিত রত্নরাজির! তিনি কোনো আশার আলো দেখতে পান না। পরিবারেও এমন কেউ নেই এগুলো যত্ন আর ভালোবাসার শক্তিশালী রক্ষাব্যূহ হয়ে আগলে রাখার। আর সরকারের বা রাষ্ট্রের কাছে আবেদন করে করে আর কিছু লাভ নাই আর! আর কতো! এটা তো বেদনাদায়ক আরেক উপাখ্যান! যেমন ‘জাদুঘর’। গোটা সময় আমরা লক্ষ্য করেছি, এই বিষয়ে তিনি কথা বলতে ইচ্ছুক না। সরাসরি বলেননি, কিন্তু আমরা প্রসঙ্গ তুললেই তিনি কথা অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেন। আমরা বুঝতে পেরেছি, তিনি এ-বিষয়ে কতোটা হতাশ আর বিরক্ত!

উয়ারী-বটেশ্বর-টঙ্গীরটেকসহ গোটা অঞ্চলেই প্রত্নতাত্ত্বিক খননের মাধ্যমে যেসব সামগ্রী পাওয়া গেছে এবং হাবিবুল্লা পাঠানের কাছে যেসব সামগ্রী সঞ্চিত আছে, সব সংরক্ষিত থাকার জন্যে একটি ‘জাদুঘর’ নির্মাণের ব্যবস্থা গ্রহণ করে সরকার আর সরকারের প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর। নামও ঠিক করে ‘গঙ্গাঋদ্ধি জাদুঘর’। ২০১৯ সালে এই জাদুঘরের কাজ শুরু হয় এবং তা এক বছরের মধ্যেই সমাপ্ত হবার কথা। কিন্তু হায়, সাত বছর অতিবাহিত হলেও এটির কাজ সমাপ্ত হবার প্রসঙ্গ তো অনেক দূরের আলাপ, বরং যতোটুকু শেষ হয়েছে, তা-ও অযত্ন-অবহেলায় পতিত স্থাপনায় পরিণত হয়েছে।

মুহাম্মদ হাবিবুল্লা পাঠান কথা বলছিলেন আমাদের সাথে। তাঁর ঘরে। যেখানে দুটি বড়ো সাইজের শেলফে কাচবন্দী আছে তাঁর আহরিত রত্নভাণ্ডার। উয়ারী ও বটেশ্বর এবং গোটা প্রত্নঅঞ্চল থেকে ৭০ বছর ধরে সংগ্রহ করা আড়াই হাজার বছর আগেকার বহুবিচিত্র সামগ্রী, যেমন : বঙ্গভারতের দুর্লভ নিদর্শন বিষ্ণুপট্ট, ব্রোঞ্জ বা তামার তৈরি অনুপম শিল্পমণ্ডিত ধাবমান অশ্ব, বৌদ্ধ-শৈব নৈবেদ্যপাত্র, পাথরের বাটখারা, কচ্ছপ, হস্তী, হাঁস, পোকা, ফুল, অর্ধচন্দ্র প্রভৃতি মন্ত্রপুত কবচ, পোড়ামাটির তৈরি কিন্নর, বিভিন্ন জীবজন্তুর প্রতিকৃতি, স্বল্পমূল্যবান পাথর ও কাচের পুঁতি ইত্যাদি।  এসব সামগ্রীই যে এই শেলফে আছে এমন নয়। তবে আছে, গোপন শেলফে। চারদিকে সুশীল প্রত্নপ্রেমিকের ছদ্মবেশে তস্করের ছড়াছড়ি। বলছিলেন তিনি। পুঁতির মালা আর কয়েক ধরনের পুঁতি নিয়ে তাঁর ব্যক্তিগত গবেষণা এখনো চলমান।

কথা বলছিলাম ধীমান বয়স্ক এক প্রত্ম আর ইতিহাসের নিবেদিতপ্রাণ ঋষির সাথে। আমরা কয়েকজন। ফাঁকে ফাঁকে চলছে চা-নাস্তা পর্ব। তিনি এই বয়েসেও যে-মাত্রায় ধূমপান আঁকড়ে ধরে আছেন, তা দেখাও এক বিস্ময়!

তিনি বলছিলেন তাঁর জীবনের নানা অভিজ্ঞতার সারাৎসার। তাঁর ভাটকবিতা প্রকাশের গল্প, কয়েক খণ্ড লোককাহিনি সংগ্রহের বিচিত্র ও অভূতপূর্ব অভিজ্ঞতার কথা, গাজীপুরের মেয়েলি গীত সংগ্রহ করতে গিয়ে কীরকম হেনস্তার শিকার হয়েছেন, সেসব ঘটনা শুনতে শুনতে আমরা বুঝতে চেষ্টা করি তাঁর সমগ্র জীবনের অমোঘ ঝোঁক ও নেশার মতো লেগে থাকা  এক সংগ্রাহক আর সংকলকসত্তার ভেতরটা। তবে সম্পূর্ণ বুঝতে পারাটা এতোটা সহজ তো নয়— এটা জানি।

যাবতীয় আলাপ-সালাপের পর ঘুরে-ফিরে সেই একই জায়গায় তিনি এবং আমরা মিলিত হই, আর তা হচ্ছে— তাঁর দেহাবসানের পর কী হবে সবকিছুর? তিনি এবং আমরা যে-শব্দ উচ্চারণ করে তৃপ্তি (!) ও বিষাদাক্রান্ত হই, তা হলো, ‘লোপাট’, ‘বেহাত’, ‘দখল’ ইত্যাদি!

তাঁর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আমরা বাড়ির পাশেই ‘গঙ্গাঋদ্ধি জাদুঘর’ নামক শাপগ্রস্ত সেই স্থাপনার ভেতর যাই। দেখি জঙ্গলাকীর্ণ ধুলা আর বহুস্তর বিশিষ্ট মাটিতে মুছে যাওয়া স্থাপনার নকশাবোর্ড, ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের পিলার…। সমগ্র স্থাপনাটির নকশা, ডিজাইন ও পুরো জাদুঘরের পরিকল্পনায় আমরা মুগ্ধ হই। কিন্তু এটা এখন গোচারণভূমি আর গাঁজাখোরদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে, দেখলেই বোঝা যায়। রাষ্ট্রের বা জনগণের কোটি কোটি টাকার কী শ্রাদ্ধশান্তি!

২০১৯ সালে শুরু হওয়া ‘গঙ্গাঋদ্ধি জাদুঘর’-এর নির্মাণাধীন স্থাপনা

রাষ্ট্র সরকার সংস্কৃতিমন্ত্রণালয় প্রত্নতত্ত্বঅধিদপ্তর গবেষক লেখক মন্ত্রী জেলাপরিষদ ঠিকাদার ইঞ্জিনিয়ার শ্রমিক… আরো কিছু পার হয়ে, এবং এদের প্রত্যেকের অভ্যন্তরে আরো অনেক লাভালাভের গল্প-টানাপোড়েন কতো কতো সংঘাত-সংকট পেরিয়ে হাবিবুল্লা পাঠানের আগলে রাখা সঞ্চিত সম্পদ ওখানে কী করে পৌঁছুবে— রাষ্ট্রের জনগণের জন্যে প্রদর্শনের, গবেষণার, শিক্ষা লাভের, সর্বোপরি একটা জাতির সভ্য হবার শর্তগুলো পূরণ হওয়া পর্যন্ত কতো আর অপেক্ষা করতে হবে, তা এই জাতি আসলেই হয়তো জানে না। সিস্টেম মানুষের উপকারের জন্যে, শৃঙ্খলাপূর্ণ পদ্ধতিচর্চার সহায়ক হবার জন্যে। সিস্টেম মানুষের জীবনীশক্তি, ধৈর্যশক্তি নিঃশেষ করার জন্যে নিশ্চয়ই নয়!

এই রাষ্ট্রের সিস্টেম নিয়ে আলাপ করতে করতে আমরা উয়ারী গ্রামে যাবার মনস্থির করলাম। যে-গ্রামে উৎখনন হয়েছিলো কয়েক দফায়, এবং মূলত, এই উৎখননের ফলেই খুলে যায় এক প্যান্ডোরার বাক্সের; আবিষ্কৃত হয় আড়াই হাজার বছর আগেকার এক দুর্গনগরীর, যেটা ছিলো মূলত টলেমি বর্ণিত গঙ্গারিডাই জাতির এক মহাবাণিজ্য বন্দর।

আমরা চলছিলাম দুটো বাইকে চড়ে, পাঁচজন। সেখানে আমাদের জন্যে অপেক্ষা করছে কী যে অদ্ভুত বাংলাদেশ, তা তখনো আমাদের ধারণায় ছিলো না। ঘনবসতিপূর্ণ নয় এখনো, এরকম গ্রামাঞ্চল পার হচ্ছি আমরা প্রচুর গাছপালার ছোটো ছোটো উদ্যান পেরিয়ে, বুকে নির্মল বাতাস ভরে নিয়ে, অপরাহ্ণের শেষ আলোয়।

উয়ারী গ্রামের এই খননকৃত জায়গাটিতে পৌঁছুতে হলো আমাদের দু’ঘর গ্রামবাসীর উঠোনের উপর দিয়ে, অনেক দ্বিধার সাথে। একটা প্রত্নস্থানে প্রবেশের পথ কেন এরকম, ভাবতে ভাবতে আমরা ঢুকে গেলাম প্রাচীর ঘেরা একটি স্থানে। এই সেই স্থান, যেটাতে এই শতাব্দীর প্রথম দশকে কয়েক দফায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষক, গবেষক ও শিক্ষার্থীদের মিলিত প্রচেষ্টায় অনেক দফায় খননকার্য পরিচালনার মাধ্যমে যে-ইতিহাস উন্মোচিত হয়েছে, তাতে ‘বাঙলার ইতিহাস’ নূতন করে রচনা করতে হচ্ছে ইতিহাসবিদ ও গবেষকদের। এসব কথা আমাদের অনেক আগেই জানা ছিলো। মোটামুটি সবাই জানে এসব কথা। গত ১৫-২০ বছর ধরেই জানে। কিন্তু এ কী তার রূপ! প্রায় জঙ্গল হয়ে যাওয়া একটা কবরস্থানের মতো মনে হলো। কিন্তু কবরস্থানে বাচ্চাদের অ্যামিউজমেন্ট পার্ক! হ্যাঁ, এটা সত্যি যে, এখানে এই স্বল্পপরিসর জায়গাটিতে বাচ্চাদের খেলাধুলা করার জন্যে স্থাপন করা হয়েছে স্লিপার, দোলনা, খেলনা হাতি-ঘোড়া ইত্যাদি। যেই স্থানটি সংরক্ষিত থাকার কথা, তার উপর দিয়েই জুতোর থপথপ আওয়াজ তুলে এইসব খেলাধুলার সামগ্রীতে চড়ছে বালক-বালিকারা। পৃথিবীর কোনো প্রত্নস্থানে এরকম গরু-ছাগল এবং মানুষের অবাধ চলাফেরা ঘটিয়ে সবকিছু নষ্ট হয়ে যাওয়ার পরিস্থিতি করা হয় কি না, এসব জানতে জানতে ভাবি, এগুলো দেখভাল করার কি কেউ নেই? এমন সময় লাগোয়া বাড়ির ভেতর থেকে এলেন আনোয়ারা বেগম নামের মাঝবয়েসী এক মহিলা। বললেন, তিনি দেখভাল করার দায়িত্বে ছিলেন অনেক দিন। এখন নাই। করোনার পর থেকে তাকে টাকা-পয়সা দেয়া বন্ধ করে দেয়া হয়। সরকার পরিবর্তনের পর তাকে বলে দেয়া হয়েছে, এখানে আর দেখভালের দরকার নেই। আমরা জিজ্ঞেস করি, কারা তাকে নিয়োগ দিলো আর কারা তাকে ছাড়িয়ে দিলো? তিনি বললেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সুফি মোস্তাফিজুর রহমানের কথা।

আনোয়ারা বেগমের সাথে আরো অনেক কথাই হলো। তার কথায় প্রচুর খেদ। তার জমি নাকি কেড়ে নেয়া হয়েছে। কে জানে, আসলে তার কথা ঠিক কি না! সুফি মোস্তাফিজুরের উপর খুবই ক্ষোভ তার।

কর্তৃপক্ষের নিকট ‘পৃথিবীর প্রথম উন্মুক্ত জাদুঘর’ স্থাপনের তৃপ্তিমিশ্রিত ঢেঁকুর থাকলেও সেটা কতোটা উন্মুক্ত আর কতোটা উন্মুক্ত নয়, উন্মুক্ত জাদুঘর বললেই সেটা যে বাপ-মা বিহীন হয়ে যায় না— এই ব্যাপারে বোঝাপড়ার ধরন দর্শনার্থীরা তখনই বুঝে ফেলবেন, যখন দেখবেন ‘উন্মুক্ত জাদুঘর’ সংক্রান্ত বিলবোর্ডই  নষ্ট হয়ে গেছে!

যাই হোক, আমরা বুঝলাম, এই খননকৃত প্রত্নস্থানটিতে এসে আমাদের কিছুই লাভ হয়নি। অথবা হয়তো হয়েছে। ইতিহাসের একটা আকরভূমি, কোটি কোটি টাকা খরচ করে খননকৃত এক মহা আবিষ্কারকে রাষ্ট্র এভাবে হেলাফেলার বস্তু বানিয়ে ফেলে রেখেছে— কীভাবে জানা হতো, না এলে আজ!

চলে যাচ্ছিলাম। বাইকের কাছাকাছি আসতেই এক মহিলা পার্কিং চার্জ দাবি করে বসলো, বাইকপ্রতি বিশ টাকা। আমরা এই ধরনের অনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ জানাতেই প্রায় খেঁকিয়ে ওঠলো মহিলাটি। “উনি কি নৈতিক কাজ করছে?” এরকম প্রশ্নে আমরা দিশেহারা। কাকে উদ্দেশ্য করে বলছে, জিজ্ঞেস করতেই সেই একই নাম উচ্চারণ করলো, সুফি মোস্তাফিজুর রহমান।

বাইকে চড়তে চড়তেই হঠাৎ মনে পড়ে গেলো পাঁচদোনার গিরিশ প্রত্নমিউজিয়ামের কথা। মনীষী ভাই গিরিশচন্দ্র সেনের স্মৃতি রক্ষার্থে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে নির্মিত এই মিউজিয়ামটির নির্মাণেও ছিলেন সুফি মোস্তাফিজুর। এতোটা জঘন্য, জগাখিচুড়ি, গোঁজামিলপূর্ণ জাদুঘর সম্ভবত বাংলাদেশে আর একটিও নেই। তার আর আওয়ামী লীগ নেতা নূহ উল আলম লেনিনের একটা প্রতিষ্ঠান আছে ‘ঐতিহ্য অন্বেষণ’ নামে। গত সরকারের পিরিয়ডে এই প্রতিষ্ঠানটি সারা দেশে সরকারের কোটি কোটি টাকা শ্রাদ্ধ করে নন্দনহীন, গোঁজামিলপূর্ণ এবং শেষ পর্যন্ত সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা না করে ভাগাড়ে পরিণত করে ফেলে রাখার মতো এরকম আরো হয়তো ‘ইতিহাস-ঐতিহ্য’ নিয়ে খেলাধুলা করেছে! সৎ, সাহসী, মেধাবী ও অনুসন্ধানী সাংবাদিকগণই কেবল এর প্রকৃত হদিস বের করতে পারবে।

সোজা মসৃণ কালো পিচের রাস্তার দু’পাশে আম-কাঁঠালের সারি। বাইকের পিঠে বসে থাকা এই বন্দরের জাহাজ আর মানুষের কলধ্বনি সমেত আমাদের চুল উড়িয়ে নিচ্ছে ব্রহ্মপুত্র তীরের বাতাস। খ্রিস্টপূর্ব ৩৫০ অব্দের সেই আলেকজান্ডারীয় বৈকালিক আলো মুখে পড়তেই আমাদের মনে পড়ে যায় দ্বিপ্রহরে ফেলে আসা সেই সন্তের মুখ। মুখমণ্ডলে বয়সের যে-বলিরেখা ছড়িয়েছে ইদানিং, সেই ঋজু দৃপ্ত তবু ভারাক্রান্ত সেই নতমুখ একজন মুহাম্মদ হাবিবুল্লা পাঠানের। তিনি ঘুমিয়ে ছিলেন। তিনি অসুস্থ শারীরিকভাবে।

এক অজপাড়াগাঁ বটেশ্বরে এমন কেউ ছিলেন বিশেষ ধীসম্পন্ন মানুষ, যিনি সেই ১০০ বছর আগে ১৯২৬ সালে এই গ্রামে বসেই ‘সবুজ পল্লী’ নামে পত্রিকা করতেন। তিনি মোহাম্মদ হানীফ পাঠান। মাটির নিচ থেকে পাওয়া গুটিকা দেখে যার চোখ আবিষ্কার করেছিলো এক মহাকাল; আর তা ছড়িয়ে দিয়েছিলেন তার বালক পুত্রের স্কন্ধে। শহরের বড়ো বড়ো বিদ্বান-পণ্ডিত-গবেষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চার দশক তারা লেখালেখি করেছেন। আর তারপর বড়ো বড়ো মানুষেরা একসময় পরীক্ষা করে দেখলো মুহাম্মদ হাবিবুল্লা পাঠান নামের গ্রামের এই স্কুলশিক্ষকের চোখ ও হৃদয়ের অবিনাশী সত্যাসত্য। পত্রিকা হলো, বই হলো, খননকর্ম হলো, তথ্যচিত্র হলো, কতো কতো আলোকচিত্র হলো, সেমিনার হলো, পুরস্কার হলো, সরকার হলো, প্রত্নতত্ত্ব হলো, প্রচুর মানুষের প্রচুর প্রচুর পিনিক হলো এই বিশ-পঁচিশ বছরে। কিন্তু  গত ১০০ বছরে বাংলাদেশে আবিষ্কৃত কোনো প্রত্নতাত্ত্বিক অঞ্চলের ভাগ্যই এই উয়ারী-বটেশ্বরের মতো হলো না। এই স্থানটির যথাযথ যা প্রাপ্য ছিলো, তা হলো না। এখানে প্রাপ্ত আয়ুধসমূহের যেখানে যথাযথ সংরক্ষণের প্রতিশ্রুতি ছিলো, তা হলো না। আর একজন হাবিবুল্লা পাঠান সাত দশক ধরে যা সংগ্রহ করেছেন অনাগত মানুষ আর মানুষের মনন উৎকর্ষের জন্যে, তার কিছুই হলো না। সম্পূর্ণ অরক্ষিত, হারিয়ে ফেলার আশঙ্কা নিয়ে আড়াই হাজার বছর আগেকার এই সভ্যতা হয়তো প্রতীক্ষা করছে বাংলাদেশ রাষ্ট্র পরিচালিত নূতন কোনো নাটকের, আবার হয়তো নূতন করে খনন শুরু হবে, নূতনভাবে কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ হবে, নূতন কোনো প্রত্নতত্ত্ব, নূতন কোনো জেলাপরিষদ, নূতন কোনো ঠিকাদার….

তবু আমরা চাই, বাংলাদেশ রাষ্ট্রের এই সকল ধারাবাহিক নাটক দেখার জন্যে প্রত্নঋষি মুহাম্মদ হাবিবুল্লা পাঠান, আপনি শতায়ু হোন।

শরীফুন্নেছা ঝিনু ও তাঁর সশস্ত্র মহিলা দল

0

১০ জনের একটা মহিলা দল গঠিত হলো। এখন তাঁদের যুদ্ধের প্রশিক্ষণ দরকার। আর সেজন্যে প্রথমেই দরকার একটি আদর্শ স্থান। পাকিস্তানি আর্মি ও রাজাকার বাহিনীর চোখের অন্তরালে তাঁদের প্রশিক্ষিত করার দায়িত্ব নিজেদের কাঁধেই তুলে নেন দুই কমান্ডার— ন্যাভাল সিরাজ ও ইমাম উদ্দিন। স্থান নির্ধারিত হয় আলগী গ্রামের শরীফুন্নেছা ঝিনুর বাড়িতেই। এই বাড়িটি গাজী বাড়ি হিসেবে পরিচিত। শরীফুন্নেছা ঝিনুর চাচা বীর মুক্তিযোদ্ধা গাজী আলাউদ্দিন। তাঁর চাচা ও অন্যান্য ভাইয়েরা সবাই মুক্তিযুদ্ধে যুদ্ধরত। তাই পারিবারিক আবহ তাঁর রক্তের ভেতর দেশপ্রেমের বীজ আগেই রোপিত করেছিলো।

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ আপামর মানুষের সম্মিলিত অবদানে ভাস্বর হয়ে আছে ইতিহাসে। নারী-পুরুষের মিলিত অংশগ্রহণ ছিলো যুদ্ধের নয় মাস জুড়েই। নরসিংদী সদর, পাঁচদোনা, ঘোড়াশাল, কালীগঞ্জসহ ব্যাপক এলাকা ছিলো বীরপ্রতীক ন্যাভাল সিরাজের অধীনে। ন্যাভাল সিরাজ আর সাব ইউনিট কমান্ডার ইমাম উদ্দিনের প্রচেষ্টা আর উদ্যোগে নরসিংদী সদরের আলগী গ্রামে গড়ে ওঠে মহিলা ট্রেনিং সেন্টার।

মুক্তিযুদ্ধে এ-অঞ্চলের সাহসী নেতৃবৃন্দ বুঝতে পেরেছিলেন, সকল বয়সের নারীদেরও যুদ্ধে অংশগ্রহণ জরুরি। তাঁরা নারীদের খুঁজতে থাকেন। একসময় পেয়ে যান নরসিংদী কলেজে একাদশ শ্রেণিতে অধ্যয়নরত আলগী গ্রামের শরীফুন্নেছা ঝিনুকে। যুদ্ধের কোনোকিছুই না জানা ও না বোঝা গ্রামের এক লাজুক তরুণী এই ধরনের দায়িত্বের কথা শুনে ভড়কে যান। কিন্তু ন্যাভাল সিরাজের অসীম সাহস ও উৎসাহে ভেতরে সাহস সঞ্চয় করেন। শরীফুন্নেছা ঝিনুর উপর দায়িত্ব অর্পিত হয় আরো কয়েকজন মেয়েকে যুক্ত করার। অবশেষে খুঁজে বের করে যুক্ত করেন আলগী গ্রামেরই আরো ৯ জনকে। তারা হলেন— মমতাজ বেগম (পিতা : আবদুল মালেক), সখিনা বেগম (পিতা : আ. আহাদ), খোদেজা বেগম (পিতা : হাজী নোয়াব আলী), সুরাইয়া বেগম (পিতা : মজিদ ভূঁইয়া), মোহছেনা বেগম (পিতা : মজিদ ভূঁইয়া), রোকেয়া বেগম (পিতা : আবদুস সামাদ), দিলরুবা বেগম (পিতা : মজিদ ভূঁইয়া), আফজল বেগম ও নূরজাহান বেগম।

১০ জনের একটা মহিলা দল গঠিত হলো। এখন তাঁদের যুদ্ধের প্রশিক্ষণ দরকার। আর সেজন্যে প্রথমেই দরকার একটি আদর্শ স্থান। পাকিস্তানি আর্মি ও রাজাকার বাহিনীর চোখের অন্তরালে তাঁদের প্রশিক্ষিত করার দায়িত্ব নিজেদের কাঁধেই তুলে নেন দুই কমান্ডার— ন্যাভাল সিরাজ ও ইমাম উদ্দিন। স্থান নির্ধারিত হয় আলগী গ্রামের শরীফুন্নেছা ঝিনুর বাড়িতেই। এই বাড়িটি গাজী বাড়ি হিসেবে পরিচিত। শরীফুন্নেছা ঝিনুর চাচা বীর মুক্তিযোদ্ধা গাজী আলাউদ্দিন। তাঁর চাচা ও অন্যান্য ভাইয়েরা সবাই মুক্তিযুদ্ধে যুদ্ধরত। তাই পারিবারিক আবহ তাঁর রক্তের ভেতর দেশপ্রেমের বীজ আগেই রোপিত করেছিলো।

এই প্রতিবেদকের সাথে সম্প্রতি কথা হয় শরীফুন্নেছা ঝিনুর। ৭১ বছর বয়স হয়ে গেছে তাঁর। অনেক কথাই মনে করতে পারেন না। তবে তিনি বলেন, “ন্যাভাল সিরাজ আমাদের বাড়িতে এলেন। আমাকে দেখে তাঁর মনে হলো মহিলাদের ট্রেনিং সেন্টার খোলার কথা। আমাকে বললেন, আরো মেয়ে জোগাড় করতে হবে। আমার গ্রাম থেকে অনেককে জোগাড় করলাম। তারা আসতে চায় না। বাবা-মা তাদের আসতে দিতে চায় না। …আমাদের বাড়িতেই সেন্টার খোলা হলো। …আমরা থ্রি নট থ্রি, পিস্তল আর স্টেনগান চালানো শিখেছিলাম।”

কখনো সম্মুখযুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে হয়েছে কি না, এই প্রশ্নের উত্তরে তিনি জানান, “একবার শুধু পাঁচদোনা ব্রিজের কাছে গিয়েছিলাম সশস্ত্র অবস্থায়। শুনেছিলাম ওখানে বিরাট গণ্ডগোল হচ্ছে। আমরা সবাই প্রস্তুতি নিয়েই গিয়েছিলাম। কিন্তু যুদ্ধ করতে হয়নি। দু’-একজন আহত মুক্তিযোদ্ধাকে ওখানে সেবা করেছিলাম আমরা।”

বর্বর পাক বাহিনী অবশ্য এই মহিলা প্রশিক্ষণ কেন্দ্রটির খবর জেনে গিয়েছিলো। তাছাড়া এই বাড়ির আরো কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধার কথাও তাদের জানা হয়ে গিয়েছিলো। অবশেষে একদিন এই সেন্টারটি পাক বাহিনী পুড়িয়ে ফেলে সম্পূর্ণভাবে। অবশ্য কারো কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। শরীফুন্নেছা ঝিনু ও তাঁর দল এবং বাড়ির অন্যান্য বাসিন্দারা আগেই অন্যত্র অবস্থান নিয়েছিলো ন্যাভাল সিরাজের নির্দেশে।

মুক্তিযোদ্ধা শরীফুন্নেছা ঝিনু পরবর্তীতে নরসিংদী কলেজ থেকে বিএসসি পাশ করেছিলেন। তিনি বর্তমানে বিবাহ সূত্রে চট্টগ্রামে বসবাস করেন।

এমনি অনেক ঘটনা-দুর্ঘটনায় ভারাক্রান্ত আমাদের একাত্তর। অনেক মানুষের আত্মত্যাগ জড়িত। আমাদের নরসিংদী জেলার নারীরা কোনোভাবেই পিছিয়ে ছিলো না মুক্তিযুদ্ধের অবিনাশী নয় মাসে। শরীফুন্নেছা ঝিনু ও তাঁর দল ইতিহাসের শ্যামল ছায়ায় মিশে থাকবেন সমগ্রকাল।

মুক্তিযুদ্ধে রায়পুরা

তিন নদীর বাহুবন্ধ পললে গঠিত রায়পুরায় সুপ্রাচীনকাল থেকেই গড়ে ওঠেছিলো কৃষিশিল্প। পরে তাঁতশিল্পে সমৃদ্ধ হয় এই জনপদ। সামন্ত যুগে ও জমিদারি ব্যবস্থায় অনেক জমিদার, অমাত্য, ভূ-স্বামী, তালুকদার, সামন্তপ্রভু পালাক্রমে শাসন ও শোষণ করেছেন এই রায়পুরাকে। তাই মুক্তিযুদ্ধের পূর্বেই এই মাটির মানুষ লড়াই-সংগ্রাম করেছে জমিদারি প্রথার বিরুদ্ধে, নীল চাষের বিরুদ্ধে, ইজারা প্রথার বিরুদ্ধে ও জলমহাল ইজারার বিরুদ্ধে, সর্বোপরি শোষণ ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে। এই মাটি কালে কালে হয়েছে আন্দোলন ও লড়াই-সংগ্রামের অগ্নিগর্ভ, বঞ্চিত মানুষ হয়েছে অধিকার সচেতন, হয়েছে সাহসী ও সংগ্রামী।

লড়াই-সংগ্রামে, বিদ্রোহ-বিপ্লবে রায়পুরার মাটি ও মানুষ যখন ঋদ্ধ-সমৃদ্ধ, দগ্ধ-বিদগ্ধ, তীব্র তাঁতানো, ঠিক ঐ-সময়ই বেজে ওঠে স্বাধীনতা সংগ্রামের মহাঢঙ্কা। ভাষা আন্দোলনের বারুদপোড়া রক্তের তেজ, বাষট্টির হামুদুর রহমান শিক্ষা কমিশন বিরোধী আন্দোলন, ছেষট্টির ছয়দফা আন্দোলন বেয়ে জাতীয় আন্দোলন যখন ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের দিকে ধাবিত হচ্ছিলো, রায়পুরা তখন তেঁতে ওঠেছিলো সেই আন্দোলনের অগ্নিচ্ছটায়।

বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণেই মুক্তিযুদ্ধের স্পষ্ট দিক-নির্দেশনা পাওয়া যায়। প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো, তোমাদের যা কিছু আছে, তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে… মনে রাখবা, রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দেবো। এ-দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাআল্লাহ…— এসব কথায়ই মুক্তিযুদ্ধের দিক-নির্দেশনা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ৭ মার্চের পর থেকেই রায়পুরার সংগ্রামী জনতা, মুক্তিকামী মানুষ যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুত হতে থাকে। রায়পুরার স্থানীয় নেতৃবৃন্দ ছাত্র, যুবক, জনতা, কৃষক, কামার, কুমার সবাইকে উদ্বুদ্ধ করতে লাগলেন। প্রাথমিক পর্যায়ে আড়াই হাত লম্বা বাঁশের লাঠি হাতে চললো গোপন প্রশিক্ষণ।

রায়পুরায় সবচেয়ে ভয়াবহ যুদ্ধ হয়েছে রামনগরের পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে। ডিসেম্বরের ৬ তারিখ থেকে ৩/৪ দিনব্যাপী রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে উভয়পক্ষের অনেক যোদ্ধা নিহত হয়। ব্রহ্মপুত্রের পশ্চিমপাড় থেকে মিত্রবাহিনি ও মুক্তিবাহিনি যৌথ আক্রমণ চালায় পাকবাহিনির ঘাটিতে। অপর পাড়ে জগন্নাথপুর, নদীর তীরে পাকবাহিনির ঘাঁটি লক্ষ্য করে অবিরাম গোলাবর্ষণ করে মিত্রবাহিনি। পাশাপাশি শুরু করে বিমান হামলা। দুই ধরনের আক্রমণের মুখে পাকসেনাদের প্রতিরোধ ব্যূহ ভেঙে তছনছ হয়ে যায়।

আর কে আর এম উচ্চ বিদ্যালয় মাঠ, পিরিজকান্দি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠ, লক্ষ্মীপুর উচ্চ বিদ্যালয় মাঠ, রাজারবাগ উচ্চ বিদ্যালয় মাঠ, নারায়ণপুর সরাফত আলী উচ্চ বিদ্যালয় মাঠ, পলাশতলী বাজার সংলগ্ন মাঠ ও রহিমাবাদের একটি খোলা জায়গায় প্রশিক্ষণ চলতো প্রাথমিকভাবে। ইপিআর ও সেনাবাহিনির অবসরপ্রাপ্ত সদস্যরা এসব ক্যাম্পে প্রশিক্ষণ দিতেন ছাত্র-যুবকদের। পিরিজকান্দির তালেব হোসেন, কাঙ্গালিয়ার লাল মিয়া, জালালাবাদের সার্জেন্ট (অব.) আব্দুল কাদের, ইদ্রিস কমান্ডার— তাঁরাই প্রশিক্ষণ দিতেন ক্যাম্পে।

একাত্তরে রায়পুরা ছিলো ঢাকা-আগরতলা পথের নিরাপদ ট্রানজিট। একাত্তরে এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহেই অনেক বরেণ্য নেতৃবৃন্দ ঢাকা থেকে রায়পুরা হয়ে নিরাপদে ভারতে গমন করেছেন। তাদের মধ্যে অগ্নিকন্যা মতিয়া চৌধুরী, নারী নেত্রী আয়েশা খানম, বাম রাজনীতিবিদ কমরেড খোকা রায়, জিতেন ঘোষ, বারিণ দত্ত ও জ্ঞান চক্রবর্তী অন্যতম।
৯ এপ্রিল পাকবাহিনি রায়পুরায় প্রবেশ করে। সেদিন তারা ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথ ধরে ভৈরবের দিকে মুভ করে। রায়পুরায় ঢুকতে তারা তেমন কোনো প্রতিরোধের মুখে পড়েনি। পরের দিনই পাকবাহিনি রায়পুরায় ক্যাম্প স্থাপন করে রেললাইনের পাশে (যে-স্থানকে সবাই কলোনি বলে ডাকে)। রায়পুরায় পাকবাহিনি স্থানীয় রাজাকারদের সহযোগিতায় বিভিন্ন জায়গা ও মুক্তিযোদ্ধাদের ঘরবাড়ি রেকি করতে থাকে। পরবর্তীতে হানাদার বাহিনি রায়পুরায় গণহত্যা ও ঘর-বাড়িতে অগ্নিসংযোগ শুরু করলে অনেকেই ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ জায়গায়, বিশেষ করে নদীবেষ্টিত অপেক্ষাকৃত দুর্গম এলাকায় আশ্রয় নেয়, অনেকেই পালিয়ে ভারতে চলে যায়। পাকবাহিনি রাজাকারদের সহযোগিতায় হাশিমপুর মৌলভীবাজারে, মামুদপুর ডাকের বাড়িতে, বাহেরচর খোন্দকার বাড়িতে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট চালায়।

রায়পুরার অনেক ছাত্র-যুবক স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেয় মুক্তিযুদ্ধে। ছাত্র-যুবকরা অনেকেই পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত গমন করে মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং গ্রহণ করে। রায়পুরা এলাকা থেকে এতো বেশি ছাত্র-যুবক ভারতে গিয়েছিলো যে, আগরতলা প্রশিক্ষণ ক্যাম্পগুলো রায়পুরাকে জেলা মনে করতো। এলাকায় বাম রাজনীতির প্রভাব থাকায় অনেক ছাত্র-যুবক ভারতে ট্রেনিং গ্রহণ করে ন্যাপ-সিপিবি-ছাত্র ইউনিয়নের বিশেষ গেরিলা বাহিনি গঠন করে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে।

একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে রায়পুরায় যারা শীর্ষ সংগঠকের ভূমিকা পালন করেছেন, তাঁদের মধ্যে কৃষকনেতা ফজলুল হক খোন্দকার, সাবেক সাংসদ মরহুম আফতাব উদ্দিন ভূঁইয়া, বর্তমান সাংসদ ও সাবেক মন্ত্রী রাজিউদ্দিন আহমেদ রাজু, গয়েছ আলী মাস্টার, কমরেড শামসুল হক, কমরেড বাবর আলী মাস্টার, আফজাল হোসাইন, আব্দুল হাই (চর উজিলাব), খালেক মাস্টার (পাহাড় উজিলাব), সাইদুর রহমান সন্দু মিয়া, আব্দুল বাছেদ চৌধুরী (ভেলুয়ারচর), বজলুর রহমান (আলীনগর) ও সুভাষ সাহা (রহিমাবাদ) প্রমুখ অন্যতম।

একাত্তরে অস্ত্র হাতে রায়পুরার যে-সকল সাহসী বীরপুরুষ হানাদার বাহিনির বিরুদ্ধে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে বীর মুক্তিযোদ্ধা গয়েছ আলী মাস্টার (থানা কমান্ডার), জয়ধর আলী ভূঁইয়া (গ্রুপ কমান্ডার), শহীদ সুবেদার মেজর আবুল বাশার (বীরপ্রতীক), কমান্ডার নজরুল ইসলাম (যুদ্ধাহত), আফজাল হোসাইন, জালাল উদ্দিন ভূঁইয়া, হারুন-অর-রশীদ, সুবেদার আব্দুল ওয়াহিদ (গ্রুপ কমান্ডার), ইদ্রিস হাবিলদার (গ্রুপ কমান্ডার), নূরুজ্জামান জহির (গ্রুপ কমান্ডার), সুবেদার আজিম চৌধুরী (গ্রুপ কমান্ডার), মো. শহীদ উল্লাহ, সাদত আলী মোক্তার (জাহাঙ্গীরনগর), সাহাবুদ্দিন, কর্পোরাল শাহজাহান, কর্পোরাল মো. নূরুল হক, সিপাহি সোহরাব হোসেন, শহীদ আব্দুস সালাম কাওসার (গ্রুপ কমান্ডার), হাবিলদার মোবারক হোসেন, বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ সাহাবুদ্দিন নান্টু (বীরবিক্রম), শহীদ আমান খান, শহীদ বশিরুল ইসলাম, শহীদ জহিরুল হক দুদু, শহীদ এ কে এফ এম শামসুল হক ডেপুটি, জলিলুর চৌধুরী মন্টু (গ্রুপ কমান্ডার), গোপাল চন্দ্র সাহা (গ্রুপ কমান্ডার), আবু সাইদ সরকার (গ্রুপ কমান্ডার), মজনু মৃধা, নূরুল ইসলাম কাঞ্চন, কাজি হারুন-অর-রশিদ ও খন্দকার শাহ আলম অন্যতম। আরো অনেক সাহসী ছাত্র-যুবক যুদ্ধে অংশ নিয়েছেন, যাঁদের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে ইতিহাসের পাতায়। ক্ষুদ্র পরিসরে আমাদের সকল বীর মুক্তিযোদ্ধাদের নাম লেখা সম্ভব নয়।

রায়পুরায় স্থানীয় উদ্যোগেও মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে। ইপিআর ও বেঙ্গল রেজিমেন্টের সদস্যরা এবং ন্যাপ-সিপিবি-ছাত্র ইউনিয়নের মুক্তিযোদ্ধারা রায়পুরার বিভিন্ন স্থানে মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্প স্থাপন করেছিলেন। নারায়ণপুরে বাবর আলী মাস্টারের বাড়িতে, গোকূলনগরে মান্নান মাস্টারের বাড়িতে, জালালাবাদে বলরাম সাহার বাড়িতে, চর উজিলাব’র আব্দুল হাইয়ের বাড়িতে ও হাইরমারা গ্রামে মুক্তিযোদ্ধারা ক্যাম্প স্থাপন করেছিলেন।

একাত্তরে বৃহত্তর রায়পুরায় (২৮ ইউনিয়ন) অনেকগুলো রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ হয়েছে। এসবের মধ্যে বেলাব বড়িবাড়ির যুদ্ধ, হাটুভাঙ্গার যুদ্ধ, বাদুয়ারচর রেলওয়ে ব্রিজের যুদ্ধ, রামনগরের যুদ্ধ, বাঙালিনগরের যুদ্ধ, হাইরমারায় ক্যাম্প আক্রমণ, ব্রজভাঙ্গার যুদ্ধ, তেলিপাড়ার যুদ্ধ, রায়পুরা থানার অস্ত্র লুণ্ঠন, মেথিকান্দা কলোনির যুদ্ধ অন্যতম। এছাড়াও মুক্তিযোদ্ধা ও পাক হানাদার বাহিনির মধ্যে বিচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন স্থানে আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণ হয়েছে। মুক্তিসেনারা ঢাকা-চট্টগ্রাম রেল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করার জন্যে একাত্তরের মাঝামাঝি সময়ে আশারামপুরের কাছে ব্রজভাঙ্গার রেলব্রিজ উড়িয়ে দেয় ডিনামাইট দিয়ে। ফলে হানাদার বাহিনির রেলপথে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। এই ঘটনায় পাকবাহিনি ক্ষুব্ধ হয়ে ব্রিজের পাশের গ্রাম শ্যাওড়াতলীতে আগুন দেয়। ব্যাপক ধর-পাকড় চালায়।
একাত্তরের ৩১ মে রেলপথে কয়েকটি বগি বোঝাই পাকসেনার নরসিংদী থেকে ভৈরবের দিকে যাওয়ার খবর শুনে মুক্তিবাহিনি শ্রীনিধি রেলস্টেশনের অদূরে মাইন স্থাপন করে। কিন্তু সেই মাইন স্থাপনের ঘটনা কীভাবে যেন টের পেয়ে যায় পাকসেনারা। ট্রেন আউট সিগনালে থামিয়ে পাকসেনারা স্টেশন মাস্টারের কাছে এলে স্টেশন মাস্টার চিৎকার দিয়ে বলেন, মন্টু ভাই, আর্মি আইছে। পাকসেনারা স্টেশন মাস্টার মওলা আলী দেওয়ানকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায় আশুগঞ্জ (৩১ মে) এবং পরের দিন (১ জুন) তাকে নির্মমভাবে হত্যা করে।

স্থানীয় রাজাকারদের সহযোগিতায় পাকসেনারা প্রায় প্রতিদিনই গ্রামে ঢুকে নিরীহ মানুষ ধরে আনতো মেথিকান্দার ক্যাম্পে। পাকসেনাদের মেথিকান্দা ক্যাম্পের প্রধান ছিলেন মেজর মঞ্জুর। সারারাত তাদের উপর চলতো অমানুষিক নির্যাতন। ভোরের দিকে তাদের রেললাইনের পাশে বধ্যভূমিতে নিয়ে গিয়ে গণহারে হত্যা করা হতো। পাকসেনারা প্রায়ই বিভিন্ন গ্রাম থেকে ধরে আনতো যুবতী মেয়েদের। তাদের উপর চলতো পাশবিক নির্যাতন। মাঝে মাঝে তাদের আর্তনাদ অনেক দূর থেকে শোনা যেতো বলে জানান মেথিকান্দা সেনাক্যাম্পের তৎকালীন কেয়ারটেকার জাফর।

পাকসেনারা স্থানীয় রাজাকারদের নিয়ে প্রায়ই বিভিন্ন গ্রামে ঢুকে লুটে নিতো হাঁস-মুরগী-গরু-ছাগল। এসব লুটের ভাগ রাজাকাররাও পেতেন। রায়পুরায় পাকসেনাদের সহযোগিতা করেছিলো স্থানীয় রাজাকারেরা। একাত্তরে রায়পুরায় যারা শান্তি কমিটি গঠন এবং নেতৃত্ব দিয়েছিলো, তাদের মধ্যে আব্দুল মতলেব ভূঁইয়া, মাওলানা খলিল উল্লাহ, সাঈদ উদ্দিন চৌধুরী, ময়ধর আলী, আব্দুল জলিল, আবু সাঈদ পণ্ডিত অন্যতম। তারা মুক্তিযোদ্ধাদের গোপন খবর, উপস্থিতি, কার্যক্রম, মুক্তিযোদ্ধা গ্রেফতারে সহযোগিতা, ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগে সহযোগিতা, পথ-ঘাট চিনিয়ে দেয়া, এলাকার পরিস্থিতি সম্পর্কে আগাম খবর দেয়া, ক্যাম্পে যুবতী নারী সরবরাহ, খাবার সরবরাহসহ নানাভাবে সহযোগিতা করতো পাকবাহিনিকে। একাত্তরের মাঝামাঝি সময় থেকে আমাদের বীর সাহসী মুক্তিযোদ্ধারা পাকবাহিনির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। মুক্তিযোদ্ধারা ধীরে ধীরে সংগঠিত হয়ে পাল্টা গুপ্ত হামলা শুরু করে বিভিন্ন স্থানে। মুক্তিবাহিনির একটি সফল অ্যাম্বুশ যুদ্ধ হলো হাটুভাঙ্গার যুদ্ধ। একাত্তরের ডিসেম্বরে পাকসেনারা রেললাইন ধরে পিছু হটার সময় হাটুভাঙ্গায় মুক্তিবাহিনির অ্যাম্বুশে পড়ে মারা যায় ৩০/৩৫ জন পাকসেনা। ব্রজভাঙ্গা ব্রিজের উপরও পাকসেনাদের উপর আক্রমণ চালায় আমাদের সাহসী মুক্তিযোদ্ধারা। সে-যুদ্ধে রাজাকার ময়ধর আলীসহ নিহত হয়েছিলো ৫/৬ জন পাকসেনা। বাদুয়ারচর ব্রিজের কাছেও তুমুল যুদ্ধ হয়েছে পাকসেনাদের সাথে। সেখানে নিহত হয়েছিলো কয়েকজন পাকসেনা। তবে বেলাব বড়িবাড়ির যুদ্ধ ছিলো আরো ভয়াবহ। সেই যুদ্ধে মুক্তিবাহিনির গ্রুপ কমান্ডার সুবেদার মেজর আবুল বাশারসহ ৮/৯ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। সেটি ছিলো মুক্তিযোদ্ধাদের অনেকটা ব্যর্থ অপারেশন। তেলিপাড়া যুদ্ধে ১০/১২ জন পাকসেনা খতম করেন মুক্তিযোদ্ধারা। মে মাস থেকে পাকসেনারা ভৈরব থেকে অবিরাম শেল নিক্ষেপ করতে থাকে। এতে অনেক জনসাধারণ আহত-নিহত হয়েছে, ঘরবাড়ি-গবাদিপশু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একাত্তরে হিন্দুদের ঘরবাড়িতে হামলা ও অগ্নিসংযোগ ছিলো এক ভয়াবহ ঘটনা। জুলাই মাসের মাঝামাঝি কড়ইতলা গ্রামের দুই হিন্দু লোককে পাকবাহিনি ধরে নিয়ে মেরাতলীর রেলব্রিজে দাঁড় করিয়ে গুলি করে হত্যা করে।

রায়পুরায় সবচেয়ে ভয়াবহ যুদ্ধ হয়েছে রামনগরের পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে। ডিসেম্বরের ৬ তারিখ থেকে ৩/৪ দিনব্যাপী রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে উভয়পক্ষের অনেক যোদ্ধা নিহত হয়। ব্রহ্মপুত্রের পশ্চিমপাড় থেকে মিত্রবাহিনি ও মুক্তিবাহিনি যৌথ আক্রমণ চালায় পাকবাহিনির ঘাটিতে। অপর পাড়ে জগন্নাথপুর, নদীর তীরে পাকবাহিনির ঘাঁটি লক্ষ্য করে অবিরাম গোলাবর্ষণ করে মিত্রবাহিনি। পাশাপাশি শুরু করে বিমান হামলা। দুই ধরনের আক্রমণের মুখে পাকসেনাদের প্রতিরোধ ব্যূহ ভেঙে তছনছ হয়ে যায়। এই যুদ্ধে ৪০/৫০ জন পাকসেনা নিহত হয়। অন্যদিকে মিত্রবাহিনি ও মুক্তিসেনা নিহত হয় ১০/১২ জন। মিত্রবাহিনির নিহত হিন্দু সৈনিকদের রায়পুরার দৌলতকান্দি এনে দাহ করা হয়।

নভেম্বরের শেষদিকে মিত্রবাহিনি, মুক্তিযোদ্ধা ও সাধারণ মানুষের সম্মিলিত প্রতিরোধের মুখে পাকসেনাদের আক্রমণ ও অভিযান ক্রমশ থিতিয়ে আসে। সর্বশেষ ও চূড়ান্ত পর্যায়ের যুদ্ধে বাংলাদেশের পূর্ব রণাঙ্গণে মুক্তিবাহিনি ও মিত্রবাহিনির যৌথ ও তীব্র আক্রমণে টিকতে না পেরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনি ভৈরব ও তার আশেপাশের এলাকায় অবস্থান নিতে থাকে। ঊর্ধ্বতন কমান্ডারের নির্দেশ মোতাবেক, পাকবাহিনি যাতে ঢাকার দিকে পলায়ন করতে না পারে, সেজন্যে রায়পুরা থানার পূর্বাঞ্চলে ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনার তীরবর্তী এলাকায় ৬ ডিসেম্বর থেকে মুক্তিবাহিনি ব্যারিকেড ও প্রতিরোধ ঘাঁটি স্থাপন করে এবং তুমুল আক্রমণ চালায়। ৯ ডিসেম্বর চতুর্থ গার্ড রেজিমেন্ট হেলিকপ্টারে রায়পুরার পূর্ব-দক্ষিণ এলাকায় অবতরণ করতে থাকে। ১০ ডিসেম্বর ভারতীয় ১০ বিহার রেজিমেন্ট ও ১৮ রাজপুত রেজিমেন্ট রায়পুরায় পৌঁছায় এবং স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে যৌথ আক্রমণ চালায়। ফলে পাকসেনারা নরসিংদী হয়ে ঢাকার দিকে পলায়ন করে এবং রায়পুরা হানাদার মুক্ত হয়। তারিখটি ছিলো ১০ ডিসেম্বর।
প্রকৃতপক্ষে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ছিলো একটি জনযুদ্ধ। এ-যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন আবালবৃদ্ধবণিতা। অনেক গরীব মানুষ নিজেরা অভুক্ত থেকে খাবার তুলে দিয়েছিলেন অভুক্ত মুক্তিযোদ্ধাদের মুখে। অনেক মা-বোন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দিয়েছেন, নিরাপদে রেখেছেন, গোপনে খাবার সরবরাহ করেছেন। এক টুকরো পোড়া আলু, সেদ্ধ শালুক, চটা পিঠার কণা দিয়ে আপ্যায়ন করেছেন অভুক্ত মুক্তিযোদ্ধাদের। আড়ালে পড়ে থাকা গণমানুষের এমন ত্যাগ-তিতিক্ষাকে ক্ষুদ্র করে দেখার কোনো অবকাশ নেই। তাই আমাদের মুক্তিযুদ্ধ হলো আমাদের জাতিসত্তার এক মৌলিক তাড়না, অস্তিত্বের অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ, নিজস্ব ঠিকানা খোঁজার এক রক্তাক্ত সংগ্রাম।


মহসিন খোন্দকার
সাধারণ সম্পাদক, প্রগতি লেখক সংঘ, নরসিংদী

বেদনা দত্ত : সামাজিক অবহেলার আড়ালে এক বীরাঙ্গনার কথা

0

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ চলছে। দেশব্যাপী চলছে পাকিস্তানি বাহিনীর ধ্বংসযজ্ঞ। আতঙ্ক আর উৎকণ্ঠায় মানুষজন পালিয়ে বেড়াচ্ছে। বাড়িঘর ছেড়ে ছুটছে অজানা গন্তব্যের দিকে। মুক্তিযোদ্ধারা প্রতিরোধ চালিয়ে যাচ্ছে সাধ্যমতো। শহর, বন্দর, স্টেশন, এমনকি গ্রাম থেকে গ্রামে সকল গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় পাকিস্তানি সেনারা স্থাপন করছে তাদের ক্যাম্প। এমনি একটি ক্যাম্প স্থাপিত হয় বর্তমান পলাশ উপজেলার জিনারদী ইউনিয়নের বড়িবাড়ি গ্রামে, বড়িবাড়ি রেলব্রিজের নিচে। মুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমণ থেকে রেলব্রিজটিকে রক্ষার জন্যেই হয়তো এই ক্যাম্পটি স্থাপন করা হয়েছিলো। জিনারদী ইউনিয়নের বরাব-বড়িবাড়িসহ আশেপাশের পুরো এলাকায় মূলত সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বসবাস ছিলো। হানাদার বাহিনীর ক্যাম্প স্থাপনের খবর পেয়ে এলাকার মানুষ পরিবারসহ পালিয়ে যায়। জনশূন্য ভূতুড়ে এক জনপদে পরিণত হয় বড়িবাড়িসহ আশেপাশের গ্রামগুলো। কিন্তু পাক আর্মি ক্যাম্পেরই একদম কাছে একটি বাড়িতে রয়ে যান এক বিধবা নারী; তার এক ছেলেকে নিয়ে। দুই মেয়েকে পাঠিয়ে দেন শিবপুরের এক আত্মীয়ের বাড়িতে। আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশি— সকলেই এলাকা ছেড়েছে। এদিকে বাড়িতে ধান থাকায় নিরুপায় হয়েই সেখানে রয়ে যান মা ও ছেলে। দূরের এক আত্মীয় নৌকাযোগে ধানগুলো নিতে এলেই তারাও সাথে চলে যাবেন, এই আশায় দিন কাটাচ্ছেন।

পাকিস্তানি আর্মির ক্যাম্প স্থাপনের কারণে এলাকায় গোপনে মুক্তিযোদ্ধাদের আনাগোনাও বেড়ে যায়। আশেপাশের বাড়িঘরে মানুষজন না থাকায় স্বভাবতই মুক্তিযোদ্ধারা কোনো প্রয়োজন হলে সেই বিধবা নারীর বাড়িতে এসে উঠতেন। তাছাড়া তার বাড়ির পেছনের জঙলায় লুকিয়ে ক্যাম্পের সেনাদের গতিবিধি নজরে রাখা সহজ ছিলো। ফলে মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে পরিবারটির একরকম সখ্য গড়ে ওঠে। মুক্তিযোদ্ধাদের রান্নাবান্না করে খাওয়াতেনও মাঝে-মধ্যে। পাশাপাশি পাকিস্তানি বাহিনীর বিভিন্ন তথ্য এনে দিতেন। বাড়ির ছোটো ছেলেটিও নানাভাবে সাহায্য-সহযোগিতা করতেন।

হঠাৎ একদিন পাক হানাদার বাহিনীকে এসব কথা জানিয়ে দেন সিরাজুল ইসলাম নামে স্থানীয় এক রাজাকার। এরপরই পাক হানাদার বাহিনী সেই নারীকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যায় তাদের ক্যাম্পে। তিনদিনব্যাপী তার উপর চালায় অমানুষিক নির্যাতন। সেই সাথে গণধর্ষণ। নির্যাতনের তীব্রতা এতোটাই মারাত্মক ছিলো যে, তিনি একদম অচেতন হয়ে পড়েন। পাক বাহিনী মৃত ভেবে তাকে রেল লাইনের পাশেই একটি ডোবায় ফেলে দিয়ে যায়। কতো সময় পর তার জ্ঞান ফেরে, তা তিনি বলতে পারেন না। জ্ঞান ফিরলেও ডোবা থেকে উঠে আসার মতো শারীরিক শক্তি ছিলো না তার। রাতের অন্ধকারে হাতড়ে তা-ও ডোবা পার হতে চেষ্টা করেন। কিন্তু কিছুতেই পাড়ে উঠে আসতে পারছিলেন না। এদিকে মুক্তিযোদ্ধারা আগেই জেনে গিয়েছিলেন তার এই পরিণতির কথা। তারাও নানাভাবে তাকে উদ্ধারের জন্যে তৎপর ছিলেন। পরে মানিক সেন নামে এক মুক্তিযোদ্ধা তাকে সেই ডোবা থেকে উদ্ধার করেন। উদ্ধার করে নিয়ে যান স্থানীয় গ্রাম্য ডাক্তার ময়েশ চন্দ্রের কাছে। চিকিৎসা শেষে আশ্রয় নেন দুই-তিন কিলোমিটার দূরের গোপীরায়েরপাড়ায়, এক আত্মীয়ের বাড়িতে। সেখানে বেশ কিছুদিন থেকে কিছুটা সুস্থ হয়ে ওঠেন। পরবর্তীতে চলে যান শিবপুরের আজকিতলায়, আরেক আত্মীয়ের বাড়ি। যুদ্ধের বাকি সময় সেখানেই অবস্থান করেন।

রক্ত হিম করা ভয়ঙ্কর অমানবিক এই ঘটনার শিকার সেই নারীর নাম বেদনা দত্ত। শরীরের নানা স্থানে স্পষ্ট ক্ষতচিহ্ন নিয়ে তিনি এখনো বেঁচে আছেন। বাস করছেন সেই বড়িবাড়ি গ্রামের তার নিজ বাড়িতেই। বয়সের ভারে ন্যুব্জ নিপীড়িত এই নারীর জীবনের গল্প যেন আমাদের মনে করিয়ে দেয় স্বাধীনতা যুদ্ধে অজানা অনেক নারীর করুণ পরিণতি আর আত্মত্যাগের বিস্মৃত ইতিহাস।

বীরাঙ্গনা বেদনা দত্ত | ছবি : গঙ্গাঋদ্ধি

বেদনা দত্তের জন্ম ঢাকার কদমতুলি থানা এলাকায়, ১৯৪০ সালে। তাঁর বাবা যোগেন্দ্র দে। ছোটোবেলায়ই বাবা-মাকে হারান তিনি। ১৫ বছর বয়সে নরসিংদীর পলাশ উপজেলার জিনারদী ইউনিয়নের বড়িবাড়ি গ্রামের এই বাড়িতে নরেন্দ্র দত্তের সাথে বিয়ে হয় তাঁর। সংসার জীবনে তাঁদের এক ছেলে— গোপাল দত্ত এবং দুই মেয়ে— জ্যোসনা দত্ত ও মল্লিকা দত্তের জন্ম হয়। কিন্তু আকস্মিকভাবে নরেন্দ্র দত্ত অসুস্থতাজনিত কারণে মারা যান ১৯৬৯ সালে। তিন সন্তান নিয়ে বিধবা বেদনা দত্ত মহাবিপদে পড়েন। তবুও কষ্টে-সৃষ্টে চালিয়ে নিচ্ছিলেন সংসার।

এরই মধ্যে শুরু হয় আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ। শুরু হয় পাকিস্তানি বাহিনীর তাণ্ডব। শুরু হয় আমাদের প্রতিরোধ যুদ্ধ। সেই সাথে পলাশের বড়িবাড়ি গ্রামে বেদনা দত্তের সাথে ঘটে যায় নির্মম সেই ঘটনা।

একসময় আমরা স্বাধীন হই। কিন্তু বেদনা দত্তের ভাগ্য পরিবর্তিত হয় না। পাক হানাদার বাহিনীর নির্যাতনের শিকার হওয়ার কারণে সমাজের মানুষের কাছে তিনি অবহেলিত হতে থাকেন। মানুষের কটু কথা আর একঘরে করে রাখার তৎপরতায় বিষিয়ে ওঠে তাঁর জীবন। শুধু তা-ই নয়, যুদ্ধের সময় দুই বছর বয়সী শিশুকন্যা মল্লিকা দত্ত পাক হানাদার বাহিনীর নির্যাতনের ফলে জন্ম নিয়েছে, এমন গুজবে আজো তাঁর বিয়ে দিতে পারেননি। ছেলে গোপাল দত্তই উপার্জনক্ষম একমাত্র ব্যক্তি। তিনি কৃষিকাজ ও গবাদিপশু পালন করেই সংসার চালাচ্ছিলেন।

বীরাঙ্গনা বেদনা দত্তের ছেলে গোপাল দত্ত | ছবি : গঙ্গাঋদ্ধি

এভাবেই দুঃখ-দুর্দশা, ক্ষুধা আর দারিদ্র্যকে সাথে নিয়ে চলছিলো বেদনা দত্তের জীবন। ইতোমধ্যে কেটে গেছে স্বাধীনতার ৫০ বছর। মুক্তিযোদ্ধাসহ বীরাঙ্গনা নারীদের বহু তালিকা হয়েছে। তাঁদের সম্মাননা-ভাতা-বাড়িঘর দেয়া হয়েছে। সমাজের মূল স্রোতে তাঁদের ফিরিয়ে আনার নানা তৎপরতা গ্রহণ করা হয়েছে। কিন্তু ক্ষমতাসীন নানা সরকারসহ সমাজের কেউই বড়িবাড়ির বীরাঙ্গনা বেদনা দত্তের দুর্দশা লাঘবে এগিয়ে আসেনি।

তখন ২০২১ সাল। নরসিংদীর একজন সাংবাদিক শরীফ ইকবাল রাসেল (বাংলা টিভি) কোনোভাবে জানতে পারেন তাঁর সেই ঘটনা এবং করুণ জীবনযাপনের কথা। তিনি স্বপ্রণোদিত হয়ে বহু চড়াই-উতরাই পেরিয়ে খুঁজে বের করেন সুবিধাবঞ্চিত বেদনা দত্ত, তাঁর পরিবার ও বাড়িঘর। তিনি জানান, “প্রথম যেদিন বেদনা দত্তের বাড়ি আবিষ্কার করি, সেদিন বাড়ির উঠোনে উঠে দেখি, বেদনা দত্তের মেয়ে মল্লিকা দত্ত গ্রামের কোনো মাঠ থেকে কলমি তুলে এনেছেন। পাশেই চুলায় পানি গরম হচ্ছে। কলমি সিদ্ধ করে তাঁরা দুপুরে খাবে।” এই দুরাবস্থা, ভাঙা বেড়ার ঘর দেখে ও তাঁদের সাথে কথা বলে তিনি মর্মাহত হন এবং বেদনা দত্ত ও তাঁর পরিবারের হেন অবস্থা নিয়ে একের পর এক নিউজ করতে থাকেন। পাশাপাশি নিজেই প্রশাসনের লোকজনের সাথে যোগাযোগ করে নানা জায়গায় চেষ্টা-তদবির চালাতে থাকেন। অবশেষে তিনি ঊর্ধ্বতন প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সমর্থ হন।

সমাজের প্রভাবশালীদের কাছ থেকে প্রতিনিয়ত অবহেলিত বেদনা দত্তকে অবশেষে স্বাধীনতার ৫০ বছর পর ২০২১ সালের ডিসেম্বরে ‘বীরাঙ্গনা’ স্বীকৃতি দেয়া হয়। মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের সহযোগিদের হাতে নির্যাতিত হওয়ায় বীরাঙ্গনা বেদনা দত্তকে মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতি দিয়ে গেজেট জারি করে তৎকালীন সরকার। জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের (জামুকা) ৭৩তম সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বীরাঙ্গনা বেদনা দত্ত এই স্বীকৃতি পান। তখনো পর্যন্ত মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতি পাওয়া বীরাঙ্গনার সংখ্যা ২৭২ জন।

তখন থেকে সরকারি ভাতা এবং আরো পরে বাড়ি বরাদ্দ পান বেদনা দত্ত। কিন্তু ধীর গতির কাজ, ঠিকাদারদের অবহেলা আর নানা জটিলতায় বাড়ি নির্মাণ আটকে ছিলো দীর্ঘদিন। অবশেষে ২০২৩ সালে দুইটি শোবার ঘর, দুইটি টয়লেট, কিচেন, বসার ঘর ও বারান্দা সম্বলিত নবনির্মিত বাড়িতে থাকতে শুরু করেন তিনি। বাড়িতে সরকারিভাবে বিদ্যুৎ, পানি ও আনুষঙ্গিক সুযোগ-সুবিধাও প্রদান করা হয়।

যুদ্ধের সময় মুক্তিরা আমগো বাড়িত আইতো। দিনে নানান জাগায় যাইতো। রাইতে খাওয়ার সময় অইলে আইতো। আমি রাইন্ধা-বাইড়া দিতাম। ভাত দিতাম, মাঝে-মইধ্যে রুটি বানায়া দিতাম। যন্ত্রপাতি আগায়া দিতাম। রেললাইনে ক্যাম্প করছিলো পাঞ্জাইব্যারা। এক রাজাকার আমার কথা তাগো কাছে কইয়া দিছে। বাড়িত আমি আর আমার ছেলে থাকতাম। বাড়ির ভিত্রে আইয়া আমারে ধরছে আর আমার পোলায় সামনেই পানি আছিলো, লাফ দিয়া পানিত পইড়া গেছে। তো আমারে লইয়া গেছে ক্যাম্পে। নিয়া আটকাইয়া রাখছে, লাত্থি দিছে, মাইরধর করছে ইচ্ছামতো। আর অত্যাচার করছে তিন-চাইর দিন ধইরা। আরো অনেক লোকে মিল্যাও অত্যাচার করছে।

বেদনা দত্ত ও তাঁর পরিবারের বর্তমান অবস্থা জানতে এবং স্বচক্ষে অবলোকন করতে আমরা যাই তাঁর বাড়িতে। চরনগরদী বাজার হয়ে বরাব মন্দির পেরিয়ে ছোটো একটি কালভার্টের পরেই হাতের বামদিকে চলে গেছে ছোট্টো পাকা সড়ক। সড়কটি বেদনা দত্তের বাড়ি পেরিয়ে একদম রেললাইন পর্যন্ত গিয়ে শেষ হয়েছে। সড়কটির নামকরণ করা হয়েছে ‘বীরাঙ্গনা বেদনা দত্ত সড়ক’ নামে। জানতে পারি, তাঁর সম্মানেই বেহাল সড়কটি নতুন রূপ ধারণ করেছে। তবে এখনো সড়কের নামফলক বসানো হয়নি।

বাড়িতে ঢুকেই বেদনা দত্তকে দেখতে পাই। উঠোনে বসে আছেন মাথা নিচু করে। ৮৫ বছর বয়স্ক বীরাঙ্গনা এই নারী অনেকটাই অসুস্থ এখন। সোজা হয়ে চলতে পারেন না। তাঁর পুত্র গোপাল দত্তের স্ত্রী স্বর্ণা দত্ত ও মেয়ে রাখি দত্ত চেয়ার পেঁতে আমাদের বসতে দেন। আন্তরিকভাবে আমাদের গ্রহণ করায় শুরু থেকেই আমরা আলাপে ঢুকে পড়ি। বেদনা দত্তের বয়স্ক কণ্ঠ আমাদের ইতিহাসের গভীরে নিবদ্ধ রাখে অনেকক্ষণ। আমাদের জানান একাত্তর সালের ভাদ্র মাসে তাঁর সাথে ঘটে যাওয়া অমানবিক ঘটনার নির্যাস। তবে অসুস্থ থাকায় খুব বেশিক্ষণ বলতে পারলেন না। তিনি বলেন, “যুদ্ধের সময় মুক্তিরা আমগো বাড়িত আইতো। দিনে নানান জাগায় যাইতো। রাইতে খাওয়ার সময় অইলে আইতো। আমি রাইন্ধা-বাইড়া দিতাম। ভাত দিতাম, মাঝে-মইধ্যে রুটি বানায়া দিতাম। যন্ত্রপাতি আগায়া দিতাম। রেললাইনে ক্যাম্প করছিলো পাঞ্জাইব্যারা। এক রাজাকার আমার কথা তাগো কাছে কইয়া দিছে। বাড়িত আমি আর আমার ছেলে থাকতাম। বাড়ির ভিত্রে আইয়া আমারে ধরছে আর আমার পোলায় সামনেই পানি আছিলো, লাফ দিয়া পানিত পইড়া গেছে। তো আমারে লইয়া গেছে ক্যাম্পে। নিয়া আটকাইয়া রাখছে, লাত্থি দিছে, মাইরধর করছে ইচ্ছামতো। আর অত্যাচার করছে তিন-চাইর দিন ধইরা। আরো অনেক লোকে মিল্যাও অত্যাচার করছে। কোনো খাওয়া-দাওয়া আছিলো না। কতো আর সহ্য করমু? পরে আমি অজ্ঞান হইয়া পড়ছি। হ্যারা মনে করছে, আমি মনে হয় মইরা গেছি নাকি কী চিন্তা কইরা আমারে লাইনের পাড় ফালায়া দিছে। আমার যহন কিছু জ্ঞান আইছে, তহন ভোর রাইত। আমি পলাইতে গিয়া খালের এই পাড় আইছি কোনোমতে। পরে মুক্তিরা দেখছে। পরে আমারে তুলছে। তুইল্যা ডাক্তরের কাছে নিছে। পরে আমি শিবপুর গেছিগা। স্বাধীনের পরে আবার বাইত আইছি।”

যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে তাঁর প্রতি পাড়া-প্রতিবেশি ও আত্মীয়-স্বজনদের দৃষ্টিভঙ্গি ও আচরণ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি জানান, “এহনো মানুষ আমারে নিয়া নানান কথা কয়। আমার একটা মাইয়্যা আছে, বিয়া দিতারি নাই তো। মাইনষের আজগুবি কথায় আমার মাইয়্যাডার বিয়া অইছে না।”

বীরাঙ্গনা বেদনা দত্তের ছোটো মেয়ে মল্লিকা দত্ত | ছবি : গঙ্গাঋদ্ধি

সমাজের এমন নিগ্রহে রাগ-দুঃখ প্রকাশ করলেও শেষে তিনি জানান যে, তাঁর আত্মত্যাগ আর সন্তানদের দুর্গতির বিনিময়ে হলেও এই দেশের মানুষ যে মুক্ত হয়েছে, সেই কারণে তিনি গর্ববোধ করেন।

বেদনা দত্তের বিচলিত কণ্ঠ নেমে আসে ধীরে ধীরে। আমরা অপেক্ষা করি গোপাল দত্ত ও মল্লিকা দত্তের জন্যে। তাঁরা পারিবারিক কাজে জিনারদী বাজারে অবস্থান করছিলেন। ততোক্ষণে রেললাইনসহ আশেপাশের এলাকা ঘুরে দেখি। স্বচক্ষে দেখে আসি বড়িবাড়ি রেলব্রিজ ও পাকিস্তান আর্মির ক্যাম্প স্থাপনের জায়গাটি। ঘণ্টাখানেক পর দুই ভাই-বোন একসাথে এসে হাজির হন বাড়িতে। তাঁদের সাথে কথা বলে জানতে পারি একাত্তরসহ পরবর্তী আরো নানা ঘটনা। যুদ্ধের সময় গোপাল দত্তের বয়স ছিলো ১২, তাঁর বোন জ্যোসনা দত্তের ৮ এবং মল্লিকা দত্তের ২। অল্প বয়সে দেখা যুদ্ধ ও তাঁর পরিবারের দুর্দশার কথা আমাদের বর্ণনা করেন গোপাল দত্ত। সেই সাথে যুদ্ধ-পরবর্তী স্বাধীন দেশে সামাজিক নিগ্রহ ও অর্থনৈতিক দুরাবস্থার চিত্রও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “যুদ্ধের পরে যহন বাড়িতে আসি, আইসা দেখি যে, বাড়ির চারপাশে বড়ো বড়ো ঘাস। বেড়া বিভিন্ন দিক দিয়া ভাঙ্গা, কিন্তু বাড়িটা পাইছি। …আর এলাকার মানুষও ফেরত আইছে। সবাই ঘটনাটা জানছে। এলাকায় আমার মায়ের নামে অনেক বদনাম ছড়াইয়া যায়। কেউ কিছু হইলেই কইতো, তোর মারে পাকিস্তানিরা ধইরা নিছে, এই করছে সেই করছে। আমার খারাপ লাগতো অনেক। কিন্তু কিছু কইতে পারতাম না। তবে এহন কেউ আর আগের মতো করে না। ’২১ সালে সম্মানটা পাওয়ার পরে আর কেউ কিছু কয় না।”

স্বাধীনতার ৫০ বছর পার হলেও তাঁরা কেন এতোদিন সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত ছিলেন, এমন প্রশ্নের জবাবে জানান, “আমরা আসলে সরকারি ভাতা সম্পর্কে এতোটা জানতাম না। জানতাম, খালি মুক্তিযোদ্ধাগোরে ভাতা দেয়। আর কেউ কোনো-সময় আমগোরে কিছু কয়ও নাই। চার-পাঁচ বছর আগে নসন্দী থেকে এক সাংবাদিক আইয়া আমগোর খোঁজ-খবর নেয়। উনিই আমগোরে বীরাঙ্গনা উপাধির কথা জানায়, ভাতার কথা জানায়। পরে পলাশ উপজেলা পরিষদ আর ঢাকা দৌড়াদৌড়ি কইরা কাজটা করি। উপজেলা অফিসারও অনেকবার বাড়িত আইয়া দেইখ্যা ছবি-টবি তুইল্যা নিছে। তো এইভাবেই আসলে সব হইছে।”

গোপাল দত্ত তাঁর মায়ের আত্মত্যাগ নিয়ে গর্ব করেন এবং আমাদের অর্জিত স্বাধীনতাকে সবার উপরে স্থান দেয়ার কথা বলেন। সবশেষে তাঁদের বর্তমান অবস্থা সম্পর্ক তিনি বলেন, “সরকারি যেই ভাতা পাই, সেইটা আমার মা আর বোনের পিছেই খরচ করি। নতুন বাড়িতেও তারা দুইজনেই থাকে। আমরা এই আগের ঘরেই থাকি। এক মেয়ে, এক ছেলে, আমি আর আমার বউ— আমরা চারজন। ছেলে-মেয়ে দুইজনই পড়ালেখা করে। আমি আগে কৃষিকাজ করতাম। কিন্তু এহন শ্বাসকষ্টের কারণে তেমন কোনো কাজ করতে পারি না। আমার একটা গাভী আছে, এটার দুধ বিক্রির টাকা দিয়াই কষ্ট করে চলতেছি।”

বীরাঙ্গনা বেদনা দত্ত ও তাঁর সন্তানদের এই ত্যাগ ও দুর্দশার চিত্র আমাদের ইতিহাস ও মানসপট থেকে কখনোই হারিয়ে যাবার নয়। অন্ধকারে তাঁরাই আমাদের আলোকরেখা। আমাদের উচিত, ইতিহাসের ধুলোর আস্তরণ মুছে এরকম আত্মত্যাগী চরিত্রদের খুঁজে বের করা এবং তরুণ প্রজন্মের সামনে দেশ গড়ার পাথেয় হিসেবে সর্বদা হাজির রাখা। তাহলেই অর্ধশত বছর ধরে বেদনা দত্তদের ভুলে থাকার দায় হয়তো-বা ঘুচবে, কিছুটা হলেও।


তথ্যসূত্র
১. বেদনা দত্ত, গোপাল দত্ত ও মল্লিকা দত্তের সাক্ষাতকার;
২. সাংবাদিক শরীফ ইকবাল রাসেলের সাক্ষাতকার;
৩. ‘প্রতিদিনের সংবাদ’ ও বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক।

আনোয়ার হোসেনের শহীদী আত্মত্যাগ

আক্রান্ত হলো মুক্তিযোদ্ধাদের একটি ক্যাম্প। প্রায় ৩০-৩৫ জন মানুষকে মাঠের মধ্যে দাঁড় করানো হলো। তাক করা সশস্ত্র বর্বর পাকিস্তানি বাহিনীর বন্দুক। সবাইকে ব্রাশফায়ার করতে উদ্যত। ট্রিগারে হাত। মুহূর্তেই একটি কণ্ঠ কথা বলে ওঠে উচ্চস্বরে। “দাঁড়ান, এখানে সবাই মুক্তিযোদ্ধা নয়। কেবল আমরা পাঁচজন মুক্তিযোদ্ধা। বাকি সবাই সাধারণ জনগণ। এদেরকে ছেড়ে দেন। আমাদের মেরে ফেলেন।” তারপর সবাই চুপ।

সবাই চেয়ে দেখলো কণ্ঠটা কার। আনোয়ারের। সবাই তাঁকে চেনে। শেখেরচরের আনোয়ার হোসেন। অকুতোভয় এক সাহসের নাম। আত্মত্যাগী এক দেশপ্রেমিক। তা না হলে মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়েও মানুষের জীবন বাঁচানোর কর্তব্য ভুলে যেতেন না। এই সাহস আর ত্যাগের শিক্ষা সে গ্রহণ করেছিলো অনেক আগেই। আনোয়ার হোসেন ইন্টারমিডিয়েটে পড়তো নরসিংদী কলেজে। পড়াশোনার পাশাপাশি সামাজিক সংগঠনেও অগ্রণী ভূমিকা পালন করতো। শেখেরচরের ঐতিহ্যবাহী সংগঠন ‘ধূমকেতু সংঘ’ গড়ার পেছনে আনোয়ার হোসেনের চিন্তা, শ্রম, নিষ্ঠা জড়িত ছিলো। দেশমাতৃকার প্রতি মমত্ববোধ, দেশের শত্রুর বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার মনোবাসনা এই সময়েই তাঁর ভেতর প্রোথিত হয়েছিলো। আনোয়ার হোসেনের পিতা মো. মিজানুর রহমান এ-ব্যাপারে তাঁকে উৎসাহ-উদ্দীপনা যোগাতেন।

মো. আনোয়ার হোসেন

আলগী তারিণী ভূঁইয়া বাড়ির ক্যাম্প। অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়। ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেনি তখনো তেমনটা। সুচিন্তিতভাবে এই সময়টাই বেছে নিয়েছে বর্বর পাক হানাদার বাহিনী আর এদেশীয় রাজাকারেরা। যেহেতু রাতেও একবার আশেপাশে ঘোরাঘুরি করে ব্যর্থ চেষ্টা করেছিলো মুক্তিযোদ্ধাদের এই ক্যাম্পটি আক্রমণের।

ভোর। ১৮-১৯ জনের একট দলের ক্যাম্প। দু’-একজন পাহারায়। বাকি সবাই ঘুমে অচেতন। আলগীর আশেপাশের তিনটি গ্রাম ধরে তিন দিক দিয়ে ক্যাম্পটি ঘিরে ফেলে পাকিস্তানি সেনারা। এই ক্যাম্পের অবস্থান রাস্তার সাথে লাগোয়া ছিলো এবং নিরাপত্তার দিক দিয়ে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ছিলো বলে আগেই জানিয়েছিলেন নরসিংদী সদরের সাব কমান্ডার ইমাম উদ্দিন। তিনি সন্ধ্যায় পরিদর্শন করেছিলেন ক্যাম্পটি।

মূলত নরসিংদী সদরের মুক্তিযুদ্ধের সার্বিক দায়িত্বে ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের কমান্ডার নৌ-সৈনিক সিরাজ উদ্দিন আহমেদ, যিনি ন্যাভাল সিরাজ নামে পরিচিত। অকুতোভয় সাহসের মূর্ত প্রতীক ন্যাভাল সিরাজ মুক্তিযুদ্ধের পরে ‘বীর প্রতীক’ খেতাবে ভূষিত হয়েছিলেন। ন্যাভাল সিরাজ এই ক্যাম্প আক্রমণের রাতে বালাপুর ক্যাম্পে অবস্থান করছিলেন। সেখানেও পাক বাহিনী দ্বারা আক্রমণের শিকার হয়েছিলেন।

আলগী, কাঁঠালিয়া আর বালাপুর— মুক্তিযোদ্ধাদের তিনটি ক্যাম্পই আক্রান্ত হয়েছিলো সেই রাতে।

আলগীর তারিণী ভূঁইয়া বাড়ির এই ক্যাম্প আক্রান্ত হয় ১৫ অক্টোবর ভোরের দিকে। আলগী বাজারের দক্ষিণ দিক দিয়ে হানাদার বাহিনী উত্তর, পশ্চিম ও দক্ষিণ— এই তিন দিক দিয়ে ঢুকে ঘিরে ফেলে ক্যাম্পটি। ভাগদীর আওলাদ হোসেন উত্তর দিকে পাহারায় ছিলেন। হঠাৎ উত্তর দিকের ক্যাম্পের খুব কাছে টর্চের আলো ফেলতেই আওলাদ বুঝতে পারে, তারা আক্রান্ত হয়েছে। সাথে সাথেই সে রাইফেলের গুলি ছোঁড়ে। হানাদার বাহিনীও তিন দিক দিয়ে গুলি ছোঁড়ে। আওলাদ আহত হয়ে সংলগ্ন পুকুরে পড়ে যায়। পরের দিন পুকুরেই তাঁর লাশ পাওয়া যায়।

চতুর্দিক থেকে মুহূর্মুহু স্টেনগান আর রাইফেলের গুলির বিকট চিৎকারে ঘুমন্ত-জাগ্রত এই ক্যাম্পের সকল মুক্তিযোদ্ধা আর স্থানীয় এলাকাবাসীর ঘুম উবে গিয়ে দৌড়াদৌড়ির হুলস্থূল লেগে যায়। আনোয়ার হোসেন এ-সময় গুলিতে আহত হয়ে পাশের পুকুরে পড়ে যায়, আওলাদের মতোই। পরে তাঁকে পুকুর থেকে আহত অবস্থায় উপরে তোলা হয়। বেশিরভাগ মুক্তিযোদ্ধারাই পালাতে সক্ষম হয়। কেবল আনোয়ারসহ ৫ জন মুক্তিযোদ্ধা ধরা পড়ে।

সবাইকে মাঠের মধ্যে একত্রে দাঁড় করানো হয়। সাথে এলাকার আরো কিছু মানুষ। সবাইকে একসাথে ব্রাশফায়ার করে এখনি ঝাঁঝরা করে দেয়া হবে।

পরমুহূর্তেই সেই অমোঘ উচ্চারণ, যে-শব্দ আর বাক্যরাশির কারণে বেঁচে গেলো অনেকগুলো নিরীহ প্রাণ। আর পরিচয় পাওয়া গেলো শস্যদায়িনী শ্যামল বাংলামাতার এক সাহসী বীর আনোয়ার হোসেনের। “দাঁড়ান, এখানে সবাই মুক্তিযোদ্ধা নয়। কেবল আমরা পাঁচজন মুক্তিযোদ্ধা। বাকি সবাই সাধারণ জনগণ। মারতে হয় আমাদের মারুন। এদেরকে ছেড়ে দিন।” মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও শেষবেলায় আরো অনেক মানুষের প্রাণ বাঁচানোর চেষ্টায় আনোয়ার হোসেন অন্য সবার থেকে আলাদা হয়ে গেলেন। যদিও প্রত্যেক মুক্তিযোদ্ধারই প্রাণের দাম সমান এই বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্যে। মৃত্যু নিশ্চিত করে বর্বর পাক বাহিনী আনোয়ার হোসেনকে মাঠের এক কাঁঠালগাছে ঝুলিয়ে রেখেছিলো। বাকি পাঁচজনের লাশ মাঠে ছড়ানো ছিলো বৃক্ষচ্যুত পাতার মতো। ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই গ্রামবাসী ক্যাম্পের মাঠে ছয় মুক্তিযোদ্ধাকে এভাবে লাশ হয়ে যেতে দেখে বেদনায় মুষড়ে পড়েন আর মুক্তিযোদ্ধারা লাভ করেন সাহস ও শক্তি। আনোয়ার হোসেনের সহযোদ্ধা বাকি পাঁচ শহীদ মুক্তিযোদ্ধারা হলেন— নেহাব গ্রামের মোহাম্মদ আলী, চাকশালের তাইজউদ্দিন পাঠান, কল্যাণদির সিরাজুল ইসলাম, কামারটেকের আব্দুস সালাম, ভাগদীর আওলাদ হোসেন।

এই সেই তারিণী ভূঁইয়া বাড়ির ক্যাম্প, মাঠ আর কাঁঠাল গাছ। এই গাছে আনোয়ার হোসেনকে মেরে ঝুলিয়ে রেখেছিলো বর্বর পাকিস্তানি বাহিনী। মূল কাঁঠাল গাছটি ৫০ বছরেরও অধিক সময় টিকে ছিলো এখানে। পরে ভেঙে যায়, এবং একই স্থানে নতুন একটা কাঁঠাল গাছের চারা রোপণ করা হয় সেই বিভীষিকাময় ও গৌরবজনক ইতিহাসকে জাগরিত রাখতে। এই চারাটির নিচে মূল গাছের গোড়া এখনো অক্ষত রয়েছে। এই ঐতিহাসিক মাঠে ছয়জন শহীদের স্মরণে একটি স্মৃতিস্তম্ভও নির্মাণ করা হয় জেলা মুক্তিযুদ্ধ কাউন্সিলের সৌজন্যে, ২০১১ সালে। এই স্মৃতিস্তম্ভটির ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন আনোয়ার হোসেনের ভাই বিশিষ্ট শিল্পপতি মো. মোশাররফ হোসেন (সিআইপি) | ছবি : শহিদুল্লাহ পিয়াস

কান্দাপাড়া গ্রামের এক রাজাকার মুক্তিযোদ্ধাদের এই ক্যাম্পটির খোঁজ-খবর পাক বাহিনীকে জানিয়েছিলো, এমনকি পথ দেখিয়ে নিয়ে গিয়েছিলো— এরকম খবর পরদিন থেকেই মানুষের জানা হয়ে গিয়েছিলো। মুক্তিযুদ্ধের পর এই রাজাকারকে মুখে চুনকালি ও মাথা ন্যাড়া করে সারা এলাকা ঘোরানো হয়েছিলো শাস্তি হিসেবে। এই রাজাকারকে মুক্তিযোদ্ধারা মেরে ফেলতেই উদ্যত ছিলো। কিন্তু অনেক গ্রামবাসীর উপর্যুপরি অনুরোধ ও শহীদ আনোয়ার হোসেনের পিতা নিজে ক্ষমা করে দেয়ায় এই লঘু শাস্তি নির্ধারণ করা হয়েছিলো।

শহীদ আনোয়ারের সেই মৃত্যুপূর্ব কাতর আহ্বানে যাদের প্রাণ বেঁচে গিয়েছিলো, সেই সব কৃতজ্ঞ মানুষেরা প্রতি বছর ১৬ ডিসেম্বর শহীদ আনোয়ারের পিতার কাছে এসে দেখা করতো (যতোদিন তিনি বেঁচে ছিলেন), কৃতজ্ঞ চিত্তে শ্রদ্ধা জানাতো এমন বীরের গর্বিত পিতা-মাতাকে। সেই সাথে সর্বদাই স্মরণ করতো আনোয়ার হোসেনের এই আত্মত্যাগকে।

শহীদ আনোয়ার হোসেনকে শেখেরচর মাদরাসা ও ঈদগাহ গোরস্থানে সমাহিত করা হয়েছিলো। প্রতি বছর ১৫ অক্টোবর তাঁর সমাধি ফুলে ফুলে ছেয়ে যায়।

নরসিংদীর মুক্তিযুদ্ধে ন্যাপ-সিপিবি-ছাত্র ইউনিয়ন গেরিলা বাহিনির ভূমিকা

বাঙালি জাতির ইতিহাসে সবচে’ গর্ব এবং গৌরবের অধ্যায় ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা অর্জন। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে সমগ্র জাতি ঐক্যবদ্ধ হয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। ঐতিহাসিক মুজিবনগর সরকার কর্তৃক গঠিত সেনাবাহিনি, ভারতে এবং দেশের অভ্যন্তরে ট্রেনিংপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে জনগণ এই মহান যুদ্ধে নানাভাবে অংশগ্রহণ করে। ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ সামগ্রিক বিবেচনায় ছিলো একটি জনযুদ্ধ।

আওয়ামী লীগ ছাড়াও ন্যাপ (মোজাফফর), ন্যাপ (ভাসানী), কমিউনিস্ট পার্টি এবং বাম ছাত্র সংগঠনগুলো মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। পাকিস্তানের ২৩ বছরের সংগ্রামের ইতিহাসে বাম রাজনৈতিক দল এবং ছাত্র সংগঠনের ভূমিকা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিশেষ করে, ’৬৯-এর গণআন্দোলনে আওয়ামী লীগের ৬ দফার সাথে ছাত্রলীগ-ছাত্র ইউনিয়নের ১১ দফা দাবি আন্দোলনকে চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে যায়। বঙ্গবন্ধু কারাগার থেকে মুক্ত হন। দেশ স্বাধীনতার পথে এগিয়ে যায়।

স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসে সারা দেশের মতো নরসিংদী জেলাও বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করে। নরসিংদী জেলার মুক্তিযুদ্ধে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের সাথে বাম রাজনৈতিক দল এবং ছাত্র সংগঠনের অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক আলোচনার এই অংশে ন্যাপ (মোজাফফর), কমিউনিস্ট পার্টি (মনি সিং) এবং ছাত্র ইউনিয়ন (মতিয়া)-এর যৌথ গেরিলা বাহিনির অবদানের সংক্ষিপ্ত বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধে নরসিংদী কলেজের রয়েছে ঐতিহাসিক অবদান। ১৯৭০-এর কলেজ ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ছাত্র ইউনিয়নের মতিয়া গ্রুপের ভুলু-মুজিব পরিষদ বিজয়ী হয়। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতিপর্বে নরসিংদী কলেজের ছাত্র-শিক্ষকেরা নানাভাবে প্রস্তুতি নিতে থাকে। নরসিংদী কলেজের তৎকালীন অধ্যক্ষ ছিলেন আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার অন্যতম আসামী নৌ-বাহিনির সাবেক কমান্ডার আবদুর রউফ। তিনি ১৯৭১ সালে ভারতে যাওয়ার পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধে ছাত্র-শিক্ষকদের সংগঠিত করাসহ নানাভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। দেশ স্বাধীন হবার পর তিনি কলেজের দায়িত্বে ফিরে এলেও দেশ গড়ার সংগ্রামে অংশ নেয়ার জন্যে অধ্যক্ষের দায়িত্ব ছেড়ে তৎকালীন ন্যাপ (মোজাফফর) রাজনৈতিক দলে যোগদান করেন।

নরসিংদী সদর এবং নরসিংদী কলেজে ন্যাপ (মোজাফফর), ছাত্র ইউনিয়ন (মতিয়া)-এর মুক্তিযুদ্ধকালীন নেতৃত্বে এবং অংশগ্রহণে যাঁরা ভূমিকা রেখেছেন, তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন— হাবিবুল্লাহ বাহার, আবুল হাশিম মিয়া, আতাউর রহমান ভূঁইয়া এবং তৎকালীন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ ছাত্র শহীদুল্লাহ বাহার, নূরুল ইসলাম গেন্দু, আজিজ আহমেদ খান, বি এ রশিদ, আলী আহমেদ, রফিকুল ইসলাম, মজিবর রহমান, সামছুল হক ভূঞা, বদরুজ্জামান বদু ভূঞা, গাজী শাহাবুদ্দিন, যূথিকা চ্যাটার্জী, কার্তিক চ্যাটার্জী। যূথিকা চ্যাটার্জী ও কার্তিক চ্যাটার্জীর বাবা ছিলেন জিনারদীর বিজয় চ্যাটার্জী, যিনি ছিলেন প্রখ্যাত বাম রাজনীতিবিদ এবং যুক্তফ্রন্টের পার্লামেন্ট সদস্য। দেশের কৃষক-প্রজা এবং সাধারণ মানুষের মুক্তির জন্যে জেল-জুলুম-নির্যাতন ভোগ করেছেন। মুক্তিযুদ্ধকালীন দেশে এবং ভারতে অবস্থানকালীন তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে।

হাবিবুল্লাহ বাহারের নেতৃত্বে নরসিংদী সদরের মুক্তিযোদ্ধাদের একটি বড়ো অংশ ভারতে ট্রেনিং গ্রহণ করে দেশে ফিরে যুদ্ধে অংশ নেন। এই দলের অন্যান্য সদস্যরা দেশের অভ্যন্তরে ট্রেনিং গ্রহণ করেন। ট্রেনিংয়ের প্রধান অস্ত্র ছিলো থ্রি নট থ্রি রাইফেল, স্টেনগান, এলএমজি ও হ্যান্ড গ্রেনেড।

দীর্ঘ নয় মাসের যুদ্ধ শেষে ১৯৭১ সালের ১২ ডিসেম্বর নরসিংদী মুক্ত হয়। নরসিংদী মুক্ত হওয়ার গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে ভারতীয় মিত্রবাহিনির সাথে হাবিবুল্লাহ বাহারের নেতৃত্বে মুক্তিবাহিনি নরসিংদী শহরে প্রবেশ করে এবং এই বাহিনির হাতে অনেক রাজাকার (যারা পালাতে পারেনি) আত্মসমর্পণ করে এবং তাৎক্ষণিক সংঘর্ষে বেশ কয়েকজন রাজাকার মৃত্যুবরণ করে।

বিজয়ের প্রাক্কালে এই বাহিনির দুজন মুক্তিযোদ্ধা মতিউর রহমান এবং আবদুল হারিছ শহীদ হন।

মহান মুক্তিযুদ্ধে রায়পুরা-বেলাব অঞ্চলেও বাম রাজনীতিবিদ ও জনগণের বিরাট ভূমিকা রয়েছে। কৃষক আন্দোলনসহ সকল রাজনৈতিক আন্দোলনে রায়পুরা-বেলাব অঞ্চলের অংশগ্রহণ ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছে।

রায়পুরা অঞ্চলে কৃষকনেতা ফজলুল হক খোন্দকার একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের একজন শীর্ষ সংগঠক। ১৯৭১ সালে তাঁর নেতৃত্বে রায়পুরার বহু যুবক-তরুণ মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং গ্রহণ করার জন্যে ভারতে চলে যান এবং ট্রেনিং নিয়ে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। তিনি স্থানীয়ভাবে রায়পুরার ৫ টি স্থানে ছাত্র-যুবকদের মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করেন। তাঁর দলের অন্যতম মুক্তিযোদ্ধারা ছিলেন— আবদুল হালিম, আবদুল কুদ্দুস, পলাশতলীর হাশিম চেয়ারম্যান, রহিমাবাদের সুভাষ সাহা, প্রীতিরঞ্জন সাহা প্রমুখ। এই দলেরই দুজন সদস্য ঐতিহাসিক বেতিয়ারা যুদ্ধে শহীদ হন। তাঁরা হলেন— শহীদ জহিরুল হক দুদু এবং শহীদ বশিরুল ইসলাম।

মুক্তিযুদ্ধে বেলাব অঞ্চলে নেতৃত্ব দেন কৃষকনেতা আবদুল হাই, শামসুল হক (চেয়ারম্যান), বাবর আলী মাস্টার। এই দলের অন্যান্য মুক্তিযোদ্ধারা ছিলেন বারৈচার আবদুল আলী মৌলভী, খালেক মাস্টার, আজিম উদ্দিন মস্তু, আবদুল কাদির, জিলানী কাদির প্রমুখ। মুক্তিযুদ্ধের প্রধান ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত বেলাব অঞ্চলে যুদ্ধের প্রধান ট্রেনিংকেন্দ্র ছিলো আবদুল হাইয়ের বাড়ি। বাড়িটি ট্রেনিং-বাড়ি হিসেবেই পরিচিতি লাভ করে। এছাড়াও আরো কয়েক স্থানে ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়। যুদ্ধকালীন জাতীয় পর্যায়ের বাম রাজনীতিবিদদের একটি প্রধান বিচরণ ক্ষেত্র ছিলো এই বেলাব অঞ্চল।

নরসিংদী জেলার মনোহরদী অঞ্চলে মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সংগঠক ছিলেন আবদুর রশিদ তারা মাস্টার। তাঁর নেতৃত্বে একটি বিশাল বাহিনি মনোহরদী অঞ্চলে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে দেশকে শত্রুমুক্ত করতে বিশেষ অবদান রাখে। তাঁর দলের অন্যতম সংগঠক ও যোদ্ধারা ছিলেন— শামসুল ইসলাম (খিদিরপুর), আবুল হোসেন (বড়চাপা), আবু তাহের (বড়চাপা), কুদ্দুস মৃধা (একদুয়ারিয়া), এম এন রশিদ (চন্দনবাড়ী), নিত্য গোপাল রায় প্রমুখ।

মনোহরদী অঞ্চলের আরেকজন বাম রাজনীতিবিদ এবং মুক্তিযুদ্ধের শীর্ষ সংগঠক ছিলেন ফয়েজ মাস্টার। পেশায় ছিলেন শিক্ষক। ছাত্রজীবনেই তিনি ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন এবং একাধিকবার জেল খাটেন। মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক হিসেবে তাঁর অবদান অনন্য।

নরসিংদী জেলায় মুক্তিযুদ্ধে দলমত নির্বিশেষে সকলের অংশগ্রহণে বিজয় ত্বরান্বিত হয়। আমরা পাই একটি স্বাধীন ও মুক্ত স্বদেশ।


গোলাম মোস্তাফা মিয়া
সাবেক অধ্যক্ষ, নরসিংদী সরকারি কলেজ