হাবিবুল্লা পাঠানের কাছে গেলাম, যন্ত্র-রাষ্ট্রের খবর জানতে

মুহাম্মদ হাবিবুল্লা পাঠান। ইতিহাসে নিবেদিত যার চোখ ও হৃদয়। থাকেন নিজের গ্রামেই, যে-গ্রামে তাঁর জন্ম, বেড়ে ওঠা আর দৃপ্তভরে পদচারণা ৮৭ বছর ধরে। ৮৮ বছরে পা দিলেন এ-বছর ফেব্রুয়ারির ৭ তারিখে। নিজের গ্রাম আর গ্রামের মাটি তাঁর আরাধ্য বিষয়। মাটির গভীরে সঞ্চিত রাখা আছে যে-মহাকালিক অতীত; যে-অতীতের কোনো হদিস জানা ছিলো না কারোরই, তা তিনি ধীরে ধীরে মাটির উপরে পাদপ্রদীপের আলোয় উন্মোচিত করেছেন থরে থরে। সবাই বিস্মিত হয়েছে।

এটা তাঁর গ্রাম, বটেশ্বর। এখানেই থাকেন তিনি, তাঁর পথপ্রদর্শক পিতার ভূমিতে, যে-পিতা তাঁকে হাতেখড়ি দিয়েছেন কেবল মাটির দিকে গভীর অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে তাকিয়ে থাকার এক অবিনাশী অভ্যাসের, যা এই ৮৭ বছর বয়সেও এক মুহূর্তের জন্যে বিস্মৃত হতে পারছেন না।

আমরা কয়েকজন বাইকে চেপে চলে গেলাম গাছপালার অফুরান স্নেহচ্ছায়াঘেরা গ্রাম বটেশ্বরে। তখন দ্বিপ্রহর। খুঁজে পেতে কষ্ট হয় না এই বাড়ি। ১৯৭৪ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘বটেশ্বর প্রত্ন সংগ্রহশালা ও গ্রন্থাগার’ নামের চৌচালা টিনশেড ঘরটি দু’ কক্ষ বিশিষ্ট। হাবিবুল্লা পাঠান গত সাত দশক ধরে যা কুড়িয়েছেন মাটির নিচ থেকে আর আশপাশের গ্রামের নানা মানুষজনের নিকট থেকে, তা এখানে সঞ্চিত করে আগলে আছেন। আমরা যখন পৌঁছুলাম, তখন তিনি এর একটি কক্ষের চৌকিতে ঘুমোচ্ছেন। আমরা অপেক্ষা করছিলাম তাঁর জেগে ওঠার। আমরা জানতাম, তিনি ইদানিং প্রায়ই নানা অসুখে ভুগছেন। শরীর ও মন কোনোটাই তাঁর স্বস্তি শান্তি আর নিরুদ্বিগ্ন নাই— এগুলো আমরা আগেই জানতাম।

যাবতীয় আলাপ-সালাপের পর ঘুরে-ফিরে সেই একই জায়গায় তিনি এবং আমরা মিলিত হই, আর তা হচ্ছে— তাঁর দেহাবসানের পর কী হবে সবকিছুর? তিনি এবং আমরা যে-শব্দ উচ্চারণ করে তৃপ্তি (!) ও বিষাদাক্রান্ত হই, তা হলো, ‘লোপাট’, ‘বেহাত’, ‘দখল’ ইত্যাদি!

ঘুম থেকে জেগেই সহজাত ভঙ্গিতে কথা বলা শুরু করলেন। তাঁর পিতার কথা, তাঁর কথা, নানা ধরনের প্রত্নসামগ্রী সংগ্রহের গল্প। আমাদের প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছেন। জানালেন তাঁর মনের ভেতর সবসময়ই চেপে রাখা সেই অমোঘ অভিমান ও ক্ষোভের অনল! তাঁর মারা যাবার পর কী হবে এইসব সাতদশকের তিল তিল করে গড়ে তোলা সঞ্চিত রত্নরাজির! তিনি কোনো আশার আলো দেখতে পান না। পরিবারেও এমন কেউ নেই এগুলো যত্ন আর ভালোবাসার শক্তিশালী রক্ষাব্যূহ হয়ে আগলে রাখার। আর সরকারের বা রাষ্ট্রের কাছে আবেদন করে করে আর কিছু লাভ নাই আর! আর কতো! এটা তো বেদনাদায়ক আরেক উপাখ্যান! যেমন ‘জাদুঘর’। গোটা সময় আমরা লক্ষ্য করেছি, এই বিষয়ে তিনি কথা বলতে ইচ্ছুক না। সরাসরি বলেননি, কিন্তু আমরা প্রসঙ্গ তুললেই তিনি কথা অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেন। আমরা বুঝতে পেরেছি, তিনি এ-বিষয়ে কতোটা হতাশ আর বিরক্ত!

উয়ারী-বটেশ্বর-টঙ্গীরটেকসহ গোটা অঞ্চলেই প্রত্নতাত্ত্বিক খননের মাধ্যমে যেসব সামগ্রী পাওয়া গেছে এবং হাবিবুল্লা পাঠানের কাছে যেসব সামগ্রী সঞ্চিত আছে, সব সংরক্ষিত থাকার জন্যে একটি ‘জাদুঘর’ নির্মাণের ব্যবস্থা গ্রহণ করে সরকার আর সরকারের প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর। নামও ঠিক করে ‘গঙ্গাঋদ্ধি জাদুঘর’। ২০১৯ সালে এই জাদুঘরের কাজ শুরু হয় এবং তা এক বছরের মধ্যেই সমাপ্ত হবার কথা। কিন্তু হায়, সাত বছর অতিবাহিত হলেও এটির কাজ সমাপ্ত হবার প্রসঙ্গ তো অনেক দূরের আলাপ, বরং যতোটুকু শেষ হয়েছে, তা-ও অযত্ন-অবহেলায় পতিত স্থাপনায় পরিণত হয়েছে।

মুহাম্মদ হাবিবুল্লা পাঠান কথা বলছিলেন আমাদের সাথে। তাঁর ঘরে। যেখানে দুটি বড়ো সাইজের শেলফে কাচবন্দী আছে তাঁর আহরিত রত্নভাণ্ডার। উয়ারী ও বটেশ্বর এবং গোটা প্রত্নঅঞ্চল থেকে ৭০ বছর ধরে সংগ্রহ করা আড়াই হাজার বছর আগেকার বহুবিচিত্র সামগ্রী, যেমন : বঙ্গভারতের দুর্লভ নিদর্শন বিষ্ণুপট্ট, ব্রোঞ্জ বা তামার তৈরি অনুপম শিল্পমণ্ডিত ধাবমান অশ্ব, বৌদ্ধ-শৈব নৈবেদ্যপাত্র, পাথরের বাটখারা, কচ্ছপ, হস্তী, হাঁস, পোকা, ফুল, অর্ধচন্দ্র প্রভৃতি মন্ত্রপুত কবচ, পোড়ামাটির তৈরি কিন্নর, বিভিন্ন জীবজন্তুর প্রতিকৃতি, স্বল্পমূল্যবান পাথর ও কাচের পুঁতি ইত্যাদি।  এসব সামগ্রীই যে এই শেলফে আছে এমন নয়। তবে আছে, গোপন শেলফে। চারদিকে সুশীল প্রত্নপ্রেমিকের ছদ্মবেশে তস্করের ছড়াছড়ি। বলছিলেন তিনি। পুঁতির মালা আর কয়েক ধরনের পুঁতি নিয়ে তাঁর ব্যক্তিগত গবেষণা এখনো চলমান।

কথা বলছিলাম ধীমান বয়স্ক এক প্রত্ম আর ইতিহাসের নিবেদিতপ্রাণ ঋষির সাথে। আমরা কয়েকজন। ফাঁকে ফাঁকে চলছে চা-নাস্তা পর্ব। তিনি এই বয়েসেও যে-মাত্রায় ধূমপান আঁকড়ে ধরে আছেন, তা দেখাও এক বিস্ময়!

তিনি বলছিলেন তাঁর জীবনের নানা অভিজ্ঞতার সারাৎসার। তাঁর ভাটকবিতা প্রকাশের গল্প, কয়েক খণ্ড লোককাহিনি সংগ্রহের বিচিত্র ও অভূতপূর্ব অভিজ্ঞতার কথা, গাজীপুরের মেয়েলি গীত সংগ্রহ করতে গিয়ে কীরকম হেনস্তার শিকার হয়েছেন, সেসব ঘটনা শুনতে শুনতে আমরা বুঝতে চেষ্টা করি তাঁর সমগ্র জীবনের অমোঘ ঝোঁক ও নেশার মতো লেগে থাকা  এক সংগ্রাহক আর সংকলকসত্তার ভেতরটা। তবে সম্পূর্ণ বুঝতে পারাটা এতোটা সহজ তো নয়— এটা জানি।

যাবতীয় আলাপ-সালাপের পর ঘুরে-ফিরে সেই একই জায়গায় তিনি এবং আমরা মিলিত হই, আর তা হচ্ছে— তাঁর দেহাবসানের পর কী হবে সবকিছুর? তিনি এবং আমরা যে-শব্দ উচ্চারণ করে তৃপ্তি (!) ও বিষাদাক্রান্ত হই, তা হলো, ‘লোপাট’, ‘বেহাত’, ‘দখল’ ইত্যাদি!

তাঁর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আমরা বাড়ির পাশেই ‘গঙ্গাঋদ্ধি জাদুঘর’ নামক শাপগ্রস্ত সেই স্থাপনার ভেতর যাই। দেখি জঙ্গলাকীর্ণ ধুলা আর বহুস্তর বিশিষ্ট মাটিতে মুছে যাওয়া স্থাপনার নকশাবোর্ড, ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের পিলার…। সমগ্র স্থাপনাটির নকশা, ডিজাইন ও পুরো জাদুঘরের পরিকল্পনায় আমরা মুগ্ধ হই। কিন্তু এটা এখন গোচারণভূমি আর গাঁজাখোরদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে, দেখলেই বোঝা যায়। রাষ্ট্রের বা জনগণের কোটি কোটি টাকার কী শ্রাদ্ধশান্তি!

২০১৯ সালে শুরু হওয়া ‘গঙ্গাঋদ্ধি জাদুঘর’-এর নির্মাণাধীন স্থাপনা

রাষ্ট্র সরকার সংস্কৃতিমন্ত্রণালয় প্রত্নতত্ত্বঅধিদপ্তর গবেষক লেখক মন্ত্রী জেলাপরিষদ ঠিকাদার ইঞ্জিনিয়ার শ্রমিক… আরো কিছু পার হয়ে, এবং এদের প্রত্যেকের অভ্যন্তরে আরো অনেক লাভালাভের গল্প-টানাপোড়েন কতো কতো সংঘাত-সংকট পেরিয়ে হাবিবুল্লা পাঠানের আগলে রাখা সঞ্চিত সম্পদ ওখানে কী করে পৌঁছুবে— রাষ্ট্রের জনগণের জন্যে প্রদর্শনের, গবেষণার, শিক্ষা লাভের, সর্বোপরি একটা জাতির সভ্য হবার শর্তগুলো পূরণ হওয়া পর্যন্ত কতো আর অপেক্ষা করতে হবে, তা এই জাতি আসলেই হয়তো জানে না। সিস্টেম মানুষের উপকারের জন্যে, শৃঙ্খলাপূর্ণ পদ্ধতিচর্চার সহায়ক হবার জন্যে। সিস্টেম মানুষের জীবনীশক্তি, ধৈর্যশক্তি নিঃশেষ করার জন্যে নিশ্চয়ই নয়!

এই রাষ্ট্রের সিস্টেম নিয়ে আলাপ করতে করতে আমরা উয়ারী গ্রামে যাবার মনস্থির করলাম। যে-গ্রামে উৎখনন হয়েছিলো কয়েক দফায়, এবং মূলত, এই উৎখননের ফলেই খুলে যায় এক প্যান্ডোরার বাক্সের; আবিষ্কৃত হয় আড়াই হাজার বছর আগেকার এক দুর্গনগরীর, যেটা ছিলো মূলত টলেমি বর্ণিত গঙ্গারিডাই জাতির এক মহাবাণিজ্য বন্দর।

আমরা চলছিলাম দুটো বাইকে চড়ে, পাঁচজন। সেখানে আমাদের জন্যে অপেক্ষা করছে কী যে অদ্ভুত বাংলাদেশ, তা তখনো আমাদের ধারণায় ছিলো না। ঘনবসতিপূর্ণ নয় এখনো, এরকম গ্রামাঞ্চল পার হচ্ছি আমরা প্রচুর গাছপালার ছোটো ছোটো উদ্যান পেরিয়ে, বুকে নির্মল বাতাস ভরে নিয়ে, অপরাহ্ণের শেষ আলোয়।

উয়ারী গ্রামের এই খননকৃত জায়গাটিতে পৌঁছুতে হলো আমাদের দু’ঘর গ্রামবাসীর উঠোনের উপর দিয়ে, অনেক দ্বিধার সাথে। একটা প্রত্নস্থানে প্রবেশের পথ কেন এরকম, ভাবতে ভাবতে আমরা ঢুকে গেলাম প্রাচীর ঘেরা একটি স্থানে। এই সেই স্থান, যেটাতে এই শতাব্দীর প্রথম দশকে কয়েক দফায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষক, গবেষক ও শিক্ষার্থীদের মিলিত প্রচেষ্টায় অনেক দফায় খননকার্য পরিচালনার মাধ্যমে যে-ইতিহাস উন্মোচিত হয়েছে, তাতে ‘বাঙলার ইতিহাস’ নূতন করে রচনা করতে হচ্ছে ইতিহাসবিদ ও গবেষকদের। এসব কথা আমাদের অনেক আগেই জানা ছিলো। মোটামুটি সবাই জানে এসব কথা। গত ১৫-২০ বছর ধরেই জানে। কিন্তু এ কী তার রূপ! প্রায় জঙ্গল হয়ে যাওয়া একটা কবরস্থানের মতো মনে হলো। কিন্তু কবরস্থানে বাচ্চাদের অ্যামিউজমেন্ট পার্ক! হ্যাঁ, এটা সত্যি যে, এখানে এই স্বল্পপরিসর জায়গাটিতে বাচ্চাদের খেলাধুলা করার জন্যে স্থাপন করা হয়েছে স্লিপার, দোলনা, খেলনা হাতি-ঘোড়া ইত্যাদি। যেই স্থানটি সংরক্ষিত থাকার কথা, তার উপর দিয়েই জুতোর থপথপ আওয়াজ তুলে এইসব খেলাধুলার সামগ্রীতে চড়ছে বালক-বালিকারা। পৃথিবীর কোনো প্রত্নস্থানে এরকম গরু-ছাগল এবং মানুষের অবাধ চলাফেরা ঘটিয়ে সবকিছু নষ্ট হয়ে যাওয়ার পরিস্থিতি করা হয় কি না, এসব জানতে জানতে ভাবি, এগুলো দেখভাল করার কি কেউ নেই? এমন সময় লাগোয়া বাড়ির ভেতর থেকে এলেন আনোয়ারা বেগম নামের মাঝবয়েসী এক মহিলা। বললেন, তিনি দেখভাল করার দায়িত্বে ছিলেন অনেক দিন। এখন নাই। করোনার পর থেকে তাকে টাকা-পয়সা দেয়া বন্ধ করে দেয়া হয়। সরকার পরিবর্তনের পর তাকে বলে দেয়া হয়েছে, এখানে আর দেখভালের দরকার নেই। আমরা জিজ্ঞেস করি, কারা তাকে নিয়োগ দিলো আর কারা তাকে ছাড়িয়ে দিলো? তিনি বললেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সুফি মোস্তাফিজুর রহমানের কথা।

আনোয়ারা বেগমের সাথে আরো অনেক কথাই হলো। তার কথায় প্রচুর খেদ। তার জমি নাকি কেড়ে নেয়া হয়েছে। কে জানে, আসলে তার কথা ঠিক কি না! সুফি মোস্তাফিজুরের উপর খুবই ক্ষোভ তার।

কর্তৃপক্ষের নিকট ‘পৃথিবীর প্রথম উন্মুক্ত জাদুঘর’ স্থাপনের তৃপ্তিমিশ্রিত ঢেঁকুর থাকলেও সেটা কতোটা উন্মুক্ত আর কতোটা উন্মুক্ত নয়, উন্মুক্ত জাদুঘর বললেই সেটা যে বাপ-মা বিহীন হয়ে যায় না— এই ব্যাপারে বোঝাপড়ার ধরন দর্শনার্থীরা তখনই বুঝে ফেলবেন, যখন দেখবেন ‘উন্মুক্ত জাদুঘর’ সংক্রান্ত বিলবোর্ডই  নষ্ট হয়ে গেছে!

যাই হোক, আমরা বুঝলাম, এই খননকৃত প্রত্নস্থানটিতে এসে আমাদের কিছুই লাভ হয়নি। অথবা হয়তো হয়েছে। ইতিহাসের একটা আকরভূমি, কোটি কোটি টাকা খরচ করে খননকৃত এক মহা আবিষ্কারকে রাষ্ট্র এভাবে হেলাফেলার বস্তু বানিয়ে ফেলে রেখেছে— কীভাবে জানা হতো, না এলে আজ!

চলে যাচ্ছিলাম। বাইকের কাছাকাছি আসতেই এক মহিলা পার্কিং চার্জ দাবি করে বসলো, বাইকপ্রতি বিশ টাকা। আমরা এই ধরনের অনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ জানাতেই প্রায় খেঁকিয়ে ওঠলো মহিলাটি। “উনি কি নৈতিক কাজ করছে?” এরকম প্রশ্নে আমরা দিশেহারা। কাকে উদ্দেশ্য করে বলছে, জিজ্ঞেস করতেই সেই একই নাম উচ্চারণ করলো, সুফি মোস্তাফিজুর রহমান।

বাইকে চড়তে চড়তেই হঠাৎ মনে পড়ে গেলো পাঁচদোনার গিরিশ প্রত্নমিউজিয়ামের কথা। মনীষী ভাই গিরিশচন্দ্র সেনের স্মৃতি রক্ষার্থে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে নির্মিত এই মিউজিয়ামটির নির্মাণেও ছিলেন সুফি মোস্তাফিজুর। এতোটা জঘন্য, জগাখিচুড়ি, গোঁজামিলপূর্ণ জাদুঘর সম্ভবত বাংলাদেশে আর একটিও নেই। তার আর আওয়ামী লীগ নেতা নূহ উল আলম লেনিনের একটা প্রতিষ্ঠান আছে ‘ঐতিহ্য অন্বেষণ’ নামে। গত সরকারের পিরিয়ডে এই প্রতিষ্ঠানটি সারা দেশে সরকারের কোটি কোটি টাকা শ্রাদ্ধ করে নন্দনহীন, গোঁজামিলপূর্ণ এবং শেষ পর্যন্ত সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা না করে ভাগাড়ে পরিণত করে ফেলে রাখার মতো এরকম আরো হয়তো ‘ইতিহাস-ঐতিহ্য’ নিয়ে খেলাধুলা করেছে! সৎ, সাহসী, মেধাবী ও অনুসন্ধানী সাংবাদিকগণই কেবল এর প্রকৃত হদিস বের করতে পারবে।

সোজা মসৃণ কালো পিচের রাস্তার দু’পাশে আম-কাঁঠালের সারি। বাইকের পিঠে বসে থাকা এই বন্দরের জাহাজ আর মানুষের কলধ্বনি সমেত আমাদের চুল উড়িয়ে নিচ্ছে ব্রহ্মপুত্র তীরের বাতাস। খ্রিস্টপূর্ব ৩৫০ অব্দের সেই আলেকজান্ডারীয় বৈকালিক আলো মুখে পড়তেই আমাদের মনে পড়ে যায় দ্বিপ্রহরে ফেলে আসা সেই সন্তের মুখ। মুখমণ্ডলে বয়সের যে-বলিরেখা ছড়িয়েছে ইদানিং, সেই ঋজু দৃপ্ত তবু ভারাক্রান্ত সেই নতমুখ একজন মুহাম্মদ হাবিবুল্লা পাঠানের। তিনি ঘুমিয়ে ছিলেন। তিনি অসুস্থ শারীরিকভাবে।

এক অজপাড়াগাঁ বটেশ্বরে এমন কেউ ছিলেন বিশেষ ধীসম্পন্ন মানুষ, যিনি সেই ১০০ বছর আগে ১৯২৬ সালে এই গ্রামে বসেই ‘সবুজ পল্লী’ নামে পত্রিকা করতেন। তিনি মোহাম্মদ হানীফ পাঠান। মাটির নিচ থেকে পাওয়া গুটিকা দেখে যার চোখ আবিষ্কার করেছিলো এক মহাকাল; আর তা ছড়িয়ে দিয়েছিলেন তার বালক পুত্রের স্কন্ধে। শহরের বড়ো বড়ো বিদ্বান-পণ্ডিত-গবেষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চার দশক তারা লেখালেখি করেছেন। আর তারপর বড়ো বড়ো মানুষেরা একসময় পরীক্ষা করে দেখলো মুহাম্মদ হাবিবুল্লা পাঠান নামের গ্রামের এই স্কুলশিক্ষকের চোখ ও হৃদয়ের অবিনাশী সত্যাসত্য। পত্রিকা হলো, বই হলো, খননকর্ম হলো, তথ্যচিত্র হলো, কতো কতো আলোকচিত্র হলো, সেমিনার হলো, পুরস্কার হলো, সরকার হলো, প্রত্নতত্ত্ব হলো, প্রচুর মানুষের প্রচুর প্রচুর পিনিক হলো এই বিশ-পঁচিশ বছরে। কিন্তু  গত ১০০ বছরে বাংলাদেশে আবিষ্কৃত কোনো প্রত্নতাত্ত্বিক অঞ্চলের ভাগ্যই এই উয়ারী-বটেশ্বরের মতো হলো না। এই স্থানটির যথাযথ যা প্রাপ্য ছিলো, তা হলো না। এখানে প্রাপ্ত আয়ুধসমূহের যেখানে যথাযথ সংরক্ষণের প্রতিশ্রুতি ছিলো, তা হলো না। আর একজন হাবিবুল্লা পাঠান সাত দশক ধরে যা সংগ্রহ করেছেন অনাগত মানুষ আর মানুষের মনন উৎকর্ষের জন্যে, তার কিছুই হলো না। সম্পূর্ণ অরক্ষিত, হারিয়ে ফেলার আশঙ্কা নিয়ে আড়াই হাজার বছর আগেকার এই সভ্যতা হয়তো প্রতীক্ষা করছে বাংলাদেশ রাষ্ট্র পরিচালিত নূতন কোনো নাটকের, আবার হয়তো নূতন করে খনন শুরু হবে, নূতনভাবে কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ হবে, নূতন কোনো প্রত্নতত্ত্ব, নূতন কোনো জেলাপরিষদ, নূতন কোনো ঠিকাদার….

তবু আমরা চাই, বাংলাদেশ রাষ্ট্রের এই সকল ধারাবাহিক নাটক দেখার জন্যে প্রত্নঋষি মুহাম্মদ হাবিবুল্লা পাঠান, আপনি শতায়ু হোন।

সম্পর্কিত

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সর্বশেষ