মোহাম্মদ হানীফ পাঠানের ‘বায়ান্নর পাণ্ডুলিপি’ : ভাষা আন্দোলনের এক দুর্লভ দলিল

মুসলমানের জন্মগত ও প্রকৃতিগত ভাষা উর্দু হইলে অন্যান্য মুসলিম রাষ্ট্রে উর্দু রাজভাষার মর্যাদা পায় নাই কেন? আমরা জন্ম হইতেই আজান, কলেমা শুনি বলিয়া এবং শত শত আরবী ফারসী শব্দ ব্যবহার করি বলিয়া উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করা উচিত ইহা একটি হাস্যকর যুক্তি।

জমিয়তে ওলামায়ে ইসলাম নামে ভারতবর্ষের একটা রাজনৈতিক দল, যেটা প্রতিষ্ঠা লাভ করে ১৯১৯ সালে জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ নামে, পরে পাকিস্তান আন্দোলনে ব্যাপক ভূমিকা পালন করে এটি আলাদা হয়ে যায় ১৯৪৫ সালে এবং স্বাধীনতার পর পাকিস্তানে তারা প্রভাবশালী রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তানের ‘রাষ্ট্রভাষা’ কী হবে, এই আলোচনা ও বিতর্কসমূহ যখন ব্যাপকভাবে চলছিলো, তখন এই সংগঠনটি উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে ৫০ টি যুক্তি তুলে ধরে। ১৯৫১ সালে তারা এ-বিষয়ে একটি পুস্তিকা প্রকাশ করে ‘উর্দুর পক্ষে পঞ্চাশ পয়েন্ট’ নামে।

তৎকালীন ঢাকা জেলার (বর্তমান নরসিংদী জেলাধীন বেলাব উপজেলার) বটেশ্বর গ্রামের স্কুলশিক্ষক মোহাম্মদ হানীফ পাঠান (১৯০১-১৯৮৯), যিনি একজন ইতিহাসকার, প্রত্ন অন্বেষক ও লোকগবেষক হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছিলেন এবং এই গ্রামে বসেই একটি মাসিক পত্রিকা প্রকাশের সাথে যুক্ত ছিলেন, তিনি জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের উর্দুর পক্ষের ৫০ যুক্তির বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে ৫২ টি যুক্তি তুলে ধরেন। এ-বিষয়ে তিনি একটি পাণ্ডুলিপি প্রস্তুত করেন। জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের প্রতিটি পয়েন্টের বিপরীতে তিনি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে মাতৃভাষা বাংলার প্রয়োজনীয়তা খুব সাবলিলরূপে তাঁর পাণ্ডুলিপিতে তুলে ধরেন। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, পাণ্ডুলিপিখানা তখন প্রকাশিত হয়নি। যদি প্রকাশিত হতো, তবে জাতীয়ভাবে ব্যাপক পঠিত হতো এবং আলোড়ন তুলতো।

এই পাণ্ডুলিপিখানা ‘বায়ান্নর পাণ্ডুলিপি : বাংলা বনাম উর্দূ রাষ্ট্রভাষা বিতর্ক’ নামে ২০০৫ সালে প্রকাশিত হয় বটেশ্বর গ্রাম থেকে। বোঝাই যায়, গ্রন্থটি খুব বেশি প্রসার ও প্রচার লাভ করেনি।

‘বায়ান্নর পাণ্ডুলিপি’টি অর্থাৎ ‘বাংলা ভাষার পক্ষে ৫২ পয়েন্ট’ মোহাম্মদ হানীফ পাঠান সমাপ্ত করেন ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির সেই রক্তঝরা ইতিহাস রচিত হবার পূর্বেই। আমরা এখানে কয়েকটি পয়েন্ট উদাহরণস্বরূপ উল্লেখ করছি :

জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের পয়েন্ট
মুসলমানের আল্লাহ এক, রছুল এক, কিতাব এক, ধর্ম এক, কেবলা এক, কাবা এক, পতাকা এক, লক্ষ্য এক। সুতরাং তাদের রাষ্ট্রভাষাও এক হওয়া চাই। আরবীকে রাষ্ট্রভাষা করাই ছিল সবচেয়ে বাঞ্ছনীয়। উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করা সেই লক্ষ্যের প্রথম ধাপস্বরূপ।

মোহাম্মদ হানীফ পাঠানের উত্তর
সব বিষয়ের উপর এক এর আরোপ করা যুক্তি নহে। যদি তাহাই হইত তবে মুসলমানের রাজা এক, রাজ্য এক, রাজধানী এক, মন্ত্রী এক, ভাষা এক, ফসল এক, জমি এক, খাদ্য এক ইত্যাদি সবই এক হইত। তবে আর পৃথক পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রয়োজন কি? আরব বা মিশরের সঙ্গে একত্রীভূত হইয়া যাওয়াই যুক্তি! কিন্তু আল্লাহ ঐক্যের ভিতর দিয়া বৈচিত্র্যকেই পছন্দ করেন। তিনি নর সৃষ্টি করিয়াই ক্ষান্ত হন নাই— নারীও সৃষ্টি করিয়াছেন। কেবল সাদা আদমীই সৃষ্টি করেন নাই— কালো আদমীও সৃষ্টি করিয়াছেন। কেবল গভীর সাগর সৃষ্টি করেন নাইÑ উচ্চ পাহাড় ও মরুভূমিও সৃষ্টি করিয়াছেন। এইরূপ দিবারাত্র, শীত গ্রীষ্ম, পণ্ডিত মূর্খ, দ্বীন বেদ্বীন ইত্যাদি কত বৈচিত্র্য দিয়াই না তিনি জগতকে সুন্দর করিয়া সাজাইয়া রাখিয়াছেন।
ভিন্ন ভিন্ন ভাষাও আল্লাহর এক একটি বিচিত্র সৃষ্টি। এই প্রকৃত বৈচিত্র্যকে অস্বীকার করিয়া কল্পনার ফানুসে ভাসিয়া প্রধানমন্ত্রীর বাড়ী ও আমার বাড়ী এক, প্রধানমন্ত্রীর খাদ্য ও আমার খাদ্য এক ভাবিলে কি আমার দিন সুখে গুজরান হইবে? না, পাকিস্তানকে অন্য কোনও মুসলমান রাজ্যের সঙ্গে এক করিয়া দিলে কোন গৌরব হইবে কি? ফলতঃ ধর্মের মৌলিকতা ও ইসলাম জগতের ঐক্য রক্ষার জন্য আরবী ভাষা অবশ্যই আমাদের শিখিতে হইবে। তাই বলিয়া আরবীকে রাষ্ট্রভাষা করিতে হইবে বা কিছুকাল উর্দুকে রাষ্ট্রভাষারূপে ব্যবহার করিতে হইবে, ইহা কোন যুক্তি নহে, নিছক ছুতা মাত্র। একই ভাষাভাষীদের মধ্যে এমনকি আরবেই ভিন্ন ভিন্ন রাষ্ট্র গঠন করিবার কারণ কি?

জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের পয়েন্ট
বাংলা, হিন্দি প্রভৃতি ভাষা হিন্দুর। আরবী, পারসী প্রভৃতি ভাষা মুসলমানের। এমন একটা উৎকট ও বাস্তব সত্যকে ধামাচাপা দিয়া যাহারা আজ বাংলার আশেক হইয়া পড়িয়াছেন তাহাদের জন্য বড়ই আক্ষেপ ও অনুতাপ।

মোহাম্মদ হানীফ পাঠানের উত্তর
আরবী, পারসী যথাক্রমে পৌত্তলিক ও অগ্নি উপাসকদের ভাষা ছিল। আর উর্দু ত দিল্লীর বাদশাহগণের সিপাহীদের ভাষা ছিল অথবা বিভিন্ন দেশ হইতে আগত দিল্লীর বাসিন্দাদের বাজারের ভাষা ছিল। তুর্কি শব্দ উর্দু অর্থ সৈনিক বা সেনানিবাস। সাধনা দ্বারা এইগুলিকে ইসলামী ভাষায় পরিণত করা হইয়াছে। তেমনি সাধনা দ্বারা ইসলামী ভাবসম্পদে পূর্ণ করিয়া বাংলা, হিন্দিকে ইসলামী ভাষায় পরিণত করিতে কোন নিষেধ নাই। কাজেই বাংলার আশেকগণের জন্য কাহার উৎকট আক্ষেপের প্রয়োজন নাই। বরং যাহারা এইরূপ সংকীর্ণ মনোভাব পোষণ করেন তাহারাই অনুতাপ করিতে পারেন।

জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের পয়েন্ট
…মুসলমানের ভাষা ও ভাবধারা জন্ম হইতেই এছলামিক। আমরা শত শত আরবী শব্দ ব্যবহার করি। এতে প্রমাণিত হইল উর্দু মুছলমানের জন্মগত ও প্রকৃতিগত ভাষা। কাজেই স্বভাব ও প্রকৃতির দাবী অনুসারেই উর্দুকে রাজভাষা করা উচিত।

মোহাম্মদ হানীফ পাঠানের উত্তর
মুসলমানের জন্মগত ও প্রকৃতিগত ভাষা উর্দু হইলে অন্যান্য মুসলিম রাষ্ট্রে উর্দু রাজভাষার মর্যাদা পায় নাই কেন? আমরা জন্ম হইতেই আজান, কলেমা শুনি বলিয়া এবং শত শত আরবী ফারসী শব্দ ব্যবহার করি বলিয়া উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করা উচিত ইহা একটি হাস্যকর যুক্তি। যেমন এখান থেকে মারলাম তীর লাগলো কলাগাছে, হাঁটু বেয়ে রক্ত পড়লো, চোখ গেলরে বাবা। বাংলা ভাষায়ও আমরা শত শত আরবী ফারসী শব্দ ব্যবহার করিতেছি এবং প্রয়োজনবোধে আরো করিব। কাজেই বাংলা ভাষাও স্বভাবের দাবি করিতে পারে।

জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের পয়েন্ট
পাকিস্তানের সংহতি ধর্মের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত। অতএব ধর্মভাবকে প্রবল ও বিস্তার করার জন্য ইসলামী ধর্মভাষা উর্দুকেই রাষ্ট্রভাষা করা উচিত ও যুক্তিসংগত।

মোহাম্মদ হানীফ পাঠানের উত্তর
ইসলামী ভাষা বলিয়া যদি কোন ভাষা থাকে তবে তাহা আরবী। যদি বলিলাম এইজন্য যে পূর্ব যমানায় আরবী ছাড়াও অন্যান্য ভাষায় আল্লাহর অহি নাজিল হইয়াছিল, তখন তাহাই ইসলামী ভাষা ছিল। যেমন ইনযিল সুরিয়ানী ভাষায় ও যবুর ইউনানী ভাষায় নাজিল হইয়াছিল। তাহাও তৎকালীন পয়গম্বরগণের মাতৃভাষাতেই হইয়াছিল। পৃথিবীর সকল ভাষাকেই সাধনা দ্বারা ইসলামী ভাষায় পরিণত করা যাইতে পারে; পারশী ভাষা ইহার নজির। আমরাও সেইসব দৃষ্টান্তে অনুপ্রাণিত হইয়া সাত আট কোটি লোকের মাতৃভাষাকে ইসলামী ভাবসম্পদে ভরপুর করিয়া ইসলামী ভাষায় পরিণত করিব। ইহার প্রথম এবং প্রধান সুযোগ মাতৃভাষা বাংলাকে রাষ্ট্র ভাষার মর্যাদা দান করা। ধর্ম, আইন, সাহিত্য, বিজ্ঞান, ইত্যাদি সর্ব সাধারণের মধ্যে দ্রুত প্রচার ও প্রতিষ্ঠা করিতে মাতৃভাষার সাহায্য ভিন্ন গত্যন্তর নাই।

জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের পয়েন্ট
…উর্দু আন্তর্জাতিক ভাষা। …বিজ্ঞান, দর্শন, রাজনীতি, শিল্প, বাণিজ্য সর্ব বিষয়ের প্রতিশব্দ উর্দুতে বিদ্যমান। …পক্ষান্তরে বাংলা প্রাদেশিক ও আঞ্চলিক ভাষা, ইহা আন্তর্জাতিক প্রতিভাশূন্য। এতে বিদেশী শব্দের বিকট দুর্ভিক্ষ।

মোহাম্মদ হানীফ পাঠানের উত্তর
ইহা হাস্যকর উক্তি। কারণ বাংলা প্রায় আট কোটি লোকের মাতৃভাষা সেইস্থলে উর্দু ভাষাভাষীর সংখ্যা দু’তিন কোটির বেশি হইবে না। সর্ব বিষয়ের প্রতিশব্দ কোনও ভাষাতেই সম্পূর্ণরূপে পাওয়া যায় না। এক ভাষার শব্দ অন্য ভাষাতে চিরকাল গ্রহণ করিয়াছে এবং করিবে, ইহাই বৈজ্ঞানিক সত্য। উর্দু এইরূপ স্বয়ংপূর্ণ ভাষা বলিয়া দাবি করা হাস্যকর শুনায়। সাত আট কোটি লোকের মাতৃভাষা যদি আঞ্চলিক ভাষা হয় এবং সেই ভাষ্য যদি আন্তর্জাতিক প্রতিভাশূন্য হয়, তবে জিজ্ঞাস্য এই যে, এই ভাষা তিন তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানো হইতেছে কিরূপে? সেই ভাষার কবি নোবেল প্রাইজ পান কীরূপে? সেই ভাষার কবি সাহিত্যিকগণ আন্তর্জাতিক খ্যাতি লাভ করেন কীরূপে? পরাধীন অবস্থায় যাহা হইয়াছে আযাদী পাওয়ার পর তাহার শত গুণ এবং বাংলা রাষ্ট্রভাষার মর্যাদায় সমাসীন হইলে সহস্র গুণ উন্নতি হইবে তাহা নিঃসন্দেহে বলা যায়।

পুরো ৫২ পয়েন্ট এখানে প্রকাশ করার সম্ভব নয়, তাই পাঠকের বোঝার স্বার্থে কয়েকটা যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করা হলো। মোদ্দা কথা হলো, বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার মহৎ আন্দোলনে সারা বাংলার শিক্ষিত প্রাজ্ঞ মানুষজন যার যার অবস্থান থেকে যেভাবে লড়াই করেছেন, মোহাম্মদ হানীফ পাঠানের এই বায়ান্নোটি পয়েন্ট প্রয়োজনীয় দুর্লভ এক অবদানের দলিল হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছে। নরসিংদীর বটেশ্বর গ্রামের এই স্কুলশিক্ষক বহুমাত্রিক জ্যোতির্ময় ছিলেন, এ-কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়।

সম্পর্কিত

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সর্বশেষ