মোমিন মোটর কোম্পানি : নরসিংদীর প্রথম বাস সার্ভিস

প্রাচীন মানুষের আলোচনায় এখনো মোমিন কোম্পানির বাস সার্ভিস নিয়ে নানা স্মৃতিচারণ শোনা যায়। চল্লিশ দশকের শুরুতে তারা ঢাকায় প্রথম সিটি সার্ভিস চালু করে ইতিহাসের অংশ হয়ে আছেন। তারপর সেই বাস সার্ভিস ঢাকা ছাড়িয়ে নারায়ণগঞ্জ, কেরানীগঞ্জ, রুহিতপুর, সাভার, ধামরাই, কালিয়াকৈর ও বাবুরহাট-নরসিংদী পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিলো। মফস্বলের কাঁচা সরু রাস্তা দিয়ে যেখানে স্টেট বাস (সরকারি বাস) চালানোর সাহস করা হয়নি, সেখানে পুরান ঢাকার ধনাঢ্য ব্যবসায়ী আব্দুল আজিজ সেই সাহস করে সফল হয়েছিলেন। বাস চলাচলের জন্যে তিনি নিজ খরচায় রাস্তাঘাট প্রশস্ত ও মেরামত করার মতো আর্থিক ঝুঁকি নিয়েছিলেন। তাঁর দেখানো পথেই পরবর্তীতে স্টেট বাস চালু হয়েছিলো। তখন মোমিন কোম্পানির বাস সার্ভিসের সাথে শুরু হয় স্টেট বাসের প্রতিযোগিতা। সেই প্রতিযোগিতার গল্প প্রবীণ মানুষের স্মৃতিচারণে পাওয়া যায়।

ঢাকার ইতিহাসে যোগাযোগ ব্যবস্থার অনেক প্রাচীন উপাদান পাওয়া গেলেও বাস সার্ভিসের বয়স খুব একটা বেশি নয়। ব্রিটিশ শাসনামলে ব্যক্তিগত ও সরকারি মোটরকারের আবির্ভাব ঘটলেও গণপরিবহনের সূচনা হয় অনেক পরে। প্রথমদিকে গণপরিবহন বা বাস সার্ভিস সবকারিভাবে হলেও পরবর্তীতে কিছু ধনাঢ্য ব্যবসায়ীর প্রচেষ্টায় বেসরকারি বাস চলাচল শুরু হয়। এক্ষেত্রে প্রথম নাম আসে মোমিন মোটর কোম্পানির। পুরান ঢাকার লালবাগ এলাকার এক পয়সাঅলা পরিবার প্রথম বেসরকারি বাস কোম্পানি গড়ে তোলে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরপর উক্ত কোম্পানির বাস চলাচল শুরু হয়।

মোমিন কোম্পানির বাস চলাচল কীভাবে শুরু হয়েছিলো, সেটা অনুসন্ধান করে জানা যায়, চল্লিশের দশকে পুরান ঢাকার উর্দু রোডের হরনাথ ঘোষ লেনের বাসিন্দা আব্দুল আজিজ ছিলেন সেই কোম্পানির কর্ণধার। তাঁর পিতা আব্দুর রহমান ছিলেন পুরোনো ব্যবসায়ী। উর্দুরোড-চকবাজারের ব্যবসায়ী হিসেবে এই পরিবারের সুনাম ছিলো পুরো ঢাকা জুড়ে। আব্দুল আজিজের আরেক ভাই আব্দুস সাত্তার ছিলেন একজন শিল্পপতি। তিনি ফার্মাদেশ ঔষধ কোম্পানি ও অভিজাত পূর্বাণী হোটেল প্রতিষ্ঠা করে অমর হয়ে আছেন। সেই সময় দুটি প্রতিষ্ঠানই ব্যাপকভাবে পরিচিত ছিলো। হোটল পূর্বাণীর অবস্থান ১ নম্বর দিলকুশা বাণিজ্যিক এলাকায়।

আব্দুল আজিজ

 

আব্দুস সাত্তার

১৯৬৪ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত আন্তর্জাতিক মানের আবাসিক হোটেলটি তখন থেকে এখন পর্যন্ত অনেক ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে আছে। আব্দুস সাত্তার ছিলেন বঙ্গববন্ধু শেখ মুজিবের ঘনিষ্ঠ সহচর এবং পৃষ্ঠপোষক। পাকিস্তান বিরোধী আন্দোলনে শুধু অংশগ্রহণই নয়, তিনি তাঁর হোটেলে বিনা ভাড়ায় আওয়ামী লীগের অনেক সভা-মিটিং করার সুযোগ দিতেন। অনেক নেতা পাকিস্তানি শাসকদের হুলিয়া নিয়ে কোথাও গা ঢাকা দেয়ার সুযোগ না পেলেও আব্দুস সাত্তার তাঁর পূর্বাণীতে নিরাপদ আশ্রয় দিয়েছিলেন। স্বাধীনতার পরও হোটেলটি বঙ্গবন্ধু ও তাঁর সহচরদের জন্যে উন্মুক্ত ছিলো। গবেষকদের মতে, ব্যবসায়ী আব্দুর রহমানের পরিবারটি একান্নবর্তী হওয়ায় মোমিন কোম্পানি প্রতিষ্ঠার সময় তাতে পরিবারের সবাই সংশ্লিষ্ট ছিলেন। এক ভাই দেখতেন ঔষধ ও হোটেল ব্যবসা। আরেক ভাই দেখতেন পরিবহন ব্যবসা। আব্দুর রহমানের মৃত্যুর পর দুই ভাইয়ের মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্প-কারখানা ভাগ-বাটোয়ারা হয়ে যায়।

আব্দুল আজিজ পরিবহনের জন্যে বাস সংগ্রহ করেন দুইভাবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইংল্যান্ডে নির্মিত অনেক জিপ ও ট্রাক পরিত্যক্ত হয়ে গ্যারেজে পড়ে থাকে। এক পর্যায়ে সেসব জিপ ও ট্রাক কম দামে অকশনে বিক্রি করে দেয়া হয়। সেসব কিনে ঢাকায় বডি বানানো হয়। স্থানীয়ভাবে বডি তৈরি হয় বিধায় তা দেখতে তেমন সুশ্রী ছিলো না। আবার সরাসরি এলসি করে ইংল্যান্ড থেকে ইঞ্জিন আমদানিও হতো। তখন বাস বডিসহ আমদানি হতো না বলে এগুলো স্থানীয়ভাবে নির্মাণ করা হতো। ফলে ইঞ্জিনগুলো নতুন-পুরাতন হলেও বডিগুলো দেখতে একই রকম ছিলো।

বাস মেরামত এবং গ্যারেজ হিসেবে ব্যবহার করা হতো ঢাকেশ্বরী মন্দির সংলগ্ন বিশাল এলাকা। সেখানে সাইনবোর্ড টাঙানো হয়— ‘মোমিন মোটর কোম্পানি’। লোকজন মুখে মুখে বলতো মোমিন মটর কোম্পানি। কিন্তু ‘মোমিন’ নামটি কীভাবে এলো? মনে করা হতো, আব্দুর রহমানের কোনো ছেলে কিংবা বংশধরের নাম অনুসারে নামকরণ করা হয়েছিলো। কিন্তু বাস্তবে তা নয়। ‘মোমিন’ একট আরবি শব্দ, যার অর্থ ঈমানদার বা বিশ্বাসী। এই ধর্মীয় আবেগ থেকেই কোম্পানির এই নাম রাখেন। এই তথ্য আব্দুর রহমানের ছেলে আব্দুস সাত্তার জীবিত থাকা অবস্থায়ই বলেছেন। তাঁদের প্রথম বাস সার্ভিস শুরু হয়েছিলো সদরঘাট থেকে রামপুরা পর্যন্ত। তখন রামপুরায় বেগুনবাড়ী খালের উপর কোনো ব্রিজ ছিলো না। প্রাচীন পাণ্ডু নদী শুকিয়ে একসময় সেটা খালে পরিণত হয়েছিলো। পরবর্তীতে তেজগাঁওয়ের পূর্বাঞ্চল বেগুনবাড়ীর দিক দিয়ে একটি খাল কেটে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা হয়। এজন্যে পুরোনো খালটাও একই নামে পরিচিত হয়ে ওঠে। পরে রামপুরা ব্রিজ নির্মিত হলে বাস সার্ভিস কুড়িল কাজীবাড়ি পর্যন্ত সম্প্রসারণ করা হয়। মধ্যবর্তী সময়ে গুলিস্তান থেকে নাবিস্কো হয়ে গুলশান রিংরোড দিয়ে কিছু হলার বাস বাড্ডা পর্যন্ত চলাচল করতো।

এরপর সদরঘাট থেকে মোমিন কোম্পানির বাস চকবাজার পর্যন্ত যাতায়াত করতো। তখন সদরঘাট, পাটুয়াটুলী, ইসলামপুর, মিটফোর্ড, মোঘলটুলী, বেগম বাজার ও চকবাজার ছিলো মূল ব্যবসা কেন্দ্র। তাই প্রতিদিন সেই পথে হাজার হাজার ব্যবসায়ী, সাধারণ মানুষ যাতায়াত করতো। তাদের কথা চিন্তা করেই মোমিন কোম্পানি সদরঘাট টু চকবাজার বাস সার্ভিস চালু করে। মুঘল আমলের এই রাস্তাটি ব্রিটিশ আমলে পাকা করা হলে বাস, টমটম, রিকশা ও সাইকেল যোগাযোগ সহজতর হয়। সদরঘাট-চকবাজার রোড থেকে বাস সার্ভিসটি সম্প্রসারণ করে গুলিস্তান টু চকবাজার করা হয়।

সেই সময় ঢাকাবাসীর বিনোদন বলতে ছিলো সিনেমা হলগুলো। ঢাকার লোকজন দল বেঁধে বিভিন্ন হলে সিনেমা দেখতে যেতো। তখন হলগুলোতে ভারতীয় ও পাকিস্তানি সুপারহিট হিন্দি ও উর্দু ছবি চলতো। দিলীপ কুমার, দেবানন্দ, মধুবালা, নার্গিস, নুরজাহান প্রমুখের ছবিগুলো দেখার জন্যে দর্শকদের ভিড় জমে যেতো। পুরান ঢাকার লায়ন, তাজমহল, মানসী, নাগরমহল, আজাদ, রূপমহল, শাবিস্তান প্রভৃতি সিনেমা হলে যেতে দর্শকেরা মোমিন কোম্পানির বাসে চড়তেন। তখন রিকশা, ঘোড়ার টমটম কিংবা গরুর গাড়ি এতোটা সহজলভ্য ছিলো না। তাছাড়া সব যানবাহনে ভাড়াও বেশি ছিলো। যার কারণে এক পয়সা, দুই পয়সা ভাড়া দিয়ে তারা মোমিন কোম্পানির বাসে গাদাগাদি করে চলাফেরা করতেন। তখন ঢাকার মধ্যে সবচেয়ে অভিজাত সিনেমা হল ছিলো ‘গুলিস্তান’। সেখানে লুঙ্গি পরে প্রবেশাধিকার নিষিদ্ধ ছিলো। সবসময় দর্শকদের প্রচণ্ড ভীড় থাকতো। ঢাকার বিভিন্ন এলাকা থেকে দর্শকরা সেই হলে যেতে বাস ব্যবহার করতো।

বাসগুলোর গতি তেমন ছিলো না। তবে গরুর গাড়ি, টমটম কিংবা রিকশার চেয়ে অনেক দ্রুত চলতো বাসগুলো। শহরের নতুন যান হিসেবে বাসের প্রতি ঢাকাবাসীর আলাদা একটা আকর্ষণ গড়ে ওঠেছিলো। তাই অনেকে শখ করেও বাসে যাতায়াত করতেন। ঢাকার বাস জনপ্রিয় হয়ে ওঠার কারণে বুড়িগঙ্গার ওপারে জিঞ্জিরা টু রুহিতপুর মোমিন কোম্পানির বাস চলাচল শুরু করে।

তখন জিঞ্জিরা ছিলো উদীয়মান ব্যবসা কেন্দ্র। রুহিতপুর ছিলো তাঁতশিল্পের জন্যে বিখ্যাত। তাদের কথা চিন্তা করে সেখানে বাস সার্ভিস চালু করা হয়। কেরানীগঞ্জের মানুষ বাস যোগাযোগকে সাদরে গ্রহণ করেন। কিন্তু তখন সেখানকার রাস্তাঘাট খুব একটা ভালো ছিলো না। ব্রিটিশ আমলে নির্মিত রাস্তাগুলো ছিলো জরাজীর্ণ। তাই মোমিন কোম্পানি নিজ খরচে রাস্তাগুলো সংস্কার করে বাস চলাচলের উপযোগী করে তোলে। মোমিন কোম্পানির দেখাদেখি সেখানে আরো কয়েকজন বাস কোম্পানি গড়ে তোলে। আশির দশক পর্যন্ত সেসব পুরোনো বাসগুলো কেরানীগঞ্জের জিঞ্জিরা-রুহিতপুর রোডে চলাচল করতে দেখা গেছে।

ঢাকা-কেরানীগঞ্জের পরিবহন ব্যবসার সাফল্যের হাত ধরে মোমিন কোম্পানি তাদের রুট নরসিংদী পর্যন্ত সম্প্রসারণ করে। নরসিংদী তখন তাঁতশিল্পের কেন্দ্রবিন্দু। বাবুরহাট, মাধবদী, হাসনাবাদ, পুরিন্দা, পাঁচরুখী ও গোপালদী জুড়ে ছিলো অসংখ্য তাঁত ব্যবসায়ী। কাপড় পরিবহনের কথা চিন্তা করে প্রায় ২০ মাইল কাঁচা সড়ক সংস্কার করার উদ্যোগ নেয় মোমিন কোম্পানি। নরসিংদী থেকে তারাব রাস্তাটি ছিলো ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের মলিাকানাধীন। তাই বেসরকারি বাস সার্ভিস চালু করতে গিয়ে কোম্পানিটিকে ডিস্ট্রিক্ট বোর্ড থেকে অনুমতি নিতে হয়। এজন্যে তাদেরকে লিজ মানিও পরিশোধ করতে হয়। ১৯৬২ খ্রিস্টাব্দের দিকে কাঁচা রাস্তায় ইট বিছানোর কাজ শুরু করে মোমিন কোম্পানি।

তখন অনেক সতকর্তার সঙ্গে সরু রাস্তা দিয়ে বাসগুলো চলতো। পরবর্তীতে রাস্তা প্রশস্ত এবং পাকা করা হলেও মোমিন কোম্পানির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সরকারি বাস চলাচল শুরু করে। সরকারি বাসগুলোকে তখন স্টেট বাস বলা হতো। কে বেশি যাত্রী পাবে, তা নিয়ে মোমিন কোম্পানি ও স্টেট বাসের মধ্যে ব্যাপক প্রতিযোগিতা শুরু হয়। তখন এক বাস আরেক বাসকে ওভারটেক করে সামনে যাওয়ার জন্যে সাইড দিতো না। যার ফলে অনেক সময় বাস রাস্তার পাশে ছিটকে পড়তো। ছোটোখাটো দুর্ঘটনা ঘটতো প্রায়ই। সময়ের ব্যবধানে সেই প্রতিযোগিতা অনেক কমে যায়। মোমিন কোম্পানি ও স্টেট বাসের পাশাপাশি আরো কয়েকটি কোম্পানি সেই রুটে বাস সার্ভিস শুরু করে। তারাব-ডেমরায় ফেরি সার্ভিস শুরু হলে নরসিংদী থেকে ঢাকায় সরাসরি যোগাযোগ স্থাপিত হয়।

পুরান ঢাকার একাধিক প্রবীণ বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঢাকার বাস সার্ভিসের শুরুতে মোমিন কোম্পানির দাপট ছিলো মফস্বল এলাকায়। তারা কেরানীগঞ্জ ও নরসিংদী এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে বিশেষ ভূমিকা রাখে। তারা সেখানে বাস সার্ভিসের পাশাপাশি রাস্তাঘাটের উন্নয়ন করেছে। অপরদিকে ঢাকায় পরিবহন সেক্টর নিয়ন্ত্রণ করতেন মাওলা বখত সরদার ও হাবিবুর রহমান খান। তারা ঢাকা-ধামরাই, ঢাকা-নবাবগঞ্জ রুটে পরিবহন সার্ভিস চালু করেন। ঢাকা ভ্যাহাইক্যাল এসোসিয়েশন টাউন সার্ভিস চালু করে ঢাকার যোগাযোগ ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনে। তারা দুটি রুটে বেশ কিছু গাড়ি চালাতো। তবে একক ব্যবসায়ী হিসেবে মোমিন কোম্পানির কর্ণধার বেশ প্রভাবশালী ছিলেন। তিনি ঢাকার ঈদ মিছিলের নেতৃত্ব দিতেন। দীর্ঘদিন সেই মিছিল আয়োজক কমিটির সেক্রেটারি ছিলেন আব্দুল আজিজ। সভাপতি ছিলেন জুম্মন সরদার।


আপেল মাহমুদ
সাংবাদিক, গবেষক ও দুষ্প্রাপ্য গ্রন্থ সংগ্রাহক

সম্পর্কিত

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সর্বশেষ