নরসিংদীতে বিলাতি ধনিয়া চাষ : সম্ভাবনার নতুন পথ

নরসিংদী শাক-সবজি উৎপাদনসহ বিভিন্ন কৃষিজাত ফসল উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এখানকার সবজি পুরো দেশব্যপী বিপণন করা হয়। বিশেষ করে, শিবপুর, বেলাব ও রায়পুরা উপজেলায় প্রচুর সবজি উৎপাদিত হয়।

বিলাতি ধনিয়া বা বাংলা ধনিয়া, যার বৈজ্ঞানিক নাম Petroselinum Crispum। এটি একটি মশলা জাতীয় ফসল। চাসনি পাতা হিসেবেও এর পরিচিতি আছে। এর পাতা সবুজ, লম্বাকৃতির, চারপাশে করাতের দাঁতের মতো খাঁজ কাটা। প্রখর সুগন্ধিযুক্ত, পুষ্টিগুণসম্পন্ন ও উন্নত ভেষজগুণে সমৃদ্ধ। নরসিংদী জেলার বেলাব, শিবপুর ও রায়পুরা উপজেলার ছায়াযুক্ত পতিত জমিতে বিলাতি ধনিয়ার চাষাবাদ হয়ে থাকে। বিশেষ করে, বেলাব-শিবপুর উপজেলার উয়ারী, বটেশ্বর, উজলাবো, রাঙ্গারটেক, জয়নগরসহ বেশকিছু এলাকায় কৃষকেরা বাণিজ্যিকভাবে এর চাষাবাদ শুরু করেছেন। এই এলাকার মাটি খুবই উর্বর, রসালো, পানি নিষ্কাশনের ভালো ব্যবস্থা আছে এবং ছায়াযুক্ত পরিবেশ থাকায় এখানে বিলাতি ধনিয়ার ভালো চাষাবাদ হয়। পুরো এলাকা জুড়েই রয়েছে বিভিন্ন ফলের গাছ— আম, কাঁঠাল, লটকন ও বিভিন্ন রকমের গাছপালা। এতো এতো গাছপালা থাকার ফলে জমিতে পর্যাপ্ত পরিমাণে ছায়া পড়ে। এসবকিছু মিলিয়ে এখানকার ভূমি এই ফসল উৎপাদনের জন্যে অনুকূল পরিবেশ তৈরি করেছে।

কৃষকেরা প্রথমে তিন-চারবার ভালো করে জমি চষে, মাটি ভেঙে ঝুরঝুরে করে, জমিতে পরিমাণমতো গোবর ও রাসায়নিক সার দিয়ে মাটির সাথে ভালোভাবে মিশিয়ে নেয়। তারপর জমিতে সেচের পানি দিয়ে মাটি রসালো করে বীজ বোনে। নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি মাস (মধ্য কার্তিক থেকে মধ্য ফাল্গুন) পর্যন্ত বীজ বোনা হয়। চারা গজানোর পর নিয়মিত নিড়ানি দিয়ে আগাছা পরিষ্কার করে জমিতে সেচ প্রদান করা হয়, নির্দিষ্ট সময় পর পর ইউরিয়া সার উপরিপ্রয়োগ করা হয়। চারা গজানোর ৪৫ থেকে ৬০ দিনের মধ্যে ফসল সংগ্রহ করা হয়। গাছের নিচের দিকের বড়ো পাতাগুলো তুলে ডুবো পানিতে ধুয়ে আঁটি বেঁধে বিক্রির জন্যে প্রস্তুত করা হয়। প্রতিদিন বিকেলে কৃষকেরা পাতা তুলতে ব্যস্ত সময় পার করে। বিকেলে পাতা তুলে সন্ধ্যার মধ্যেই সমস্ত কাজ শেষ করে প্রস্তুতকৃত পাতা বিক্রি করে পরদিন সকালে। এভাবে পাতা তুললে দীর্ঘমেয়াদে নিয়মিত পাতা তোলা যায়।

আমার স্বামী চৌদ্দ গণ্ডা (একুশ শতক) জমিতে ধইন্যা লাগাইছেন। আমি প্রতিদিন বিকেলে পাতা তুলে ধুয়ে আঁটি বেঁধে দেই। অনেক পরিশ্রম লাগে। খরচ হইছে পঞ্চাশ হাজার টাকার বেশি। আশা করি, পাঁচ লাখ টাকার মতো বিক্রি করতে পারবো।

কৃষক লতিফ মিয়া (৫৫) বলেন, “বিলাতি ধনে চাষ করতে অনেক খাটুনি লাগে। নিয়মিত নিড়ানি দিতে হয়, জমিতে আগাছা হলে ফলন কম হয়।” তিনি আরো বলেন, “করতে পারলে লাভ আছে। খরচ কম, লাভ বেশি। গায়ে-গতরে খাটতে হয় বেশি। একবার লাগাইলে সারা বছর পাতা তোলা যায়।”

বটেশ্বরের কৃষক কফিল উদ্দীন খান (৪৮) জানান, “তিনি পাঁচ গণ্ডা (আট শতাংশ) জমি চাষ করেছেন। এখানে প্রায় বিশ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। তিনি এখনো পর্যন্ত চল্লিশ হাজার টাকার পাতা বিক্রি করেছেন। পুরো সিজনে প্রায় দুই লাখ  টাকা বিক্রি করতে পারবেন বলে আশা করছেন।”

প্রতি শতক জমি চাষাবাদ করতে ২,০০০-২,৫০০ টাকা খরচ হয়। আর পাতা সংগ্রহ করা যায় প্রায় ১৮০-২৫০ কেজি। প্রতি কেজি পাতা গড়ে ১০০-১২০ টাকা করে পাইকারি বিক্রি হয়। স্থানীয় বটেশ্বর বাজারে প্রতিদিন সকাল এগারোটা থেকে দুপুর একটা পর্যন্ত হাট বসে। এখানে কৃষকের কাছ থেকে পাইকাররা পাতা কিনে ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলা ও বিভাগে আড়তদার এবং খুচরা বিক্রেতাদের কাছে বিক্রি করে। এছাড়াও মরজাল, বারৈচা ও শিবপুর বাজারে নিয়মিত কেনাবেচা হয়। বর্ষার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পূর্ণ উদ্যমে চলে এই কাজ। টানা দুই থেকে তিন মাস কৃষকেরা পাতা সংগ্রহ করতে পারেন। এছাড়াও বয়স্ক চারা থেকে বীজ সংগ্রহ করে সেই বীজ বিক্রি করেও আয় করা যায় বাড়তি টাকা।

কৃষক ফুলমতি (৫২) জানান, “আমার স্বামী চৌদ্দ গণ্ডা (একুশ শতক) জমিতে ধইন্যা লাগাইছেন। আমি প্রতিদিন বিকেলে পাতা তুলে ধুয়ে আঁটি বেঁধে দেই। অনেক পরিশ্রম লাগে। খরচ হইছে পঞ্চাশ হাজার টাকার বেশি। আশা করি, পাঁচ লাখ টাকার মতো বিক্রি করতে পারবো।”

এই অঞ্চলে প্রচুর পরিমাণে গাছপালা আছে। মাটির পুষ্টিগুণ খুবই ভালো, পর্যাপ্ত বৃষ্টি হয়, মাটির পানি ধারণ ক্ষমতা বেশি, পানি নিষ্কাশনের সুবিধা ভালো। অনেক গাছপালা, বাগান থাকার জন্যে পর্যাপ্ত ছায়া পাওয়া যায়। বিলাতি ধনে সরাসরি রোদে পড়লে পাতার কাঁটা শক্ত হয়ে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে যায়। সেজন্যে আলাদা করে ছাউনির ব্যবস্থা করা লাগে। কিন্তু আমাদের এই অঞ্চলে এসবের কোনো প্রয়োজন নেই। মাটির পুষ্টিগুণ ভালো হওয়ায় সার বেশি লাগে না। ফলে খরচ অনেকাংশে কমে যায় এবং উৎপাদন ভালো হয়। এই ফসল চাষে কৃষকের ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। অন্যান্য ফসল চাষে কৃষকদের বাড়তি রাসায়নিক সার ও মজুরির খরচ গুণতে হয়। বাড়ির আঙিনায়, বাগানের মধ্যে খালি জমি ইত্যাদি স্থানেই চাষ করা হয়। ফলে পরিবারের সকলে একসাথে হাত লাগিয়ে কাজ করতে পারে। কৃষকের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, বিলাতি ধনিয়া চাষে বিঘা প্রতি আনুমানিক খরচ ষাট থেকে সত্তর হাজার টাকা। আর ফসল সংগ্রহ করে বিক্রি করে আয় হবে আনুমানিক সাত থেকে আট লাখ টাকা। কৃষকের আরেকটু সচেতনতা ও কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের সুনজর পড়লে আশা করা যায়, অন্যসব সবজির মতো এটিও হতে পারে একটি প্রধান অর্থকরী ফসল এবং এতে তৈরি হবে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার।

সম্পর্কিত

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সর্বশেষ