জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের এক বছর : প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি

ছাত্র জনতার অভ্যুত্থানের মাধ্যমে স্বৈর সরকার পরিবর্তনের এক বছর পূর্ণ হলো। এই এক বছরে বাংলাদেশের অর্জন কী? জনগণের প্রত্যাশা কী ছিলো আর কী প্রাপ্তি ঘটেছে? ফ্যাসিবাদের পতন কি হয়েছে? না হলে কেন হয় নাই, কোথায় ঘাটতি— এসব বিষয় নিয়ে ‘গঙ্গাঋদ্ধি’ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার সাতজনের মতামত তুলে ধরেছে। এই মতামত একান্তই যার যার ব্যক্তিগত ভাবনা উৎসারিত।

আজহারুল হক লিংকন
সংগঠক, জুলাই স্মৃতি ফাউন্ডেশন

জুলাই কোনো তথাকথিত গণঅভ্যুত্থান নয়। বাংলাদেশের ইতিহাসে এই প্রথম রাজনৈতিক সংগঠিত শক্তির সরাসরি তত্ত্বাবধানে বা নেতৃত্বে গণঅভ্যুত্থান হয় নাই। রাজনৈতিক ক্ষমতার গঠনের দিক দিয়ে এটি ছিলো একটি বিকেন্দ্রিভূত গণগঠন। যদিও পরবর্তীতে ছাত্রদের নেতৃত্বে একটি রাজনৈতিক দল তৈরি হয়েছে এবং কেউ কেউ এটাকে সেই রাজনৈতিক সংগঠনের অধীনে সংগঠিত একটি অভ্যুত্থান হিসেবে চিত্রিত করার চেষ্টা করেছে, কিন্তু আদতে সেটা বাস্তবতা পরিপন্থী। জুলাই একটি স্বতঃস্ফূর্ত গণবিস্ফোরণ, যেখানে সাহসী তরুণদের সমন্বয়ধর্মী নেতৃত্বকে সামনে রেখে মানুষ সংগঠিত হয়ে একটি ফ্যাসিস্ট কাঠামোর দখলকারীদের উচ্ছেদ করেছে। কিন্তু ফ্যাসিস্ট কাঠামোটি এখনো তার ডালপালা নিয়ে বহাল তবিয়তে দাঁড়িয়ে আছে। আমাদের ব্যর্থতা হচ্ছে জুলাইয়ের এই গণগঠনটিকে আমরা রাষ্ট্র বিনির্মাণের কোনো নির্দিষ্ট আকাঙ্ক্ষা কিংবা আকাঙ্ক্ষাগুচ্ছের সাপেক্ষে একাট্টা রাখতে পারি নাই। অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী প্রতিটি পক্ষ নিজেদের ক্ষুদ্র স্বার্থের বিপরীতে গণসার্বভৌম রাষ্ট্র নির্মাণের প্রয়োজনকে উপেক্ষা করেছি ও যার যার পেটি স্বার্থকে গণঅভ্যুত্থানের প্রধান উদ্দেশ্য হিসেবে প্রচার করে মানুষকে বিভ্রান্ত করেছি ও নিজেদের মধ্যে লড়াই-সংগ্রামে ব্যস্ত থেকেছি। যার মধ্যে শাতিম কেন্দ্রিক উগ্র ডানপন্থী রাজনীতি যেমন আছে, তেমনি আছে পৈতৃক সম্পত্তিতে সমানাধিকারের মতো সময় অনুপযোগী কৌশলগত ভুল সেক্যুলার আন্দোলন। আমরা ভুলে গেছি মানুষের অর্জিত সম্পত্তির অধিকার থেকে কেউ যাতে বঞ্চিত না হয়, সেই ব্যবস্থা কায়েম করাটা কৌশলগতভাবে আগের কর্তব্য। ঘোড়া কাঁধে নিয়ে জিনের অধিকার নিয়ে কামড়া-কামড়ি আমাদের জুলাইকে ব্যর্থ করে দিয়েছে। সরকার ও রাষ্ট্রের মধ্যে তফাৎ সম্পর্কে আমাদের রাজনৈতিক অজ্ঞতাই এই পতনের কারণ। ঘোড়ার জিন আপনি বাঘের পিঠে চড়িয়ে বসতে পারবেন না। রাষ্ট্রের গঠন যদি মানুষখেকো হয়, তাহলে সরকারে আপনি ইউসুফ নবীকে বসিয়ে দিলেও তিনি আপনাকে নিয়ে তরতর করে এগিয়ে যেতে পারবেন না। রাষ্ট্রের রাজনৈতিক গঠনের আমূল পরিবর্তন ও মানুষের সরাসরি রাজনৈতিক নীতিনির্ধারণীতে সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব নিশ্চিত করার আগেই তড়িঘড়ি একটা নির্বাচন দিয়ে সরকার পরিবর্তন করে হয়তো আবারো আমরা মানুষখেকো একটা রাষ্ট্রব্যবস্থার খপ্পরেই পড়তে চলেছি। তবে আশার ব্যাপার হচ্ছে, জুলাই বঙ্গোপসাগরের তীরে এই অচ্ছুৎ নমশুদ্র ও মেচ্ছেলদের সম্বিলিতভাবে বাঘ শিকার করতে শিখিয়ে দিয়ে গেছে। তথ্য প্রযুক্তির এই বিপ্লবী সময়ে মুহূর্তেই গণগঠনের শিক্ষা আমাদের সামষ্টিক লড়াইয়ের ইতিহাসকে আর পেছনে ঠেলে নিয়ে যেতে দেবে না। আমাদের সামনে আরো অসংখ্য ছোটো-বড়ো লড়াই অপেক্ষা করছে। জনতার সামষ্টিক অভিপ্রায়ের বিকাশ ঘটিয়ে শক্তিশালী গণরাজনৈতিক ধারা কীভাবে গড়ে তোলা যায়, দ্রুত সেই রাজনৈতিক শিক্ষা আমাদের নিজেদের অর্জন করা ও ছড়িয়ে দেয়াই এখনকার মূল রাজনৈতিক লক্ষ্য হওয়া উচিত বলে মনে করি।

বালাক রাসেল
সম্পাদক, dheki24.com

ব্রিটেনের একদল গবেষক সারা দুনিয়া থেকে তিনশত ষাটটি আন্দোলন নিয়ে গবেষণা করে দেখিয়েছেন যে, কোনো আন্দোলনে যদি একটি ভূখণ্ডের মোট জনসমষ্টির দুই থেকে তিন শতাংশ মানুষ রাস্তায় নামে, তাহলে সেই আন্দোলনের সফলতার হার মোটামুটি একশত ভাগ না হলেও কাছাকাছি। সেই হিসেবে বাংলাদেশের প্রায় আশি শতাংশের বেশি  মানুষ এই আন্দোলনে সমর্থন দিয়েছিলেন এবং লক্ষ লক্ষ মানুষ রাস্তায় নেমে এসে তাদের ক্ষোভ ঝেরেছেন। এই সফল অভ্যুত্থানের পলিটিক্যাল ট্রান্সলেশন নিয়ে এখনো পর্যন্ত ব্যাপক বিতর্ক এবং আলোচনা-সমালোচনা বিদ্যমান। তবে অন্তত এটা সবাই মেনে নিয়েছে যে, জনগণ একটা বৈষম্যহীন রাষ্ট্রের চাহিদা নিয়ে রাজপথ দখল করেছিলেন। বেশ কিছুদিন ধরেই কিছু মানুষ অভ্যুত্থানের একজন সমর্থক হিসেবে আমাকে বলেছে যে, যারা এই আন্দোলনে সম্পৃক্ত হয়েছিলেন, তারা প্রতারিত হয়েছেন। আসলে বিষয়টি যারা বলছে, একদিক থেকে এটার ট্রান্সলেশনটা জটিল। প্রতিউত্তরটা বর্তমান সরকারের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি নিয়ে আলোচনা করলে মোটামুটি চিত্রটা দেখা যাবে। গণঅভ্যুত্থানে জনগণ নেমে এসে ভুল করে নাই। আর ইতিহাস বলে, প্রতিটি গণঅভ্যুত্থানেই জনগণ স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে থেকে ন্যায্যতার ভিত্তিতেই আন্দোলন করে। চব্বিশেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। জনগণ অভ্যুত্থান করে দানব হটিয়ে বিদায় করেছে, এটা তাদের সফলতা। কিন্তু রাষ্ট্র মেরামতের কাজ তো আর জনগণের করার কথা নয়। যারা এখন রাষ্ট্র মেরামতের কাজ করছে, রাষ্ট্রের গঠন যদি না করতে পারে, সেটা তাদের দোষ। আখের গোছানোর এই অভ্যুত্থানের পরপরই জনমনে পোক্ত ধারণা জন্ম নিয়েছিলো যে, দেশের গাঠনিক কাঠামো এবার বদলাইয়া ওঠবে। প্রয়োজনের তাগিদেই সেটা হতে হবে। অভ্যুত্থান পরবর্তী এক বছরে অন্তর্র্বর্তীকালীন সরকারের নিষ্প্রভ আচরণ অনেক কিছুরই ইঙ্গিত বহন করে। তাদের নির্লিপ্ততা বৃক্ষের গোড়ায় পানি ঢালার ন্যায়। স্বাধীনতা বিরোধী শক্তির উত্থান আরেকটি বড়ো উদ্বেগের বিষয়। যেখানে লাইভ টকশোতে এসে বাংলাদেশকে তালেবানি রাষ্ট্র বানানোর ইচ্ছা বা হুমকি দেন, তখন আমরা দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়ি নারী শিক্ষার বিরোধিতা  আর খেলাফতি কায়দায় দেশ পরিচালনা নিয়ে। অভ্যুত্থানের নারী শক্তির হেনস্তার মধ্য দিয়ে তা মোটামুটি পরিষ্কার হয়ে গেছে। অন্যদিকে, বামদের আন্দোলনে সম্পৃক্ত করতে রাজি না হওয়া, জামাতের নিজের মতো সংবিধান তৈরি করা, মুক্তিযুদ্ধের বিকল্প হিসেবে অভ্যুত্থানকে দাঁড় করানো, বিএনপির চাঁদাবাজি, এনসিপির কর্মকাণ্ড, ইউনুসের গ্রামীণ ইউনিভার্সিটি, ছয়শত ছেষট্টি কোটি টাকার কর রেয়াত, পাঁচ বছরের ট্যাক্স মওকুফ, গ্রামীণ ব্যাংকের সরকারি মালিকানা পঁচিশ থেকে দশ শতাংশে আনা, খুন, ধর্ষণ, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মব কালচার, আমেরিকার সাথে গোপন চুক্তি, আমেরিকার শুল্ক ইত্যাদি এমন আরো বহু সমস্যায় জর্জরিত বাংলাদেশের ইন্টেরিম সরকারের সময়টা অত্যন্ত দুঃখজনকভাবে অতিক্রম করছে। এটা তাদের ব্যর্থতা। এদিকে মুক্তিযুদ্ধকে পাশ কাটিয়ে ‘নতুন বাংলাদেশ’ আর ‘দ্বিতীয় স্বাধীনতা’র ন্যারেটিভ দাঁড় করানোর আপ্রাণ চেষ্টা জামায়াতের ইতিহাসের খপ্পরে আরেক ধাপ এগিয়ে যাওয়ার পায়তারা ঊর্ধ্বসীমা অতিক্রম করে ফেলেছে। এদিকে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানকে ইসলামি বিপ্লব নামে যে-এস্টাবলিশমেন্টের প্রচেষ্টা, এটা কেবল গণতন্ত্রকে খামচেই ধরবে না, একে খেলাফতি কায়দায় নারী স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করে বাকস্বাধীনতায় শেষ পেরেকটি ঠুকে দিবে।  ডিপ স্টেটের মাধ্যমে  ফ্যাসিবাদের ফিরে আসা আমাদের শুধু অবাকই করেনি, সেই সাথে আতঙ্কেরও জন্ম দিয়েছে। অভ্যুত্থান পরবর্তীকালে বাংলাদেশের সরকার নিয়ে প্রথম যে-বাক্যটি ব্যয় করেছিলাম, সেটা হলো বিপ্লবী সরকার গঠন। কিন্তু  হয়নি।

মফিজুল ইসলাম
যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল, নরসিংদী

আসলে ১৭ বছর স্বৈরশাসনের পর যে-অভ্যুত্থানটা হলো ছাত্র সমাজের মাধ্যমে, দেশের মঙ্গলার্থেই এটা ঘটেছে। তবে আমরা আশা করেছি দ্রুত সময়ের মধ্যে একটা পরিবর্তন আসবে; ইদানিং আমরা যেটা দেখছি যে, বিভিন্ন জায়গায় চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অপকর্ম হচ্ছে, সেগুলোও থাকবে না। যার যার দল থেকে বিভিন্ন ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। আমি আশা করি, এই সাময়িক অপচ্ছায়া দূর হয়ে যাবে। আর কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য হচ্ছে নির্বাচন। সেই নির্বাচনটা হয়ে গেলে, দলীয় সরকার ক্ষমতায় আসলে আরো কঠোরভাবে দমন করা যাবে। আমরা সবাই জানি, দেশে ঠিকভাবে আইনের প্রয়োগ হচ্ছে না। বিভিন্ন বাহিনি যারা আছেন, পুলিশ-আর্মি— তাদের আরো সোচ্চার হওয়ার দরকার ছিলো। আমরা আশা করেছিলাম দেশে সেনাবাহিনির মাধ্যমে একটা চিরুনি অভিযান হবে, দোষী যারা আছে, দেশে অবৈধ অস্ত্র যেগুলো আছে, সেগুলো উদ্ধার হবে, কিন্তু আমার মনে হচ্ছে, এগুলো পরিপূর্ণভাবে হচ্ছে না। বিভিন্ন দলের নেতাকর্মীরা যদি আরো পারস্পরিক ভুল বোঝাবুঝির অবসান করে একত্রে কাজ করেন, তাহলে সবার জন্যই মঙ্গল হবে। আমরা যুদ্ধ করে লাল সবুজের পতাকা পেয়েছি, এটা ধরে রাখতে চাই। গণতান্ত্রিক মানুষের মুক্তির যে-স্বাদ, সেটা হচ্ছে নির্বাচন। সেই নির্বাচনের মাধ্যমে আমরা একটা সুন্দর বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চাই।

রবিউল আলম নবী
কবি ও গল্পকার

আমাদের দেশটা স্বপ্নপুরী। আসলেই কি তাই? আসলেই কি তাই নয়? এই স্বপ্নপুরীর পরতে পরতে লুকিয়ে আছে দানব-দৈত্য-রাক্ষস-ভোক্ষক-খোক্ষক। জ্বিন-পরী, দেও-দানব। পরতে পরতে আমলাবাজ-দুর্নীতিবাজ। উগ্রধর্মবাজ, উগ্রবিধর্মবাজ। আজানবাদী। নারায়ে তাকবিরবাদী। যারা সুন্দরের ধ্বংসকামী, অসুন্দরের উত্থানকামী। নতুবা ৩৬-এর গণঅভ্যুত্থানের পর যে-অলৌকিক চেহারা বেরিয়ে আসছে এইসব দৈত্য-দানবের, সে-চেহারা কোনো হিউমেন বিয়িংয়ের চেহারা নয়। মানুষ চেয়েছিলো মানুষের অধিকার। চেয়েছিলো রাষ্ট্রটি এমন একটি রাষ্ট্রে রূপান্তরিত হবে, যে-রাষ্ট্রে বাক-ভোট-বুদ্ধির স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠিত হবে। কিন্তু তার কিছু তো হয়ইনি, বরং ক্রমে ক্রমে তলিয়ে যাচ্ছে সমগ্র সম্ভাবনার সুলুক। বিশ্বফিগার হিসেবে ড. ইউনুসের কাছে প্রত্যাশা ছিলো বাংলাদেশকে গ্লোবাল পলিটিক্যাল এনভায়রনমেন্ট দেয়া। কিন্তু তিনি পদে পদে ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছেন। পারছেন না মবতন্ত্রকে সামাল দিতে, পারছেন না প্রশাসনিক শক্তিকে কাজে লাগাতে। একটি বিশৃঙ্খল-উলঙ্গ সমাজব্যবস্থা ক্রমে অশ্লীলতার দিকে ধাবিত হচ্ছে। এই রাষ্ট্রে এখন একটি হারমোনিয়ামও মেট্রোরেলে ওঠার ক্ষমতা রাখছে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের মতো রাষ্ট্রায়ত্ত্ব প্রতিষ্ঠানও নারীদের যাপিত জীবনে ফেলছে আবরণ ও আভরণগত নিষেধাজ্ঞা। মোড়ে মোড়ে চাঁদাবাজি। মানুষ হত্যার একটা টি-টোয়েন্টি উল্লাস চলছে বাংলাদেশ নামক স্টেডিয়ামে ও তার দর্শক গ্যালারিতে। এখন এটা সত্যিই একটা স্বপ্নপুরীÑ মধ্যযুগে সদ্য ইউটার্ন নেয়া দানব-দৈত্য-রাক্ষস-ভোক্ষক-খোক্ষকময় এক অবক্ষয়পুরী। আজানবাদী মারছে ঘণ্টাবাদীকে, নারায়ে-তাকবিরবাদী মারছে নারায়ণবাদীকে। সারা বাংলাদেশ জুড়ে ৩৬-এ নিহত হওয়া সন্তানের মায়েদের চিৎকার ছাড়া আর কিছু প্রবেশ করছে না কারো কর্ণকুহরে।

সুমাইয়া শিকদার
সদস্য, নারী অঙ্গন

জুলাই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আগস্টের ৫ তারিখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালিয়েছে। আমরা যারা জুলাইয়ের ময়দানে, মাঠে ছিলাম, যারা আমাদের পাশে ছিলো, জুলাই পরবর্তী সময়ে আমাদের, দেশের মানুষের আকাঙ্ক্ষা ছিলো, এবার আমাদের দুঃখ-কষ্ট-দুর্দশার লাঘব হবে। নিরাপদ জীবনযাপন করবে। কিন্তু জুলাই পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে আমরা লক্ষ্য করছি যে, গত একবছরে দেশের সার্বিক পরিস্থিতি, আইন-শৃঙ্খলার কোনো উন্নতি হয়নি। নারী নিপীড়ন, ধর্ষণ-হত্যা, খুন, মব-মোরাল পুলিশিংয়ের নামে হেনস্তা, একের পর এক নাগরিকের মানবাধিকার ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। এসবের বিরুদ্ধে সরকার কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না। বরং বিপরীতে আমরা দেখছি, একজন নারী হেনস্তাকারীকে মব নিয়ে গিয়ে থানা থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে ফুলের মালা দিয়ে বরণ করা হচ্ছে, অপরাধীর হাতে কুরআন শরীফ তুলে দিয়ে পুরস্কৃত করছে। জুলাইয়ের প্রতিবাদী নারীদের অনলাইন-অফলাইনে সমানে হেনস্তা করা হয়েছে। এমনকি দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও কোনো পরিবর্তন হয়নি। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো পুনরায় রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে। অথচ আমাদের আশা ছিলো সিস্টেমের পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে মানুষের জীবন-যাপন সহজ করা হবে, প্রত্যেকের মৌলিক চাহিদা পূরণ হবে। জুলাইয়ে শহীদদের পূর্ণ মর্যাদা দেয়া হবে, আহতদের চিকিৎসা নিশ্চিত করা হবে, কিন্তু তা হয়নি। এখনো পর্যন্ত জুলাইয়ের আওয়ামী সন্ত্রাসীদের, হত্যাকারীদের বিচারের আওতাভুক্ত করতে পারেনি। আমরা দেখেছি, সেনাবাহিনির সহায়তায় হাসিনা যেভাবে দেশ ছেড়ে পালিয়েছে, ঠিক সেভাবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্বে আসার পর আওয়ামী লীগের বড়ো বড়ো নেতাকর্মীরা দেশ থেকে পালিয়েছে। আমরা চাই, এই আওয়ামী দোসরদের বিচারের আওতায় নিয়ে আসুক। এদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা হোক।

নির্জনা
সদস্য, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, কেন্দ্রীয় কমিটি

জুলাই গণঅভ্যুত্থান অনেকের কাছে নিজের চোখ, পা, শরীরে গুলির জখম, সহযোদ্ধা হারানো, আপনজন হারানো, আবার কারো কাছে জুলাই গণঅভ্যুত্থান মানে একটা ‘কোটা আন্দোলন’। ২০২৫ সালের জুলাই মাসে এসেও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা আমাদের কাছে একটুও ম্লান হয়ে যায়নি। আমরা যারা জীবনকে হাতে নিয়ে রাজপথে নেমেছিলাম, তাদের কাছে আমরা যারা পুলিশি হামলা আর ছাত্রলীগের তাণ্ডবের শিকার হয়েছিলাম, তাদের কাছে, এমনকি এদেশের জনতা, যারা শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, তাদের কাছে কোনোদিন জুলাই গণঅভ্যুত্থান ম্লান হবে না। আমার মনে পড়ে, ১৬ জুলাই নরসিংদীর বিপ্লবী শিক্ষার্থীরা ঘোষণা দেয়, জেলখানার মোড়ে বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হবে। সেদিন ছাত্রলীগ পুলিশের সাথে একজোট হয়ে আমাদের উপর হামলা করে আর একই ধারাবাহিকতায় ১৮ জুলাই পুলিশ আমাদের নিকটবর্তী তিনজন সহযোদ্ধা (মিজানুর রহমান, রাকিবুল ইসলাম, শাহীন ভূঁইয়া)-সহ নানা স্থান থেকে আন্দোলনে যোগ দেয়া শিক্ষার্থীদের গ্রেফতার করে। আর সেদিন বিকেলে চালায় নির্মম হত্যাকাণ্ড। সেই হাসিনা বাহিনির হাতে আমাদের ভাই তাহমিদসহ আরো অনেকে নিহত ও আহত হয়। এই ইতিহাস আসলে ম্লান হওয়ার ইতিহাস না।  কিন্তু আমরা যখন ৫ আগস্টে স্বৈরশাসক হাসিনার পতন ঘটাই এবং তাকে পালাতে বাধ্য করি, তখন থেকেই আমরা যে ‘দ্বিতীয় স্বাধীনতা’ অর্জন করেছি, এই ধারণা ছিলো ভুল। আমরা দেখতে পাই, হাসিনার পতনের পর যে-ইন্টেরিম সরকারকে দেশ পরিচালনার ভার আমরা দিয়েছি, সেই ইন্টেরিম সরকার আমাদের বারবার নিরাশ করেছে। গণঅভ্যুত্থানের পর সংখ্যালঘুদের উপর হামলা, বিভিন্ন জায়গায় মাজার ভাঙা, মন্দির ভাঙা, মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য ভাঙা, নাটক বন্ধ করে দেয়া, বাউলমেলা বন্ধ করে দেয়া, সিনেমা হল বন্ধ করে দেয়াসহ নানা বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটে। তাছাড়া বিপুল পরিমাণ নারী নিপীড়কের উত্থান দেখে আমরা অবাক হই। বিভিন্ন জায়গায় মবতন্ত্র আমাদের নতুন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্নকে ভেঙে দেয়। ইন্টেরিম সরকারের এনজিও কোটা আর মৌলবাদীদের প্রতি নীরব সমর্থন আমাদের আশাহত করে। এমনকি ইন্টেরিম সরকার বন্দর, করিডোরের মতো স্পর্শকাতর বিষয়গুলো নিয়ে যেসব সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, তাতেও দেশবাসী হতাশ। ফলস্বরূপ আমরা দেখছি, অনেকে বলছি, এই গণঅভ্যুত্থান মার্কিন এক্টিভিস্টের এক কালার রেভ্যুলেশন। আমরা আমাদের লড়াই জারি রেখেছি। বন্দর, করিডোর রক্ষায় আমরা ঢাকা টু চট্টগ্রাম দুইদিনের রোডমার্চ কর্মসূচির ডাক দিই আর ছাত্রজনতার অংশগ্রহণের মাধ্যমে রোডমার্চ সফল করি। আমরা আরো দেখতে পাই, গণঅভ্যুত্থানের পর ইন্টেরিম সরকার কুখ্যাত রাজাকার জামায়াত নেতা এটিএম আজহারুল ইসলামকে বেকসুর খালাস দেয়। তাৎক্ষণিক বিক্ষোভ মিছিল করে আমরা বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন তার প্রতিবাদ জানাই রাজু ভাস্কর্যের সামনে অবস্থান করে। কিছুদিন আগে যুদ্ধাপরাধী জামায়াতে ইসলামকে ঐতিহাসিক  সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশ করার অনুমতি দেয়াতেও ছাত্র ইউনিয়ন নিন্দা জানায়। আমরা মনে করি, যুদ্ধাপরাধী দল জামায়াতে ইসলামকে ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশের অনুমতি দিয়ে ইন্টেরিম সরকার মুক্তিযুদ্ধকে কলঙ্কিত করেছে। তাছাড়াও বিভিন্ন দেয়ালচিত্রে বাংলাদেশকে মুসলিমবঙ্গ উল্লেখ্য করার মতো নানা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা আমরা লক্ষ্য করি গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে। তবুও নির্বাচিত সরকারের মাধ্যমে দেশের স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরে পাওয়াই এখন আমাদের একমাত্র প্রত্যাশা। তাতেও ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা দল ও গোষ্ঠীর লোকজন নির্বাচন পেছানোর নানা এজেন্ডা হাতে নিচ্ছে। আমাদের লড়াই এখনো শেষ হয়নি।  জুলাই এখনো চলমান।

সাহাদাত হোসেন
ব্যবসায়ী, শেখেরচর বাজার

আপনি প্রশ্ন করেছেন, ২৪-এর পরে কেমন বাংলাদেশ চেয়েছি, আমি কেমন বাংলাদেশ চেয়েছি। আমি অবশ্যই বৈষম্যহীন বাংলাদেশ চেয়েছি। আর ২৪-এর আন্দোলনটা শুরু হয়েছিলো বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন হিসেবে। কিন্তু আমি আশাহত হয়েছি যে, সেই বৈষম্য এখনো রয়েই গেলো। এতোগুলো মানুষ শহীদ হলেন, কিন্তু বৈষম্যবিরোধী যে-আন্দোলন, সেটা আসলে এখন পর্যন্ত  আলোর মুখ দেখেনি। কারণ, যে-স্বপ্ন নিয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধ অর্থাৎ একাত্তরে দেশ স্বাধীন হয়েছিলো, গত চুয়ান্নো বছরে সেই স্বপ্নের লক্ষ্যে পৌঁছাতে কিন্তু পারিনি। তারপর আমরা আশা করেছিলাম, একটি অভ্যুত্থান বলেন, বিপ্লবই বলেন, ২৪-এ একটা পরিবর্তন সাধিত হবে। কিন্তু সেটাও উলট-পালট হয়ে গেছে। মনে করেছিলাম যে, একটি সুষ্ঠু ধারার রাজনীতি ফিরে আসবে। মানুষে মানুষে বৈষম্য থাকবে না, অসাম্প্রদায়িক চেতনা আমাদের মধ্যে সৃষ্টি হবে। কিন্তু আমরা কী দেখলাম, আমরা দেখলাম মব-সন্ত্রাস-চাঁদাবাজি-নৈরাজ্য— কোনো জায়গায়ই শৃঙ্খলা ফিরে আসেনি। স্বাস্থ্যে বলেন, যোগাযোগে বলেন, কোনো জায়গায়ই শৃঙ্খলা ফিরে আসেনি। সুস্থ ধারার রাজনীতি এবং সুস্থ ধারার সংস্কৃতি— কোনোটাই আমরা দেখতে পাচ্ছি না। কিন্তু আমি আশাহত মানুষ নই, আমি আশাবাদী মানুষ। আমরা আবার সুন্দর একটা বাংলাদেশ, স্বপ্নের একটা বাংলাদেশ দেখতে চাই। আমাদের স্বপ্ন পূরণ হোক, এই আশা রাখছি। আসসালামু আলাইকুম।

সম্পর্কিত

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সর্বশেষ