কুইড়ার কিসসা : বিলীন হয়ে যাওয়া নরসিংদীর লোককথা

নরসিংদীর খাঁটি লোকসাহিত্যের এক নিদর্শন হলো ‘কুইড়ার কিসসা’। এটা এমন এক ধরনের সাহিত্য, যা আমাদের গ্রামবাংলার আবহ দ্বারা নির্মিত।

লোকসাহিত্য মূলত মৌখিক সাহিত্য, যা অতীত ও বর্তমান অভিজ্ঞতাকে আশ্রয় করে রচিত। অক্ষরজ্ঞানহীন জনগোষ্ঠী তাদের এই রচনাকে লিখিতভাবে লিপিবদ্ধ করতে না পারলেও আবেগ, ভাব এবং কল্পনার দ্বারা মানুষের কাছে মুখে মুখে তাদের সৃষ্টিকে প্রকাশ করে। নরসিংদীর অক্ষরজ্ঞানহীন জনগোষ্ঠীও লোকসাহিত্যের এই ধারাকে লালন ও বহন করে।

কুইড়ার কিসসা’র গায়ক আবদুল হাকিম। তাঁর বাড়ি শিবপুর উপজেলার ছুটাবন্দ গ্রামে। তবে এই কিসসাটি তাঁর রচিত নয়। মূল রচয়িতা ছিলেন রায়পুরা উপজেলার মাহমুদপুর গ্রামের আবদুল গফুর। আবদুল গফুরের এই কিসসা রচনার সময়কাল জানা যায় না। আবদুল হাকিম তাঁর বাড়িতে চার মাস মজুরি খেটে এই কিসসা লিখে আনেন। এবং নিজে আত্মস্থ করে জনগণের মাঝে বিশেষ ভঙ্গিতে তা পরিবেশন করতে থাকেন। কিসসাটি বয়ান করতে পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা সময় লাগে।

এই ঘরে বাস করতেন কুইড়ার কিসসাকার আবদুল হাকিম

আবদুল হাকিমকে এই কিসসার নামের সাথে মিলিয়ে ‘কুইড়া’ নামে অভিহিত করা হয়। তিনি কবিরাজী চিকিৎসায়ও দক্ষ ছিলেন।

এই আয়নাটি কোনো-এক আসর থেকে পুরস্কার হিসেবে পান কুিইড়ার কিসসাকার আবদুল হাকিম

আবদুল হাকিম ২০০৮ সালে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুর সাথে সাথে লোকসাহিত্যের এই ধারাটিরও মৃত্যু হবার কথা ছিলো। কিন্তু তা হয়নি। তাঁর দোহার হিসেবে ৩২ বছর দায়িত্ব পালন করা আবদুর রহমান মোল্লা কুইড়ার কিসসাকে মানুষের মাঝে জনপ্রিয় করে তুলেছিলেন।

আবদুর রহমান মোল্লা

আবদুর রহমান মোল্লার বাড়ি নৌকাঘাটা। ছুটাবন্দ ও নৌকাঘাটা গ্রাম দুটি পাশাপাশি।

আবদুর রহমান মোল্লা ২০১৬ সালে মাত্র ৬০-৬২ বছর বয়সে চিকিৎসকের ভুল চিকিৎসাজনিত কারণে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে নরসিংদীর এই নিজস্ব ধারাটি প্রায় হারিয়ে গেছে বলা যায়। এই বিশেষ ধারার কিসসা পরিবেশন করতে দশজন দোহারের প্রয়োজন হয়। স্থানীয় সংশ্লিষ্ট লোকজনের সাথে কথা বলে জানা যায়, এই সকল দোহারবৃন্দও ইতোমধ্যে পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন। আর দুয়েকজন যদিও জীবিত থাকেন, তারা কিসসাটি পরিবেশন করার কোনো দক্ষতা রাখেন না।

২০১১ সালে সুজাতপুর গ্রামে এই কিসসাটির এক মহা আসর বসে। সন্ধ্যার পর থেকে মধ্যরাত অবধি এই কিসসাটি পরিবেশিত হয়েছিলো। দিনের বেলা এই আসর বসে না। কিসসাকার আবদুর রহমান মোল্লা তাঁর দোহারবৃন্দ নিয়ে মধ্যরাত অবধি এই কিসসা পরিবেশন করেছিলেন। জয়নগর ইউনিয়নের চেয়ারম্যানও সেদিন উপস্থিত ছিলেন।

লোকসাহিত্যিক, প্রত্নতাত্ত্বিক ও লেখক মুহাম্মদ হাবিবুল্লা পাঠান উপস্থিত ছিলেন উক্ত আসরে। তিনি অবশ্য আবদুল হাকিম ও আবদুর রহমান মোল্লা— দুজনেরই পরিবেশন উপভোগ করেছেন। তার বক্তব্য হলো :

“আগে কিসসাটির কথক ছিলেন শিবপুর উপজেলার ছুটাবন্দ গ্রামের আবদুল হাকিম। আবদুল হাকিম ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। তার বলার ভঙ্গি, কণ্ঠ, শিল্পসম্মত বাচনভঙ্গি কিসসাকে জনপ্রিয় করে তুলেছিলো। আবদুল হাকিম ও কুইড়ার কিসসা দুটো অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত ছিলো। আবদুল হাকিম আড়াই ঘণ্টা সময়ের মতো ব্যয় করতেন। তার পরিমিত বাচনভঙ্গি ছিলো।
সাম্প্রতিককালে তার শিষ্য আবদুর রহমান মোল্লা, তিনি নৌকাঘাটা গ্রামের অধিবাসী, এই কিসসাটি বয়ান করেন বিভিন্ন আসরে। তার সময় লাগছে আরো বেশি। এর অর্থ ভিন্ন কথকের হাতে পড়ে একটি পালা রূপান্তরিত হয়ে পড়ে। আমি আবদুল হাকিম ও আবদুর রহমানের কিসসাটি শুনেছি। দুটি কিসসার তুলনামূলকভাবে এটুকু অনুধাবন করেছি যে, আবদুর রহমান নিজস্ব কিছু বাকভঙ্গি এখানে বিস্তারিত করেছেন। আবদুর রহমান মোল্লার পরিবেশন সম্পূর্ণভাবে ঠিক আছে এবং বিশ্বস্ততা রক্ষিত হয়েছে। আবদুর রহমান মোল্লা কিছুটা আধুনিক শব্দ, অতিকথন ও কলাকৌশল প্রয়োগ করেছেন। এই আধুনিকতা স্বাভাবিক।”

কুইড়ার কিসসার লিখিত পালাটি ১০০ পৃষ্ঠারও অধিক। বাংলা একাডেমি এটা প্রকাশ করেছে ‘লোকজ সংস্কৃতি গ্রন্থমালা : নরসিংদী’ গ্রন্থে। একাডেমি আবদুর রহমান মোল্লার কাছ থেকে এটা রেকর্ড করে নিয়ে প্রকাশ করেছে তাঁর জীবদ্দশায়ই।

আমরা এই পালাটির সার-সংক্ষেপ আর প্রথমে যে-বন্দনাপর্বটি বয়ান করা হয়, তা এখানে উল্লেখ করছি।

কুইড়ার বন্দনা

উদয় মাগো সোনার বাংলা তোমায় হাজারো সালাম মাগো জন্মভূমি।
উদয় মাগো সরেস্বতী নাইম্যা দেও চানভর
মাগো সরেস্বতী
পুবেতে বন্দনা করলাম পুবের বাণু সারোগো
মাগো সরেস্বতী
একদিকেদা উদয় বাণু চৌদিকে ফসরগো
মাগো সরেস্বতী
উত্তরে বন্দনা করলাম হিমালয় পর্বত
তাহার অ ইংগলে কাঁপে সয়ালও সংসার ওগো
মাগো সরেস্বতী
পশ্চিমে বন্দনা করলাম মৌক্কা বাণু সারোগো
মাগো সরেস্বতী
মুসলমানে পড়ে নামাজ আল্লাহু আকবার
মাগো সরেস্বতী
দক্ষিণে বন্দনা করলাম কালী দশায়
মাগো সরেস্বতী
সে সায়রে বাণিজ্য করে চান্দ সওদাগর ও মা সরেস্বতী
চারকোণা বন্দনা করলাম আসর করলাম স্থির
মাগো সরেস্বতী।
নরসিংদীতে জেলা ধরি শিবপুরে হয় থানা
মাগো সরেস্বতী
পোস্টা অফিস নৌকাঘাটা ছুটাবন্দ হয় ঠিকানা
মাগো সরেস্বতী
ওস্তাদ আমার আব্দুল হেকিম সবাইকে জানাই
মাগো সরেস্বতী
আমার নামটি আব্দুর রহমান দিলাম পরিচয়
মাগো সরেস্বতী।
আব্দুল বাদশার কিস্সা বলবেন সবার বিদ্যমান
মাগো সরেস্বতী।
তোমায় ডাকি লোকজনও আহা লোকজন সালাম জানাই সবার বিদ্যমানে।

কুইড়ার কিসসার সার-সংক্ষেপ
চারদিকে চারটি সাগর এবং সাগরগুলোর মধ্যে একটি বালুচর। বালুচরে রয়েছে একটি শহর, যার নাম মেরছির শহর। শহরে বাস করতো একজন বাদশাহ। তাকে বলা হতো মেরছির বাদশাহ। এ-বাদশাহ বারবার বিয়া করে, কিন্তু কোনো সন্তান লাভ করতে পারে না। কেন সন্তান হয় না, কারণ জানতে জতিশ (জ্যোতিষী) এনে গণনা করায়। জতিশ এসে উপদেশ দেয় আর বিয়া না করার জন্যে। তার ভাগ্যে সন্তানাদি নেই বলে স্পষ্ট জানিয়ে দেয়। রাজ্যের উজির- নাজিরসহ সকলে একত্র সভায় মিলিত হয়ে বাদশাহকে আটখুড়া বাদশাহ ঘোষণা করে। কেউ আর বাদশাহর মুখদর্শন করবে না বলে সিদ্ধান্ত নেয়। উপায় না দেখে বাদশাহ সাত বিবির নিকট থেকে বিদায় নিয়ে করুণভাবে ডাকতে ডাকতে আল্লাহর পথের যাত্রী হয়। এদিকে দয়ার ভাণ্ডার আল্লাহপাক সদয় হয়ে আটখুড়া বাদশাহর পুত্র হওয়ার জন্যে আবদুল বাদশাহকে আহ্বান পাঠান। কিন্তু আবদুল বাদশাহ জন্মের পূর্বেই পুত্র হওয়ার বিনিময়ে আল্লাহর দরবারে তিনটি জিনিস প্রার্থনা করে। আবদুল বাদশাহ বলে, (এক) মিছা এ-দুনিয়ায় তাকে নিতে হলে সুন্দরী পরী মকবুলা বিবির সাথে বিয়া লিখে দিতে হবে। (দুই) সে মুখে যা বলবে, তাৎক্ষণিক তা হতে হবে এবং (তিন) আকাশ ও পাতালে কী আছে, সে জানতে চাইলে জানতে পারার ক্ষমতা দিতে হবে। দয়াল আল্লাহ মহান আবদুল বাদশাহর সকল আর্জি মঞ্জুর করেন। একইসাথে আশ্চর্য ঠাকুরের মাধ্যমে আল্লাহ আবদুল বাদশাহকে মেরছির বাদশাহর কাছে পৌঁছে দিবার আদেশ দেন। কিন্তু আশ্চর্য ঠাকুরও তিনটি শর্ত দিয়ে বসে— (এক) মৃত্যুর জায়গা সে নিজে বানাবে। (দুই) মুখে যা বলবে, তাৎক্ষণিক তা হতে হবে এবং (তিন) আকাশ ও পাতালের সব গণনাও শুনতে পারবে। দয়াল আল্লাহ আশ্চর্য ঠাকুরের প্রার্থনাও কবুল করলেন। কিন্তু জতিশকে তার সঙ্গী করে দেন। আবদুল বাদশাহ, আশ্চর্য ঠাকুর এবং জতিশের নানা শক্তি ও কেরামতিতে উল্লেখিত কুইড়ার কিসসার উত্থান-পতন ঘটে। এর সাথে অনেক ধরনের পাত্র-পাত্রীর নিশ্চিত সংযোগের মাধ্যমে কুইড়ার কিসসা এগিয়ে চলে।

কুইড়ার কিসসা পরিবেশন কৌশল
দলে থাকে মোট ৮-১০ জন। মূল গায়ক দাঁড়িয়ে এবং অনেক সময় নেচে নেচে অভিনয়ের মাধ্যমে কিসসা বর্ণনা করেন। সহযোগী হিসেবে বসে বসে দোহার দল দোহার গায়। দোহারগণ মঞ্চে গোল হয়ে বসেন। মূল গায়ক দর্শকদের উদ্দেশ্যে ইশারা করেন। কখনো কখনো মূল গায়ক হাতের রুমাল উঁচিয়ে উঁচিয়ে দোহারগণের মধ্যে ছেড়ে দেন। তেমন কোনো বাদ্যযন্ত্রের দরকার হয় না। সামান্য বাদ্যযন্ত্রের মৃদু তালে হাতের মোহনীয় তালিতে দর্শকদের মাতিয়ে রাখেন। পোশাক-আশাকেও তেমন বাধাধরা নিয়ম নেই। সাধারণত ছোটো আসরেই কিসসা চলে। জনসমাগম বেশি হলে বড়ো আকারের মঞ্চ তৈরি হয়। খোলা আকাশের নিচে বসেই দর্শকগণ কিসসা উপভোগ করেন। শীতের দিনে এবং বিশেষ বিশেষ দিনে শামিয়ানা টাঙানো হয়। মঞ্চের পেছন দিক কাপড় দিয়ে ঢেকে দেয়া হয়। মঞ্চের তিনদিকে খোলা জায়গায় দর্শকগণ বসেন। বন্দনার মাধ্যমে শুরু হয়ে কিসসা চলে প্রায় চার ঘণ্টা। এই চার ঘণ্টা হাসি-আনন্দের মধ্যে সাধারণ মানুষ মনের খোরাক যুগিয়ে নেয়।

নরসিংদীর এই লোকসাহিত্যের বিচিত্র ধারাটিকে আমরা রক্ষা করতে পারিনি মনে হয়। সম্প্রতি আমরা গিয়েছিলাম শিবপুরের ছুটাবন্দ ও নৌকাঘাটা গ্রামে। কিসসাকার আবদুল হাকিমের বাড়ি খুঁজে পেতে বেগ পেতে হয়নি। এ-গ্রামের সকলেই কিসসা আর কিসসাকারদের চিনতো। প্রায় ভেঙে পড়া থেকে অল্প দূরে বেঁচে যাওয়া আবদুল হাকিমের ঘরখানা দেখলাম, যেটাতে তিনি বসবাস করতেন।

তাঁর দোহার আবদুর রহমান মোল্লা, যিনি আবদুল হাকিমের পরে এই গীতধারাটিকে একাই বাঁচিয়ে রেখেছিলেন, তাঁর বাড়িতেও গেলাম। কথা হয়েছে তাঁর পুত্র ও স্বজনদের সাথে। এই এলাকার সবার সাথে কথা বলে এটা জানাই উদ্দেশ্য ছিলো যে, এই দুই কিংবদন্তীর পরে আর কেউ কি আছেন, যিনি এই কুইড়ার কিসসাটি পরিবেশন করতে পারেন। হতাশাজনকভাবে আমরা এই উত্তরই পেলাম, আর কেউ নেই!

সম্পর্কিত

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সর্বশেষ