নরসিংদীর ভাটপাড়া গুপ্ত জমিদার বাড়ি শুধু সাহিত্য-সংস্কৃতি, ইতিহাস-ঐতিহ্য ও কৃতী মানুষের পীঠভূমি নয়, তারা সমাজ সংস্কার, সঙ্গীত, চলচ্চিত্র, ব্রাহ্মধর্মকে টেনে নিয়েছিলেন ভারতবর্ষব্যাপী। এই জমিদার বাড়ির জিন থেকে জন্ম নেয়া বিশ্ববিখ্যাত চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায় তো নিজের ঘরে অস্কার তুলে এনেছিলেন। তাঁর মামা অর্থাৎ স্যার কে জি গুপ্ত’র ভাগ্নে সঙ্গীতজ্ঞ অতুলপ্রসাদ সেন তো অতুলপ্রসাদী সঙ্গীত ঘরানার জন্মদাতা। তেমনি পূর্ববঙ্গের প্রথম আইসিএস (ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিস) অফিসার স্যার কৃষ্ণ গোবিন্দ গুপ্ত’র মামা ভাই গিরিশচন্দ্র সেন শুধু কোরানের প্রথম বঙ্গানুবাদকারীই নন, বহু মুসলিম মনিষীর জীবনীকারও। মামা-ভাগ্নের এমন কীর্তি এদেশে সত্যিই বিরল, যা নরসিংদী জেলাকে গর্বিত করেছে। নরসিংদী তথা মহেশ্বরদী পরগণার মাটি সত্যিই উর্বর।
শিক্ষা-দীক্ষা, সাহিত্য-সংস্কৃতি, সমাজ সংস্কার আর আভিজাত্যের দিক দিয়ে বাংলাদেশে যে-ক’টি জমিদার বংশ খ্যাতির চরম শিখরে পৌঁছুতে পেরেছে, তাদের মধ্যে নরসিংদী জেলার ভাটপাড়া গুপ্ত জমিদার বংশটি অন্যতম। উক্ত বংশের প্রভাবশালী, জাঁদরেল ও প্রজাবৎসল জমিদার মহিন্দ্র নারায়ণ গুপ্তের নাম-ডাক ও সাফল্যের খ্যাতি চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছিলো। ভাটপাড়া এলাকা ছাড়াও গাজীপুর জেলার শ্রীপুর থানাধীন কাওরাইদ এবং ময়মনসিংহের ভাটি অঞ্চলে তাঁর বিশাল জমিদারি ছিলো। কিন্তু একটি ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন চরম ব্যর্থ ও অসুখী। ঘরে অর্থ-কড়ি, বিত্ত-বৈভবের চাকচিক্য বিরাজ করলেও বংশ রক্ষার জন্যে ছিলো না কোনো ছেলে সন্তান। সন্তান হারা মনে এক অসহনীয় যন্ত্রণা নিয়ে সময় কাটাতে থাকেন জমিদার মহিন্দ্র নারায়ণ গুপ্ত। অবশেষে বংশ রক্ষার জন্যে তিনি দত্তক গ্রহণ করতে সম্মত হন।
কালী নারায়ণ সেন নামে এক বালককে দত্তক নিয়ে লালন-পালন শুরু করেন। কালী নারায়ণ সেন সম্পর্কে জানা যায়, তিনি তৎকালীন রামপুরা থানা বর্তমানে মনোহরদী থানার ভুলা ইউনিয়নস্থ আকানগর গ্রামে ১৮৩০ খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম সুধারাম সেন। মাতা যশোদা দেবী। তাদের আর্থিক অবস্থা তেমন ভালো ছিলো না। এ-কারণে কালী নারায়ণ আকানগর গ্রাম থেকে পোষ্যপুত্ররূপে ভাটপাড়া জমিদার বাড়িতে গৃহীত হন। একই সাথে দীন কুটির থেকে একেবারে রাজ দরবারে পদার্পণে তাঁর ভাগ্যের সবগুলো দরোজা খুলে যায়। সেই সাথে পারিবারিক পদবী ‘সেন’ থেকে ‘গুপ্ত’-তে পরিণত হয়। পরবর্তী জীবনে এই কালী নারায়ণ গুপ্তই ভারতবর্ষের বরেণ্য ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়েছিলেন।
ইতিহাসে দেখা যায়, দত্তকপুত্ররা পরবর্তীতে যশ-খ্যাতি, অর্থ-সাফল্য অর্জন করেন। দত্তকপুত্র নাটোরের মহারাজ দীনেন্দ্রনাথ রায় তো খ্যাতির চরম শিখরে উঠতে পেরেছিলেন। খ্যাতিমান সত্যজিৎ রায়-সুকুমার রায়ের উদ্ভব হয়েছিলো দত্তকপুত্রের রক্ত থেকেই। কালী নারায়ণ গুপ্তও দত্তকপুত্র হিসেবে ভাটপাড়ার বিশাল জমিদারির হাল ধরে কর্মগুণে অমর হতে পেরেছিলেন। বিদ্যাশিক্ষার ক্ষেত্রে তাঁর বড়ো ধরনের কোনো অর্জন ছিলো না। শৈশবে মাতামহের কাছে বাংলা লেখাপড়া সমাপ্ত করে পরে কিঞ্চিত ফারসি ও সংস্কৃত অধ্যয়ন করেছিলেন। কিন্তু স্বাধীন চিন্তাধারা, বিচার-বুদ্ধি আর ঈশ্বরানুরাগ চিরদিন তাঁকে সম্মুখপানে এগিয়ে নিয়ে গেছে। একাডেমিক শিক্ষার কোনো ডিগ্রি না থাকলেও বিদ্যাশিক্ষার প্রতি আমৃত্যু স্পৃহা থাকার কারণে তিনি এক পর্যায়ে প্রাজ্ঞ-পণ্ডিত হয়ে ওঠেছিলেন। তরুণ বয়সে তিনি শক্তিমন্ত্রের উপাসক ছিলেন। কিন্তু পরবর্তী জীবনে একজন শুদ্ধ কৃষ্ণভক্ত হিসেবে খ্যাতিমান হন। ঢাকা এবং ময়মনসিংহ অঞ্চলে তাঁর জমিদারি থাকায় তিনি ব্রাহ্মমণ্ডলীর সংস্পর্শে আসেন। তবে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে ব্রাহ্ম ধর্মে দীক্ষিত হন ১৮৬৯ খ্রিস্টাব্দের দিকে। তিনি পুত্র-ভৃত্যসহ ব্রাহ্মসমাজে যোগদান করে তৎসময়ে রীতিমতো আলোড়ন তুলেছিলেন। তাঁর জমিদারির কেন্দ্রস্থল কাওরাইদের মতো একটি অজপাড়াগাঁয়ে ব্রাহ্ম সমাজের একটি শাখা প্রতিষ্ঠা করে বিশেষ সুনাম অর্জন করেছিলেন। তবে কালী নারায়ণ গুপ্তের সর্বোচ্চ আলোচিত ঘটনা হলো, মুন্সি জালালউদ্দিন মিয়া নামে ঢাকা ব্রাহ্মকুলের একজন মুসলমান ছাত্রকে তিনি প্রকাশ্যে ব্রাহ্ম সমাজভুক্ত করার ব্যবস্থা করেন। শুধু তা-ই নয়, এক বিবাহভোজ অনুষ্ঠানে সপুত্র উক্ত যুবক জালালউদ্দিনের সঙ্গে এক থালায় ভোজন করে প্রমাণ করেন, উদারতার কাছে কোনো বর্ণ-ধর্ম-জাত-পাতের প্রশ্রয় নেই। এই ঘটনা সমস্ত ভারতবর্ষের জ্ঞানী-সুধী সমাজে প্রশংসিত হলেও একযোগে হিন্দু-মুসলিম সমাজে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে।
হিন্দুরা ‘হিন্দু হিতৈষিণী’ পত্রিকায় এর প্রবল বিরোধিতা করতে লাগলেন। মুসলিম সম্প্রদায় তাঁকে মেরে ফেলার হুমকি পর্যন্ত দিয়েছিলো। এভাবে অনেক সামাজিক-ধর্মীয় লাঞ্চনা ভোগ করেও তিনি দমে যাননি। ব্রাহ্ম সমাজের অগ্রগতি ব্যাহত হলো না। বরং জমিদারি, ব্রাহ্ম সমাজ, সমাজ সংস্কার, শিক্ষা, বিধবা বিবাহ, সতীদাহ প্রথা রোধে কাজের পাশাপাশি ভাবসঙ্গীত, ভক্তিসঙ্গীত রচনা, সুর দেয়া এবং গেয়ে তিনি চারিদিকে হৈচৈ ফেলে দেন। বিমল ঈশ্বর ভক্তি ও সরল হৃদয়ের পরিচয় পাওয়া যায় তাঁর সঙ্গীতে। তিনি ভক্তি রসাত্মক সঙ্গীতসমূহ, ভাবসঙ্গীত ও সাধনালব্ধ তত্ত্ববিষয়ক ‘ভাবকথা’ রচনা করেছেন। ভক্তি ও ভাবসঙ্গীত রচনায় তাঁর এই স্বাভাবিক ক্ষমতা বহুল পরিমাণে দৌহিত্র (মেয়ের ঘরের নাতি) ব্যারিস্টার অতুলপ্রসাদ সেনের মধ্যে সত্যায়িত হয়েছে। কালী নারায়ণ গুপ্ত সম্পর্কে লোকসাহিত্যিক, প্রত্ন বিশারদ ও ‘নরসিংদীর কবি-সাহিত্যিক’ গ্রন্থের লেখক মুহাম্মদ হাবিবুল্লা পাঠান বলেন, “তিনি শিবানন্দ সেনের বংশধর ছিলেন।” তৎকৃত গ্রন্থ ‘আশালতা’। ‘আশালতা’ গ্রন্থ সম্পর্কে কোনো খোঁজ-খবর জানা যায়নি। তবে কালী নারায়ণ গুপ্তের জীবনীগ্রন্থ ‘ভক্ত কালীনারায়ণ গুপ্তের জীবন-বৃত্তান্ত’ ১৩৩১ বঙ্গাব্দে কলকাতা থেকে প্রকাশিত হয়েছিলো। গ্রন্থটি লিখেছিলেন ব্রাহ্মপণ্ডিত বঙ্কুবিহারী কর। ১৯০৩ খ্রিস্টাব্দে এই মহর্ষির মৃত্যু হয়।
ভাটপাড়ার জমিদার বাড়ি সম্পর্কে জানা যায়, একই সাথে তাঁদের ময়মনসিংহ ভাটি অঞ্চল, কাওরাইদ, ভাটপাড়া, ঢাকার লক্ষ্মীবাজার ও কলকাতার বালিগঞ্জের নিজস্ব বাড়ি ও প্রাসাদে বসবাস ছিলো। এ-প্রসঙ্গে বিখ্যাত স্মৃতিচারণামূলক গ্রন্থে শ্রীমতী মনোদা দেবী লিখেছেন, “স্যার কে. জি. গুপ্তের কন্যা হেমকুসুম (অতুলপ্রসাদ সেনের স্ত্রী) আমার ক্লাশফ্রেন্ড ছিলো কিছুদিন। ঢাকাতে কালীনারায়ণ বাবুর নিজের মস্ত বড় বাড়ী ছিল। বহুদিন সে বাড়ীতে আমরা ছোটর দল যাইয়া খেলাধুলা করিতাম। কালীনারায়ণ বাবু আমাদের লইয়া কোন খেলায় মত্য হইয়া যাইতেন।”
কালী নারায়ণ গুপ্তের জীবনাচরণ ও চরিত্র সম্পর্কে মনোদা দেবী তাঁর গ্রন্থে আরো উল্লেখ করেন, “কালীনারায়ণ রায় অতি সৎ ও সাধু প্রকৃতির লোক ছিলেন। মস্ত জমিদার হইলেও তিনি অতি সহজ-সরলভাবে জীবনযাপন করিতেন। বিলাসিতার ধার ধারিতেন না। কালী নারায়ণ বাবুর দৌহিত্র অতুলপ্রসাদ সেন ঢাকাতেই পড়াশুনা করতেন এবং তার এক খুড়তুত ভাই সত্যপ্রসাদ সেনও কালীনারায়ণ বাবুর বাসায় থাকিয়া পড়াশুনা করিত। তাহারা মাঝে মাঝে আমাদের ছোট দলের মধ্যে খেলায় হামলা দিতে চেষ্টা করিত, কিন্তু কালীনারায়ণ বাবু সেটাকে কিছুতেই বরদাস্ত করিতেন না, কারণ আমরা সকলেই ছোট ছোট মানুষ আর উনারা ১৪/১৫ বৎসরের ছেলে। উহাদের সঙ্গে আমরা কিছুতেই পারিয়া উঠিব না।”
কালী নারায়ণ গুপ্তের সৎ ও সাদাসিধে জীবনের একটি দৃষ্টান্ত হলো, তাঁর কন্যা বিমলা গুপ্তের সাথে বিক্রমপুরের তেলিয় বাগস্থ দুর্গামোহন দাশগুপ্তের জ্যেষ্ঠ পুত্র ব্যারিস্টার সত্যরঞ্জন দাশগুপ্তের বিয়ে হয়েছিলো। কোট-প্যান্ট পরিহিত বিলাত-ফেরত ব্যারিস্টার বর সাজানো ল্যান্ড গাড়িতে চড়ে বিবাহ সভায় হাজির হন। সবাই সতৃষ্ণ দৃষ্টিতে বিলাত-ফেরত ব্যারিস্টার বরকে দেখতে লাগলেন। কারণ তৎসময়ে বিলাত-ফেরত ব্যারিস্টার ছেলে বর হিসেবে পাওয়া দুঃসাধ্য বিষয় ছিলো। হঠাৎ দেখা গেলো, জমিদার কালী নারায়ণ গুপ্ত ড্রয়িংরুম থেকে একটি গরদের ধুতি ও একটি গরদের কোট নিয়ে বিবাহ সভায় ঢুকে হাত বাড়িয়ে এসব কাপড় ভাবী জামাতার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, “সাহেবি পোশাক ত্যাগ করে বাঙালি পোশাক পরে মানুষ হও।” এ-দৃশ্য দেখে আগত অতিথিরা আশ্চর্য হয়ে গেলেন। ছেলের বাবা দুর্গামোহন দাশগুপ্তও তা দেখে ছেলের দিকে তাকিয়ে রইলেন। সবাইকে অবাক করে ব্যারিস্টার বর সত্যরঞ্জন দাশগুপ্ত স্মিতহাস্যে তাঁর ভাবী শ্বশুরের হাত থেকে কাপড়গুলো নিয়ে সভার মধ্যেই পরিধান করলেন। এরপর ব্রাহ্ম ধর্মমতে তাদের বিবাহ হয়। ভাবী জামাই সত্যরঞ্জন কোনো আপত্তি ছাড়াই খুশি মনে ভাবী শ্বশুরের দেয়া দেশীয় গরদের পোশাক পড়ে বিবাহ সভায় বসেছিলেন। এতে কালী নারায়ণ গুপ্ত অত্যন্ত প্রীত হয়েছিলেন।
কালী নারায়ণ গুপ্তের স্ত্রীর নাম অন্নদা সুন্দরী দেবী। সন্তান-সন্ততি, বিষয়-সম্পত্তি আর যশ-খ্যাতিতে এই পরিবারটি ছিলো বাঙালিদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বিশেষ করে, কালী নারায়ণ গুপ্ত ও অন্নদা সুন্দরী দেবীর কোল জুড়ে এসেছে ষোলোজন সন্তান। এর মধ্যে ছয়জন শৈশবেই মৃত্যুবরণ করে। জীবিতদের মধ্যে জগদ্বিখ্যাত বাঙালি স্যার কে জি গুপ্ত ছিলেন বড়ো সন্তান। তাঁর আগে একজন সন্তান শৈশবে মারা গিয়েছিলো। স্যার কে জি গুপ্তের স্ত্রীর নাম প্রসন্নতারা গুপ্তা। তিনি তৎকালীন রূপগঞ্জ থানাধীন দুপতারা জমিদার বাড়ির মেয়ে। তিনি খুব মেধাবী ছিলেন। ১৮৭০ খ্রিস্টাব্দে শ্বশুর কালী নারায়ণ গুপ্তের প্রতিষ্ঠিত ঢাকার ‘অন্তপুর স্ত্রী শিক্ষা সভা’র মেধাবী ছাত্রী হিসেবে স্বামী স্যার কে জি গুপ্তের মুখোজ্জ্বল করতে পেরেছিলেন। ১৮৮৬ খ্রিস্টাব্দে কলকাতার অভিজাত ও সুশিক্ষিত সম্প্রদায়ের মেয়েরা ‘সখী সমিতি’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করে। এর প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন স্বর্ণকুমারী দেবী। তাঁর অন্যতম সহযোগী ছিলেন কে জি গুপ্তের স্ত্রী প্রসন্নতারা গুপ্তা। উল্লেখ্য, উক্ত সমিতিতে একমাত্র মুসলিম সদস্য ছিলেন লাকসামের জমিদার নবাব ফয়জুন্নেসা চৌধুরাণী। উক্ত সমিতির মাধ্যমে প্রসন্নতারা গুপ্তা স্ত্রী শিক্ষা, বিধবা বিবাহের প্রচলন, সহমরণ প্রথা রোধ এবং মেয়েদের স্বাবলম্বী করার জন্যে অনেক কাজ করেছেন। স্যার কে জি গুপ্ত ও প্রসন্নতারা গুপ্তার সংসারে সাফল্যের কোনো অন্ত ছিলো না। স্যার কে জি গুপ্তের পর কালী নারায়ণ গুপ্তের ঔরসে যে-সন্তান জন্ম নিয়েছিলো, তারও মৃত্যু হয়েছিলো শৈশবে। এভাবে দশম, দ্বাদশ, চতুর্দশ ও পঞ্চদশ সন্তানও শৈশবে মারা যায়। জীবিতদের মধ্যে দ্বিতীয় সন্তান ছিলেন প্যারীমোহন গুপ্ত। তিনি ছিলেন ভারতের খ্যাতনামা সিভিল মেডিক্যাল অফিসার। তাঁর স্ত্রীর নাম সরলা গুপ্তা। তৃতীয় ছেলে গঙ্গাগোবিন্দ গুপ্ত ওরফে পানি বাবু ছিলেন বিচিত্র প্রতিভার অধিকারী। তিনি ছিলেন কালী নারায়ণ গুপ্তের মতো সাদাসিধে সদানন্দ পুরুষ। বিলাসিতার কোনো বালাই ছিলো না তাঁর মধ্যে। ব্রাহ্ম ধর্মের একনিষ্ঠ ভক্ত ছিলেন। তাছাড়া ছিলেন ফুর্তিবাজ লোক। তিনি ছিলেন একজন উঁচুদরের চিত্রকর। ‘সীতার বনবাস’, ‘প্রহ্লাদ চরিত্র’ ইত্যাদি নাটক করার জন্যে তিনি বহু চেষ্টা ও অর্থ ব্যয় করে একটি বাড়ি ভাড়া করেন। নাটক মঞ্চায়নের জন্যে স্টেজও করেন সেই বাড়িতে। নিজ হাতেই বহু দৃশ্য নিপুণভাবে এঁকেছিলেন। সবাই তাঁর আঁকা এসব চিত্র ও দৃশ্য দেখে মুগ্ধ হয়ে প্রশংসা করেছিলেন। তৎকালীন সমাজে ঢাকার হোলি খেলার প্রাণপুরুষ ছিলেন গঙ্গাগোবিন্দ গুপ্ত।
বড়ো মেয়ে ছিলেন হেমন্ত শশী গুপ্তা। তিনি ছিলেন বিশিষ্ট সঙ্গীতজ্ঞ ও ব্যারিস্টার অতুলপ্রসাদ সেনের মা। দ্বিতীয় মেয়ের নাম চপলা গুপ্তা। তাঁর বিয়ে হয়েছিলো শশীভূষণ দত্তের সঙ্গে। তৃতীয় মেয়ে সৌদামিনী গুপ্তার ছেলের নাম চারুচন্দ্র। তার মেয়ে বিজয়া হলেন বিশ্ববিখ্যাত চলচ্চিত্রকার ও সাহিত্যিক সত্যজিৎ রায়ের স্ত্রী। অপরদিকে চতুর্থ কন্যা সরলা গুপ্তার মেয়ে সুপ্রভাকে বিয়ে করেন সত্যজিৎ রায়ের পিতা সুকুমার রায়। চতুর্থ পুতির নাম বিনয়চন্দ্র গুপ্ত। তিনি চন্দ্রপ্রভাকে বিয়ে করেছিলেন। সর্বকনিষ্ঠ কন্যা ছিলেন সুবলা গুপ্তা। প্রাণকৃষ্ণ আচার্যের সাথে তার বিয়ে হয়েছিলো। তারা স্ব স্ব ক্ষেত্রে সফল ও মহীয়ান ছিলেন।
স্যার কে জি গুপ্তের ছিলো তিন ছেলে— যতীন্দ্রমোহন গুপ্ত, বীরেন্দ্র চন্দ্র গুপ্ত ও শৈলেন্দ্র চন্দ্র গুপ্ত এবং পাঁচ মেয়ে— লাবণ্য গুপ্তা, হেমকুসুম গুপ্তা, নলিনী গুপ্তা, সরযু গুপ্তা ও ইলা গুপ্তা। প্যারীমোহন গুপ্তের সন্তানেরা হলেন— মলিনা গুপ্তা, অমিয়া গুপ্তা, নলিনী গুপ্ত, সুধাংশুমোহন গুপ্ত, অফলা গুপ্তা, সাহানা গুপ্তা ও লীনা গুপ্তা। গঙ্গাগোবিন্দ গুপ্তের ছেলে-মেয়েদের নাম হলো— সুধা গুপ্তা, হিমাংশুমোহন গুপ্ত, ধীরেন্দ্র চন্দ্র গুপ্ত। সর্বকনিষ্ঠ পুত্র বিনয়চন্দ্র গুপ্তের ছেলে-মেয়ে হলেন— বিমল চন্দ্র গুপ্ত, ক্ষণিকা গুপ্তা ও মণিকা গুপ্তা। এক কথায় বলা যায়, কালী নারায়ণ গুপ্তের বিশাল পরিবারের শাখা-প্রশাখা, আত্মীয়-স্বজন অবিভক্ত ভারতবর্ষব্যাপী সম্মান ও আভিজাত্যের সাথে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়েছেন। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয় নিয়ে এখানে আলোচনা করা হলো।
১৯৮৭ সালের ১৮ এপ্রিল ‘দেশ’ পত্রিকায় সত্যজিৎ রায়ের একটি আলোচিত সাক্ষাতকার প্রকাশিত হয়। উক্ত সাক্ষাতকারে সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায় তাঁর কাছে প্রশ্ন রাখেন, “আপনি এইবার বলুন, আপনি এত কাণ্ড করলেন, এর পেছনে, এই যে সাকসেস, সাকসেস অ্যান্ড সাকসেস, এর রহস্যটা কোথায়, আপনি কি কোনও দিন অ্যানালিসিস করেছেন? কি হলে কি হয়?” জবাবে সত্যজিৎ রায় বলেন, “রহস্যটা কোথায়! এই আমি, তাহলে সেই জিনের প্রশ্নে চলে যেতে হয়। কেননা, আমার মার দিক দিয়েও, মানে যে ফ্যামিলি থেকে আমার মা এসেছিলেন, তাঁরা অসম্ভব সঙ্গীত রসিক ছিলেন। অতুলপ্রসাদ সেন আমার মামা। কালী নারায়ণ গুপ্তের ফ্যামিলি থেকে উদ্ভব হয়েছিলেন এঁরা। তিনি নিজেও আশ্চর্য সুরকার ছিলেন। ব্রাহ্ম ছিলেন। ভাবসঙ্গীত বলে তাঁর একটা বই আছে। এবং আমার মায়ের দিকে প্রত্যেকে গাইতে পারে। এবং আমি ছেলেবেলা থেকে সেই গানের মধ্যে মানুষ হয়েছি। আমার ঠাকুরদাদার মধ্যেও গান ছিল। ঠাকুরদাদা নিজে বেহালা বাজাতেন, পাখোয়াজ বাজাতেন। বাঁশী বাজাতেন, সেতার বাজাতেন। তিনি সঙ্গীত সম্বন্ধে প্রবন্ধ লিখেছেন। গান রচনা করেছেন। সেই উত্তরাধিকার আমি হয় তো পেয়েছি।” সত্যজিৎ রায় জিনের প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে কালী নারায়ণ গুপ্তের কথা বলেছেন, সেই গুপ্তের পুত্র হলেন স্যার কে জি গুপ্ত। পুরো নাম স্যার কৃষ্ণ গোবিন্দ গুপ্ত। তিনি অতুলপ্রসাদ সেনের আপন মামা। কে জি গুপ্তের অপর তিন ভাই হলেন প্যারী গুপ্ত, বিনয় গুপ্ত ও গঙ্গাগোবিন্দ গুপ্ত। ছয় বোনের মধ্যে হেমন্ত শশী গুপ্তা ছিলেন সবচেয়ে বড়ো। আর এই হেমন্ত শশীর পুত্রই হলেন অতুলপ্রসাদ সেন। অপর তিন সন্তান ছিলো মেয়ে— হিরণ, কিরণ ও প্রভা।
হেমন্ত শশী গুপ্তা সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো, তিনি তৎসময়ে পুনর্বিবাহ করে ভারতবর্ষজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন তোলেন। ১৮৯০ সালে তিনি কলকাতায় দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জনের জ্যেষ্ঠ পুত্র দুর্গামোহন দাশকে বিয়ে করেন। এটাই ব্রাহ্ম সমাজে প্রথম বিধবা বিবাহের ঘটনা। ১৮৮৪ সালে অতুলপ্রসাদ সেনের বাবা রামপ্রসাদ সেন মাত্র সাইত্রিশ বছর বয়স্কা হেমন্ত শশীকে রেখে মারা যান। স্ত্রীর বয়সের কথা চিন্তা করে মৃত্যুর পূর্বে রামপ্রসাদ সেন একটি ঔদার্যপূর্ণ মন্তব্য করেন, “আমার অবর্তমানে তুমি পুনরায় বিবাহ করো।” কিন্তু অতুলপ্রসাদ সেন এই ঘটনায় প্রচণ্ড ব্যথিত হন। কারণ আজীবন তিনি মাকেই সবচে’ বেশি ভালবেসে গেছেন। মায়ের প্রতি এই সকরুণ অভিমান অতুলপ্রসাদ কোনোকালেই মুছে ফেলতে পারেননি। মার কারণে মায়ের পুনর্বিবাহের পর সৎ পিতার উদার আতিথেয়তা উপেক্ষা করে তিনি মেজো মামা প্যারী গুপ্তের কাছে আশ্রয় নেন। মামা তাঁকে ভর্তি করে দেন কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজে। মায়ের সঙ্গে তাঁর স্পর্শকাতর মনের যে গোপন সংঘর্ষ চলছিলো এবং ক্ষত-বিক্ষত হচ্ছিলো নিঃসঙ্গ হৃদয়, তা থেকে বাঁচতেই যেন ধনবান ও শিক্ষিত মাতুলরা তাঁকে ব্যারিস্টারি পড়াতে বিলাত পাঠান। অতুলপ্রসাদ বিলাতে সহপাঠী হিসেবে পান ভারতের নবযুগ নির্মাতা চিত্তরঞ্জন দাশ, শ্রী অরবিন্দ, সরোজিনী নাইডু, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, মনোমোহন ঘোষ প্রমুখকে। এর মধ্যে তাঁর নিঃসঙ্গ জীবনে আরেকটি আলোচিত ঘটনা ঘটে। বড়ো মামা স্যার কে জি গুপ্ত বিশেষ কাজে বিলাতে আসতেন। মামাতো বোন হেমকুসুমের সংস্পর্শে এসে ভিন্ন এক জীবনের সন্ধান পান। অতুলপ্রসাদের আহত হৃদয়ের অজান্তেই দুজন দুজনকে সহমর্মী মনের আবেগে শান্তি এনে দিতে ভালোবেসে ফেলে। তখন এই অসম সম্পর্ক কোনো সমাজেই গ্রহণযোগ্য ছিলো না। কিন্তু তৎকালীন অভিজাত পরিবারে সচ্ছল পরিবেশে বড়ো হয়ে ওঠা হেমকুসুম খুবই একরোখা ও জেদী ছিলেন। যার কারণে তিনি দুই পরিবারের কাছ থেকে বিবাহের অনুমতি আদায় করেছিলেন। কিন্তু সেকালে ভাই-বোনের বিচিত্র বিবাহ আইনে সায় ছিলো না বলে তাদেরকে স্কটল্যান্ডের গ্রেটনাগ্রিনে যেতে হয়। সেখানে এ-ধরনের বিবাহ রীতি বৈধ ছিলো। সময়টা ১৯০০ খ্রিস্টাব্দ। তাদের এই বিয়ে কারো কাছেই আশীর্বাদ ধন্য হয়নি। অতুলপ্রসাদ সেনের মা হেমন্ত শশী কোনোকালেই ভাইঝি হেমকুসুমকে পুত্রবধূ হিসেবে মেনে নেননি। অপরদিকে হেমকুসুমও সহ্য করতে পারেননি হেমন্ত শশীকে। এই জটিল পরিস্থিতিতে অতুলপ্রসাদ অভিমানে ক্ষুব্ধ হয়ে পড়েছিলেন। এসব তাঁর লেখা গানগুলোতেই ফুটে ওঠে। তাঁর লেখা একটি অসামান্য গান হলো :
“ওগো নিঠুর দরদী, একি খেলছ অনুক্ষণ!
তোমার কাঁটায় ভরা বন তোমার প্রেমে ভরা মন।
মিছে দাও কাঁটার ব্যথা, সহিতে না পারতা আমার আঁখি জল, তোমায় করে গো চঞ্চল—”
গুপ্ত জমিদার বংশের সকলের মধ্যে বিশিষ্ট স্থান অধিকার করে আছেন কে জি গুপ্ত। ধনাঢ্য জমিদার কালী নারায়ণ গুপ্তের পুত্র কিংবা প্রখ্যাত সঙ্গীত-ব্যক্তিত্ব ব্যারিস্টার অতুলপ্রসাদ সেনের মামা পরিচয় তাঁকে যতোটুকু না গৌরবান্বিত করেছে, তারচে’ অনেক বেশি মহৎ ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছিলো তাঁর প্রাজ্ঞ কর্মদক্ষতা। যা পুরো বাঙালি জাতি যুগ যুগ ধরে গর্বে ধারণ করে যাচ্ছে। শ্রেষ্ঠ বাঙালি হিসেবে কে জি গুপ্তের নাম স্বয়ং সত্যজিৎ রায় পর্যন্ত তাঁর সাক্ষাতকারে উচ্চারণ করতেন। এর অন্যতম কারণ হলো, তিনি ছিলেন ব্রিটিশ ভারতে ভাইসরয়ের ইন্ডিয়ান কাউন্সিলের প্রথম ভারতীয় সদস্য। তিনি আইসিএস (INDIAN CIVIL SERVICE) অফিসার হিসেবে এই সৌভাগ্য অর্জন করেছিলেন। তাঁর সাথে একই গৌরবের অধিকারী ছিলেন সৈয়দ হোসেইন বিলগ্রামী। কে জি গুপ্তই সর্বভারতীয় একমাত্র ব্যক্তি ছিলেন, যিনি ইংল্যান্ডের হাউজ অব কমন্সের সম্মানিত সদস্য নির্বাচিত হবার মতো গৌরব অর্জন করেছিলেন। ব্রিটিশ সরকার তাঁকে দুর্লভ সম্মানসূচক উপাধি কেসিএসআই (KNIGHT COMMANDER OF THE STARS OF INDIA)-তে ভূষিত করে। এই উপাধিটিও তাঁর আগে আর কোনো ভারতীয় অর্জন করেননি। সে-সময় ব্রিটিশ প্রশাসন ক্ষণজন্মা এই ভারতীয় বাঙালি রত্নকে ‘স্যার’ উপাধিতে ভূষিত করে।
অবিভক্ত ভারতের কৃতী পুরুষ স্যার কে জি গুপ্ত ২৮ ফেব্রুয়ারি ১৮৫১ খ্রিস্টাব্দে নরসিংদীর ভাটপাড়া গ্রামে গুপ্ত জমিদার বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা কালী নারায়ণ গুপ্ত শুধু জমিদার হিসেবে পরিচিত ছিলেন না, সমাজ সংস্কারক, প্রগতিশীল ধর্ম ব্রাহ্ম মতবাদের প্রচারক এবং প্রখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞ হিসেবে তাঁর খ্যাতি ছিলো ভারতবর্ষব্যাপী। কে জি গুপ্তের পড়াশোনার হাতেখড়ি হয় গ্রাম্য টোলে। কিন্তু গ্রাম্য বিরূপ পরিবেশের কথা চিন্তা করে কে জি গুপ্তকে পাঠানো হয় বিদ্যা অর্জনের জন্যে। প্রথমেই তাঁকে ঢাকার পগোজ স্কুলে ভর্তি করা হয়। পগোজ স্কুল থেকে পরবর্তীতে ট্রান্সফার হয়ে যান ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলে। এন্ট্রান্স পাশ করে উচ্চশিক্ষার জন্যে ইংল্যান্ডে পাড়ি জমান। সেখানকার বিশ্বখ্যাত অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বীয় প্রতিভার প্রমাণ রাখেন।
বাঙালি হয়েও তিনি বিলাতের অনেক প্রতিভাবান ছাত্রকে ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন। সে-সময়ে অবিভক্ত ভারতের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে শুধুমাত্র ইংরেজরাই চাকরি করতো। কে জি গুপ্ত তাঁর প্রতিভা ও যোগ্যতা দিয়ে ব্রিটিশ সরকারের এই প্রথা ভেঙে ভারতের প্রথম আইসিএস অফিসার হিসেবে চাকরিতে যোগ দেন। প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় ইংরেজ ট্যালেন্টদের পরাজিত করেই তিনি অফিসার হিসেবে চাকরি পান। তৎকালীন বাংলাভাষী ভারতীয়দের ব্রিটিশরা বড়জোর গৃহপালিত ভৃত্য হিসেবে বিবেচনা করতো। ঠিক এমন সময় স্যার কে জি গুপ্তের এই অবিস্মরণীয় সাফল্য বাঙালির অবস্থান অনেক উঁচুতে নিয়ে যায়।
স্যার কে জি গুপ্ত একই সাথে ইংল্যান্ড এবং ভারতে আইন ব্যবসা শুরু করেন। তীক্ষন প্রতিভা, মেধা, অভিনব কৌশলের গুণে তিনি আইনজীবী হিসেবে বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেন। বিশেষ করে, ইংল্যান্ডে অবস্থান করে ভারতে উদ্ভূত বিভিন্ন পরিস্থিতির সময় ভারতের পক্ষাবলম্বন করে ভারতের স্বাধীনতার পথকে সহজ করে তোলেন। সেই সাথে তিনি ইংল্যান্ডের মাটিতে একজন কালজয়ী বাঙালি হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করতে সক্ষম হন। স্যার কে জি গুপ্ত অত্যন্ত দেশপ্রেমিক ছিলেন। জীবনের শেষদিকে ইংল্যান্ডে বড়ো বড়ো চাকরির অফার, লাখ পাউন্ড কামানোর সহজ রাস্তা পরিহার করে তিনি স্বদেশে ফিরে আসেন। কলকাতার বালিগঞ্জ ও ঢাকার লক্ষ্মীবাজারে বাড়ি নির্মাণ করে আইন ব্যবসা শুরু করেন। শেষ জীবনটা তিনি কলকাতায় আইন ব্যবসা করে কাটিয়ে দিলেও মাঝে-মধ্যে ঢাকার লক্ষ্মীবাজারের বাড়িতে এসে থাকতেন। পরবর্তীতে লক্ষ্মীবাজারের বাড়ির রাস্তাটি স্যার কে জি গুপ্ত লেন হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়। ১৯২৬ সালের ২৯ মার্চ স্যার কে জি গুপ্ত বালিগঞ্জের নিজ বাসভবনে হইলোক ত্যাগ করেন। তিনি তৎকালীন নারায়ণগঞ্জ জেলার রূপগঞ্জ থানাধীন দুপতারা গ্রামের জমিদার পরিবারের প্রসন্নতারা গুপ্তাকে বিয়ে করেছিলেন। প্রসন্নতারা গুপ্তা তৎকালীন গ্র্যাজুয়েট ছিলেন।
ঢাকা ব্রাহ্ম সমাজের আওতাধীন রাজা রামমোহন রায় লাইব্রেরি গড়ে ওঠে ১৮৭১ সালে। উক্ত লাইব্রেরিটি প্রতিষ্ঠার পেছনে কালী নারায়ণ গুপ্ত ও স্যার কে জি গুপ্তের অবদান ছিলো সবচে’ বেশি। তাঁদের আর্থিক দানেই ঢাকা ব্রাহ্ম সমাজের গেইটের ডানপাশে দোতলা ভবনে রাজা রামমোহন রায় লাইব্রেরিটি গড়ে ওঠেছিলো। একসময় লাইব্রেরিটি ঢাকার অন্যতম লাইব্রেরি হিসেবে খ্যাতি পেয়েছিলো। দেশ-বিদেশের হাজার হাজার মহামূল্যবান গ্রন্থের কারণে রাজা রামমোহন রায় লাইব্রেরিটি পণ্ডিত ও শিক্ষিত মহলে বেশ নাম করেছিলো। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় লাইব্রেরিটি পাক হানাদার বাহিনি কর্তৃক আক্রান্ত হলে অধিকাংশ গ্রন্থ পুড়ে নষ্ট হয়ে যায়। কিন্তু স্বাধীনতা যুদ্ধের ৫৪ বছর পেরিয়ে গেলেও নতুন করে গড়ে তোলা হয়নি। প্রয়োজনীয় গ্রন্থের অভাবে লাইব্রেরিটি মুখ থুবড়ে পড়ার মতো অবস্থার সম্মুখীন। অথচ বর্তমানে ব্রাহ্ম সমাজের সম্পত্তির উপর সুমনা নামের বিশাল ক্লিনিক তুলে এবং দোকান ভাড়া দিয়ে লাখ টাকা আয় করা হচ্ছে। এই বিশাল অর্থের পাহাড় কীসের জন্যে আয় করা হচ্ছে, সেটা কারো বোধগম্য নয়। সবচেয়ে দুঃখজনক ব্যাপার হলো, ঢাকা ব্রাহ্ম সমাজের উপর ভিত্তি করে ইতিহাস বিষয়ক একটি গ্রন্থ আজ দুষ্প্রাপ্য হলেও অল্প কিছু টাকা খরচের অজুহাতে সংস্করণ বের করা হচ্ছে না।
এই ব্যাপারে বেশ কয়েকদিন ঘুরেও ঢাকার সেই ইতিহাস বিষয়ক গ্রন্থটি সম্পর্কে কোনো তথ্য উদ্ধার করা যায়নি। ব্রাহ্ম সমাজের আচার্য প্রাণেশ সমাদ্দার অন্যান্যদের ভয়ে মুখ খুলতে অপারগতা প্রকাশ করেন। স্যার কে জি গুপ্তের একটি অনন্য দৃষ্টান্ত হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কালী নারায়ণ গুপ্ত স্কলারশিপ (কেএনএস) প্রবর্তন। তিনি নিজ অর্থ ব্যয়ে এবং উৎসাহে পিতা কালী নারায়ণ গুপ্তের নামে এই স্কলারশিপ প্রবর্তন করেন। পিতার স্মৃতিকে ধরে রাখার জন্যে কে জি গুপ্তের এই দৃষ্টান্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে আজীবন থেকে যাবে। উক্ত স্কলারশিপের বৈশিষ্ট্য হলো, অধিভুক্ত সকল বিষয়ের অনার্স ও সাবসিডিয়ারি পরীক্ষার সম্মিলিতভাবে যিনি সর্বাধিক নম্বর পাবেন, তিনি এই পুরস্কার পাবেন। ইদানিং কালী নারায়ণ গুপ্ত স্কলারশিপটির অবস্থা কী, তা আমাদের জানা নেই। স্যার কে জি গুপ্তের আরেকটি দৃষ্টান্তমূলক কাজ হলো, তিনি নরসিংদী জেলার ঐতিহাসিক পাঁচদোনায় বিদ্যালয় গড়ে তোলেন ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে। তাঁর মৃত্যুর সাত বছর আগে গড়ে তোলা বিদ্যালয়টি আজো মাথা উঁচু করে গর্বের সাথে পথ চলছে। নরসিংদী জেলায় যে-ক’টি বিদ্যালয় বিশেষ কৃতিত্ব অর্জন করেছে, তার মধ্যে সাটিরপাড়া কালী কুমার উচ্চ বিদ্যালয় ও স্যার কে জি গুপ্ত উচ্চ বিদ্যালয়ের অবস্থান শীর্ষ পর্যায়ে। পাঁচদোনা ছিলো স্যার কে জি গুপ্তের মামার বাড়ি। তাঁর মামা ভাই গিরিশচন্দ্র সেন ছিলেন একজন জগতবিখ্যাত প্রতিভা। তিনি পবিত্র কোরআন শরীফের সর্বপ্রথম বঙ্গানুবাদ (তরজমাসহ) করে সকল বাঙালি মুসলমানদের কাছে অমর হয়ে আছেন। আলীবর্দী খাঁ’র দেওয়ান রাজা রামমোহন রায়ের বংশধর হলেন গিরিশচন্দ্র সেন। এই বংশেই বিয়ে করেন কালী নারায়ণ গুপ্ত। মায়ের ‘জিন’ই স্যার কে জি গুপ্তের সব প্রতিভার উৎস। মামা গিরিশচন্দ্র সেনকে স্যার কে জি অত্যন্ত শ্রদ্ধা করতেন। গিরিশচন্দ্র সেন যখন মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়েন, তখন স্যার কে জি গুপ্ত মামাকে তাঁর কলকাতাস্থ বালিগঞ্জের বাসায় এনে চিকিৎসা করান। কোনোভাবেই তাঁর শরীর সুস্থ হয়ে ওঠছিলো না। গিরিশচন্দ্র সেন বুঝে ফেলেন, তাঁর আয়ু ফুরিয়ে গেছে। এ-কারণে মৃত্যুর পূর্বে তিনি জন্মভূমিতে ফিরে আসেন। ১৫ আগস্ট ১৯১০, সকাল দশটায় ৭৬ বছর বয়সে গিরিশচন্দ্র সেন ইহলোক ত্যাগ করেন। তাঁর মরদেহ নিজ গ্রাম পাঁচদোনায় এনে শেষকৃত্য সম্পন্ন করা হয়। মামা গিরিশচন্দ্রের মৃত্যুর পর স্যার কে জি গুপ্ত ভাটপাড়ার সাথে যোগাযোগ বৃদ্ধি করেন। এলাকার শিক্ষা এবং সামাজিক অবক্ষয়ের কথা চিন্তা করে পাঁচদোনায় একটি উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। এলাকাবাসী বিদ্যালয়টি তার নামে নামকরণ করেন।
আপেল মাহমুদ
সাংবাদিক, গবেষক ও দুষ্প্রাপ্য গ্রন্থ সংগ্রাহক

