১৯৯২ সালে ভারতে বাবরি মসজিদ ভাঙাকে কেন্দ্র করে সারা দেশের মতো নরসিংদীতে যেই উত্তপ্ত পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছিলো, সেটা এছাক সাহেব নিজে দিনে ও রাতে হিন্দু মহল্লায় পাহারা দিয়ে সামাল দিয়েছেন।
ঘটনাটি নরসিংদী সরকারি কলেজের। এক বখাটে ছাত্র কোনো-এক ছাত্রীর ওড়না ধরে টান দিয়েছে। আর যায় কোথায়! তরুণী ছাত্রী বখাটের বাবার কাছে গিয়ে বিচার দিয়েছে। বাবাও কম যান না। কলেজের মাঠে মঞ্চ বানিয়ে সদরবাসীকে আমন্ত্রণ জানিয়ে বক্তৃতা শুরু করলেন। বললেন, “আমার পোলা এক ছাত্রীকে অপমান করছে। আমি মঞ্চে পোলারে আর ছাত্রীরে উপস্থিত করছি।” এই বলে তিনি ছাত্রীকে বললেন, “মা গো, তোমার জুতাডা হাতে নেও। এইবার আমার পোলার গালে যতোক্ষণ পারো, জুতার বারি দেও।”
সেই হাজার জনতার সামনে মঞ্চে দাঁড়িয়ে ইতস্তত তরুণী ছেলের বাবার অভয় পেয়ে রায় কার্যকর করলেন। সদরবাসী ‘জাগুর’ দিলো, চিৎকার করে ওঠলো ‘জয়, এমপি সাবের জয়’। এভাবেই নরসিংদী-১ আসনে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন চারবারের নির্বাচিত জাতীয় সংসদ সদস্য সামসুদ্দিন আহমেদ এছাক। তিনি ছিলেন ন্যায়বিচারক, সঙ্গীতজ্ঞ, খাদ্যরসিক, আমুদে তথা গণমানুষের নেতা।

আরেকবার এক মা বিচার নিয়ে এসেছেন, ছেলে খেতে দেয় না, পরতে দেয় না। সেই ছেলেকে মায়ের সামনে এতো পিটুনি দিয়েছিলেন যে, মাকেই কাকুতি-মিনতি করে এমপি সাহেবের কাছ থেকে ছেলের নিস্তার নিতে হয়েছিলো।
এসব কথা কিংবদন্তির মতোই নরসিংদীর চায়ের স্টলে, দোকানে, বাজারে, রাজনৈতিক মহলে নিত্যনৈমিত্তিক। তাঁর সম্পর্কে অভিযোগও ছিলো, রাস্তা নির্মাণ আর অবকাঠামো স্থাপন— এসব ব্যাপারে তিনি ছিলেন উদাসীন। কিন্তু মানুষের মনের রাস্তা নির্মাণে ছিলেন সিদ্ধহস্ত। অর্থাৎ মানুষে মানুষে সম্প্রীতি স্থাপনে ছিলেন অগ্রণী। হিন্দু-মুসলমান সাম্প্রদায়িক দ্বন্দ্বে সবসময় তিনি নিজে কঠিন বাধা হয়ে দাঁড়াতেন। কখনোই ধর্মীয় সংখ্যালঘু নির্যাতন উস্কে দিতেন না। বরং শক্ত হাতে রোধ করতেন। সেজন্যেই নরসিংদী সরকারি কলেজের মরহুম অধ্যাপক সর্বজনপ্রিয় আবুল খায়ের বলতেন, “নরসিংদীতে সিঁদুর পরা মহিলাদের যে নিশ্চিন্ত হাসি আমি দেখি, বাংলাদেশের কোথাও এমনটা আমি দেখি না।” ১৯৯২ সালে ভারতে বাবরি মসজিদ ভাঙাকে কেন্দ্র করে সারা দেশের মতো নরসিংদীতে যেই উত্তপ্ত পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছিলো, সেটা এছাক সাহেব নিজে দিনে ও রাতে হিন্দু মহল্লায় পাহারা দিয়ে সামাল দিয়েছেন। নরসিংদীর হিন্দু সম্প্রদায় এখনো এসব কথা বলে বেড়ায়। পালা-পার্বণে বলে বেড়ায়।
ছিলেন শ্রমিক। হয়েছিলেন শ্রমিক নেতা। সারা জীবনেই তিনি গরীবের বন্ধু ছিলেন। যেখানটায় তিনি দিনের বেশিরভাগ সময় কাটাতেন, তা হচ্ছে আরশীনগর। নামটা তাঁরই দেয়া। মূলত এটা নরসিংদী শহরে রেলের গুদামঘাট। এখানে তিনি উদ্যান, মিনি চিড়িয়াখানা ও সঙ্গীত একাডেমি গড়ে তুলেছিলেন। সপ্তাহের প্রতি বৃহস্পতিবার এশার নামাজের পরে রাস্তা থেকে রিকশাঅলা, গরীব পথচারী, ছিন্নমূল মানুষদের ডেকে ডেকে বড়ো ডেকচিকে রান্না করা খিচুড়ি নিজ হাতে বেড়ে খাওয়াতেন। মানুষকে খাওয়াতে এমপি সাহেব ভালোবাসতেন। বিভিন্ন দিবস, অনুষ্ঠানে সদরবাসীদের দাওয়াত করে খাওয়াতে পছন্দ করতেন। জীবনযাপনে ছিলেন সাধারণ। লুঙ্গি পরতেন। খুব সম্পদ করেছেন এমন কিছু দৃশ্যমান হয় না। সন্তানদেরও তিনি কৃচ্ছসাধনার শিক্ষা দিয়েছেন। তারা নরসিংদীবাসীর সঙ্গে খুব সাধারণ হয়েই চলেন।
বাংলাদেশে ভাষণ বলতে ভরাট কণ্ঠ, টেনে টেনে কথা বলা, বাগাড়ম্বর— এসব। কিন্তু এছাক সাহেব এসবের ধার ধারতেন না। মাইকে কথা বলতে গিয়ে মাউথে দুটি টোকা দিয়ে বলতেন, “হুনা (শোনা) যায়?” মানুষ হেসে ওঠতো। খুবই রসবোধ ছিলো তাঁর বক্তৃতায়। হাসাতে হাসাতে জনতার সামনে মূল কথাগুলো তিনি সাবলীলভাবে বলে যেতেন। ভাষণে কথা বলতেন খুব কম।
একবার কলেজ সংসদের প্যানেল পরিচিতি অনুষ্ঠান। প্রার্থীদের পরিচয় করিয়ে দেয়া হচ্ছে কলেজ ক্যাম্পাসে মঞ্চ করে। ছাত্র-ছাত্রী তথা সদরবাসীদেরই বিপুল উপস্থিতি। কেননা, এরপর হবে বড়ো ব্যান্ডদলের বড়ো কনসার্ট। সবাই গান শুনতে মুখিয়ে আছে। কিন্তু একেকজন বক্তা বক্তৃতায় আজই সব বলতে হবে! এমন একটা অবস্থা। যাক অবশেষে বক্তৃতা সবাই দিলো। সঙ্গীতপ্রেমী তরুণরা খুবই বিরক্ত। এবার প্রধান অতিথির বক্তৃতা। এমপি সাহেব বললেন, “অহন সবাই গান হুনবো। বক্তৃতা হুইন্যা সবতে কাহিল। এই গান গাওয়া শুরু কর।” তরুণদের উল্লাস আর হাসি। আর হাততালি। সবাই বলাবলি করছে, এমপি সাবোই আমগোরে বুঝে।
নিজে গান লিখতেন, গাইতেন। মরমীবোধের গানই মূলত তিনি চর্চা করতেন। নিজের স্ত্রী, ছেলেরাও গান করেন। ছিলেন রেডিও-টেলিভিশনের তালিকাভুক্ত গীতিকার। তার বেশকিছু গান বাংলা চলচ্চিত্রে গাওয়া হয়েছে।
রাজনীতির জটিল জায়গায় তাঁর শান্ত-শিষ্ট ছেলে মাসুদকে খুন হতে হয়েছে। এই যন্ত্রণা তাঁকে অনেক ক্ষুব্ধ করে তুলেছিলো। প্রশাসনকে শহরে কারফিউ জারি করতে হয়েছিলো।
গণমানুষের এই নেতাও মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করেছেন। ২৭ মার্চ তাঁর মৃত্যুবার্ষিকী। সামসুদ্দীন আহমেদ এছাক তাঁর মহত্ত্ব নিয়ে, তাঁর কিংবদন্তি নিয়ে, মানুষের ভালোবাসা নিয়ে আরশীনগর বটগাছের নিচে চিরবিশ্রামে শায়িত আছেন। আমরা তাঁকে পরম শ্রদ্ধায় স্মরণ করি।
নাজমুল আলম সোহাগ
সভাপতি, বাঙলাদেশ লেখক শিবির, নরসিংদী

