ফণী দাস শুভ্র ও সুন্দরের এক মহান রূপকার। নরসিংদীর শিল্প ও সংস্কৃতি চর্চায় আজ যেই সুকুমার জগত তৈরি হয়েছে, তার রূপকারদের মধ্যে ফণী দাস অন্যতম। নরসিংদী চারুভাস্কর্য শিল্পে তিনি রেখেছেন বিরল অবদান। তাঁর ছবি আঁকার বিশাল জগত জুড়ে ছিলো বাংলাদেশ, প্রকৃতি ও মুক্তিযুদ্ধ। তিনি ছবি আঁকতেন তেলরঙ, জলরঙ, পেন্সিল ও কালি-কলমে। তাঁর কর্মের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি পেয়েছেন শিল্পকলা পদক, গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন পদক, নবধারা কণ্ঠশীলন পদক, নরসিংদী পৌরসভা কর্তৃক সম্মাননা পদক, বৈশাখী একাডেমি কর্তৃক সম্মাননা পদক, যুগান্তর-স্বজন সমাবেশ পদকসহ অসংখ্য পুরস্কার। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত একাত্ম ছিলেন শিল্পের সাধনায়।
ফণী ভূষণ দাসের জন্ম ১৩ জানুয়ারি ১৯৫৩, নরসিংদী জেলা সদরের টেকপাড়া (পূর্ব দত্তপাড়া) গ্রামে। তাঁর বাবার নাম গোবিন্দ চন্দ্র দাস, মায়ের নাম প্রেমদা দাস, স্ত্রীর নাম রুমা দাস, ছেলে মাইকেল দাস রনি, মেয়ে নীলা দাস সুইটি। তিনি নরসিংদী পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৬৭ সালে এসএসসি এবং নরসিংদী কলেজ থেকে ১৯৬৯ সালে এইচএসসি পাশ করেন। তিনি ঢাকা আর্ট কলেজ (বর্তমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ) থেকে ১৯৭৬ সালে বিএফএ স্নাতক এবং পরে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন, শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী, শিল্পী কামরুল হাসান, শিল্পী রফিকুন নবী, স্থপতি শামীম শিকদারের মতো শিক্ষকের প্রিয় ছাত্র ছিলেন। এছাড়া তিনি কলকাতা আর্ট কলেজের কয়েকজন বিখ্যাত শিক্ষকের কাছ থেকে চারু ও ভাস্কর্য বিষয়ে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন।
শিবপুরের ইটাখোলায় শহীদ মিনারের কাছে নিহত পুলিশ সদস্যদের স্মরণে নির্মিত স্মৃতিস্তম্ভ, তাঁতশিল্প নগরী মাধবদীতে তাঁতশিল্পের উপর তাঁত ও মাকু দিয়ে ম্যানচেস্টার চত্বর নির্মাণ করেন। তাছাড়া নরসিংদী ও নরসিংদীর বাইরে ৩০-৩৫ টি ভাস্কর্য নির্মাণ করেন। ফণী দাসের ভাস্কর্যের কারণে নরসিংদী পৌরসভা বাংলাদেশে নান্দনিক ভাস্কর্যের শহর হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।
ফণী দাস ছিলেন আমাদের সময়ের বর্ণাঢ্য, উজ্জ্বল, বহুমাত্রিক ব্যক্তিত্ব। কালের স্বাক্ষী হয়ে নানাভাবে দেখেছেন জীবন ও কর্মকে। অলোকিত ও শাণিত করার চেষ্টা করেছেন চারপাশের সবাইকে। গত ১৪ এপ্রিল ২০২৪ (রবিবার), ১৪৩১ বঙ্গাব্দের প্রথম দিনে আমাদের কাঁদিয়ে না ফেরার দেশে পাড়ি জমান। ফণী দাসের পুরো জীবন ছিলো সংগ্রামমুখর। নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান হিসেবে অনেক সংগ্রাম করে লেখাপড়া করেছেন। লেখাপড়ার খরচ জোগাতে লেখাপড়ার পাশাপাশি টিউশনি করেছেন। ছবি এঁকেও কিছু আয়-রোজগার করেছেন। লেখাপড়া শেষ করে পরিবারের হাল ধরতে শিক্ষকতা শুরু করেন। তিনি সুদীর্ঘকাল ইউ-এম-সি আর্দশ উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করে ২০১০ সালে অবসর গ্রহণ করেন। শিক্ষকতার পাশাপাশি নরসিংদী শিল্পকলা একাডেমিতে তবলার প্রশিক্ষক হিসেবে চাকুরি করেন। তাঁর পুরো পরিবারই শিল্পী পরিবার। তিনি নিজে ভালো গান গাইতে পারতেন, লিখতে পারতেন, সুর করতে পারতেন। তাঁর ছোটো দুই বোন— শিপালী, দিপালী ও স্ত্রী রুমা দাস বাংলাদেশ রেডিও ও টিভির তালিকাভুক্ত শিল্পী। স্বাধীনতার পর নরসিংদীতে এমন একটা সময় ছিলো, যখন ফণী দাসের পরিবার ছাড়া কোনো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানই হতো না। তাঁর একমাত্র ছেলে রনি মাধবদী গার্লস স্কুল এন্ড কলেজের ইংরেজির শিক্ষক। একমাত্র মেয়ে আমেরিকার নাগরিক। গত বছরের জুন মাসে তাঁর বাবা-মাকে আমেরিকা নিয়ে যাবার কথা ছিলো। তাঁদের ভিসাও হয়ে গিয়েছিলো। কিন্তু তার আগেই তিনি স্থায়ী ভিসা নিয়ে না ফেরার দেশে পাড়ি জমান।
ফণী দা’ আমার খুব প্রিয় মানুষ ছিলেন, কাছের মানুষ ছিলেন, আত্মার মানুষ ছিলেন। বয়সে আমার থেকে অনেক বড়ো হলেও আমরা মিশেছি বন্ধুর মতো। গান, কবিতা, নাটক, দেশের সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক অবস্থা নিয়ে আমরা আলাপ করতাম ঘণ্টার পর ঘণ্টা। বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক ও সামাজিক অবস্থান নিয়ে তাঁর মধ্যে অনেক হতাশা ছিলো। তারপরও বাংলাদেশের ভবিষ্যত নিয়ে আশাবাদী ছিলেন। ফণী দা’ ছিলেন রাজনীতি সচেতন, অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রগতিশীল মানুষ। এতো বড়ো একজন শিল্পী, কিন্তু তাঁর মধ্যে কোনো অহঙ্কার ছিলো না। চলাফেরা করতেন অতি সাধারণ মানুষের মতো। সমাজের সব মানুষের সাথে মিশতেন।
ফণী দা’র সাথে আমার পরিচয় ও চলাফেরা প্রায় দীর্ঘ ৩৫-৪০ বছর যাবত। প্রথম পরিচয়ের পর থেকে তাঁকে যেমন দেখেছি, মৃত্যুর আগ পযর্ন্ত তেমনই দেখেছি। তিনি ছিলেন চিরতরুণ। ছোটোখাটো গড়নের মানুষ, সব সময় পরিষ্কার-পরিপাটি জামা-কাপড় পড়তেন, ক্লিনশেভ হয়ে থাকতেন। তিনি ছিলেন মৃদুভাষী, আস্তে আস্তে কথা বলতেন, খুব কম কথা বলতেন। সব সময় তাঁর মুখে হাসি লেগে থাকতো। পান-সিগারেটের প্রতি তাঁর আসক্তি ছিলো না। কিন্তু চা পান করতেন ঘন ঘন। এমনও হয়েছে, কাজের চাপে শুধু চা পান করে সারাদিন কাটিয়ে দিয়েছেন। ফণী দা’কে যখন প্রশ্ন করতাম, আচ্ছা দাদা, সেই ছোটোবেলায় আপনাকে যেমন দেখেছি, এখনো তেমনই আছেন কেমন করে? ফণী দা’ মুচকি মুচকি হাসতেন, কোনো উত্তর দিতেন না। আমার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘আমার ভালোবাসা তুমি’ এবং দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ প্রয়াত মেয়র লোকমান হোসেনকে নিয়ে লেখা ‘তোমার মৃত্যু আমাদের অপরাধী করে দিয়েছে’। কাব্যগ্রন্থ দুটির কবিতার সাথে মিল রেখে কবিতার মধ্যে চমৎকার ইলাস্ট্রেশন করে দিয়েছেন। তাঁর এই ইলাস্ট্রেশনের কারণে বই দুইটি অনেক সমৃদ্ধ হয়েছে। নরসিংদীর সবচাইতে প্রাচীন সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘স্বরলিপি’ শিল্পীগোষ্ঠীর তিনি আমৃত্যু সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। তাঁর সভাপতি ছিলেন অভিনেতা খালেকুজ্জামান ও সাবেক সচিব মুক্তিযোদ্ধা সামসুজ্জামান ভাই। স্বরলিপির অন্যান্য সদস্যরা ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা হাবিব ভাই, আমিরুল ভাই, আসাদুজ্জামান খোকন, সরকার সগীর আহম্মেদ, বিদ্যুৎ ভৌমিক, শ্রীধাম কর্মকার, টিপু সুলতান, রতন ধর, সন্তোষ দা’, দিলীপ দা’, রুমা দাস, শিপালী, দিপালী, আকলিমা আক্তার, চিত্রা বিশ্বাস প্রমুখ। এই সংগঠনের নানা কর্মকাণ্ডে ফণী দা’র সাথে আমি জড়িত ছিলাম। তিনি অঙ্গীকার একাডেমি নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলেন। সেখানে ছোটো ছোটো ছেলেমেয়েরা গান গাওয়া শিখতো, ছবি আঁকা শিখতো, তবলা বাজানো শিখতো। নরসিংদীতে ফণী দা’ কিছু অসাধারণ শিল্পকর্ম নির্মাণ করেছেন, যা আজো নরসিংদীর ইতিহাস-ঐতিহ্যের অংশ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ঐতিহ্যবাহী সাটিরপাড়া কালী কুমার ইনস্টিটিউশনের শতবর্ষ পূর্তি অনুষ্ঠানে ফণী দা’ রাত-দিন অক্লান্ত পরিশ্রম করে কর্কশিট, বাঁশ, কাঠ দিয়ে নানা রকম কারুকার্যময় শিল্পকর্ম করে একটা শতবর্ষী নান্দনিক মঞ্চ তৈরি করে নরসিংদীর মানুষকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন। শুধু এই মঞ্চ দেখার জন্যে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ ভীড় করতেন। শতবর্ষী অনুষ্ঠানে তিনি বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা জমিদার ললিতমোহন রায়ের একটা ছেঁড়া, পুরাতন সাদা-কালো ছবি থেকে অসাধারণ সুন্দর একটি ছবি আঁকেন, যা এখন নরসিংদীর ইতিহাস-ঐতিহ্যের অংশ। সাটিরপাড়া স্কুলের সামনের দেয়ালে তিনি কিছু দৃষ্টিনন্দন টেরাকোটা শিল্পকর্মের কাজ করেছেন। তার মধ্যে জাতীয় স্মৃতিসৌধ, শহীদ মিনার, জাতীয় পাখি দোয়েল, জাতীয় ফুল শাপলা, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ, বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা ললিতমোহন রায়ের ছবি ইত্যাদি অন্যতম।
বিশ-তিরিশ বছর আগে বাংলাদেশের মুদ্রণশিল্প তেমন আধুনিক ছিলো না। নির্বাচন এলে শিল্পীরা কাপড়ে লিখে ছবি এঁকে ব্যানার বানাতেন। ফণী দা’কে দেখতাম কী চমৎকার করে হারিকেনের ভেতর প্রার্থীর ছবি রেখে মোমবাতির আলোয় প্রার্থীর ছবি এঁকে বড়ো বড়ো তোরণ নির্মাণ করতেন। মানুষ ভীড় করে এসব তোরণ ও ছবি দেখতো।
নরসিংদী সরকারি কলেজের শহীদ মিনারের সাথে ফণী দাসের ইতিহাসও জড়িয়ে আছে। প্রতি বছর একুশ এলেই প্রণব স্যার, মোহাম্মদ আলী স্যার, মোস্তাফা স্যার ফণী দাসকে কলেজে ডেকে আনতেন। তিনি কাপড়ের ক্যানভাসে ভাষা আন্দোলনের নানা রকম ছবি এঁকে, পোস্টার লিখে চারপাশ নান্দনিকভাবে সাজিয়ে তুলতেন। তাঁর ক্যানভাসে আঁকা ছবি, দেয়ালচিত্র, দেয়ালে লেখা কবিতার লাইন, আল্পনা দেখতে ছাত্র-ছাত্রী ও সাধারণ মানুষেরা ভীড় করতো। নরসিংদী কলেজের শহীদ মিনার ছিলো তখন নরসিংদীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার। একুশে ফেব্রুয়ারির প্রথম প্রহরে নরসিংদী শহরের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ক্লাব, অফিস-আদালত থেকে হাজার হাজার মানুষ এখানে শ্রদ্ধার্ঘ নিবেদন করতে আসতেন। একুশের প্রথম প্রহর থেকে সকাল পর্যন্ত আবৃত্তি, নাটক, গানসহ নানা রকম আয়োজন থাকতো। বিশেষ করে, ফণী দাসের শিল্পকর্মের কারণে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে একুশের এক অনন্য আবহ তৈরি হতো।
নরসিংদীর বিখ্যাত চারুশিল্পী ফণী দাস নরসিংদীর প্রয়াত মেয়র লোকমান হোসেনের কল্যাণে পরিচিত হয়ে ওঠেন ভাস্কর হিসেবে। লোকমান হোসেন ফণী দাসকে দিয়ে নরসিংদী পৌরসভার সামনে তিন রাস্তার মোড়ে প্রথম ‘স্বাধীনতা স্তম্ভ’ নির্মাণ করান। এই কাজের ঠিকাদার ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা মনিরুজ্জামান ভাইয়ের প্রতিষ্ঠান। স্তম্ভটি উদ্বোধনের সময় উদ্বোধনী ফলকে প্রতিষ্ঠানের নাম ছিলো, কিন্তু শিল্পী হিসেবে ফণী দাসের নাম ছিলো না। এতে ফণী দাস খুব মনোকষ্টে ছিলেন। কিছুদিন পর আমি, ফণী দা’, রুমা বৌদি মেয়র লোকমান হোসেনের বাড়িতে গিয়ে তাঁকে অনুরোধ করি ভাস্কর্যের নামফলকে শিল্পীর নাম সংযোজন করতে। আমরা মেয়রকে বোঝাতে সক্ষম হই যে, কিছুদিন পর হয়তো ফণী দাস থাকবেন না, মেয়র লোকমান হোসেন থাকবেন না, কিন্তু এই ভাস্কর্য থাকবে। ভাস্কর্যে ফণী দাসের নাম থাকলে তা পরবর্তী প্রজন্ম জানবে এবং এই ভাস্কর্যের মধ্যে তিনি বেঁচে থাকবেন। লোকমান হোসেন পরে ভাস্কর্যের নিচে আরেকটা নামফলক তৈরি করে ভাস্কর্য শিল্পী হিসেবে ফণী দাসের নাম সংযুক্ত করে দেন। এরপরে আর ফণী দাসকে এসব নিয়ে ভাবতে হয়নি। লোকমান হোসেন ফণী দাসকে দিয়ে একে একে শিক্ষা চত্বর, গোলাপ চত্বর, শাপলা চত্বর, রজনীগন্ধা চত্বর, ফোয়ারা চত্বর নির্মাণ করান। লোকমান হোসেনের মৃত্যুর পর তাঁর ছোটো ভাই মেয়র কামরুজ্জামানও ফণী দাসকে দিয়ে দোয়েল চত্বর, লোকমান হোসেনের সমাধি সৌধ নির্মাণ করান। শিবপুরের ইটাখোলায় শহীদ মিনারের কাছে নিহত পুলিশ সদস্যদের স্মরণে নির্মিত স্মৃতিস্তম্ভ, তাঁতশিল্প নগরী মাধবদীতে তাঁতশিল্পের উপর তাঁত ও মাকু দিয়ে ম্যানচেস্টার চত্বর নির্মাণ করেন। তাছাড়া নরসিংদী ও নরসিংদীর বাইরে ৩০-৩৫ টি ভাস্কর্য নির্মাণ করেন। ফণী দাসের ভাস্কর্যের কারণে নরসিংদী পৌরসভা বাংলাদেশে নান্দনিক ভাস্কর্যের শহর হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।


তিনি ২০১০ সালে বাংলাভিশন টেলিভিশনে ‘আমার আমি’ অনুষ্ঠানে এবং ২০১৩ সালে মাছরাঙ্গা টেলিভিশনে ‘ভোরের সকাল’ অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে অংশ নেন।
আমি ফণী দা’র সাথে সুদীর্ঘ ১২ বছর নরসিংদী পৌরসভার আয়োজনে অমর একুশে বইমেলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে বিচারকের দায়িত্ব পালন করেছি। আমাদের সাথে বিচারক হিসেবে আরো ছিলেন কণ্ঠশিল্পী নাজির উদ্দিন আহম্মেদ ভাই। ফণী দা’ তাঁর দায়িত্বের প্রতি অত্যন্ত সচেতন ও নিষ্ঠাবান ছিলেন। প্রতিদিনই অনুষ্ঠান শুরুর আগে খাতা, কলম ও ডায়রি নিয়ে হাজির থাকতেন। অনুষ্ঠানের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নাচ, গান, আবৃত্তি ও নাটকের সবকিছু ডায়রিতে নোট করে রাখতেন। নিরপেক্ষ বিচার করতেন। কারো অন্যায় অনুরোধ ও দাবির কাছে আপোষ করেননি।
ফণী দাস একজন স্বপ্নবাজ মানুষ ছিলেন। তাঁর অনেক স্বপ্নের কথা আমার সাথে শেয়ার করতেন। নতুন কোনো গান লিখলে সুর করে আমাকে শোনাতেন। খুব সুন্দর কণ্ঠ ছিলো তাঁর। উচ্চারণও ছিলো নিখুঁত। যেকোনো বিষয়ে তৎক্ষণাৎ গান লিখতে পারতেন। তাঁর একটি বড়ো স্বপ্ন ছিলো নিজের আঁকা মুক্তিযুদ্ধের ছবি দিয়ে একটি প্রদর্শনী করার। ইতোমধ্যে অনেক ছবিও এঁকেছিলেন। আমাকে কিছু আঁকা ছবি দেখিয়েছেনও। তবলার প্রতি তাঁর একটা অন্য রকম আবেগ ছিলো। এ-আবেগ থেকে তবলার উপর একটা বই লেখা শুরু করেছিলেন। কিন্তু শেষ করে যেতে পারেননি। তাঁর লেখা গান নিয়ে তিনি একটি একক গানের অনুষ্ঠান করতে চেয়েছিলেন। এক জীবনে মানুষ অনেক স্বপ্ন দেখে, তার বেশিরভাগই মানুষের অপূর্ণ থেকে যায়। ফণী দা’র দেখা স্বপ্ন তিনি পূরণ করতে না পারলেও আমাদের চোখে সেই স্বপ্ন তিনি এঁকে দিয়ে গেছেন। জানি না, এই স্বপ্নবাজ মানুষটি অদেখা ভুবনে কেমন আছেন। প্রার্থনা করি, যেখানে থাকুন, ভালো থাকুন, পরম করুণাময়ের করুণাধারায় সিক্ত থাকুন।
শাহ্ আলম
কবি ও নাট্যকার

