নরসিংদী রেলস্টেশন সংলগ্ন খালপাড় থেকে ভেলানগর যাওয়ার রাস্তায় ব্রাহ্মন্দী গার্লস হাই স্কুল এন্ড কলেজের সামনেই মালাকার মোড়। মোড় ঘেঁষেই একতলা ভবনের উপরে সাইনবোর্ড ঝুলে আছে— ‘মালাকার হোমিও হল’। সকাল নয়টা বাজতেই রোগীদের ভীড় জমে ওঠে। নারী, পুরুষ, শিশু, বৃদ্ধ— প্রায় সব বয়সী রোগীরাই এখানে চিকিৎসা নিতে আসেন। তবে বেশি সংখ্যক নারী ও শিশুরাই এখানে সেবা নিতে আসেন।
তৎসময়ে বসন্ত রোগের খুব প্রাদুর্ভাব দেখা দিতো। শীতের শেষে বসন্তের শুরুতে খুব প্রকট আকার ধারণ করতো, চারপাশে হু হু করে ছড়িয়ে পড়তো জলবসন্তের জীবাণু। নিম্ন শ্রেণির পেশাজীবীর মানুষ তখন অর্থের অভাবে চিকিৎসা করতে পারতেন না। তখনই ডা. চান মোহন মালাকার এই গরীব-অসহায়দের বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা প্রদান করতেন।
কালের পরিক্রমায় বদলে গেছে অনেক কিছুই। আজকের এই শহরের বুক চিরে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে বিরাট বিরাট সব বিল্ডিং, মার্কেট, শপিংমল, পরিবর্তিত হয়েছে রাস্তাঘাট। একটা সময় এসবের কিছুই ছিলো না, বলছি চল্লিশের দশকের কথা। এখানেই একটি টিনের ঘরে নিজ বাড়িতেই ডা. চান মোহন মালাকার শুরু করেছিলেন হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা। তাঁর জন্ম ২৮ অগ্রহায়ণ ১৩২৬ বঙ্গাব্দ। তিনি একজন ধনাঢ্য পরিবারের সন্তান ছিলেন। তিনি সাটিরপাড়া কালী কুমার উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন (বর্তমানে সাটিরপাড়া কালী কুমার ইনস্টিটিউশন স্কুল এন্ড কলেজ)। তিনি যখন ক্লাশ নাইনে পড়তেন, তখন থেকেই হাতেখড়ি। ব্রাহ্মন্দীর তৎকালীন জমিদার জিতেন্দ্র কিশোর মৌলিকের পরিবার সেবামূলকভাবে হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা প্রদান করতেন। গরীব-অসহায়দের সেখানে বিনামূল্যে চিকিৎসা দেয়া হতো। তিনি সেখান থেকেই হোমিওপ্যাথি চিকিৎসায় হাতেখড়ি নেন। পরবর্তীতে তিনি পাকিস্তান আমলে হোমিওপ্যাথিতে এইচএমবি ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি নিজ বাড়িতেই এই চিকিৎসা শুরু করেন। তৎসময়ে বসন্ত রোগের খুব প্রাদুর্ভাব দেখা দিতো। শীতের শেষে বসন্তের শুরুতে খুব প্রকট আকার ধারণ করতো, চারপাশে হু হু করে ছড়িয়ে পড়তো জলবসন্তের জীবাণু। নিম্ন শ্রেণির পেশাজীবীর মানুষ তখন অর্থের অভাবে চিকিৎসা করতে পারতেন না। তখনই ডা. চান মোহন মালাকার এই গরীব-অসহায়দের বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা প্রদান করতেন। অনেক দূর-দূরান্ত থেকে রোগীরা পায়ে হেঁটে, নৌকায় করে গ্রাম থেকে কাদামাটি পেরিয়ে এখানে আসতেন চিকিৎসার জন্যে। বেশিরভাগই নারী ও শিশু আসতো। শিশুরাই জলবসন্তে আক্রান্ত হতো বেশি। মায়েরা তাদের সন্তান নিয়ে সেই দূরের গ্রাম থেকে নদী পেরিয়ে পায়ে হেঁটে সন্তানের চিকিৎসার জন্যে এখানে আসতেন। তিনি কখনোই কারো কাছ থেকে টাকা চেয়ে নিতেন না। যার যেমন সাধ্য ছিলো, তেমনই দিতেন। এছাড়াও তিনি যে-সকল মুমূর্ষু রোগীরা আসতে পারতো না, তাদেরকে বাড়িতে গিয়ে চিকিৎসা সেবা প্রদান করতেন। এভাবেই মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে ডা. চান মোহন মালাকারের নাম। পুরো নরসিংদী জুড়েই ছড়িয়ে পড়ে তাঁর চিকিৎসা খ্যাতি। রোগীরা তাঁকে মালাকার ডাক্তার বলেই চিনতেন। দূর-দূরান্ত থেকে রোগীরা এসে মালাকার ডাক্তারের চেম্বার বা বাড়ির খোঁজ করতো। এভাবে মানুষের মুখে মুখে প্রচারিত হতে থাকে মালাকার মোড়। অসংখ্য গুণের অধিকারী মহান হৃদয়ের এই মানুষটি ১৭ আশ্বিন ১৪০১ বঙ্গাব্দে মৃত্যুবরণ করেন।
ডা. চান মোহন মালাকারের ছয় সন্তান। তিন ছেলে এবং তিন মেয়ে। ছোটো ছেলে ডা. সঞ্জয় কুমার মালাকার। তিনিই এখন বাবার এই ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন। তিনি জানান, “আমার বাবা ব্রিটিশ আমলের শেষের দিকে হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসায় নিয়োজিত হোন। তখন কোনো দোকান ছিলো না, ফার্মেসির নাম ছিলো না, সাইনবোর্ড ছিলো না, বাড়িতে বসেই বাবা চিকিৎসাকার্য চালাতেন। অনেক দূর-দূরান্ত থেকে রোগীরা আসতেন। তারপর সময়ের পরিক্রমায় অনেক কিছুর বদল হয়েছে। আইন কাঠামোর পরিবর্তন হয়েছে। তখন ফার্মেসির নাম ও সাইনবোর্ড লাগানো হলো। আমি হোমিওপ্যাথিতে ডিএইচএমএস ডিগ্রি অর্জন করেছি। এখন আমাদের এখানে প্রতিদিনই ৭০-৮০ জন রোগী আসে।”
এছাড়াও কথা হয়েছে নরসিংদী সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ মোহাম্মদ আলী স্যারের সঙ্গে। তিনি বলেন, “বাবু চান মোহন মালাকার একজন খ্যাতিসম্পন্ন হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক ও নিভৃতচারী সমাজসেবক ছিলেন। ডা. চান মোহন মালাকার দেশভাগ হওয়ার আগে থেকেই হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা শুরু করেন। তাঁর বড়ো ছেলে নারায়ণ মালাকার আমার বন্ধু ছিলো। আমরা একসাথে ব্রাহ্মন্দী বয়েজ স্কুলে পড়তাম। সেই সুবাদে তাঁদের বাসায় যাতায়াত ছিলো, তিনি আমাকে খুব স্নেহ করতেন। তখন আমারও কোনো সমস্যা হলে তাঁর কাছ থেকে ঔষধ নিতাম। সকলের সাথেই খুব আন্তরিকতা ও নমনীয়তা বজায় রাখতেন। তাঁদের পুরো পরিবারটিই অসাম্প্রদায়িক ছিলো।”
নরসিংদী সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ গোলাম মোস্তাফা মিয়া বলেন, “তৎকালীন সময়ে যে-ক’জন লোক সমাজে নেতৃত্ব দিতেন, তিনি তাদের মধ্যে একজন ছিলেন। তিনি সব সময়ই সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখতেন। তিনি সবথেকে বেশি জনপ্রিয় ছিলেন একজন হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক হিসেবে। তিনি নারীদের শিক্ষার ক্ষেত্রে খুব সচেতন ছিলেন। তৎসময়ে নারীদের শিক্ষার খুব বেশি সুযোগ ছিলো না। তিনি সেটা উপলব্ধি করেছিলেন। তিনি ব্রাহ্মন্দী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় (এখন যেটা পরিবর্তিত হয়ে ব্রাহ্মন্দী গার্লস হাই স্কুল এন্ড কলেজ)-এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন। তৎকালীন চিনিশপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জনাব জাহাদ আলী চেয়ারম্যান, ডা. চান মোহন মালাকার, সমসের ইঞ্জিনিয়ার, মধু ভূঁইয়া প্রমুখ সম্মিলিত চেষ্টায় এই বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন।”

